Friday, November 27, 2009

মনপুরার পরি ফারহানা মিলি

13 comments
ছোট ছোট স্বপ্ন তাঁর; আকাশ ছোঁয়ার সাধও নেই।
খুব বেশি কাজ করার ইচ্ছাও করে না তাঁর। যে কাজটুকু করতে চান, সেটুকু ভালোভাবে করতে পারলেই তিনি খুশি থাকেন।
মনপুরার মিলি জানালেন কথাগুলো।
মনপুরা যখন আকাশচুম্বী ব্যবসায়িক সাফল্য পেল, তখনো মিলি স্বাভাবিক,
এ নিয়ে খুব হইচই করেননি। বাইরে বেরিয়েছেন খুব স্বাভাবিকভাবেই।
অনেকেই মিলিকে দেখেছেন আর বলেছেন, আপনি সেই পরি?
মিলি মাথা নেড়ে সম্মতি দেন, কখনো এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে মুখে। এতটুকুই।
ফেইসবুকে যখন শত শত বন্ধু অভিনন্দন জানাচ্ছে, তখনো মিলি এ নিয়ে মাতামাতি করেননি।
বলেছেন, সব কৃতিত্ব নির্মাতার।
প্রচারবিমুখ মিলি খুঁজছেন আরও কিছু ভালো কাজ, যে কাজ তাঁকে আনন্দ দেবে; তবে সে আনন্দ নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান তিনি।
মিলির শুরুটাও ছিল একদম সাদামাটা।

নবাবপুরের মেয়ে ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। বাবা-মা দুজনেই চাইতেন, মেয়ে নাচ, গান, অভিনয়—সবই করুক। ছোটবেলাতেই কিশোর থিয়েটারে মিলিকে ভর্তির সুযোগ করে দেন। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে মিলি থিয়েটারের নাটকের মহড়ায় ব্যস্ত হয়ে যেতেন। আবার গানও শিখতেন। একসময় মা মনে করলেন, মিলি অভিনয়টা কি ঠিকমতো করতে পারবে? বড় হলে কীভাবে তখন নিজেকে সামলাবে? মিলি ঠিকই নিজেকে সামলে নিয়েছেন। মিলির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভাইও একই অঙ্গনের সঙ্গে জড়িয়েছেন।
মিলির অভিনয়ের সাফল্যটা আসে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়। জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় অভিনয় শাখায় চ্যাম্পিয়ন হলেন। পরিবারের মানুষগুলোর খুশি আর দেখে কে? মিলি সেদিনও ছিলেন নির্বিকার। তাঁর মনে হয়েছিল, এখনই সন্তুষ্টি নয়। সন্তুষ্টি এলেই আর কাজ ভালো হবে না।
পরের বছর আবারও একই অভিনয়ে স্বীকৃতি পেলেন মিলি। পরপর দুইবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মিলি অনেকটাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। কোনটা করবেন— অভিনয়, নাকি গান? পড়াশোনা তো করতেই হবে তাঁকে। অবশ্য তত দিনে মা-বাবা মিলিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। মিলি যেটা করে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করবেন, তাতেই তাঁদের সম্মতি আছে।
‘এইচএসসি পরীক্ষার আগে আগে একটি নাটকের জন্য কথা হলো। নাটকের নাম জননী ও জাতিকা। এটি পরিচালনা করেছিলেন নাহিদ আহমেদ। মাত্র কয়েকটি সংলাপ ছিল আমার। এক ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম। এরপরই একুশে টেলিভশন থেকে ডাক এল। তথ্যপ্রযুক্তির একটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করলাম। কাজটা উপভোগই করছিলাম। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর একদিন ডাক এল তারিক আনাম খানের কাছ থেকে। একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করলাম। তত দিনে মিডিয়া জগত্টাকে বুঝতে শিখলাম। দেখলাম, মজা তো! যে কাজটাই করছি, সেই কাজটার এক ধরনের প্রতিক্রিয়া পেতে শুরু করলাম। একটু একটু করে উত্সাহ পেলাম। একটা কাজ করি তো আরেকটা কাজে জড়িয়ে যেতে শুরু করলাম। কিন্তু তখনো জানি না যে আমার সামনেই একটি সুযোগ অপেক্ষা করছে। যে সুযোগটি আসলে আমার সব চিন্তাভাবনাতেও ছিল না।’ বলছিলেন মিলি।
বিনোদন মাধ্যমের প্রায় সব শাখাতেই কাজ করলেন তিনি। বাকি ছিল চলচ্চিত্র। পরিচয় হলো গিয়াসউদিন সেলিমের সঙ্গে। মিলি তখন পড়াশোনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে। সেলিম মিলিকে বললেন এক পরির গল্প। মিলি ভেবেচিন্তেই কাজটা করতে সম্মতি দিলেন।
বড় ক্যানভাসে এটিই ছিল মিলির প্রথম কাজ। অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন হলো। কিন্তু মেলা পরিশ্রম। তবু কোথায় যেন ভালো লাগার একটা স্বাদ খুঁজে পান মিলি। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেগে থাকা, কাজ করা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে শুটিং করা—সব মিলিয়ে মিলির কাছে ছিল উপভোগ্য একটি কাজ। সারা দিনের কাজ শেষে রাতের বেলা আবার নিজের কাজের খুঁত ধরা, এভাবেই একটি মনপুরার পরি হিসেবে নিজেকে সাজিয়ে তুললেন মিলি।
‘যখন কাজ করেছি, তখন মিলি যে একদিন এতটাই আলোচনা তুলবে, এত বেশি হূদয়বিদারক একটি পরিস্থিতির চরিত্র হিসেবে মানুষের কাছে আসবে, এটি কেউই জানতাম না। আমরা একটি ছবিতে কাজ করেছি, সবাই মনোযোগ দিয়ে কাজটা করার চেষ্টা করেছি। চেয়েছি যেন একটি ভালো ছবি হয়, মানুষ ছবিটি উপভোগ করে। ছবি মুক্তির পর দেখলাম, তা-ই হয়েছে।’ বললেন তিনি।
মনপুরার মতো এত বড় একটি ছবিতে অভিনয়ের পর মিলি এখনো কেন অন্তর্মুখী?
মিলি প্রশ্ন শুনে দৃষ্টি নিচের দিকে নামিয়ে নেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘কই, আমি তো আমার মতোই আছি। ভালো কাজের জন্য অপেক্ষা করছি। যে কাজগুলো একটু অন্য রকম মনে হচ্ছে, সেই কাজগুলোই করছি। আবার একটা সমস্যাও হয়েছে। মনপুরায় গ্রামের চরিত্রে কাজ করে খ্যাতি পেয়েছি, এখন সবাই আমার কাছে গ্রামের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করার জন্য গল্প নিয়ে আসে। এসব পড়তে পড়তে আমি ক্লান্ত হয়ে যাই। তার মধ্যে থেকেও দু-একটা চরিত্র যখন আমাকে টানে, সেগুলোতে কাজ করছি। তবে সেই অর্থে চলচ্চিত্রে কাজ করার গল্প পাইনি। কাজ অবশ্যই করব। বাণিজ্যিক ছবিতেও কাজ করব। কিন্তু সেটি অবশ্যই হতে হবে ভালো গল্পের কাজ। হতে হবে সুনির্মিত। কিন্তু যেনতেন কাজ করে শুধু কাজের সংখ্যা বাড়াতে চাই না। মনপুরা সুপারহিট হয়েছে আর একেই পুঁজি করে সস্তা জনপ্রিয়তায় নিজেকে ভাসাতে চাই না। ’
মিলি সম্প্রতি কাজ করেছেন অমিতাভ রেজার একটি নাটকে। ‘এ কাজটি করে নিজের কাছে অনেক ভালো লেগেছে। যদি অন্যদেরও ভালো লাগে, তবে কাজে আরও বেশি উত্সাহ পাব।’ বললেন মিলি।
ব্যক্তিজীবন নিয়ে মিলির কাছে প্রশ্ন ছিল, এত বড় একটি ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিলেন। ভক্তরা কী বলে?
মিলি হাসেন। ‘আরে যারাই আমার সঙ্গে কথা বলে, তারা প্রথমেই আপু ডাকে। বুঝলাম না, কেউ কেন সেই রকমভাবে নায়িকা সম্বোধন করে না। আর ভালো লাগার কথাও দেখি কেউ বলে না।’
কেউ ভালোবাসার কথা বলেনি?
মিলি বলেন, ‘না’।
কাউকে ভালোবেসেছেন?
মিলি উত্তর দেন না।
আবার প্রশ্ন করি।
‘সে তো একসময় ছিলই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই একজনকে ভালো লেগেছিল। তারও পছন্দের ছিলাম আমি। কিন্তু একসময় দেখলাম যে আসলে অ্যাডজাস্ট হচ্ছে না। তাই সমঝোতার ভিত্তিতেই আমরা দুজনেই সেই সম্পর্কের ইতি টেনেছি। এর পরে আসলে এ বিষয়টি নিয়ে আর ভাবিনি। ভাবতেও চাই না। ভাবনার মধ্যে আছে কাজ। তবে আহামরি প্রত্যাশা করি না। দু-একটি ভালো কাজ পেলেই আমি খুশি।’
এভাবেই কথা বলেন মিলি। কোনো রকম ঘোরপ্যাঁচ করেন না। করতে পছন্দও করেন না। যেটা করতে মন চায় না, তা তিনি কখনোই করেন না। যা কিছু করেন, তা নিজের বিবেচনায় করেন।
হাতঘড়ির দিকে তাকান মিলি। বললেন, ‘যে কাজই করছি, সেই কাজটাকে গুরুত্ব দিয়ে করি। এ জন্যই সেই কাজের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসার মায়া সৃষ্টি করে।’
মিলি এমন মায়া নিয়েই কাজ করেছেন বলেই হয়তো পরির আত্মত্যাগের ঘটনা সবার চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে। পরি সবার কাছেই হয়েছে অনন্য এক চরিত্র। এমনিভাবে মিলি আরও অনেকবার পরি হয়ে আসবেন পর্দায়, এটাই সবার প্রত্যাশা।

আজম খানের পাঁচটি গানের নেপথ্য কাহিণী

0 comments
এ দেশে পপসংগীতকে তুমুল জনপ্রিয় করার প্রচেষ্টায় যিনি অগ্রণী, তিনি আজম খান। এ কারণেই তাঁর নামের আগে ব্যবহূত হয় ‘পপসম্রাট’। তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান তরুণ তো বটেই, সব ধরনের শ্রোতার পছন্দের তালিকায় রয়েছে। সেই তালিকা থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে পাঁচটি গান। আজম খান এই গানগুলো সৃষ্টির পেছনের গল্প বলেছেন কবির বকুলের কাছে।


১. পাপড়ি কেন বোঝে না...
পাপড়ি কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। এটা বাস্তব। ১৯৭৫ সালের কথা। পাপড়িদের পরিবার ভাড়া থাকত ঢাকার কমলাপুরে, ১২ জসীমউদ্দীন রোডে, আমার বড় ভাইয়ের বাড়ির দোতলায়। তখন ওর উঠতি বয়স। পাড়ার ছেলেরা ওকে দেখলেই এটা-সেটা বলত, বিরক্ত করত। মহল্লার ছেলে হিসেবে আমার একটু দাপট ছিল। যখন শুনলাম পাপড়িকে দেখলে পোলাপান ইয়ার্কি-ফাজলামো করে, তখন একটু রাগই হলো। একদিন ওদের ডেকে ধমক দিয়ে বললাম, আর কোনো দিন যেন ওর দিকে চোখ তুলে না তাকায়।
এর পর থেকে পাপড়ির সবকিছু খেয়াল রাখা যেন আমার প্রতিদিনের কাজ হয়ে গেল। এই করতে করতে কখন যে আমি নিজেই ওকে ভালোবেসে ফেলেছি, টের পাইনি। টের পেলাম তখন, যখন পাপড়িও আমাকে ভালোবাসতে শুরু করল। কিন্তু আমাদের দুই পরিবারের কেউ এটা মেনে নিতে পারল না। একদিন পাপড়ি আমাকে বলল, ‘চলো, আমরা পালিয়ে যাই।’ কিন্তু বিষয়টা আমার পছন্দ হলো না। মেয়ের মতিগতি ভালো ঠেকল না ওর মায়ের। তিনি কিছু একটা আঁচ করতে পেরে পাপড়ির ঘরে তালা মেরে দিলেন। ঘরের ভেতরই খাওয়া-দাওয়া। বাইরে যাওয়া বন্ধ। একদিন সকালে দেখি ওরা বাসা বদলাচ্ছে। এরপর পাপড়িরা চলে গেল। কই গেল, জানতেও পারলাম না। আমার আর কিছুই ভালো লাগে না। সকাল ভালো লাগে না, বিকেল ভালো লাগে না, রাত ভালো লাগে না।
আমার এক বন্ধু অনু। ওর প্রেমিকা ছিল জলি। অনুরও আমার মতো দশা। আমরা দুজন মিলে দুঃখ ভাগাভাগি করি। ওই সময়ই আমি গানটা বানাই। ‘সারা রাত জেগে কত কথা ভাবি আমি।’ দুঃখমনে সেই গান গাই। আর পাপড়ির কথা মনে করি।
হঠাত্ একদিন মনে হলো, এই গানটা পাপড়ির মা শুনে যদি বলে, ‘আমার মেয়েরে নিয়া গান করছ কেন?’ এ জন্য মনে মনে উত্তর ঠিক করলাম যে, ওনাকে তখন বলব, ‘আমি চোখের পাপড়ির কথা বলছি। পাপড়ি কেন বন্ধ হয় না। এই কারণে ঘুম আসে না।’ গানটার সৃষ্টি ১৯৭৫ সালে। কিন্তু গানটা বিটিভিতে প্রথম গাই ১৯৭৭ সালে। তারপর তো গানটা সুপার হিট।
১৯৮৪-৮৫ সালে আমি চট্টগ্রামে একটা অনুষ্ঠানে গান গাইতে গেছি। হঠাত্ এক লোক এসে আমাকে বলল, ভাই, একজন ভদ্রলোক আপনাকে খুঁজছে। আমি দেখা করলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি পাপড়ির স্বামী।’ তিনি আমাকে জোর করে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। পাপড়ির সঙ্গে আবার আমার দেখা হলো ১০ বছর পরে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই খুব রসিক। ওদের বাসায় খাওয়া-দাওয়া করলাম। এর পর পাপড়ি বলল, ‘চট্টগ্রামে এলে আমার বাসায় ছাড়া অন্য কোথাও উঠতে পারবেন না।’ গানের প্রসঙ্গও এল। ‘পাপড়ি’ গানটা নিয়ে নাকি ওকে সবাই খেপায়। যা-ই হোক, সেই থেকে আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত। পাপড়িরা ঢাকায় এলে আমার বাসায় আসে। আমার মেয়েরা ওর বাড়িতে যায়। পাপড়ি এখন দাদি হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে ওর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। (আমার ‘বাধা দিয়ো না’ গানটিও পাপড়িকে নিয়েই লেখা।)


২. আলাল-দুলাল...
এটা আড্ডারই গান। এই গানটা হলো আমাদের বন্ধুদের সম্মিলিত প্রয়াস। কবি জসীমউদ্দীনের বাড়ির বাগানের দেবদারু গাছতলায় প্রতিদিনই বন্ধুরা আড্ডা দিতাম। গিটার নিয়ে টুংটাং করতাম। আমাদের দুই বন্ধু শাহজাহান আর জাহাঙ্গীর; আপন দুই ভাই ওরা। ওদের ‘আলাল-দুলাল’ বলে খেপাত আমাদের আরেক বন্ধু আলমগীর। শাহজাহান হলো আলাল আর জাহাঙ্গীর হলো দুলাল। ওদের খেপানোর নানা রকম ভাষা থেকেই পরে ‘আলাল-দুলাল’ গানের সৃষ্টি। আমরা মজা করে গাইতাম, শুনে লজ্জায় শাহজাহান আর জাহাঙ্গীর মাথা নিচু করে থাকত। প্রথম প্রথম গাইতাম, ‘আলাল দুলাল, তাদের বাবা হাজি চান, প্যাডেল মেরে ওই পুলে পোঁছে বাড়ি’। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে তখন একটা পুল ছিল। আমাদের আড্ডা থেকে পুলটা দেখা যেত। আমার মেজো ভাই আলম খান (সংগীত পরিচালক) গানটি শুনে বললেন, ‘ওই পুলে’র জায়গায় ‘চানখাঁর পুল’ শব্দ দুইটা দে, শুনতে ভালো লাগবে। তাই করলাম। একদিন চিন্তা করলাম, গান যখন গাই, এটা গাইছি না কেন। বিটিভিতে ১৯৭৫-৭৬ সালের দিকে আবদুল্লাহ আবু সাইয়িদ স্যারের একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের (সম্ভবত ‘চারুপাঠ’) জন্য গানটা রেকর্ড করলাম; কাকরাইলের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে। সেই গানও দেখি রাতারাতি হিট।
মজার বিষয় হলো, পুরান ঢাকার চানখাঁর পুলে সত্যি সত্যি ‘হাজি চান’ নামের এক মুরুব্বি ছিলেন। গান শুনে তিনি তো বেজায় খুশি। মনে করলেন, গানটি তাঁকে নিয়েই লেখা হয়েছে। তিনি আমাদের এক বন্ধুকে পেয়ে বললেন, ‘আজম খান তো গানটা জব্বর গাইছে। গানের ম্যাজিকটাও (মিউজিক) ভি ফাটাফাটি হইছে। ওরে লইয়া একদিন মহল্লায় আহ। আমার দাওয়াত।’ তারপর আমরা বন্ধুরা মিলে একদিন তাঁর বাড়িতে যাই। গানবাজনা করি।
কিছুদিন আগে অমিতাভ রেজা ফোন করে বলল, “আপনার ‘আলাল দুলাল’ গানটা একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে ব্যবহার করতে চাই। আমি বললাম, ‘তুমি তো ভালোই বানাও। ঠিক আছে, ব্যবহার করো।’ অমিভাভ বলল, ‘একটা সমস্যা, গানটা নতুন করে কাকে দিয়া গাওয়াই।’ আমি বললাম, ‘নতুন কাউকে নিলে সে কেমন গাইবে, তার চাইতে বরং আমিই গেয়ে দিই।’ শুনে অমিতাভ বলল, ‘আপনি গাইলে তো ভালোই হয়।’ বিজ্ঞাপনচিত্রের জন্য গানটা আবার গাইলাম।

৩. অভিমানী তুমি কোথায়
এটা আমারই লেখা, ১৯৭৩ সালের দিকে সৃষ্টি। আমি খাতাকলমে কোনো দিন গান লিখতাম না। হঠাত্ মাথায় এসে পড়লে মুখে মুখেই বানিয়ে ফেলতাম। আমরা আড্ডা দিতাম চিটাগং হোটেলের সামনে। আমাদের সঙ্গে একটা গিটার থাকত। আমরা যেখানে গান করতাম, সেখানে এক ভারতীয় পাগল ছিল। সে সুরে সুরে একটা গান গাইত আর নাচত, ‘ইতলের বিনা, বিনারে ভাগি, বিনা চালা গ্যায়া।’ ঠান্ডা পাগল ছিল। শুনে খুব মজা লাগত। এই গান থেকে আমি পেয়ে গেলাম সুর। হঠাত্ই মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল, ‘অভিমানী, তুমি কোথায় হারিয়ে গেছ...’।


৪. ওরে সালেকা ওরে মালেকা
এটা পাকিস্তান আমলের গান। জসীমউদ্দীন রোডে ঢুকতেই চিটাগং হোটেলের পাশে ছিল টাওয়ার হোটেল। ওটা একতলা থেকে দুইতলা হয়েছে। সেখানে একটা পানির ট্যাংক ছিল। আমাদের বন্ধু নীলু। গিটার বাজাত। ছোট বাঁশের স্টিক দিয়ে পানির ট্যাংকটাকে ও ড্রাম বানিয়ে বাজাতে লাগল। সেই রিদমের তালে তালে আমরা পাঁচ-ছয়জন বন্ধু মজা করছি। নীলুর বিটের তালে আমার মুখ থেকে হঠাত্ বের হলো, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা, ওরে ফুলবানু পারলি না বাঁচাতে’। কোনো কারণ ছাড়াই। এ গান নিয়ে পরে দেড় ঘণ্টা মজা করলাম। এভাবে গানটা বের হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে আমরা যখন পপগান করি, তখন হঠাত্ মনে হলো, এই গানটা করি না কেন। এরপর গানটা নতুন করে গাইলাম। তারপর তো গানটা সুপারহিট।


৫. রেললাইনের ওই বস্তিতে...বাংলাদেশ
১৯৭৪ সালের দিকে দেশে দুর্ভিক্ষ লাগল। ভালো মানুষ খাবারের আশায় শহরে এসে ফকির হয়ে গেল। তখন কমলাপুর থেকে নটর ডেম কলেজের ফুটপাত মানুষে ভরপুর। মানুষ মারা যাচ্ছে। ছোট বাচ্চারা মারা যাচ্ছে। কবর দেওয়ার মানুষ নেই। কে দাফন করবে। মা তাঁর দুধের সন্তানকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষুধার জ্বালায় বাচ্চাকে বিক্রিও করে দিচ্ছেন। তখন নতুন নতুন গান করতাম। আমি নিয়মিত পাঞ্জাবি পরতাম। বড় বড় চুল ছিল। ফুটপাতের বাচ্চাগুলো আমারে দেখলে মামা মামা বলে ডাকত। একদিন দেখি একটা বাচ্চা কাঁদছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হইছে?’ একজন বলল, ‘মা বাচ্চাটারে রাইখা পলাইছে।’ সব শুনে বুকটা ফেটে গেল। মনে মনে তখনি গানের লাইন খুঁজে পেলাম, ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে...’।

Thursday, November 26, 2009

জুলফি পানচিল

0 comments

নামটি আমার বলি - জুলফি পানচিল
ইংরেজিতে বলি - Whiskered Tern
বৈজ্ঞানিক নাম - Chlidonias hybridus

দেখতে আমি যেমন - আকারে প্রায় ২৮সে.মি। গাল ও গলা সাদা কিন্তু মাথার উপর থেকে চোখ বরাবর হয়ে ঘাড় পর্যন্ত কালো,ধুসর সাদা রংয়ের শরীর, সিঁদুরে লাল ছোট পা আর ঠোঁট। ডানার বড় পালকগুলো কয়েকটা কালো রংয়ের হয়।
মজার ব্যাপার কী জানো, শীতকালে মাথা ও কপালের কালো রং ধিরে ধিরে হালকা হতে থাকে আর গায়ের রং হয়ে উঠে শুভ্র।

যেথায় আমার বাস-নিবাস - আমি মূলতো শীতের পাখি তবে শীত শেষে কেউ কেউ তোমাদের দেশে থেকেও যায়।জলাভূমি,নদীর চড় বা হাওর বাওরে আমার দেখা মিলে।
আমার খাবার মেন্যু - পোকা-মাকড়,কাঁকড়া,ছোট মাছ,ব্যাঙ আমার খুব প্রিয় খাবার,আমি উড়ন্ত অবস্থায় শিকার ধরতে পারি।





Wednesday, November 25, 2009

জিরিয়া

0 comments

নামটি আমার বলি - জিরিয়া
ইংরেজিতে বলি - Little Plover, Little Ring Plover
বৈজ্ঞানিক নাম - Charadrius dubius
আমার যত নাম - ছোট জিরিয়া,ছোটনথ জিরিয়া

দেখতে আমি যেমন - আমি আকারে প্রায় ১৬সে.মি লম্বা। ঠোঁটের উপরের সামান্য অংশ সাদা,কপাল কালো,চাঁদি ধুসর বাদামী, চোখের পাতা হলুদ তার মাঝে কালো চোখ।গলা আর ঘাড় সাদা,ঠিক তার নিচ থেকে শুরু হয়েছে কালো মোটা বৃত্ত,বুক থেকে শুরু করে লেজের নিচ পর্যন্ত সাদা।কালো ঠোঁট,লম্বা সরু দুখানা কালচে হলুদ পা। পিঠ,ডানা আর লেজের উপরের অংশ ধুসর বাদামী।
যেথায় আমার বাস-নিবাস - আমি তোমাদের দেশে অতিথি হয়ে আসি,জলার ধারে দৌড়ে দৌড়ে চলি।শুকনো ডালপালা দিয়ে মাটিতেই বাসা বানাই।
আমার খাবার মেন্যু - কেঁচো,জলের পোকা।



