Monday, July 26, 2010

রিউম্যাটিক ফিভার

1 comments
সাধারণত এক প্রকার ইনফ্লামেটর ডিজিজই রিউম্যাটিক ফিভার। রিউম্যাটিক ফিভার হতে পারে স্কারলেট ফিভার অথবা স্ট্রেপ থ্রোট জাতীয় ইনফেকশন থেকে। আর এই ইনফেকশনটির জš§ হয় গ্রুপ এ হিমোলাইটিক স্ট্রেপ্টোককাস নামক ব্যাকটেরিয়া থেকে। বড়দের চাইতে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সের বাচ্চাদের ওপর রিউম্যাটিক ফিভারের প্রভাবটা পড়ে অনেকখানি বেশি। ক্যান্সার বা মরণব্যাধীর মতো নিশ্চিত মৃত্যুর রোগ না হলেও এই ফিভারের ভোগান্তিটা মারাত্মক। বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য।

লক্ষণ :

০০ জ্বর, গলা খুশখুশ, গলায় ব্যথা হওয়া

০০ হাটু, গোড়ালি, কনুই, কবজিসহ যে কোনো জয়েন্টে ফুলে ওঠা এবং সাথে প্রচণ্ড ব্যাথা হওয়া

০০ সারা শরীরে, স্পেশালি কোমর, পা এবং হাতের উপরের লাল লাল র‌্যাশ বের হওয়া

০০ হাত ও পায়ের হাড় এবং টেন্ডনের ওপর চিঠির মতো (রিউম্যাটিক নোডিউলস) গ্রোথ ডেভেলপ করা।

আপনি যখনই লক্ষণ দেখে এনশিউর হবেন কিংবা মনে মনে সন্দেহ পোষণ করবেন যে কোনো বাচ্চার রিউম্যিাটিক কীভাবে ভুগছে সাথে সাথে সতর্ক থাকুন। যার রিউম্যাটিক ফিভার কিংবা সর্দি-কাশি তার থেকে অন্য বাচ্চাদের টিফিন খেতে দিবেন না। যদি মনে হয় যে বাচ্চার স্ট্রেট থ্রোট বা স্কারলেট ফিভার হয়েছে তাহলে অতিশীঘ্রই চিকিৎসা করান নইলে ইনফেকশন হয়ে রিউম্যাটিক ফিভারে সে আক্রান্ত হতে পারে। বাচ্চার রোগ নির্ণয়ের জন্য কিছু ব্যবস্থা নিতে পারেন। যেমন বারবার সর্দিকাশি হলে সময় মতো রক্ত (ASO Titer) এবং স্যালাইকা পরীক্ষা করাতে হবে। প্রয়োজন হতে পারে ইসিজি, জয়েন্টের এক্সরে করানোর। যদি সবধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে বাচ্চার রিউম্যাটিক ফিভার হয়েছে, তবে টানা ১০ বছর ধরে ২১ দিনে ১ বার করে পেনিসিলিন ইনফেকশন দেওয়া জরুরি। বাচ্চার ওজনের ওপর ডোজ নির্ভর করে। যার পেনিসিলিনে এলার্জি থাকে তার বেলায় এরিথ্রোমায়েসিন জাতীয় ওষুধ দেয়া হয়। ব্যথার জন্যে ব্যবহার করতে পারেন অ্যাসপিরিন ওষুধ দেয়া হয়। ব্যাথার জন্যে ব্যবহার করতে পারেন অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ। তবে সাবধান থাকুন রোগ নির্নয়ের ব্যাপারে। কেননা রোগ নির্ণয় যদি সঠিকভাবে না হয় তবে নানা ধরনের সমস্যা ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে। যেমন- হার্টের ভালভ নষ্ট হয়ে গিয়ে নানা উপসর্গ, বুকে ব্যথা, এমনকি হার্ট ফেলও হতে পারে। এছাড়া অনেক সময় কিডনি আক্রান্ত হতে পারে। ফলে কিডনিও ফেল করতে পারে। এর ফলে হয়তো দেখা যাবে বাচ্চার মুভমেন্টে পরবর্তীতে সমস্যা হচ্ছে। তার চলাফেরার সময় হাত এবং পুরো শরীরটাই কাঁপছে। এমনটা একেবারে অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই সমস্যাকে চিকিৎসাশাস্ত্রে সিডেনহ্যাম কোরিয়া বলে। আর তাই রিউম্যাটিক ফিভারের ক্ষেত্রে একটু মনোযোগসহকারে সতর্ক থাকুন।

ডায়বেটিক রোগীদের জন্য

1 comments
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের বিজ্ঞানীদের সফল গবেষণালব্ধ হারবাল উদ্ভাবন এন্টি-ডায়াবেটিক টি ‘ডায়াবিনো’। যা তৈরি হয়েছে জারুল গাছের পাতা থেকে। জারুল গাছের কচি পাতার নির্যাসে রয়েছে কোরোসলিক এসিড যা ডায়াবেটিক রোগে প্রাকৃতিক ইনসুলিন হিসেবে কাজ করে। সেই সাথে প্রচুর পরিমাণে এন্টি-অক্সিডেন্ট, বিশেষ করে ভিটামিন-ই রয়েছে হার্ট, কিডনি, লিভার সুরক্ষা সহ সৌন্দর্য রক্ষায় বিশেষ কাজ করে। ডায়াবিনো চুমুকেই তিনটি সমাধান দেয় তাহলো- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে, বাড়তি মেদ কমায় ও তারুণ্য দীর্ঘায়িত করে। আমেরিকা, জাপান, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ায় এই গবেষণা একইভাবে প্রমাণিত। প্রাকৃতিক ইনসুলিন সমৃদ্ধ ‘ডায়াবিনো’ ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন নির্ভরতা কমায় বিস্ময়করভাবে। ফেম ফার্মাসিউটিক্যালস ‘ডায়াবিনো’ স্যাচেটস আকারে বাজারজাত করছে। সম্পূর্ণ হারবাল উপাদানে প্রস্তুত তাই সবার জন্য নিরাপদ ও কার্যকর। কেনার জন্য অথবা পরিবেশক হতে যোগাযোগ করা যাবে এই নম্বরগুলোতে: সাইন্সল্যাব শো-রুম, ঢাকা। ডাঃ প্রিন্স ঃ ০১৭১২২৬৬০৯০। ঢাকা হেড অফিস: ৮৮-০২-৮৮১৭৯৫০

কর্পোরেট পোশাক বনাম শ্বশুর বাড়ি

0 comments
-চিত্র-১ : মাস চারেক হলো একটি কর্পোরেট হাউজে যোগ দিয়েছেন তিথি। কাল থেকেই তার মনটা ভালো নেই। শেষ বেলায় অফিসে ঘটে গেল বিশাল এক কাণ্ড। ঘটনার সূত্রপাত তার পোশাক-পরিচ্ছদকে কেন্দ্র করেই। বরাবরের মতো গতকালও তিনি অফিসে পরে এসেছিলেন টপসের সঙ্গে ক্যাপ্রি। ব্যস ... তারপর সহকর্মীর কটূক্তি এবং ঝগড়া। অফিসে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি নিত্যনতুন বাহারি রংয়ের পোশাক পরে এসেছেন। কিছুদিন ধরে তিনি খেয়াল করছেন তার পিছনে তার সহকর্মীরা কিছু উক্তি করে। যা শুনেও তিনি না শোনার ভান করেন। ইতোমধ্যে তিথির পরিবার থেকেও শ্বশুর-শাশুড়ি তার পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। এ ব্যাপার নিয়ে তার স্বামী ও তার স্কুলপড়ুয়া ছেলের সঙ্গেও কথা কাটাকাটি হয়েছে।



-চিত্র-২ : আজ তিন মাস যাবৎ একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে বিজনেস এক্সিকিউটিভ হিসেবে চাকরি করছেন ইতি। বিয়ের আগে থেকেই তিনি শাড়ি পরতে অভ্যস্ত। যেকোনো পার্টিতে শাড়িটাকে তিনি প্রাধান্য দেন। কিন্তু প্রায়ই অফিসের কাজে যেতে হয় লেটনাইট পার্টিতে। সবসময় সেখানে ট্র্যাডিশনাল শাড়িতে মানায় না। বাধ্য হয়ে ওয়েস্টার্ন পোশাক পরতে হয়। এতে করে তার যৌথ পরিবারের ৫ জনের ৫ রকম মন্তব্য শুনতে হয়। প্রতিদিনের এই ঝামেলা আর ভালো লাগে না।



-চিত্র -৩ : একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন দিতি। কর্পোরেট চাহিদা মতো পোশাক-আশাক পরে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। শ্বশুর বাড়ি থেকেও নেই কোনো আপত্তি। বরং সহযোগিতা করা হয় বেশি। পোশাকের ব্যাপারে তার স্বামীও প্রশ্ন তোলেন না। বাসা যখন থাকেন তখন সেই অনুযায়ী পোশাক পরেন দিতি।

উপরোলি্লখিত ঘটনা তিনটি থেকে তিন রকমের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমটিতে দেখা যাচ্ছে যে, অফিসের চাহিদার চেয়ে অতিরঞ্জিত করে নিজেকে উপস্থাপনে ব্যস্ত রয়েছেন তিথি। তার মানসিক ধারণা এরকম যে, মডার্ন গার্ল হিসেবে নিজেকে দেখাতে পারলে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়টিতে দেখা যাচ্ছে যে, অফিসের চাহিদার জন্য আধুনিক পোশাক পরেও পরিবারের কাছে কথা শুনতে হচ্ছে ইতির। তার ধারণা নিজের ইচ্ছাটাকেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পরিবারের কারো সিদ্ধান্ত সে মেনে নিতে চায় না।

তিথি, ইতি ও দিতির সমস্যাগুলো খুব সহজভাবেই সমাধান করা সম্ভব। নিজেরা যদি একটু সচেতন ও আপসমনা হতে পারি তাহলেই তা সহজ হবে। তৃতীয়টিতে দিতিকে বেশ সাবলীল মনে হয়েছে। শ্বশুর বাড়ির সঙ্গে আপস করেই রীতিমতো পরে যাচ্ছেন কর্পোরেট পোশাক। পরিবারের লোকজনের মানসিকতাটাও মিলে গেছে তার সঙ্গে।

কি করবেন

-প্রথমেই স্বামীর সমর্থন আদায় করুন। আধুনিক পোশাক যেমন শর্ট স্কার্ট, ক্যাপ্রি ও জিনস পরার অনুমতি নিন। বাড়িতে মাঝে মাঝে এসব পোশাক পরতে পারেন। এতে করে ব্যাপারটা সহনীয় হয়ে দাঁড়াবে।

-শ্বশুর বাড়ির প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলুন। ওয়ান টু ওয়ান ডিসকাশনে তাদের বোঝাতে চেষ্টা করুন। একসময় তারা বুঝবে মানুষের ব্যক্তিত্বই আসল। কোনো বিশেষ পোশাক দিয়ে বিচার করা যায় না।

-পরিবারের সবার আস্থা অর্জনের চেষ্টা করুন। বাড়িতে আপনার নিজের বয়সী কেউ থাকলে তাকে বশ করে আপনার সমস্যা খুলে বলুন। চেষ্টা করুন তার মাধ্যমে অন্য সদস্যদের আপনার সম্পর্কে বুঝিয়ে তোলা।

-পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে নিজের সমস্যা খুলে বলুন। প্রয়োজনে আপনার কর্মস্থলের কাউকে নিয়ে আসুন। তাতে করে তারা স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টাকে তুলে ধরতে পারবেন।

-মাঝেমধ্যে পরিবারের পছন্দমতো পোশাক পরুন। তাদেরও একটু সময় দিন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

-নিজের অন্য গুণ ও স্বভাব দিয়ে সবার কাছে প্রিয় হয়ে উঠুন, তাহলে তারাও গুরুত্ব দেবেন আপনার পছন্দ ও অপছন্দকে।

-অতিরঞ্জিত কোনো পোশাক পরে অফিসে যাবেন না। যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করুন। এতে করে আপনার আড়ালে কেউ কথা বলবে না।



-কি করবেন না

-শ্বশুর বাড়ির লোকজন পুরনো দিনের মানুষ। হয়তো দেরিতে বুঝবেন তাই অল্পেই অধৈর্য হবেন না। ওদের মনে কোনো আঘাত দিয়ে ইচ্ছা আদায় করবেন না।

-'অন্য বাড়িতে এই স্বাধীনতা আছে, এই বাড়িতে নেই'_ এরকম কোনো মন্তব্য করে পরিবারের লোকজনকে আপনার বিরুদ্ধে উস্কে দেবেন না। এতে করে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে যেতে পারে।

-যতটা সম্ভব মার্জিত ও শালীনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করুন। অতিমাত্রায় মেকাপ করে সবার কাছে হাসির পাত্র না হওয়াই ভালো। চেষ্টা করুন সহজ ও সাবলীলভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে।

-অন্য সহকর্মীকে জোর করে আপনার মতো আধুনিক পোশাকে অভ্যস্ত হওয়ার উপদেশ দেবেন না। এতে করে আড়ালে আপনার বিরুদ্ধেই অন্যের কাছে নালিশ করবে। আপনার যেরকম পোশাকে স্বাধীনতা রয়েছে আপনার সহকর্মীরও সেরকম স্বাধীনতা রয়েছে। মনে রাখবেন মডার্ন পোশাক মানেই উগ্র পোশাক নয়।

Sunday, July 25, 2010

একসেস ডিনাইড

0 comments
আমরা যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করি তারা প্রায়ই এই সমস্যাটার সম্মুখীন হই সমস্যাটি হলো
Access Denied , please contact your server team
এই সমস্যাটি হলে আপনি নিজেই এটি সমাধান করতে পারবেন , এর জন্য আপনাকে যা করতে হবঃ
প্রথমে Start মেনুতে যান , সেখান থেকে Run এ যান এখন এইখানে লিখুন ping 8.8.4.4 -t এবার Enter দিন এখন আপনার ওয়েব ব্রাউজারটি ওপেন করু দেখুন ঠিক হয়ে গেছে।
কোন সমস্যা হলে আমাকে জানান 
পোষ্টটির লেখক: লাকি এফ , এম
লেখকের ব্লগ : http://luckyfm.cz.cc

বলধা গার্ডেন

0 comments
০ আল মেহেদী ০
‘পৃথিবীর কত দেশ ঘুরলাম কিন্তু এমন সবুজ আর সবুজের সমারোহ কোথাও খুঁজে পেলাম না। এ দেশের মাটি ও মানুষের সরলতা, তাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা কোনোদিনও ভুলবার নয়। প্রকৃতির এমন আপন করে নেয়া সত্যিই বিস্ময় আমাদের কাছে।’ বাংলাদেশ ঘুরে বিদায় নেয়ার পথে এমন অনুভূতিই শোনা যায় বিদেশি পর্যটকদের মুখে। লাল-সবুজের পতাকাবেষ্টিত ছোট্ট এ দেশটি যেন প্রকৃতির এক আশ্চার্য রূপ। ষড়ঋতুর এ দেশে বিভিন্ন সময় গড়ে উঠেছে পার্ক, উদ্যান আর স্থাপত্যসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। বলধা গার্ডেন তাদেরই একটি। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে (১৯০৫ সালে) সাহিত্যমোদী ভাওয়াল জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী আপন সৌন্দর্যে গড়ে তোলেন এ উদ্যান। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরে তিনি নানা রকম ফুল, উদ্ভিদ আর গাছ-গাছড়া এনে রোপণ করেন এ গার্ডেনে। বলধা গার্ডেনকে অভিহিত করা হয় ফুল ও উদ্ভিদের মিউজিয়াম বা যাদুঘর হিসেবে। তবে এখানে গার্ডেন নির্মাণের পূর্বে একটি সত্যিকারের মিউজিয়াম ছিল। তাতে কয়েকটি ধাতব মূর্তিও ছিল। উনিশ শতকের শেষের দিকে (বর্তমান) বলধা গার্ডেন ছিল উচ্চবিত্তদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সেখানে প্রতিদিনই গান-বাজনার আসর বসত। এই বলধা গার্ডেনের আদলেই হৃষিকেশ নির্মাণ করেছিলেন রোজ গার্ডেন বা গোলাপ বাগান। সেখানে আজ নির্মিত বাড়িটি ছাড়া আর কিছুই নেই। গার্ডেনের দু’টি অংশ সিবিলি ও সাইকি। সিবিলি মানে হলো প্রকৃতির দেবী আর সাইকি মানে হলো আত্মা। এ দু’টি শব্দ এসেছে গ্রিক ভাষা থেকে। সিবিলি অংশের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে- শঙ্খনদ পুকুর, ক্যামেলিয়া, স্বর্ণ আশোক, আফ্রিকান টিউলিপ। এছাড়া আছে সূর্য ঘড়ি, জয় হাউজ, ফার্ন হাউজ। সূর্যঘড়ি রৌদ্রজ্জ্বোল দিনে সঠিক সময় নির্দেশ করে। সাইকি অংশের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে লাল, নীল, সাদা, হলুদ, জাতের শাপলায় ভরা অনেকগুলো শাপলা হাউজ। বিরল প্রজাতির দেশি বিদেশি ক্যাকটাস, অর্কিড, অ্যানথুরিয়াম, ভুজুপত গাছ, বিচিত্র বকুল, আমাজন লিলি, কৃত্তিম সুড়ঙ্গসহ একটি ছায়া তরু। তবে সাইকি অঞ্চলে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার নেই। সাইকি অঞ্চল শুধু উদ্ভিদের ছাত্র বা গবেষকরা পরিদর্শন করতে পারেন। উদ্যান উদ্ভিদ সম্ভার প্রধানত সাত ধরনের। সব মিলিয়ে এখানে ৬৭২ প্রজাতির প্রায় ১৫ হাজার নমুনা রয়েছে। এদের অনেকগুলো বিদেশি ও দুষ্প্রাপ্য। গার্ডেনের সাথে বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। গার্ডেন পরিদর্শনে এসে বহুজাতিক ফুলের সমাহার দেখে কবিগুরু বিস্মিত হন। তিনি জাপান থেকে সংগৃহীত camelia japonica ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তার বিখ্যাত ক্যামেলিয়া কবিতাটি রচনা করেছিলেন। এছাড়াও বহু বিদেশি ফুলের বাংলায় নামকরণ করেন তিনি। ১৯৪৩ সালে নরেন চৌধুরী মৃত্যুবরণ করলে বাগানের উন্নয়ন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশ বেনিয়াদের অব্যবস্থাপনায় উদ্যানটি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তান আমলে কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও তেমন অগ্রগতি হয়নি। স্বাধীনতার পর বন বিভাগের অধীনে নব উদ্যোমে শুরু হয় এর উন্নয়ন কাজ- বলধা ফিরে পায় তার প্রাণ। এ বলধা গার্ডেনকে ঘিরে আছে এক রক্তাক্ত করুণ ইতিহাস (বর্তমান বলধা গার্ডেনেই ছিল নরেন চৌধুরীর বাসগৃহ)। নরেন চৌধুরীর ছেলে নৃপেণ চৌধুরী স্বীয় প্রতিভায় বন্ধুমহল থেকে সবার কাছে ছিলেন সমাদৃত। ঘরে ছিল তার সৎ মা। সৎ মার সাথে নৃপেণের তেমন কোনো দ্বন্দ্ব না থাকলেও তিনি মোটেও সহ্য করতে পারতেন না নৃপেণকে। নৃপেণ প্রতিদিনের মতোই এক রাতে ঘুমাতে যান নিজ গৃহে (বর্তমান বলধা গার্ডেনে)। ছেপে ছোপ রক্ত আর মৃত লাশের ওপর আজও দাঁড়িয়ে আছে চিরসবুজের বলধা। রক্তের উর্বরতায় সেখানে জন্মেছে তাজা গাছ আর বাহারি ফুল। দেশি বিদেশি হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়ে বলধা আজ মুখরিত।

