Tuesday, September 29, 2009

ভূমিকম্পে করণীয়

30 comments


ভূমিকম্প-প্রতিরোধী বাড়ি

যাঁরা এখনো বাড়ি তৈরি করেননি, পরিকল্পনা করছেন, তাঁরা চাইলেই ভূমিকম্প-প্রতিরোধী বাড়ি বানাতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে:
* প্রথমেই মাটি পরীক্ষা করে নিতে হবে। ওই জায়গায় মাটি দেবে যাওয়ার প্রবণতা আছে কি না দেখে নিন। খাল-বিল-পুকুর-ডোবা ভরাট করে বাড়ি বানাতে চাইলে মাটি ভালোভাবে দুরমুস করে নিন।
* বাড়ি এমনভাবে তৈরি করুন, যাতে রোমান সংখ্যায় VII (৭) মাত্রার ইনটেনসিটি (তীব্রতা) সহনশীল হয়।
* দক্ষ প্রকৌশলী দিয়ে নকশা তৈরি ও তদারক করাতে হবে।
* ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণ আইন অনুযায়ী ভূমিকম্পের ধাক্কায় সহনশীল হবে এমন রড ব্যবহার করতে হবে।
* ভবনের উচ্চতা ও ভার বহনের হিসাব অনুযায়ী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করুন।
* সিমেন্ট, রড, বালু ভালো মানের ও পরীক্ষিত হতে হবে।
* ভিত্তিপ্রস্তরে গ্রেট বিম কলামের সংযোগস্থলে প্রয়োজনীয় কোড অনুযায়ী রড দিতে হবে।
* কলামের রডে বাঁধনগুলোর শেষ মাথা ১৩৫ ডিগ্রি হতে হবে এবং বাঁধনগুলোর দূরত্ব অন্য জায়গার চেয়ে অর্ধেক হবে। অর্থাত্ ফাঁকা কম হবে।
* বিম ও কলামের সংযোগস্থলে জোড়া লাগানো যাবে না। নতুন-পুরোনো সংযোগগুলো কলামের মাঝামাঝি যেন হয় এমনভাবে রড কাটতে হবে। সংযোগগুলো ঝালাই করা যেতে পারে।
* বহুতল ভবনে কংক্রিটের তৈরি কোরওয়াল (লিফটের দেয়াল) প্রয়োজনমতো থাকা উচিত।
* কার পার্কিং বিম ও কলাম বরাবর বাইরের দেয়াল প্রয়োজনমতো থাকা উচিত।
* মাটির ঘর হলে শক্তভাবে নির্মাণ করুন।
* আপনার বাড়িটি পাশের বাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্বে নির্মাণ করুন।
* বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন, গ্যাসলাইন নিরাপদ ও সতর্কভাবে স্থাপন করুন, যাতে তাত্ক্ষণিকভাবে বন্ধ করা যায়।
* ঘরে একাধিক দরজা রাখুন, যাতে বিপদের সময় দ্রুত বের হওয়া যায়।

পুরোনো বাড়ির ক্ষেত্রে
বাড়ির মালিকদের দুশ্চিন্তার কিছু নেই। একটু সচেতন হলেই আপনার বাড়িটি এখনো ভূমিকম্পরোধী করা সম্ভব। এর জন্য বাড়তি কিছু অর্থ ব্যয় করতে হবে।
* পুরোনো ঘরের খুঁটি মেরামত করুন।
* সে জন্য বাড়ির কলামগুলো শক্তিশালী করতে হবে। প্রয়োজনমতো কলামের আকৃতি বাড়াতে হবে। অতিরিক্ত টানা রড বা তারের জালি (ফেরোসিমেন্ট পদ্ধতি) কলামকে চিপিং করে ফেরোসিমেন্ট ব্যবহার করা যায়।
* প্রয়োজনে নতুন করে মাটি পরীক্ষা করতে হবে।
* প্রতিটি ঘরের কোনায় খাড়াভাবে অতিরিক্ত কংক্রিটের কলাম ইস্পাতের রডসহ নির্মাণ করা যায়। টানা পদ্ধতি না থাকলে নতুন করে দেওয়া যায়।
* দেয়াল মজবুত করার জন্য দরজা-জানালার দুই দিকে খাড়া রড গাঁথতে হবে। ইটের দেয়ালের মাঝখানে অতিরিক্ত রড দিয়ে দিতে হবে।
* কাঁচা বাড়িঘর, বাঁশের ঘর হলে বাঁশের বেড়ার দুপাশে মাটি বা চুন-সুরকির প্রলেপ দেওয়া যেতে পারে, তা সাশ্রয়ীও বটে।
* খাট ও টেবিল শক্তভাবে তৈরি কি না পরীক্ষা করুন। ভূমিকম্পের সময় এসবের নিচে আশ্রয় নেওয়া যায়।
* বাড়ির বীমা করা না থাকলে করিয়ে রাখুন।


