Tuesday, August 31, 2010

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন

43 comments
চট্টগ্রামে অবস্থিত এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন নারী শিক্ষায় একটি অগ্রগামী বিশ্ববিদ্যালয়। এশিয়ার নারীদের মাঝে উচ্চশিক্ষার আলোর মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, নেতৃত্ব তৈরী এবং এশিয়ান আন্তঃসাংস্কৃতিক মেল বন্ধনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে এটি। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে তিনটি অনুষদে প্রায় ৩০০০ নারীকে এই মুহূর্তে শিক্ষাদান কার্যক্রম চলছে। এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানান সংস্কৃতির মেয়েদের একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাবেশও বলা যেতে পারে এই ক্যাম্পাসকে। মেধাবীদের পাশাপাশি এশিয়ার বিভিন্ন সুবিধাবঞ্চিত, উপজাতি, উদ্বাস্তু গোষ্ঠীর নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করাই এর মূল লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী পুরোপুরি বিনামূল্যে পড়াশোনা করে।

একসেস একাডেমি একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ: এশিয়ার পিছিয়ে পড়া মেয়েদের দক্ষ ও শিক্ষিত করে তোলাই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন-এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু যারা পিছিয়ে পড়েছে তারাতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত থাকবেন না। নিশ্চিতভাবে তারা কোন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অন্যদের থেকে পিছিয়ে থাকবেন। এক্ষেত্রে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এ বাছাই করা পিছিয়ে পড়া প্রার্থীদেরকে মূল কোর্সে ভর্তির আগেই ইংরেজি, অংক ও কম্পিউটারে বিশেষ দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এক বছর মেয়াদী কোর্স করানো হয়। এই কোর্সের নাম একসেস একাডেমি। আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শ্রেষ্ঠতম উপায়ে যাতে উপস্থাপন করতে পারে সে লক্ষ্যে আন্ডার গ্রাজুয়েটের আগে এক বছর একসেস একাডেমি কোর্সের ব্যবস্থা করা আছে। এর ফলে ভর্তি হওয়া সব শিক্ষার্থী সমান যোগ্যতা নিয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট পড়াশুনা শুরু করেন। একসেস একাডেমিতে সুযোগ পাওয়া ৭৫ শতাংস শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ পায়।

লিবারেল আর্টসই উচ্চশিক্ষার ভিত্তি: এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন-এর স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার মূল ভিত্তি হল লিবারেল আর্টস। লিবারেল আর্টস একটি আমেরিকার শিক্ষা পদ্ধতি যেখানে শিক্ষার্থীর একটি বিশেষ দিকের যোগ্যতা, আগ্রহ কিংবা অভিজ্ঞতাকে আরও শক্তিশালী করা হয়। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর উপর কোন বিষয় চাপিয়ে না দিয়ে তার যে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা আছে সে বিষ্েয়ই পড়ানো হয়। একজন শিক্ষার্থীর যে অভিজ্ঞতা আগেই ছিল সেটাকে এমনভাবে আরও মজবুত করা হয় যাতে সে পরবর্তীতে সমাজের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে, পাশাপাশি চাকরির বাজারেও সে যোগ্যতর প্রার্থী হতে পারে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ মোট চারটি বিষয়ের মধ্যেই সিমাবদ্ধ থাকে। এগুলো হল- ১. বায়োলজিক্যাল সাইন্স। ২. সাহিত্য ও নারী শিক্ষা। ৩. রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ও অর্থনীতি। ৪. ইনফরমেশন কমিউনিকেশন এন্ড টেকনোলজি (আইসিটি)। আন্ডার গ্রাজুয়েটে ভর্তির আগে শিক্ষার্থীকে তার আগ্রহের প্রমাণ দিয়ে ভর্তি হতে হয়। চার বছর মেয়াদি কোর্সের শেষে একজন নারী একটি ব্যাচেলর ডিগ্রি পান যেমনø বিএ ইন বায়োলজিক্যাল সাইন্স। ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনের পর কোন শিক্ষার্থী ব্যবসা, মেডিসিন, আইন ইত্যাদি বিষয়ে আরও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে চাইলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনই প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে থাকে। কারণ ইংল্যান্ডে ইম্পেরিয়াল কলেজসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তাদের সমঝোতা চুক্তি রয়েছে।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এ ভর্তি: এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন-এ প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের দিকে পরবর্তী বছরের জন্য ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয় । বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য ২৫ শতাংশ কোটা আছে। আবেদন করার জন্য এক এক দেশের জন্য একটি তারিখ থাকে। সালের ব্যাচের জন্য বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীদের আবেদনের সময়সীমা গত ৩০ জানুয়ারী শেয় হয়ে গেছে। ১৭ থেকে ২৫ বছরের যে কোন এশিয়ান ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস কিংবা নিজ নিজ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ১২ বছরের সফল পড়াশোনা করা মেয়ে হতে হবে। একসেস একাডেমিতে ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রত্যেকটিতে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ এবং সরাসরি ব্যাচেলর প্রোগামে ভর্তির জন্য ৭০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। এইসএসসি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে এমন মেয়েরাও আবেদন করতে পারবে।

