Friday, July 23, 2010

সমস্যা যখন চুল পড়া

0 comments
একটা বয়সের পর পুরুষদের কমন দুশ্চিন্তা টাক হয়ে যাবে না তো? মেয়েরাও চুল নিয়ে কম ভোগে না। চুল পড়া রোধ, চুল ঘন ও সুন্দর করতে কত কিছু যে করে মানুষ! চুল পড়ার সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বিশেষজ্ঞ, কসমেটিক সার্জারি সেন্টারের কনসালট্যান্ট ডা. ফেরদৌস কাদের মিনু-এর পরামর্শ তুলে ধরেছেন ডা. সাবরিনা শারমিন
সেই প্রাচীনকাল থেকেই চুল পড়া, চুল উঠে যাওয়া বা চুল পাতলা হয়ে যাওয়া খুব কমন সমস্যা। আমেরিকার একাডেমী অব ডার্মাটোলজির রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৫-১৬ শতাংশই চুল ঝরে যাওয়া সমস্যায় ভুগছেন। শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও এর শিকার। চুল পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা আবার ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বেশি।
মানুষের চুল প্রতি মাসে আধ ইঞ্চি করে বড় হয়। স্বাভাবিকভাবে একটি চুল দুই থেকে চার বছর পর্যন্ত বড় হতে থাকে। এর পর বৃদ্ধি থেমে যায় ও কয়েক দিনের মধ্যে আপনা-আপনি পড়ে যায়। যদি কোনো কারণে বেশি পরিমাণে চুল বর্ধনশীল অবস্থা থেকে স্থিতিশীল অবস্থায় (পরিণত অবস্থায়) চলে আসে তবে চুল পড়ার পরিমাণ চুল তৈরি হওয়ার চেয়ে বেশি হবে। জানা যাক, কী কী কারণে চুল পড়ে।

অ্যান্ড্রোহেনের কারণে চুল পড়া
অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোন, যেমন টেস্টোস্টেরন, অ্যান্ড্রোস্ট্রেনডিয়ন, ডিএইচটি হরমোনগুলো সাধারণত পুরুষের বেশি ও মহিলাদের কম পরিমাণে থাকে। এ হরমোনগুলো হেয়ার ফলিকলের ওপর কাজ করে ও চুল পড়া ত্বরান্বিত করে। সে কারণে পুরুষের চুল বেশি পড়ে। তবে সবারই যে পড়বে তা নয়, যাদের এসব হরমোনের প্রভাব বেশি তাদের বেশি করে চুল পড়ে। পুরুষের চুল পড়া বা টাক পড়া সাধারণত ২০ বছর থেকেই শুরু হতে পারে। এটিকে বলে মেল প্যাটার্ন অব হেয়ার লস বা পুরুষালী টাক। অর্থাৎ কপাল থেকে শুরু করে পেছন দিকে চুল উঠতে থাকে।
মহিলাদের মেনোপজের সময় ও পরে অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোনগুলো আনুপাতিক হারে বেড়ে যায়, তখন চুল বেশি করে পড়তে শুরু করে। তবে এ ক্ষেত্রে ফিমেল প্যাটার্ন অব হেয়ার লস হয়ে থাকে। শুধু কপালের দিক থেকে নয়, চুল পড়া শুরু হয় পুরো মাথা থেকেই। ধীরে ধীরে চুলের ঘনত্ব কমে যায়। অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোনই মেয়েদের চুল পড়া ও ছেলেদের টাকের সবচেয়ে বড় কারণ।

স্ট্রেস বা মানসিক চাপ
দুশ্চিন্তায় ভুগলে বা মানসিক সমস্যা থাকলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি করে চুল পড়তে পারে। তবে এ চুল পড়া সাময়িক এবং পুনরায় চুল গজায়। তবে দীর্ঘদিন মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকলে বা দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে অনেক বেশি চুল পড়ে যেতে পারে।

হরমোনাল পরিবর্তন
হরমোনের কমবেশি হওয়ার কারণে চুল উঠে যেতে পারে। যেমন থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কম বা বেশি হলে, গর্ভবতী অবস্থায় এবং বাচ্চার জন্মের পর হরমোনাল ভারসাম্য পরিবর্তিত হয় বলে তখন চুল বেশি পড়ে। হরমোনের এ পরিবর্তন আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে পুনরায় চুল গজায়। তবে তা আগের অবস্থায় যেতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কেমোথেরাপির পর
ক্যান্সার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি দেওয়ার পর চুল উঠে যায়। এর কারণ কেমোথেরাপিউটিক ড্রাগসগুলো বর্ধনশীল কোষের ওপর কাজ করে। কেমোথেরাপির প্রথম ডোজ দেওয়ার দুই-তিন সপ্তাহ পর চুল পড়া শুরু হয় এবং কেমোর সর্বশেষ ডোজের তিন-চার মাস পর পুনরায় চুল গজানো শুরু হয়।