ভূমিকম্পের সময় করণীয়
* ভূমিকম্পের প্রথম ঝাঁকুনির সঙ্গে সঙ্গে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিন।
* ঘরে হেলমেট থাকলে মাথায় পরে নিন, অন্যদেরও পরতে বলুন।
* ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সম্ভব হলে আশপাশের সবাইকে বের হয়ে যেতে বলুন।
* দ্রুত বৈদ্যুতিক ও গ্যাসের সুইচ বন্ধ করে দিন।
* কোনো কিছু সঙ্গে নেওয়ার জন্য অযথা সময় নষ্ট করবেন না।
* যদি ঘর থেকে বের হওয়া না যায়, সে ক্ষেত্রে ইটের গাঁথুনি দেওয়া পাকা ঘর হলে ঘরের কোণে এবং কলাম ও বিমের তৈরি ভবন হলে কলামের গোড়ায় আশ্রয় নিন।
* আধাপাকা বা টিন দিয়ে তৈরি ঘর থেকে বের হতে না পারলে শক্ত খাট বা চৌকির নিচে আশ্রয় নিন।
* ভূমিকম্প রাতে হলে কিংবা দ্রুত বের হতে না পারলে সজাগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয় নিন ঘরের কোণে, কলামের গোড়ায় অথবা শক্ত খাট বা টেবিলের নিচে।
* গাড়িতে থাকলে যথাসম্ভব নিরাপদ স্থানে থাকুন। কখনো সেতুর ওপর গাড়ি থামাবেন না।
* এ সময় লিফট ব্যবহার করবেন না।
* যদি বহুতল বাড়ির ওপরের দিকে কোনো তলায় আটকা পড়েন, বেরিয়ে আসার কোনো পথই না থাকে, তবে সাহস হারাবেন না। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। ভেবে দেখুন, উদ্ধারকারী পর্যন্ত আপনার চিত্কার পৌঁছাবে কি না।
* বিম, দেয়াল, কংক্রিটের ছাদ ইত্যাদির মধ্যে আপনার শরীরের কোনো অংশ চাপা পড়লে, বের হওয়ার সুযোগ যদি না-ই থাকে, তবে বেশি নড়াচড়া করবেন না। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে।
* ধ্বংসস্তূপে আটকে গেলে সাহস হারাবেন না। যেকোনো উত্তেজনা ও ভয় আপনার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।


সতর্কতা ও সচেতনতা
* ভূমিকম্প সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিন।
* এর ঝুঁকি ও করণীয় সম্পর্কে অবহিত থাকতে হবে।
* ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি থাকতে হবে।
* এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গড়ে তুলতে হবে।
* ভূমিকম্পে আহতদের জন্য জরুরি চিকিত্সাসেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
* বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সভা, সেমিনার এবং গণমাধ্যমের সাহায্যে জনগণের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
* বাড়ি বানানোর প্রকৌশলী, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, বাড়ির মালিক ও মেরামতের সঙ্গে জড়িত লোকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
* ভূমিকম্প প্রকৌশল কোর্স চালু করা দরকার।
* স্কুল, হাসপাতাল ও দমকলের মতো অত্যাবশ্যকীয় প্রতিষ্ঠানের গঠন সুচারুভাবে করা উচিত।
* গৃহীত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে হবে।
* বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ আইন অনুযায়ী তৈরি করলে দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব।
* বাড়ি বানানোর সময় অবশ্যই তীব্রতা-সহনশীল করে তৈরি করতে হবে। আমরা না বুঝে ম্যাগনেচুড বা মাত্রা-সহনশীল তৈরি করে থাকি, যা ঠিক নয়। তীব্রতা-সহনশীল পদ্ধতি ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা নির্দেশ করে। ভূমিকম্প হয়ে যাওয়ার পরপরই এটি মাপা হয়। ভূমিকম্পের ব্যাপকতা বোঝাতে ভয়াবহ, প্রচণ্ড, মাঝারি, মৃদু ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করা হয়।


