Thursday, November 19, 2009

রাসসুন্দরী দাসী

0 comments
            বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী রচনাকার রাসসুন্দরী দাসীর দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি
                                                     এক পিঞ্জরে বাঁধা বিহঙ্গীর আমার জীবন

বহু দিন পর কোন বই এত মন দিয়ে পড়লাম। এবার পূজায় কোলকাতায় গিয়েছিলাম। ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে উপহার পেলাম রাসসুন্দরীর 'আমার জীবন'। রাসসুন্দরী আমাদের রাজবাড়ীর অখ্যাত এক গ্রামে বসে দেড়শো বছর আগে নিজেকে লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই আগ্রহ নিয়েই বইটি প্রথমে পড়তে বসলাম। যতই পড়ছি ততই যেন নানাভাবে রাসসুন্দরী নামের ব্যক্তিত্বটি আমার সামনে আবিষ্কৃত হতে থাকলো। নির্দিষ্ট কোন এলাকার সীমানায় তাকে আসলে বাঁধা যায় না।

রাসসুন্দরী এমন এক নারী, এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি পিঞ্জরে বাঁধা থেকেও একান্ত মানসিক শক্তির জোরেই দূর আকাশে মুক্ত ডানা মেলতে পেরেছেন। সম্পূর্ণ অবগুণ্ঠিতা এক ঘরোয়া নারী হিসেবে নিজের যুগ, নিজের কাল, নিজের পরিবেশের সমস্ত চিহ্ন তিনি শরীরে ও মনে ধারণ করেছেন। অন্যদিকে তার প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা ও নারীর মানবাধিকার অর্জনের সংগ্রামে তিনি যুগোত্তীর্ণ তো বটেই। তার সমস্ত উপলব্ধি কর্মতৎপরতা একদিকে তার নিজের আত্মবিকাশ ও মুক্তির জন্য অন্যদিকে তার দীর্ঘ জীবন এক পচা-গলা সমাজের বিরুদ্ধে সবল প্রতিবাদ। তাকে চেনা ও জানাটা আমাদের দায়িত্ব।
এখন থেকে ঠিক দুশো বছর আগে রাসসুন্দরীর জন্ম। পাবনা জেলার পোতাদিয়া গ্রামে এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে তার জন্ম। পিতা পদ্মলোচন রায় রাসসুন্দরীর অতি শৈশনে মারা যান। কন্যা হিসেবে জন্ম নিলেও মা এবং অন্যান্য পরিজনের কাছে তিনি খুব আদুরে ছিলেন। অতি আদরেই কোন জোর কথা বা কটু কথা শোনার আগেই তিনি চোখের জলে বুক ভাসাতেন। খেলার সাথীরা এ নিয়ে তাকে অনেক সময় রীতিমতো লাঞ্ছনা-গঞ্জনা করতো। নীরবে চোখের জলে এগুলো সহ্য করতেন ছোট্ট রাসসুন্দরী। কারণ তার মনে সব সময় একটা ভয় কাজ করতো। দুষ্ঠুদের ছেলেধরা ধরে নিয়ে যায়, ছোটবেলায় বড়দের মুখে শোনা এ কথাটা তিনি বিশ্বাস করতেন। খেলার সাথীরা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে এই কারণে তার কান্না আসতো না। ছেলেধরা যদি দুষ্ঠু সাথীদের ধরে নিয়ে যায় কিংবা পরিজনরা যদি তাদের বকে এই ভয় কাজ করতো সব সময়।
রাসসুন্দরীর পরিজনেরা অতিমাত্রায় রক্ষণশীল ছিলেন না। তাই মেয়েদের লেখাপড়ার প্রচলন না থাকলেও বাড়ীর বাইরে স্কুলে ছেলেদের পড়ার পাশে রাসসুন্দরীকে বসিয়ে রাখতেন। চিৎকার করে এক সাথে ছেলেরা বাংলা বর্ণমালা উচ্চারণ কতো এবং মাটিতে অাঁক দিয়ে লেখা শিখতো। রাসসুন্দরী তার শিশু মনে অক্ষরগুলো গেঁথে নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ সুযোগ বেশিদিন থাকেনি। ছোটবেলা থেকেই দৈহিক রূপের কারণে সবাই তাকে 'সোনার পুতলী' বলতো। কার মেয়ে? কার মেয়ে? বিভিন্নজনের এ জিজ্ঞাসাবাদের সুবাদে বাবার নামটা তার কানে আসে। ছোটবেলা থেকে মায়ের হাতে শাঁখা বা শরীরে কোন গয়না না দেখে রাসসুন্দরীর বিশ্বাস ছিল তার মায়ের বিয়ে হয়নি। আট বছর বয়সে অন্যের মুখে বাবা হিসেবে পদ্মলোচন রায়ের নাম শুনে ভীষণ মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ে যান তিনি। 