আবেদনপত্রের সাথে শিক্ষার্থী তার শিক্ষা জীবনে বা সামাজিক জীবনে যে কোন বিষয়ে কোন বিশেষ অর্জন বা অভিজ্ঞতার উল্লেখ করতে হবে। নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সুপারিশসহ তার অর্জন উপস্থাপন করবেন। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন-এর নিজস্ব ওয়েব সাইট www.asianuniversity.org বা স্ব স্ব দেশে বাংলাদেশের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটরের সাথে যোগাযোগ করে আবেদনপত্র সংগ্রহ করা যাবে।
০০ রফিকুল ইসলাম

বিএনপি

29 comments
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এই দল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল তার শাসনকে বেসামরিক করার উদ্দেশ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি শুরু করেন। জেনারেল জিয়া যখন সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য নির্বাচন করবেন তখন তার নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দলের সমন্বয়ক ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার।
১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতেই জাগদলের নেতৃত্বে ছয়টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে 'জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট' নামে একটা নির্বাচনী জোট গঠন করা হয়। জোটভুক্ত দলগুলো হলো_ জাগদল, মুসলিম লীগ, ন্যাপ (ভাসানী), ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও বাংলাদেশ তফসিলী সম্প্রদায় ফেডারেশন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই ফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন জিয়াউর রহমান। অপরদিকে, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোঃ), জাতীয় জনতা পার্টি, পিপলস লীগ, গণআজাদী লীগসহ ১০ দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় 'গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট' নামে আরেকটি নির্বাচনী জোট। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এ জোটের প্রার্থী ছিলেন জেনারেল (অব.) এমএজি ওসমানী। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন এগিয়ে এলে জেনারেল জিয়া জাগদলের ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোকে একীভূত করে '৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর গঠন করেন 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল' (বিএনপি)। রাষ্ট্রপতি জিয়া এই দলের সমন্বয়ক এবং দলের প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন দলের প্রথম মহাসচিব। জিয়ার এই দলে বাম, ডান, মধ্যপন্থি সব ধরনের লোক ছিলেন।
জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচির মধ্যে খালকাটা কর্মসূচিটি দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে জেনারেল জিয়া বেশি দিন সরকার ও দলের হাল ধরে রাখতে পারেননি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কিছু উচ্ছৃঙ্খল সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন। এরপর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হলেও অসুস্থতার কারণে দল ও সরকারের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছিলেন না।
এ পরিস্থিতিতে দলের নেতাকর্মীদের অনুরোধে অনেকটা আকস্মিকভাবে শোকার্ত গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া ওরফে পুতুল রাজনীতিতে এলেন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিচারপতি সাত্তারের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন। এ অবস্থায় সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে যান বেগম জিয়া। '৮৩ সালের মার্চ মাসে নেতাকর্মীদের সমর্থনে খালেদা জিয়া বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। স্বৈরশাসকবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালের ১০ মে খালেদা জিয়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
পিছু ছাড়েনি ভাঙন : অবশ্য প্রতিষ্ঠার পর থেকে দফায় দফায় ভাঙনের মুখে পড়ে বিএনপি। প্রথমে হুদা-মতিন, দ্বিতীয়বার শাহ আজিজ, তৃতীয়বার কেএম ওবায়দুর রহমান, চতুর্থবার অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, পঞ্চমবার কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ এবং ষষ্ঠবার আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ভাঙনের মুখে পড়েছিল দলটি।