ভূমিকম্প যেভাবে মাপা হয়
ভূমিকম্পের মাত্রা দুভাবে নির্ধারণ করা হয়।
১. ম্যাগনেচুড (মাত্রা)
২. ইনটেনসিটি (তীব্রতা)
ম্যাগনেচুড (মাত্রা): সাধারণ রিখটার স্কেলেই ম্যাগনেচুড (মাত্রা) মাপা হয়। স্কেলের এককের সীমা ১ থেকে ১০ পর্যন্ত। রিখটার স্কেলে মাত্রা পাঁচের বেশি হওয়া মানে ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা।
রিখটার স্কেলে প্রতি ১ মাত্রা বৃদ্ধি মানে ভূকম্পনের শক্তি প্রায় ৩২ গুণ বেড়ে যাওয়া। এটি ভূমিকম্প সৃষ্টির প্রধান নিয়ামক। ভূমিকম্পের বিভিন্ন স্তরের পরিবর্তনের কারণে শক্তির যে নিঃসরণ ঘটে, এর সঙ্গে এটি সরাসরি জড়িত।
ইনটেনসিটি (তীব্রতা): সাধারণত সংশোধিত মার্কেলিং স্কেলে এটি মাপা হয়। মানুষের অনুভূতি, গৌণ কাঠামো ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের ওপর এটি নির্ভরশীল। এর এককগুলো প্রকাশ করা হয় রোমান সংখ্যায়, অর্থাত্ I থেকে XII পর্যন্ত। ইনটেনসিটি বেশি হলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। একটি নির্দিষ্ট ভূমিকম্পের জন্য জায়গাভেদে এর পরিমাত্রা ভিন্ন হয়।


লিখেছেন তৌহিদা শিরোপা। প্রকাশিত হয়েছে "দৈনিক প্রথম আলো" পত্রিকায়।

Saturday, September 26, 2009

বিভিন্ন ঘুর্নিঝড়ের নাম

0 comments
ঘুর্নিঝড়নার্গিস’ এর নামকরন করেছে পাকিস্তান। ফুলের নামে এর নাম। এরপর যে ঘুর্নিঝড়টি আসবে তারনাম অভয় (এবিএ)। এরপর আসবে- খায়মুক, নিশা, বিজলী, আইলা, ফিয়ান, ওয়ার্দ, লায়লা, বন্দু, ফেট, গিরি, জাল, কেইলা, থানে, মার্জান, নিলম, মাহাসেন, ফাইলিন, হেলেন, লহর, মাদী, নানাউক, হুদহুদ, নিলুফার, প্রিয়া, কোমেন, চপলা, মেঘ, ভালি, কায়ন্ত, নাদা, ভরদাহ, সামা, মোরা, অক্ষি, সাগর, বাজু, দায়ে, লুবান, তিতলি, দাস, ফেথাই, ফণী, বায়ু, হিকা, কায়ের, মহা, বুলবুল, সোবা, আমপান। আবহাওয়া অধিদফতর এ তথ্য জানিয়েছে।



আবহাওয়া অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সুজিত কুমার দে শর্মা জানান, ২০০৬ সালের ৩০শে জানুয়ারী থেকে ৪ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত বাংলাদেশের সার্ক আবহাওয়া গবেষনা কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) এবং ৮ দেশের সমণ্বয়ে গঠিত ‘Economic and social commission for Asia and Pacific’(ESCAP) এ Panel on tropical cyclone শীর্ষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে ইএসসিএপি (ইসকেপ) প্যানেলভুক্ত বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ও থাইল্যান্ড-এ ৮টি দেশের প্রস্তাবিত নামের ভিত্তিতে সরব সম্মতিক্রমে ৬৪টি ঘুর্নিঝড়ের নাম গৃহিত হয়। নামগুলো শুধু বঙ্গোপসাগরেআরব সাগরে সৃষ্ট ঘুর্নিঝড়গুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশের দেয়া নাম - নিশা, গিরি, হেলেন, চপলা, অক্ষি, ফণী, অনিল, অগ্নি।