'এত দিবস আমি জানিতাম, আমি আমার মায়ের কন্যা'। রাসসুন্দরীর জীবনে তাঁর মায়ের আদর্শ এবং ভূমিকা ছিল অপরিসীম। জীবনের সকল আনন্দ-বেদনায় সংকটে 'দয়ামাধব' বা 'পরমেশ্বর'ই একমাত্র বন্ধু, একমাত্র শক্তি। নেপথ্যচারিণী মায়ের এই বীজমন্ত্র আজীবন আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে অাঁকড়ে ধরেছেন রাসসুন্দরী। নিজের একাগ্রতা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম, সংগ্রাম, দুঃখ-বেদনা-সাফল্য সব কিছুই সেই পরমেশ্বর বা একের কাছ থেকে প্রাপ্তি বলে বিশ্বাস করেছেন। বাবার বাড়ির বিগ্রহের নাম 'দয়ামাধব' শ্বশুর বাড়ির 'মদন গোপাল'। নাম যাই হোক রাসসুন্দরীর কাছে এক পরমেশ্বরই সকল শক্তির উৎস। শৈশবে এই বিশ্বাসের সাথে ছিল স্বভাবসুলভ সরলতা। একবার ভাইবোন মিলে তারা একমাঠে সন্ধ্যায় পথ হারিয়ে ফেলেন। এক ব্যক্তি তাদের বাড়ি পেঁৗছে দিয়ে যায়। রাসসুন্দরীর বিশ্বাস দয়ামাধব তাদের হাত ধরে বাড়িতে দিয়ে যায়। 'দয়ামাধবের মুখে কি দাড়ি থাকে?' আপন ছোট্ট ভাই-এর প্রশ্নে সংবিৎ ফিরে পান তিনি। এবং রীতিমত মানসিক দ্বন্দ্বে পড়েন। দয়ামাধবই ডাক শুনতে পেয়ে অন্য ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্যে পাঠান। মায়ের এই উত্তরে প্রশ্ন থেমে থাকে না। মন্দিরের দেবতা কী করে মানুষের কথা শুনতে পান? এরও সমাধান দিয়েছিলেন রাসসুন্দরীর মাতা_ 'তাহাকে যে যেখানে থাকিয়া ডাকে, তাহাই তিনি শুনেন। বড় করিয়া ডাকিলেও তিনি শুনেন, ছোট করিয়া ডাকিলেও শুনিয়া থাকেন... এই এক পরমেশ্বর সকলেরই; সকল লোকেই তাঁহাকে ডাকে, তিনি আদিকর্তা' মায়ের এই শিক্ষায় ঈশ্বর আর তার কাছে চার দেয়ালে কখনও বন্দী হননি। মা এবং পরমেশ্বর রাসসুন্দরীর সারা জীবনের সাথী।
১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় রাসসুন্দরীর। সময় বিচারে বেশি বয়সেই তার বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের জন্যে মোটেই মানসিক প্রস্ততি ছিল না তার। বিয়ের শাড়ি-গয়না-বাজনা ধুমধামে তিনি নিজেও আনন্দ ভরপুর ছিলেন। এত সরল ছিলেন যে বরপক্ষ আনন্দ শেষে নিজেরাই বিদায় নেবে এমন ধারণা ছিল তার। সকলের কান্নাকাটি আর প্রস্তুতির ধরন দেখে যখন বুঝলেন বরপক্ষের সঙ্গে তাকেও যেতে হবে তখনই বুকফাটা কান্নায় মাকে জড়িয়ে আকুতি 'মা, তুমি আমাকে দিওনা।' বাস্তবে সে আকুতি রক্ষার উপায় কারোরই ছিল না। মা ও পরিজনদের ছেড়ে এলেন ভিন্ন এলাকার ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন পরিজনের মাঝে। এবং আজীবন সেই ভিন্ন অধীনতাকে মেনে নেয়া একটি মেয়ের জন্যে যে কী কষ্টকর তা অত্যন্ত সাবলীলভাবে রাসসুন্দরী নিজেই ফুটিয়ে তুলেছেন। 'যখন দুর্গোৎসবে কি শ্যামাপূজায় পাঁঠা বলি দিতে লইয়া যায়, সেই সময় সেই পাঁঠা যেমন প্রাণের আশা ত্যাগ করিয়া হতজ্ঞান হইয়া মা-মা-মা বলিয়া ডাকিতে থাকে আমার মনের ভাবও তখন ঠিক সেই প্রকার হইয়াছিল। ...