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট

0 comments
শেখ জাহাঙ্গীর আলম ০ 
কর্মক্ষেত্রে নিজেকে আরও যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যান্য যোগ্যতা। এর মধ্যে একটি বিদেশি ভাষা জ্ঞান অর্জন করা। বিদেশি ভাষা শেখানোর জন্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে সবচেয়ে বেশি কাজ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অংশ হিসেবে ‘বিদেশি ভাষা বিভাগ’ নামে এই ইনস্টিটিউট ১৯৬৪ সালে যাত্রা শুরু করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের বিদেশি ভাষা শেখানো। পরবর্তীতে দেখা যায় বিদেশি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অধিক উৎসাহিত। তাদের বিবেচনায় রেখে ১৯৭৪  সালের ১ জুলাই আধুনিক ভাষা ইনস্টিউটটে পরিণত হয় এই বিভাগ। এই বিভাগে বর্তমানে ১২টি ভাষা শেখানো হয়। এর মধ্যে বাংলা ভাষা শুধু বিদেশিদের শেখানো হয়। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মুহম্মদ আব্দুর রহীম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাই নয়, আরও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান থাকা দরকার। বাংলা-ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি তৃতীয় কোনো ভাষায় অনুশীলন বা শিক্ষা গ্রহণ করা ও জানা দরকার। এতে তাদের জীবনে কর্মক্ষেত্রে সাফল্য বয়ে আনবে। আর এ কারণে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে ভাষা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, যে কেউ এখানে ভাষা শিখতে পারেন।

জনবল

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে মোট শিক্ষক ৫০ জন। এদের মধ্যে ফুল টাইম ২৭ জন। পার্ট টাইম শিক্ষক ১৬ জন, ভিজিটর ৬ জন (বিদেশি) এবং একজন সুপার নিউমারারি। এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী মোট ২৪ জন। কর্মকর্তা ৫ জন ৩য় শ্রেণীর ৪ জন এবং ৪র্থ শ্রেণীর ১৫ জন কার্যরত আছেন বলে জানান, সিনিয়র সচিব আফিজ আব্দুর রহমান।

পড়ানোর পদ্ধতি

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে এক বছর মেয়াদী জুনিয়র ও সিনিয়র সার্টিফিকেট কোর্স, ডিপ্লোমা ও চার বছর মেয়াদি উচ্চতর ডিপ্লোমা করার সুযোগ রয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীদের খুব যতœ সহকারে ভাষা শেখানো হয়। তবে শেখানোর পদ্ধতি অন্যান্য বিভাগ থেকে আলাদা। এখানে প্রতিটি ভাষায় ভর্তি শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রুপ তৈরি করা হয়। প্রতিটি গ্রুপে (ন্যূনতম) ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকে। প্রতি বছর ৩টি শর্ট কোর্স করানো হয়। সংক্ষিপ্ত কোর্স এখানে ৫০-৬০ ঘণ্টা করানো হয়। এখানে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নন, বরং বাহিরের শিক্ষার্থীরাও যে কোনো ভাষায় সংক্ষিপ্ত কোর্সে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তবে ইংরেজি কোর্স শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। এছাড়াও রয়েছে ইংরেজি সংক্ষিপ্ত কোর্স (৫০-৬০) ঘণ্টা। এতে যে কোনো শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে পারেন।

যোগ্যতা

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তা নয়, এখানে উচ্চ মাধ্যমিক পাস যে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেতে পারেন।

সময় ও খরচ

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে প্রতিটি কোর্সের মেয়াদ এক বছর অথবা ন্যূনতম ১২০ ঘণ্টা। তবে এখানে টানা চার বছর না পড়েও উচ্চতর ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করা সম্ভব। ইনস্টিটিউটে প্রতিটি কোর্সের ফি হাজার ৩০০ টাকা। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরের শিক্ষার্থী যারা তাদের রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৩৩ টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে। বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে এখানে ভর্তি হতে পারবেন। এজন্য ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ বিদেশি শিক্ষার্থীদের খরচ হবে ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া শিক্ষা উপকরণ বাবদ দিতে হবে আরও দুই হাজার টাকা।

আবেদনপত্র সংগ্রহ ও পরবর্তী কাজ

একজন শিক্ষার্থী একাধিক বিষয়ে আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে একই সঙ্গে একাধিক ভাষায় ভর্তি হতে পারবেন না। টিএসসিতে অবস্থিত জনতা ব্যাংকের শাখা থেকে ২৫০ টাকার বিনিময়ে আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে পারবেন। আবেদনপত্রের সাথে এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার মার্কশিটের সত্যায়িত কপি সংযুক্ত করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য মার্কশিটের প্রয়োজন হবে না। তবে আবেদনপত্রে নিজ নিজ বিভাগের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর প্রয়োজন হবে।

দন্ত চিকিৎসক

1 comments
রাজধানীর ব্যস্ততম বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে চোখে পড়ে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসক, যাদের চিকিৎসাসংক্রান্ত নেই কোনো ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতা। অথচ তারা সহজ-সরল মানুষকে কম পয়সার প্রলোভনে চিকিৎসার নামে প্রতারিত করছেন। তেমনি নগরীর মিরপুর শাহআলী মাজার এলাকায় এক দন্ত চিকিৎসক রোগীর দাঁত তুলছেন ফুটপাতে বসেই।
ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর

Saturday, July 24, 2010

কাসা-কাটু টেন্ট রকস ন্যাশনাল মনুমেন্ট

0 comments
কাসা কাটুপর্বত (Kasha-Katuwe Tent Rocks National Monument) মুক্তগবেষনাগার হিসেবে পরিচিত। এর অবস্থান উত্তর-মধ্য নিউ মেক্সিকোতে। সমুদ্রপৃষ্ট হতে ৫৫৭০-৬৭৬০ ফুট উচু । তাবুর মত দেখায় বলে এর নাম টেন্ট রকস।
৬-৭ মিলিয়ন বছর আগে আগ্নেয়ছাই আর লাভার ১০০০ ফিট পুরুত্বের স্তর জমে বিশাল এই এলাকার জন্ম হয়েছে। কালক্রমে বাতাস আর পানি প্রবাহ সৃষ্ট ভুমিক্ষয়ের মাধ্যমে বর্তমান আকার ধারন করেছে। টেন্ট রকস এর তাবুকৃতি অংশ নরম পিউমিস দিয়ে গঠিত(লাভা ঠান্ডা হলে শক্ত ও কঠিন আকার ধারন করলে তাকে পিউমিস বলে) আর ক্ষয়ে যাওয়া অংশ টাফ দ্বারা গঠিত(আগ্নেয় ছাইকে টাফ বলা হয়)

এলাকা উন্নয়নের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ১/৫/২০১০ হতে ৩১/৭/২০১০ পর্যন্ত ভিজিটরদের যাওয়া বন্ধ রেখেছে,শুধুমাত্র গবেষকরা দিনের বেলায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যাবহার করতে পারবেন।

Friday, July 23, 2010

সমস্যা যখন চুল পড়া

0 comments
একটা বয়সের পর পুরুষদের কমন দুশ্চিন্তা টাক হয়ে যাবে না তো? মেয়েরাও চুল নিয়ে কম ভোগে না। চুল পড়া রোধ, চুল ঘন ও সুন্দর করতে কত কিছু যে করে মানুষ! চুল পড়ার সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বিশেষজ্ঞ, কসমেটিক সার্জারি সেন্টারের কনসালট্যান্ট ডা. ফেরদৌস কাদের মিনু-এর পরামর্শ তুলে ধরেছেন ডা. সাবরিনা শারমিন
সেই প্রাচীনকাল থেকেই চুল পড়া, চুল উঠে যাওয়া বা চুল পাতলা হয়ে যাওয়া খুব কমন সমস্যা। আমেরিকার একাডেমী অব ডার্মাটোলজির রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৫-১৬ শতাংশই চুল ঝরে যাওয়া সমস্যায় ভুগছেন। শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও এর শিকার। চুল পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা আবার ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বেশি।
মানুষের চুল প্রতি মাসে আধ ইঞ্চি করে বড় হয়। স্বাভাবিকভাবে একটি চুল দুই থেকে চার বছর পর্যন্ত বড় হতে থাকে। এর পর বৃদ্ধি থেমে যায় ও কয়েক দিনের মধ্যে আপনা-আপনি পড়ে যায়। যদি কোনো কারণে বেশি পরিমাণে চুল বর্ধনশীল অবস্থা থেকে স্থিতিশীল অবস্থায় (পরিণত অবস্থায়) চলে আসে তবে চুল পড়ার পরিমাণ চুল তৈরি হওয়ার চেয়ে বেশি হবে। জানা যাক, কী কী কারণে চুল পড়ে।

অ্যান্ড্রোহেনের কারণে চুল পড়া
অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোন, যেমন টেস্টোস্টেরন, অ্যান্ড্রোস্ট্রেনডিয়ন, ডিএইচটি হরমোনগুলো সাধারণত পুরুষের বেশি ও মহিলাদের কম পরিমাণে থাকে। এ হরমোনগুলো হেয়ার ফলিকলের ওপর কাজ করে ও চুল পড়া ত্বরান্বিত করে। সে কারণে পুরুষের চুল বেশি পড়ে। তবে সবারই যে পড়বে তা নয়, যাদের এসব হরমোনের প্রভাব বেশি তাদের বেশি করে চুল পড়ে। পুরুষের চুল পড়া বা টাক পড়া সাধারণত ২০ বছর থেকেই শুরু হতে পারে। এটিকে বলে মেল প্যাটার্ন অব হেয়ার লস বা পুরুষালী টাক। অর্থাৎ কপাল থেকে শুরু করে পেছন দিকে চুল উঠতে থাকে।
মহিলাদের মেনোপজের সময় ও পরে অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোনগুলো আনুপাতিক হারে বেড়ে যায়, তখন চুল বেশি করে পড়তে শুরু করে। তবে এ ক্ষেত্রে ফিমেল প্যাটার্ন অব হেয়ার লস হয়ে থাকে। শুধু কপালের দিক থেকে নয়, চুল পড়া শুরু হয় পুরো মাথা থেকেই। ধীরে ধীরে চুলের ঘনত্ব কমে যায়। অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোনই মেয়েদের চুল পড়া ও ছেলেদের টাকের সবচেয়ে বড় কারণ।

স্ট্রেস বা মানসিক চাপ
দুশ্চিন্তায় ভুগলে বা মানসিক সমস্যা থাকলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি করে চুল পড়তে পারে। তবে এ চুল পড়া সাময়িক এবং পুনরায় চুল গজায়। তবে দীর্ঘদিন মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকলে বা দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে অনেক বেশি চুল পড়ে যেতে পারে।

হরমোনাল পরিবর্তন
হরমোনের কমবেশি হওয়ার কারণে চুল উঠে যেতে পারে। যেমন থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কম বা বেশি হলে, গর্ভবতী অবস্থায় এবং বাচ্চার জন্মের পর হরমোনাল ভারসাম্য পরিবর্তিত হয় বলে তখন চুল বেশি পড়ে। হরমোনের এ পরিবর্তন আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে পুনরায় চুল গজায়। তবে তা আগের অবস্থায় যেতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কেমোথেরাপির পর
ক্যান্সার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি দেওয়ার পর চুল উঠে যায়। এর কারণ কেমোথেরাপিউটিক ড্রাগসগুলো বর্ধনশীল কোষের ওপর কাজ করে। কেমোথেরাপির প্রথম ডোজ দেওয়ার দুই-তিন সপ্তাহ পর চুল পড়া শুরু হয় এবং কেমোর সর্বশেষ ডোজের তিন-চার মাস পর পুনরায় চুল গজানো শুরু হয়।

ট্রাকশন অ্যালোপেসিয়া
চুলের বিশেষ কোনো স্টাইলের জন্য যদি দীর্ঘদিন খুব টেনে চুল বাঁধা বা টাইট করে খোঁপা বা ব্যান্ড করা হয় তবে এ ধরনের চুল পড়া শুরু হয়। দীর্ঘদিন এক রকম চুল বাঁধার কারণে চুল পড়া পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। ফলে টেনে বাঁধার কারণে এ চুল পড়া স্থায়ীভাবে হেয়ার লসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

হেয়ার প্রোডাক্টের জন্য
খুব বেশি পরিমাণ কালারিং এজেন্ট, বি্লচিংসামগ্রী, চুল সোজা করা বা ক্রমাগত রিবল্ডিং করানো ও ঘন ঘন চুল পার্ম করার সামগ্রী ব্যবহার করলে চুল পড়ার হার বেড়ে যায়। বিশেষ করে প্রোডাক্টগুলো যদি উন্নতমানের না হয় সে ক্ষেত্রে চুল বেশি করে পড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই আবার চুল ওঠে; কিন্তু অনেক সময় হেয়ার ফলিকলের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেলে চুল আবার নাও গজাতে পারে।

টিনিয়া ক্যাপাইটিস
এটি এক ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশন, যা স্কাল বা মাথার খুলিতে হয়ে থাকে। এ ফাঙ্গাল ইনফেকশনের জন্য ওই অংশের চুল পড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে নাইজোরাল শ্যাম্পু (কিটোকোনাজল) চুলে ব্যবহার করতে হয়। কখনো কখনো দিনে একটি করে এন্টিফাঙ্গাস ওষুধ আট থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত খেতে হতে পারে। ইনফেকশন ভালো হয়ে গেলে চুল আবার গজায়।

অপারেশনের পর
শরীরে বড় কোনো সার্জারি বা অপারেশনের পর অনেক ক্ষেত্রেই চুল পড়ে যায়। এটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অপারেশনের কারণে শারীরিক পরিবর্তন অথবা মানসিক উদ্বেগের জন্য
হতে পারে। সুস্থ হওয়ার পর চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে চুল আগের অবস্থায়
ফিরে যায়।
অসুখের কারণে চুল পড়া
কিছু অসুখে, যেমন অ্যানিমিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, ম্যালেরিয়া, ডায়াবেটিস ইত্যাদিতে চুল পড়ে যেতে পারে। অনেক সময় অসুখ ভালো হওয়ার পরও চুল আর আগের অবস্থায় ফিরে যায় না।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কোনো কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় চুল পড়তে পারে; যেমন জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি, প্রেশারের ওষুধ, রক্ত তরলীকরণের ওষুধ, হরমোন, অ্যান্টিসাইকোটিক বা মানসিক অসুস্থতার ওষুধ ইত্যাদি।

রেডিওথেরাপি
ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি দেওয়ার পর চুল পড়ে এবং তা আর গজায় না।

খাদ্যাভ্যাস
শারীরিক নিউট্রিশনাল স্ট্যাটাসের ওপর চুলের স্বাস্থ্য নির্ভর করে। দৈনিক খাদ্য তালিকায় প্রোটিন, কার্বহাইড্রেট, ফ্যাট, মিনারেলস ও ভিটামিন পরিমিত পরিমাণে না থাকলে চুল পড়ে যায়। এছাড়া দীর্ঘদিন শরীরে কোনো একটি উপাদানের অভাবে চুল পড়ে যায়।

চুল পড়ার ধরন
অ্যালোপেসিয়া অ্যারিয়াটা
এ ক্ষেত্রে মাথার কোনো একটি স্থানের চুল একেবারে উঠে যায় এবং ওই স্থানে টাক হয়ে যায়। এটি অটোইমুইন ডিজিজ এবং এর কারণ এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনেরই বংশে এ ধরনের চুল পড়ার ঘটনা থাকে। কিছু অসুখেও এটি হতে পারে। যেমন অ্যাজমা, একজিমা, থাইরয়েড ডিজিজ, ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লুপাস ইরাইথ্রোম্যাটোসাস, ভিটিলিগো, এডিসনস ডিজিজ ও পরিনিশাস অ্যানিমিয়া।
এ ক্ষেত্রে কোনো ট্রিটমেন্টের প্রয়োজন হয় না, পুনরায় চুল গজানো শুরু হয় অন্তত ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই।
অ্যালোপেসিয়া টোটালিস
এ ক্ষেত্রে পুরো মাথার চুলই পাতলা হয়ে যায় বলে এটি অ্যালোপেসিয়া টোটালিস নামে পরিচিত। পুষ্টির অভাব, কেমোথেরাপি অপারেশন বা কোনো অসুখের পর এ ধরনের চুল পড়ে থাকে।
এছাড়া অ্যালোপেসিয়া ইউনিভার্সালিসে পুরো শরীরের চুল উঠে যায় ও অ্যান্ড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়ায় টাক পড়ে।

চুল সম্পর্কে ভুল ধারণা
চুল সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন_
* প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে চুল পড়ে যায়। আসলে শ্যাম্পু করলে মাথার চামড়া পরিষ্কার থাকে। তবে সব শ্যাম্পু প্রতিদিন ব্যবহার করা যায় না। প্রতিদিন ব্যবহারের কিছু শ্যাম্পু আছে, যা ব্যবহার করলে কখনোই চুল পড়ে না।
* দিনে ১০০ বার চুল আঁচড়ালে চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে বলে অনেকেই বলেন। চুল বেশি আঁচড়ালে টান লেগে বরং চুল পড়ার হার বেড়ে যায়। দিনে পাঁচ-ছয়বার আঁচড়ানোই যথেষ্ট।
* চুল বারবার কামালে ঘন চুল ওঠে বলে ছোটবেলায় আমরা অনেকেই মাথা ন্যাড়া করেছি। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বেশি বার কামালে হেয়ার ফলিকল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এতে বরং চুল কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
* তেল দিলে চুল ঘন হয় বলে মনে করেন বেশির ভাগ মানুষ। বাস্তবে চুল ঘন হওয়ার সঙ্গে তেলের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে চুল তেল দিয়ে মসৃণ রাখলে জট লেগে চুল ছেঁড়ার আশঙ্কা কম থাকে।
* গরম তেল মালিশ করলে চুল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল থাকে বলেও কারো কারো ধারণা। কিন্তু গরম তেল হেয়ার ফলিকলে ক্ষতি করতে পারে। অবশ্য সাধারণ তাপমাত্রার তেল দিয়ে মাসাজ করলে চুলের গোড়ার রক্তসঞ্চালন খানিকটা বাড়ে।
* চুল টাইট করে বেণী করে ঘুমালে চুলের বৃদ্ধি বেশি হয় বলে মেয়েরা মনে করে। কিন্তু বেশি টাইট করে না বাঁধাই ভালো। এতে চুল উঠে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

কিভাবে বুঝবেন চুল পড়ছে
দৈনিক ১০০টা পর্যন্ত চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু এর চেয়ে বেশি পড়লে তা অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। বালিশ, তোয়ালে বা চিরুনিতে লেগে থাকা চুল গুনতে চেষ্টা করুন। অন্তত পরপর তিন দিন।
অথবা অল্প এক গোছা চুল হাতে নিয়ে হালকা টান দিন। যদি গোছার চার ভাগের এক ভাগ চুলই উঠে আসে তবে তা চিন্তার কারণ।