বনৌষধি মেলোডোরাম

0 comments
ছোট গুল্ম। আমাদের দেশে এর দুটি ঘনিষ্ঠ প্রজাতি দেখা যায় চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায়। এরা মূলত লতানো গুল্ম। একটার নাম বড়সানে ও অন্যটার নাম ছোটসানে। বেশ কিছুদিন আগে ব্যাংককের এক বাড়ির বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। হঠাত্ বাঁ পাশ থেকে এক মিষ্টিমধুর সৌরভ ভেসে এল। অনেকটা কাঁঠালীচাঁপার গন্ধের মতো। তবে বেশ মোলায়েম। ভালো করে তাকিয়ে দেখি ছোট এক গাছ, পাতার ফাঁকে ফাঁকে হালকা হলুদ ফুলে আচ্ছন্ন। অসংখ্য মৌমাছির আনাগোনা।


এই প্রজাতির নাম Melodorum fructicosum। Annonaceae বা আতা ও কাঁঠালীচাঁপা পরিবারভুক্ত। লম্বা লম্বা পাতা, সরল আর একান্তর। বেশ বড় ফুল, একক; পাতার গোড়া থেকে ঝুলে পড়ে। পাপড়ির রঙের কথা আগেই বলা হয়েছে হালকা হলুদ। দুই সারিতে ছয়টা পাপড়ি। বাইরের তিনটা একটু ছড়ানো আর ভেতরের তিনটা একটু গোটানো। ফল পাকলে খেতে ভালো। একটু মিষ্টি। থাই-চীনা ভেষজের তালিকায় বেশ গুরুত্ব পেয়েছে এই প্রজাতির গাছ। এর শুকনো ফুল চীনা ওষুধ ‘ইয়া হোম’-এর এক উপাদান। রক্ত ও হূদজনিত রোগের টনিক হিসেবে বেশ পরিচিত। সংজ্ঞাহীন রোগেও ফুলের নির্যাস ব্যবহূত হয়। কিন্তু ভারতীয় বনৌষধির তালিকায় এই প্রজাতির কোনো উল্লেখ নেই। তবে আমাদের দেশে এই প্রজাতি সহজেই লাগানো যেতে পারে।
লিখেছেন নওয়াজেশ আহমদ । প্রকাশিত হয়েছে "দৈনিক প্রথম আলো" পত্রিকায়।

সোনা-রুপা দিলে মুদ্রা তৈরি করে দিত ঢাকার টাঁকশাল

0 comments
লিখেছেন আশীষ-উর-রহমান



টাঁকশাল স্থাপন মুঘল আমলে শহরের মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। টাঁকশাল হলো টাকা তৈরির কারখানা। ঢাকাকে রাজধানী করার পর এখানে একটি টাঁকশাল স্থাপন করেছিলেন মুঘল শাসকেরা। বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকার কোনো এক জায়গায় ছিল এর অবস্থান।
সে সময় স্থানীয় মুদ্রা বিদেশি বণিকদের কাছে পর্যাপ্ত থাকত না। ইউরোপীয় বড় বণিক, কোম্পানি বা অন্যান্য বিদেশি ব্যবসায়ী আসতেন সোনা বা রুপা নিয়ে। তাঁরা সেসব সোনা-রুপা দিয়ে এই টাঁকশাল থেকে বিভিন্ন মানের স্থানীয় মুদ্রা তৈরি করিয়ে নিতেন কেনাকাটার জন্য। এ জন্য অবশ্য টাঁকশালকে শতকরা সাড়ে তিন ভাগ শুল্ক দিতে হতো তাঁদের।
ঢাকার টাঁকশাল প্রতিষ্ঠার সঠিক সন-তারিখ অজানা। সুবেদার ইসলাম খান ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের পর শহরের নামকরণ করেছিলেন তাঁর প্রিয় সম্রাটের নামানুসারে জাহাঙ্গীরনগর। ইসলাম খানের সময়ই, না এর পরে টাঁকশালটি স্থাপন করা হয়েছিল, তেমন কোনো প্রমাণ ঐতিহাসিকেরা পাননি। অধ্যাপক আবদুল করিম তাঁর ঢাকা: দ্য মুঘল ক্যাপিটাল বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ঢাকার টাঁকশালের সবচেয়ে পুরোনো যে মুদ্রাটি পাওয়া গেছে, তা হিজরি ১০২৬ সনের; ইংরেজি ১৬১৭ সালের। মুঘল সাম্রাজ্যের শেষাবধি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পরও ঢাকার টাঁকশাল চালু ছিল। তিনি জানিয়েছেন, আঠারো শতকের দিকে টাঁকশালে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাও ছিল।