লোকে আমোদ করিয়া পাখি পিঞ্জরে বন্ধ করিয়া রাখিয়া থাকে, আমার যেন সেই দশা ঘটিয়াছে। আমি ঐ পিঞ্জরে এ জন্মের মতো বন্দী হইলাম। আমার জীবদ্দশাতে আর মুক্তি নাই' রাসসুন্দরী নিজের কথা লিখতে যেয়ে বহুবার এই পিঞ্জরে বাঁধা পাখির সাথে নিজের তুলনা করেছেন। যদিও বাঙালি নারীর সে আমলের শ্বশুরবাড়ির নিগ্রহ এবং নির্যাতনের দিকগুলো তার আত্মজীবনীতে স্পষ্ট নয়। না থাকাটাই স্বাভাবিক। স্বামী শ্বশুরবাড়ির কথিত মর্যাদা আজকের যুগেও অধিকাংশ মধ্যবিত্ত বাঙালি নারী রক্ষা করে চলার চেষ্টা করেন। তাছাড়া হয়তো এই সামন্ততান্ত্রিক পরিবারটি অপেক্ষাকৃত রুচিশীল ছিলেন। রাসসুন্দরীর বিয়ে হয়েছিল রাজবাড়ী জেলার 'ভর রামদিয়া' গ্রামে। জোতদার ও অবস্থাপন্ন এক পরিবারে। স্বামী নীলমনি সরকার। রাসসুন্দরী তার জীবনীর মূল খ-ে স্বামী সম্পর্কে 'বেশ লোক' ছিলেন মর্মে উক্তি করেন। স্বামী সম্পর্কে নিজের লেখায় তেমন কিছু বলা হয়নি বুঝতে পেরে পরবর্তীতে খুব অল্পেই স্বামী নীলমনি সরকারের চেহারাটা ফুটিয়ে তোলেন। শরীরে, কণ্ঠে এবং মেজাজে রাশভারী ব্যক্তি। একদিকে দিলদরিয়া। অন্যদিকে জাগাজমি নিয়ে দিনের পর দিন মামলা-মোকদ্দমা ও কাইজা করার নেশা। রাসসুন্দরী এসব পছন্দ করতেন না। কিন্তু তিনিও স্বামী নামক কর্তা ব্যক্তিটিতে অত্যন্ত সমীহ করতেন। সকলের খাবারের আগে তার খাবার দেয়া, নম্রভাবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, সকল ক্ষেত্রে তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া সে যুগের আর পাঁচটা বাঙালি নারীর মতোই মেনে চলেছেন রাসসুন্দরী। কর্তা ব্যক্তিটির প্রভাব এতই বেশি যে কর্তার ঘোড়া জয়হরিকে দেখলেও একহাত ঘোমটা দিয়ে লজ্জায় পালাতেন। তাকিয়ে দেখতে কণ্ঠাবোধ করতেন। শ্বশুরবাড়ি যখন প্রথম এলেন তখন শাশুড়ি জীবিত। তিনিই পরিবারের প্রধান। ক্রমে তিনি অসুস্থ হলেন। এক সময় মারা গেলেন। সংসারের কর্তৃত্ব এল রাসসুন্দরীর ওপর। দেওর-ভাসুর কেউ ছিল না। কিন্তু একে একে তিন ননদ বিধবা হয়ে সংসারে এল। তাদেরকেও মেনে চলতে হতো পদে পদে। এরই মধ্যে এক এক করে বারোটি সন্তানের মা হয়েছেন। ক্রমে পুত্রবধূ, জামাতা, নাতি, নাতনী। সংসারের এক অবস্থা থেকে আর এক অবস্থায় নিজের অবস্থান পাল্টেছে। শরীরের, মনের পরিবর্তন হয়েছে। ভূমিকা পাল্টে গেছে। এই সব কিছুই সবিস্ময়ে বিশ্লেষণ ও লক্ষ্য করেছেন রাসসুন্দরী। তার ভাষায় এক সময়_ 'নতুন বউ নামটি বাদ গেল। মা, বউ, বউঠাকুরানী, বাবুর মা, কর্তা মা, কর্তা ঠাকুরানী এই প্রকার অনেক নতুন নতুন নাম হইল। এককালে বাল্যকাল পরিবর্তিত হইয়া আমি একজন পুরাতন মানুষ হইলাম।' নিজেই বিস্মিত হতেন নিজের পরিবর্তনে 'আমি এখন আচ্ছা একজন গৃহস্থ হইয়াছি এ আবার কি কা-। এখন অধিকাংশ লোক আমাকে বলে কর্তা ঠাকুরানী। দেখা যাক, আরও কী হয়'। নিজের ৬০ বছর বয়সে লিখেছিলেন 'আমার নাম মা, আমার পিত্রালয়ে যে নাম ছিল তাহাতো অনেক কাল লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে আমি সকলেরি মা' এক সময় ছিল যখন- 'পক্ষীটা কী, গাছটা কী, কুকুরটা কী, বিড়ালটা কী যাহা দেখিতাম আমার জ্ঞান হইত যে আমার বাপের বাড়ির দেশ হইতে আসিয়াছে, এই ভাবিয়া কাঁদিদতাম' ক্রমশ চোখের জল শুকিয়ে এসেছে। সম্পূর্ণ দায়িত্ব এবং কর্তৃত্ব নিয়ে স্বামীর সংসার করেছেন। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির বিষয়-আশয়-ঐশ্বর্য-কর্তৃত্ব কোনকিছুই তার নারী মনের বেদনা, যন্ত্রণা ও ক্ষোভকে কখনই প্রশমিত করতে পারেনি। নিজের মায়ের কথা সব সময় মনে পড়তো। মা'র কাছে ইচ্ছে মতো যেতে পারেননি, সেবা করতে পারেননি, মা'র কোন উপকার করতে পারেননি এই যন্ত্রণা তার মধ্যে তীব্রভাবে ছিল। 'আমি এখানে (শ্বশুরবাড়ি) আসিয়া অবধি দায়মালী কারাগারে বন্দী হইয়াছি। এই সংসারের কাজ চলিবে না বলিয়া প্রাণান্তেও আমাকে পাঠানো হইত না' যদিবা কখনও পাঠানো হতো সাথে থাকতো বড় বাড়ির অহংকার দশ-পনেরো জন পাহাদার, সরদার দাস-দাসী। তারা সাথে যেত, ধার্য দিন মতো সাথে নিয়ে আসতো। মায়ের মৃত্যুকালেও তিনি যেতে পারেননি। 'আমার নারীকুলে কেন জন্ম হইয়াছিল? আমার জীবন ধিক্। পৃথিবীর মধ্যে মাতার তুল্য স্নেহময়ী আর কে আছে। এমন যে দুর্লভ বস্তু মা, এই মায়ের সেবা করিতে পারি নাই। আহা এ দুঃখ রাখিবার কী স্থান আছে? আমি যদি পুত্র সন্তান হইতাম আর মার আসন্ন কালের সংবাদ পাইতাম, তবে আমি যেখানে থাকিতাম, পাখির মতো উড়িয়া যাইতাম। কি করিব, আমি পিঞ্জরবদ্ধ বিহঙ্গী।'
নারী হিসেবে এই সমাজে জন্মে যে বিড়ম্বনা তা প্রতিমুহূর্তে রাসসুন্দরী উপলদ্ধি করেছেন। সে যুগের মোটা মোটা কাপড়। শরীর ভরা ভারী গহনা। এক হাত ঘোমটা 'যেন কলুর বলদের মত দুই চক্ষু ঢাকা থাকিত। আপনার পায়ের পাতা ভিন্ন অন্য কোন দিকে দৃষ্টি চলিত না' অবস্থা সম্পন্ন পরিবারের বউ তিনি। দাস-দাসী যা ছিল তাদের কর্মক্ষেত্র ভিন্ন। এক এক বেলা ১০/১২ সের চাউল ও সেই সাথে অন্যান্য ব্যঞ্জনা রান্নার দায়িত্ব, সংসার ঠিক রাখার দায়িত্ব, ছেলে-মেয়ে প্রতিপালনের দায়িত্ব, সবই নিখুঁতভাবে পালন করতে হতো। 'ছেলেগুলো কাঁদিলে কর্তাটি কাঁদে কেন? কাঁদে কেন? বলিয়া উচ্চস্বরে সোর করিবেন' অর্থাৎ কর্তা ঘরে এলে ছেলে কাঁদাও অপরাধ। তার পর আছে বিগ্রহের পূজা-অর্চনা সেবার দায়-দায়িত্ব।
এই অবস্থা ও পরিবেশে থেকেও আবহমান বাঙালি সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে আপাত অবগুণ্ঠিত এই নারী সব সময় চিন্তা করেছেন। উপলব্ধি করেছেন নারী-পুরুষের সামাজিক বৈষম্যর নিগড়ে নারীর যন্ত্রণা। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে নারী হিসেবে বঞ্চনার দিকগুলো তিনি সুচিহ্নিত করেছেন। ধীর গতিতে, শান্ত মেজাজে, সুকোমল স্পর্শে সংসারে তিনি সব সময় কল্যাণী নারী হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত হয়েছেন। কিন্তু তার মনের মধ্যে সব সময়ের দ্বন্দ্বের যে ওঠানামা, নিজেকে প্রকাশের জন্যে অস্থিরতা, নিজেকে প্রকাশের জন্যে যে ব্যাকুলতা তা যদি তিনি প্রায় ৬০ থেকে ৮৮ বছর বয়স পর্যন্ত সময় ধরে না লিখে যেতেন তাহলে এক অবগুণ্ঠিত সাধারণ নারীর অসাধারণত্ব চেনাজানার আড়ালেই থেকে যেত।
রাসসুন্দরীর জীবনের সবচেয়ে বড়ো নিষ্ঠার, একাগ্রতার ও ধৈর্যের জায়গা ছিল তার লেখাপড়া শেখাটা। যে যুগে তিনি জন্মেছিলেন সে যুগে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাটা রীতিমতো সামাজিক অপরাধ হিসেবে পণ্য হতো। রাসসুন্দরীর পুঁথি পড়ার ইচ্ছেটা বউ অবস্থাতেই প্রবল হয়ে ওঠে। 'কি জ্বালা হইল, কোন মেয়ে লেখাপড়া শেখে না, আমি কেমন করিয়া লেখাপড়া শিখিব, একি দায় হইল' দেশের সমাজের আর যা কিছু ভালো থাক না কেন 'কিন্তু এই বিষয়টি ভারী মন্দ ছিল। সকলেই মেয়েছেলেকে বিদ্যায় বঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছিলেন। তখনকার মেয়েছেলেগুলো নিতান্ত হতভাগা, প্রকৃত পশুর মধ্যে গণনা করিতে হইবেক'। মেয়েদের লেখাপড়া শেখায় মেয়েরা নিজেরাও প্রবল বাধা ছিল। 