চিকিৎসা
ওষুধের মাধ্যমে
বাজারে চুল পড়া রোধের জন্য মিনোক্সিডিল নামের ওষুধ পাওয়া যায়। এটি যেখান থেকে চুল পড়ছে সেখানে লাগাতে হবে। এটি নারী ও পুরুষ উভয়েই ব্যবহার করতে পারেন। এতে কাজ না হলে অন্য চিকিৎসা নিতে হবে।
লেজার থেরাপি-এলএইচটি
লেজার থেরাপি হেয়ার ফলিকলগুলোকে আবার সজীব করে। এমনিতে প্রতিদিনই চুল পড়ে ও নতুন চুল গজায়।
কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বা অন্য কোনো অসুস্থতার ফলে যে পরিমাণ চুল পড়ে যায়, সেই পরিমাণ গজায় না। লেজার থেরাপি চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয় ও ফলিকলগুলোকে পুনর্জীবিত করে। চুলের গোড়া ও কাণ্ডের গঠন দৃঢ় করে। চুলের অকাল পতন রোধ করে।
এটি আধঘণ্টা পরে প্রতি সপ্তাহে এক দিন হিসেবে, সাধারণত ছয় মাস পর্যন্ত নিতে হয়। লেজার থেরাপির পাশাপাশি মিনোক্সিডিলও ব্যবহার করতে হয়।
হেয়ার ফলিকল রিপ্লেসমেন্ট
এটি একধরনের মাইক্রোসার্জারি বা সূক্ষ্ম অপারেশন। এতে চুল পড়ে যাওয়া অংশে হেয়ার ফলিকল ইমপ্লান্ট করা হয়। অপারেশনটিতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। অপারেশনের পরদিনই রোগী বাসায় চলে যেতে পারেন। সাধারণত মোট তুই-তিনটি সিটিং লাগে।
হেয়ার স্কাল্প রিপ্লেসমেন্ট
এ ক্ষেত্রে অক্সিপুট বা মাথার পেছনের অংশ যেখানে চুলের ঘনত্ব বেশি থাকে তা ফ্ল্যাপ করে কেটে এনে টাক হওয়া অংশে রিপ্লেস করা হয় বা বসানো হয়।
কখনো কখনো নিজের স্কাল্প হেয়ারের পরিবর্তে আর্টিফিশিয়াল হেয়ার পিস আক্রান্ত স্থানে ইমপ্লান্ট করা হয়।
চুল পড়া রোধের প্রায় সব চিকিৎসাই বাংলাদেশে আছে।
তবে অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখনো উন্নততর চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। এ ছাড়া এসব চিকিৎসা এখন পর্যন্ত ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ। ঢাকার বিভিন্ন কসমেটিক সার্জারি সেন্টারে সাত-আট বছর ধরে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আর খরচও এখন
অনেক কমে এসেছে।

Monday, July 19, 2010

টিপস

0 comments
ফন্ট তৈরির সফটওয়্যার
কম্পিউটারে লেখালেখির জন্য বিভিন্ন মজার ফন্ট পাওয়া যায়। ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন ফন্ট নামানোও যায়। তবে ইচ্ছা করলে নিজের মনের মতো ফন্ট তৈরিও করা যায়। এ জন্য http://softandebook.blogspot.com/2010/04/soft-font-creator.html থেকে ফন্ট তৈরির সফটওয়্যার ফন্ট ক্রিয়েটর৬ নামাতে পারবেন। এরপর নিজের মতো ফন্ট তৈরি করে ব্যবহার করতে পারবেন। এ ছাড়া অন্য কোনো ফন্ট পরিবর্তনও করতে পারবেন।
শাহানাজ পারভীন

ভিডিও গেম থেকে ভিডিও রেকর্ড
ডেক্সটপ ভিডিও করার বেশ কিছু ভালো সফটওয়্যার আছে। ভিডিও গেম রেকর্ড করার একটি সফটওয়্যার হচ্ছে টাকসি। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভিডিও গেম বা ত্রিমাত্রিক প্রোগ্রামের ভিডিও ধারণ করা যায়। এমনকি অডিও হিসেবে মাইক্রোফোনের কথাও ভিডিওর সঙ্গে রেকর্ড করা যাবে। মাত্র ২১০ কিলোবাইটের এই মুক্ত সফটওয়্যার নামানো যাবে http://sourceforge.net/projects/ taksi/ ঠিকানার ওয়েবসাইট থেকে ।
মেহেদী আকরাম

বলি রেখা

0 comments
বয়স বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে বলিরেখার প্রার্দুভাব দেখা যায়। বলি রেখা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত কিছু এক্সারসাইজ করা। চলুন জেনে নেই কীভাবে এক্সারসাইজ করবেন।

০০ ঠোঁট দুটো বন্ধ করে কিছুক্ষণ রিল্যাক্স করুন। তারপর সামনের দিকে ঠোঁট দুটো কুঁচকে একবার ডানে, আরেকবার বামে ঘোরান। এভাবে ক্রমাগত ১০ বার করুন।

০০ সোজা হয়ে বসে মাথা পিছনের দিকে হেলান দিন। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনুন।

০০ দাঁত বের করে বড় করে হাসুন, হাসিটা ধরে রেখে পাঁচ পর্যন্ত গুনুন। একই রকম ভাবে ঠোঁট ও মুখ বন্ধ করে হাসুন। দুটোই ১০ বার করুন।

০০ মুখ বন্ধ করে জোরে নিঃশ্বাস নিন গাল দুটো ফুলে না ওঠা পর্যন্ত। ডান দিকের গালটা ফুলিয়ে ১০ মিনিট ধরে রাখুন। একই রকমভাবে বা গালটা ফুলিয়ে ১০ মিনিট ধরে রাখুন। এভাবে ৫ বার করুন।

০০ সোজা হয়ে বসে মুখের পেশি শিথিল করুন। নিঃশ্বাস নিয়ে গাল দুটো মুখের ভিতরে দাঁতের মাঝে ঢোকান। নিঃশ্বাস ধরে রেখে ১০ পর্যন্ত গুনুন।

০০ চোখ বন্ধ করে ভ্রু দুটো ওপরে তুলুন। চোখের পাতা নীচের দিকে যতটা পারুন ততটা নিন। এভাবে ১০ বার করুন।

০০ সামনের দিকে সোজা তাকিয়ে মুখের মাসলগুলো রিলাক্স করুন। বড় করে চোখটা খুলে ‘০’ বলুন। এভাবে ৫ বার করুন।

০০ সামনের দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকুন। চোখ বন্ধ করে ‘আঃ’ করে চিৎকার করুন। এতে করে গাল ও ঘাড়ের মাসলে চাপ পড়বে।

০০ ঠোঁট বন্ধ করে বসুন। মুখ খুলে ‘ই’ বলুন জোরে। ৫ বার করুন।

০০ সোজা বসে মাথাটা পিছনের দিকে হেলিয়ে দিন। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বন্ধ রেখে মুখ নাড়ান। এমন ভাবে মুখ নাড়াবেন যেন মনে হয় আপনি কিছু খাচ্ছেন।

০০ সোজা বসে চোখ বন্ধ করে গাল, কপাল, চোখ ও থুতনি টেনে ধরুন নাকের দিকে, এভাবে ১০ বার করুন।

০০ সপ্তাহে কমপক্ষে তিনবার এ ব্যায়াম করুন।

Sunday, July 18, 2010

রাজধানী সুপার মার্কেট

0 comments
টিকাটুলিতে অবস্থিত রাজধানী সুপার মার্কেটটির সাপ্তাহিক ছুটি ছিল রোববার। গত কয়েক মাস ধরে সরকার ঘোষিত শুক্রবার পূর্ণ দিবস এবং শনিবার অর্ধ দিবস সাপ্তাহিক ছুটি চলাতে এই মার্কেটের ব্যবসা অনেকাংশে কমে এসেছে। শুক্র ও শনিবার মার্কেট বন্ধ থাকার কারণে ব্যবসার ক্ষতি বেড়ে গেছে। এ ব্যাপারে কথা হয় রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট দোকান মালিক সমিতির নেতাদের সাথে। তারা জানান, পুরান ঢাকাবাসীর কাছে এই রাজধানী সুপার মার্কেট বিশেষ স্থান দখল করে আছে। নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনীচক- এসব মার্কেটের পণ্যের মূল্যের তুলনায় সুলভ মূল্যে রাজধানী সুপার মার্কেটে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া, স্বামীবাগ, দয়াগঞ্জ, কেএম দাস লেন, যাত্রাবাড়ি, টিকাটুলি ও ওয়ারি এলাকা থেকে ক্রেতাসাধারণ বেশি আসে। ব্যবসায়ীরা বলেন, বিশেষ করে চাকরিজীবীরা এই মার্কেটে শুক্রবার কেনাকাটার জন্য আসত। এখন মার্কেট বন্ধ থাকার কারণে এই মার্কেটে ব্যবসার সাথে জড়িত সকল ব্যবসায়ীর ব্যবসার ক্ষতি বেড়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে মার্কেট পরিচালিত হচ্ছে এবং ১৯৯৫ সালে মার্কেটটি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট নিয়ে ১৭৮৩টি দোকান গড়ে উঠেছে। মার্কেট টিনশেড হিসেবে এখানে ৯টি ব্লকে বিভক্ত। এ ব্লকে কসমেটিক্স, তৈরি পোশাক এবং বাচ্চাদের খেলনার সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে। বি ব্লকে মহিলা ও পুরুষদের তৈরি পোশাক, পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী রয়েছে। সি ব্লকে মহিলাদের পণ্যসামগ্রী, ক্রোকারিজ, ঘড়ি এবং রেকসিন পাওয়া যাচ্ছে। ডি ব্লকে শাড়ি, থানকাপড় এবং বেডশিট রয়েছে। ই ব্লকে পুরোটাই ঘড়ি মার্কেট। এফ ব্লকে লুঙ্গি এবং জুতার সামগ্রী। জি ব্লকে বাটা শোরুম, জুতা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। তাছাড়া নিউ রাজধানীর নিচতলায় সম্পূর্ণ স্বর্ণের শো রুম রয়েছে। নিউ রাজধানীর দ্বিতীয় তলায় কারখানা, হোলসেল, মোবাইল সামগ্রীসহ ভ্যারাইটিজ আইটেম পাওয়া যায়। এই মার্কেটে পুরান ঢাকার লোক বেশি আসে। তাদের মধ্যে মধ্য ও নি¤œ-মধ্য শ্রেণীর লোক বেশি আসে। রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট দোকান মালিক সমিতি রয়েছে। এই সমিতির বর্তমান নির্বাচিত সভাপতি হাজী মো. আজমল হোসেন বাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হক মঞ্চ (সাবেক কমিশনার)। বর্তমানে মার্কেটে কিছু সমস্যা তুলে ব্যবসায়ীরা বলেন, ১৯৯৬ সালে যাত্রাবাড়ি-টিকাটুলি ওয়ান ওয়ে রোড হওয়ার পর থেকে মার্কেটের চারপাশে রাস্তা থাকায় গাড়িগুলো একদিকে চলাচল করার কারণে মার্কেটে ব্যবসার কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এখানে বেচা-বিক্রিরও ব্যাঘাত হয়ে থাকে। তাছাড়া বিদ্যুতের লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। ২ ঘণ্টা অন্তর অন্তর বিদ্যুৎ থাকে না। এতে টিনশেড দোকান হওয়ার কারণে গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। অন্যদিকে মার্কেটের পাশে ফুটপাতে আইল্যান্ডের কোনো ব্যবস্থা নেই। যে কারণে যাতায়াতকালে কোনো গাড়ি, ব্রেক ফেল হলে সরাসরি মার্কেটের ভিতর ঢুকে পড়ে। ব্যবসায়ীরা জানায়, গত ৩ মাস পূর্বে একটি মিনিবাস যাত্রাবাড়ি থেকে আসার পথে ব্রেক ফেল করে মার্কেটে ঢুকে পড়ে। এরই মধ্যে একটি পিকআপ ভ্যানও ব্রেক ফেল করে মার্কেটে ঢুকে পড়েছিল। ভাগ্যক্রমে সেদিন কোনো হতাহত হয়নি।

Friday, July 16, 2010

বিষবৃক্ষের মালিনী হীরা দাসী

0 comments
বিষবৃক্ষের বীজ মূলত বপিত হয়েছিল হীরা দাসীর মানসে। বিষবৃক্ষ (১৮৭৩) উপন্যাসের হীরা দাসী পুরো বঙ্কিম (১৮৩৮-৯৪) সাহিত্যের এক উজ্জ্বল খল চরিত্র। তাঁর কপটতা, প্রতিশোধস্পৃহা, হিংসাত্দক জীবনাচরণ পুরো উপন্যাসের কাহিনীকে ঘনীভূত ও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। একটি খল চরিত্রে এত ডাইমেনশনের সার্থক সমন্বয় পুরো বাংলা সাহিত্যে সত্যিই বিরল। বিষবৃক্ষের আরেকটি খল চরিত্র হরি দাসী। হীরা দাসী চরিত্রটিকে পরিপূর্ণ ও সজীব করে তোলার পেছনে এ চরিত্রের প্রভাব অনস্বীকার্য। যদিও বঙ্কিম এ উপন্যাসে পুরনো রীতি, রেওয়াজ ও আচারে নিষ্ঠ থাকার পক্ষে হিতবাণী প্রচার করেছেন; কিন্তু হীরা দাসী ও হরি দাসী চরিত্র দুটি নিপীড়নে অভ্যস্ত ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থাকে পাঠক-সম্মুখে উন্মোচিত করেছে। তাঁর খল চরিত্রগুলো সার্থক হয়ে ওঠার পেছনে এটিও একটি বড় অনুষঙ্গ।
হীরা দাসী চরিত্রটিকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য হরি দাসী সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। দেবেন্দ্র নারীমহলে প্রবেশাধিকার হেতু হরি দাসী বৈষ্ণবীর ছদ্মবেশ ধারণ করে। বিভিন্ন ধরনের গান গেয়ে নারীর মন হরণের ক্ষমতা তার আছে। তা ছাড়া তার নারী ছদ্মবেশের রূপ দেখে নারীকুলও মুগ্ধ হয়। 'সকলেই বিস্মিত হইয়া দেখিল যে, বৈষ্ণবী যুবতী, তাহার শরীরে আর রূপ ধরে না। ...ফুল্লেন্দীবরতুল্য চক্ষু চিত্ররেখাবৎ ভ্রূ যুগল, নিটোল ললাট, বাহুযুগলের মৃণালবৎ গঠন এবং চম্পকদানবৎ বর্ণ, রমণীকুল দুর্ল্লভ।'
উপন্যাসের নায়ক নগেন্দ্র ও খলনায়ক দেবেন্দ্র একই বংশের। তবে পুরুষানুক্রমে উভয় পরিবারের মধ্যে বিবাদ রয়েছে। মোকদ্দমায় নগেন্দ্রর পিতামহের কাছে দেবেন্দ্রর পিতামহ পরাজিত হলে দুর্বল হয়ে পড়ে তাদের পরিবার। দেবেন্দ্রর পিতা তাঁর সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শঙ্কিত হন। তিনি গণেশ বাবু নামে এক জমিদারের একমাত্র কন্যা হৈমবতীর সঙ্গে দেবেন্দ্রর বিবাহ দেন। হৈমবতী কুরূপা, মুখরা এক রমণী। দেবেন্দ্র সৎ ও সত্যনিষ্ঠ ছিল। কিন্তু পরিবারে তার সুখের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা না মেটায় সে রূপতৃষ্ণা মেটাতে গৃহত্যাগী হয়। অ্যান্টি হিরো চরিত্র নির্মাণে এখানেই বঙ্কিমের বিশেষত্ব। তাঁর খলনায়ক-নায়িকারা কোনো না কোনো বঞ্চনার শিকার হয়ে বিপথগামী হয়। তারা এ বঞ্চনার কারণে সমাজের প্রতি, ব্যক্তির প্রতি প্রতিশোধমূলক আচরণ করে। ফলে এসব খল চরিত্রের ওপরও পাঠকের মনে এক ধরনের সমবেদনা সঞ্চারিত হয়। এভাবে বহু ডাইমেনশনের কারণে চরিত্রগুলো আরো মানবীয় ও সজীব হয়ে ওঠে। কী ছিল না দেবেন্দ্রর_সৌন্দর্য, বংশ পরিচয়, শিক্ষা? তবে কেন সে পরম আকাঙ্ক্ষার নারীর সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হবে?
দেবেন্দ্র ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বাসী ছিল। সে বিধবা বিবাহেও বেশ উৎসাহী ছিল। তাই মেয়েদের গ্রাম্য আড্ডায় রূপবতী, কুন্দনন্দিনীকে বৈধব্যের বেশে দেখেও খুব সহজে তার প্রতি প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ে এবং একান্তে তাকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। হরি দাসী মতৃষ্ণ বিলোলনেত্রে কুন্দনন্দিনীর মুখপানে চাহিয়া পুনশ্চ কীর্তন আরম্ভ করিল,
'শ্রীমুখপঙ্কজ_দেখবো বলে হে,
তাই এসেছিলাম এ গোকুলে।
আমায় স্থান দিও বাই চরণ তলে।
মানের দায়ে তুই মানিনী,
তাই সেজেছি বিদেশিনী,
এখন বাঁচাও রাধে কথা কোয়ে,
ঘরে যাই হে চরণ ছুঁয়ে।...'
হরি দাসীরূপী দেবেন্দ্র কুন্দকে হরণ করার জন্য প্রথমে এক বাহানা করে। সে কুন্দকে তার কুলভ্রষ্টা দেশত্যাগী শাশুড়ির সঙ্গে তার সঙ্গে গিয়ে সাক্ষাৎ করার অনুরোধ জানায়। কিন্তু কুন্দ নগেন্দ্রর স্ত্রী সূর্যমুখীর অনুমতি ছাড়া কোথাও যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। কুন্দর সঙ্গে সূর্যমুখীর সম্পর্কটা ছিল ঝরনার পানির মতো স্বচ্ছ ও মানবীয়। কিন্তু সম্পর্কে ফাটল ধরায় দাসী হীরা। হীরা দেবেন্দ্রর পৌরুষের অনুরক্ত হয়ে কাজটি করে। সূর্যমুখী অনেক আগেই অনুমান করেছিল নগেন্দ্র কুন্দকে ভালোবাসে। কিন্তু নিরাশ্রয় বিধবা মেয়েটিকে সে ঘর থেকে বের করে দিতে পারেনি। হীরা যখন সূর্যমুখীকে জানায়, দেবেন্দ্র হরি দাসীর ছদ্মবেশে কুন্দর সঙ্গে অভিসারে মিলিত হয়_সূর্যমুখী কুন্দর বিষয়ে আর ধৈর্য ধরতে পারে না। সে কুন্দকে ভর্ৎসনা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। হীরা সচেতনভাবেই কুন্দ ও সূর্যমুখীর পাশে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ সৃষ্টি করেছিল। মূলত হীরা দাসীর সক্রিয় প্রচেষ্টায় কুন্দ, নগেন্দ্র ও সূর্যমুখীর সম্পর্কের জটিলতা অনিবার্য সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়।
হীরা নগেন্দ্রর পরিবারের গৃহপরিচারিকা হিসেবে সুখে ও সম্মানের সঙ্গে থাকত। হীরা কায়স্থ কন্যা। হীরার বয়স বিশ বছর। নিজ জ্ঞান, বুদ্ধি ও চরিত্রের গুণে দাসীদের মধ্যে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। সে বাল্য বিধবা। কিন্তু তার স্বামী প্রসঙ্গে কেউ কিছু শোনেনি। হীরা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, চোখ দুটো পদ্ম পলাশ ফুলের মতো সুন্দর। সুন্দরী হীরা গান গাইতে, শুনতে ভালোবাসে। তাই সে খুব সহজেই সুরেলা কণ্ঠের দেবেন্দ্রর অনুরক্ত হয়ে পড়ে। হীরার মনে অনেক ক্ষোভ। রূপ, গুণ কী নেই তার? সূর্যমুখীর জায়গায় সেও তো থাকতে পারত। বিধাতার এ কেমন বঞ্চনা। আর কুন্দর মধ্যে দেবেন্দ্র এমন কী দেখেছে? 'আমরা গতর খাটিয়ে খাই, আমরা যদি ভালো খাই, ভালো পরি, পটের বিবির মতো ঘরে তোলা থাকি, তাহলে আমরাও অমন হতে পারি। আর এটা (কুন্দ) মিনমিনে ঘ্যানঘেনে, প্যানপেনে, সে দেবেন্দ্র বাবুর মর্ম বুঝিবে কি?' সূর্যমুখীর প্রতি হীরার এক ধরনের হিংসাত্দক বিদ্বেষ জন্ম নিয়েছিল; যদিও সে জানত এটা অযৌক্তিক, একপেশে। কারণ সূর্যমুখী তার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী_সে কখনো হীরার ক্ষতি করেনি বরং উপকারই করেছে। "তবে সেইখানে (নগেন্দ্রর বাড়িতে) কুন্দকে ফিরিয়া রাখিয়া আসাই মত। কিন্তু কুন্দ যাইবে না_আর সে বাড়িমুখো হইবার মত নাই। কিন্তু যদি সবাই মিলে 'বাপু, বাছা' বলে লইয়া যায়, তবে যাইতেও পারে। আর একটা আমার মনের কথা আছে, ঈশ্বর তাহা কি করবেন? সূর্যমুখীর থোঁতা মুখ ভোঁতা হবে? দেবতা করিলে হতেও পারে। আচ্ছা সূর্যমুখীর উপর আমার এত রাগই বা কেন? সে তো কখন আমার কিছু মন্দ করে নাই; বরং ভালই বাসে, ভালই করে। তবে রাগ কেন? তা কি হীরা জানে না?... সূর্যমুখী সুখী, আমি দুঃখী, এই জন্য আমার রাগ। সে বড়, আমি ছোট_সে মুনিব, আমি বাদী। ...আমি তার হিংসা করি কেন? তাতে আমি বলি, ঈশ্বর আমাকে হিংসুটে করেছেন, আমারই বা দোষ কি?" হীরার অর্থলোভও ছিল। সে কুন্দকে পুঁজি করে দত্তবাড়ি থেকে কিছু অর্থ আদায়ের অভিসন্ধি করেছিল। হীরা জানত কুন্দনন্দিনীর বিরহ বিচ্ছেদে নগেন্দ্রর প্রেম আরো অদম্য হয়ে পড়বে। আর কুন্দকে সে তার আজ্ঞাকারী করে তুলবে, যাতে কুন্দর উপাসক নগেন্দ্রর কাছ থেকে পুজোর ছোলাটা কলাটার ভোগ সে নিজেও পায়।
হীরার প্রথম কাজ নগেন্দ্রর সঙ্গে তার স্ত্রী সূর্যমুখীর সম্পর্কের ফাটল ধরানো। অতি কৌশলে সে এ কার্য সাধন করল। নগেন্দ্রকে সে জানাল, সূর্যমুখী অতি কটু কথা বলে কুন্দকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। এভাবে সে নগেন্দ্রর বিরহ যন্ত্রণাকে আরো গাঢ় করে তোলে। কুন্দ একদিন নির্জন রাতে হীরার গোপন আশ্রয় থেকে বেরিয়ে দত্তবাড়িতে যায়। সূর্যমুখী তাকে পেয়ে সাদরে গ্রহণ করে। সে তার স্বামী নগেন্দ্রর মনের অবস্থা জানত, তাই সে নিজ উদ্যোগে কুন্দর সঙ্গে তার স্বামীর বিয়ে দেয় এবং নিজে গৃহত্যাগী হয়।
এর পরও হীরার ধ্বংসাত্দক প্রবৃত্তি প্রশমিত হলো না। কুন্দর সুখও তার চোখের কাঁকর হয়ে উঠল। দেবেন্দ্র ভেবেছিল, হীরা তাকে কুন্দর বিষয়ে সহায়তা করবে। কিন্তু হলো উল্টো। হীরা কুন্দ-দেবেন্দ্রর মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াল। কারণ স্বয়ং হীরা দেবেন্দ্রর প্রণয়প্রার্থী। দেবেন্দ্র প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে হীরার প্রণয় স্বীকার করে নেয় এবং তাকে ব্যবহার করে শরীরে কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে পদাঘাত দিয়ে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। হীরা তার এ দুর্ভাগ্যের জন্য কুন্দনন্দিনীকে দোষী সাব্যস্ত করে। আর প্রতিশোধস্পৃহা এতটাই বেড়ে যায় যে সে কুন্দকে বিষ খাইয়ে মারার পরিকল্পনা আঁটে। 'আমি কি দোষে বিষ খাইয়া মরিব? যে আমাকে মারিল, আমি তাহাকে না মারিয়া আপনি মরিব কেন? এ বিষ আমি খাইব না। যে আমার এ দশা করিয়াছে, হয় সেই ইহা খাইবে, নাইলে তাহার প্রেয়সী কুন্দনন্দিনী ইহা ভক্ষণ করিবে। ইহাদের একজনকে মারিয়া, পরে মরিতে হয় মরিব।'
সূর্যমুখীর জীবনের এ পরিণতির জন্য কুন্দ নিজেকে অনেকটা দায়ী মনে করত। তাই সে আত্দ-অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছিল। আর এ অনুষঙ্গকে কাজে লাগিয়ে হীরা কুন্দকে আত্দহত্যার জন্য প্ররোচিত করে এবং সবশেষে সে এ কার্যে সফলকামও হয়।
বঙ্কিম উপন্যাসের খলনায়ক-নায়িকাদের শেষ পরিণতি অত্যন্ত মর্মপীড়াদায়ক হয়। সমাজের মানুষ যেন এ থেকে যথার্থ শিক্ষা নিতে পারে। এই অন্বিষ্ট অনুষঙ্গকে সামনে রেখে লেখক এমন পরিণতি রচনা করেন। কারণ বঙ্কিম সাহিত্যের একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে হিতজ্ঞান প্রচার। শেক্সপিয়রিয়ান ট্র্যাজেডির সঙ্গে বঙ্কিম উপন্যাসের পরিণতিগত অনেক সাদৃশ্য থাকলেও এখানে একটি সূক্ষ্ম প্রাতিস্বিকতা স্পষ্ট। শেক্সপিয়রিয়ান ট্র্যাজেডিতে শুধু নায়ক-নায়িকাদের বিয়োগান্তক পরিণতি লক্ষ করা যায়। কিন্তু বঙ্কিম ট্র্যাজেডিতে নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে সঙ্গে খলনায়ক-নায়িকারাও করুণ পরিণতির শিকার হন।
পুরো উপন্যাসে খল চরিত্র হিসেবে হীরা চরিত্রটি প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছে। হরি দাসী এখানে হীরা দাসী চরিত্রটিকে স্পষ্ট করে তুলতে সাপোর্টিং চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। হীরা দাসী চরিত্রের কাছে বিষবৃক্ষের অন্য চরিত্রগুলো জলো, অনুজ্জ্বল, নিষ্প্রভ। হীরার মাঝে প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে, কামনা আছে, লোভ আছে, হিংসা আছে, প্রতিশোধের আগুন আছে। একটি চরিত্রে এত ডাইমেনশন কথাসাহিত্যের এ সূচনা পর্বে সত্যিই বিরল। বিষবৃক্ষের উপন্যাস হিসেবে সার্থকতার পেছনে হীরা দাসী চরিত্রটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বিষবৃক্ষের বীজ বপন, চারাকে যত্নের মাধ্যমে লালন-পালন করে বৃক্ষে পরিণত করা, ফল পাকলে তা দত্ত পরিবারে পরিবেশন করার কাজটি তো করেছে হীরা দাসী। হীরা দাসী তাই তো বাংলা সাহিত্যের অমর, কালজয়ী খলনায়িকা চরিত্র।