কোথায় ছিল টাঁকশাল: ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন, ঢাকার বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় ছিল টাঁকশালের অবস্থান। তবে ঠিক কোন জায়গায় এটি ছিল, তা চিহ্নিত করা যায়নি। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তাঁর ঢাকা: স্মৃতিবিস্মৃতির নগরী গ্রন্থে ঢাকার কালেক্টর র্যাংকিনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, চকবাজারের পুরোনো দুর্গের মধ্যে তখন ছিল পাগলাগারদ। এর আশপাশেই তিনি মুঘল আমলের টাঁকশালটির জরাজীর্ণ ভিত্তিটি হয়তো দেখে থাকবেন। পাগলাগারদের পাশেই ছিল একটি পুকুর। পাগলাগারদের কথা অনেকেই উল্লেখ করেছেন। র্যাংকিন ঢাকায় এসেছিলেন ১৯২০ সালে। এ সময় পুকুরটির পাশে আগা মেহেন্দী টাঁকশালীর বাড়ি ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। মুনতাসীর মামুনের অনুমান, আগা মেহেন্দী হয়তো কখনো টাঁকশালের তত্ত্বাবধানে ছিলেন বলেই তাঁর টাঁকশালী উপাধি।
টাকার হাট: টাঁকশাল ছাড়া ঢাকায় টাকার হাটও ছিল মুঘল আমলে। নবাবপুর এলাকায় ছিল এই হাট ও মহাজনপুর নামের দুটি বসতি। টাকার হাটে সোনা-রুপার বদলে টাকা দেওয়া, বন্ধকি ও ঋণ দেওয়ার ব্যবসা চলত। যাঁরা এসব ব্যবসা করতেন তাঁরাই থাকতেন পাশের মহাজনপুরে। নাজির হোসেন তাঁর কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থে টাকার হাট ও মহাজনপুরের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, মুঘল আমলের শেষদিকে নবাবপুরে এই এলাকা গড়ে উঠেছিল এবং কোম্পানির আমলেও টাকার হাটের ব্যবসা চলত।
আরও টাঁকশাল: মুঘলদের আগেও বাংলায় টাঁকশাল ছিল। ১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পর থেকে এখানে টাঁকশাল স্থাপিত হতে থাকে। বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাজধানীসহ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক শহরগুলোতে মুদ্রা তৈরি শুরু হয়।’ সে সময়ের টাঁকশালগুলোর দীর্ঘ তালিকা আছে বাংলাপিডিয়ায়। বাংলার আদি টাঁকশালটি অবশ্য ছিল গঙ্গার পশ্চিম তীরে রাজধানী লক্ষ্নৌতে। এখানে পাওয়া প্রথম রৌপ্যমুদ্রাটি ১২৩৬ সালের। সুলতান জালালুদ্দিন বাজিয়ারের সময় টাঁকশালটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহর সময় ১৩২২ সালে টাঁকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সোনারগাঁয়ে। ব্রহ্মপুত্র নদের বিপরীতে সোনারগাঁর ১২ মাইল উত্তরে তখনকার মুয়াজ্জামাবাদে সিকান্দার শাহর সময় টাঁকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৩৯৫ সালে। ফরিদপুরের নাম ছিল তখন ফতেহাবাদ, এখানে ১৪৩৬ সালে টাঁকশাল স্থাপন করেন রুকনুদ্দিন বরবক। জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ চাটগাঁওয়ের টাঁকশালটি করেছিলেন ১৪১৫ সালে (মুঘল আমলে সুবেদার শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রামের নাম বদলে রেখেছিলেন ইসলামাবাদ)। যশোরের উত্তর-পূর্ব এলাকায় ফরিদপুর অঞ্চল নিয়ে একটি টাঁকশাল স্থাপিত হয়েছিল ১৪৫৪ সালে নাসিরউদ্দিন শাহর আমলে। এলাকাটির নাম ছিল মাহমুদাবাদ। পশ্চিম দিনাজপুর অঞ্চলকে তখন বলা হতো বারবকাবাদ। এখানে ১৪৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল টাঁকশাল। বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর ও দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এলাকা নিয়ে ১৪৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নুসরতাবাদ টাঁকশাল। এটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নাসিরুদ্দিন নুসরাত শাহ।
প্রকাশিত হয়েছে "দৈনিক প্রথম আলো" পত্রিকায়।

Friday, September 25, 2009

দৃষ্টান্ত (we should follow it )