'মেয়েছেলের হাতে কাগজ দেখিলে সেটি ভারী বিরুদ্ধ কর্ম জ্ঞান করিয়া বৃদ্ধ ঠাকুরানীরা অতিশয় অসন্তোষ প্রকাশ করিতেন'। নিজের পুঁথি পড়ার চেষ্টার প্রাক্কালে ননদদের সম্পর্কে তিনি নিজেও ভীত ছিলেন। 'আমার ননদ তিনটি আছেন, তাহারা যদি আমাকে পুঁথি পড়িতে দেখেন, তবে আর রক্ষা নাই' যদিও পরবর্তী সময়ে নিজের ব্যক্তিত্বের দ্বারা ননদদের পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলেন। এমনকি তাদেরকে লেখাপড়া শেখানোরও চেষ্টা করেন। পড়তে না পারার কষ্ট তিনি শয়নে-স্বপনে, দিবসে-রাতে সকল কর্মসময়ে বয়ে ফিরতেন। কিন্তু একে মেয়ে তার পর বউ মানুষ। কারো কটু কথা শোনার ভয়ও সমানভাবে তাড়িত করতো। বহু প্রতীক্ষার পর একসয় চৈতন্য ভাগবত পুঁথিটা হাতের কাছে এল। কাঠের আড়িয়া লাগানো হাতে লেখা নানা চিত্রবিচিত্র দৃষ্টি কাড়া একটি পুঁথি। লুকিয়ে একটি পাতা খুলে রাখলেন। পাতাটা রাখবেন কোথায়? নিন্দা ও কটুবাক্যের ভয়ে রান্না ঘরে খড়ির নিচে পাতাটি লুকিয়ে রাখলেন। কিন্তু দেখার অবকাশ কোথায়? বড় সংসারের বড় কর্মব্যস্ততা। স্বামী-সন্তানের দায়িত্ব পালন_। 'সকল দিবস সংসারের কাজে অবকাশ পাওয়া যায় না। রাত্রে পাক-সাক করাতেই ভারি রাত্রি হয়ে যায়। তখন ঐ সকল কাজ মিটিতে না মিটিতে ছেলেপেলেগুলো জাগিয়ে উঠিয়া বসে। তখন কী অন্য কোন কথা! তখন কেহ বলে মা মুতিব, কেহ বলে মা খিদে লেগেছে, কেহ বলে মা কোলেনে, কেহ বা জাগিয়া কান্না আরম্ভ করে' তারপরেও অদম্য আগ্রহ থেমে থাকে না। ছেলের তালপাতায় লেখা একটি পাতাও লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু কীভাবে পড়বেন? সেই ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার পাশে বসে থাকার দিনগুলোকে মনে করার চেষ্টা করতে থাকেন। 'পুস্তকের পাতাটি, তালের পাতাটি মনের অক্ষরের সাথে সাথে মিলাইয়া দেখিতাম। আমি অনেক দিবস অনেক পরিশ্রমে, অনেক যত্নে এবং অনেক কষ্ট করিয়া ঐ চৈতন্য ভাগবত পুস্তকখানি গোঙাইতে শিখিলাম...। আমার এত দুঃখের পড়া। বস্তুত আমি এত কষ্ট করিয়া পড়িতে শিখিয়াও তাহা লিখিতে শিখিলাম না' মেয়ে মানুষকে লেখাপড়া শিখতে হয় না। স্ত্রী জাতির জন্যে এটা প্রধান দোষ সেই সময়ের এই সমাজ ভাবনা সব সময় রাসসুন্দরীকে পীড়া দিত। কষ্ট করে পড়তে শেখার পর লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ির সব বই পড়ে ফেলেন। যে ব্যক্তি কোনদিন কারো কাছে কিছু চাননি সেই ব্যক্তি অতি সংকোচে নিজের ছেলের কাছে বাল্মিকী রামায়ণ সপ্তকা- বইটি চান। ছেলে কলকাতায় যেয়ে বইটি পাঠিয়ে দেন। এই প্রথম ছাপার অক্ষরে লেখা বই তার সামনে এল। প্রথম প্রথম ছোট ছোট অক্ষর বহু কষ্টে তিনি পড়তে শুরু করলেন। তারপর_ 'দেখিলাম সে কালের হাতের লেখা অপেক্ষা ছাপার অক্ষরই উত্তম'। এবার ছেলে কিশোরীলালের অনুরোধ মাকে চিঠির উত্তর দিতে হবে। কীভাবে দেবেন? ছেলে কোন কথাই মানতে নারাজ। কালি-কলম-কাগজ এর যোগান হলো। মধ্য বয়সে শুরু হলো নতুন অধ্যবসায়। হাতের লেখা শেখার। ছেলের চিঠির উত্তরতো দিতেই হবে। পঞ্চাশোর্ধ্ব গৃহিণী এক নারী সংসারের সকল ব্যস্ততার মাঝে লিখতে শুরু করলেন। ছেলের চিঠির উত্তর