শ্রীকৃষ্ণ

0 comments
পৃথিবী থেকে দুরাচারী দুষ্টদের দমন আর সজ্জনদের রক্ষার জন্যই মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ১৭ ভাদ্র স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই আবির্ভাব-তিথিকে ভক্তরা শুভ জন্মাষ্টমী হিসেবে উদ্যাপন করে থাকেন।
এই মহাপুণ্য তিথিতে দেবকী ও বাসুদেবের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়া অত্যাচারী কংসের কারাকক্ষে পুত্ররূপে আবির্ভূত হন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। বসুদেব ও দেবকীর পুত্র শ্রীকৃষ্ণ। মানবপুত্র মানবই, ঈশ্বর হয় কি করে! আর তাঁর জন্মও হয়েছে একটি কারাগারে। স্বয়ং ভগবান কারাগারে জন্মাবেন কেন? আরাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে সেসব প্রশ্ন অনুধাবনযোগ্য।

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় উল্লেখ আছে : যখনই পৃথিবীতে অধর্মের প্রাদুর্ভাবে ভক্ত ও সর্বসাধারণের জীবন দুর্বিষহ ও অতিষ্ঠ হইয়া ওঠে, দুরাচারীর অত্যাচার ও নিপীড়ন বৃদ্ধি পায়, তখন ধর্ম সংস্থাপনের জন্য কৃপাবশত ঈশ্বর ‘অবতার’ রূপে এই নশ্বর পৃথিবীতে আগমন করিয়া থাকেন। তখন তিনি ষড়গুন তথা ঐশ্বর্য, বীর্য, তেজ, জ্ঞান, শ্রী ও বৈরাগ্যসম্পন্ন ’পুণ্যাবতার’ রূপে প্রকাশিত হন। তাঁহার আবির্ভাবে ধরণী হয় পাপভারমুক্ত। সাধুসজ্জন ও ভক্তদের মনে সঞ্চারিত হয় অনাবিল আনন্দ। তাঁহার এই জন্মলীলাই জন্মাষ্টমী হিসাবে অভিহিত ও স্মরণীয়। কেননা তিনি অষ্টমী তিথিতে দৈবকীয় অষ্টম গর্ভে জন্ম নিয়াছিলেন। বলাবাহুল্য, ইহা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই পৃথিবীতে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মধারী শ্রীকৃষ্ণরূপে আবির্ভূত হইয়াছিলেন দ্বাপর যুগে। তাঁহার জন্ম হইয়াছিল বর্ণমালা পিতাসন পরিহিত অবস্থায়। সর্বাঙ্গে ছিল বহুমূল্য বলয় ও মণিমুক্তাখচিত অলংকারাদি। তাঁহার আগমনী বার্তায় কারাগারের লোহার শিকল ও বন্ধ দরজা আপনা-আপনি উন্মুক্ত হইয়া যায়। অঝোর বারিধারার সিঞ্চন হইতে রক্ষায় অনন্তদেব ফণা বিস্তার করিয়া চক্রধারণ করেন। ভরা ভাদ্রের প্রমত্তা যমুনা তাহার গমনপথ সুগম করিয়া দেয়। তিনি মানবদেহ ধারণ করিয়া ১২৫ বৎসর জীবিত ছিলেন। তাঁহার জীবনকালকে বিন্যস্ত করিলে দেখা যায় মথুরায় তাঁহার জন্ম, গোকুলে নন্দালয়ে পরিবর্ধন, মথুরায় কংস বধ, রাজ্যাধিকার, কুরুক্ষেত্রে পান্ডবদের সঙ্গে সখ্যতা, দ্বারকায় রাজধানী স্থানান্তর ও অতঃপর লীলাবসান।

শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ অবদান শ্রীমদ্ভগবদগীতা। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহই এই মহাগ্রন্থে স্থান পাইয়াছে। সব বেদ ও উপনিষদের ইহাই সারসংক্ষেপ। গীতায় ঈশ্বর সাধনার বিভিন্ন পথ রহিয়াছে। জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি যে কোন পথ ধরিয়া সাধনা করিলে ঈশ্বরকে লাভ করা যায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের পরমাত্মীয় ও বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের আত্মা। ভারতবর্ষের ধর্ম ও ইতিহাসের এক আধ্যাত্মিক ও অবিস্মরণীয় পুরুষ। তাঁহার গীতা মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়, বিশ্বাস ও প্রেমেই শ্রীকৃষ্ণকে পাওয়া যায়।

Monday, August 30, 2010

প্রেমিকার জন্য ল্যাপটপ এবং একটি অপহরণ নাটক

0 comments
প্রেমিকা বৃষ্টিকে পূজায় ল্যাপটপ উপহার দিতে হবে। এ জন্য দশম শ্রেণীর ছাত্র রাহুলের ৪৫ হাজার টাকা প্রয়োজন। তাই প্রবাসী পিতার একমাত্র সন্তান রাহুল বন্ধুদের নিয়ে পরামর্শ করে সাজায় এক অপহরণ নাটক। মায়ের কাছ থেকে মুক্তিপণ নেওয়া হবে ৫০ হাজার টাকা। সে টাকায় কেনা হবে রাহুলের প্রেমিকার জন্য ল্যাপটপ। এমন পরিকল্পনাই ছিল চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র সনদ সুশীল ওরফে রাহুলের (১৬)। কিন্তু মা
তাপসী সুদ্দল মুক্তিপণের টাকা না দিয়ে রোববার সন্ধ্যায় নগরীর কোতোয়ালি থানায় পুলিশের
সহায়তা চাইলে ফাঁস হয়ে যায় সব। পুলিশ ফাঁদ পেতে রোববার রাতেই কথিত অপহৃত রাহুলকে উদ্ধার এবং তিন অপহরণকারীকে গ্রেফতার করে।
কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ গাজী সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, 'প্রেমিকাকে উপহার দেওয়ার জন্য স্কুলছাত্র রাহুল ও তার বন্ধুরা এ অপহরণ নাটকের অবতারণা করেছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত আমরা অভিযান চালিয়ে রাহুলকে উদ্ধার করার পাশাপাশি অপহরণের সঙ্গে জড়িত তিন জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। এ অপহরণের সঙ্গে জড়িত অপর দুজনকেও গ্রেফতার করার জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে।'
নগরীর পাথরঘাটা এলাকার প্রবাসী সত্যরঞ্জন সুশীলের স্ত্রী তাপসী সুদ্দল রোববার ইফতারের আগে কোতোয়ালি থানায় এসে কাঁদতে কাঁদতে জানান, তার ছেলে রাহুলকে (১৬) অজ্ঞাতনামা অপহরণকারীরা অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এখন মোবাইল ফোনে রাহুলের মুক্তিপণ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দাবি করছে। টাকা নিয়ে দ্রুত নগরীর জিইসি মোড়ে যাওয়ার জন্যও বারবার তাগিদ দিচ্ছে তারা। এরপর তাপসী সুদ্দলকে নিয়ে পুলিশ অপহরণকারীদের গ্রেফতার করতে একটি ফাঁদ পাতে। কোতোয়ালি থানার এসআই সুকান্ত চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সাদা পোশাকে পুলিশের একটি দল রাহুলের মাকে নিয়ে জিইসি মোড় এলাকায় যায়। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর জিইসি মোড় সংলগ্ন ওআর নিজাম রোডের রয়েল হাসপাতালের সামনে মুক্তিপণের ৫০ হাজার টাকা নিতে দুই অপহরণকারী এলে পুলিশ মোঃ মফিজ নামের এক অপহরণকারীকে গ্রেফতার করে। পালিয়ে যায় মফিজের সঙ্গী ফারুক। থানায় নিয়ে আসার পর রাহুলের মা মফিজ, ফারুকসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে একটি অপহরণ মামলা করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, রোববার সকালে পাথরঘাটার বাসা থেকে মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুলে যায় রাহুল। স্কুলের পর কোচিং শেষে দুপুর গড়িয়ে গেলেও সে আর ফিরে আসে না। মোবাইল ফোনও বন্ধ। এ অবস্থায় দুপুর ৩টার দিকে রাহুলের মোবাইল ফোন খোলা পাওয়া যায়। কিন্তু রাহুলের ফোন ধরে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি। তিনি রাহুলের মাকে বলেন, বসের সঙ্গে কথা বলুন। এরপর অপর অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন ধরে রাহুলের মাকে জানায়, 'আপনার ছেলে রাহুল আমার হাতে। তাকে পেতে হলে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে জিইসি মোড়ে চলে আসেন।'
এ অপহরণের মামলাটি হওয়ার পর রাহুলকে উদ্ধার করতে আরও তৎপর হয় কোতোয়ালি থানা পুলিশ। একটি বিশেষ টিম রাতেই নগরীতে ব্যাপক অভিযান চালায়। এক পর্যায়ে ফারুককে গ্রেফতারে ব্যর্থ হয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ফারুকের বাবা মোঃ আলতাফ হোসেনকে থানায় নিয়ে আসা হয়। আনার দুই ঘণ্টার মধ্যে আত্মীয়স্বজনরা অপহরণকারী ফারুককে থানায় হাজির করে। ফারুক স্বীকার করে, এটি একটি অপহরণ নাটক।
ফারুকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার রাত ২টার দিকে নগরীর খুলশী থানাধীন গরিবুল্লাহ শাহ মাজার এলাকা থেকে কথিত অপহৃত রাহুলকে উদ্ধার করা হয় এবং তার বন্ধু রিয়াদকে (১৬) গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর অপহরণকারী ও রাহুলকে পৃথকভাবে ও মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ২৮ আগস্ট সকাল ১০টায় রাহুল নগরীর মেহেদীবাগ সিডিএ কলোনির তার বন্ধু রিয়াদের বাসায় গিয়ে তাকে নিয়ে পাথরঘাটা রাহুলের বাসার কাছে মন্দিরের পেছনে আসে। সেখানে রাহুলের স্থানীয় বন্ধু ইমন পান্নাসহ বৈঠকে বসে। ওই বৈঠকেই এ অপহরণ নাটকের পরিকল্পনা করা হয়।
গতকাল সোমবার আদালত অপহরণের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া মফিজ, ফারুক ও রিয়াদকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠান। রাহুলকে পাঠানো হয় নিরাপত্তা হেফাজতে।
সূত্রঃ সমকাল
রুবেল খান, চট্টগ্রাম ব্যুরো