ঠকচাচা

0 comments
আলালের ঘরের দুলালের (১৮৫৮) কাহিনীকারের মতোই প্রকৃত নামটি পর্দার অন্তরালে রয়ে গেল ঠকচাচার। টেকচাঁদ ঠাকুরের আসল নাম (প্যারীচাঁদ মিত্র) যদিওবা আজ সর্বজনবিদিত, কিন্তু মোকাজান মিয়াই যে ঠকচাচা_অনেকেই তা আর মনে করতে পারবেন না। ঠকচাচার আড়ালে ঢাকা পড়েছেন মোকাজান মিয়া। তবে কি প্রকৃত নামকে অতিক্রম করেছে তাঁর কীর্তি? আপাতত তা-ই মনে হয়, কিন্তু কপটতাই মোকাজানের একমাত্র জীবন-পাথেয় নয়। বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে ক্লাসিক মর্যাদাপ্রাপ্ত 'আলাল'-কাহিনীর সবচেয়ে ক্রিয়াশীল চরিত্র ঠকচাচা। এই ঠকচাচা বাংলা কথাসাহিত্যে উচ্চারিত সর্বাপেক্ষা প্রাচীনতম চরিত্র-নাম, যে নামের বয়স দেড় শ বছর পেরিয়েছে বেশ আগেই।
আখ্যায়িকা নাকি উপন্যাস_কী বলব 'আলালের ঘরের দুলাল'কে_সে বিবেচনা উহ্য রেখেই ঠকচাচাকে নিয়ে আলোচনা করা চলে। বাঙালির আখ্যান নির্মাণ মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ও পীর পাচালি থেকে শুরু। ইউরোপ এমন আখ্যানকে উপন্যাস বলতেই পারে। কারণ এ কাহিনীতে 'পূর্ণ-জীবন-প্রমাণ' আছে একমাত্র ঠকচাচাতেই। ঠকচাচা নিজ হাতে নিজের ভাগ্য গড়েছেন, ভাগ্যের বিড়ম্বনায়ও পড়েছেন। বেঁচে থাকার জন্য তাঁকে বেশ কপটতার আশ্রয় নিতে হয়। জেনেশুনেই তিনি তা করেন। কিন্তু একমাত্র স্ত্রীর (ওই সময় বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজে পুরুষের একাধিক স্ত্রী গ্রহণকে দোষ বলে বিবেচনা করা হতো না।) কাছে তিনি অকপট, উদারজন। স্ত্রীর মৃদু ভর্ৎসনাও তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করেন। স্ত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরতা, নিজের অনুপস্থিতিতে স্ত্রী অন্যকে নিকা করবে এই ভয়, স্ত্রীকে ভালোবাসা_কোনো কিছুর কমতি নেই তাঁর। ১৮৫৮-এর আগে বাংলা মৌলিক গদ্যকাহিনীতে এমন সক্রিয় চরিত্র আর ছিল না; কবিতায় ছিল, ভাঁড়ু দত্ত তাঁর নাম। ঠকচাচা বলেছেন : 'মুই বুক ঠুকে বল্ছি যেত্না মামলা মোর মারফতে হচ্ছে সে সব বেলকুল ফতে হবে_আফদ বেলকুল মুই কেটিয়ে দিব_মরদ হইলে লড়াই চাই_তাতে ডর কি?' ঠকচাচা 'লড়াই' করতে বলেছেন, নিজে 'লড়াই' করেছেন। সত্যি বলতে, বাংলা কথাসাহিত্যে 'লড়াই' করা ঠকচাচাই প্রথম 'মরদ' চরিত্র।
আপ্ত বিশেষণ এই_'খলচরিত্র' ঠকচাচা। কী করে ঠকচাচা 'খল' হলেন বোঝা দায়! চরিত্রকে এভাবে 'খল' অভিধা দিলে 'নির্মল' চরিত্র বলেও তো কিছু একটা থাকার কথা। কিন্তু 'নির্মল' বলে সত্যি কি কিছু আছে এ জগতে_বিশেষ করে মনুষ্য চরিত্রে? বাংলা সাহিত্যেই কোনটি 'নির্মল' চরিত্র? 'নির্মল' চরিত্র দেবতার হতে পারে, মানুষের নয়। কারণ জগৎটাই তো 'নির্মল' নয়। ঠকচাচার অভিজ্ঞতাও বলে : 'দুনিয়া সাচ্চা নয়_মুই একা সাচ্চা হয়ে কি কর্বো?' তাই তিনি মনে করেন: 'দুনিয়াদারি করতে গেলে ভালা বুরা দুই চাই_'। ঠকচাচা কেন 'বুরা'-কর্মে লিপ্ত? ঠকচাচা ও ঠকচাচির কথোপকথনেই বিষয়টি স্পষ্ট : 'ঠকচাচী মোড়ার উপর বসিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছেন_তুমি হররোজ এখানে ওখানে ফিরে বেড়াও_তাতে মোর আর লেড়কাবালার কি ফয়দা? তুমি হর ঘড়ী বল যে হাতে বহুত কাম, এতনা বাতে কি মোদের পেটের জ্বালা যায়। মোর দেল বড় চায় যে জরি জর পিনে দশ জন ভাল২ রেণ্ডির বিচে ফিরি, লেকেন রোপেয়া কড়ি কিছুই দেখি না, তুমি দেয়ানার মত ফের_চুপচাপ মেরে হাবলিতে বসেই রহ। ঠকচাচা কিঞ্চিৎ বিরক্ত হইয়া বলিলেন_আমি যে কোশেশ করি তা কি বল্ব, মোর কিত্না ফিকির_কেত্না ফন্দি_কেত্না প্যাঁচ_কেত্না শেন্ত তা জবানিতে বলা যায় না, শিকার দস্তে এল২ হয় আবার পালিয়ে যায়।' তাই ঠকচাচা বলেন : 'মুই ওক্ত বুঝে হাত মার্বো।' যিনি স্ত্রীকে সুখী ও খুশি করে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য ফন্দি-ফিকিরের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এবং সময় বুঝে 'হাত মারেন' তাঁকে কিনা বলব 'খল চরিত্র'?
আসলে মোকাজান সম্পর্কে কাহিনীর শুরুতে লেখক যে নেতিবাচক ধারণা দিয়েছেন, পাঠক এবং পরে সমালোচকরা তা থেকে আজও বের হতে পারেননি। টেকচাঁদ ঠাকুর মোকাজান সম্পর্কে কাহিনীর প্রথম দিকে লিখেছেন এ রকম : মোকাজান আদালতের কাজে বড় পটু। নানা কিছু জাল করতে, মিথ্যা সাক্ষ্য সাজাতে, দারোগা-আমলা বশ করতে, সম্পদ 'হজম' করতে, দাঙ্গা-হাঙ্গামা করতে, হ্যাঁ-কে না আর না-কে হ্যাঁ করতে তাঁর তুলনা নেই। এ জন্য নীলকর ও জমিদারদের কাছে মোকাজানের খুব কদর। এ চরিত্র সম্পর্কে টেকচাঁদ আরো লিখেছেন : 'তাহাকে আদর করিয়া সকলে ঠকচাচা বলিয়া ডাকিত,...।' 'ঠকচাচা' নাম একবার উল্লেখমাত্রই কাহিনীকার থেমে যেতে পারতেন, সে সুযোগ তাঁর ছিল। কারণ তিনি তো কাহিনীর 'সকলে' নন, কাহিনীকার। কিন্তু প্যারীচাঁদ স্বয়ং মোকাজান নামটি আর নিলেনই না, তাঁকে 'ঠকচাচা' বলেই উল্লেখ করে গেলেন কাহিনীজুড়ে। কাহিনীকারের পক্ষপাতে ঠকচাচা নামটিই বড় হলো মোকাজান মিয়া নামের চেয়ে। আর 'ঠক' কথাটি নামের সঙ্গে বহুবার উচ্চারিত-আলোচিত-পঠিত হওয়ায় মোকাজানের কপালে 'খলচরিত্র'-এর তিলক হলো আঁকা। আমার বিশ্বাস, প্যারীচাঁদ মিত্র তাঁর কাহিনীতে মোকাজানকে সব সময় 'ঠকচাচা' (এবং তাঁর স্ত্রীকে ঠকচাচি) বলে উল্লেখ না করলে মোকাজান 'খলচরিত্র' বলে সহজে পরিচিত হতেন না। আমরা কি এখন থেকে মোকাজানকে মোকাজান বলে সম্বোধন বা অভিহিত করতে পারি না? কী আশ্চর্য, প্যারীচাঁদের ভাষায় মোকাজানের স্ত্রীও হলেন 'ঠকচাচী'? লেখক তাঁর জন্য কোনো নাম পেলেন না? যিনি কি না গ্রামীণ নারীদের নিয়তি-নির্ভরতা ও নানা সংস্কারকে অবলম্বন করে স্বামীর কষ্টের সংসারে একটু সচ্ছলভাবে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজেছিলেন_তাঁকেও 'ঠকচাচী' নাম দিয়ে 'খল-সহধর্মিণী' বানানো বিবেচনাপ্রসূত ছিল কি? 'আলাল'-কাহিনীতে তাঁরাই তো সবচেয়ে নিবিড় দম্পতি, পরস্পর পাশে থেকে যাঁরা একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন সুখ-দুঃখের পসরা! তাহলে তাঁদের জন্য এ অপবাদ কেন? লেখকের দৃষ্টিতে ঠক-দম্পতি হলেন তাঁরা? আর গত দেড় শ বছর ধরে গতানুগতিক মূল্যায়নে বদ্ধ থাকলেন এই যুগল!
মোকাজানকে বলেছি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম 'মরদ' অর্থাৎ পুরুষ চরিত্র। 'নর' মানেই 'পুরুষ' নয়। পুরুষ আর পৌরুষত্ব সম্পর্কান্বিত। পৌরুষত্বের সঙ্গে যুক্ত তেজ, বীর্য, পরাক্রম। অর্থ-পরিব্যাপ্তির দিক থেকে এই প্রতীতি বিচার করলে বলতে হয়, মোকাজানে এ তিনটিই আছে। কর্ম সম্পাদনে তাঁর তেজোদ্দীপ্ততার পরিচয় মেলে; স্ত্রীর প্রতি নিজের নিষ্ঠা এবং নিজের অনুপস্থিতিতে স্ত্রী অন্য কাউকে নিকা করতে পারে_এই চিন্তা বীর্য-ভাবনাপ্রসূত; আর যাঁর কাছে নীলকর বা জমিদার আশ্রয়প্রার্থী, ছেলের হাজতবাসের সংবাদ শুনে মাথায় 'বজ্র ভাঙ্গিয়া' পড়া ধনাঢ্য বাবুরাম বাবু যাঁর শরণ নেন, তিনি যে স্বীয় পরাক্রমের সীমা কত দূর সম্প্রসারিত করেছেন তা সহজেই অনুমান করা যায়। নিজের বিপৎকালেও যিনি ব্রাহ্মণদের শাস্ত্রীয় তর্ক অবসানে অগ্রসর হন, তিনি যে পরম বিচক্ষণ সে কথা বলাই বাহুল্য। তাই বলি, 'আলাল'-কাহিনীতে অনেক 'নর' চরিত্র আছেন বটে, কিন্তু মোকাজান ছাড়া কেউ সে অর্থে 'পুরুষ' নন। নিশ্চয়ই মরণে ভয় আছে তাঁর_মানুষের যেমন থাকে। কিন্তু মরার আগে মরতে রাজি নন তিনি। বাবুরাম বাবুকে নিয়ে নদীতে নৌকাসহ ঝড়ের মুখোমুখি হওয়ার পরও মুখে সাহস প্রদর্শন করতে ছাড়েননি মোকাজান। তিনি বাবুরামের উদ্দেশে বলেছেন : 'ডর কেন কর বাবু? লা ডুবি হইলে মুই তোমাকে কাঁদে করে সেতরে লিয়ে যাব_আফদ তো মরদের হয়।' পরে অন্যত্র বেণীবাবু ও বেচারামের সঙ্গে কথোপকথনকালেও তিনি মরদের লড়াইয়ের প্রসঙ্গ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। লক্ষ করার ব্যাপার, মোকাজান সব সময় 'নর'কে 'মরদ' বা 'পুরুষ' হতে অনুপ্রাণিত করেছেন। সাধারণ 'নর'-এর জীবন তাঁর কাছে কাম্য ছিল না।
'আলাল'-কাহিনীর শেষ দিকে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জাহাজে চড়ে দূর দেশে যাওয়ার সময় মোকাজান বলেছেন : 'মোদের নসিব বড় বুরা_'। সত্যি বলতে, ভাগ্য তাঁর পক্ষে ছিল না। ভাগ্য পক্ষে না-থাকায় শেষ পর্যন্ত কঠিন শাস্তি জোটে তাঁর 'কপালে'। শুধু ভাগ্য নয়, লেখক নিজেও কি বিপক্ষে ছিলেন না মোকাজানের? ছিলেন। প্যারীচাঁদ মোকাজানের বিপক্ষে ছিলেন বলে নামে তো তাঁকে 'ঠকচাচা' বানানো হয়েছেই, উপরন্তু কাহিনীর শেষ দিকে বেশ কিছু দুর্বলতাও অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে এ চরিত্রে। তার পরও 'আলাল'-কাহিনীতে 'পূর্ণ-জীবন-প্রমাণ' বলে যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা আছে মোকাজানেই। মোকাজান 'খল-চরিত্র' নয়_'আলাল'-কাহিনীর প্রকৃত 'মরদ' চরিত্র_আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম 'মরদ'ও।