লেখা শিখতে যেয়ে লিখে ফেললেন_ 'আমার জীবন' আত্মকাহিনী। এ এক গভীর বিস্ময়ের বিষয়। ১৮৭৬ সনে রাসসুন্দরীর ৬৭ বছর বয়সে প্রথম বইটি ছাপা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় বইটির সংস্কারণ প্রকাশিত হয়। তার ৮৮ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি লিখতেই থাকেন। সম্পাদক ও প্রকাশকদের মতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী রাসসুন্দরী'র লেখা 'আমার জীবন' সেই হিসাবেও তার লেখার মূল্যায়ন অপরিসীম।
রাসসুন্দরীর সহজ-সরল ব্যক্তিত্বকে আমরা খুঁজে পাই তার লেখায়। তারই মতো তার ভাষা এবং প্রকাশ অত্যন্ত অনায়াস ও সরল। বারবারই যে কথাটি না বললে নয়, তিনি তার জীবনে সাংসারিক সমস্ত দায়দায়িত্ব অত্যন্ত সুষ্ঠু এবং বিচক্ষণতার সাথে পালন করেছেন। কিন্তু সংসারের বিষয় ঐশ্বর্যের মোহ তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। মায়ের মৃত্যু, ১২টি গর্ভজাত সন্তানের মধ্যে চোখের সামনে সাত সাতজনের মৃত্যু; নাতি-নাতনীর মৃত্যু, তাকে প্রচ- কষ্ট দিয়েছে। শেষ বয়সে এসে স্বামী হারিয়েছেন। স্বামীর প্রতি সমীহ ছিল। উচ্ছ্বাস ছিল না। সে যুগের প্রভাবশালী সামন্ত জোতদার পরিবারের বউ হিসেবে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্বকর্তব্য পালনে ত্রুটি করেননি। স্বামীর মৃত্যুতে বলেছেন_ 'এক্ষণে শেষ দশাতে বৈধব্য দশা ঘটিয়েছে। কিন্তু একটি কথা বলিতেও লজ্জা হয়। শুনিতেও দুঃখের বিষয় বটে।
_শত পুত্রবতী যদি পতিহীন হয়।
তথাপি তাহাকে লোকে অভাগিনী কয়_
বাস্তবিক যদি আর কিছু না বলে তুমি বিধবা হইয়াছ, কথাটি বলিতেই চাহে'। সে যুগের বিধবা হিন্দু নারীর চুল কেটে ফেলতে হতো। এ বিষয়েও সমাজকে তিনি কটাক্ষ করেই কথা বলেছেন। স্বামী ছাড়া নারী সমাজের চোখে হেয় এই মানসিকতাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
রাসসুন্দরীর জীবন সম্পূর্ণভাবে নিজের হাতে গড়া। পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রবল প্রতিপত্তিশালী স্বামী অর্থাৎ কর্তা ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার বিনা অনুমতিতে প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্যে পার্শ্ববর্তী তেতুলিয়া গ্রামের মীর আমুদে নামের প্রতিপত্তিশালী জোতদারকে চিঠি দিয়ে ডেকে আনেন। এবং তার সাথে তিন পুরুষের চলমান মামলা-মোকদ্দমার লিখিত আপোষ নিষ্পত্তি করেন। এক হাত ঘোমটা দেওয়া এক অন্তঃপুরবাসিনীর এই দুঃসাহস তার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। এই ব্যক্তিত্বের কাছে কর্তা ব্যক্তিটিও শেষ পর্যন্ত বিনত হতে বাধ্য হন।
সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনায় পূর্ণ এই সংসার জীবনে সকলের সাথে থেকে সব কিছুর মাঝেও রাসসুন্দরী ছিলেন একাকী। তার নিজস্ব জগত পূর্ণ ছিল একদিকে ঈশ্বরের প্রতি আস্থায়, অন্যদিকে শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের প্রতি প্রবল আগ্রহে। সংসারে থেকে সংসারে নিরাসক্ত এই মানুষটি একটি পরিপূর্ণ জীবনাদর্শে আনন্দে বিভোর ছিলেন। নিজে সবসময় নিজের মনের সঙ্গে কথা বলতেন। 