Sunday, August 29, 2010

বীভৎস যৌন নির্যাতন, কিন্তু এড়িয়ে গেছেন সবাই

1 comments
লিখেছেনঃ শেরিফ আল সায়ার
একাত্তরে আমাদের নারীদের ওপর পরিচালিত পাকিস্তানি সৈন্যদের যৌন নির্যাতনের ধরন কতোটা ভয়াবহ, কতোটা বীভৎস ছিল- যুদ্ধ চলাকালে এদেশ থেকে প্রকাশিত কোনো দৈনিকে তা প্রকাশিত হয় নি। প্রকাশিত হয়নি বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে পরিবেশিত বাংলাদেশের যুদ্ধ সংবাদেও।

১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর থেকে জাতীয় দৈনিকগুলোতে পাকিস্তানিদের নারী নির্যাতনের বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশিত হলেও ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নির্যাতনের ধরন, প্রকৃতি, শারীরিক, মানসিক প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে খুব কমই গবেষণা হয়েছে। “স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও দলিল প্রামাণ্যকরন” প্রকল্পের তৎকালীন গবেষক, বর্তমানে ইংরেজী দৈনিক ডেইলি ষ্টারের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক আফসান চৌধুরী এজন্য ইতিহাস রচনার সনাতনি দৃষ্টিভঙ্গিকে দায়ী করে বলেছেন, দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখনে বরাবরই সশস্ত্র লড়াই, ক্ষমতাসীন পুরুষদের কৃতিত্ব গ্রন্থিত করার উদ্যোগ চলছে, কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে লাখ লাখ নারী অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করেও যেভাবে যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার হয়েছে, সনাতনি মানুসিকতার কারণে কখনই তা নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের যৌন সন্ত্রাসের ধরন সম্পর্কে প্রথম তথ্য পাওয়া যায় ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত আমেরিকান সাংবাদিক সুসান ব্রাউন মিলার রচিত “এগেইনেস্ট আওয়ার উইল: ম্যান, উইম্যান এন্ড রেপ” গ্রন্থে। দেশে এ বিষয়ক গবেষণাকর্ম প্রকাশিত হয় খুব কম এবং যা হয়েছে ৮০ সালের পর থেকে। যুদ্ধের পর ৭৬-৭৭ সাল পর্যন্ত গ্রহণ করা এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সাক্ষাৎকার একমাত্র প্রকাশিত হয় প্রামাণ্যকরণ প্রকল্পের অষ্টম খন্ডে। কিন্তু এই খন্ড যাচাই করে দেখা গেছে, এতে মোট গৃহীত ২৬২টি সাক্ষাৎকারের মধ্যে নির্যাতনের সাক্ষাৎকার মাত্র ২২টি।