ট্রাকশন অ্যালোপেসিয়া
চুলের বিশেষ কোনো স্টাইলের জন্য যদি দীর্ঘদিন খুব টেনে চুল বাঁধা বা টাইট করে খোঁপা বা ব্যান্ড করা হয় তবে এ ধরনের চুল পড়া শুরু হয়। দীর্ঘদিন এক রকম চুল বাঁধার কারণে চুল পড়া পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। ফলে টেনে বাঁধার কারণে এ চুল পড়া স্থায়ীভাবে হেয়ার লসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

হেয়ার প্রোডাক্টের জন্য
খুব বেশি পরিমাণ কালারিং এজেন্ট, বি্লচিংসামগ্রী, চুল সোজা করা বা ক্রমাগত রিবল্ডিং করানো ও ঘন ঘন চুল পার্ম করার সামগ্রী ব্যবহার করলে চুল পড়ার হার বেড়ে যায়। বিশেষ করে প্রোডাক্টগুলো যদি উন্নতমানের না হয় সে ক্ষেত্রে চুল বেশি করে পড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই আবার চুল ওঠে; কিন্তু অনেক সময় হেয়ার ফলিকলের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেলে চুল আবার নাও গজাতে পারে।

টিনিয়া ক্যাপাইটিস
এটি এক ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশন, যা স্কাল বা মাথার খুলিতে হয়ে থাকে। এ ফাঙ্গাল ইনফেকশনের জন্য ওই অংশের চুল পড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে নাইজোরাল শ্যাম্পু (কিটোকোনাজল) চুলে ব্যবহার করতে হয়। কখনো কখনো দিনে একটি করে এন্টিফাঙ্গাস ওষুধ আট থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত খেতে হতে পারে। ইনফেকশন ভালো হয়ে গেলে চুল আবার গজায়।

অপারেশনের পর
শরীরে বড় কোনো সার্জারি বা অপারেশনের পর অনেক ক্ষেত্রেই চুল পড়ে যায়। এটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অপারেশনের কারণে শারীরিক পরিবর্তন অথবা মানসিক উদ্বেগের জন্য
হতে পারে। সুস্থ হওয়ার পর চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে চুল আগের অবস্থায়
ফিরে যায়।
অসুখের কারণে চুল পড়া
কিছু অসুখে, যেমন অ্যানিমিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, ম্যালেরিয়া, ডায়াবেটিস ইত্যাদিতে চুল পড়ে যেতে পারে। অনেক সময় অসুখ ভালো হওয়ার পরও চুল আর আগের অবস্থায় ফিরে যায় না।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কোনো কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় চুল পড়তে পারে; যেমন জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি, প্রেশারের ওষুধ, রক্ত তরলীকরণের ওষুধ, হরমোন, অ্যান্টিসাইকোটিক বা মানসিক অসুস্থতার ওষুধ ইত্যাদি।

রেডিওথেরাপি
ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি দেওয়ার পর চুল পড়ে এবং তা আর গজায় না।

খাদ্যাভ্যাস
শারীরিক নিউট্রিশনাল স্ট্যাটাসের ওপর চুলের স্বাস্থ্য নির্ভর করে। দৈনিক খাদ্য তালিকায় প্রোটিন, কার্বহাইড্রেট, ফ্যাট, মিনারেলস ও ভিটামিন পরিমিত পরিমাণে না থাকলে চুল পড়ে যায়। এছাড়া দীর্ঘদিন শরীরে কোনো একটি উপাদানের অভাবে চুল পড়ে যায়।

চুল পড়ার ধরন
অ্যালোপেসিয়া অ্যারিয়াটা
এ ক্ষেত্রে মাথার কোনো একটি স্থানের চুল একেবারে উঠে যায় এবং ওই স্থানে টাক হয়ে যায়। এটি অটোইমুইন ডিজিজ এবং এর কারণ এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনেরই বংশে এ ধরনের চুল পড়ার ঘটনা থাকে। কিছু অসুখেও এটি হতে পারে। যেমন অ্যাজমা, একজিমা, থাইরয়েড ডিজিজ, ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লুপাস ইরাইথ্রোম্যাটোসাস, ভিটিলিগো, এডিসনস ডিজিজ ও পরিনিশাস অ্যানিমিয়া।
এ ক্ষেত্রে কোনো ট্রিটমেন্টের প্রয়োজন হয় না, পুনরায় চুল গজানো শুরু হয় অন্তত ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই।
অ্যালোপেসিয়া টোটালিস
এ ক্ষেত্রে পুরো মাথার চুলই পাতলা হয়ে যায় বলে এটি অ্যালোপেসিয়া টোটালিস নামে পরিচিত। পুষ্টির অভাব, কেমোথেরাপি অপারেশন বা কোনো অসুখের পর এ ধরনের চুল পড়ে থাকে।
এছাড়া অ্যালোপেসিয়া ইউনিভার্সালিসে পুরো শরীরের চুল উঠে যায় ও অ্যান্ড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়ায় টাক পড়ে।