'মন মুখে বলি বটে, কিন্তু কর্মের দ্বারা দেখিতে পাই তোমার অসীম শক্তি, তুমি পলকে এই পৃথিবী পর্যটন করিয়া আসিয়া থাক। তোমার সঙ্গে অন্য কারো তুলনা হয় না'। একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় জর্জরিত শোকসপ্তপ্ত মনকে নিজেই নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। 'সংসারী লোকের প্রতি পরমেশ্বর সম্পদ বিপদ দুইই সমান করিয়া দিয়াছেন। কেহ বা কষ্টের কথাটি আগ্রহ করিয়া মনে রাখিয়া সতত কষ্ট ভোগ করিতেছে। কোন লোক এমনও দেখা যায় তাহাদের শত শত বিপদের রাশি সম্মুখে থাকিলেও তারারা সেদিকে দৃষ্টিপাত করেন না।' নিঃসন্দেহে তিনি নিজে এই দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্যক্তিত্বের মধ্যে পড়েন। একাধিক পুত্রশোক যন্ত্রণা দিবারাত্র বুকের মধ্যে জ্বলছে। কিন্তু সেই শৈশবে মায়ের শেখানো প্রগাঢ় ঈশ্বর বিশ্বাস_ 'সেই মহৌষধি আমার অস্থিভেদী হইয়া রাখিয়াছে। আমার শরীর মন যখন বিষয়ের হলাহলে এককালে আচ্ছন্ন ও অবশ হইয়া পড়ে তখন আমার সেই অস্থিভেদী বিশল্যকরণী প্রবল হইয়া আমার শরীরের সমুদয় ব্যাধি শান্তি করিয়া আনন্দ রসে মনকে পরিতোষ করে।' এ যেন সেই জীবনদর্শন যা রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় ও আমরা খুঁজে পাই বস্তুত এই নারীকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখার এবং বুঝার রয়েছে তিনি বলেছেন 'আমাদের হৃদয় প্রকোষ্ট এমন রত্নপূর্ণ রহিয়াছে যে (আমরা এমন হতভাগ্য) তাহা আমরা খুলিয়া না দেখিলে দীনদরিদ্রের মতো হাহাকার করিয়া দিবারাত্রি কাঁদিয়া বেড়াই। একি সামান্য দুঃখের বিষয়_ ভাবিয়া দেখিলে হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়'।
রাসসুন্দরী রামদিয়া গ্রামের দীর্ঘ অন্তঃপুরের জীবনে একটি দিনও নষ্ট করেননি। নিজেকে স্বশিক্ষিত করেছেন। শিক্ষার জন্য ব্যাকুল মন প্রাণ নিয়ে সংসারের কাজকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। এই পিঞ্জরাবদ্ধ বিহঙ্গী নিজের মনোজগতে সব সময় ছিলেন স্বাধীন এবং আনন্দে ভরপুর। তিনি নিজেও জানেন_ 'আমার লেখাপড়া বড় সহজ কষ্টে হয় নাই। যাকে বলে কষ্ট' অসীম ধৈর্যের সাথে এই কষ্ট তিনি করেছেন। তারপরেও অতৃপ্তি থেকে গেছে। দুর্লভ মনুষ্য জন্মের সম্পূর্ণ দেনা তিনি পরিশোধ করতে পারেননি। এই ভেবে বারবার আক্ষেপ করেছেন_ 'এই রত্নপূর্ণ ভারতবর্ষ। এই ভারতবর্ষে কত শত অমূল্য রত্নের খনি রহিয়াছে। কত দরিদ্র ঐ রত্ন সঞ্চিত করিয়া মহাজন হইয়া বসিয়াছে। সেই ভারতবর্ষে আসিয়া আমি ৮৮ বৎসর পর্যন্ত আছি। এত দিবস কী কাজ করিয়াছি?... আমার বৃথা কাজে দিন গেল। আমার মানবজন্ম বৃথা হইল। ভারী আক্ষেপের। মনে হইলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়।'
রাসসুন্দরী লেখা অনুযায়ী তিনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী ছিলেন। বিশেষ কোন রোগবালাই ছিল না। শরীর, মন ও সাজের অবস্থানের পরিবর্তনকে তিনি সবিস্ময়ে পর্যালোচনা করেছেন এবং মেনে নিয়েছেন। 'সংসার যাত্রায় তুমি আমা হইতেই আমাকে কত প্রকার সাজ সাজাইয়া আনিয়া দেখাইতেছ-' ঈশ্বরের প্রতি এমনই ছিল তার স্বগত উক্তি। 'লোকে বলে সংসার সমুদ্র। সে সমুদ্র বটে। কিন্তু সংসারের সাথে সমুদ্র তুলনা করিয়া দেখিলে সংসার তরঙ্গ হইতে সমুদ্রের তরঙ্গ বোধ হয় বড় জয়ী হইতে পারে না। সময়ে সময়ে তুল্যই হয়-' এই সংসার সমুদ্র তরঙ্গের কোন ঝড়-ঝাপটায় তিনি অবসন্ন হননি। ডুবেছেন আবার ভেসেছেন। যেমন এক সময় সর্বদা নানাবিধ ভয়ে কম্পমান ছিল সেই ভয়কে তিনি শেষ পর্যন্ত পরাস্ত করেন। প্রচ- মানসিক শক্তি ও একাগ্রতা দিয়ে তিনি পড়া শিখেছেন। লেখা শিখেছেন। গদ্য, পদ্য, গান লিখেছেন, গান গেয়েছেন। মানুষের সাথে মিশেছেন। মানুষকে ভালবেসেছেন। নিজের মনকে নিয়ে তার নিজেরই ছিল অগাধ বিস্ময়।