ঘসেটি বেগম

0 comments
'আমার রাজ্য নাই, তাই আমার কাছে রাজনীতিও নাই। আমার বুকে দয়া নাই, মায়া নাই, স্নেহ নাই, মমতা নাই_আছে শুধু প্রতিহিংসা। এই প্রতিহিংসা আমার পূর্ণ হবে সেই দিন, যে দিন তোমার এই প্রাসাদ অপরে অধিকার করবে, তোমাকে ওই সিংহাসন থেকে ঠেলে ফেলে শওকত জঙের মতো কেউ যে দিন তোমাকে...।'

ঘসেটি বেগম সাহিত্য, চলচ্চিত্র বা নাটকপ্রসূত চরিত্র নয়। ঐতিহাসিক চরিত্র। কিন্তু নাটক, চলচ্চিত্র বা সাহিত্যে দাপটের সঙ্গেই নানা সময়ে নানাভাবে তিনি উপস্থিত এবং সুঅর্থে নয়, কুঅর্থেই। সাহিত্য বা ইতিহাসে খলচরিত্র অপ্রাসঙ্গিক নয়। সৎকে মজবুত ভিত দিতে অসতের উপস্থিতি শুধু বাংলা নয়, বিশ্বসাহিত্যেই অনিবার্য হয়েছে অসাধারণ সব সাহিত্যিকের সৃজনশীল রচনায়। আর ইতিহাসে নিজ স্বার্থ জায়েজ করতে ব্যক্তি শুধু নয়, সমষ্টির পতনেও পিছপা হননি এমন ব্যক্তির নজির দুর্লভ নয়। তেমনই এক ব্যক্তি, একজন নারী ঘসেটি বেগম। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের, পলাশির আমবাগান ট্র্যাজেডির এক প্রভাবশালী খল চরিত্র তিনি। সিরাজের পরাজয়ের পেছনে ছিল যে ষড়যন্ত্র, তার একটা বড় অংশের হিস্যা ছিল তাঁর। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে মীর জাফর, রাজবল্লভ, জগৎ শেঠদের সঙ্গে ঘোট পাকিয়ে ঘসেটি পুরো বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতাটাই বিলিয়ে দিলেন ব্রিটিশ বেনিয়ার হাতে। অথচ সম্পর্কে তিনি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার আপন বড় খালা!
সৃজনশীল নাট্যসাহিত্যে পলাশীর যুদ্ধটা এসেছিল সিরাজকে মূল চরিত্র করে। তার সঙ্গে আসে সে যুদ্ধের খল চরিত্রগুলো। বাংলা নাটক ও মঞ্চের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিভা গিরিশচন্দ্র ঘোষ ১৯০৫-এ সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে নাটক লেখেন। ১৯৩৮ সালে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তও লেখেন 'সিরাজদ্দৌলা'। বর্তমান আলোচনায় শচীন্দ্রনাথের নাটকটিকেই অবলম্বন করা হয়েছে। তিনি এখানে সিরাজকে ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবেই শুধু দেখেননি, তাঁর মধ্যে জাতির ট্র্যাজেডি চিত্রটিও আঁকেন বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই। এ ক্ষেত্রে তিনি ইতিহাসের সঙ্গে মিশিয়েছেন কল্পনাকেও, কিন্তু সে কল্পনা ইতিহাসবিরোধী নয়। নাটকটির নিবেদন অংশে তাই নাট্যকার নিজেই লেখেন 'ইতিহাস ঘটনাপঞ্জি'। নাটক তা নয়। ঐতিহাসিক লোকের ঘটনাবহুল জীবনের মাত্র একটি ঘটনা অবলম্বন করেও একাধিক নাটক রচনা করা যায়। যায় এ জন্যই যে ঘটনা নয়, ঘটনাটি ঘটার কারণই নাট্যকারের বিষয়বস্তু। সে 'ঘটার' কারণ অনুসন্ধান করতেই সিরাজের পাশাপাশি ঘসেটি চরিত্রটিও নাটকে উঠে এসেছে সমান গুরুত্বের সঙ্গেই। তাই নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যেই আমাদের দেখা হয় তাঁর রাজবল্লভের সঙ্গে কথোপকথনরত অবস্থায়। জানা হয়, তাঁর মতিঝিলের বাড়িটি সাজিয়ে দিয়ে গেছেন ইংরেজ বেনিয়া ওয়াটসের বউ। প্রকাশিত হয় তাঁর সিরাজবিরোধী ইংরেজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও। তাঁর চেহারা-সুরতের কোনো বর্ণনা নাটক কি ইতিহাসগ্রন্থে সুলভ না হলেও তিনি সম্ভবত সুশ্রীই ছিলেন। নাটকের এ অংশে সাজগোজ করার পর তাঁকে কেমন লাগছে সে বিষয়েও তিনি জানতে চান রাজবল্লভের কাছে। তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়ের 'পলাশির যুদ্ধ' গ্রন্থে তাঁর ব্যক্তিচরিত্র সম্পর্কেও জানান এক চমকপ্রদ তথ্য, নবাব হওয়ার আগেই নাকি এক দিন প্রকাশ্য রাজপথে হোসেন কুলী খাঁ নামের এক ব্যক্তিকে সিরাজ খুন করেন; এ ব্যক্তির সঙ্গে ঘসেটির গুপ্ত প্রণয় ছিল বলে লোকের মধ্যে আলোচনা ছিল। ঘসেটির এ বিষয়ে দুর্নামও ছিল বেশ। এ নিয়েও হয়তো সিরাজের বিরুদ্ধে ঘসেটির অন্তরে ছিল চাপা এক প্রদাহ।
আলিবর্দী খাঁর কোনো ছেলে ছিল না, ছিল তিন মেয়ে। ছোট মেয়ে আমেনা বেগমের ছেলে সিরাজ। কিন্তু বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম ছিলেন নিঃসন্তান। তাই সিরাজেরই ছোট ভাই আক্রামউদ্দৌল্লাকে পোষ্য নিয়েছিলেন। চেয়েছিলেন এ ছেলেই আলিবর্দীর পর হোক নবাব। তা হলে হয়তো পর্দার আড়ালে বসে বাংলার শাসনযন্ত্রটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে তাঁর পক্ষে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অল্পবয়সেই বসন্তরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় আক্রামের। তাই ওই ইচ্ছা তাঁর থেকে যায় অপূর্ণই। আক্রামের মৃত্যুশোকে ঘসেটি বেগমের স্বামী ঢাকার গভর্নর নোয়াজিশ খাঁও কিছুদিন পর মৃত্যুবরণ করেন। তার দুই মাস পর আলিবর্দীর মেজ জামাই সৈয়দ মোহাম্মদও মারা যান। তখন ঘসেটির শেষ অবলম্বন মেজ বোনের ছেলে শওকত জঙ। কিন্তু বাবার জায়গায় শওকত পুর্নিয়ার নবাব হলে সিরাজের নবাব হওয়ার পথটা হয়ে যায় নিষ্কণ্টক। ঘসেটির রাজদ্রোহ তখন পায় এক গনগনে চেহারা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। তাই রাজবল্লভের কাছেই তাঁকে আক্ষেপ করতে শোনা যায়, 'উঃ! আপনার কথায় বিশ্বাস করে কী নির্বোধের মতোই কাজ আমি করেছি। সিংহাসনে সিরাজ সুপ্রতিষ্ঠিত হবে জানলে আমি আপনাদের দলে যোগ দিতাম না। সিরাজের প্রতি স্নেহ দেখিয়ে আমি সহজেই সিরাজের বিশ্বাসের পাত্রী হতে পারতাম! আপনাদের শক্তির ভরসায়, আপনাদের প্ররোচনায়, আমি সে পথেও কাঁটা দিয়ে রেখেছি।'
সিরাজও জানতেন তাঁর এসব দুরভিসন্ধির কথা। তাই সিংহাসনে বসেই প্রথম চোটটাই নিলেন ঘসেটির ওপর। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ধনদৌলত-লোকলস্কর নিয়ে মুর্শিদাবাদের দক্ষিণে মতিঝিলের ওপর এক প্রকাণ্ড বাড়ি হাঁকিয়ে রাজার হালে বাস করছিলেন। কিন্তু সিরাজ তাঁর ওপর প্রসন্ন ছিলেন না কখনোই। এত দিন আলিবর্দী খাঁ-ই ছিলেন বড় বাধা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সে বাধা আর থাকল না। সিরাজ জানতেন আক্রামউদ্দৌলাকে নবাব করতে আটঘাট বেঁধে লেগেছিলেন তিনি। এখন তাঁর চোখ পড়েছে শওকত জঙের ওপর। তাঁকেই সিরাজের স্থলাভিষিক্ত করতে আঁটছেন ফন্দি। সে সুযোগ ঘসেটিকে তিনি আর দিতে চাইলেন না। আসলে আলিবর্দী খাঁর মৃত্যুর আগেই সিরাজবিরোধী দলটা যে তাঁকে কেন্দ্র করেই ডালপালা ছড়াচ্ছে, সে বিষয়েও অবগত ছিলেন সিরাজ। সেসবের বদলা নিতে এবং নিজ নবাবির ভিতটা পোক্ত করতে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো সিরাজ এবার চড়াও হলেন ঘসেটির মতিঝিলের বাড়িতে। তপনমোহনের ভাষ্যে, সৈন্যসামন্ত সব কয়েদ করে ধনসম্পত্তি সব নিলেন লুটে। স্বামীর দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অর্থ-ধনরত্ন সব চলে গেল নবাবের হাতে। ঘসেটির প্রাণ বাঁচলেও মান বাঁচল না। হলেন সিরাজের অন্তঃপুরে নজরবন্দি। তার ওপর নোয়াজিশ খাঁর মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগমের ঢাকার দেওয়ান ছিলেন যে রাজবল্লভ, সে মুর্শিদাবাদ এলে সিরাজ কয়েদ করেন তাকেও। এসব ঘটনার অভিঘাত আরো উসকে দিল ঘসেটি বেগমকে। খেপে হলেন আগুন।
এবার পেছন থেকে শওকত জঙকে উসকে দেওয়ার খেলায় নামলেন ঘসেটি। শওকতও বিশ্বাস করতেন নবাবি পদটা তাঁরই পাওনা। সিরাজকে তিনি যে নবাব বলে স্বীকার করেন না, এ বিষয়টা ছিল প্রকাশ্য। তাই ঘসেটিরই প্ররোচনায় ১৭৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর নবাবে-জঙে বাধে ঘোর যুদ্ধ। বেদম ভাঙ খেয়ে হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধের ময়দানে এলেন শওকত। তারপর যা হওয়ার তাই_সিরাজের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরার আগেই গোলার আঘাতে তাঁর মাথার খুলিটা গেল উড়ে। শওকতের নবাবির আশার এখানেই ইতি। কিন্তু হাল ছাড়লেন না ঘসেটি। তাঁর আঁতাত অটুট থাকল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মারফতে ইংরেজের সঙ্গে। সিরাজের অন্তঃপুরে নজরবন্দি অবস্থায়ও ছড়াতে লাগলেন বিষবাষ্প।
তারই ছবিটা শচীন্দ্রনাথ এঁকেছেন নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে। সেখানে বসেও তিনি ভুলতে পারেন না মাতা হওয়ার অভিলাষটা। এবার সিরাজ, লুৎফা আর ঘসেটির কথোপকথন। ঘসেটিকে এখানে বলতে শুনি, 'অপরকে বঞ্চিত করে যে সিংহাসন পেয়েছ, সে সিংহাসন তোমাকে শান্তি দেবে ভেবেছ?' অথবা লুৎফাকে কাঁদতে দেখে, 'আজকের এ কান্না শুধু বিলাস। চোখের জলে নবাব পথ দেখতে পাবেন না। বেগমকে আজীবন আমারই মতো কেঁদে কাটাতে হবে। আমিনা কেঁদে কেঁদে অন্ধ হবে। পলাশি-প্রান্তরে কোলাহল ছাপিয়ে উঠবে ক্রন্দন রোল।' বিস্মিত, হতবিহ্বল সিরাজ প্রশ্ন করেন, 'ওই ঘসেটি বেগম মানবী না দানবী?' এর জবাবে লুৎফার মুখ দিয়েই যেন শচীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করেন ঘসেটি চরিত্রটা, 'ওর নিঃশ্বাসে বিষ, ওর দৃষ্টিতে আগুন, ওর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ভূমিকম্প।'
মোগল হেরেমের নারী-রাজদ্রোহের বল্গাহীন ঘোড়াটিই যেন ছুটে এসে ঢুকেছিল বাংলার নবাবের অন্তঃপুরেও। তার লাগাম টানতে পারেননি সিরাজও। তাই পলাশীতে জয় হয়েছিল খলেরই। সেই আম্রকাননে এক বিষবৃক্ষের মতোই যেন মীর জাফর, জগৎ শেঠদের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ঘসেটি বেগম। ইংরেজদের সব মিলিয়ে ছিল ৯৫০ গোরা আর ২১০০ সেপাই। সঙ্গে মাত্র আটটি কামান আর দুটি বড় তোপ। অন্যদিকে সিরাজের ছিল জঙ্গি আর ঘোড়সওয়ার মিলে ৫০ হাজার সৈন্য এবং ৫৩টি বড় কামান। কিন্তু জয় হলো ঘসেটি গংয়েরই। ২৫ বছর বয়সে মাত্র ১৪ মাস নবাব ছিলেন সিরাজ। তারপর ঘসেটির ক্রোধ আর হিংসার দাবানলে পুড়েছেন তিনি।
তাই ঘসেটি বেগম আজ আর শুধু ব্যক্তিমাত্র নন। তার এ নাম আজ বিশেষ্য থেকে হয়েছে বিশেষণ। পরিণতি পেয়েছে এক ব্যক্তিক খল-মিথে। যুদ্ধ শেষে তার সাঙ্গাত মীর জাফর নবাব হয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেই কি (!), কুষ্ঠরোগে ১৭৬৫ সালে মারা যান তিনি। নবাবির লোভে মত্ত মীরন, সিরাজের বংশের একটি ছেলেকেও যে জ্যান্ত ছাড়েনি, তার মৃত্যু বজ্রাঘাতে। কী দুঃখে কে জানে রবার্ট ক্লাইভ মরেছিলেন নিজের গলায় নিজেই ক্ষুর চালিয়ে। আর ঘসেটি বেগম? একদার দোসর মীর জাফরের ছেলে মীরনের কূটকৌশলে করুণ এক সলিল সমাধি হয়েছিল তার ঢাকার অদূরে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা আর ধলেশ্বরীর ত্রিমোহনায়।

সূত্রঃ কালের কন্ঠ


নবাব আলিবর্দী খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা ঘসেটি বেগম। আলিবর্দীর বড়ভাই হাজী আহমদের বড় ছেলে এবং ঢাকার শাসনকর্তা নওয়াজিস মোহাম্মদ শাহমৎজঙ্গের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। ঘসেটি বেগম সে কারণে ছোট বোন এবং সিরাজউদ্দৌলার মা আমিনা বেগমের দ্বিতীয় পুত্র একরামুদ্দৌলাকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। হয়তো গোপন ইচ্ছা ছিল, একদিন এই পোষ্যপুত্র নবাব হবে এবং তিনি নবাবের মাতা হিসেবে রাজকার্য পরিচালনা করবেন। কিন্তু যুবক বয়সেই একরামুদ্দৌলা বসন্ত রোগে মারা যায়। ঘষেটি বেগমের স্বামী নওয়াজিস মোহাম্মদ ছিলেন ভগ্নস্বাস্থ্য ও দুর্বল চিত্ত ব্যক্তি। তার শাসনকার্য পরিচালনা করতেন সেনাপতি হোসেন কুলী খাঁ। হোসেন কুলী খাঁর সঙ্গে ঘষেটি বেগমের অবৈধ সম্পর্ক ছিল বলে অনুমান করা হয়। আলিবর্দীর ইঙ্গিতে হোসেন কুলী খাঁকে হত্যা করেন সিরাজউদ্দৌলা। এ কারণে ঘষেটি বেগম সিরাজউদ্দৌলার প্রতি বিরূপ হন। ঘসেটি বেগম বাস করতেন মুর্শিদাবাদে সুরম্য মতিঝিল প্রাসাদে। বিক্রমপুরের আধিবাসী রাজা রাজবল্লভ ঢাকায় নওয়াজেস মোহাম্মদের দেওয়ান ছিলেন। রাজা রাজবল্লভের সহায়তায় ঘসেটি সিরাজদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নবাব যথাসময়ে এই ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে মতিঝিল প্রাসাদ থেকে ঘসেটীকে উৎখাত করে রাজ প্রাসাদে বন্দী করে রাখেন এবং তার যাবতীয় সোনাদানা বাজেয়াপ্ত করেন। পলাশী যুদ্ধের পর ইংরেজরা ঘষেটী বেগমকে ঢাকায় অন্তরীণ রাখে এবং মীরনের চক্রান্তে ঘষেটীকে মাঝনদীতে ফেলে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।