0 comments



Published in Daily Ittefaq

১০৭ বছর বয়সে ২৩ তম বিবাহের আশা

0 comments


Published in Daily Jaijaidin

এদেশেরই এক বিপ্লবী: বীরকন্যা প্রীতিলতা

0 comments
বয়স কত? একুশ। পরনে মালকোঁচা ধুতি। মাথায় গৈরিক পাগড়ি, গায়ে লাল ব্যাজ লাগানো শার্ট। ইনিই দলনেতা। এক হাতে রিভলবার, অন্য হাতে হাতবোমা। দলের সদস্যসংখ্যা সাত। সবার পরনে রাবার সোলের কাপড়ের জুতো। সবাই প্রস্তুত। দলনেতার মুখে ‘চার্জ’ শুনতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল শত্রুর ওপর। তারা তখন ক্লাবে মত্ত নাচ-গানে। পিকরিক অ্যাসিডে তৈরি বোমাটি বর্জ্রের মতো ভয়ংকর শব্দে ফেটে পড়ল; হলঘরে তখন শুধু ধোঁয়া। দলনেতাই এগিয়ে গেল সবার আগে। অথচ এটাই তার প্রথম অভিযান। বোমার বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ, শত্রুর মরণ চিত্কার—সব মিলে এলাকাটা যেন পরিণত হলো এক দক্ষযজ্ঞে!

এটা কোনো অ্যাডভেঞ্চার ফিল্মের দৃশ্য নয়। এটি ইতিহাসের এক অনন্য ঘটনা। আমরা আরও রোমাঞ্চিত হই—যখন জানি, ২১ বছরের সেই দলনেতা পুরুষ বেশে একজন নারী! বাংলাদেশেরই নারী! নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

১৯৩২ সাল। আজ থেকে প্রায় ৭৭ বছর আগে। যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই বাঙালি নারী। তত্কালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ‘প্রীতিলতা’। আত্মদান করে প্রমাণ করেছেন, মেয়েরাও পারে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উত্সর্গ করতে।