Tuesday, November 24, 2009

মেটেপ্যাঁচা

0 comments

নামটি আমার বলি - মেটেপ্যাঁচা
ইংরেজিতে বলি - Large-tailed Nightjar
বৈজ্ঞানিক নাম -Caprimulgus macrurus
আমার যত নাম - চরপ্যাঁচা, নলপিতানি দিনকানা, নলপিতানি রাতচরা,ল্যাঞ্জা রাতচরা

দেখতে আমি যেমন - আপদামস্তক প্রায়৩০সে.মি লম্বা।আমার গায়ের পালক অন্য প্যাঁচা ভায়াদের মতোই অদ্ভুত।কালো,বাদামী,হালকা বাদামীর ফুটি,লম্বা লেজ,ছোট্ট মাথা আর ছোট্ট এক জোড়া ঠোঁট,গোল কালো চোখ।নিজের পায়ে দাঁড়াই খুব কম সময়ই,গায়ের সাথে ডানা লেপ্টে পা গুটিয়ে বসে সারদিন ঝিমুই।

যেথায় আমার বাস-নিবাস - আমি অন্যসব প্যাঁচা ভায়াদের মতোই নিশাচর।শক্ত পাথুরে মাটি, নুড়ি মিশ্রিত বা মাটির শক্ত ঢ্যালা মিশ্রিত ভূমিতে শুকনো পাতা আর ডালপালা জড়ো করে বাসা বানাই।হালকা জঙ্গল বা পুরনো পরিত্যাক্ত বাড়ির আশেপাশে আমায় দেখতে পাবে। আমার গায়ের রং মাটির সাথে এতোটা মিলে যায় যে হঠাৎ করে কেউ আমার বাসা আর আমাকে ঠাহর করতে পারে না।
আমার খাবার মেন্যু - প্রধানত পোকা-মাকড়,ছোট সাপ।



Monday, November 23, 2009

নীলকন্ঠি

0 comments

লিখেছেন : সোমা

নামটি আমার বলি - নীলকন্ঠি

ইংরেজিতে বলি - Indian Roller
বৈজ্ঞানিক নাম - Coracias benghalensis
আমার যত নাম - নীলকন্ঠ,নীলকন্ঠি
দেখতে আমি যেমন - আকারে প্রায় ৩১সে.মি। আমার মেয়ে পাখি আর ছেলে পাখি দেখতে প্রায় একই রকম,বাদামী পিঠ,ডানায় গাঢ় নীল আর আকাশি নীলের খেলা ,লেজের দিকটাতেও তেমনি। মাথা,ঘাড়,গলা আর বুক আকাশনীল,চোখ,ঠোঁট কালো আর পা দু’খানা হালকা হলুদ।।
যেথায় আমার বাস-নিবাস - অগভীর বন আমার বসবাসের জন্য পছন্দ,,তোমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশেই আমার বিচরণ বেশি।
আমার খাবার মেন্যু – - প্রধানত পোকা-মাকড়।
যেভাবে আমি ডাকি - খাক ... কাক...কাক।
প্রজনন সময় -মার্চ থেকে মে। ডিম সংখ্যা -৩-৪ টি।




Sunday, November 22, 2009

বাংলা - প্রথম শ্রেণী

0 comments
প্রশ্ন: বাংলাদেশের জাতীয় বিষয়গুলোর নাম লেখো।
জাতীয় ফুল = সাদা শাপলা।
জাতীয় ফল = কাঁঠাল।
জাতীয় মাছ = ইলিশ।
জাতীয় পশু = রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
জাতীয় পাখি = দোয়েল।
জাতীয় বন = সুন্দরবন।
জাতীয় খেলা = হা-ডু-ডু।
জাতীয় কবি = কাজী নজরুল ইসলাম।
জাতীয় মসজিদ = বায়তুল মোকাররম মসজিদ।
জাতীয় দিবস = ২৬ মার্চ।
খাবার
প্রশ্ন: যা চিবিয়ে খেতে হয় না।
১. চা ২. কফি ৩. শরবত ৪. মধু ৫. দুধ ৬. পানি।
প্রশ্ন: দুধ দিয়ে তৈরি খাবারের নাম।
১. দই ২. মাখন ৩. ছানা ৪. পায়েস ৫. ফিরনি ৬. সেমাই।
ফুল
গন্ধযুক্ত/সাদা ফুল: ১. গন্ধরাজ ২. বেলি ৩. বকুল ৪. হাসনাহেনা ৫. রজনীগন্ধা।
গন্ধবিহীন/লাল ফুল: ১. জবা ২. মাদার ৩. শিমুল ৪. পলাশ ৫. কৃষ্ণচূড়া।
শীতকালীন ফুল:
১. ডালিয়া ২. চন্দ্রমল্লিকা ৩. গোলাপ ৪. সূর্যমুখী ৫. জিনিয়া।
গ্রীষ্মকালীন ফুল:
১. গন্ধরাজ ২. বেলি ৩. চাঁপা ৪. রজনীগন্ধা ৫. কৃষ্ণচূড়া।
হলুদ ফুল:
১. সূর্যমুখী ২. গাঁদা ৩. কাঁঠালী চাঁপা ৪. কদম ৫. সরিষা ফুল।
অন্যান্য ফুলের নাম:
১. মাধবীলতা ২. মালতী ৩. দোপাটি কলমি ৪. শিউলি/ শেফালি ৪. ধুতরা ৬. ঝুমকোলতা ৭. পদ্ম ৮. যূথি ৯. শাপলা ১০. চাঁপা।
ফল
গ্রীষ্মকালীন ফল: ১. আম ২. জাম ৩. কাঁঠাল ৪. আনারস ৫. লিচু।
শীতকালীন ফল:
১. কমলা লেবু ২. কামরাঙ্গা ৩. জলপাই ৪. চালতা ৫. বরই।
সব সময় পাওয়া যায়:
১. কলা ২. পেঁপে ৩. লেবু ৪. ডালিম ৫. ডাব।
মিষ্টি ফল:
১. আম ২. কলা ৩. খেজুর ৪. লিচু ৫. কাঁঠাল।
টক ফল:
১. তেঁতুল ২. কুল/বরই ৩. জলপাই ৪. আমড়া ৫. কামরাঙ্গা।
রসযুক্ত ফল:
১. তরমুজ ২. আনারস ৩. আঙুর ৪. বেদানা ৫. কমলা।

Friday, November 20, 2009

গীতা দত্ত

0 comments
পুরোনো দিনের যেসব গান শুনে আজও সংগীতানুরাগীরা মুগ্ধ হন, যেসব গান আজও শ্রোতাদের বিনোদিত করে, করে নস্টালজিক, যেসব গান আজও অনেকে একলা দুপুরে বা শেষ বিকেলে আপন মনে গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন, সেই সব গান যাঁরা গেয়েছেন, তাঁদের একজন গীতা দত্ত।
উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের কিংবদন্তি জুটি উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত এবং অজয় কর পরিচালিত অন্যতম জনপ্রিয় ছবি হারানো সুর-এ (১৯৫৬) যে সুরটি হারিয়ে যায়, যে সুরের গানটিতে ঠোঁট মিলিয়েছেন সুচিত্রা সেন, সেই—
তুমি যে আমার
ওগো তুমি যে আমার
কানে কানে শুধু একবার বল
তুমি যে আমার।
গানটির শিল্পী গীতা দত্ত। গীতা দত্তের আরও অনেক জনপ্রিয় গান রয়েছে। আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনায় তাঁর অন্য সব গান যদি হারিয়ে যায়, কেবল ‘তুমি যে আমার’ বেঁচে থাকে, তবু সংগীতানুরাগীরা তাঁকে বহুদিন বিশেষভাবে মনে রাখবে। ‘তুমি যে আমার’ ছাড়াও সুচিত্রা সেন গীতা দত্তের গাওয়া আরও বেশ কিছু গানে ঠোঁট মিলিয়েছেন। এর মধ্যে হসপিটাল-এর (১৯৬০) ‘এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়’ ও ইন্দ্রানীর (১৯৫৭) ‘ওগো সুন্দর জানো নাকি’ অন্যতম। এ ছাড়া বাংলায় তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গান হচ্ছে ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ’, ‘আমি শুনেছি তোমার গান’, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই’, ‘এই মায়াবী তিথি’, ‘যাদু ভরা ঐ বাঁশি’, ‘বাঁশি বুঝি সেই সুরে’, ‘শুধু একটুখানি চাওয়া’ ইত্যাদি। শচীন দেববর্মণসহ ভারতের প্রায় সব বিখ্যাত সুরকারের সুরে গান গেয়েছেন তিনি। তাঁদের মধ্যে ও পি নাইয়ার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ ও সুধীন দাশগুপ্ত অন্যতম। হ্যাঁ, গীতা ঘোষ রায় চৌধুরীর কথাই বলা হচ্ছে, যিনি সংগীতজগতে গীতা দত্ত নামে অধিক পরিচিত।
গীতা দত্ত ১৯৩০ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার এক ধনাঢ্য জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালে তিনি মা-বাবার সঙ্গে ভারতের মুম্বাই চলে যান।
গীতা দত্ত প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসেবে ১৯৪৬ সালে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেন। বাংলা ও হিন্দিতে সমান পারদর্শিতায় গান করেছেন। তিনি সব ধরনের গান করেছেন। তাঁর মধ্যে ভজন, কীর্তন, আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গান অন্যতম।
শচীন দেববর্মণের সুরে গীতা দত্তের গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানগুলো হচ্ছে, ‘মেরা সুন্দর স্বপ্ন ভীত গাইয়া’, ‘ওহ্ স্বপ্নেওয়ালি রাত’, ‘তদবির সে বিগদি হুই তাকদির’, ‘আন মিলো আন মিলো’, ‘আজ সাজন মোহে অঙ লাগলো’, ‘হাওয়া ধীরে আনা’, ‘ওয়াক্ত নে কিয়া কায়া হাসিন সিতাম’ প্রভৃতি।
ও পি নাইয়ায়ের সুরে গাওয়া গীতা দত্তের জনপ্রিয় গানগুলো হচ্ছে ‘জারা সামনে আ’, ‘বাবুজি ধীরে চল না’, ‘ঠান্ডি হাওয়া কালি ঘাটে’, ‘জব বাদল লেহরায়া’, ‘মেরে জিন্দিগি কি হামসফর’, ‘চোর, লুটেরে, ডাকু’, ‘মেরা নাম চিন চিন চো’, ‘কায়সা জাদু বালাম তুনে দরা’ প্রভৃতি।
এসব গানই জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার গান। সিনেমাগুলোর মধ্যে বাজি (১৯৫১), পয়সা (১৯৫৭), কাগজ কি ফুল (১৯৫৯), আর পার (১৯৫৪), মি. অ্যান্ড মিসেস ৫৫ (১৯৫৫) অন্যতম।
সিনেমার গান রেকর্ড করতে গিয়ে গীতা দত্ত নায়ক ও উঠতি পরিচালক গুরু দত্তের সান্নিধ্যে এসে হূদয়ঘটিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৫৩ সালের ২৩ মে দুজন বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁদের দাম্পত্য জীবন দীর্ঘ হয়নি। গুরু দত্ত ১৯৫৭ সালে গৌরী ছবি পরিচালনা করতে গিয়ে ওয়াহিদা রেহমানের সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গীতা দত্ত তা মেনে নিতে পারেননি। ফলে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এই বিবাহবিচ্ছেদের পর গীতা দত্ত মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং কার্যত তাঁর ক্যারিয়ারের যবনিকা ঘটে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত মদ্যপান ও ঘুমের ওষুধ খাওয়ার ফলে ১৯৬৪ সালে গুরু দত্ত মৃত্যুবরণ (অনেকের ধারণা, এটি ছিল আত্মহত্যা) করেন। এ সময় গীতা দত্ত আরও ভেঙে পড়েন। একই সঙ্গে আর্থিক সমস্যায় পড়েন। এ সমস্যা কাটানোর জন্য তিনি আবার তাঁর গানের ক্যারিয়ারের দিকে নজর দেন। নানাভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি বধূ বরণ (১৯৬৭) নামের একটি ছবিতে অভিনয়ও করেন। গান করেন অনুভব (১৯৭১) ছবির জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আর তাঁর ক্যারিয়ারে ভালোভাবে ফিরতে পারেননি। অতিরিক্ত মদ্যপান এরই মধ্যে তাঁর স্বাস্থ্যকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ ছিল না। ফলে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ২০ জুলাই মাত্র ৪১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন হারানো সুর-এর এই শিল্পী। কিন্তু তাঁর গান হারিয়ে যায়নি।
Writer: আশরাফুল হক

চম্পা

0 comments
চম্পা
তখন আমি অনেক পিচ্চি। বনানীতে থাকি। ভীষণ চঞ্চল ছিলাম। একদিন হঠাত্ই আমার মাথায় খেয়াল চাপল, পাড়ায় মাতব্বরি করতে হবে। কীভাবে করা যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা করতে বান্ধবীদের পরামর্শ চাইতেই ওরা দোকান খোলার পরামর্শ দিল। যেই কথা সেই কাজ। পাড়ার ফওজিয়া আপাকে (বর্তমানে বিখ্যাত আইনজীবী) সঙ্গে নিয়ে নেমে পড়লাম দোকান প্রতিষ্ঠার কাজে। এক বন্ধুর বাড়ির গ্যারেজকেই আমরা আমাদের নিজেদের দোকান মনে করে কাজ শুরু করলাম। নিজেরাই রং করে গ্যারেজের চেহারা পুরোপুরি বদলে ফেললাম। জায়গা তো পাওয়া গেল। সমস্যা হলো, কিসের দোকান দেব? টাকাপয়সাও নেই। দোকান সাজাব কী দিয়ে? উপায়ান্তর না দেখে চৌর্যবৃত্তির পথ বেছে নিলাম। যার বাড়িতে যা আছে, শাড়ি-কাপড় থেকে শুরু করে চুড়ি, কানের দুল, নাকের ফুল, জামা—সব একে একে চুরি করে দোকানে নিয়ে আসা শুরু করলাম আমরা। ক্রেতাও আমাদের দোকানেও আসা শুরু করল। দুর্ভাগ্য, জিনিসপত্রের হাল দেখে কেউ আর কিছুই কেনে না। এদিকে আমাদের প্রত্যেকের বাসায় খবর হয়ে গেল। কারও বাসায় শাড়ি পাওয়া যায় না তো কারও বাসায় জামা, জুতা। একদিন আমাদের দোকানে এসে আমার বান্ধবীর এক বোন এসে দেখল তার ওড়না ঝুলছে। আরেক বান্ধবীর ভাই এসে দেখল তার ময়লা জুতা দোকানে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর আমাদের বাড়িতে কী হয়েছিল, সেটা না-ই বা বললাম! তবে মাতব্বরি করার শখ সেদিনই আমাদের চিরতরে বিদায় নিয়েছিল, এটুকু বলতে পারি।

আশ্চর্য যত কান্ড

0 comments
১) উটের মেরুদন্ডের হাড় কিন্তু সরল রেখার মত সোজা
২)গবেষনায় দেখা গেছে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে বেশি ঘুমায়।
৩)একটা ইদুর পানি না খেয়ে একটা উটের চেয়ে বেশিদিন বেচে থাকতে পারে।
৩)কোমল পানীয় কোকাকোলার রং প্রথমে ছিল সবুজ।
৪)একটা মৌমাছির চোখে প্রায় ৬হাজার৩০০ মাইক্রোস্কোপিক লেন্স আছে।
৫)সাইবেরিয়াতে দুধ বরফের মত জমাট করে বিক্রি করা হয়।
৫)শামুক হল পৃথিবীর সবচেয়ে মন্থর গতির প্রানি । চলার গতি ঘন্টায় ০.০৩মাইল।
৬) ঘুমন্ত অবস্থায় একজন মানুষ ৪০বারের মত পাশ বদল করে, আর অনিদ্রা রুগীরা করে ৭০ বারের মত ।
৭) মানুষের ফুসফুসে প্রায় ৩০০কোটির মত অতি ক্ষুদ্র ধমনি আছে। সেই ধমনি ঘুলো পাশাপাশি জুড়লে ১৫০০ মাইলের মত হবে।
৮) শামুক তার অমন নরম শরীর নিয়ে একটি ব্লেডের ধারালো অংশের উপর দিয়ে অনায়াসে চলাফেরা করতে পারে।
৯) সম্রাট জুলিইয়াস সিজার এবং আলেক্সজান্ডার ২জনি ছিলেন মৃগি রোগী।
১০) শরীরের তাপমাত্রার শতকরা ৮০ ভাগ বেরিয়ে যায় মাথা দিয়ে ।
১১) আমাদের মধ্যমা আংগুলের নখ দ্রুত বাড়ে আর বৃদ্ধাআংগুলের নখ বাড়ে খুব ধীরে ধীরে।
১২) বিশ্বের বৃহত্তম ডাকটিকিটটি চালু ছিলো চীন দেশে ১৯১৩ সালে যার দৈর্ঘ ১০ইঞ্চি প্রস্থ ৩ ইঞ্চি।
১৩) একজন মানুষের মাথায় গড়ে ১,০০,০০০ চুল থাকে ।
১৪) একটি বাদামী বাদুর ঘন্টায় প্রায় ৬০০ মশা ধরতে পারে ।
১৫) ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের শরীরের ওজন ১১ আউন্সের মত কমে যায়।
১৬) গরুর ঘ্রান শক্তি এতটাই প্রখর যে সে প্রায় ছয় মাইল দূর থেকে কোন জিনিসের গন্ধ পায়।
১৭) ইংল্যান্ডে যে কোন অংশে যাওয়া হোক না কেন সর্বদাই ৭৫ মাইলের ভেতর সমুদ্র পাওয়া যাবে।
১৮) সারা পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২,৫০,০০০ রকমের ফুলগাছের সন্ধান পাওয়া গেছে।
১৯) এই পৃথিবীতে যত প্রানীর আর্বিভাব ঘটেছে তার ৯৯.৯ ভাগ মানুষ জন্মের আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
২০) মাকড়সার রক্তের রঙ গ্লিসারিনের মত স্বচ্ছ।
২১) উদ্ভিদের বীজ হিসেবে সবচেয়ে বড় বীজ হচ্ছে কোকোডিমার বীজ । এই ১টা বীজের ওজন ২৭ কেজি।
২২) মানুষের রক্তের ওজন তার দেহের তেরো ভাগের এক ভাগ।
২৩) মানুষ হচ্ছে একমা প্রানী যে চিৎ হয়ে ঘুমাত পারে।
২৪) চাদ এবং আমেরিকার ব্যাস সমান। ২১৬০ মাইল।
২৫) যে কোন পাখির দশ নম্বর ডিমটা তার আগের নয়টা ডিমের চেয়ে আকারে বড় হয়ে থাকে।
২৬) কলায় শতকরা ৭৫ ভাগই রয়েছে পানি।
২৭) মানুষের ফুসফুসের উপরি ভাগ ছাড়িয়ে তার ক্ষেত্রফল বের করলে সেটা হবে একটা টেনিস কোটের সমান।
২৮) প্রানীদের ভেতর সবচেয়ে কম ঘুমায় হাতি এবং ডলফিন। এরা গড়ে প্রতিদিন ২ ঘন্টার মত।
২৯) সার বিশ্বে শতকরা ৮ভাগ মানুষের শরীরে অতিরিক্ত একটা করে পাজঁর রয়েছে।
৩০) একটা ইঁদুর একরাতে ১০০ গজ লম্বা সুড়ঙ্গ খুঁড়তে পারে ।
৩১) সমুদ্রের ক্যাটফিশ শরীরের যে কোন অংশ দিয়ে খাবারের স্বাদ নিতে পারে।
৩২) ফানি বোন আসলে কোন হাড় নয়, ওটা মানুষের কনুইয়ের একটা নার্ভ মাত্র।
৩৩) ইংল্যান্ডের স্টাম্পের উপর দেশের নাম লেখা থাকে না।
৩৪) মৌমাছি-ই একমাত্র কীট যার খাদ্য মানুষ খায়।
৩৫) পতংগ কিছু খেতে পারে না, কারন তার মুখ নেই এমন কি পেটও নাই।
৩৫) কাঁচ ভেঙ্গে পড়লে তার টুকরাগুলো প্রতি ঘন্টায় ৪৮০০ কিঃমিঃ গতিতে ছিটকে পড়ে।
৩৬) হাচিঁ ছাড়ার সময় মানুশের ২ চোখঁ খুলে রাখা অসম্ভব।
৩৭) পতংগ কখনো কাপড় কাটে না তার লালা কাপড় নস্ট করে।
৩৮) কম খাদ্যের তুলনায় কম নিদ্রার মানুষের মৃত্যু আগে হয়।
৩৯) অ্যালবাট্রস পাখি ডানা না ঝাপটে ছয়দিন পর্যন্ত শূন্যে ভেসে থাকতে পারে।
৪০) পৃথিবীর সর্বাধিক বিক্রিত গ্রন্থের নাম বাইবেল।

Thursday, November 19, 2009

উলি নেকড স্টর্ক পাখি কি বাংলায় ফিরেছে!