গ্রন্থনা : তাহ্মীদুল ইসলাম

ভাঁড়ু দত্ত

0 comments
মঙ্গলকাব্যগুলো বাংলার ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালের ভাষ্য। ওই সময়টায় বাংলার রাষ্ট্র-সমাজ নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটা জটিলতার ঘূর্ণাবর্তে উপনীত। এ জটিলতার প্রভাব সমাজ-সংস্কৃতির ওপর তো বটেই, মানুষের ওপরও বর্তেছে। কাজেই সে সময়কার সাহিত্যে বর্ণিত বিভিন্ন চরিত্রের পশ্চাতে সমকালীন জীবনের একটা সংলগ্নতাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না, এমনকি সে চরিত্র যদি পৌরাণিক বা ধর্মাশ্রিতও হয় তবুও।
ভারতবর্ষের অন্যান্য অংশের তুলনায় এর পূর্ব দিককার বাংলা অঞ্চল অপেক্ষাকৃত নতুন হলেও এর রাজনৈতিক-সামাজিক গুরুত্ব একপর্যায়ে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিনিধিত্বমূলক হয়ে দেখা দেয়। দুজন প্রধান ধর্মপ্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ এবং জৈন মহাবীর বাংলায় ধর্ম প্রচারের জন্য আসেন। মৌর্যযুগের দীর্ঘ দুর্ভিক্ষ এবং মগধে দক্ষিণী ও তিব্বতি আগ্রাসনের পরিণামে মগধ থেকে বাংলা অভিমুখী জন-অভিপ্রয়াণের (সধংং-সরমৎধঃরড়হ) বিষয়টিও এখানে স্মর্তব্য। গুপ্তযুগেও বাংলার ঊর্ধ্বাঞ্চল মগধে : গুপ্ত-সম্রাটদের আকর্ষণের উপলক্ষ ছিল। শশাঙ্কের গৌড়তন্ত্রের প্রভাবে সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলে বিস্তার ঘটে শৈবতন্ত্রের। এদিকে দক্ষিণ ভারতের সেনারাও একসময় এসে হাজির হয় প্রথমত রাঢ় অঞ্চলে এবং ক্রমশ পুণ্ড্রান্তরে। পালরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়রাও তাঁদের শাসনামলে মর্যাদাপূর্ণ অংশীদারির মালিক। পরবর্তী সময়ে সেন আমল থেকে তুর্কি বিজয়কাল পর্যন্ত বাংলায় দেব-খৰ-বর্মণ-চন্দ্র প্রভৃতি রাজবংশ কোনো না কোনো দিকে প্রতিপত্তিশালী। সুলতানি আমলে বিদেশি সংস্কৃতি ও মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলায়। দিলি্লতে মোগলদের শক্তিশালী অবস্থানের সুযোগে আফগানরা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে বাংলার দিকে। রাজনৈতিকভাবে বাংলা অঞ্চলে বিকাশ ঘটে বৈচিত্র্যের।
পেশাগত বিচারেও দেখা যাবে, কয়েক শ বছরের ব্যবধানে বাংলার সমাজজীবন বিচিত্র পদ-অভিধায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উচ্চতর আর্য শেণীগুলো ছাড়াও নানা প্রশাসনিক প্রয়োজনে এবং ভূমিকেন্দ্রিকতার কারণে মানুষ বৃত হয়েছে নতুন নতুন পরিচয়ে। মধ্যযুগের বাংলায় তথা সুলতানি মোগল আমলে কমপক্ষে ছত্রিশ রকমের পেশাধারী মানুষের হদিস পাওয়া যাবে। এ পেশাবৈচিত্র্য মানুষ মানুষে প্রভেদ গড়েছে। মাথাপিছু পুঁজির অধিকারিত্ব সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক বৈচিত্র্য ও সম্পর্ক জটিলতার হেতু। সব মিলিয়ে একটা জটিল মানবিক সংস্কৃতিও মধ্যযুগের বাংলায় লক্ষণীয় হয়ে উঠেছিল।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের ভাঁড়ু দত্ত চরিত্রটি মধ্যযুগের বাংলার বহুস্তরা সামাজিক জীবনের প্রতিনিধি। চণ্ডীমঙ্গলের অনেক কবির কাব্যেই ভাঁড়ু একটি প্রাণবন্ত চরিত্র, বিশেষ করে দ্বিজ মাধব এবং মুকুন্দরামের কাব্যে সে শিখরস্পর্শী। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁকে দিয়েছেন এমন অবয়ব। চণ্ডীমঙ্গল কবির এমন একটা সময়ের রচনা যখন তিনি বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে অন্যের করুণা-দয়ায় আশ্রিত। বাকি জীবন আর তাঁর ফেরা হয়নি আপন ভূমে। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার আফগান শাসন অপসৃয়মাণ। মোগলরা একে একে ঢুকছে পূর্ব পরিবৃত্তে। বার ভূঁইয়ার দাপট ম্রিয়মাণ।
উড়িষ্যার পরাক্রমশালী কতলু খাঁ নিহত হন মানসিংহের হাতে। সেই ক্রান্তিকালে বিপর্যয় জাপটে ধরে জীবনের অভিজ্ঞতাধারী মুকুন্দরামকে। তাঁর কাব্যে প্রায় সপ্তাহ দুয়েকের গ্রাম ত্যাগের ও সুস্থিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত কবির ভেতরে উন্মীলন ঘটায় এক নব নয়নের। ফলে সামাজিক কাহিনীর একটি ক্ষুদ্র পূর্বভাষণরূপে এসে পড়ে মূল্যবান 'গ্রন্থোৎপত্তির বিবরণ'।
সবটাই কবির জীবনের অভিজ্ঞতা। ভূমিকাংশের বিপর্যয়-বৃত্তান্ত এবং কাব্য-উপাখ্যানের প্লটটিও। কালকেতুর রাজ্য প্রতিষ্ঠার কাহিনী নিঃস্ব মানুষের স্বপ্ন-সংবচন এবং এর মাঝখানে ভাঁড়ু দত্ত মানবমনের স্বপ্ন-প্রসন্নতা ও আরাম ধ্বংসকারী এক চিরন্তন দুঃস্বপ্নের প্রতিরূপ। সাড়ে চার শ বছর আগেকার এ লোকটিকে যেন গতকাল, গত বছর, গত দশকে বা বিগত ইতিহাসের নানা বিন্দুতে দেখতে পাওয়া গেছে। যেন বিষাক্ত তীরের মাথাকে মধুমণ্ডিত করে এখনই ছুড়ে দেবে সে।
ভাঁড়ু শব্দটি মূলত 'ভণ্ড'_এই প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষাজাত। সে ভাঁড়ুতে পরিণত হয়ে বরং আরো বিচিত্র, আরো দুর্জ্ঞেয়। শব্দটিকে চমৎকার বিশেষ্য বানিয়ে দত্ত পদবিযুক্ত কায়স্থের পরিচিতি এনে যেন অধিকতর সমাজকেন্দ্রিক করে তোলা গেল। মুকুন্দরাম এখন তাঁর চণ্ডীমঙ্গল লিখছেন ১৫৯৬-১৬০০_এর মধ্যে তখন তো ভাঁড়ুরা বটেই, তারও অনেককাল আগে থেকে তারা বাংলার সমাজে-পরিবারে পূর্ণাঙ্গ অবয়বে প্রকাশমান।
প্রতারণা, চক্রান্ত, নির্যাতন, ষড়যন্ত্র কেবল আজকের দিনের ঘটনা নয়। সন্ত্রাস, রাহাজানি, মাস্তানিও তেমনি উত্তরাধিকারের ফল। কালকেতু চেয়েছে একটি সুবিন্যস্ত শান্তিকামী অসাম্প্রদায়িক জনবসতির প্রতিষ্ঠা; কিন্তু মানুষের এসব মহৎ স্বপ্ন যেন কোনোকালেই পূরণ হওয়ার নয়। শ্রমবিমুখ, পরস্ব-অপহরণকারী, বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির কুচক্রের কাছে পরাজিত হয় সুস্থ-জীবনের অভীপ্সা। ভাঁডু দত্তেরও প্রায় সাত-আট শ বছর আগে চর্যাপদের কবি সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব ও ভাগ্যবিড়ম্বিত হওয়ার কথা পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই দুর্বলের নিগ্রহ চিরকালীন বাঙালি-জীবনের প্রধান কাহিনী। সে জন্যই ভাঁড়ুকে এমন হিরণ্যপ্রভা দেওয়ার আয়োজন দেখি কবির।
মনে হচ্ছে, যেন জটিল জীবনের ভেতর থেকে এক শক্তিশালী প্রেক্ষণযন্ত্র দিয়ে মুকুন্দরাম বের করে নিয়ে এসেছেন ভাঁড়ুকে।
কালকেতুর প্রতিষ্ঠিত নগর যে কেবল ভালো মানুষের সমবায়ে একটি আদর্শ উপনিবেশ হয়ে উঠবে, তা কিন্তু নয়। সে না চাইলেও মন্দ মানুষ ঢুকে পড়ে সেখানে। ফলে দ্বন্দ্ব হয়, জটিলতা বাড়ে, জীবনের বিরুদ্ধে স্রোতগুলো স্পষ্ট হয়। যদিও কবির বিবরণ দেখে মনে হতে পারে, ভাঁড়ু দত্ত একা, একাকী, সমাজবিরোধী মধ্যস্বত্বভোগী এক ব্যক্তি। কিন্তু তার পেছনে একটি চক্র হয়তো সক্রিয়। হাটুরেদের মধ্যে ভাঁড়ুর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ এবং দম্ভোক্তি (আমি মহামণ্ডল আমার আগে তোলা) প্রবল সমাজবিরোধীদের কার্যকলাপ। দেশ বাইরের মানুষের দখলে, স্বদেশিদের বেদনা অন্তহীন। ফুল্লরার শ্রমের পসরা রোদে-বৃষ্টিতে কেবলই দীর্ঘশ্বাস ছড়ায় অথচ আপন মানুষদেরই অচেনা ঠেকে। সব চাপের শিকার হয়ে পড়ে শ্রমজীবী মাটিসংলগ্ন জনমণ্ডলী। এমন নগর কালকেতুর প্রত্যাশা ছিল না, ছিল না কবিরও।
পরশ্রীকাতরতার শ্রেষ্ঠ মধ্যযুগীয় দৃষ্টান্ত ভাঁড়ু দত্ত। সমগোত্রীয় মানুষের উত্থানে সে ঈর্ষাকাতর। অন্যের আনন্দ, অন্যের উন্নতি তাকে জ্বালিয়ে মারে। নিম্নস্থ ব্যাধের রাজ্য হওয়াটা তো অনেক বড় সর্বনাশ (ভাঁড়ুর চোখে) কাজেই রাজতোষণের মায়াময় আয়োজন ভাঁড়ুর। রাজা দাক্ষিণ্য, দান, পৃষ্ঠপোষণায় নিজের বৈষয়িক সম্ভাবনা ফাঁপাতে থাকে ভাঁড়ু। উৎপাদন থেকে শত হস্ত দূরে থাকা ভাঁড়ুর সব ষড়যন্ত্র উৎপাদনাশ্রিত মানুষের বিরুদ্ধে। এরাই পরে আরো ভীষণ ও বিভীষণ হয়ে ওঠে।
মুকুন্দরামের কাব্যের শেষ দিকে ভাঁড়ুর পরিণামভোগ ও শায়েস্তার ব্যবস্থায় এটা মনে জাগা স্বাভাবিক যে ভাঁড়ুদের দৌরাত্দ্যেরও শেষ আছে। ভাঁড়ুকেন্দ্রিক দুঃস্বপ্নের অন্তিমে খানিকটা আরাম খোঁজা যায়_'ভাঁড়ুর ভিজায় মাথা দিয়া ঘোড়ার মুত'_এ-ও যে কাজ হয়নি তার প্রমাণ পরবর্তীকালের ভাঁড়ুর নব নব অবতারসমূহের ক্রমাবির্ভাবে। অনন্তর মধ্যযুগের বহু সাহিত্যে আমরা তাদের নানা রূপে নানা মূলে শনাক্ত করি, যাদের বারবার উত্থান ঠেকানো যায় না কোনোভাবেই। ইয়াকুব, রমজান, গদু প্রধান, লুন্দর শেখ, মজিদ, কাদের প্রভৃতি তাদের নতুন নাম বিশেষণ। যে সামাজিক অসম্পূর্ণতা-বিকৃতি, বিকাশহীনতা আবদ্ধতার ফলে ডিফর্মড চাইল্ডের মতো ভাঁড়ুদের জন্ম, সে সমাজটাকে হয়তো আমরা পাঁচ শতাব্দী পেছনে রেখে এসেছি; কিন্তু তার দীর্ঘ প্রলম্বিত ছায়ার নিচে আজও আমাদের দণ্ডায়মানতা।