'মনের যে ভাব দেখি আশ্চর্য কেমন।
চাঁদ ধরিবারে ধায় হইয়া বামন\\'
দুই হাতে সংসারের কাজ, সন্তানদের বুকে সাপটে রাখা- 'অন্য দুই হস্তে আমার মন যেন চাঁদ ধরিতে চাহে। আহা কি আশ্চর্য। মনের ভাবভঙ্গী দেখিয়া আমার মুখে আর বাক্য সরে না'। তিনি নিজে বামন হয়ে চাঁদ ঠিকই ধরেছিলেন। অসাধ্য সাধন করছেন তিনি। স্ত্রী শিক্ষা দ-নীয় অপরাধ_ সমাজের এই রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে নিজের জীবনেই এক বিরাট বিপ্লব ঘটিয়েছেন। এক অবরোধবাসিনী নারীর হাতেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী 'আমার জীবন'। দক্ষ জীবনীকারের মতোই সচেতন ছিলেন তিনি। জীবনী লিখতে গিয়ে লিখেছেন- 'আমি যদি আপনার নিন্দিত কর্ম বলিয়া কিছু গোপনে রাখিয়া থাকি পরমেশ্বর তাহা তুমি প্রকাশ করিয়া দাও। আমার যে কথা স্মরণ না থাকে তাহা তুমি আমাকে স্মরণ করাইয়া দাও।' বইটি প্রথম প্রকাশনার সময় তিনি লেখেন_ 'এই বই খানি আমার নিজ হস্তের লেখা। আমি লেখাপড়া কিছুই জানি না। অধিকারী মহাশয়েরা তোমরা যেন অবহেলা না কর, দেখিয়া ঘৃণা করিও না' রাসসুন্দরী জানতেন না তার এই লেখা অবহেলার কোন বিষয় তো নয়ই। বরং বিস্ময় ও গৌরবের। ৯০ বছর বয়সে রাসসুন্দরী (ইং ১৮৯৯ সনে) মারা গেছেন। প্রায় একশত বছরের সামাজিক পরিবর্তনকে কিছুটা হলেও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। তার ৮৮ বছর বয়সের লেখায় বারবার এসেছে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা। তিনি অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছেন এই পরিবর্তনে। রক্ষণশীল সামন্ত সমাজের মন মানসিকতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সুদৃঢ়। আমরা যদি এই মহীয়সী নারীর সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারি, সে ব্যর্থতার দায়ভার আমাদের।
রাসসুন্দরী প্রথাগতভাবে নিজের নামের শেষে 'দাসী' ব্যবহার করেছেন। পরবর্তী যুগ তাকে 'দেবী'র সম্মান দিয়েছে। আমরা শুধু এটুকুই বলবো, আমরা যারা বিভিন্ন মানবাধিকার বা নারীর মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী হিসেবে দাবি করি, আমরা যারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চার দাবি করি, আমরা যারা শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালো' বলে সেস্নাগান দেই তাদের সকলের কাছে রাসসুন্দরী এক অনন্য অগ্রবর্তী পথিক। রাসসুন্দরীর দুশো বছরের জন্মবার্ষিকীতে তাদের সকলের হয়ে এই বিশাল ব্যক্তিত্বের প্রতি বিনত চিত্তে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা। তার জীবন, তার 'আমার জীবন' আমাদের কাছে আজও এক গভীর বিস্ময়। আমরা তার সঠিক মূল্যায়ন হয়তো আজও করতে পারিনি। অথচ এমন জীবনই তো নির্দ্বিধায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জন্যে রেখে যেতে পারে সেই স্পর্ধিত অহংকার যা বলতে পারে, 'আমার জীবনের লভিয়া জীবন, জাগোরে সকল দেশ'।

0 comments:

Post a Comment