0 comments
বাংলাদেশে স্টর্ক গোত্রের পাখি মদনটাক। এ পাখি সুন্দরবনসহ দেশের বড় নদীগুলোর চড়ায় সীমিত সংখ্যায় দেখা যায়। স্টর্ক গোত্রের আরেক সদস্য এশিয়ান ওপেন বিল বা শামুকখোল পাখি। মাঝেমধ্যে শীতকালে এদের বাংলাদেশের বিলঝিলে দেখা যায়। কখনো কখনো দেখা যায় পেইন্টেড স্টর্কও। ব্যস, এই হলো বাংলাদেশে স্টর্ক গোত্রের পাখির হাল অবস্থা।
তবে বাংলাদেশের মতো বিলঝিলের দেশে এমন হওয়ার কথা নয়। যেমন—ব্ল্যাক নেকড স্টর্ক, হাড়গিলা বা অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক, হোয়াইট স্টর্ক, উলি নেকড স্টর্ক একসময় এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিল। এখন এদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। স্টর্ক সাধারণত অত্যন্ত বড় ও ভারী পাখি। প্রজাতিভেদে এক একটি পাখির ওজন চার থেকে সাত কেজি। বক বা সারসের তুলনায় এই পাখিগুলো অনেকটা নীরব-শান্ত। বাসা বাঁধে জলাশয়ের কাছাকাছি উঁচু গাছে। অনেক সময় বক, পানকৌড়ির মিশ্র দলে বাসা বাঁধে।
স্টর্ক-জাতীয় পাখি মাছ, গেঁড়ি গুগলী, ব্যাঙ, ইঁদুর, সাপসহ যা কিছু ঠোঁটের আওতায় আনতে পারে, সবই খেয়ে থাকে। শামুকখোল অনেক সময় চষা জমিতে শামুক খুঁজে বেড়ায়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে ব্যাপক হারে গাছ কাটা হলে এই পাখিদের বাসা বানানোর জায়গার সংকট দেখা দেয়। সেই সঙ্গে জলাভূমি ভরাট করে কৃষিজমি বা আবাসন গড়ে তোলায় এদের খাদ্যসংকটও চরম আকার ধারণ করে। ফলে এই পাখিগুলো বাংলা ছেড়ে আশপাশের দেশে আশ্রয় নিয়েছে।
চল্লিশের দশকেই হাড়গিলা বাংলা থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। এদের মধ্যে সবার আগে বাংলা ছেড়েছে হোয়াইট নেকড স্টর্ক, যার বর্তমান নাম উলি নেকড স্টর্ক। এ পাখিটি বাংলাদেশে শেষ দেখা গেছে ১৮৮৮ সালে। পাখিটি দাঁড়ালে ১০৬ সেন্টিমিটার উঁচু। সাধারণত ঘাসওয়ালা বিলঝিলে চরতে পছন্দ করে। তবে জঙ্গলের ধারের জলাভূমিই বেশি পছন্দের। পাখিটির পাখা দুটো কালচে, শরীরও নীলাভ কালচে। লেজ সাদা-কালোয় মেশানো, গলার রং সাদা, মাথা কালো। পা লালচে, ঠোঁট লালচে কালো। গলার পালকগুলো দেখলে মনে হয় উল দিয়ে বোনা। তাই এর নতুন নামকরণ উলি নেকড স্টর্ক।
সুখের খবর হলো—প্রায় ১২১ বছর পর সম্প্রতি একটি উলি নেকড স্টর্ক পাখিকে বাংলার আকাশে উড়তে দেখলেন একদল পাখিবিদ। পাখিবিদদের দলে ছিলেন ড. রোনাল্ড হালদার, ড. মনিরুল খান, সিরাজুল হোসেন, ড. হেলমুট, গারট্রুড, মার্টিন উইলিয়াম, সায়েম চৌধুরী, জমিরুদ্দিন ফয়সাল। সুন্দরবনের কটকায় ঘটেছিল ওই বিরল দর্শন।
তবে এ পাখি দেখাটা যেমন আশার, তেমনি নিরাশারও। কারণ বিক্ষিপ্ত দু-একটি পাখি প্রমাণ করে না যে এরা আবার এ দেশে স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছে। তবে আগ্রহীরা হতাশ হবেন না। যাঁদের এখনো এই পাখি দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তাঁরা কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে যেতে পারেন। সেখানে দু-তিনটি উলি নেকড স্টর্ক আছে দর্শনার্থীদের জন্য।

ন্যাশনাল আইডি কার্ডের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

0 comments
ন্যাশনাল আইডি কার্ড সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য


ন্যাশনাল আইডি কার্ডের নিচে ১৩টি ডিজিট রয়েছে
এই ১৩ টি ডিজিটের একটি বিশেষত্ব রয়েছে যা আমাদের জেনে রাখা প্রয়োজন।
আমার ন্যাশনাল আইডি কার্ডের নম্বরটি হচ্ছেঃ
৫৫২৫৭০৮১৪৬২৩১


যার প্রথম দুই ডিজিট - ৫৫ হচ্ছে জেলা কোড। আমার জেলা মাগুরা।


পরবর্তী ডিজিট- ২ হচ্ছে আর.এম.ও (রিজিওন)
এখানে ২ মানে পৌরসভা।


১ = পল্লী
২ = পৌরসভা / অন্য এলাকা
৩ = শহর
৫ = ক্যান্টঃ বোর্ড
৯ = সিটি কর্পোরেশন


পরবর্তী দুই ডিজিট- ৫৭ হচ্ছে উপজেলা কোড। আমার উপজেলা মাগুরা সদর।


পরবর্তী দুই ডিজিট- ০৮ হচ্ছে পৌর ওয়ার্ড/ইউনিয়ন কোড।


পরবর্তী ৬ ডিজিট হচ্ছে ব্যক্তিগত নম্বর।

হিলারি ম্যানটেল

0 comments

অসাধারণ সৃষ্টির উপাদান ও উপাত্তের কোনো কাল নেই। প্রাচীনতম বস্তুর ভেতরে যদি নতুন কোনো বৈশিষ্ট্য আমরা খুঁজে পাই তাহলে আলোড়িত হয়ে উঠি, নতুন করে আবিষ্কারের আনন্দে আমরা পুলকিত হই। আমাদের দেখার পরিধি বিস্তৃৃত হয়। যিনি দেখান তাকে বাহবা দিয়ে আমরা ধন্য হই। তেমনি ইতিহাসের এক চিরচেনা ঘটনাকে নতুন করে উপস্থাপন করেছেন হিলারি ম্যানটেল, তার উপন্যাস ওল্ফ হল'র মধ্য দিয়ে। তার অসাধারণ কল্পনাশক্তি, সাবলীল লেখনি শৈলির পথ ধরে মানটেল দ্রুত হেঁটে গেছের ইতিহাসের পাতায়; পাঠককে টেনে নিয়েছেন সঙ্গে। তাই মান বুকার পুরস্কারটিও ললনার সুগঠিত পায়ের আলতায় অাঁকা আল্পনা হয়ে ধরা দিয়েছে।

হিলারি মানটেলের নবম উপন্যাস ওল্ফ নিয়ে আলোচনা করতে হলে পঞ্চদশ শতাব্দির ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিতির প্রয়োজন পড়বে। অনেকগুলো কারণে ইংল্যান্ডে রাজা অষ্টম হেনরীর শাসনামল স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৪৯১ সালে রাজা সপ্তম হেনরি এবং এলিজাবেথ অব ইয়র্কের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন অষ্টম হেনরি। ভাই বোনের মধ্যে ষষ্ঠ ছিলেন তিনি। হেনরির ভাই বোনের মধ্যে তিনজন মাত্র শৈশব পার করতে পেরেছিলেন। হেনরির বড় ভাই আর্থার ১৫০২ সালে ১৫ বছর বয়সে মারা গেলে হেনরিই প্রিন্স অব ওয়েলস হিসাবে অভিষিক্ত হন। আর্থারের স্ত্রী ছিলেন স্পেনের রাজা ফার্ডিন্যান্ড এবং রানী ইসাবেলার কনিষ্ঠ কন্যা ক্যাথেরিন অব অরাগন। তার মৃত্যুর পর হেনরির পিতা স্পেনের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে ক্যাথেরিন অব অরাগনকে হেনরির সঙ্গে বিয়ে দেন।
হেনরি মোট ছয়টি বিয়ে করেছিলেন। এই বিয়েকে ঘিরেই ইংল্যান্ডের ইতিহাসে ব্যাপক ঘটনাবলী জন্ম নেয়। ১৫০৯ সালে ক্যাথেরিনকে বিয়ে করলেও হেনরি তাকে ১৫৩৩ সালে তালাক দেন। হেনরি সে বছরই আনে বোলিনকে গর্ভাবস্থায় বিয়ে করেন। আনে বোলিনের গর্ভে এলিজাবেথ নামে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। হেনরি আনেকে অবিশ্বাসের কারণে ১৫৩৬ সালে মৃত্যুদ- দেন। মৃত্যুদ- কার্যকরের এক মাস পার না হতেই তিনি জেইন সেমুরকে বিয়ে করেন। এই সেমুরের গর্ভেই অষ্টম হেনরীর একমাত্র পুরুষ উত্তরাধিকারী এডোয়ার্ডের জন্ম হয়। ১৫৪০ সালে হেনরি জার্মান প্রিন্সেস আনে অব ক্লেভেসকে বিয়ে করেন। নিষ্কণ্টক হয়নি সে বিয়েও। ওই বছরই তিনি ক্যাথেরিন হাওয়ার্ডকে বিয়ে করেন। কিন্তু তাকেও দু' বছর পর মৃত্যুদ- প্রদান করেন। শেষ বিয়েটি তিনি করেন ১৫৪৩ সালে ক্যাথেরিন পারকে। হেনরি ছিলেন শৈল্পিক বোধ ও নিষ্ঠুরতার এক অদ্ভুত সমন্বয়। তিনি ছিলেন গোরা ক্যাথলিক। আবার রোমান চার্চের সঙ্গে তিনি ইংল্যান্ডের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেন। সে সময় এটি ছিল এক অবিশ্বাস্য পদক্ষেপ। রোমান ক্যাথলিক চার্চের সঙ্গে ইংল্যান্ডের চার্চের সম্পর্ক ছিন্ন করার পেছনে ছিল বোলিনকে বিয়ে। একটি সময় হেনরি অস্থির হয়েছিলেন এক পুত্র সন্তানের জন্য। শিল্প ও জ্ঞান বিজ্ঞানের সমঝদার কাউকে পথের কাটা মনে করলে মৃত্যুদ- দিতে সামান্য কুণ্ঠা বোধ করতেন না। হেনরি ছিলেন ভয়ানক রকমের প্রোটেস্ট্যান্ট বিরোধী। কিন্তু বর্তমান ইংল্যান্ডেও শ্রুতি আছে যে তিনি মৃত্যুকালে প্রোটেস্ট্যান্ট হয়ে উঠেছিলেন। ইংল্যান্ডে তখন রানীকে তালাক দেয়া আর চার্চকে তালাক দেয়া ছিল সমান কথা। তার উপর চার্চের সঙ্গে সমঝোতা করেই প্রথম স্ত্রীর বিয়েটা সব পক্ষ, অর্থাৎ হেনরির পিতা ও স্পেনের রাজা মিলে ম্যানেজ করেছিলেন। কারণ চার্চের মত ছিল, মৃত ভাইয়ের স্ত্রীকে বিয়ে করতে হলে সারা জীবন সন্তানহীন থাকতে হবে। যদিও ক্যাথেরিন অব অরাগন দাবী করেছিলেন, তার সঙ্গে আর্থারের বিয়েটা দৈহিক সম্পর্ক পর্যন্ত গড়ায়নি।
মজার বিষয় হল, হিলারি ম্যানটেল সেই সময়কে দেখিয়েছেন অতি সাধারণ অবস্থা থেকে উঠে আসা থমাস ক্রমওয়েলের মধ্য দিয়ে। যার ফলে হিলারির উপন্যাসে রাজপ্রাসাদ থেকে রাস্তা সমানভাবে উপস্থিত। ক্রমওয়েল ছিলেন রাজার প্রধান উপদেষ্টা। ১৯৪০ সালে ক্রমওয়েলকে রাজা মৃত্যুদ- প্রদান করেছিলেন। ম্যানটেলে উপন্যাসের মূল চরিত্র রাজা অষ্টম হেনরি নয়, ক্রমওয়েল। ম্যানটেল ক্রমওয়েলকে ষোড়শ শতাব্দির উপযুক্ত ব্যক্তিত্ব বলে প্রমাণ করেছেন তার উপন্যাসে। অবশ্য ইতিহাসবিদরাও মনে করেন ক্রমওয়েল ছিলেন মধ্যযুগের এক জিনিয়াস প্রশাসক। নিষ্ঠুর হেনরির পাশে অবস্থান করে ক্রমওয়েল হয়ে উঠেছিলেন ইংল্যান্ডের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে অসাধারণ আবেগ অন্যদিকে বিচক্ষণতা, শত্রু থমাস মোরকে মৃত্যুদ- প্রদান-এই বৈপরিত্যের মাঝেও ক্রমওয়েলকে বুঝতে পাঠকের কোনো অসুবিধাই নেই। অতি সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ম্যানটেল চিত্রায়িত করেছেন সাবলীলভাবে। অনেকে বিয়ের কারণে, বিয়ের বৈধতা প্রশ্নে রাজাকে ইংল্যান্ডের হেড অব দি চার্চ পদে শপথ করাতে অস্বীকার করেন থমাস মোর। সে কারণেই মোরকে মৃত্যুর স্বাদ পেতে হয়। রাজা পোপদের হাত থেকে চার্চকে মুক্ত করেন। কিন্তু থমাস মোর কে? তিনি কী ইংল্যান্ডের চার্চ সমাজের আদর্শকে সমুন্নত রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? ম্যানটেল বলছেন, না। থমাস মোর তার ক্রীতদাসকে নিষ্ঠুরভাবে পেটাতেন। তার নিজের স্ত্রীর প্রতি ছিলেন নির্দয় এবং প্রোটেস্ট্যান্টদেরকে অমানবিক অত্যাচার করতেন।
বালক ক্রমওয়েলের জীবনের হৃদয় বিদারক এক দৃশ্যের মধ্য দিয়ে হিলারি ম্যানটেল তার উপন্যাস শুরু করেছেন-
ুঝড় হড় িমবঃ ঁঢ়!চ্ ডধষঃবৎ রং ৎড়ধৎরহম ফড়হি ধঃ যরস, ড়িৎশরহম ড়ঁঃ যিবৎব ঃড় শরপশ যরস হবীঃ. যব ষরভঃ যরং যবধফ ধহ রহপয ড়ৎ ঃড়ি, ধহফ সড়াবং ভড়ৎধিৎফ, ড়হ যরং নবষষু, ঃৎুরহম ঃড় ফড় রঃ রিঃযড়ঁঃ বীঢ়ড়ংরহম যরং যধহফং ড়হ যিরপয ডধষঃবৎ বহলড়ুং ংঃধসঢ়রহম ুডযধঃ ধৎব ুড়ঁ, ধহ ববষ?চ্ যরং ঢ়ধৎবহঃ ধংশং. ঐব ঃৎড়ঃং নধপশধিৎফ, মধঃযবৎং ঢ়ধপব ধহফ ধরসং ধহড়ঃযবৎ শরপশ........
ুখড়ড়শ হড়,িষড়ড়শ হড়,িচ্ ধিষঃবৎ নবষষড়ংি. ঐব যড়ঢ়বং ড়হ ড়হব ভড়ড়ঃ, ধং রভ যব রং ফধহপরহম. ুখড়ড়শ যিধঃ ও যধাব ফড়হব. ইঁৎংঃ সু নড়ড়ঃ, শরপশরহম ুড়ঁৎ যবধফ.চ্
পাটনির মদ্যপ কামার পিতা এর পরের প্রায় ১৪টি পাতায় ম্যানটেল ক্রমওয়েলকে বর্ণনা করেছেন ইতালীয় কুক থেকে সেনা পর্যন্ত নানা পেশায়। এবং নিয়ে গেছেন নিষ্ঠুর হেনরির দরবারে। ক্রমওয়েল সাধারণ মানুষের জন্য ইংল্যান্ডকে বসবাস উপযোগি করে তুলতে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলে আমৃত্যু। সেটা যেমনি ইতিহাসের সত্য তেমনি উঠে এসেছে ম্যানটেলের উপন্যাসে। নিজে ক্রমওয়েল যে সমাজ থেকে উঠে এসেছিলেন সেই সমাজকে অভিজাত, দুর্নীতিবাজ চার্চের অধিকর্তাদের হাত থেকে রক্ষার একটি প্রচেষ্টা গোটা উপন্যাসেই চিত্রিত আছে। রাজা হেনরির উপর ক্রমওয়েলে প্রভাব এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে নিজে গোড়া ক্যাথলিক হয়েও রাজা অনেক বিষয়েই চার্চের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন। হেনরির সবগুলো বিয়ের মধ্যে আনে বোলিনকে বিয়ে করা নিয়েই সবচেয়ে বড় ঝড়টি উঠেছিল। উপন্যাসের অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে আনে বোলিনকে বিয়ের ঘটনাবলী। ক্রমওয়েল আনেকে গভীরভাবে পছন্দ করতেন, আবার আনেকে হেনরির বিয়েতে ক্রমসওয়েল সমর্থন যুগিয়েছেন। হেনরি বিশ্বাস করতেন শিক্ষা, সহিষ্ণুতা, বিবেক, বিচক্ষণতায়। নিজের ব্যক্তি জীবনের এই চর্চাই তাকে ক্ষমতার দোড়গোড়ায় নিয়ে এসেছিল।
অষ্টম হেনরি এবং আনে বোলিনের রোমাঞ্চকর বিয়ে নিয়ে অনেক গল্প এবং কাহিনী ইংরেজি সাহিত্যে রচিত হয়েছে। তার অধিকাংশ কাহিনী হয় পুরোটাই ইতিহাস নির্ভর অথবা ভিত্তিহীন কল্পনা। কিন্তু ম্যানটেলের এই উপন্যাস অষ্টম হেনরি, হেনরির উপদেষ্টা থমাস ক্রমওয়েল, ইটউডর ইংল্যান্ডের রাজ কর্মচারী এবং চার্চ সমাজ সম্পর্কে দিয়েছে নতুন পাঠ। পেছনের কাহিনীসহ ম্যানটেল ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর মনস্তত্ব বিশ্লেষণ করেছেন নিপুণ হাতে। মধ্যযুগের ইংরেজ সমাজের কুসংস্কার এবং তার প্রভাব ম্যানটেল তার উপন্যাসে সফলভাবে উপস্থাপন করেছেন।
ম্যানটেলের উপন্যাস ওল্ফ হলের আলোচনা করতে গিয়ে অনেক আলোচক দুটি নেতিবাচক দিকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। ম্যানটেল ব্যাকগ্রাউন্ড ঠিক রাখতে গিয়ে যে বংশ পরিচয় তুলে ধরেছেন তা কিছুটা একঘেয়েমি এনে দিয়েছে বলে অনেকের ধারণা। কিন্তু এ ধরণের একটি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসে ব্যাকগ্রাউন্ড এক অপরিহার্য অংশ। সেই ব্যাকগ্রাউন্ডকে উপেক্ষা করে রচনাকে শক্তিশালী করে তোলা প্রায় অসম্ভব কাজ। দ্বিতীয়ত ম্যানটেলের উপন্যাসে বিশেষণের মাত্রা চোখে পড়ার মত বলে অনেকে মনে করেন। ইংরেজি সাহিত্যে বরাবরই বিশেষণের ব্যবহার প্রাবল্য লক্ষ করা যায়।
২০০৯ সালের মান বুকার শর্ট লিস্টে ছিলেন, এ, এস বাইয়াট, জেম্স কোয়েৎসি, অ্যাডাম ফোল্ডস, সাইমন মাওয়ার এবং সারাহ ওয়াল্টারের নাম। কিন্তু ভুল করেননি অথোরিটি-অন্তত অনেকে তাই মনে করেন। টিউডর বংশের শাসন নিয়ে এ ম্যান অব অল সিজনস, আনে অব এ থাউজেন্ড ডে'জ, দি টিউডরস এর মত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কিন্তু ম্যানটেল এই চিত্রটি অাঁকতে সক্ষম হয়েছেন যে হেনরি ৬টি বিয়ে করলেও, সে বিয়ের পেছনে অনেক নিষ্ঠুরতা-অনেক ঘটনা প্রবাহ থাকলেও তিনি ভয়ানক যৌন পিপাসু কোনো রাজা ছিলেন না। হেনরির অন্দর মহলকে যেভাবে ম্যানটেল তুলে এনেছেন তা পাঠক সমাজ এক কথায় মেনে নিয়েছে।

সুধীন দত্ত

0 comments

বাংলা কবিতার দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০) নানা কারণে প্রাতিস্বিকতার পরিচয় দিয়েছেন। চর্যাকারদের থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলা কবিতার যে ধারা তিরিশোত্তর কালের কবিরা সে ধারায় নতুন বাঁক সৃষ্টি করেন। মূলত, মেধা-মননের পরিচর্যায় এ সময়ের কবিরা কবিতাকে করে তোলেন অতি উচ্চ মার্গের শিল্পপ্রতিমারূপে ...এক্ষেত্রে অন্যতম পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন সুধীন দত্ত। তার কবিচিত্ত সমস্ত বিশ্ব-ব্রহ্মা- ঘুরে বীজ সংগ্রহ করেই নির্মাণ করেছে কাব্যের কল্পতরু। তিনি জগৎকে দেখেছেন নেতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে। ফলে তার কবিতার সর্বত্রই নৈরাশ্য, হতাশা, ক্লান্তি, অবসাদের ছাপ স্পষ্টরূপে প্রতিভাত। জীবনানন্দ দাশ এ জন্যই বোধ করি তাঁকে 'আধুনিক বাংলা কাব্যের সবচেয়ে নিরাশাকরোজ্জ্বল চেতনা বলে অভিহিত করেছিলেন'। পুঁজিবাদী শোষণের বৈনাশিকতায় তিনি যন্ত্রণাদগ্ধ হয়েছেন, ফলে সমাজ, সংসার, ধর্ম, ঈশ্বর, প্রেম, প্রকৃতি- সব কিছুকেই না-বোধক দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন। শূন্যমনস্ক ও ক্ষণবাদী, গণতন্ত্র ও মানবতন্ত্রে শ্রদ্ধাশীল অথচ গণবিচ্ছিন্ন ও আত্মমুখী এই কবি সংযত ও দৃঢ় ভাষাশৈলীর অাঁধারে তীব্রবেগবান অনুভূতির আলোকে তাঁর কাব্যের জগৎ নির্মাণ করেছেন 'অর্কেস্ট্রা' (১৯৩৫), 'ক্রন্দসী' (১৩৩৭), 'উত্তরফাল্গুনী' (১৩৪৭), 'তন্বী' (১৩৩৭) প্রভৃতি কবিতাগ্রন্থে তাঁর নৈরাশ্যবাদী কবিসত্তার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। দীপ্তি ত্রিপাঠী বলেছেন: 'সুধীন্দ্রনাথের কাব্য যেন ভ্রষ্ট আদমের আর্তনাদ। তিনি স্বর্গচ্যুত কিন্তু মর্ত্যে অবিশ্বাসী। তাঁর মধ্যে বিজ্ঞতা আছে কিন্তু শান্তি নেই, যুক্তি আছে কিন্তু মুক্তি নেই। তাঁর কাব্য কোনো আশ্বাসের আশ্রয়ে আমাদের পেঁৗছে দেয় না। সুধীন্দ্রনাথের নঞ্র্থক ও পরে ক্ষণবাদী জীবনদর্শন আমাদের ধর্মপুষ্ট বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব সংযোজন।...সুধীন্দ্রনাথের কাব্য পাঠকালে মনে হয়, কবি যেন এক নিঃসঙ্গ চূড়ায় দাঁড়িয়ে আধুনিক জীবনের নিঃসীম শূন্যতা নৈরাশ্যভারাতুর নয়নে অবলোকন করেছেন।'