বাংলা সাহিত্যে খল চরিত্র

0 comments
সাহিত্যের আদি কবিরা খল চরিত্রের রূপায়ণ করেছেন। ইলিয়ড-ওডিসি, মহাভারত-রামায়ণ মহাকাব্যে খল চরিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। গ্রিক মিথে রয়েছে দেব-দেবীর বিচিত্র খলামির বিবরণ। মহাভারতের শকুনি, রামায়ণের রাবণ বিখ্যাত খল চরিত্র। জন মিল্টনের প্যারাডাইস লস্টের শয়তান চরিত্রটি শয়তানের শয়তান, বেউলফের গ্র্যান্ডেলের মা প্রকৃত খল। রবীন্দ্রনাথ খল চরিত্র হিসেবে শেক্সপিয়রের ফলস্টাফের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, কল্পনার রসে জারিত হয়ে চরিত্রগুলো সৃষ্টি হয়েছে বলে খল হয়েও আমাদের মনে সেগুলো দাগ কাটে। 'ওথেলো'র ইয়াগো মতলববাজ, ধূর্ত চক্রান্তকারী। হ্যামলেটের চাচা ক্লডিয়াস খলতার পরিচয় দিয়েছে দুষ্কর্ম করে। সে হত্যা করে নিজ ভ্রাতা তথা হ্যামলেটের বাবাকে, বিয়ে করে রানি গারট্রুডকে, যাকে হ্যামলেট মা বলে ডাকে। বাবার প্রেতাত্দা হ্যামেলেটের চাচাকে বদমাশ বলেছে, বলেছে চতুর, ব্যভিচারী, পশু, বিশ্বাসঘাতক। 'টেম্পেস্টে' কুচক্রী অ্যান্টোনিও প্রস্পেরোকে সরিয়ে মিলানের ডিউক হয়েছে। মার্চেন্ট অব ভেনিসের শাইলক ক্রূরতায় খলপনা করেছে। কিং লেয়ার, রিচার্ড দ্য থার্ডে খল চরিত্র আছে। জোশেফ কনরাডের উপন্যাসে, ক্রিস্টোফার মার্লোর নাটকে, হার্ডির টেসে, নবকভের ললিতায়, মেলভিনের মবিডিকে স্মরণীয় হয়ে আছে খলাঙ্কন। কিপলিংয়ের শের খানের খলত্ব ছাড়াও জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪-তে, ডিকেন্সের রচনায়, গোর্কি ও হামসুনের উপন্যাসে চরিত্রের খলতা আমাদের অতি পরিচিত। বর্তমানে বহুল পরিচিত কিশোর সাহিত্য হ্যারি পটার সিরিজের উপন্যাসগুলোয় জে কে রাউলিং খলের বহুমাত্রিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
বিশ্বসাহিত্যের খল চরিত্রগুলোর দিকে মনোযোগ দিলে লক্ষ করা যায়, এরা কেউ অপরাধী, খারাপ ব্যক্তি, সংকীর্ণচেতা, অসততায় অসামান্য এবং নায়কের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্তিশালী। সাধারণ মানুষের কাছে এরা বাজে লোক, শত্রু, হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর নীতিহীন। সাহিত্যে খল চরিত্রের রূপায়ণের সার্থকতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন : 'বহু লোকের বহুবিধ মন্দত্বের খণ্ড খণ্ড পরিচয় সংসারে আমাদের কাছে ক্ষণে ক্ষণে এসে পড়ে; তারা আসে, তারা যায়, তারা আঘাত করে, নানা ঘটনায় চাপা প'ড়ে তারা অগোচর হতে থাকে। সাহিত্যে তারা সংহত আকারে ঐক্য লাভ করে আমাদের নিত্যমনের সামগ্রী হয়ে ওঠে, তখন তাদের আর ভুলতে পারি নে।' (সাহিত্যের তাৎপর্য)
খল বলতে খারাপ ব্যক্তিকে আমরা বুঝে থাকি, যে অপরের মুখ ম্লান করে দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করে, সাহিত্যে নায়কের বিপরীতে যার অবস্থান। অনেক সময় সে নিজেই নায়ক হয়ে ওঠে। অসততা যার মর্মে ফল্গুস্রোতের মতো প্রবাহিত, হীনতা যার মজ্জাগত তাকে খল হিসেবে অভিহিত করা যায়। খল অন্যের ক্ষতি করে লাভবান হয় নিজে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতি-আদর্শ তার কাছে মুখ্য নয়। বরং অনৈতিক কর্মধারা তার জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদে খল চরিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় সেই সময়ের উচ্চবর্গের জনগোষ্ঠীর মধ্যে। যারা রাতে নিম্নবর্গের নারীদের সঙ্গে সহবাস করত আর দিনের আলোয় সেসব অস্পৃশ্য নারীদের ঘৃণা করত, তারাই চর্যাপদের উদ্দিষ্ট খল। মধ্যযুগের কাব্যে দেবীদের খলপনা লক্ষ করা যায়। চণ্ডী, মনসা, শীতলা দুর্গতির দ্বারা মানুষকে পরাস্ত করে আপন মাহাত্ম্য প্রকাশ করেছে। শৈব চাঁদ-সওদাগরের দুরবস্থা দেবীর কারণে। বিক্রম দেখিয়ে কার্যসিদ্ধি করেছে দেবী। ব্যাধকে বিনা কারণে চণ্ডী দয়া দেখিয়েছে আবার কলিঙ্গরাজকে তেমনি বিনা দোষে নিগ্রহ করেছে। দয়ামায়াহীন ধর্মাধর্মবিবর্জিত শক্তিকে বড় দেখানো হয়েছে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলোয়। তবে এসব কাব্যে রূপায়িত খল চরিত্রগুলো কাব্যের সুষমা সৌন্দর্য প্রকাশ করেছে। রবীন্দ্রনাথ 'সৌন্দর্য ও সাহিত্য' প্রবন্ধে বলেছেন, কবিকঙ্কণ-চণ্ডীর ভাঁড়ু দত্ত চতুর স্বার্থপর এবং গায়ে পড়ে মোড়লি করতে মজবুত লোক। তার সঙ্গ সুখকর নয়। তবু কবি মূর্তিমান করতে পেরেছেন তাকে। সে কৌতুকরস নিয়ে জেগে উঠেছে। ভাঁড়ু দত্ত প্রত্যক্ষ সংসারে এভাবে গোচর হয় না। যতটুকু আবশ্যক সুসহ করে ততটুকুই তুলে ধরেছেন কবি। প্রত্যক্ষ সংসারে ভাঁড়ু দত্ত ওইটুকুমাত্র নয়। সমগ্রভাবে গোচর হয় না বলে তাতে আমরা আনন্দ পাই। ভাঁড়ু দত্ত বাহুল্য বর্জন করে কেবল একটি সমগ্ররসে মূর্তিতে প্রকাশ পেয়েছে। সামঞ্জস্যের সুষমার মধ্যে সমস্ত চিত্র দেখায় বলে আমরা আনন্দ পাই_একে সুষমা সৌন্দর্য বলে।
ভাঁড়ু দত্ত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের 'উজ্জ্বল জীবন্ত পাষণ্ড চরিত্র'। লোভী, অত্যাচারী, স্বার্থপর, ধূর্ত আচরণ তার। মৈমনসিংহ-গীতিকায় দুশমন কাজী মলুয়াকে তার স্বামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। অর্থলোভী আত্দীয় ভাটুক ঠাকুর, অত্যাচারী কাজী ও দেওয়ান খল। নেতাই কুটনী, চিকন গোয়ালিনী অপরের লালসার বহ্নিতে ইন্ধন দিয়েছে ও পারিবারিক জীবনের সুখ, শান্তি, পবিত্রতা নষ্ট করেছে। দুষ্টক্ষতের মতো এসব চরিত্র এখনো সমাজজীবনে বিরাজ করছে। 'মহুয়া'র হোমরা বেদে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যে ভূমিকা পালন করেছে, তা খলেরই নামান্তর।
উনিশ শতকে বাংলা কাব্যের বিকাশের ধারায় মধুসূদনের 'মেঘনাদবধ কাব্যে'র বিভীষণ অন্যতম খল চরিত্র। রবীন্দ্রনাথের 'দুই বিঘা জমি'র ভূস্বামীর খলত্ব প্রমাণিত হয় যখন পৈতৃক বাস্তুভিটা ছাড়তে হয় কৃষককে। 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' কাব্যে জমিদার প্রতিভূ নায়েবের উসকানিতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেধেছে। কুচক্রী জমিদার ও মহাজন শ্রেণীর ইন্ধনে নমঃশূদ্র ও মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। কারাভোগ করে সোজন। প্রেমের দুলি দূরে চলে যায়।
মধুসূদন, দীনবন্ধু, মীর মশাররফ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের নাটক-প্রহসনে বিভিন্ন খল চরিত্র তাদের খলতার স্বাক্ষর রেখেছে। মাইকেল মধুসূদনের 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ' প্রহসনে প্রবীণ জমিদার ভক্তপ্রসাদের অর্থলোভ, কৃপণতা ও লাম্পট্য চিত্রিত হয়েছে। দীনবন্ধু মিত্রের 'নীল দর্পণে'র নীলকুঠির দেওয়ান গোপীনাথ নীলকরের পক্ষে মিথ্যা মামলা করেছে গোলকচন্দ্রের বিরুদ্ধে। এ নাটকের রোগ সাহেব ও অন্য নীলকররা খল-শিরোমণি। 'জমিদার দর্পণে' মীর মশাররফ উচ্ছৃঙ্খল জমিদার হাওয়াদ আলীর খলামি দেখিয়েছেন। প্রজা আবু মোল্লার যুবতী স্ত্রী নুরুন্নেহারকে বলপূর্বক অপহরণ করে। অপহরণ পরবর্তী সে মৃত্যুবরণ করলে হত্যা মামলায় শেষ পর্যন্ত সাক্ষীদের বশ করে, মুক্তি পায় জমিদার। 'বিসর্জনে' রঘুপতির কর্মতৎপরতা খলাঙ্কনের শামিল, যদিও পরিণতিতে তার হৃদয় দ্রবীভূত। নক্ষত্ররায় রাজাকে বলেছে, 'রঘুপতি দেয় কুমন্ত্রণা। রক্ষ মোরে তার কাছ হ'তে।' গিরিশচন্দ্র ঘোষের 'সিরাজদ্দৌলা' নাটকে জগৎশেঠ-ঘষেটি বেগম, মীর জাফরদের শত্রুতায় ও বিশ্বাসঘাতকতায় পরাজয় ঘটে নবাবের।
কথাসাহিত্যে খল চরিত্রের রূপায়ণ সবচেয়ে বেশি। গল্প ও উপন্যাসের কাহিনীর ঘটনা ধারায় সম্পৃক্ত এসব চরিত্র কখনো উপন্যাসের সমস্যা আবার কখনো বা বক্তব্যের সঙ্গে জড়িত হয়ে খলারু হয়ে উঠেছে। প্যারীচাঁদ মিত্রের 'আলালের ঘরে দুলাল' রচনায় ঠকচাচা চরিত্রটি উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের খল চরিত্রের চমৎকার দৃষ্টান্ত। কূটকৌশল ও স্তোকবাক্যে মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারদর্শী জীবন্ত চরিত্র ঠকচাচা। প্রবঞ্চনাশ্রয়ী জীবন তার। তাকে বলা হয়েছে উনিশ শতকের ডামাডোলের এক কিম্ভূতকিমাকার অবস্থার নিদর্শন।
তবে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে খল চরিত্রের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। চরিত্রগুলোর মিছিল বাংলা সাহিত্যে অভিনব। এরা পাপভ্রষ্ট, নীতিভ্রষ্ট, প্রবৃত্তিতাড়িত, ঘাতক-ঘাতিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাঁর নারীরা চতুর ও কূটকৌশলী এবং দাগি। বিমলা, কতলু খাঁ (দুর্গেশনন্দিনী), মতিবিবি, কাপালিক (কপালকুণ্ডলা), পশুপতি, গিরিজায়া (মৃণালিনী), দেবেন্দ্রনাথ, হীরা (বিষবৃক্ষ), গুরগন খাঁ, ফস্টর, দলনী, শৈবলিনী (চন্দ্রশেখর), লবঙ্গ, হীরালাল (রজনী), ইন্দিরা (ইন্দিরা), হরলাল, রোহিনী (কৃষ্ণকান্তের উইল), প্রফুল্ল, হরবল্লভ (দেবী চৌধুরাণী), জয়ন্তী, শ্রী, গঙ্গারাম (সীতারাম), শান্তি (আনন্দমঠ), নির্মলকুমারী, জেবুন্নেসা, দরিয়া (রাজসিংহ) প্রভৃতি চরিত্রের খলাচার ও খলময় স্বভাব বাংলা সাহিত্যে অনন্য। তবে এদের মধ্যে খলস্বভাব ও নায়কোচিত বৈশিষ্ট্য আছে পশুপতির।
শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বিষবৃক্ষের হীরাকে বলেছেন 'ভিলেন'। কুন্দ-নগেন্দ্র-সূর্যমুখী ত্রিভুজ পারিবারিক গণ্ডি থেকে কাহিনী ধারাকে বের করে এনেছে হীরা। ঈর্ষাদগ্ধ, অভিমানবিকৃত, বিদ্বেষক্রূর হৃদয়ের হীরা গৌণ চরিত্র নয়। দেবেন্দ্র-হীরাই উপন্যাসের সমাপ্তি টেনেছে। দুর্বিনীত খল রবীন্দ্রনাথের 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসের সন্দীপ। নগ্নভাবে সে নিজেকে জাহির করে, প্রবৃত্তির জয়গান করে, পৌরুষের অহঙ্কারে ছিনিয়ে নিতে চায় সব কিছু। সন্দীপের রাজনৈতিক মত্ততা লেখকের মতে তার চরিত্রেরই নগ্ন লোভাতুরতার পরিণাম। উল্লেখ্য, সন্দীপের আদর্শ নায়ক রাবণ।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'গৃহদাহে'র সুরেশকে খল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সমাজ ও ধর্মকে সে পৃথক করে দেখেছে। কিন্তু অচলার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণে সে যা করেছে, তা প্রচলিত হিন্দু সমাজবহির্ভূত। অচলাকে ভুলিয়ে এনে সুরেশ যে খলযাত্রার পথ উন্মোচন করেছে, তা অচলার জীবনের ট্র্যাজেডিকে ত্বরান্বিত করে তোলে। মীর মশাররফ হোসেনের 'বিষাদ-সিন্ধু'র এজিদ রূপমোহে যে কাজগুলো করেছে, তা তাকে খলের মর্যাদা দিয়েছে। এজিদের উপায় ও কৌশলগুলো ছিল নীতি-আদর্শবহির্ভূত।
'কল্লোলে'র কথাসাহিত্যে রূপায়িত চরিত্রে স্খলনবৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। গল্প ও উপন্যাসে খল, শঠ, শঠতানিপুণ, শয়তান চরিত্রের দেখা মেলে একাধিক। সৃষ্ট চরিত্রের শঠতার সঙ্গে তাদের ক্রূরতা, ক্রূরাচার, ক্রূরমতিত্বের পরিচয়ও পাওয়া যায়। নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের রচনায় বেশ্যা-মাতাল-গেঁজেল-জুয়াড়ি-অপরাধীর মিছিল অনর্গল। যুবনাশের 'পটলডাঙ্গার পাঁচালী'তে কালনেমি গণেশ ডাকু নিজের স্ত্রীকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে রাজি হয়ে খলত্বের পরিচয় দিয়েছে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের 'আকস্মিক' উপন্যাসে ছলনায় পারঙ্গম কুঞ্জ। অন্যদিকে পঞ্জ নানা দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত।
জগদীশ গুপ্তের সাহিত্যে বসেছে খলের হাটবাজার। তাঁর কথাসাহিত্যে 'কোমরবাঁধা শয়তান' মানুষের ইতরতা, নীচতা, নোংরামি প্রকাশিত হয়েছে। মূলত তিনি মানুষের স্বভাবের দৈন্য, কদর্যতা, লালসা, অমানুষিক হীনতা, লোলুপতা ও অপকৌশলের চিত্র তুলে ধরতে খল চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। লঘু-গুরু, অসাধু সিদ্ধার্থ, গতিহারা জাহ্নবী, রোমন্থন, মহিষী, রতি ও বিরতি প্রভৃতি উপন্যাসে মানুষের মনুষ্যত্বহীনতা, খলতা ও খলাচার বর্ণিত হয়েছে। এসব মানুষের নৈতিক মর্যাদাবোধ নেই। সূক্ষ্ম সুখ-দুঃখ অনুভূতি অনুপস্থিত। এরা মেরুদণ্ডহীন।
'অসাধু সিদ্ধার্থে'র নটবর সিদ্ধার্থ নামে মৃত এক ব্যক্তির ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল অজয়া নামে একটি সুন্দরী তরুণীর হৃদয় হরণের জন্য। তাদের বিবাহের আগে নটবরের জাল সিদ্ধার্থ পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে। তার ছদ্মবেশের ব্যর্থতা প্রকৃতপক্ষে তার খলত্বের পরিণাম। 'গতিহারা জাহ্নবী'তে ভূস্বত্বভোগী নিষ্কর্মা স্থূল প্রবৃত্তিপরায়ণ গ্রাম্য যুবক অকিঞ্চন তার নববিবাহিতা স্ত্রী কিশোরীর দৃষ্টিতে কামার্ত বহুগামিতায় উৎসাহী যুবক। অকিঞ্চনের মাতা কাত্যায়নীকে কিশোরী মনে মনে বলেছে, 'জননী কতবার কত জলে স্নান করিলে তোমার পুত্র শুচি হইতে পারে?' তার প্রতি এ নারীর ঘৃণা ও অরুচি চরিত্রের খলন উন্মোচনে সহায়ক হয়েছে। স্বামীর পরনারীলোলুপতাকে ক্ষমা করতে পারেনি সে। 'রোমন্থনে' সম্মানিত ব্রাহ্মণ হয়েছেন কুচক্রী, মিথ্যা মামলার সাক্ষী। 'মহিষী'তে বখে যাওয়া অশোকের ইতরতা প্রকাশ পেয়েছে নিজ স্ত্রী সম্পর্কে কুৎসা রটনার মধ্য দিয়ে। কূটকৌশলী, অর্থগৃধ্নু মামলাবাজ ও সুদখোর মহাজন ব্রজকিশোরের পারিবারিক কাহিনী এটি। তার সমাজ কলুষ ও ইতরতায় পূর্ণ। দুলালের দোলায় কপটদের ভণ্ডামি ও ইতরতায় পূর্ণ পরিবেশ দেখা যায়। 'কলঙ্কিত সম্পর্ক' গল্পে সাতকড়ি নারী ধর্ষণের দায়ে জেল খেটে মুক্ত হয়ে পুনরায় স্ত্রীর সঙ্গে সংসার শুরু করে। 'আদিকলার একটি'তে সুবল কাঞ্চনের শিশুকন্যাকে বিবাহ করে তার মাতাকে সম্ভোগ করার অভিপ্রায় নিয়ে। তাকে ধর্ষণও করে সে। কাঞ্চন 'যেন স্পষ্ট দেখিতে পাইল, বহুদিনের সঞ্চিত ইচ্ছা খলতায় ছলনায় পরিপূর্ণ হইয়া শামুকের মতো ধীরে ধীরে বুকে হাঁটিয়া অগ্রসর হইয়া হঠাৎ খাড়া হইয়া উঠিয়াছে।...পাপিষ্ঠের এই লজ্জাহীন সহজ ধৃষ্টতায় তার ক্রোধের অন্ত রহিল না।' লেখকের রচনায় দেখা যায় নর-নারী সম্পর্কের ভেতর যৌন আনুগত্য নেই। বিবাহিত সম্পর্কের শুচিতা নেই। ছেলের জন্য নির্বাচিত পাত্রীর রূপে মুগ্ধ বাবা তাকে বিয়ে করে (পৃষ্ঠে শরলেখা) আবার স্ত্রী বর্তমানে দ্বিতীয় বিবাহ, সপত্নীর সমস্যার মধ্যে পুরুষের ইতরতাকে তুলে ধরেন লেখক। 'চন্দ্রসূর্য যতোদিন' গল্পে শ্বশুরের সম্পত্তির লোভে দীনতারণ প্রথম স্ত্রী ক্ষণপ্রভা থাকতেও শালিকা প্রফুল্লকে বিয়ে করে। জগদীশ গুপ্তের রচনায় পরনারী সম্ভোগে খল চরিত্রগুলোর মনের কোনো নৈতিক বা রুচিগত বাধা নেই। তাদের যৌনক্ষুধার কাছে সম্পর্কজনিত বাধাও বাধা নয়। হিংস্র পাশবিক নীচতায় ভরা জগতে মানুষের ঈর্ষা ও অর্থগৃধ্নুতা সহজাতধর্ম। সম্পত্তি ও টাকার জন্য কুকর্মই এদের দ্বারা সম্ভব। পয়সায় পাপ নেই বলে বন্ধুকেও এরা হত্যা করতে পারে।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'কুয়াশা' উপন্যাসের নায়ক প্রদ্যোত বসুর অতীত জীবন কলুষময় ও ইতরামোতে পূর্ণ। অতীতে সে ছিল জোচ্চোর ও শঠ। অনৈতিক জীবনযাপন নোংরামো ও অসুখে পরিপূর্ণ। 'উপনায়নে' একইভাবে তরুণ সন্ন্যাসী অমৃতানন্দের অতীত হচ্ছে দারিদ্র্য, অনৈতিক ও মনুষ্যত্বহীনতার জীবন। সে অতীতে ছিল বিনু। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও বস্তিবাসী বিনু বাবার অনাচারে জীবনের সুস্থতা থেকে বঞ্চিত হয়। জীবনানন্দ দাশের 'মাল্যবান' উপন্যাসের মাল্যবান-স্ত্রী উৎপলা দাগি অপ্রেমের নারী। হৃদয়হীন নির্মম ও ঘৃণ্য। মাল্যবান বলেছে, 'কতো যে সজারুর ধ্যাষ্টামো, কাকাতুয়ার নষ্টামি, ভোঁদরের কাতরতা, বেড়ালের ভেংচি, কেউটের ছোবল আর বাঘিনীর থাবা এই নারীটির।' স্ত্রীর খলপনার জন্য মর্মান্তিক বিরূপতার সম্পর্ক তাদের দাম্পত্যে।
তিরিশোত্তর বাংলা কথাসাহিত্যে মানিক, তারাশঙ্কর এবং অন্যদের রচনায় খলাঙ্কন গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে। 'কল্লোল' এবং তার পরবর্তী যুগের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা খল চরিত্র নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মানদীর মাঝি'র 'রহস্যময়' হোসেন মিয়া মাঝিদের নিস্তরঙ্গ জীবন বদলে দিয়েছে। গোপন ও দুর্জ্ঞেয় মতলব হাসিল করতে গিয়ে খলতার পরিচয় দিয়েছে সে। 'প্রাগৈতিহাসিক' গল্পে ক্রূরতা, নির্মমতা, নিষ্ঠুর নির্দয়তা, অকৃতজ্ঞতা, যৌনতা, প্রবৃত্তিতাড়না ও বেঁচে থাকার দুর্নিবার প্রয়াস প্রভৃতির সমন্বয়ে ডাকাত ও ভিখারি ভিখুকে অনন্য খলের নিদর্শন হিসেবে সৃষ্টি করেছেন মানিক। ডাকাতি করতে গিয়ে আহত হয়ে বন্ধু পেহ্লাদ বাগদির গৃহে আশ্রয় না পেয়ে তাকেই খুন করার হুমকি দেওয়া, আশ্রয়দাতা পেহ্লাদের স্ত্রীকে লাঞ্ছনার পর বন্ধু কর্তৃক প্রহৃত হয়ে তার গৃহেই অগি্নসংযোগ, ভিক্ষাবৃত্তি জীবনে পাঁচীকে পাওয়ার জন্য বসিরকে হত্যা প্রভৃতি ঘটনা তার চরিত্রে পাঁচীর প্রতি মমত্ববোধকে অতিক্রম করে যায়। সমাজের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবৃত্তিতাড়িত ভিখু বলিষ্ঠ বীভৎস আদিম মানবের জিঘাংসা, রিরংসা ও ভোগবাদিতায় শিল্পিত। লেখকের 'জীবনের জটিলতা' উপন্যাসে বিমল নিম্ন-মধ্যবিত্ত। দাম্পত্য জীবনে যৌনঈর্ষাকাতর। চক্রান্তপরায়ণ, নীরব পীড়নকারী। স্ত্রীকে স্নায়বিক অত্যাচার চালায়, আত্দহত্যায় প্ররোচিত করে। স্ত্রী তার কারণে আত্দহত্যা করলে স্ত্রীর প্রেমিকের বোনকে বিয়ে করতে চায় সে। নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য তার এ আকাঙ্ক্ষা। 'অহিংসা'র আশ্রম পরিচালক বিপিন ভণ্ড। আশ্রম হচ্ছে তার ধন উপার্জনের উপায় এবং আশ্রমের কপট সাধু সদানন্দ ধর্মের মুখোশ আবৃত এক যৌনবিকারগ্রস্ত মানুষ। 'দর্পণে'র মিল মালিক লোকনাথ ধূর্ত, ঠগ, ফন্দিবাজ ও কূটকৌশলী। নানা কৌশলে শ্রমিকদের শোষণ করে সে। নিকটাত্দীয়ের সঙ্গে প্রতারণা করে। পারিবারিক জীবন তার কলুষ, অনৈতিকতা ও বিকারে পূর্ণ। লাম্পট্য তাদের পরিবারের প্রধান ধর্ম। 'জীয়ন্তে' নারীলিপ্সু চরিত্রহীন জমিদার পুত্র খলামি করেছে। প্রজাদের হাতে লাঞ্ছিত হয়ে কাপুরুষ জমিদার পুত্র পালিয়ে গেছে কলকাতায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় 'আরণ্যকে' দেবী সিং, ছটু সিং, রাসবিহারী সিং, নন্দলাল ওঝার মতো স্বার্থপর ও প্রতিপত্তিশালী অত্যাচারী মহাজন চরিত্র অঙ্কন করেছেন। যারা জমি বিলি থেকে মুনাফা করতে চায়।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণদেবতা-পঞ্চগ্রাম, নীলকণ্ঠ, প্রেম ও প্রয়োজন, কালিন্দী প্রভৃতি উপন্যাসে খলদের সমাবেশ লক্ষণীয়। 'গণদেবতা-পঞ্চগ্রাম' উপন্যাসের খল শিরোমণি শ্রীহরিপাল। সে 'ইতর, লম্পট, প্রভুত্বগর্বোদ্ধত'। এ উপন্যাসে সমাজপতিদের ক্রূর অভিসন্ধিপরায়ণতা, ষড়যন্ত্র, কুটিলতায় অপর ব্যক্তিজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। নীলকণ্ঠে মহাজন চরিত্রটি ক্রূর, অভিসন্ধিপরায়ণ, অসৎ প্রতারক, লোভী। প্রেম ও প্রয়োজনে জমিদার লোভী, দাম্ভিক, ক্রূরতা ও বহুনারীসম্ভোগে পঙ্কিল। কালিন্দীর নব্যবণিক বিমলবাবু কূটকৌশলী, শঠতা ও অর্থের জোরে চরের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
বনফুলের 'বৈতরণী তীরে' উপন্যাসে ধনী বন্ধু দরিদ্র স্বামীর রূপসী স্ত্রীকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে স্বামী ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যদিকে দাগি বিবাহিত নারী স্বামীকে ভালোবাসতে পারে না স্বামীর ভালোমানুষী স্বভাবের জন্য। সে ভালোবাসতে চায় শক্তিমান নিষ্ঠুর পুরুষকে। নিষ্ঠুরতা ও শক্তিকেই সে গণ্য করে পৌরুষরূপে। অন্নদাশঙ্কর রায়ের 'সত্যাসত্যে'র দে সরকার সন্দীপের মতোই নর-নারী সম্পর্ক বিষয়ে নায়িকা উজ্জয়িনীকে আন্দোলিত করতে চেয়েছে। বাদল তার বন্ধু হলেও তাকে শত্রু ভেবেছে। কমলকুমার মজুমদারের অন্তর্জলীযাত্রী মুমূর্ষু সীতারাম চট্টোপাধ্যায় যশোবতীর চরিত্রে সন্দেহ করে বলেছে, 'হারামজাদী নষ্ট খল খচ্চর মাগী।' এখানে 'খল' শব্দটির প্রয়োগ লক্ষণীয়। সমরেশ বসুর উপন্যাসে বিদ্বেষপরায়ণ, হিংস্র, নির্বেদজর্জর, বিচ্ছিন্ন ও আত্দগ্লানিময় চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। 'স্বীকারোক্তি'র অনামা নায়কের হননের ইচ্ছা মানুষ সম্বন্ধে অবিশ্বাস, ঘৃণা বিবমিষা জন্ম দিয়েছিল। 'প্রজাপতি'তে সুখচাঁদ বা সুখেন গুণ্ডা মূল চরিত্র। 'পাতকে'র অনামা নায়ক মূল্যবোধের বিপর্যয়ে নিজের মাকে খুন করে। 'বিশ্বাস' উপন্যাসে লিপির মা ছুঁড়ি সেজে থাকে। কারণ অন্য লোকের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক। লিপির অবৈধ গর্ভ সঞ্চার ও গর্ভপাত এবং নীরেনকে ধোঁকা দিয়ে অন্যের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া খলাচার। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী'তে আছে খল জমিদার কুমার বিশ্বনাথ। ক্রোধ, প্রতিহিংসা, উগ্রতা, অমিতাচারী ও সম্ভোগমত্ত বেহিসেবী সে। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের 'দ্বীপপুঞ্জে'র ধনী নবদ্বীপ সার পুত্র মুরলী সুদর্শন, নিষ্কর্মা এবং লম্পট। কৌশল কিংবা বলপ্রয়োগে নারীদেহ সম্ভোগই তার কাজ। গোপাল হালদারের 'ভাঙন' উপন্যাসে নৃপেন্দ্র অকর্মণ্য, আয়েশি, স্বার্থপর, সংকীর্ণ ও দুশ্চরিত্র। স্ত্রীর বর্তমানে একটি খ্রিস্টান ধাত্রী মেয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলে সে। নীতিহীনতাই তার আদর্শ।
বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে যে খলমতি ও খলময় চরিত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার বাস্তব প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আলোকপাত পাওয়া যায় বোধিসত্ত্ব মৈত্রেয়র 'মান্ধাতার মুখ' উপন্যাসে। উপন্যাসের একটি চরিত্র ঋদ্ধিনাথ শর্মা বলেছে : 'ক্যারেক্টার বলতে তো স্রেফ ভণ্ডামি, চালাকি আর ভাঁওতাবাজি। সে কাজে যার যতো বেশি নাম সে ততো বড়ো ভণ্ড-ধূর্ত-ভাঁওতাবাজ। ইংরেজ শাসন আর ইংরেজি শিক্ষা এ দেশের মান্ধাতাকে প্যান্ট-সুট-বুট পরিয়ে আরও চালাক, আরও ভণ্ড, আরও বেশি ভাঁওতাবাজ করে ছেড়েছে। দেশের ছোটবড় সবার এখানকার ভাবনা কি করে ধরে মেরে শুষে খাব ও কি করে মান্ধাতার মতো রাজতি্ব করব।' বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে এ ধরনের বাস্তবতা লক্ষ করা যায়। তাঁর উপন্যাসে নগরজীবনের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনের রূপে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের বহুচারিতা, ছেনালিপনা, প্রগলভতা চিত্রিত হয়েছে। 'অসূর্যস্পৃশ্যা'র দাগি নারী ভানুমতী সেন। অর্থের জন্য অপরিসীম অতৃপ্তিগ্রস্ত, জমাট জমকালো জীবনলোলুপ। যেকোনোভাবে অর্থলাভ করা, ইচ্ছেমতো খরচ করা, শরীরকে সুখ দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী সে। ব্যারিস্টার স্বামী পেশাগত জীবনে ব্যর্থ হলে তার সানি্নধ্য সে অসহ্য মনে করে। লেখকের অন্যান্য উপন্যাসেও অর্থগৃধ্নুতা, বিলাস, বিকার ও ছেনালিপনা দেখা যায়। 'পরিক্রমা'য় বিজন ঘোষ অমার্জিত ও দুশ্চরিত্র। একঘেয়ে তাদের দাম্পত্য জীবন। সংকীর্ণ, পরশ্রীকাতর, কুৎসাপ্রবণ ও স্থূল তার মানসিকতা। ধনের প্রদর্শন, পরনিন্দা, পরছিদ্রান্ব্বেষণ এই জীবনের আনন্দ, ইতরতা ও নোংরামিতে পূর্ণ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সেই সময়' উপন্যাসে রাইমোহন ধনী বাবুদের মোসাহেব। গান বাঁধতে জানে, সুরও দেয়; সংস্কৃতিমনা। সে বাইজি হীরা বুলবুলকে ভালোবাসে। জমিদার শ্রেণী প্রজা-পীড়ন করত তার নিদর্শন ত্রিলোচন দাসের নিপীড়ন। কলহ, ঈর্ষা, লোভ, লালসা, চতুরতা, প্রতারণা আর ব্যভিচার মিছিল করেছে এ উপন্যাসের মধ্যে। শংকর ওরফে মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের সীমাবদ্ধ (চলচ্চিত্র সত্যজিৎ রায়) উপন্যাসে শ্যামলেন্দু উচ্চাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে খলামিতে লিপ্ত হয়। ইংরেজির অধ্যাপক থেকে কম্পানির ডিরেক্টর পদে আসীন হয়েছে নীতি বিসর্জন দিয়ে দিয়ে। দেবেশ রায়ের 'সময় অসময়ের বৃত্তান্তে' পুলিশ খলের ভূমিকায় অবতীর্ণ। পুলিশ নারী ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হয়। আবুল বাশারের 'ফুলবউ' উপন্যাসে মিল্লাতের বাবার বিধবা চতুর্থ স্ত্রী রাজিয়াকে ধর্ষণ করে মিল্লাতের বন্ধু মবিন।
বাংলাদেশের উপন্যাসে বিখ্যাত সব খল চরিত্র সাহিত্যের খলযাত্রায় শামিল হয়েছে। লাল সালুর মজিদ, চাঁদের অমাবস্যার কাদের, শহীদুল্লা কায়সারের সংশপ্তকের রমজান ও সারেং বৌয়ের লুন্দর শেখ, সূর্যদীঘল বাড়ীর গদু প্রধান, সালাম সালেহ উদ্দীনের নগরবালার আশরাফ উল্লেখযোগ্য। শওকত ওসমান, সৈয়দ শামসুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, শওকত আলী, সেলিনা হোসেন প্রমুখের রচনায় একাধিক খল চরিত্র বাংলা সাহিত্যের সরণি প্রদিক্ষণ করেছে। খলের রাজত্ব দেখা যাবে মুক্তিযুদ্ধের একাধিক উপন্যাসে। উপন্যাসে রাজাকার চরিত্র রূপায়ণে লেখকরা তাদের খল সম্রাট করে চিত্রিত করেছেন।
মূলত সাহিত্যে খল চরিত্রের স্বরূপ ও ক্রিয়া বর্ণনা করেছেন অনেক লেখক। প্রাচীন-মধ্যযুগের সাহিত্যের খল আধুনিক সাহিত্যে ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। তবে বাংলা সাহিত্যের খলের ক্ষেত্রে দেখা যায় তরুণ, বৃদ্ধ ও মধ্যবয়সী প্রত্যেকেই ধুরন্ধর, অসৎ, নিষ্ঠুর, দুশ্চরিত্র, মেরুদণ্ডহীন। দুর্বল ও অভিসন্ধিপরায়ণ তারা। উচ্চবর্গ-নিম্নবর্গ নির্বিশেষ তাদের খলযাত্রা একই গন্তব্যে ধাবমান।