চুল সম্পর্কে ভুল ধারণা
চুল সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন_
* প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে চুল পড়ে যায়। আসলে শ্যাম্পু করলে মাথার চামড়া পরিষ্কার থাকে। তবে সব শ্যাম্পু প্রতিদিন ব্যবহার করা যায় না। প্রতিদিন ব্যবহারের কিছু শ্যাম্পু আছে, যা ব্যবহার করলে কখনোই চুল পড়ে না।
* দিনে ১০০ বার চুল আঁচড়ালে চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে বলে অনেকেই বলেন। চুল বেশি আঁচড়ালে টান লেগে বরং চুল পড়ার হার বেড়ে যায়। দিনে পাঁচ-ছয়বার আঁচড়ানোই যথেষ্ট।
* চুল বারবার কামালে ঘন চুল ওঠে বলে ছোটবেলায় আমরা অনেকেই মাথা ন্যাড়া করেছি। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বেশি বার কামালে হেয়ার ফলিকল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এতে বরং চুল কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
* তেল দিলে চুল ঘন হয় বলে মনে করেন বেশির ভাগ মানুষ। বাস্তবে চুল ঘন হওয়ার সঙ্গে তেলের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে চুল তেল দিয়ে মসৃণ রাখলে জট লেগে চুল ছেঁড়ার আশঙ্কা কম থাকে।
* গরম তেল মালিশ করলে চুল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল থাকে বলেও কারো কারো ধারণা। কিন্তু গরম তেল হেয়ার ফলিকলে ক্ষতি করতে পারে। অবশ্য সাধারণ তাপমাত্রার তেল দিয়ে মাসাজ করলে চুলের গোড়ার রক্তসঞ্চালন খানিকটা বাড়ে।
* চুল টাইট করে বেণী করে ঘুমালে চুলের বৃদ্ধি বেশি হয় বলে মেয়েরা মনে করে। কিন্তু বেশি টাইট করে না বাঁধাই ভালো। এতে চুল উঠে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

কিভাবে বুঝবেন চুল পড়ছে
দৈনিক ১০০টা পর্যন্ত চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু এর চেয়ে বেশি পড়লে তা অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। বালিশ, তোয়ালে বা চিরুনিতে লেগে থাকা চুল গুনতে চেষ্টা করুন। অন্তত পরপর তিন দিন।
অথবা অল্প এক গোছা চুল হাতে নিয়ে হালকা টান দিন। যদি গোছার চার ভাগের এক ভাগ চুলই উঠে আসে তবে তা চিন্তার কারণ।

চিকিৎসা
ওষুধের মাধ্যমে
বাজারে চুল পড়া রোধের জন্য মিনোক্সিডিল নামের ওষুধ পাওয়া যায়। এটি যেখান থেকে চুল পড়ছে সেখানে লাগাতে হবে। এটি নারী ও পুরুষ উভয়েই ব্যবহার করতে পারেন। এতে কাজ না হলে অন্য চিকিৎসা নিতে হবে।
লেজার থেরাপি-এলএইচটি
লেজার থেরাপি হেয়ার ফলিকলগুলোকে আবার সজীব করে। এমনিতে প্রতিদিনই চুল পড়ে ও নতুন চুল গজায়।
কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বা অন্য কোনো অসুস্থতার ফলে যে পরিমাণ চুল পড়ে যায়, সেই পরিমাণ গজায় না। লেজার থেরাপি চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয় ও ফলিকলগুলোকে পুনর্জীবিত করে। চুলের গোড়া ও কাণ্ডের গঠন দৃঢ় করে। চুলের অকাল পতন রোধ করে।
এটি আধঘণ্টা পরে প্রতি সপ্তাহে এক দিন হিসেবে, সাধারণত ছয় মাস পর্যন্ত নিতে হয়। লেজার থেরাপির পাশাপাশি মিনোক্সিডিলও ব্যবহার করতে হয়।
হেয়ার ফলিকল রিপ্লেসমেন্ট
এটি একধরনের মাইক্রোসার্জারি বা সূক্ষ্ম অপারেশন। এতে চুল পড়ে যাওয়া অংশে হেয়ার ফলিকল ইমপ্লান্ট করা হয়। অপারেশনটিতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। অপারেশনের পরদিনই রোগী বাসায় চলে যেতে পারেন। সাধারণত মোট তুই-তিনটি সিটিং লাগে।
হেয়ার স্কাল্প রিপ্লেসমেন্ট
এ ক্ষেত্রে অক্সিপুট বা মাথার পেছনের অংশ যেখানে চুলের ঘনত্ব বেশি থাকে তা ফ্ল্যাপ করে কেটে এনে টাক হওয়া অংশে রিপ্লেস করা হয় বা বসানো হয়।
কখনো কখনো নিজের স্কাল্প হেয়ারের পরিবর্তে আর্টিফিশিয়াল হেয়ার পিস আক্রান্ত স্থানে ইমপ্লান্ট করা হয়।
চুল পড়া রোধের প্রায় সব চিকিৎসাই বাংলাদেশে আছে।
তবে অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখনো উন্নততর চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। এ ছাড়া এসব চিকিৎসা এখন পর্যন্ত ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ। ঢাকার বিভিন্ন কসমেটিক সার্জারি সেন্টারে সাত-আট বছর ধরে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আর খরচও এখন
অনেক কমে এসেছে।

0 comments:

Post a Comment