সমকালীন যুগের অস্থিরতা সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে যন্ত্রণা দিয়েছে। যুগের বৈরী পরিবেশে তিনি নিজেকে অসহায় ভেবেছেন, নিজেকে কল্পনা করেছেন সমাজ-সংসারের সকল কিছু থেকে পুরোপুরি স্বতন্ত্র এক মানুষ হিসেবে। পৃথিবীকে তাঁর মনে হয়েছে শূন্য, বন্ধ্যা এবং নাস্তিময়। এজন্য তাঁর মধ্যে বাসা বেঁধেছে সংশয় ও অবিশ্বাস। কবিতায় শূন্যতাদ্যোতক উপমা হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছেন বন্ধ্যা ফণিমনসা, শূন্য মরুপ্রান্তর, উপহাস্য মরুমায়া ও নিষ্ফলা মরুভূমি। তিনি নিরালম্ব নৈরাশ্যের জ্বালায় উচ্চারণ করেছেন : 'মনে হয়/অতল শূন্যের শেষে পড়ে আছি আমি নিরাশ্রয়/দেখিতেছি ভ্রমিভ্রান্ত চোখে/গতাসু আলোর প্রেত বিচরিছে স্তবকে স্তবকে/নিরালম্ব নৈরাশ্যের নিঃসঙ্গ অাঁধারে। 'তিনি জন্মগ্রহণ করেন ভারতবর্ষের এক যুগ-সংক্রান্তির কালে। নানা আন্দোলন-সংগ্রাম, যুদ্ধ-মহামারী এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিসরে ভাঙা-গড়া চলছিল তখন। এক কথায় তাঁর সমকাল ছিল নানাবিধ সমস্যা-সঙ্কটে নিমজ্জিত। তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যুগের সেসব ঘটনা ও প্রবণতাকে। পেশাগত জীবনে একজন বিত্তবান সাংবাদিক হিসেবে তিনি যেতে পেরেছিলেন নগ্ন-রূঢ় বাস্তবের কাছাকাছি। যুদ্ধের বিভীষিকা, দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তাঁর সংবেদনশীল মনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। বিংশ শতাব্দির সমান বয়সী এই কবি সজাগ দৃষ্টিতে সবকিছু অবলোকন করে দুঃসহ যাতনা ভোগ করেছেন। তিনি জন্মাবধি দেখেছেন যুদ্ধ বিপ্লব, বিনষ্টিজ্জ তাই মেকি সভ্যতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেছেন: 'আমি বিংশ শতাব্দীর/ সমান বয়সী; মজ্জমান বঙ্গোপসাগরে; বীর/নই, তবু জন্মাবধি যুদ্ধে যুদ্ধে, বিপ্লবে বিপ্লবে/বিনষ্টির চক্রবৃদ্ধি দেখে, মনুষ্যধর্মের স্তবে নিরুত্তর, অভিব্যক্তিবাদে অবিশ্বাসী, প্রগতিতে/যত না পশ্চাৎপদ, ততোধিক বিমুখ অতীতে।'সুধীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছেন তাঁর সমসাময়িক যুগ নিষ্ঠুরতায় বিপর্যস্ত। বিশ্বের সকল স্থিতি লুপ্তপ্রায়; মানুষের মনুষ্যত্বহীনতা, বর্বরতা আর তা-বে সবকিছু যেন রসাতলে যাচ্ছে। এজন্য পৃথিবীর শান্তি বিনষ্টকারী স্বার্থপর এবং যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রনায়কদের তিনি 'তৃষিত মড়কের পিশাচ' বলেছেন। চারিদিকে সম্ভাবনাহীন জগৎ, কোন সুস্থিরতা নেই, নেই জীবনে কোন স্বস্তি। এক ধরনের অবলম্বনহীন, নিরাশ্রয়, হতাশাগ্রস্ত ভাবনা কবিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। ফলে বিনষ্ট মূল্যবোধ, আদর্শ ও অবক্ষয়ী সমাজের বাণীমূর্তি তিনি নির্মাণ করেছেন। উটপাখির প্রতীকে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত যুগ, সমাজ এবং নিহত সম্ভাবনার কথা ব্যক্ত করেছেন। উটপাখি যেমন ঝড়ের সম্ভাবনায় মরুভূমির বালিতে মুখ গুঁজে আত্মরক্ষার বৃথা চেষ্টা করে; যুদ্ধ, মারি-মন্বন্তরে বিধ্বস্ত মানুষও তেমনি কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছে। যুগ জটিলতায় উদ্ভূত সঙ্কট থেকে তাঁর সত্তায় শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি হয়েছে নৈরাশ্যের ভয়াবহ রূপ। দিগভ্রান্ত মানুষের সেই নৈরাশ্যকে মরুভূমির উটপাখির প্রতীকে তুলে ধরেছেন: 'কোথায় পালবে? ছুটবে বা আর কত?/উদাসীন বালি ঢাকবে না পদরেখা/প্রাকপুরাণিক বাল্যবন্ধু যত/বিগত সবাই, তুমি অসহায় একা' তিনি লক্ষ্য করেছেন তাঁর যুগে মানুষের বেঁচে থাকবার মতো রসদ নেই, মনের তৃষ্ণা দূর করবার মতো সৌন্দর্য নেই, মানবধর্ম টিকিয়ে রাখবার মতো সামঞ্জস্যপূর্ণ অভিব্যক্তিবাদ নেই। শুধু রয়েছে রাজনীতির সর্বনাশা পাশা খেলা। সকল শুভবোধের বিলোপ ঘটেছে, পৃথিবীতে জাগ্রত হয়েছে কেবল অমঙ্গলের চিহ্নসমূহ। সেই নেতিবাচক বিনষ্ট যুগকে কবি উপস্থাপন করেছেন অমঙ্গলসূচক সব প্রতীক আর চিত্রকল্পের মাধ্যমে: 'নিশ্চিহ্ন সে-নচিকেতা; নৈরাশ্যের নির্বাণী প্রভাবে/ধূমাঙ্কিত চৈত্যে আজ বীতাগি্ন দেউটি,/আত্মহা অসূর্যলোক, নক্ষত্রেও লেগেছে নিদুটি।/কালপেঁচা, বাদুড়, শৃগাল/ জাগে শুধু সে-তিমিরে; প্রাগ্রসর রক্তিম মশাল /আমাকে অবিল করে; একচক্ষু ছায়া, /দীপ্ত-নখ, স্ফীত-নাশা, নিরিন্দ্রীয় বৈদ্যুতিক কায়া /চতুর্দিকে চক্রবূ্যহ বাঁধে।'
সুধীন দত্ত চেতনায় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেছেন বিধায় সবকিছু সম্পর্কেই তাঁর অবিশ্বাস, অবিশ্বাস ঈশ্বরেও। তাঁর কবিতায় ঈশ্বর জিজ্ঞাসা দ্বন্দ্বমুখর হলেও তা মানবতন্ত্রী অথচ শূন্য ও নাস্তিবাদী বৈনাশিক চেতনায় পরিব্যাপ্ত। বাল্যকালে পিতার অদ্বৈতশিক্ষার পাঠে সংশয় তাঁকে অনেকটাই জড়বাদে উপনীত করেছিল। পরবর্তীতে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সাহিত্য-দর্শন অনুশীলন তাঁর এ চেতনাকে আরও শানিত করে। বৌদ্ধদর্শনের শূন্যবাদ থেকে তিনি নাস্তিক্যবাদের রসদ পেয়েছিলেন। বৈরী বিশ্বের প্রতিকূলতা ও ব্যক্তিজীবনের ব্যর্থতাও তাঁর মধ্যে নাস্তিক্যবাদী ভাবনা উপ্ত করেছে। তিনি অর্জন করেছেন সোহংবাদ বিষয়ে ধারণা। শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধদর্শনের ক্ষণবাদে আস্থাশীল হয়েছেন। ধর্ম ও ঈশ্বর সম্পর্কে এই অবিশ্বাস আধুনিক মানুষের চিত্তে সৃষ্টি করে প্রবল সংশয়। এযুগের কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাই ধর্ম ও ঈশ্বরের প্রতি প্রবল অবিশ্বাস করেছেন, এমনকি ঈশ্বর সম্পর্কে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতেও ছাড়েননি। ভগবানকে কখনো তিনি 'য়িহুদির হিংস্র ভাগবান, কখনো 'যাযাবর অর্থের বিধাতা,' কখনো বা 'লুপ্তবংশ কুলীনের কল্পিত ঈশান' বলে অভিহিত করেছেন। প্রথম থেকেই তাঁর কাব্যভাবনায় ঈশ্বর বিচ্ছিন্নতা দানা বাঁধতে থাকে। তিনি ঈশ্বরের প্রতি নিক্ষেপ করেছেন সংশয় মিশ্রিত নেতিবাচক বিদ্রূপ। কোন কবিতায় সন্দিগ্ধচিত্তে বলেছেন: 'নিরাকার নির্গুণের করিতেছি সন্দিগ্ধ অন্বেষ।' আবার কোন কবিতায় নেতিবাচক মনোভাবের দ্যোতক হিসেবে উচ্চারণ করেছেন: 'অলীক, অনাম কোন বিধাতার অলখ আসন।' ভগবানের উপর চরম অনাস্থা প্রকাশ করে লিখেছেন :'শ্বেত শুদ্ধ দেবতাত্মা? সে তো শুধু পীত পুরাতন/পুরাণের আখ্যায়িকা, চিরাভ্যন্ত অপলাপ শত '। তাঁর কবিহৃদয়ের 'জ্যোতির্ময় সিংহাসনখানি ডুবেছে নাস্তির গর্ভে।' তাঁর সংশয় জেগেছে 'হয়তো ঈশ্বর নেই' কিংবা তিনি কল্পনা করেছেন 'অপমৃত ভগবানকে'। নাস্তিক্য বিশ্বাসের অতলে ঈশ্বরকে ডুবিয়ে দিয়ে নীটশের মতো বলে উঠেছেন : 'উড়ায়ে মরুর বায়ে ছিন্ন বেদ- বেদান্তের পাতা, /বলেছি পিশাচ হস্তে নিহত বিধাতা\\' পুঁজিবাদের দোর্দ- প্রতাপে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অসুর শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানবের উপর। এমতাবস্থায় ঈশ্বরের মঙ্গলময় রূপ পরাহত হয়েছে। সুধীন্দ্রনাথ অসুর শক্তির তা-বলীলার জন্য ঈশ্বরের অক্ষমতা ও অসম্পূর্ণতাকে দায়ী করেছেন। তিনি ঈশ্বরের নিত্য রূপকে যেমন স্বীকার করেননি, তেমনি স্বীকার করেননি তার মঙ্গলময় ও সত্য রূপকে। ধ্বংসের বিভীষিকার উপর দাঁড়িয়ে ভগবানকে উপহাস করে বলেছেন: ' হায়, ভগবান।/ হায়, হায় ব্যর্থ ভগবান,/তোমার অমিত ক্ষমা, সে কি শুধু অসুরের তরে? /কিন্তু যারা প্রহরে প্রহরে/ উৎসর্গিছে অকাতরে অতিমূল্য প্রাণ / সুপ্রতিষ্ঠ করিবারে মরলোক সিংহাসন তব,/তারা অবজ্ঞার পাত্র। সুধীন্দ্রনাথ নানা বিশেষণে ঈশ্বরের প্রতি বিদ্রূপ করে তাঁর নাস্তিক্যবাদী ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। 'উদাসীন বিধাতা', ব্যর্থ ভগবান', 'কুটিল দেবতা', 'আশ্রিত বিধি', 'রুক্ষ বিধাতা', 'পৈতৃক বিধাতা', 'অলীক আত্মীয় ভগবান,' 'ক্রূর ভগবান' প্রভৃতি সম্বোধনের মধ্যে ভগবান সম্পর্কে কবির বিদ্রূপ বর্ষিত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ধর্মের প্রতিও তিনি অন্বয় স্থাপন করতে পারেননি। ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা বৃথা জেনে উচ্চারণ করেছেন : 'তিলভা- সর্বনাশ; অতিদৈব বিশ্বের দেউল: / প্রার্থনা বা অভিযোগ বৃথা: / প্রতিজ্ঞাবিস্মৃত কল্কি; কিংবদন্তী শিবের ত্রিশূল, /শূন্যকুম্ভ পুরাণ, সংহিতা। নাস্তিবাদী ভাবনা সুধীন দত্তের মনে যে সকরুণ বেদনা ও দ্বিধা সৃষ্টি করেছে তা থেকে পরিত্রাণের জন্য তিনি 'নিখিল নাস্তির মৌনে সোহংবাদ ধ্বনিত' করেছেন। তিনি স্বীয় চৈতন্যের মর্মমূলে প্রবেশ করেছেন ব্যক্তিস্বরূপের অন্বেষায়। একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ঈশ্বর-সংক্রান্ত ভাবনায় সুধীন্দ্রনাথের যে জিজ্ঞাসা, অবিশ্বাস, যন্ত্রণা ও দাহ তাতে তাঁর নিরীশ্বর জড়বাদী মনোভাব প্রকাশ করে। এক্ষেত্রে নিরীশ্বর বৌদ্ধদর্শন দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন।
বৌদ্ধদর্শনের শূন্যবাদ ছাড়াও ক্ষণবাদী চেতনা সুধীন্দ্রনাথের কবিতায় নৈরাশ্য রূপায়ণে বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছিল। ক্ষণবাদী দর্শনকে তিনি গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন বলেই লিখতে পেরেছিলেন: 'ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর যথাশক্তি অনুশীলনের ফলে আজ আমি যে দার্শনিক মতে উপনীত, তা যখন প্রাচীন ক্ষণবাদেরই সামপ্রতিক সংস্করণ, তখন না মেনে উপায় নেই যে আমার রচনামাত্রেই অতিশয় অস্থায়ী। এই ক্ষণবাদী কবি দ্ব্যর্থহীনভাবে উচ্চারণ করেছেন : 'আমি ক্ষণবাদী : অর্থাৎ আমার মতে হয়ে যায় / নিমেষে তামাদী আমাদের ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ, তথা /তাতে যার জের, সে-সংসারও। '
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রেম ভাবনায় এসেছে নৈরাশ্যের ছাপ। তাঁর হৃদয় নিরাশা ও নেতিবাচক ভাবনায় ভরপুর। পুঁজিবাদী সমাজের একজন পোড়খাওয়া মানুষ বলে তাঁর হৃদয় থেকে প্রেম অপসৃত। বিরহ, শূন্যতা, হতাশা, বিলাপ, দীর্ঘশ্বাস এবং শেষ পর্যন্ত একাকিত্বের দুর্বিষহ যন্ত্রণা সুধীন্দ্রনাথের প্রেমভাবনায় স্থান পেয়েছে। তাঁর কবিতায় 'এক বন্ধ্যা নায়কের হাহাকার শোনা যায়। ফলে 'ঘৃণা, ক্লান্তি, অবিশ্বাসের প্রাবল্যে কবি সমস্ত আদর্শবাদ, শাশ্বত প্রেমকে নিয়ে উপহাস বিদ্রূপ করেন।' তার প্রেমের কবিতায় নায়ক যৌবন অতিক্রম করে বার্ধক্যে উপনীত। এই যৌবনগত নায়ক বন্ধ্যাত্ব এবং অক্ষমতা নিয়ে নষ্ট-ভ্রষ্ট সভ্যতার নায়িকার প্রেমকে অবলোকন করে মর্মযাতনা পায়। তাঁর প্রেমচৈতন্যে বিষণ্নতা, নিঃসঙ্গতা এবং নির্বেদ শূন্যতা ছাড়া কিছু নেই। 'এ শূন্যতা আগুনের মতো জ্বালাময় স্বপ্নহীন বিক্ষুব্ধ অশান্ত শূন্যতা।' বৌদ্ধদর্শনের নাস্তিবাদী শূন্যতা থেকে সুধীন্দ্রনাথের প্রেমভাবনায় রিক্ততা ও বিচ্ছিন্নতার সংক্রাম ঘটেছে। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে প্রেম মানুষকে আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। কিন্তু যুগের পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে নৈতিক মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে প্রেমে ফাটল ধরেছে। প্রেমের সি্নগ্ধ রূপ হারিয়ে দৈহিক কামনার দিকে মানুষ ধাবিত হয়েছে। পুঁজিশাসিত বিশ্বে মানুষের আবেগ-অনুভূতি ক্রমে ক্ষণকায় হওয়ায় তার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে প্রেমহীনতা। 'প্রেমিক- প্রেমিকার পারস্পরিক ভালোবাসা এ যুগের অদৃশ্য দৈত্য নিয়েছে হরণ করে। ' প্রেম-ভালোবাসার বন্ধন শিথিল হওয়ায় পুঁজিবাদী যুগের মানুষ নিঃসঙ্গতার জ্বালা ভোগ করেছে। সুধীন্দ্রনাথ জেনেছেন ধনতান্ত্রিক 'যুগে প্রেমে নিষ্ঠা, তপস্যা, স্মরণ, অঙ্গীকার সবই মিথ্যা।' সেখানে তিনি নেতি ছাড়া কিছুই পান না। প্রেয়সীর আবির্ভাব তাঁর হৃদয়ে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আসে : 'তোমার উদীর্ণ আবির্ভাবে / মোর শূন্য পরিপূর্ণ হয় নাই কভু;/অবলুপ্ত অতল অভাবে/তোমার অজস্র দান/ বরঞ্চ গিয়েছে রেখে নেতির প্রমাণ।/ সুধীন্দ্রনাথ শাশ্বত প্রেম কল্পনা করতে পারেননি। ভালেরির মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন মানুষের পক্ষে পরস্পরকে ভালোবাসা অসম্ভব। প্রিয়ার নিবিড় সানি্নধ্যে তিনি পূর্ণতা পাননি। বিগত যৌবন নায়ক এবং মধুরিক্তা নায়িকার কল্পনা করে তিনি তাদের মধ্যে শাশ্বত প্রেমের সন্ধান পাননি্ত দেখেছেন কেবল ক্ষণবিলাস। শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুর নৈরাশ্যে উচ্চারণ করেছেন: 'হে মোর ক্ষণিকা,/তোমার অরূপ স্মৃতি, সে নহে শাশ্বত।' আরো বলেছেন :' অসম্ভব, প্রিয়তমে, অসম্ভব শাশ্বত স্মরণ;/ অসঙ্গত চিরপ্রেম; সংবরণ অসাধ্য, অন্যায়;' সুধীন্দ্রনাথের প্রেমচেতনায় সুগভীর বিষাদ পরিদৃশ্যমান। বস্তুত, প্রেমের বঞ্চনা-মূর্তি তাঁকে নৈরাশ্য ভারাতুর করেছে। প্রেমের আধার তাঁর কাছে নিত্য সৃষ্টির সুষমা না হয়ে হয়েছে যৌবনের ভ্রান্তি :'নাস্তিক বুদ্ধির বশে কোনও দিনও যেন নাহি মানি, /হে অস্ত রতমা,/তুমি ভ্রান্তি যৌবনের, নও নিত্য সৃষ্টির সুষমা \\' বিচ্ছেদ-যন্ত্রণা ও বিরহের হাহাকার সুধীন্দ্রনাথের কবিতায় প্রবল। তাঁর প্রেমভাবনা বারংবার অতীতমুখী হয়েছে। হারানো প্রেমের দাহ তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। বিরহের জ্বালা তাঁর হৃদয়ে মরণ-যন্ত্রণা জাগিয়ে তুলেছে বলেই তিনি লিখেছেন: 'অভাবে তোমার/অসহ্য অধুনা মোর, ভবিষ্যৎ বন্ধ অন্ধকার,/ কাম্য শুধু স্থবির মরণ।' আশাহত কবি বিরহে কাতর এবং বিষাদমগ্ন হয়ে বলেছেন : 'কী যেন হারায়ে গেছে জীবন হতে/কী যে তা বুঝিবে কে বা কেমন মতে।/ শুধু জানি এই টুকু/ কী এক বিপুল দুখ/ ভ'রে গেছে সারা বুক গোপন ক্ষতে। / কী যেন হারায়ে গেছে জীবন হ'তে।' তাঁর প্রেমের কবিতার নামকরণে যেমন নেতিবাদী ভাবনা কাজ করেছে তেমনি কবিতার বিষয়বস্তুতেও নৈরাশ্যবাদী ভাবনা প্রবলভাবে উপস্থিত হয়েছে। 'পলাতকা' 'মৃতপ্রেম' 'ভ্রষ্টলগ্ন' নামাগুলো ইতিবাচক কোন ইঙ্গিত দেয় না। এসব কবিতায় অতৃপ্ত প্রেম কল্পনা ও ব্যর্থতার বেদনা চূড়ান্ত হতাশায় অভিব্যক্তি লাভ করেছে। এজন্য 'সকলি আজ লুপ্ত মোদের চিত্তদেশে/প্রেমের চিতাভস্ম শেষে' ৫৮ বলে কবি হাহাকার করতে পারেন। তাঁর মানসী স্বপ্নেই বিরাজ করেছে, বাস্তবে কেবল বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের যন্ত্রণা দিয়েছে। কবির ভাষ্য : ' মানসীর দিব্য আবির্ভাব, সে শুধু সম্ভব স্বপ্নে, জাগরণে আমরা একাকী; /তাহার বিখ্যাত রাখি, / সে নহে মঙ্গলসূত্র কেবল কুটিল নাগপাশ; /মলময় তাহার উচ্ছ্বাস /বোনে শুধু উর্ণাজালে অসতর্ক মক্ষিকার পথে। ' প্রিয়ার অদর্শনে তিনি নরকযাতনা ভোগ করেছেন; ফলে আর্তনাদ করে জানিয়েছেন: 'পাপ ও আশিস, সুধা আর বিষ/একত্রে বিধি বিতরে মোরে।' প্রেয়সীর সঙ্গে মিলনেও সুখ নেই, কারণ তার ভেতরে বাসা বেঁধেছে রিক্ততা ও ক্লেদ। স্বপ্ন ভঙ্গের হাহাকার আর সুগভীর বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত কবির উক্তি: 'মন্থর কালের স্রোতে সতূপীকৃত হয় সর্বনাশ; /মোদের বিচ্ছিন্ন করে মৃত্যুপম ব্যবধী দুস্তর \\/অপ্রাপনীয় প্রেমের দাহে সুধীন্দ্রনাথের কবিচিত্তে দেখা দিয়েছে নৈঃসঙ্গ্য ও শূন্যতাবোধের আর্তি, আত্মধিক্কার ও অনুতাপ, বিতৃষ্ণা ও নির্বেদ। নিরুদ্বেগ প্রেমিকার পাশে উপবিষ্ট কবি অনুভব করেন বিশ্ব চরাচর অরাজক ও উচ্ছৃঙ্খল এবং তিনি একা। এই একাকিত্ব চারিয়ে যায় তাঁর সমগ্র অস্তিত্বে; পরম রিক্ততায় তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় : 'চারিপাশে মোর মরু করে ধূজ্জধূ ; /আমি অবলোকি তার করপুটে /দমহীন মালাখানি।' ক্ষণিক প্রেমের স্তবগানে তিনি যেমন বলেছেন: 'মোদের ক্ষণিক প্রেম স্থান পাবে ক্ষণিকের গানে';৬৪ তেমনি শূন্যতায় মিলে যাওয়া নিরুপম আননের স্মৃতি স্মরণ করে লিখেছেন : 'শুধু নিরুপম /এখন আননখানি সীমাশূন্য শূন্যে যে লুকালে \\/ তাই আজি তব স্মৃতি, মগ্নতরী জঞ্জালের মতো, সহে না আশার ভার, করে, হায়, বিদ্রূপে বিব্রত\\ /সুধীন্দ্রনাথের নঞ্র্থক জীবনবোধ, বিষণ্নতা, সংহত প্রকরণ সবই প্রেমের রূপকে ৬৬ ফোটাতে সহায়তা করেছে। বিচ্ছেদে পূর্ণতার কোন ইঙ্গিত তিনি পাননি এমনকি মিলনেও; পেয়েছেন কেবল সর্বব্যাপী রিক্ততা ও যন্ত্রণার হাহাকার। শাশ্বত প্রেম অকল্পনীয়, প্রেমের ক্ষণবিলাসই মুখ্য বলে তাঁর বোধ কেবল নিঃসঙ্গতায় হাহাকার করেছে। প্রেমসূত্রে জাত নৈঃসঙ্গ্যবোধ সুধীন্দ্র হৃদয়ে উত্তরোত্তর পুষ্টিলাভ করেছে; শুধু নৈঃসঙ্গ্য নয় সুধীন্দ্রনাথ মুখোমুখি হয়েছেন শূন্যতা, নৈরাশ্য ও ভবিতব্যের।'