১৯১১ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার প্রীতিলতার জন্ম। মা প্রতিভা দেবী। বাবার নাম জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি মিউনিসিপ্যালিটির হেড ক্লার্ক। ছয় ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন প্রীতিলতা। মা আদর করে ডাকতেন রানী বলে। ছাত্রী হিসেবে ঝলমলে সব রেকর্ড। ১৯২৭ সালে চট্টগ্রামের খাস্তগীর উচ্চবিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন এবং ভর্তি হন ঢাকাইডেন কলেজে। ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহিলাদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন। পরে কলকাতায় গিয়ে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামে ফিরে নন্দনকানন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পদ গ্রহণ করেন। ছোটবেলায় যখন দাদা পূর্ণেন্দুর দেওয়া বইয়ে ‘ক্ষুদিরামের ফাঁসির’ কথা পড়তেন, তখন ভাবতেন এও কি সম্ভব! মনে তাঁর প্রশ্ন জাগে, আমরা মেয়েরা কি এঁদের মতো হতে পারি না?
বেথুন কলেজে পড়ার সময় ‘দিপালী সংঘের’ সঙ্গে পরিচয়। সংঘের দিদিদের দেওয়া বইয়ের প্রচ্ছদে ছিন্ন লালপাড়ের শাড়ি পরা এক শৃঙ্খলিত নারীর ছবি। নিচে লেখা ‘ভাঙ্গনের পালা শুরু হল আজি, ভাঙ্গ ভাঙ্গ শৃঙ্খল।’ এ বই পড়েই উত্তেজিত প্রীতিলতা। তিনিও ভাঙতে চান ব্রিটিশদের শৃঙ্খল। কিন্তু পথ খুঁজে পান না। একদিন পত্রিকায় খবর হয়, ‘চাঁদপুর স্টেশনের ইন্সপেক্টরের’ হত্যাকারী দুই বাঙালি যুবক গ্রেপ্তার। তাঁদের নাম রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও কালিপদ চক্রবর্তী। প্রীতিলতার সঙ্গে রামকৃষ্ণের পরিচয় ছিল না। নিজেকে বোন পরিচয় দিয়ে জেলের ভেতর ৪০ বারের মতো রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করেন প্রীতিলতা। তাঁর মুখেই শোনেন সূর্য সেনের দৃঢ়চরিত্র ও বীরত্বের কথা। দাদা রামকৃষ্ণের কাছেও প্রীতির একই প্রশ্ন, ‘আমরা মেয়েরা কি তোমাদের মতো হতে পারি না, দাদা?’
১৯৩২ সালের মে মাসে রানীর জীবনে এল সেই স্মরণীয় দিন। জীর্ণ এক ঘরের কোনায় জ্বলছিল একটি প্রদীপ। ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন‘মাস্টারদা’। সেই প্রথম দেখা মাস্টারদার সঙ্গে। এমন সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা বাড়িটি ঘিরে ফেলে। শুরু হয় দুই দিক থেকে গুলি চালাচালি। সে যুদ্ধে প্রাণ দেন বিপ্লবী নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। সূর্য সেন প্রীতিলতাকে নিয়ে বাড়ির পাশে ডোবার পানিতে ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর মাস্টারদা বলেন, ‘প্রীতি, তুমি বাড়ি ফিরে গিয়ে স্কুলের কাজে যোগ দেবে, তাহলে গত রাতের ঘটনায় কেউ তোমাকে সন্দেহ করবে না।’ ধলঘাটের সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ক্যামারুনও নিহত হন।
মাস্টারদা উপলব্ধি করতে লাগলেন মেয়েরাও দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পারে। এর আগে সশস্ত্র সংগ্রামে গুটিকয় মেয়ে কর্মী ছিল। কিন্তু এদের কাজ ছিল বিপ্লবীদের খবর আদান-প্রদান, অস্ত্রশস্ত্র জমা রাখা, চাঁদা তোলা এবং বিপ্লবীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। সামনাসামনি অস্ত্র হাতে শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করেনি। সূর্য সেন সিদ্ধান্ত নেন ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দেবে ‘প্রীতিলতা’।
শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি। সাতজনের দলে দলনেতা প্রীতিলতা ছাড়াও ছিলেন—বিপ্লবী কালীকিংকর, শান্তি, সুশীল, মহেন্দ্র, বীরেশ্বর, প্রফুল্ল ও পান্না। অভিযানের আগে পড়া হলো ইশতেহার। মাস্টারদা বললেন, ‘জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্তঋণ, ওদের রক্ত দিয়েই আজ শোধ করতে হবে। এ দায়িত্ব তোমাদের। সবাই দেখবে অপমানে জবাব দিতে আমরা আর পিছিয়ে থাকব না।’
১৯৩২ সাল। ২৪ সেপ্টেম্বর। ইউরোপীয় ক্লাব থেকে বিপ্লবীদের সংকেত পাওয়ার পর, প্রীতিলতার নেতৃত্বে সাতজন তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইংরেজদের ওপর। সফল(!) হলো বিপ্লবীদের অভিযান। সকলেই নিরাপদে ফিরে এলেন, ফিরে এলেন না দলনেতা প্রীতিলতা। ধরা পড়ার অপমানের ঠেকাতে ‘পটাশিয়াম সায়ানাইড’ খেয়ে আত্মদান করলেন। পরের দিন যখন পুলিশ ক্লাবের পাশে পড়ে থাকা লাশকে পুরুষ ভেবেছিল। কিন্তু মাথার পাগড়ি খুলে লম্বা চুল দেখে শুধু ব্রিটিশ পুলিশ নয়, গোটা ব্রিটিশ সরকারই নড়েচড়ে উঠল। আলোড়িত হলো গোটা ভারতবাসী
যাওয়ার আগে মায়ের কাছে চিঠি লেখেন প্রীতি, ‘মাগো, অমন করে কেঁদোনা! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা!
তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উত্সর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?’
গতকাল (২৫ সেপ্টেম্বর) ছিল প্রীতিলতার আত্মাহুতি দিবস। আমরা কয়জন ভারতবর্ষে প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতার কথা জানি? এমনকি এ বিপ্লবীর স্মৃতিচিহ্নটুকু রক্ষারও কোনো আয়োজন আজ নেই। সরকার অন্তত প্রীতিলতার আত্মাহুতির স্থান চট্টগ্রাম পাহাড়তলীর সেই ইউরোপীয় ক্লাবের সামনে প্রীতিলতার একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করতে পারে। এমনকি যে খাস্তগীর স্কুলে প্রীতিলতা পড়াশোনা করেছেন সে স্কুলের ছাত্রীরাও প্রীতিলতার নাম জানে না। জানে না তাঁর বীরত্বের কথা। আমরা কি আমাদের এ বীরদের যথার্থ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না?