ফেইসবুক অ্যালবামের ছবি ডাউনলোড

0 comments
অনেকেই ফেইসবুক থেকে বন্ধুদের ছবি কম্পিউটারে ডাউনলোড করে থাকেন। একটি একটি করে ছবি ডাউনলোড করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। ফেইসবুক বন্ধুদের সব ছবি একবারেই ডাউনলোড করা সম্ভব। এ জন্য মজিলা ফায়ারফক্স ইন্টারনেট ব্রাউজারে https://addons.mozilla.org/en-US/firefox/addon/8442/eula/93852 ঠিকানা থেকে একটি অ্যাডঅনস ইনস্টল করে নিন। এবার ফেইসবুক বন্ধুর অ্যালবামের নামের ওপর মাউসের রাইট বাটন ক্লিক করে Download Album With Facepad নির্বাচন করুন।

Wednesday, July 14, 2010

How to Change or Upload a Photo in Facebook

0 comments
First go your Profile. Then move the mouse on the profile Picture.
Then You will see some option like_
Upload a Picture, Choose From Album, Take a Picture. As a primary user you need to click Upload a Picture option.
Then Lodding the following picture
Click on Browse for upload form your hard drive. Whare your pic is saved.
After uploading the profile pic will be shown.

এটিএন বাংলা

0 comments
১৯৯৭ সালের ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠা পায় দেশের প্রথম বেসরকারী স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলা। আজ চ্যানেলটি চৌদ্দ বছরে পদার্পণ করবে। ১৯৯৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে তিন ঘন্টাব্যপী সাপ্তাহিক ইসলামী অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়। ১৯৯৯ সালের মে মাসে এটিএন বাংলা এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরিত হয়। ইউরোপ সম্প্রচারের লক্ষ্য নিয়ে এটিএন বাংলা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একাধিকবার আয়োজন করলো বিভিন্ন সাং¯ড়ৃতিক অনুষ্ঠানমালা। ১৬ আগষ্ট ২০০১ সংবাদ প্রচার, আর ২০০২ এর ১ অক্টোবর শুরু হলো ইংরেজী সংবাদ প্রচার। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের উপর বিশেষ বুলেটিন দিয়ে শুরু হয় প্রতি ঘন্টার সংবাদ। ২০০৪ সালের ২২ নভেম্বর ছোট পর্দার অস্কার খ্যাত এমি এ্যাওয়ার্ড অর্জন করে এটিএন বাংলা ‘আমরাও পারি’ অনুষ্ঠানের জন্য। ২০০৫ সালে এটিএন বাংলা ইউরোপে নিজস্ব ষ্টুডিও স্থাপন করে স্কাই টিভির ৮৪২ চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করে। ২০০৬ সালে এশিয়া অঞ্চল থেকে আঞ্চলিক এ্যামি এ্যাওয়ার্ড লাভ করে এটিএন বাংলা। ২০০৭ এ চতুর্থবাারের মত এটিএন বাংলা এ্যমি’র জন্য মনোনয়ন পায়। এভাবেই নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এটিএন বাংলা আজকের অবস্থানে পৌছেছে।

Tuesday, July 13, 2010

যেভাবে ইসরাইল এর জন্ম

44 comments
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হিজাজের নেতা শরীফ হুসাইন বৃটেন এবং ফরাসীদের অনুরোধে তুর্কীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পরিচালনা করে।
সে যুদ্ধে মুসলমান শাসকদের অদূরদর্শীতা এবং বৃটিশদের ষড়যন্ত্রের কারণে তুরষ্ক খিলাফত ভেঙ্গে যায়। বৃটিশ বাহিনী ১৯১৭ সালে ইরাক, সিনাই উপত্যকা, ফিলিস্তিন, পবিত্র জেরুজালেম দখল করে নেয়। সেদিন ফিলিস্তিনীরা ব্রিটিশ জেনারেল এলেনবিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় জেরুজালেমে। আর জেরুজালেম বিজেতা হযরত সুলতান সালাউদ্দীন আইয়ুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি মাযার শরীফ-এ বেয়াদবগুলো পদাঘাত করে বলে উনার নাম মোবাকার উচ্চারণ করে বল আমরা এসে পরেছি, আমরা সিরিয়া জয় করেছি, উঠে দেখ। প্রায় সোয়া দুইশ বছর আগে জেরুজালেম হারানোর যে জ্বালা তার প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করে মহান গাজীর মাযার শরীফ-এ পদাঘাত করে। হায় মুসলিম জাতি। শুধু খেয়ালী শাসকদের ভুলের কারণে , ক্ষমতা লোভের কারণে ঘটে এই পরিণতি। (এটি প্রথম ভুল শাসকদের সিদ্ধান্তের) তুরুষ্ক খেলাফত ভেঙ্গেফেলার জন্য বৃটিশ দের সহযোগিতা করা ছিল আরব নেতাদের একটি বড় ভূল।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা টি ই লরেন্স হিজাজের নেতা শরীফ হুসেইনকে উস্কে দেয় তুরস্কের বিরুদ্ধে।
 তুরস্ক সাম্রাজ্য ভেঙে যাবার থেকে ব্রিটিশ ম্যানডেট অনুযায়ী শাসিত হতে থাকে ফিলিস্তিন। এবং সে সময় ১৯১৭ সালে তদানীন্তন ব্রিটেনের পররাষ্ট্র সচীব বেলফোর প্রথম ফিলিস্তিনে ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেয়।
ইউরোপ ইহুদীদের সঙ্গে অমানবিক ব্যবহার করতো এই সেদিন পর্যন্ত।
কিন্তু ব্রিটিশরা চায়নি ইহুদীদের ইউরোপে জায়গা দিয়ে জঞ্জাল সৃষ্টি করতে। পৃথিবীর কোন দেশ তাদের ভূখন্ড দিতে রাজী হয়নি। পরবর্তীতে মুসলমানদের ঠেকাতে তারা ইহুদীদের ব্যবহারের নীতি অবলম্বন করে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষত ফিলিস্তিনে ইহুদীদের আবাস ভুমি দেবার পেছনে বৃটিশ এবং আমেরিকাদের যে সকল যুক্তি ছিল।
১। সর্বদাই ইহুদীরা মিথ্যুক, নিষ্ঠুর, ফিৎনাবাজ এবং ষড়যন্ত্রকারী।
২। মুসলমানদের উত্থান ঠেকানোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
৩। ইসরাইলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য প্রাচ্যের তেল সম্পদ কব্জা করা/নিয়ন্ত্রণে রাখা।

তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উইলসন চেয়েছিলো জনমতের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর রাষ্ট্রগঠণ করতে। কিন্তু ব্রিটিশরা তার বিরোধীতা করে।
পরবর্তীতে উইলসন শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের দ্বারাই একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে সেই এলাকায় পাঠায়। যাকে কিংক্রেন কমিশন বলে। তারা অনেকগুলো পরামর্শের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেয় যে প্যালেষ্টাইনসহ সিরিয়া থাকবে এবং তাদের আলাদা করা যাবে না। (সেহেতু সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন একত্রিত ছিল)
সেই তদন্ত কমিশনের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে- ইহুদীদের প্রতি সহানুভুতি নিয়ে কাজ করলেও, প্যালেস্টাইনের অবস্থা দেখে তদন্তকারি দল বুঝতে পেরেছিলো বিভিন্ন উপায়ে জমি কেনার মাধ্যমে তারা আরবদের সম্পূর্ণরুপে ভুমিহীন করতে চায়। তারা জোর দিয়ে বলে যে, ইহুদীদের পরিকল্পনাকে সংকুচিত করতে হবে। প্যালেস্টাইনে বহিরাগত ইহুদীদের বসতি সীমিত রাখতে হবে এবং প্যালেস্টাইনে ইহুদী রাষ্ট্র গঠন করার পরিকল্পনা ত্যাগ করতে হবে।
কিন্তু ইহুদীদের ষড়যন্ত্রে ফ্রান্স এবং ব্রিটেন কিংক্রেন কমিশনের রিপোর্টকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের পছন্দমত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় ফলে তখন থেকে মধ্যপ্রাচ্য অসন্তোষের বারুদাগারে পরিণত হয়। যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ইহুদী রাষ্টগঠনের বিপক্ষে ছিল পরবর্তীতে ইহুদীদের অর্থ, আর ষড়যন্ত্রের কারণে সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগীতাতেই ইসরাইলের জন্ম হয়।
১৯৪৬ সালে ব্রিটেনকে চাপ দেয়া হয় এক লাখ ইহুদীকে প্যালেস্টাইনে প্রেরণ করতে। ১৯৪৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ছোট রাষ্ট্রগুলোকে চাপ সৃষ্টি করে জাতিসংঘে ইহুদী রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিতে।
সে সময় যুক্তরাষ্ট্র নিজের দেশের শরণার্থীদের জন্য বিল পাশ করছিলোনা অথচ প্যালেস্টাইনে ১২ লাখ আরবের মধ্যে আড়াই লাখ ইহুদীদের স্থান দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ৪৭৬৭ জন ইহুদীকে গ্রহণ করে।

উইন্ডোজ ৭ এর ৬৪ বিট ভার্সন ব্যবহারের সুবিধাগুলো কি কি ?

0 comments
লিখেছেন : এমদাদ খান        ১৩ জুলাই (মঙ্গলবার), ২০১০ ১:৪৮ অপরাহ্ন

আমরা কম বেশি সবাই উইন্ডোজ এর ৩২ বিটের অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে থাকি।তাছাড়া আমরা যখন কোন নতুন কম্পিউটার কিনতে যায় তখন বিক্রেতা আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করে আমরা কত GHz এর প্রোসেসোর নিব কিন্তু দোকানাদার কখনও জিজ্ঞাসা করে না কত বিটের প্রোসেসর নিবেন। এবং তারা এই সুযোগে আমাদেরকে ৩২ বিটের প্রোসেসর দিয়ে থাকেন। আমরা যারা উইন্ডোজ ৭ এর ৬৪ বিটের অপারেটিং ব্যবহার করি তারা হয়ত সবাই জানি যে, উইন্ডোজ ৩২ বিটের অপারেটিং সিস্টেমগুলো এক ধরনের সেবা দিয়ে থাকে এবং ৬৪ বিটের অপারেটিং সিস্টেমগুলো অন্য ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। আজ আমি আপনাদেরকে উইন্ডোজ ৭ এর ৬৪ বিটের অপারেটিং সিস্টেমের নানা সুবিধাগুলো তুলে ধরব।

advantages of using windows 7 of windows 64 bit editions

১। Windows ৭-এ এর Performance কে উন্নতি সাধন

উইন্ডোজ ৭ এ ৬৪ বিটের অপারেটিং সিস্টেমগুলোতে সবচেয়ে যে লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হল তা হচ্ছে এর কাজ করার পদ্ধতি। এই ৬৪ বিটের কম্পিউটারে আপনি একসাথে অনেকগুলো প্রোগ্রাম একসাথে চালনা করতে পারবেন যা কিনা অন্যান্য বিটের অপারেটিং সিস্টেম এর তুলানায় অনেক লক্ষ্যনীয়।

২। Windows ৭ এর Memory কে বৃদ্ধি করা হয়েছে

যে সকল অপারেটিং সিস্টেমগুলোতে অনেকগুলো প্রোগ্রাম এবং বড় কোন প্রোগ্রাম চালনা করতে হয় সেগুলোতে অনেক মেমোরির প্রয়োজন হয়। আর যদি আপনার পর্যাপ্ত মেমোরি না থকে তাহলে আপনার প্রোগ্রামগুলো ঠিকমত কাজ করে না (মানে আটকে থাকে)। তাছাড়া উইন্ডোজ ৭ এর ৩২ বিটের কম্পিউটারে আপনি ৪ GB RAM এর বেশি ব্যবহার করতে পারবেন না। কিন্তু মাইক্রোসফট উইন্ডোজ ৭ এর ৬৪ বিটের অপারেটিং সিস্টেমে এই সীমাবদ্ধতা তুলে নিয়েছে।

নিচে উইন্ডোজ ৭ এর ৬৪ বিটের অপারেটিং সিস্টেমের বিভিন্ন ভার্সনের এবং তাদের মেমোরি সম্পর্কে লেখা হলঃ

Windows 7 Edition Memory

Home Basic / Home Basic N 8 GB Ram

Home premium 16 GB Ram

Professional / professional N 128 GB or more Ram

Enterprise / Ultimate 128 GB or more Ram

৩। Windows ৭ এর Device support কে উন্নতি সাধন

যদিও ৬৪ বিটের প্রোসেসর কম ছিল আগের সময়, এবং অতীতে এই প্রোসেসর এর জন্য 3rd party Driver পাওয়া খুবই কষ্টকর ছিল ।কিন্তু যখন উইন্ডোজ ভিস্তা এর ৬৪ বিটের অপারেটিং সিস্টেম প্রথম বাজারে ছাড়া হয় তখন মাইক্রোসফট এই ৬৪ বিটের অপারেটিং সিস্টেমের জন্য যাতে সহজে Driver পাওয়া যায় তার জন্য ব্যবস্থা করেছে। আর উইন্ডোজ ভিস্তাতে যে পদ্ধতিটা অনূসরণ করা হয়েছে, উইন্ডোজ ৭-এ একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। যার কারণে উইন্ডোজ ভিস্তাতে যে প্রোগ্রামগুলো কাজ করে তা উইন্ডোজ ৭-এ কাজ করে।

৪। Security কে অনেক জোরালো করা হয়েছে উইন্ডোজ ৭-এ ৬৪ বিটের অপারেটিং সিস্টেমগুলোতে

Intel এবং AMD এর ৬৪ বিটের প্রোসেসর-এর যে গঠন পদ্ধতি এবং বৈশিষ্ট্য রয়েছে তাতে নিরাপত্তার বিষয়টি অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে। আর তাহল

* Kernel Patch Protection : এইটি আপনার অপারেটিং সিস্টেমের KERNEL কে সুরক্ষিত রাখে

* Mendatatory Kernel-mode driver singing : স্বাক্ষরিত Driver এটা কোন সফটওয়্যারের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকে। আর উইন্ডোজ ৭ এর ৬৪ বিটের কম্পিউটারে অবশ্যই Kernel-mode এর Driver এর Digital signed থাকতে হয় ব্যবহার করার জন্য।

* Data Exceution Preventation : এইখানে সফটওয়্যার এর ব্যাতিত হার্ডওয়্যার কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যার ফলে আপনার কম্পিউটারে থাকা ক্ষতিকর সফটগুলো অপারেটিং সিস্টেমের System Failure করতে পারে না

৫। Windows 7 এর 64 বিটের ভার্সনের সীমাবদ্ধতা

উইন্ডোজ ৭ এ একটি সীমাবদ্ধতা হলে এটি ১৬ বিটের Windows on Windows (WOW) environment কে সাপোর্ট করে না।

আরো বিস্তারিত দেখুন Advantages of using 64bit editions of windows 7 এইখানে