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় নৈরাশ্য রূপায়ণে ইউরোপীয় সাহিত্য ও দর্শনের প্রভাব বিদ্যমান। শিল্পবিপ্লবের উন্মাদনায় পুঁজি নিয়ে ইউরোপ যতই বিংশ শতাব্দীর দিকে এগোচ্ছিল ততই তার কৃষ্টি সভ্যতা জীবনদর্শন ধর্মীয় চেতনা প্রভৃতি সম্পর্কিত প্রাচীন মূল্যবোধের নমনীয়তায় চরম টান পড়ছিল। যুদ্ধের তা-বলীলায় ইউরোপের প্রাচীন মূল্যবোধে ফাটল ধরল। ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি কেঁপে উঠল, জীবনের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা বদলে গেল। ফলস্বরূপ, সচেতন মানবচিত্তে এক অনিবার্য শূন্যতার সৃষ্টি হলো। সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে যুদ্ধপরবর্তী যুগ-জটিলতায় ইউরোপের কবি-সাহিত্যিকগণ বেদনা-ভারাক্রান্ত হয়ে বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত হলেন। নৈরাশ্যদীর্ণ কবিসত্তার বাণীরূপ তাঁরা সাহিত্যে প্রকাশ করলেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত গভীরভাবে ইউরোপীয় সাহিত্য আত্মস্থ করে নৈরাশ্যের পঙ্কে নিমজ্জিত হলেন। মালার্মে, হাইনরিখ হাইনে, টিএস এলিয়ট প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকের জীবনবোধ ও সাহিত্যচেতনা তাঁকে নৈরাশ্যবাদী করেছে। এছাড়া ইউরোপের অস্তিত্ববাদী দার্শনিক নীট্শে' আলবের কাম্যু, হাইডেগার, সার্ত্রের ধ্যান-ধারণা কবির নাস্তিক্যবাদী চিন্তা- চেতনাকে সৃদৃঢ় করে তাঁর মধ্যে নিরালম্ব মনোভাব জাগিয়ে তুলল। সুধীন্দ্রনাথ টিএস এলিয়টের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর অবক্ষয়, নৈরাশ্য, মূল্যবোধের সঙ্কট, প্রেমহীন, ধর্মহীন, নিরাপত্তাহীন অস্তিত্বের মর্মযাতনা এলিয়টের কাব্য কবিতায় বিপন্নতা ও নাস্তির যে ছায়াপাত ঘটিয়েছিল সুধীন্দ্রনাথের কাব্যেও তা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এলিয়টের 'দি ওয়েস্ট ল্যান্ড' কাব্যে নৈরাশ্য-হতাশা এবং বিচ্ছিন্নতার যে ছবি অঙ্কিত হয়েছে, তা সুধীন্দ্রনাথের কবিভাবনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। কুন্তল চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন : 'ওয়েস্টল্যান্ড কাব্যে রূপকের অন্তরালে শতাব্দীর অবক্ষয়ী ও বিপর্যস্ত রূপের যে চেহারাটি এলিয়ট চিত্রিত করেছিলেন, বন্ধ্যাত্ব, মরুময়তা, শূন্যতা, নাগরিক জীবনের নৈরাশ্য ও বেদনার যে আর্তি তাতে অভিব্যক্ত হয়েছিল, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় সেই এলিয়টের মন ও মননের রূপ নানাভাবে জড়িয়ে আছে। বস্তুতপক্ষে, সুধীন্দ্রনাথের রচনায় যে মরু-ধূসরতা, হতাশা ও নাস্তির বলয়গ্রাস আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় তাতে এলিয়টের ওয়েস্টল্যান্ডের বন্ধ্যাভূমির রিক্ততা বিশেষ আভাস বিস্তার করেছে বলে মনে হয়েছে।' যুদ্ধপরবর্তী ইউরোপের বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উদ্ভূত এলিয়টের পোড়োজমির ভাবনা সুধীন্দ্রনাথের কবিতায় রূপায়িত হয়েছে। উটপাখি' কবিতায় তিনি যে নেতিবাচক মরুভূমির বন্ধ্যাত্ব, শূন্যতার ও বিচ্ছিন্নতার চিত্রকল্প এঁকেছিলেন, তাতে এলিয়টের ভাবধর্মের ছাপ পড়েছে। এলিয়ট লিখেছেন : ' ডযধঃ ধৎব ঃযব ৎড়ড়ঃং ঃযধঃ পষঁঃপয, যিধঃ নৎধহপযবং মৎড় ি/ঙঁঃ ড়ভ ঃযরং ংঃড়হু ৎঁননরংয? ঝড়হ ড়ভ সধহ, /ণড়ঁ পধহহড়ঃ ংধু, ড়ৎ মঁবংং, ভড়ৎ ুড়ঁ শহড় িড়হষু /অ যবধঢ় ড়ভ নৎড়শবহ রসধমবং, যিবৎব ঃযব ংঁহ নবধঃং, / অহফ ঃযব ফবধফ ঃৎবব মরাবং হড় ংযবষঃবৎ, ঃযব পৎরপশবঃং হড় ৎবষরবভ / অহফ ঃযব ফৎু ংঃড়হব হড় ংড়ঁহফ ড়ভ ধিঃবৎ. সুধীন্দ্রনাথের ভাষ্য : ' কোথায় লুকাবে? ধূ ধূ করে মরুভূমি ; / ক্ষ'য়ে ক্ষ'য়ে ছায়া মরে গেছে পদতলে।/আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই ; / নির্বাক, নীল, নির্মম, মহাকাশ। '
এলিয়ট ্তুফবধফ ষধহফ্থ, ্তুঈধপঃঁং ষধহফ্থ শব্দ ব্যবহার করে যুগের বন্ধ্যা ও রিক্ত অবস্থার বর্ণনা করেছেন। এর প্রভাবে সুধীন্দ্রনাথ 'শূন্য মরুভূমি', বন্ধ্যা ফণিমনসা', 'দূরত্যয় মরুভূমি', 'উপহাস্য মরুছায়া' প্রভৃতি প্রসঙ্গ উল্লেখ করে স্বীয়
নৈরাশ্যকে প্রকাশ করেছেন। প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর ইউরোপের বিধ্বস্ত রূপ দেখে এলিয়ট পোড়োজমির রূপকটি ব্যবহার করেছিলেন। এলিয়টের 'দি ওয়েস্ট ল্যান্ড' কিংবা 'প্রুফক' কবিতায় নৈঃসঙ্গ্যতার যে চিত্র রূপায়িত হয়েছে, তা কবি সুধীন্দ্রনাথকে পীড়িত করেছিল। মর্মাহত সত্তা থেকে তাঁর কাব্যে এসেছিল নৈরাশ্যবোধ। এজন্য লিখেছিলেন: 'ভিড়ের সংসর্গ মোরে করে সদা নৈঃসঙ্গ্যবিব্রত'। তাঁর 'উটপাখী', 'যযাতি', 'সংবর্ত', এবং 'প্রতীক্ষা' কবিতাতেও এলিয়টের প্রভাব আছে। 'প্রতীক্ষা' কবিতায় যে আর্তনাদ তাতে এলিয়টীয় বক্তব্যেরই অনুরণন : ' / বনের বাহিরে ক্ষওয়া মাটি ধূ ধূ করে ; /নেই ফসলের দুরাশাও অম্বরে ; / যা ছিল বলার, কবে হয়ে গেছে বলা সে \\
সুধীন্দ্রনাথের কবিমানসে সবচেয়ে বেশি রেখাপাত করেছে ফরাসি কবি স্টেফান মালার্মের প্রভাব। তিনি বলেছেন: 'মালার্মে প্রবর্তিত কাব্যাদর্শই আমার অন্বিষ্ট'। মালার্মের অনিকেত মনোভাব এবং নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সুধীন্দ্রনাথকে বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণায় জর্জরিত করেছিল। শুধু তাই নয়, কবিতার ভাবদ্যোতনা, শব্দচয়ন এবং চিত্রকল্প নির্মাণে সুধীন্দ্রনাথ যে বিচ্ছিন্নতাবোধের প্রকাশ ঘটিয়েছেন মালার্মের কবিতার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান। দীপ্তি ত্রিপাঠী জানাচ্ছেন : 'মালার্র্মের নেতিবাদী জীবনদর্শনও সুধীন্দ্রনাথের কাব্যকে প্রভাবিত করেছে। মালার্মের কবিতায় যেমন বারংবার গোরস্থান, কবর, মৃত্যু, ভাঙা জাহাজ, অবসাদ, নিখিল নাস্তি কথাগুলোর প্রয়োগ দেখা যায় এবং তারা সড়ৎনরফরঃু বা বিষাদ তিক্ততা বহন করে, সুধীন্দ্রনাথেও তেমনি দেখা যায় 'মরুভূমি,' 'নরক', 'শব', 'প্রাবরণী' (ঝযৎড়ঁফ) 'পিশাচ', 'শটিত' প্রভৃতি শব্দগুলির প্রয়োগ। মালার্মে যেমন 'বহহঁর' কথাটির একাধিকবার প্রয়োগে জীবন সম্বন্ধে অবসাদ, ক্লান্তি, আত্মগ্লানি ও বিরক্তির ভাব একসঙ্গে দ্যোতিত করেছেন কিংবা 'হবধহঃ' কথাটির মধ্যে দিয়েছেন নাস্তির ইঙ্গিত, সুধীন্দ্রনাথও তেমনি 'নির্বেদ', 'বিবিক্তি'জ্জ এই শব্দগুলির মধ্যে ঐ একই মনোভাব ব্যঞ্জিত করতে চেয়েছেন।' মালার্মে বিশ্বজগৎ শূন্য হিসেবেই দেখেছিলেন: তাঁর কল্পনায় ও কাব্যতত্ত্বে সবকিছু শেষ পর্যন্ত এই শূন্য হয়ে যায় অথবা এই শূন্যতায় এসে মিলে যায়। সুধীন্দ্রনাথের কবিতায়ও স্বপ্ন-রাত্রি-অন্ধকার-আত্মরতি- নেতি-শূন্যতা, শুক্রের শুদ্ধতা সবকিছুর সমবায়ে শেষ পর্যন্ত এক ভীষণ সুন্দর পৃথিবীর নির্মাণ হয় যা মালার্মের পৃথিবীর সঙ্গে তুলনীয়। যে নেতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কবিভাবনায় নৈরাশ্যের বিস্তার ঘটিয়েছে, তার মূলচেতনা এসেছে মালার্মের কবিতা থেকে। মালার্মের প্রভাবে তিনি লিখেছেন: 'নৌজীবী অগত্যা পান্থ; অনন্য সম্বল/মজ্জমান সাধের তরণী /উত্তরঙ্গ জলোচ্ছ্বাস তাই তার সমগ্র ধরণী / উদ্বৃত্ত মঙ্গল\\'
মালার্মের কবিতায় ব্যবহৃত ্তুরিঃযড়ঁঃ সধংঃ,্থ ্তুরহারঃরহম ঃবসঢ়বংঃ্থ, ্তুংযরঢ়ৎিবপশ্থ আর সুধীন্দ্রনাথের কবিতার 'মজ্জমান সাধের তরণী','উত্তরঙ্গ জলোচ্ছ্বাস' প্রভৃতির উল্লেখ নেতিবাচক ভাবকে সুস্পষ্ট করে। মালার্মের 'কুসুম' (খবং ঋবঁৎ)ি কবিতায় বৎসরের তুষারপাতের সঙ্গে যুক্ত বিচ্ছিন্ন যে কবি-আত্মার শূন্যতাবোধ-বেদনাবোধ আছে, সুধীনদত্তের 'কুক্কুট' কবিতাটিতেও একই আরতি আছে। বলা যায় মালার্মে ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত উভয়েই জীবনের বেদীমূলে বিষাদ ও নিষ্ক্রিয়ের পুঞ্জীভূত অঞ্জলি প্রদান করেছেন। বস্তুত, মালার্মের কবিতার প্রভাব সুধীন্দ্রনাথের জীবনে নেতিবাদী ভাবনা জাগ্রত করেছিল। হাইনরিখ হাইনে, ভালেরি, প্রুস্তের কবিতাও সুধীন্দ্রনাথের চেতনাজগতে নৈরাশ্য রূপায়ণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এসব কবি ফ্যাসিবাদী শক্তির হিংস্রতা ও নাৎসীবাদের বর্বরতা এবং বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা দেখে জীবনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে ফেলেছিলেন। হাইনে দেখেছিলেন পৃথিবীতে জীবনের সদর্থক (বিষঃ) কিছু নেই, সুধীন্দ্রনাথও দেখেছেন: 'বিশ্বজগৎ হিম কুয়াশায় ঢাকা'। নৈরাশ্যভাবনা সুধীন্দ্রনাথ কতকটা পেয়েছিলেন ভালেরির কাব্য পাঠ করে। ভালেরির 'চষধস' কবিতায় রিক্ততা, বিচ্ছিন্নতা প্রকটিত হয়েছে মরুভূমির চিত্রকল্পে। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর 'উটপাখী' কবিতায় জীবনে একইভাবে বন্ধ্যা মরুভূমির শূন্যতা প্রত্যক্ষ করে নৈরাশ্যের ভয়াবহ রূপ নির্মাণ করেছেন : ' / কোথায় লুকারে? ধূ ধূ করে মরুভূমি, /ক্ষ'য়ে ক্ষ'য়ে ছায়া মরে গেছে পদতলে।/আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই; / নির্বাক, নীল, নির্মম মহাকাশ। /মালার্মের অনুগামী প্রুস্তের প্রভাব সুূধীন্দ্রনাথ দত্তের নৈরাজ্যবাদী কবিমানসে নৈরাশ্য ছায়াপাত ঘটিয়েছে। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের চেতনার মূলে আত্মার আসল অস্তিত্বকে অস্বীকার করার যে প্রবণতা তা প্রুস্তের ধ্যান-ধারণা থেকেই প্রাপ্ত। বিরূপ বিশ্বের নিঃসঙ্গ পথিক সুধীন্দ্রনাথ মানব-সংসারের সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে হয়ে প্রুস্তের মতোই গ্লানি ছাড়া আর কিছু পাননি। এ প্রসঙ্গে সুকুমার সেনের উক্তি প্রণিধানযোগ্য : '/সুধীনবাবুও প্রুস্তের মতো জীবনে ফুটোফাটা জোড়াতালি (দৈন্য-দারিদ্র্য, পীড়া- বেদনা, পাপ-অপরাধ, ধ্বংস-বিস্মৃতি)-বিদীর্ণ বিচ্ছিন্ন করিয়া মহাকালে পৌঁছাইয়া জীবনের তাৎপর্য খুঁজিয়াছেন এবং ফলে পাইয়াছেন প্রধানত আত্মগ্লানী। '
ইউরোপীয় কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি ইউরোপীয় দার্শনিকদের বিভিন্ন তত্ত্ব-মতবাদের প্রভাব সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে নৈরাশ্যের রূপ নির্মাণে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে নীটসে, আলবের কাম্যু, হাইডেগার এবং সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দর্শন তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল এবং ক্রমে নিঃসঙ্গতার পথে ধাবিত করেছিল। অস্তিত্ববাদী মানুষের জীবন এক নিখিল নাস্তির দেয়ালে আঘাত খেয়ে ফিরে আসে, ফলে তাঁর অন্তর্লোকে উপ্ত হয় নৈরাশ্যের ভ্রূণকোষ। অস্তিত্ববাদী সার্ত্র অদৃষ্টবাদে আস্থাশীল নন, এমনকি স্বপ্নময় আদর্শবাদেও। এহাড়া ভগবান কিংবা শাশ্বত মূল্যবোধের মূল্য নেই সার্ত্রের কাছে। মানুষই চরম সত্য এবং সত্য মানুষের দায়িত্বজ্ঞান। দায়িত্বজ্ঞান থেকেই মানবচিত্তে জন্মে বিষণ্নতা আর তিক্ততা। শেষপর্যন্ত মানুষ উপনিত হয় নঞ্র্থক জীবন ভাবনায়। অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল্যচেতনা সুধীন্দ্রনাথকে নৈঃসঙ্গ্যপীড়িত করেছে। তাঁর কাছে পাপ-পূণ্য, ভালো মন্দ সবকিছু তুল্যমূল্যজ্জবিশুদ্ধ চৈতন্যকেই তিনি একমাত্র সত্য জ্ঞান করেছেন। বিশুদ্ধ চৈতন্যের সন্ধানে গিয়েই তিনি উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। অস্তিত্ব-বাদী দর্শনের আতঙ্ক, উদ্বেগ, মনস্তাপ, ব্যর্থতা, একাকিত্ব, আত্মপ্রকাশ, প্রেম-ভালোবাসা, হিংসা-ভয়, ঘৃণা, লজ্জা, অর্থহীনতা, অসঙ্গতি, বিচ্ছিন্নতা-বিচ্যুতি, মৃত্যুভাবনা প্রভৃতি সুধীন্দ্রনাথের কাব্যে নানামাত্রিক ভাব-ভাবনার আলোকে রূপলাভ করেছে। এ প্রসঙ্গে সঞ্জীব ঘোষের মন্তব্য : 'তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু জীবনের মৌল সত্যজ্জপ্রেম, কাল, ঈশ্বরের অনুসন্ধান, অক্ষমতা, মনস্তাপ, হাহাকার, নৈরাশ্য, সসীমতা, নিঃসঙ্গতা প্রভৃতি। অস্তিত্ববাদেও এগুলিকেই জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ বলে গণ্য করা হয়েছে এবং এগুলিকে বাদ দিয়ে যে যথার্থ জীবনের ছবি অাঁকা যায় না তা স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে। সেদিক থেকে অস্তিত্ববাদীদের সঙ্গে সুধীন্দ্রনাথের আশ্চর্য রকমের মিল আমরা লক্ষ করি।'
জৈবনিক অর্থহীনতা ও সভ্যতার কপটাচার সুধীন্দ্রনাথের 'নিখিল নাস্তি' চেতনা বা সর্বব্যাপ্ত শূন্যতাবোধের জন্য দায়ী। বিজ্ঞান-দর্শনজাত ক্ষণকালীন নৈরাশ্যনুভব তাঁর মতো আর কোন কবির কবিতায় পরিলক্ষিত হয় না। সকল ঐশ্বরিক প্রত্যয়ে তাঁর অনাস্থা, সকল রকম মূঢ় প্রত্যয় তাঁর কাছে শূন্যতাগর্ভ। জীবনের সকল রকম সদর্থক ভাবনা মানুষের অলীক স্বপ্ন আর কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। সর্বত্র কেবল শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতার ভয়াবহ আরতি। কবির হৃদয় থেকে শান্তির কপোত উড়ে গেছে, সেখানে বাসা বেঁধেছে নির্বাক নিঃসঙ্গতা : ' মোর মনে / হয়তো বা শান্তি নেই তাই। / তাই বুঝি বোধ হয় নিতান্ত বৃথাই / অন্ধকার বন্ধ ঘরে শ্বাস টেনে বাঁচা কোনও মতে;/ উন্মার্গ হয়েছে নদী, বর্জিত এ-শ্মশানসৈকতে/ নির্বিকার ঊষরতা শুধু; / যতদূর দৃষ্টি যায় করে ধূ-ধূ / ভ্রাম্যমাণ পিঞ্জরের দুর্লঙ্ঘ্য প্রসার /নিঃসঙ্গ, নির্বাক, নিরাকার।' সুধীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকেও দেখেছেন নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টি দিয়ে। প্রকৃতির দিকে চেয়ে তিনি সদর্থক রূপ দেখতে পান নি। তাঁর মনে হয়েছে: 'গ্রহ, তারা, নীহারিকা ধায় নিত্য বিয়োগের পথে।' স্তব্ধ, রিক্ত, শূন্য প্রকৃতিই তার মানসপটে ভেসে ওঠে : 'হেমন্তের বেলা প'ড়ে আসে: /ক্ষেতে ক্ষেতে ধান কাটা হয়ে গেছে সারা, /খামারে খামারে সোনা, ভারা ভারা খর আশে, পাশে; /স্তব্ধ ঘাট, রিক্ত বাট; একমাত্র তারা/অনুমিত পা-ুর আকাশে\\
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যবিষয়ে যেমন নৈরাশ্য প্রকটিত হয়েছে, তেমনি নৈরাশ্যের রূপায়ণ ঘটেছে তাঁর কাব্যের প্রকরণশৈলীতে। তাঁর কাব্য-কবিতার নামকরণ থেকে শুরু করে ভাষা নির্মাণ, শব্দচয়ন্ত এমনকি অলঙ্কার সনি্নবেশেও নৈরাশ্যের প্রকাশ স্পষ্ট। তাঁর কাব্যের 'ক্রন্দসী' নামের মধ্যে নৈরাশ্যের সুর প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি কবিতার নামকরণ করেছেন 'অপচয়', 'প্রুশ্রম', 'বিকলতা,' 'প্রলাপ,' 'উদ্ভ্রান্তি,' 'দৈন্য,' 'ধিক্কার,' 'সর্বনাশ,' 'প্রত্যাখ্যান,' 'নরক,' 'মৃত্যু,' 'সংশয়,' 'দুঃসময়,' 'বিপ্রলাপ,' 'উন্মার্গ,' 'লগ্নহারা,' 'অনিকেত,' 'ভ্রষ্টতরী,' 'নষ্টনীড়,' 'মৃত প্রেম,' 'ভ্রষ্ট লগ্ন', 'চ্যুতকুসুম', প্রভৃতি। নৈরাশ্য, নাস্তি, নেতি, শূন্যতা, নিঃসঙ্গতা এবং বিচ্ছিন্নতার আবহ এসব কবিতার নামের মধ্যে উঠে এসেছে। কবির শব্দচয়নের ক্ষেত্রেও বিবিক্তি-বিযুক্তি-বিচ্ছিন্নতা এবং নিঃসঙ্গতার প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। রিক্ত মাঠ, মস্নান চেতনা, মদমত্ত সর্বনাশ, শূন্যগর্ভ বহ্নি, বন্ধ্য স্পর্শে, নিঃস্ব জগতে, মুমূর্ষার প্ররোচনা, প্রেতসঞ্চরিত ধ্বংস, অস্থির মরীচিকা, অন্তিম আশ্লেষে, বুভুক্ষু দেহ, পরিত্যক্ত স্থানটুকু, শূন্য চক্রবালে, নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায়, ঊষর সঙ্গমে, সীমাশূন্য শূন্যতার, বিচ্ছেদের রাতি, উপহাস্য মরুমায়া, নৈরাশ্যের পারে, অনন্ত বিয়োগে, বিরহসংপ্ত শূন্যতা, নিরলস শূন্যে, অসহ্য অধুনা, বিচ্ছেদবিধুর লগ্নে, পথশূন্য বনের নির্জনে, অতল শূন্যের নিঃসঙ্গ অাঁধারে, ধূ ধূ মরুভূমি, নিখিল নাস্তি, দহনক্লান্ত দুপুর্ত এ জাতীয় অসংখ্য শব্দের ব্যবহার সুধীন্দ্রনাথের কবিমানসে বিচ্ছিন্নতার প্রকাশকে সুস্পষ্ট করে তোলে। অলংকার, চিত্রকল্প এবং প্রতীক ব্যবহারেও সুধীন্দ্রনাথের কবিতায় নিরাশার সুর শোনা যায়। অনুপ্রাস, উপমা, রূপক প্রতিটি অলঙ্কারই নৈরাশ্যের রূপকে মূর্ত করে।
সুধীন্দ্রনাথ নৈরাশ্যের যন্ত্রণায় কখনো কখনো মৃত্যুচিন্তা করেছেন। যন্ত্রণা-জর্জর কবি বলেছেন: 'মৃত্যু,কেবল মৃত্যুই ধ্রুব সখা,/ যাতনা শুধুই যাতনা সুচির সাথী\\ নিদারুণ মর্মবেদনা তাকে স্বস্তি দেয়নি। যান্ত্রিক সভ্যতার নির্মমতা, পাশবিকতা তাকে মানুষের প্রতি অনাস্থা এনে দিয়েছে। জনতার জঘন্য মিতালী তাঁর সহ্য হয়নি, প্রেমের মমতাময় বন্ধন তাঁকে টানতে পারেনি। তাই ব্রহ্মা-কে আচম্বিতে অমায় ডুবিয়ে দিতে চেয়েছেন এবং মরণের তরণীতে জীবনের পসরা তুলে দিয়ে বিচ্ছিন্নতার জ্বালায় মৃত্যু কামনা করেছেন : 'মরণ, তোমার উদ্দাম তরী / লেগেছে কি ফের ঘাটে? / শুনি কি তোমারই বিদেশী বাঁশরী / তেপান্তরের মাঠে? / আজ যদি তুমি এসে থাকো ঠিক, / তুলে দেব সবই তোমারে, বণিক; /প্রাণের পসরা ফেরি ক'রে আর /ফিরিব না ভাঙা হাটে।' সুধীন্দ্রনাথ নৈরাশ্যের যন্ত্রণায় মৃত্যু কামনা করলেও তাতে সমাধান খুঁজে পাননি। কারণ নিদ্রার মতো মৃত্যুকে স্বপ্নগর্ভ বলে মনে হয়েছে তাঁর। তাঁর প্রত্যয় জন্মেছে এ মৃত্যু যুগের বর্তমান কৃত্রিম ও যান্ত্রিক মানুষদের সংসর্গে পীড়িত এবং বেদনায় বিহ্বল, তাই মৃত্যু তাঁর কাছে নৈরাশ্য মুক্তির একমাত্র পথ নয়। তিনি নির্গুণ নির্বাণের মাধ্যমেই নৈরাশ্য থেকে মুক্তি পথ খোঁজেন : 'চাহি না মৃত্যুরে আমি ; স্বপ্নগর্ভ সেও নিদ্রাসম, / সখার সংসর্গে দুঃস্থ, আত্মীয়ের বিলাপে বিহ্বল। /হানো তীক্ষ্ন সর্বনাশ, তীব্র ক্ষতি, বৈরিতা নির্মম; /জুগুপ্সার শক্তি দাও, দাও মোরে নির্গুণ নির্বাণ\\' তিনি বৌদ্ধদর্শন দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। বৌদ্ধদর্শনে মোক্ষলাভের চূড়ান্ত উপায় নির্বাণ। কবি কামনা-বাসনারূপ দুঃখ মোচন করতে নির্বাণপ্রয়াসী হয়েছেন। নির্বাণ লাভের মাধ্যমেই তিনি নৈরাশ্য থেকে মুক্তি লাভ করতে চান। বৌদ্ধদর্শনের জন্মান্তরবাদে আস্থাশীল হয়ে উচ্চারণ করেছেন: ' নির্বাণ বুদ্ধির স্বপ্ন, মৃত্যুঞ্জয় জলন্ত হৃদয়; / হয়তো মানুষ মরে, কিন্তু তার বৃত্তি বেঁচে রয়, / জন্ম হতে জন্মান্তরে সংক্রমিত প্রত্ন মনোরথ\\ / বুদ্ধদেবের অনুসারীরা নির্বাণের মাধ্যমে শূন্যতা উপলব্ধির মাধ্যমে অস্তিত্বকে অনস্তিত্বের মধ্যে বিলোপ করে দেন। সুধীন্দ্রনাথ 'শোধবোধ শূন্যে অবসিত' করে নিজের অস্তিত্বের যাতনা তথা নৈরাশ্যের বেদনা থেকে মুক্তি লাভ করেন। নির্বাণে সংশয় থাকলেও তার মাধ্যমে সুধীন্দ্রনাথ নৈরাশ্যের জ্বালা নিবারণ করেছেন। নির্বাণে আস্থাশীল হয়ে তিনি নৈরাশ্য মুক্তির পথ পেয়েছেন।
কাজেই আমাদের বলতে দ্বিধা নেই, কাব্যের বিষয় এবং শিল্পের পরিসর সবক্ষেত্রেই সুধীন্দ্রনাথ দত্ত নৈরাশ্যের রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। প্রখর মেধা, পরিশীলিত মনন এবং বহুমাত্রিক চেতনার বিন্যাসে তাঁর কাব্যে বিচ্ছিন্নতা, শূন্যতা ও একাকিত্বের শিল্পরূপ নির্মিত হয়েছে। সিদ্দিকা মাহমুদা যথার্থই বলেছেন: 'ফ্রয়েড-বিদ্ধ, মার্কস-অনাগ্রহী, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনপুষ্ট সুধীন্দ্রনাথ মানসদিগন্তে নিরালম্ব, নিঃসঙ্গ, শূন্যমনস্ক এবং মুহূর্তচারী; গণতন্ত্র ও মানবতন্ত্রে শ্রদ্ধাপোষণ সত্ত্বেও বিচ্ছিন্ন এবং আত্মমুখী'। যুগের বৈরী পরিবেশ তাঁকে নৈরাশ্যবাদী ও অবিশ্বাসী করে তুলেছে। যুগ-সংঘাতে তিনি অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। অস্তিবাদ, ক্ষণবাদ, সোহংবাদ এসব দর্শন; এলিয়ট, মালার্মে প্রমুখের সাহিত্যরাজি; যুগের বিনষ্টি; বৌদ্ধদর্শন্ত সবকিছুই তাঁর নেতিবাদী মনে নৈরাশ্যের সংক্রমণ ঘটিয়েছে। ফলে কবিতার আভ্যন্তর এবং উপরিকাঠামোকে তিনি সাজিয়েছেন রিক্ততা এবং শূন্যতার প্রলেপনে। অবিনাশী নৈঃসঙ্গ্য ও বিচ্ছিন্নতায় কখনো মৃত্যুমুখী, আবার কখনো সংশয় সন্দেহ নিয়ে শূন্যবাদ তথা নির্বাণতত্ত্বে সমর্পিত। এভাবেই বিরূপ বিশ্বের একাকী পথিক কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের নিরাশাকরোজ্জ্বল কবিসত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ধূধূ মরুপ্রান্তরে তাকিয়ে ফণিমনসার প্রতীকে বন্ধ্যা যুগের নেতিবাচক ভাবকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। কোনও আশা নেই; নৈরাশ্যের কর্কটরোগ যেন তাঁর কবিচেতনায় সর্বত্র সংক্রমিত; ঈশ্বরেও বিশ্বাস নেই্ত সমস্ত সত্তা জুড়ে কেবল নাস্তি আর নাস্তি। ফলে নিরাশাকরোজ্জ্বল কবিসত্তা হিসেবে সুধীন্দ্রনাথ আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে ওঠেন।

