Sunday, June 20, 2010

বাহাদুর শাহ্ পার্ক

0 comments
একসময় পুরনো ঢাকাই ছিল রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ঢাকায় ইংরেজদের কাচারি স্থাপিত হয় বাহাদুর শাহ পার্ককে ঘিরে। তারও প্রায় একশ’ বছর আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গদি বা ফ্যাক্টর ছিল বাহাদুর শাহ পার্কের পশ্চিম পাশের একটি বিরাট অট্টালিকায়। বাহাদুর শাহ পার্কের পূর্ব নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। তারও পূর্বে ছিল আন্টাঘরের ময়দান, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে আর্মেনীয়দের একটি ছোট দল নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে পুরনো ঢাকায় স্থিত হয়েছিল। তারা এখানে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য করত। বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় আর্মেনীয়দের ছিল একটা ক্লাবঘর। সারাদিনের কর্মক্লান্তি ভুলে সন্ধ্যা নাগাদ সেখানে তারা বিলিয়ার্ড খেলত। ডিম্বাকৃতির এই বিলিয়ার্ডকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলতেন আন্টা বা আন্ডা। এভাবে ক্লাবঘরটি আন্টাঘর নামে পরিচিতি পায়। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর্মেনীয়দের কাছ থেকে ক্লাবঘরটি কিনে নেন। পরে জীর্ণ ক্লাবঘরটিকে ভেঙে বানানো হয় ময়দান। ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ভারত শাসনের ভার গ্রহণ করেন ১৮৫৮ সালে। পূর্ববঙ্গের এ অঞ্চলে প্রশাসন হাত বদলের সেই ঘোষণাপত্র পড়া হয়েছিল ঢাকার আন্টাঘর ময়দানে। সেই থেকে আন্টাঘর ময়দানের নতুন নামকরণ করা হয় ভিক্টোরিয়া পার্ক নামে। আর এ আন্টাঘরের ময়দানকে (বর্তমান ভিক্টোরিয়া পার্ক) ঘিরে আছে আমাদের দু’শ’ বছরের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক নির্মম শোকাবহ ঘটনা। ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর দেশীয় পদাতিক বাহিনীর হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হলে ক্রমেই তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তখন ইংরেজ নৌ-সেনাপতি লে. লজ-এর নেতৃত্বে ইংরেজ সেনাবাহিনী লালবাগ সেনানিবাস ঘেরাও করে দেশি সিপাহিদের ক্যাম্প আক্রমণ করে। ফলে শুরু হয় এক অসম যুদ্ধ। এক ঘণ্টার এ যুদ্ধে ৪১ জন দেশীয় সিপাহি নিহত হন। আর বন্দি হন বেশ কয়েকজন। বন্দি দেশ সিপাহিদের আন্টাঘরের ময়দানে (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কে) সবার সামনে গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়। দেশি প্রজারা যাতে ভয় পায় সে জন্য ফাঁসির ব্যবস্থা করা হয়েছিল জনসমক্ষে। তবে সেদিন অকুতভয় এ বীরসেনানিরা স্বেচ্ছায় তুলে নিয়েছিলেন ফাঁসির রজ্জু। শোষিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত এ অঞ্চলের পরাধীন মানুষের আস্থার প্রতীক জাতীয় বীর সিপাহিদের এ বীরত্বে সেদিন নিরবে অশ্রু ফেলেছিল ঢাকাবাসীরা। সে সময় অনেক ভৌতিক কাহিনী গড়ে উঠেছিল আন্টাঘরের ময়দানকে ঘিরে। রাতের বেলা মানুষ এর আশপাশ দিয়ে চলাফেরা করতে ভয় পেত। তারও অনেক পরে (১৯৪৭ সাল) এদেশ থেকে ব্রিটিশ বেনিয়ারা বিতাড়িত হয়। জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র, পাকিস্তান আমলে শোকাবহ সিপাহি বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে মুঘল বাদশাহ সুলতান গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের স্মৃতিতে ভিক্টোরিয়া পার্ক নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক, এখনও মুক্তিকামী মানুষের শৌর্য-বির্যের প্রতীক হিসেবে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বাহাদুর শাহ পার্ক। পুরনো ঢাকার আনন্দ বিনোদনের একমাত্র এ স্থানটিতে বিকাল হতেই ভিড় জমান নানা বয়সী দর্শনার্থী। পার্কের মাঝখানে রয়েছে শরীরচর্চার বিভিন্ন সরঞ্জাম। তবে এগুলোর মান খুব নাজুক। পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে ল্যাম্পপোস্ট থাকলেও নেই লাইট। শরীরচর্চা করতে আসা নয়াবাজার এলাকার টুটুল বলেন, ব্যায়ামের ইনস্ট্রুমেন্ট অনেকটাই দুর্বল। কোনটা উঁচু কোনটা নিচু। এগুলো নতুন হওয়া দরকার, ব্যায়াম করতে প্রবলেম হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত দুই বন্ধু রবিন ও জেননি বলেন, আমরা মাঝে-মধ্যে আসি। জগন্নাথের ক্যাম্পাস ছোট ও হল না থাকায় জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের জন্য এটাই (বাহাদুর শাহ পার্ক) একমাত্র আড্ডা দেয়ার জায়গা। ঘুরতে আসা চার বন্ধু মনির, বাদশা, কমল ও শাহিন বলেন, এই পার্কটা আছে তাই অন্তত আড্ডা দেয়া যায়। জিমের জিনিসগুলো নতুন কইরা দিলে ভালো অইত। এগুলোর অবস্থা খারাপ।’ প্রায় প্রতিদিনই হাঁটতে আসেন সেলিনা সুলতানা (পেশায় শিক্ষিত), তিনি বলেন, এ পার্কটা আমাদের হাঁটার একমাত্র জায়গা। এখানে তেমন সমস্যা নেই। তবে আলোর ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। সন্ধ্যার পর পার্কের দক্ষিণ পাশটায় থাকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তাছাড়া ছোট এ পার্কটির উত্তর পাশে একটু খালি জায়গা থাকলেও বসার কোনো জায়গা নেই। তাই পার্কে আসা দর্শনার্থীদের বসে বিশ্রাম নিতে অসুবিধা হয়।

0 comments:

Post a Comment