লিখেছেন  জিন্নাত-উল-ফেরদৌস । প্রকাশিত হয়েছে "দৈনিক প্রথম আলো" পত্রিকায়। 

দুই বছর ধরে পরিবার তিনটি একঘরে

41 comments

নিম্নবর্ণের মেয়েকে বিয়ে করায় লালমনিরহাটের সদর উপজেলার রতিধর গ্রামে এক স্কুলশিক্ষকসহ তিনটি পরিবারের সদস্যদের দুই বছর ধরে একঘরে করে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সমাজপতিদের নির্দেশ অনুযায়ী তিন মণ ছাগলের মাংস দিয়ে ১০০ হিন্দু পরিবারের সদস্যদের ভূরিভোজ না করানোর কারণে ২০০৭ সালের ২২ জুন থেকে পরিবারগুলোকে একঘরে করে রাখা হয়েছে।
এলাকাবাসী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার রতিধর গ্রামের সহদেব কুমার রায় নায়েকের ছেলে ও দেউতিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মৃণাল কান্তি কয়েক বছর আগে শিবরাম গ্রামের বৈশ্য বর্ণের শিখা রানীকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। মৃণাল কান্তি ক্ষত্রিয় বর্ণের হওয়ায় সমাজপতিরা এই বিয়ে মেনে নেননি। কয়েকজন সমাজপতি ২০০৭ সালের ১৯ জুন সহদেব কুমারের বাড়িতে এসে এই বিয়ে বৈধ করার জন্য পুনরায় ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তাঁরা ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে ১০০টি হিন্দু পরিবারের সদস্যদের তিন মণ ছাগলের মাংস দিয়ে ভূরিভোজ করানোর নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ না মানলে তাঁর পরিবারকে একঘরে করে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।
স্কুলশিক্ষক মৃণাল কান্তি অভিযোগ করেন, সমাজপতিদের কথামতো তাঁরা ২০০৭ সালের ২১ জুন পুনরায় বিয়ের আয়োজন করেন। কিন্তু সমাজপতিদের নির্দেশ অনুযায়ী তিন মণ ছাগলের মাংস দিয়ে ১০০ হিন্দু পরিবারের সদস্যদের খাওয়াতে পারেননি। এই কারণে আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমাজপতিরা ২২ জুন থেকে তাঁদের, তাঁর জ্যাঠা বিষামচন্দ্র রায় নায়েক ও মেশো নগেন্দ্রনাথ রায়ের পরিবারকে একঘরে করে রেখেছেন।
মৃণাল কান্তি আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার প্রথম সন্তান সোমির কান্তির অন্নপ্রাসনে গ্রামের পুরোহিত প্রফুল্ল ভট্টাচার্যকে পূজার জন্য ডেকেছিলাম। কিন্তু তিনি আসতে রাজি হননি। পরে অন্য গ্রাম থেকে পুরোহিত এনে কাজ চালিয়েছি।’
রতিধর মৌজার পুরোহিত প্রফুল্ল ভট্টাচার্য বলেন, ‘মৃণাল নিচু জাতের মেয়েকে বিয়ে করেছেন। এটা সমাজপতিরা মেনে নেননি, তাঁদের দেওয়া শর্তও মৃণাল মানেননি। এমন অবস্থায় আমি কী করে ওদের বাড়িতে পূজা পার্বণে অংশ নিই।’
পঞ্চগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মৃণালের পরিবারকে যে কারণে একঘরে করে রাখা হয়েছে তা বেআইনি। তিনি বলেন, ‘আমি গ্রামের সবাইকে মানবিক কারণে সমস্যাটির সমাধান করার জন্য বলেছি।’
পঞ্চগ্রাম বৈদিক সমাজকল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক শিবু প্রসাদ বসুনিয়া বলেন, অসমবর্ণের বিয়ের অজুহাত তুলে একজন স্কুলশিক্ষক ও তাঁর আত্মীয়দের পরিবারকে দুই বছর ধরে একঘরে করে রাখা অমানবিক। বিষয়টির সমাধান করার জন্য তাঁরা চেষ্টা চালাচ্ছেন।
লালমনিরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়জুর রহমান জানান, মৃণালসহ তিনটি পরিবারকে একঘরে করে রাখার বিষয়টি তিনি লোক মারফত জানতে পেরেছেন। এই ব্যাপারে তিনি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
সমাজপতিদের মধ্যে একজন শিবুর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। (প্রথমআলো'র লালমনিরহাট প্রতিনিধি)
 
এই খবরটি নেওয়া হয়েছে..দৈনিক প্রথম আলো থেকে