মামুন রশীদ নব্বইয়ের দশকের কবি

0 comments
মামুন রশীদ নব্বইয়ের দশকের কবি। তিরিশের দশকের বাংলা কবিতাকে যে করে রাহুগ্রাসের মতই নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা গ্রাস করে নিয়েছিল আর যে কারণেই জীবনানন্দ দাশের আর্তনাদ, 'ছিঁড়ে গেছি_ ফেঁড়ে গেছি_ পৃথিবীর পথে পথে হেঁটে হেঁটে', সুধীন দত্তের বুকভাঙা আকুতি 'ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে' দেখে-শুনে আমরা নিজেরাও তলিয়ে ছিলাম অসীম নিঃসঙ্গতার পীড়নে। বাংলা কবিতার এই নৈরাশ্য ও নৈরাজ্য চলেছে পঞ্চাশের দশক অবধি। তারপরেই ষাটের দশকে কবিতা বিশেষত; বাংলাদেশের কবিতায় আসে প্রকট দেশ ও জাতি চেতনা এবং 'মৃত্তিকামুখী সমাজদৃষ্টি'। সত্তরের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলা কবিতাকে আরও বেশি দেশ ও জাতীয় প্রশ্নে পাটফর্মমুখী করে তুলেছিল। মাঝের আশির দশকের স্বৈরশাসনের পীড়নে বাংলা কবিতা ফের তিরিশের কবিদের একাংশের মতই মিথমুখী ছিল। তবে পার্থক্য ছিল_ তিরিশের কবিদের মত তারা আকণ্ঠ নিঃসঙ্গতায় ডুবে ছিলেন না_ উত্তরণের আশা ছিল ভিতরে। যার কারণেই নব্বইয়ের দশকের প্রশ্নবিদ্ধ গণতন্ত্র আসতেই বাংলা কবিতায় একঝাঁক তরুণ কবির আগমন ঘটে। যারা পূর্বসূরিদের অস্বীকার করেনি বরং তাদের অর্জন এবং নিজেদের নিরন্তর সাধনায় গড়ে তোলেন বাংলা কবিতার একটি নতুন চৌহদ্দি। এর অব্যহতি পরেই আরেকটি দশকের আগমন। এই দুইয়ের চৌহদ্দির মাঝের কবি মামুন রশীদ।
মামুন রশীদের মেধা, মনন ও আত্মজিঙ্গাসার শৈল্পিকরূপ 'কুশল তোমার বাঞ্জা করি (ফেব্রয়ারি ২০০৯)। কবির এটি দ্বিতীয় কাব্য। কাব্যের নামকরণেই কবির পুরোভাবনার ফ্লাশ রয়েছে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দাপুটে আগ্রাসনে, মানুষের বিকাশের সকল সম্ভাবনা বিজ্ঞানের কব্জায় চলে যাওয়ায় এখন মূলত অনুভূতিহীন জড়পদার্থ_ মায়ামমতা, প্রেম, বিশ্বাস হারিয়ে বিষময় নিঃসঙ্গতায় পতিত মানুষগুলো যেন এলিয়টের মতই দীর্ঘশ্বাস ফেলছে 'হড়ঃযরহম রিঃয হড়ঃযরহম্থ। সময়ের এই চরম সংকটে দাঁড়িয়ে, 'বিরূপ বিশ্বে নিয়ত একাকী' জেনেও কবি মামুন রশীদের আস্থা মানুষের প্রতিই_ মানুষের মঙ্গল, শুভ, কল্যাণ কামনা তাঁর বাঞ্জা। ইতিহাস ও সময়চেতনা মামুনের কবিতার প্রাণ_ সময়ের ভূগোল ঘুরে তিনি সব খুঁটিনাটি জেনেছেন_ জেনেছেন সাধারণের জীবন, দেখেছেন তাঁর দেশ, সবচেয়ে বড় করে তাকিয়েছেন যেন নিজের সত্তার দিকে_ কীভাবে সময়ের সংকটে আপাদমস্তক মুষড়ে পড়ছেন। মানুষের লড়াই করার শেষ শক্তিটুকুও যেন সময়ের প্রহারে ক্ষত-বিক্ষত হতে চলছে। তবু তিনি বাঁচবেন, হারবেন না যেন সময়ের ভয়ানক আগ্রাসনের কাছে_ কোনতেই তিনি হারাবেন না তাঁর পূর্বপুরুষের স্মৃতি, এবং বাস্তুভিটার আদিমগন্ধ। যে করণেই 'মুকুরে প্রতিফলিত মুখ কখনো সত্য বলে না' জেনেও কবি বলেন 'তবু আমরা আস্থা রাখি বারবারই মুকুরেই।' সময়ের প্রহারে রক্তাক্ত কবি জীবনানন্দের নাটোরে ফেরার মতই যেন মামুন রশীদও শেষে বগুড়া ফিরে আসেন শান্তির খোঁজে_

সকল ভ্রমণ শেষে বগুড়ায় ফিরে যেতে সাধ হয়।
অসংখ্য মানসীর ভিড়ে তুমি যেমন স্থির দাঁড়িয়ে থাকো
যেনো কোনো পোট্রেট! নিখুঁত পটুয়ার আঁকা। ডান ভ্রুর পাশে
কালের জন্ম-দাগ। ট্রেন ছেড়ে দেবার শেষ হাসি।
(সকল ভ্রমণ শেষে)

কবি মামুন রশীদ সময়ের কাছে দায়বদ্ধ কবি। মামুন রশীদই বা কেন, যে কোন সৃষ্টিশীল মানুষই সময়ের কাছে দায়বদ্ধ_ কেননা সে যে সময়ের-ই প্রতিভূ। তবে কালচক্রে কবির দায়বদ্ধতারও রকমফের ঘটে।
মামুন রশীদের স্বাতন্ত্র্যের জায়গা হল গতির জায়গাতে। গতির উপর কবি চরম আস্থাশীল। অস্বাভাকি গতিতে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন, চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ, চিন্তা-চেতনা। প্রযুক্তির সাথে জীবনের যোগ এতটা প্রকট হয়ে উঠেছে, গোটা বিশ্ব এখন নাকি 'গোবাল ভিলেজ'। মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের নাম করে মানুষকে ঠেলা হচ্ছে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে_ এই প্রতিযোগিতা মানুষ তাঁর নিজের সাথে, আত্মজা ও স্বজনের সাথে, চারপাশের মানুষের সাথে, বহির্বিশ্বের সকলের সাথে। জীবনের এই গতিই মামুন রশীদের কবিতার গতি। কবি নিজেও আর স্থির থাকতে পারছেন না, চাইলেও পারছেন না। সময় কবিকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না। অস্থিরতা, প্রাণান্ত ছুটে চলা মানুষের জন্যে নিয়তির মতই সত্য বলে কবি ভাবেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত মানুষ কতদূর আগায় কিংবা কতদূর আগাতে পারে? মামুন রশীদের কাছে নিজের দেহটাই যেন 'অজন্ম বোঝা'। তাঁর আক্ষেপ, 'যদি চলে যাওয়া যেতো দেহ ছেড়ে।' বেদনার সঙ্গে কবি অনুভব করেন, 'বহু পথ পেরিয়ে তৃষ্ণার মুখোমুখি মনে হয় নদী শুষে মরুভূমি করে গড়ি নিরাপদ বালুচর।' কবির এগিয়ে যাবার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা শেষপর্যন্ত করুণ শূন্যতায় পতিত হয়।

যতো দৌড়ে পালাতে চাইছি ততো বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন
মুদ্রায় ডাকিনীর তীব্র চিৎকার ঘিরে ফেলছে। পালাতে চাইছে প্রাণপণ।
পেছনে ফেলে যেতে চাইছি আমার দেখা যাবতীয় দৃশ্য। সীমাহীন
গতিতে শরীর থেকে বেরিয়ে নিখিল ব্রহ্মা-ের দিকে প্রসারিত করে দিতে
চাইছি হাত। অথচ কে যেনো বার বার আমার হাত ভূতের পায়ের মতো
পেছনে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।
(তোমার কীর্তনে কৃতার্থ দোহার)

বাস্তব সরে সরে গেলে কবি কিন্তু হতাশ হন নি বরং ফিরে গেছেন জীবনের ভিন্ন মাত্রায়-সেখানেও বালুচরে বাধা পড়ে গেলে ফের নতুন শুরু করেন যাত্রা।
কবিতায় শব্দ ব্যবহারে কবি মামুন রশীদ এতটাই কৌশলী এবং এতটাই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, নিছক প্রশংসা করলে যথেষ্ট বলা হয় না, বরং নিন্দুকেরও বলতেই হবে 'নতুনত্বেরও দাবিদার'। তাঁর কবিতায় শব্দ এসেছে শব্দের মর্জিতে, জোরজবরদস্তি করে বা বেহিসাবে নয়। অপ্রচলিত, আটপৌরে, বর্তমান সময়ে অব্যবহৃত কোন শব্দই চোখে পড়ে না।
প্রত্যেক কবিকে একটি নির্মাণশৈলী গড়ে নিতে হয়। তিরিশের দশকের কবি জীবনানন্দ দাশ আমাদের সামনে নিয়তির মত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোন শক্তিতে_ সময় ও ইতিহাসকে অপূর্ব সমন্বয় করতে পেরেছিলেন বলেই।
মামুন রশীদ বয়সে তরুণ_ সামনে তাঁর অফুরান সময়। শব্দ চয়নে, নির্মাণ কৌশলে, চিন্তার স্বাতন্ত্র্যে মামুন রশীদ বাংলা কবিতায় যে সম্ভাবনার বীজ রোপণ করলেন মাত্র দু'টি কাব্যেই, সেই বীজ একদিন প্রকা- বৃক্ষ হবে, সেই বৃক্ষে অমৃত ফলবে_ এই প্রত্যাশা থাকল।

জীবনানন্দ দাশ

0 comments
'কবিতা ও জীবন একই জিনিষেরই দুইরকম উৎসারণ।'

_জীবনানন্দ দাশ

বাংলা সাহিত্যের দুই যুগন্ধর কবি জন্মেছিলেন একই খ্রিস্টীয় বছর ১৮৯৯-এ, দুই খ্রিস্টীয় শতাব্দীর যৌগিকলগ্নে। একজন কাজী নজরুল ইসলাম ও অন্যজন জীবনানন্দ দাশ। নজরুলের জন্ম ২৪ শে মে আর জীবনানন্দের ১৭ই ফেব্রুয়ারি। বাংলা সাহিত্যে দু'জনেরই আবির্ভাব নতুনকে ধারণ করে। অর্থাৎ প্রচলিত ধারা ও ধারণার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তাদের সরব আগমন। নজরুল হুঙ্কার দিলেন_

'তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখীর ঝড়।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
[ 'প্রলয়োল্লাস', অগি্নবীণা ]
নজরুল যেমন বাংলা সাহিত্যে নতুনের পতাকা উড়িয়ে প্রবেশ করলেন জীবনানন্দও তেমনি তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থেই (প্রথম 'ঝরা পালক', দ্বিতীয় 'ধূসর পা-ুলিপি') পুরাতনকে অস্বীকার করলেন। 'অজানা এক বাণী' তিনি শোনাতে চাইলেন :
'কেউ যাহা জানে নাই_কোনো এক বাণী_
আমি বহে আনি :
একদিন শুনেছ যে-সুর_
ফুরায়েছে,_পুরানো তা_ কোনো এক নতুন-কিছুর
আছে প্রয়োজন,
তাই আমি আসিয়াছি,_আমার মতন
আর নাই কেউ!
কলেজে অধ্যাপনার কাজ দিয়ে জীবনানন্দের কর্মজীবন শুরু ও শেষ। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা ব্রাহ্মসমাজ সিটি কলেজে ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু। অধ্যাপনা করেছেন পূর্ববাংলা ও তৎকালীন ভারতের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। উল্লেখযোগ্য- সিটি কলেজ, কলকাতা, বাগেরহাট কলেজ, খুলনা, রামযশ কলেজ, দিলি্ল, ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল, খড়গপুর কলেজ, বাড়িশা কলেজ, হাওড়া গার্লস কলেজ। ঐ কলেজে চাকরিরত থাকাকালীনই তিনি মারা যান।
জীবনানন্দের কর্মজীবন আদৌ মসৃণ ছিল না। তাকে একটি ছেড়ে আরেকটি চাকরি খুঁজতে হয়েছে। চাকরি তথা জীবিকার অভাব তাকে আজীবন কষ্ট দিয়েছে। একটি চাকরির জন্য তিনি হন্যে হয়ে দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। বেকার জীবনে তাকে বীমার দালালি পর্যন্ত করতে হয়েছে। বেশিরভাগ সময় জীবনানন্দকে গৃহশিক্ষকতা করে জীবিকানির্বাহ করতে হয়েছে। এ ছাড়া ছোটভাই অশোকানন্দের কাছ থেকে টাকা ধার করে এক বন্ধুর সাথে ব্যবসার চেষ্টাও করেছেন বছরখানেক। জীবনানন্দ বৈষয়িক ছিলেন না, তাই দারিদ্র্য ও অভাব-অনটন ছিল তার নিত্যসঙ্গী।
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে জীবনানন্দ যখন দিলি্লর রামযশ কলেজের অধ্যাপক তখন তিনি ঢাকা ইডেন কলেজের ছাত্রী লাবণ্য গুপ্তকে বিয়ে করেন। লাবণ্য খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামের রোহিণীকুমার গুপ্তের কন্যা। তাদের বিয়ে হয় ঢাকার ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে। কবির স্ত্রী বিয়ের পর স্নাতক হন এবং শিক্ষকতা করেন। কলেজজীবনে লাবণ্য স্বদেশী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। লাবণ্য-জীবনানন্দের দুটি সন্তান। কন্যা মঞ্জুশ্রীর জন্ম ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে আর পুত্র সমরানন্দের ১৯৩৮-এ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মা কুসুমকুমারী ও বাবা সত্যানন্দের প্রভাবে জীবনানন্দ সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। তাছাড়া মা-বাবা দুদিকের পরিবারেই সাহিত্যচর্চার একটি আবহ ছিল। এর সুফলও জীবনানন্দ ভোগ করেছিলেন। জীবনানন্দের লেখা প্রথম কবিতা 'বর্ষ-আবাহন' প্রকাশিত হয় 'ব্রহ্মবাদী' পত্রিকার বৈশাখ ১৩২৬ সংখ্যায় ( খ্রিস্টাব্দ ১৯১৯)। স্কুলজীবন থেকেই বাংলা ও ইংরেজিতে তিনি লিখতে শুরু করেন। প্রথম জীবনে ছবি অাঁকার দিকেও তার ঝোঁক ছিল। জীবনানন্দের প্রথম দিকের কবিতায় নজরুলের কবিতার ছাপ লক্ষ্যণীয়। একই বছরে জন্মগ্রহণ করলেও জীবনানন্দের আগেই নজরুলের কবিকৃতি ছড়িয়ে পড়ে।
তবে জীবনানন্দ খুব দ্রুতই তার এ দুর্বলতাটুকু কাটিয়ে ওঠেন এবং নিজস্ব ঢং-এ কবিতা লিখতে শুরু করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরা পালক' প্রকাশিত হয় ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে। গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর জীবনানন্দ এর এক কপি অগ্রজ কবি রবীন্দ্রনাথকে পাঠান। রবীন্দ্রনাথ বইটির প্রাপ্তিস্বীকার করে কবিকে যে চিঠি পাঠান তার ভাষা একজন তরুণ কবির জন্য খুব একটা উৎসাহব্যঞ্জক ছিল বলে মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,
'তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহমাত্র নেই। _ কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারিনে। কাব্যের মুদ্রাদোষটা ওস্তাদীকে পরিহাসিত করে।
বড়ো জাতের রচনার মধ্যে একটা শান্তি আছে যেখানে তার ব্যাঘাত দেখি সেখানে স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জন্মে। জোর দেখানো যে জোরের প্রমাণ তা নয় বরঞ্চ উল্টো।'
জীবনানন্দ কিন্তু দমে যাননি। তিনি তার মতো লিখে যেতে থাকলেন। কবিতায় তিনি তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ বর্জন করেন এবং ব্যাপকভাবে পূর্ববাংলার লোকজ শব্দ ব্যবহার করেন। এতে তার একটি নিজস্ব ভাষারীতি গড়ে ওঠে। কিন্তু জীবনানন্দের মতো প্রতিভাবান ও আধুনিক কবির দুর্ভাগ্য, জীবদ্দশায় তিনি প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল উভয় শিবিরের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। রক্ষণশীলদের মুখপত্র 'শনিবারের চিঠি' এবং প্রগতিশীলদের 'পরিচয়' ও 'নতুন সাহিত্য' জীবনানন্দের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। মননশীলতার আভিজাত্যের অহঙ্কারী কবি সুধীন্দ্রনাথ (১৯০১-৬০) জীবনানন্দকে কবি বলেই স্বীকার করেননি। 'শনিবারের চিঠি' এবং এর সম্পাদক সজনীকান্ত দাস (১৯০০-৬২) আধুনিক সাহিত্যের বিরোধিতাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩), ননী ভৌমিক প্রমুখ প্রগতিশীল কবি-সাহিত্যিকরাও জীবনানন্দ ও তার সাহিত্যকে ব্যাপক আক্রমণ করেছেন। অবশ্য প্রগতিশীল শিবির পরবর্তীকালে তাদের ভুল বুঝতে পেরে নিজেদের শুধরে নিয়েছেন। তবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দের মতো 'অন্তর্বৃত-অসামাজিক-অভিনব' কবিকে সাহিত্যিকভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট ছিলেন দু'জন কবি-সমালোচক : বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪) ও সঞ্জয় ভট্টাচার্য (১৯০৯-৬৯)। বুদ্ধদেব বসু এবং অজিত দত্ত (১৯০৮-৭৯) সম্পাদিত 'প্রগতি', বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকায় এবং সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত 'পূর্বাশা', সঞ্জয় ভট্টাচার্য ও প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-৮৮)সম্পাদিত 'নিরুক্ত' পত্রিকায় জীবনানন্দকে তারা ব্যাপকভাবে তুলে ধরেন।
জীবনানন্দের জীবদ্দশায় তার মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল এবং এগুলোতে মাত্র ১৬২টি কবিতা সংগ্রথিত হয়েছিল। কোন গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পর তার খাটের নিচে দুই ট্রাঙ্কভর্তি লেখার পা-ুলিপি আবিষ্কৃত হয়। এগুলো কবির লেখা কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ ইত্যাদি। জীবনানন্দের কবিতার সংখ্যা আড়াই হাজারেরও অধিক। তাছাড়া তার ১৪টি উপন্যাস, ৫০টিও বেশি প্রবন্ধ এবং শতাধিক ছোট গল্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। তার ৪৮টি কবিতার খাতা কলকাতা ন্যাশন্যাল লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়া ৬০/৬৫টি খাতায় ডায়েরি লেখার মতো করে তিনি যে 'লিটারারি নোটস' লিখেছিলেন এর পাঠোদ্ধারের কাজ চলছে। ৭০/৮০ বছরের জীর্ণ, ক্ষয়ে যাওয়া এসব লেখার পাঠোদ্ধারের কঠিন কাজটি করছেন জীবনানন্দ-গবেষক ডা. ভূূমেন্দ্র গুহ। এখানে উল্লেখ্য যে, জীবনানন্দের হাতের লেখা খুব অস্পষ্ট, কাটাকুটি এবং জটিল। কলকাতার 'প্রতিক্ষণ পাবলিকেশন' ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে 'জীবনানন্দ সমগ্র' দেবেশ রায়ের সম্পাদনায় খ-ে খ-ে প্রকাশ করে চলেছে। এখনও তার অগ্রন্থিত, অপ্রকাশিত লেখা পাওয়া যাচ্ছে। জীবনানন্দের আলোচিত উপন্যাসগুলো হলো- মাল্যদান (জুন ১৯৪৮, কলকাতা), কারুবাসনা (অগাস্ট ১৯৩৩, বরিশাল), জলপাইহাটি (এপ্রিল-মে ১৯৪৮, কলকাতা) এবং বাসমতীর উপাখ্যান ( ১৯৪৮, কলকাতা)।
জীবনানন্দের বিখ্যাত 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর পর ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে। তার 'রূপসী বাংলা'র কবিতা 'বাংলার মুখ আমি' এবং 'আবার আসিব ফিরে' আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিকামী বাঙালীদের গভীর অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। জীবনানন্দের বহুলালোচিত কাব্যগ্রন্থ 'বনলতা সেন'। এ কাব্যগ্রন্থের বহুলপঠিত 'বনলতা সেন' কবিতাটি নিয়ে অনেক 'মিথ', অনেক কাহিনী সৃষ্টি হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, অনেকেই নাটোরে বেড়াতে গেলে বনলতা সেনের বাড়িটি খোঁজ করেন। বিভিন্নজন 'নাটোরের বনলতা সেন'কে বিভিন্নভাবে 'আবিষ্কারের' চেষ্টা করেছেন এবং এখনও করছেন। বেশিরভাগ পাঠকের ধারণা, বনলতা সেন শুধুই কবির কল্পনা। কলকাতার প্রখ্যাত জীবনানন্দ গবেষক (জন্ম বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলার অন্তর্গত স্বরূপকাঠী উপজেলার মৈশালী গ্রামে) ও হৃদরোগ সার্জন ডা. ভূমেন্দ্র গুহ সমপ্রতি জীবনানন্দের ডায়েরি থেকে পাঠোদ্ধার করে জানিয়েছেন, 'বনলতা সেন' কবির কল্পনা নয়, রক্তমাংসের মানুষ। কবির কাকাত বোন 'শোভনা', যার ডাকনাম বেবী_ সেই 'বনলতা সেন'। কবির ইংরেজিতে লেখা দিনলিপি 'লিটারেরি নোটস'-এ 'ওয়াই' হিসেবে চিহ্নিত মেয়েটিই শোভনা। জীবনানন্দের বয়স যখন চৌত্রিশের কোঠায় তখন তিনি শোভনা ছাড়া আরও তিনটি মেয়ের প্রেমে পড়েন। কাকা ফরেস্ট অফিসার অতুলানন্দ দাশের মেয়ে শোভনাকে বিয়ের আগে থেকেই তিনি ভালোবাসতেন। শোভনাও তার 'মিলুদা'কে (কবির ডাকনাম মিলু) এবং মিলুদার কবিতাকে খুব ভালোবাসতেন। জীবনানন্দ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরা পালক' তার 'বনলতা সেন' শোভনাকে উৎসর্গ করেন। কবি যখন কলকাতা সিটি কলেজের প্রভাষক শোভনা কখন কলকাতা ডায়োসেশান কলেজের ছাত্রী। (বিস্তারিত জানতে পড়ুন, আনিসুল হক-এর পূর্বোক্ত উপন্যাস এবং দেখুন দৈনিক 'আমাদের সময়' ৭ জুন ২০০৯ সংখ্যা)।
জীবনানন্দ এতটাই প্রচারবিমুখ ছিলেন যে মৃত্যুর পর তার একটি ছবি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এখন সব জায়গায় তার যে একটি মাত্র ছবি দেখা যায় এটি মৃত্যুর পর তার ট্রাংকে খুঁজে পাওয়া একটি গ্রুপ ফটো থেকে কেটে নেয়া। জীবনানন্দ ছিলেন নির্জনতাপ্রিয় এবং লাজুক স্বভাবের। কোন সভা-সমাবেশ পছন্দ করতেন না। এমনকি সাহিত্যিক আড্ডাও না। তবে সমাজবিমুখ কিংবা রাজনীতিবিমুখ ছিলেন না।
তার কবিতা সমাজ ও ইতিহাসচেতনাকে ধারণ করেছে এবং তা ব্যাপকভাবে। এ প্রসঙ্গে জীবনানন্দ নিজেই বলেছেন, 'কবিতার অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাস চেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান'। প্রকৃত কবি মাত্রেই অসামপ্রদায়িক। ১৯৪৬-এর ভয়াবহ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা জীবনানন্দকে খুব বিচলিত করে। তিনি লিখলেন,
'মানুষ মেরেছি আমি_তার রক্তে আমার শরীর
ভরে গেছে : পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার
ভাই আমি : আমাকে সে কনিষ্ঠের মতো জেনে তবু
হৃদয়ে কঠিন হয়ে বধ করে গেল, আমি রক্তাক্ত নদীর
কল্লোলের কাছে শুয়ে অগ্রজপ্রতিম বিমূঢ়কে
বধ করে ঘুমাতেছি_ ...
যদি ডাকি রক্তের নদীর থেকে কল্লোলিত হয়ে
বলে যাবে কাছে এসে, 'ইয়াসিন আমি,
হানিফ মহম্মদ মকবুল করিম আজিজ_
আর তুমি?' আমার বুকের 'পরে হাত রেখে মৃত মুখ থেকে
চোখ তুলে শুধাবে সে _ রক্তনদী উদ্বেলিত হয়ে
বলে যাবে, গগন, বিপিন, শশী, পাথুরেঘাটার :'
('১৯৪৬-৪৭', শ্রেষ্ঠ কবিতা)
'রূপসী বাংলা'র সৌন্দর্যের বিমুগ্ধ রূপকার কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, 'তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও_আমি এই বাংলার পারে রয়ে যাব।'_জীবনানন্দের বাংলা যদি তার সাধের পূর্ববাংলা হয় তাহলে বলতে হয় এই পারে তিনি থাকতে পারেননি। কবি ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববাংলা ছেড়ে যান, মৃত্যুর আগপর্যন্ত আসতে পারেননি। একথা বললে অন্যায় হবে না, পশ্চিমবঙ্গে তিনি এক উদ্বাস্তু কবির জীবনযাপন করেছেন। না পেলেন খ্যাতি, না পেলেন মর্যাদা। উল্টো কপালে জুটলো নিন্দা আর অপবাদ। জীবৎকালে তিনি একমাত্র পুরস্কার পান 'নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন পুরস্কার'। এ নিয়েও কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রবন্ধ লিখে নিন্দার ঝড় তোলেন।
প্রথম জীবনে রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দের 'নিষ্ঠুর সমালোচনা' করলেও ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে তার একাট কবিতা পড়ে মন্তব্য করেছিলেন 'চিত্ররূপময়'। ব্যক্তিগত জীবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত পছন্দ না করলেও জীবনানন্দ রবীন্দ্র্রনাথকে নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছিলেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত জীবনানন্দ-গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ অনেক আগেই জীবনানন্দকে 'শুদ্ধতম কবি' অভিধা দিয়েছেন। যতই দিন যাচ্ছে ততই জীবনানন্দের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। আর প্রমাণিত হচ্ছে দুঃখবাদী হলেও কবি ছিলেন জীবনবাদী। তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীলতা, নিরাদর্শবাদিতা, পলায়নপরতা এবং জীবন সম্পর্কে নিরুৎসাহিতার যেসব অভিযোগ ছিল এগুলো ইতোমধ্যে তিরোহিত হয়েছে। তথাকথিত আধুনিকতা যে ধনতন্ত্রের একটি মুখোশমাত্র এটি নিরীশ্বরবাদী জীবনানন্দ ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। সত্তরোর্ধ জীবনানন্দ-গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ, যিনি কবির মৃত্যুর তিন বছর আগে থেকে তার সানি্নধ্যে ছিলেন এবং ২৮ বছর যাবৎ জীবনানন্দ-গবেষণায় রত তিনি এ বছরের (২০০৯) গোড়ার দিকে বাংলাদেশে এসে এক সাক্ষাৎকারে বলে গেছেন, 'জীবনানন্দ এক শ' পঞ্চাশ ভাগ জৈবনিক'। আমরা মনে করি, জীবনানন্দের এর চেয়ে বড় কোন মূল্যায়ন হতে পারে না। একই ধারণার সপক্ষে আমরা স্বয়ং জীবনানন্দেরও সাক্ষ্য পাই,
'জীবন ছাড়িয়ে কোন মানবীয় অভিজ্ঞতা থাকা কি সম্ভব? কবির অভিজ্ঞতা যা আকাশ পাতাল সমস্তই উপলব্ধি করে নিতে চায় তাও তো মানবীয়।'
('কেন লিখি', জীবনানন্দ দাশ)
আপাতদৃষ্টিতে জীবনানন্দকে ভাবুক ও গম্ভীর মনে হলেও ব্যক্তিজীবনে পারিবারিক বলয় ও বন্ধুমহলে তিনি পরিচিত ছিলেন কৌতুকপ্রিয় ও সদা হাসিখুশি একজন মানুষ হিসেবে। তার আপাত দুবর্োধ্য কবিতা পড়ে বোঝার জো নেই যে জীবনানন্দ একজন প্রখর রসবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন।
১৪ অক্টোবর ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ, কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কের কাছে নিয়মিত সান্ধ্যভ্রমণকালে কবি জীবনানন্দ দাশ ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। কলকাতার শম্ভুনাথ প-িত হাসপাতালে নয়দিন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে ২২ অক্টোবর ১৯৫৪, শুক্রবার রাত ১১.৪৫-এ তিনি মৃত্যুর কাছে হেরে যান। অনেকের ধারণা, এটি তার স্বেচ্ছামৃত্যু বা আত্মহত্যা। কিংবা দুর্ঘটনাটি তার মগ্নস্বভাবের জন্যেও হয়ে থাকতে পারে। তবে যতদূর জানা যায়, এসময়টাতে কবি তীব্র আর্থিক সঙ্কট, পারিবারিক অশান্তি এবং লেখক হিসেবে স্বীকৃতিহীনতার বেদনায় ভুগছিলেন। আমরা মনে করি, দিন দিন জীবনানন্দ যত জনপ্রিয় হবেন ততই তার মৃত্যুরহস্য নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকবে।

Published in SANGBAD

রাসসুন্দরী দাসী

0 comments
            বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী রচনাকার রাসসুন্দরী দাসীর দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি
                                                     এক পিঞ্জরে বাঁধা বিহঙ্গীর আমার জীবন

বহু দিন পর কোন বই এত মন দিয়ে পড়লাম। এবার পূজায় কোলকাতায় গিয়েছিলাম। ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে উপহার পেলাম রাসসুন্দরীর 'আমার জীবন'। রাসসুন্দরী আমাদের রাজবাড়ীর অখ্যাত এক গ্রামে বসে দেড়শো বছর আগে নিজেকে লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই আগ্রহ নিয়েই বইটি প্রথমে পড়তে বসলাম। যতই পড়ছি ততই যেন নানাভাবে রাসসুন্দরী নামের ব্যক্তিত্বটি আমার সামনে আবিষ্কৃত হতে থাকলো। নির্দিষ্ট কোন এলাকার সীমানায় তাকে আসলে বাঁধা যায় না।

রাসসুন্দরী এমন এক নারী, এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি পিঞ্জরে বাঁধা থেকেও একান্ত মানসিক শক্তির জোরেই দূর আকাশে মুক্ত ডানা মেলতে পেরেছেন। সম্পূর্ণ অবগুণ্ঠিতা এক ঘরোয়া নারী হিসেবে নিজের যুগ, নিজের কাল, নিজের পরিবেশের সমস্ত চিহ্ন তিনি শরীরে ও মনে ধারণ করেছেন। অন্যদিকে তার প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা ও নারীর মানবাধিকার অর্জনের সংগ্রামে তিনি যুগোত্তীর্ণ তো বটেই। তার সমস্ত উপলব্ধি কর্মতৎপরতা একদিকে তার নিজের আত্মবিকাশ ও মুক্তির জন্য অন্যদিকে তার দীর্ঘ জীবন এক পচা-গলা সমাজের বিরুদ্ধে সবল প্রতিবাদ। তাকে চেনা ও জানাটা আমাদের দায়িত্ব।
এখন থেকে ঠিক দুশো বছর আগে রাসসুন্দরীর জন্ম। পাবনা জেলার পোতাদিয়া গ্রামে এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে তার জন্ম। পিতা পদ্মলোচন রায় রাসসুন্দরীর অতি শৈশনে মারা যান। কন্যা হিসেবে জন্ম নিলেও মা এবং অন্যান্য পরিজনের কাছে তিনি খুব আদুরে ছিলেন। অতি আদরেই কোন জোর কথা বা কটু কথা শোনার আগেই তিনি চোখের জলে বুক ভাসাতেন। খেলার সাথীরা এ নিয়ে তাকে অনেক সময় রীতিমতো লাঞ্ছনা-গঞ্জনা করতো। নীরবে চোখের জলে এগুলো সহ্য করতেন ছোট্ট রাসসুন্দরী। কারণ তার মনে সব সময় একটা ভয় কাজ করতো। দুষ্ঠুদের ছেলেধরা ধরে নিয়ে যায়, ছোটবেলায় বড়দের মুখে শোনা এ কথাটা তিনি বিশ্বাস করতেন। খেলার সাথীরা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে এই কারণে তার কান্না আসতো না। ছেলেধরা যদি দুষ্ঠু সাথীদের ধরে নিয়ে যায় কিংবা পরিজনরা যদি তাদের বকে এই ভয় কাজ করতো সব সময়।
রাসসুন্দরীর পরিজনেরা অতিমাত্রায় রক্ষণশীল ছিলেন না। তাই মেয়েদের লেখাপড়ার প্রচলন না থাকলেও বাড়ীর বাইরে স্কুলে ছেলেদের পড়ার পাশে রাসসুন্দরীকে বসিয়ে রাখতেন। চিৎকার করে এক সাথে ছেলেরা বাংলা বর্ণমালা উচ্চারণ কতো এবং মাটিতে অাঁক দিয়ে লেখা শিখতো। রাসসুন্দরী তার শিশু মনে অক্ষরগুলো গেঁথে নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ সুযোগ বেশিদিন থাকেনি। ছোটবেলা থেকেই দৈহিক রূপের কারণে সবাই তাকে 'সোনার পুতলী' বলতো। কার মেয়ে? কার মেয়ে? বিভিন্নজনের এ জিজ্ঞাসাবাদের সুবাদে বাবার নামটা তার কানে আসে। ছোটবেলা থেকে মায়ের হাতে শাঁখা বা শরীরে কোন গয়না না দেখে রাসসুন্দরীর বিশ্বাস ছিল তার মায়ের বিয়ে হয়নি। আট বছর বয়সে অন্যের মুখে বাবা হিসেবে পদ্মলোচন রায়ের নাম শুনে ভীষণ মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ে যান তিনি। 'এত দিবস আমি জানিতাম, আমি আমার মায়ের কন্যা'। রাসসুন্দরীর জীবনে তাঁর মায়ের আদর্শ এবং ভূমিকা ছিল অপরিসীম। জীবনের সকল আনন্দ-বেদনায় সংকটে 'দয়ামাধব' বা 'পরমেশ্বর'ই একমাত্র বন্ধু, একমাত্র শক্তি। নেপথ্যচারিণী মায়ের এই বীজমন্ত্র আজীবন আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে অাঁকড়ে ধরেছেন রাসসুন্দরী। নিজের একাগ্রতা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম, সংগ্রাম, দুঃখ-বেদনা-সাফল্য সব কিছুই সেই পরমেশ্বর বা একের কাছ থেকে প্রাপ্তি বলে বিশ্বাস করেছেন। বাবার বাড়ির বিগ্রহের নাম 'দয়ামাধব' শ্বশুর বাড়ির 'মদন গোপাল'। নাম যাই হোক রাসসুন্দরীর কাছে এক পরমেশ্বরই সকল শক্তির উৎস। শৈশবে এই বিশ্বাসের সাথে ছিল স্বভাবসুলভ সরলতা। একবার ভাইবোন মিলে তারা একমাঠে সন্ধ্যায় পথ হারিয়ে ফেলেন। এক ব্যক্তি তাদের বাড়ি পেঁৗছে দিয়ে যায়। রাসসুন্দরীর বিশ্বাস দয়ামাধব তাদের হাত ধরে বাড়িতে দিয়ে যায়। 'দয়ামাধবের মুখে কি দাড়ি থাকে?' আপন ছোট্ট ভাই-এর প্রশ্নে সংবিৎ ফিরে পান তিনি। এবং রীতিমত মানসিক দ্বন্দ্বে পড়েন। দয়ামাধবই ডাক শুনতে পেয়ে অন্য ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্যে পাঠান। মায়ের এই উত্তরে প্রশ্ন থেমে থাকে না। মন্দিরের দেবতা কী করে মানুষের কথা শুনতে পান? এরও সমাধান দিয়েছিলেন রাসসুন্দরীর মাতা_ 'তাহাকে যে যেখানে থাকিয়া ডাকে, তাহাই তিনি শুনেন। বড় করিয়া ডাকিলেও তিনি শুনেন, ছোট করিয়া ডাকিলেও শুনিয়া থাকেন... এই এক পরমেশ্বর সকলেরই; সকল লোকেই তাঁহাকে ডাকে, তিনি আদিকর্তা' মায়ের এই শিক্ষায় ঈশ্বর আর তার কাছে চার দেয়ালে কখনও বন্দী হননি। মা এবং পরমেশ্বর রাসসুন্দরীর সারা জীবনের সাথী।
১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় রাসসুন্দরীর। সময় বিচারে বেশি বয়সেই তার বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের জন্যে মোটেই মানসিক প্রস্ততি ছিল না তার। বিয়ের শাড়ি-গয়না-বাজনা ধুমধামে তিনি নিজেও আনন্দ ভরপুর ছিলেন। এত সরল ছিলেন যে বরপক্ষ আনন্দ শেষে নিজেরাই বিদায় নেবে এমন ধারণা ছিল তার। সকলের কান্নাকাটি আর প্রস্তুতির ধরন দেখে যখন বুঝলেন বরপক্ষের সঙ্গে তাকেও যেতে হবে তখনই বুকফাটা কান্নায় মাকে জড়িয়ে আকুতি 'মা, তুমি আমাকে দিওনা।' বাস্তবে সে আকুতি রক্ষার উপায় কারোরই ছিল না। মা ও পরিজনদের ছেড়ে এলেন ভিন্ন এলাকার ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন পরিজনের মাঝে। এবং আজীবন সেই ভিন্ন অধীনতাকে মেনে নেয়া একটি মেয়ের জন্যে যে কী কষ্টকর তা অত্যন্ত সাবলীলভাবে রাসসুন্দরী নিজেই ফুটিয়ে তুলেছেন। 'যখন দুর্গোৎসবে কি শ্যামাপূজায় পাঁঠা বলি দিতে লইয়া যায়, সেই সময় সেই পাঁঠা যেমন প্রাণের আশা ত্যাগ করিয়া হতজ্ঞান হইয়া মা-মা-মা বলিয়া ডাকিতে থাকে আমার মনের ভাবও তখন ঠিক সেই প্রকার হইয়াছিল। ...লোকে আমোদ করিয়া পাখি পিঞ্জরে বন্ধ করিয়া রাখিয়া থাকে, আমার যেন সেই দশা ঘটিয়াছে। আমি ঐ পিঞ্জরে এ জন্মের মতো বন্দী হইলাম। আমার জীবদ্দশাতে আর মুক্তি নাই' রাসসুন্দরী নিজের কথা লিখতে যেয়ে বহুবার এই পিঞ্জরে বাঁধা পাখির সাথে নিজের তুলনা করেছেন। যদিও বাঙালি নারীর সে আমলের শ্বশুরবাড়ির নিগ্রহ এবং নির্যাতনের দিকগুলো তার আত্মজীবনীতে স্পষ্ট নয়। না থাকাটাই স্বাভাবিক। স্বামী শ্বশুরবাড়ির কথিত মর্যাদা আজকের যুগেও অধিকাংশ মধ্যবিত্ত বাঙালি নারী রক্ষা করে চলার চেষ্টা করেন। তাছাড়া হয়তো এই সামন্ততান্ত্রিক পরিবারটি অপেক্ষাকৃত রুচিশীল ছিলেন। রাসসুন্দরীর বিয়ে হয়েছিল রাজবাড়ী জেলার 'ভর রামদিয়া' গ্রামে। জোতদার ও অবস্থাপন্ন এক পরিবারে। স্বামী নীলমনি সরকার। রাসসুন্দরী তার জীবনীর মূল খ-ে স্বামী সম্পর্কে 'বেশ লোক' ছিলেন মর্মে উক্তি করেন। স্বামী সম্পর্কে নিজের লেখায় তেমন কিছু বলা হয়নি বুঝতে পেরে পরবর্তীতে খুব অল্পেই স্বামী নীলমনি সরকারের চেহারাটা ফুটিয়ে তোলেন। শরীরে, কণ্ঠে এবং মেজাজে রাশভারী ব্যক্তি। একদিকে দিলদরিয়া। অন্যদিকে জাগাজমি নিয়ে দিনের পর দিন মামলা-মোকদ্দমা ও কাইজা করার নেশা। রাসসুন্দরী এসব পছন্দ করতেন না। কিন্তু তিনিও স্বামী নামক কর্তা ব্যক্তিটিতে অত্যন্ত সমীহ করতেন। সকলের খাবারের আগে তার খাবার দেয়া, নম্রভাবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, সকল ক্ষেত্রে তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া সে যুগের আর পাঁচটা বাঙালি নারীর মতোই মেনে চলেছেন রাসসুন্দরী। কর্তা ব্যক্তিটির প্রভাব এতই বেশি যে কর্তার ঘোড়া জয়হরিকে দেখলেও একহাত ঘোমটা দিয়ে লজ্জায় পালাতেন। তাকিয়ে দেখতে কণ্ঠাবোধ করতেন। শ্বশুরবাড়ি যখন প্রথম এলেন তখন শাশুড়ি জীবিত। তিনিই পরিবারের প্রধান। ক্রমে তিনি অসুস্থ হলেন। এক সময় মারা গেলেন। সংসারের কর্তৃত্ব এল রাসসুন্দরীর ওপর। দেওর-ভাসুর কেউ ছিল না। কিন্তু একে একে তিন ননদ বিধবা হয়ে সংসারে এল। তাদেরকেও মেনে চলতে হতো পদে পদে। এরই মধ্যে এক এক করে বারোটি সন্তানের মা হয়েছেন। ক্রমে পুত্রবধূ, জামাতা, নাতি, নাতনী। সংসারের এক অবস্থা থেকে আর এক অবস্থায় নিজের অবস্থান পাল্টেছে। শরীরের, মনের পরিবর্তন হয়েছে। ভূমিকা পাল্টে গেছে। এই সব কিছুই সবিস্ময়ে বিশ্লেষণ ও লক্ষ্য করেছেন রাসসুন্দরী। তার ভাষায় এক সময়_ 'নতুন বউ নামটি বাদ গেল। মা, বউ, বউঠাকুরানী, বাবুর মা, কর্তা মা, কর্তা ঠাকুরানী এই প্রকার অনেক নতুন নতুন নাম হইল। এককালে বাল্যকাল পরিবর্তিত হইয়া আমি একজন পুরাতন মানুষ হইলাম।' নিজেই বিস্মিত হতেন নিজের পরিবর্তনে 'আমি এখন আচ্ছা একজন গৃহস্থ হইয়াছি এ আবার কি কা-। এখন অধিকাংশ লোক আমাকে বলে কর্তা ঠাকুরানী। দেখা যাক, আরও কী হয়'। নিজের ৬০ বছর বয়সে লিখেছিলেন 'আমার নাম মা, আমার পিত্রালয়ে যে নাম ছিল তাহাতো অনেক কাল লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে আমি সকলেরি মা' এক সময় ছিল যখন- 'পক্ষীটা কী, গাছটা কী, কুকুরটা কী, বিড়ালটা কী যাহা দেখিতাম আমার জ্ঞান হইত যে আমার বাপের বাড়ির দেশ হইতে আসিয়াছে, এই ভাবিয়া কাঁদিদতাম' ক্রমশ চোখের জল শুকিয়ে এসেছে। সম্পূর্ণ দায়িত্ব এবং কর্তৃত্ব নিয়ে স্বামীর সংসার করেছেন। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির বিষয়-আশয়-ঐশ্বর্য-কর্তৃত্ব কোনকিছুই তার নারী মনের বেদনা, যন্ত্রণা ও ক্ষোভকে কখনই প্রশমিত করতে পারেনি। নিজের মায়ের কথা সব সময় মনে পড়তো। মা'র কাছে ইচ্ছে মতো যেতে পারেননি, সেবা করতে পারেননি, মা'র কোন উপকার করতে পারেননি এই যন্ত্রণা তার মধ্যে তীব্রভাবে ছিল। 'আমি এখানে (শ্বশুরবাড়ি) আসিয়া অবধি দায়মালী কারাগারে বন্দী হইয়াছি। এই সংসারের কাজ চলিবে না বলিয়া প্রাণান্তেও আমাকে পাঠানো হইত না' যদিবা কখনও পাঠানো হতো সাথে থাকতো বড় বাড়ির অহংকার দশ-পনেরো জন পাহাদার, সরদার দাস-দাসী। তারা সাথে যেত, ধার্য দিন মতো সাথে নিয়ে আসতো। মায়ের মৃত্যুকালেও তিনি যেতে পারেননি। 'আমার নারীকুলে কেন জন্ম হইয়াছিল? আমার জীবন ধিক্। পৃথিবীর মধ্যে মাতার তুল্য স্নেহময়ী আর কে আছে। এমন যে দুর্লভ বস্তু মা, এই মায়ের সেবা করিতে পারি নাই। আহা এ দুঃখ রাখিবার কী স্থান আছে? আমি যদি পুত্র সন্তান হইতাম আর মার আসন্ন কালের সংবাদ পাইতাম, তবে আমি যেখানে থাকিতাম, পাখির মতো উড়িয়া যাইতাম। কি করিব, আমি পিঞ্জরবদ্ধ বিহঙ্গী।'
নারী হিসেবে এই সমাজে জন্মে যে বিড়ম্বনা তা প্রতিমুহূর্তে রাসসুন্দরী উপলদ্ধি করেছেন। সে যুগের মোটা মোটা কাপড়। শরীর ভরা ভারী গহনা। এক হাত ঘোমটা 'যেন কলুর বলদের মত দুই চক্ষু ঢাকা থাকিত। আপনার পায়ের পাতা ভিন্ন অন্য কোন দিকে দৃষ্টি চলিত না' অবস্থা সম্পন্ন পরিবারের বউ তিনি। দাস-দাসী যা ছিল তাদের কর্মক্ষেত্র ভিন্ন। এক এক বেলা ১০/১২ সের চাউল ও সেই সাথে অন্যান্য ব্যঞ্জনা রান্নার দায়িত্ব, সংসার ঠিক রাখার দায়িত্ব, ছেলে-মেয়ে প্রতিপালনের দায়িত্ব, সবই নিখুঁতভাবে পালন করতে হতো। 'ছেলেগুলো কাঁদিলে কর্তাটি কাঁদে কেন? কাঁদে কেন? বলিয়া উচ্চস্বরে সোর করিবেন' অর্থাৎ কর্তা ঘরে এলে ছেলে কাঁদাও অপরাধ। তার পর আছে বিগ্রহের পূজা-অর্চনা সেবার দায়-দায়িত্ব।
এই অবস্থা ও পরিবেশে থেকেও আবহমান বাঙালি সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে আপাত অবগুণ্ঠিত এই নারী সব সময় চিন্তা করেছেন। উপলব্ধি করেছেন নারী-পুরুষের সামাজিক বৈষম্যর নিগড়ে নারীর যন্ত্রণা। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে নারী হিসেবে বঞ্চনার দিকগুলো তিনি সুচিহ্নিত করেছেন। ধীর গতিতে, শান্ত মেজাজে, সুকোমল স্পর্শে সংসারে তিনি সব সময় কল্যাণী নারী হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত হয়েছেন। কিন্তু তার মনের মধ্যে সব সময়ের দ্বন্দ্বের যে ওঠানামা, নিজেকে প্রকাশের জন্যে অস্থিরতা, নিজেকে প্রকাশের জন্যে যে ব্যাকুলতা তা যদি তিনি প্রায় ৬০ থেকে ৮৮ বছর বয়স পর্যন্ত সময় ধরে না লিখে যেতেন তাহলে এক অবগুণ্ঠিত সাধারণ নারীর অসাধারণত্ব চেনাজানার আড়ালেই থেকে যেত।
রাসসুন্দরীর জীবনের সবচেয়ে বড়ো নিষ্ঠার, একাগ্রতার ও ধৈর্যের জায়গা ছিল তার লেখাপড়া শেখাটা। যে যুগে তিনি জন্মেছিলেন সে যুগে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাটা রীতিমতো সামাজিক অপরাধ হিসেবে পণ্য হতো। রাসসুন্দরীর পুঁথি পড়ার ইচ্ছেটা বউ অবস্থাতেই প্রবল হয়ে ওঠে। 'কি জ্বালা হইল, কোন মেয়ে লেখাপড়া শেখে না, আমি কেমন করিয়া লেখাপড়া শিখিব, একি দায় হইল' দেশের সমাজের আর যা কিছু ভালো থাক না কেন 'কিন্তু এই বিষয়টি ভারী মন্দ ছিল। সকলেই মেয়েছেলেকে বিদ্যায় বঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছিলেন। তখনকার মেয়েছেলেগুলো নিতান্ত হতভাগা, প্রকৃত পশুর মধ্যে গণনা করিতে হইবেক'। মেয়েদের লেখাপড়া শেখায় মেয়েরা নিজেরাও প্রবল বাধা ছিল। 'মেয়েছেলের হাতে কাগজ দেখিলে সেটি ভারী বিরুদ্ধ কর্ম জ্ঞান করিয়া বৃদ্ধ ঠাকুরানীরা অতিশয় অসন্তোষ প্রকাশ করিতেন'। নিজের পুঁথি পড়ার চেষ্টার প্রাক্কালে ননদদের সম্পর্কে তিনি নিজেও ভীত ছিলেন। 'আমার ননদ তিনটি আছেন, তাহারা যদি আমাকে পুঁথি পড়িতে দেখেন, তবে আর রক্ষা নাই' যদিও পরবর্তী সময়ে নিজের ব্যক্তিত্বের দ্বারা ননদদের পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলেন। এমনকি তাদেরকে লেখাপড়া শেখানোরও চেষ্টা করেন। পড়তে না পারার কষ্ট তিনি শয়নে-স্বপনে, দিবসে-রাতে সকল কর্মসময়ে বয়ে ফিরতেন। কিন্তু একে মেয়ে তার পর বউ মানুষ। কারো কটু কথা শোনার ভয়ও সমানভাবে তাড়িত করতো। বহু প্রতীক্ষার পর একসয় চৈতন্য ভাগবত পুঁথিটা হাতের কাছে এল। কাঠের আড়িয়া লাগানো হাতে লেখা নানা চিত্রবিচিত্র দৃষ্টি কাড়া একটি পুঁথি। লুকিয়ে একটি পাতা খুলে রাখলেন। পাতাটা রাখবেন কোথায়? নিন্দা ও কটুবাক্যের ভয়ে রান্না ঘরে খড়ির নিচে পাতাটি লুকিয়ে রাখলেন। কিন্তু দেখার অবকাশ কোথায়? বড় সংসারের বড় কর্মব্যস্ততা। স্বামী-সন্তানের দায়িত্ব পালন_। 'সকল দিবস সংসারের কাজে অবকাশ পাওয়া যায় না। রাত্রে পাক-সাক করাতেই ভারি রাত্রি হয়ে যায়। তখন ঐ সকল কাজ মিটিতে না মিটিতে ছেলেপেলেগুলো জাগিয়ে উঠিয়া বসে। তখন কী অন্য কোন কথা! তখন কেহ বলে মা মুতিব, কেহ বলে মা খিদে লেগেছে, কেহ বলে মা কোলেনে, কেহ বা জাগিয়া কান্না আরম্ভ করে' তারপরেও অদম্য আগ্রহ থেমে থাকে না। ছেলের তালপাতায় লেখা একটি পাতাও লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু কীভাবে পড়বেন? সেই ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার পাশে বসে থাকার দিনগুলোকে মনে করার চেষ্টা করতে থাকেন। 'পুস্তকের পাতাটি, তালের পাতাটি মনের অক্ষরের সাথে সাথে মিলাইয়া দেখিতাম। আমি অনেক দিবস অনেক পরিশ্রমে, অনেক যত্নে এবং অনেক কষ্ট করিয়া ঐ চৈতন্য ভাগবত পুস্তকখানি গোঙাইতে শিখিলাম...। আমার এত দুঃখের পড়া। বস্তুত আমি এত কষ্ট করিয়া পড়িতে শিখিয়াও তাহা লিখিতে শিখিলাম না' মেয়ে মানুষকে লেখাপড়া শিখতে হয় না। স্ত্রী জাতির জন্যে এটা প্রধান দোষ সেই সময়ের এই সমাজ ভাবনা সব সময় রাসসুন্দরীকে পীড়া দিত। কষ্ট করে পড়তে শেখার পর লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ির সব বই পড়ে ফেলেন। যে ব্যক্তি কোনদিন কারো কাছে কিছু চাননি সেই ব্যক্তি অতি সংকোচে নিজের ছেলের কাছে বাল্মিকী রামায়ণ সপ্তকা- বইটি চান। ছেলে কলকাতায় যেয়ে বইটি পাঠিয়ে দেন। এই প্রথম ছাপার অক্ষরে লেখা বই তার সামনে এল। প্রথম প্রথম ছোট ছোট অক্ষর বহু কষ্টে তিনি পড়তে শুরু করলেন। তারপর_ 'দেখিলাম সে কালের হাতের লেখা অপেক্ষা ছাপার অক্ষরই উত্তম'। এবার ছেলে কিশোরীলালের অনুরোধ মাকে চিঠির উত্তর দিতে হবে। কীভাবে দেবেন? ছেলে কোন কথাই মানতে নারাজ। কালি-কলম-কাগজ এর যোগান হলো। মধ্য বয়সে শুরু হলো নতুন অধ্যবসায়। হাতের লেখা শেখার। ছেলের চিঠির উত্তরতো দিতেই হবে। পঞ্চাশোর্ধ্ব গৃহিণী এক নারী সংসারের সকল ব্যস্ততার মাঝে লিখতে শুরু করলেন। ছেলের চিঠির উত্তর লেখা শিখতে যেয়ে লিখে ফেললেন_ 'আমার জীবন' আত্মকাহিনী। এ এক গভীর বিস্ময়ের বিষয়। ১৮৭৬ সনে রাসসুন্দরীর ৬৭ বছর বয়সে প্রথম বইটি ছাপা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় বইটির সংস্কারণ প্রকাশিত হয়। তার ৮৮ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি লিখতেই থাকেন। সম্পাদক ও প্রকাশকদের মতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী রাসসুন্দরী'র লেখা 'আমার জীবন' সেই হিসাবেও তার লেখার মূল্যায়ন অপরিসীম।
রাসসুন্দরীর সহজ-সরল ব্যক্তিত্বকে আমরা খুঁজে পাই তার লেখায়। তারই মতো তার ভাষা এবং প্রকাশ অত্যন্ত অনায়াস ও সরল। বারবারই যে কথাটি না বললে নয়, তিনি তার জীবনে সাংসারিক সমস্ত দায়দায়িত্ব অত্যন্ত সুষ্ঠু এবং বিচক্ষণতার সাথে পালন করেছেন। কিন্তু সংসারের বিষয় ঐশ্বর্যের মোহ তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। মায়ের মৃত্যু, ১২টি গর্ভজাত সন্তানের মধ্যে চোখের সামনে সাত সাতজনের মৃত্যু; নাতি-নাতনীর মৃত্যু, তাকে প্রচ- কষ্ট দিয়েছে। শেষ বয়সে এসে স্বামী হারিয়েছেন। স্বামীর প্রতি সমীহ ছিল। উচ্ছ্বাস ছিল না। সে যুগের প্রভাবশালী সামন্ত জোতদার পরিবারের বউ হিসেবে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্বকর্তব্য পালনে ত্রুটি করেননি। স্বামীর মৃত্যুতে বলেছেন_ 'এক্ষণে শেষ দশাতে বৈধব্য দশা ঘটিয়েছে। কিন্তু একটি কথা বলিতেও লজ্জা হয়। শুনিতেও দুঃখের বিষয় বটে।
_শত পুত্রবতী যদি পতিহীন হয়।
তথাপি তাহাকে লোকে অভাগিনী কয়_
বাস্তবিক যদি আর কিছু না বলে তুমি বিধবা হইয়াছ, কথাটি বলিতেই চাহে'। সে যুগের বিধবা হিন্দু নারীর চুল কেটে ফেলতে হতো। এ বিষয়েও সমাজকে তিনি কটাক্ষ করেই কথা বলেছেন। স্বামী ছাড়া নারী সমাজের চোখে হেয় এই মানসিকতাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
রাসসুন্দরীর জীবন সম্পূর্ণভাবে নিজের হাতে গড়া। পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রবল প্রতিপত্তিশালী স্বামী অর্থাৎ কর্তা ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার বিনা অনুমতিতে প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্যে পার্শ্ববর্তী তেতুলিয়া গ্রামের মীর আমুদে নামের প্রতিপত্তিশালী জোতদারকে চিঠি দিয়ে ডেকে আনেন। এবং তার সাথে তিন পুরুষের চলমান মামলা-মোকদ্দমার লিখিত আপোষ নিষ্পত্তি করেন। এক হাত ঘোমটা দেওয়া এক অন্তঃপুরবাসিনীর এই দুঃসাহস তার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। এই ব্যক্তিত্বের কাছে কর্তা ব্যক্তিটিও শেষ পর্যন্ত বিনত হতে বাধ্য হন।
সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনায় পূর্ণ এই সংসার জীবনে সকলের সাথে থেকে সব কিছুর মাঝেও রাসসুন্দরী ছিলেন একাকী। তার নিজস্ব জগত পূর্ণ ছিল একদিকে ঈশ্বরের প্রতি আস্থায়, অন্যদিকে শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের প্রতি প্রবল আগ্রহে। সংসারে থেকে সংসারে নিরাসক্ত এই মানুষটি একটি পরিপূর্ণ জীবনাদর্শে আনন্দে বিভোর ছিলেন। নিজে সবসময় নিজের মনের সঙ্গে কথা বলতেন। 'মন মুখে বলি বটে, কিন্তু কর্মের দ্বারা দেখিতে পাই তোমার অসীম শক্তি, তুমি পলকে এই পৃথিবী পর্যটন করিয়া আসিয়া থাক। তোমার সঙ্গে অন্য কারো তুলনা হয় না'। একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় জর্জরিত শোকসপ্তপ্ত মনকে নিজেই নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। 'সংসারী লোকের প্রতি পরমেশ্বর সম্পদ বিপদ দুইই সমান করিয়া দিয়াছেন। কেহ বা কষ্টের কথাটি আগ্রহ করিয়া মনে রাখিয়া সতত কষ্ট ভোগ করিতেছে। কোন লোক এমনও দেখা যায় তাহাদের শত শত বিপদের রাশি সম্মুখে থাকিলেও তারারা সেদিকে দৃষ্টিপাত করেন না।' নিঃসন্দেহে তিনি নিজে এই দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্যক্তিত্বের মধ্যে পড়েন। একাধিক পুত্রশোক যন্ত্রণা দিবারাত্র বুকের মধ্যে জ্বলছে। কিন্তু সেই শৈশবে মায়ের শেখানো প্রগাঢ় ঈশ্বর বিশ্বাস_ 'সেই মহৌষধি আমার অস্থিভেদী হইয়া রাখিয়াছে। আমার শরীর মন যখন বিষয়ের হলাহলে এককালে আচ্ছন্ন ও অবশ হইয়া পড়ে তখন আমার সেই অস্থিভেদী বিশল্যকরণী প্রবল হইয়া আমার শরীরের সমুদয় ব্যাধি শান্তি করিয়া আনন্দ রসে মনকে পরিতোষ করে।' এ যেন সেই জীবনদর্শন যা রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় ও আমরা খুঁজে পাই বস্তুত এই নারীকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখার এবং বুঝার রয়েছে তিনি বলেছেন 'আমাদের হৃদয় প্রকোষ্ট এমন রত্নপূর্ণ রহিয়াছে যে (আমরা এমন হতভাগ্য) তাহা আমরা খুলিয়া না দেখিলে দীনদরিদ্রের মতো হাহাকার করিয়া দিবারাত্রি কাঁদিয়া বেড়াই। একি সামান্য দুঃখের বিষয়_ ভাবিয়া দেখিলে হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়'।
রাসসুন্দরী রামদিয়া গ্রামের দীর্ঘ অন্তঃপুরের জীবনে একটি দিনও নষ্ট করেননি। নিজেকে স্বশিক্ষিত করেছেন। শিক্ষার জন্য ব্যাকুল মন প্রাণ নিয়ে সংসারের কাজকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। এই পিঞ্জরাবদ্ধ বিহঙ্গী নিজের মনোজগতে সব সময় ছিলেন স্বাধীন এবং আনন্দে ভরপুর। তিনি নিজেও জানেন_ 'আমার লেখাপড়া বড় সহজ কষ্টে হয় নাই। যাকে বলে কষ্ট' অসীম ধৈর্যের সাথে এই কষ্ট তিনি করেছেন। তারপরেও অতৃপ্তি থেকে গেছে। দুর্লভ মনুষ্য জন্মের সম্পূর্ণ দেনা তিনি পরিশোধ করতে পারেননি। এই ভেবে বারবার আক্ষেপ করেছেন_ 'এই রত্নপূর্ণ ভারতবর্ষ। এই ভারতবর্ষে কত শত অমূল্য রত্নের খনি রহিয়াছে। কত দরিদ্র ঐ রত্ন সঞ্চিত করিয়া মহাজন হইয়া বসিয়াছে। সেই ভারতবর্ষে আসিয়া আমি ৮৮ বৎসর পর্যন্ত আছি। এত দিবস কী কাজ করিয়াছি?... আমার বৃথা কাজে দিন গেল। আমার মানবজন্ম বৃথা হইল। ভারী আক্ষেপের। মনে হইলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়।'
রাসসুন্দরী লেখা অনুযায়ী তিনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী ছিলেন। বিশেষ কোন রোগবালাই ছিল না। শরীর, মন ও সাজের অবস্থানের পরিবর্তনকে তিনি সবিস্ময়ে পর্যালোচনা করেছেন এবং মেনে নিয়েছেন। 'সংসার যাত্রায় তুমি আমা হইতেই আমাকে কত প্রকার সাজ সাজাইয়া আনিয়া দেখাইতেছ-' ঈশ্বরের প্রতি এমনই ছিল তার স্বগত উক্তি। 'লোকে বলে সংসার সমুদ্র। সে সমুদ্র বটে। কিন্তু সংসারের সাথে সমুদ্র তুলনা করিয়া দেখিলে সংসার তরঙ্গ হইতে সমুদ্রের তরঙ্গ বোধ হয় বড় জয়ী হইতে পারে না। সময়ে সময়ে তুল্যই হয়-' এই সংসার সমুদ্র তরঙ্গের কোন ঝড়-ঝাপটায় তিনি অবসন্ন হননি। ডুবেছেন আবার ভেসেছেন। যেমন এক সময় সর্বদা নানাবিধ ভয়ে কম্পমান ছিল সেই ভয়কে তিনি শেষ পর্যন্ত পরাস্ত করেন। প্রচ- মানসিক শক্তি ও একাগ্রতা দিয়ে তিনি পড়া শিখেছেন। লেখা শিখেছেন। গদ্য, পদ্য, গান লিখেছেন, গান গেয়েছেন। মানুষের সাথে মিশেছেন। মানুষকে ভালবেসেছেন। নিজের মনকে নিয়ে তার নিজেরই ছিল অগাধ বিস্ময়।
'মনের যে ভাব দেখি আশ্চর্য কেমন।
চাঁদ ধরিবারে ধায় হইয়া বামন\\'
দুই হাতে সংসারের কাজ, সন্তানদের বুকে সাপটে রাখা- 'অন্য দুই হস্তে আমার মন যেন চাঁদ ধরিতে চাহে। আহা কি আশ্চর্য। মনের ভাবভঙ্গী দেখিয়া আমার মুখে আর বাক্য সরে না'। তিনি নিজে বামন হয়ে চাঁদ ঠিকই ধরেছিলেন। অসাধ্য সাধন করছেন তিনি। স্ত্রী শিক্ষা দ-নীয় অপরাধ_ সমাজের এই রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে নিজের জীবনেই এক বিরাট বিপ্লব ঘটিয়েছেন। এক অবরোধবাসিনী নারীর হাতেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী 'আমার জীবন'। দক্ষ জীবনীকারের মতোই সচেতন ছিলেন তিনি। জীবনী লিখতে গিয়ে লিখেছেন- 'আমি যদি আপনার নিন্দিত কর্ম বলিয়া কিছু গোপনে রাখিয়া থাকি পরমেশ্বর তাহা তুমি প্রকাশ করিয়া দাও। আমার যে কথা স্মরণ না থাকে তাহা তুমি আমাকে স্মরণ করাইয়া দাও।' বইটি প্রথম প্রকাশনার সময় তিনি লেখেন_ 'এই বই খানি আমার নিজ হস্তের লেখা। আমি লেখাপড়া কিছুই জানি না। অধিকারী মহাশয়েরা তোমরা যেন অবহেলা না কর, দেখিয়া ঘৃণা করিও না' রাসসুন্দরী জানতেন না তার এই লেখা অবহেলার কোন বিষয় তো নয়ই। বরং বিস্ময় ও গৌরবের। ৯০ বছর বয়সে রাসসুন্দরী (ইং ১৮৯৯ সনে) মারা গেছেন। প্রায় একশত বছরের সামাজিক পরিবর্তনকে কিছুটা হলেও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। তার ৮৮ বছর বয়সের লেখায় বারবার এসেছে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা। তিনি অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছেন এই পরিবর্তনে। রক্ষণশীল সামন্ত সমাজের মন মানসিকতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সুদৃঢ়। আমরা যদি এই মহীয়সী নারীর সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারি, সে ব্যর্থতার দায়ভার আমাদের।
রাসসুন্দরী প্রথাগতভাবে নিজের নামের শেষে 'দাসী' ব্যবহার করেছেন। পরবর্তী যুগ তাকে 'দেবী'র সম্মান দিয়েছে। আমরা শুধু এটুকুই বলবো, আমরা যারা বিভিন্ন মানবাধিকার বা নারীর মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী হিসেবে দাবি করি, আমরা যারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চার দাবি করি, আমরা যারা শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালো' বলে সেস্নাগান দেই তাদের সকলের কাছে রাসসুন্দরী এক অনন্য অগ্রবর্তী পথিক। রাসসুন্দরীর দুশো বছরের জন্মবার্ষিকীতে তাদের সকলের হয়ে এই বিশাল ব্যক্তিত্বের প্রতি বিনত চিত্তে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা। তার জীবন, তার 'আমার জীবন' আমাদের কাছে আজও এক গভীর বিস্ময়। আমরা তার সঠিক মূল্যায়ন হয়তো আজও করতে পারিনি। অথচ এমন জীবনই তো নির্দ্বিধায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জন্যে রেখে যেতে পারে সেই স্পর্ধিত অহংকার যা বলতে পারে, 'আমার জীবনের লভিয়া জীবন, জাগোরে সকল দেশ'।