প্রকল্পের তৎকালীন গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, প্রামাণ্যকরণ কমিটি তাদের কার্যালয়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখের বেশি পৃষ্ঠার তথ্য সংগ্রহ করেছে। এরমধ্যে মাত্র ১৫ হাজার পৃষ্ঠা গ্রন্থিত আছে। বাকি লাখ লাখ পৃষ্ঠার তথ্যের মধ্যে নারী নির্যাতন বিষয়ক বেশকিছু ঘটনা আছে। প্রকল্পের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক কে এম মহসীন বলেন, ‘ডকুমেন্টগুলো এখন জাতীয় ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব গ্র্রহনের পারস্পরিক টানাহেচড়ায় অরক্ষিত অবস্থায় আছে। যতোদূর জানি, বেশ কিছু ডকুমেন্ট চুরিও হয়ে গেছে।’

মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত লিখিত সূত্র, সমাজকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তানিদের ধারাবাহিক ধর্ষণ উন্মত্ততার সঙ্গে মধ্য এপ্রিল থেকে যুক্ত হতে শুরু করে এদেশীয় দোসর রাজাকার, শান্তি কমিটি, আল বদর ও আল শামস্ বাহিনীর সদস্যরা। এরা বিভিন্ন স্থান থেকে নারীদের ধরে আনার পাশাপাশি ধর্ষকে অংশ নিয়েছে। প্রত্যেকটি ক্যান্টনমেন্ট, পুলিশ ব্যারাক, স্থায়ী সেনা বাঙ্কার ছাড়াও বিভিন্ন স্কুল কলেজ, সরকারি ভবন ধর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

জানা যায়, একাত্তরে পুরো ৯ মাস পাকিস্তানি সৈন্যরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে ঘটনাস্থলে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বাঙালি নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন আটকে রেখে ধর্ষণের যে ঘটনা ঘটিয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা গণধর্ষণ। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বাড়ির পুরুষ সদস্য, স্বামীদের হত্যা করার পর নারীদের উপর ধর্ষণ নির্যাতন চালাতো পাকিস্তানী সৈন্যরা। ৯ থেকে শুরু করে ৭৫ বছরের বৃদ্ধা কেউই পাকিস্তানী সৈন্য বা তাদের দোসরদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। সুসান ব্রাউনি মিলার তার গ্রন্থের ৮৩ পাতায় উল্লেখ করেছেন, কোনো কোনো মেয়েকে পাকসেনারা এক রাতে ৮০ বারও ধর্ষণ করেছে। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির “যুদ্ধ ও নারী” গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এক একটি গণধর্ষণে ৮/১০ থেকে শুরু করে ১০০ জন পাকসেনাও অংশ নিয়েছে। একাত্তরের ভয়াবহ ধর্ষণ সম্পর্কে একমাত্র জবানবন্দিদানকারী সাহসিক ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী তার সাক্ষাৎকারে (একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি, সম্পাদনা শাহরিয়ার কবির) জানান, “রাতে ফিদাইর (উচ্চ পদস্থ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা) চিঠি নিয়ে ক্যাপ্টেন সুলতান, লে. কোরবান আর বেঙ্গল ট্রেডার্সও অবাঙালি মালিক ইউসুফ এরা আমাকে যশোরে নিয়ে যেত। যাওয়ার পথে গাড়ির ভেতরে তারা আমাকে ধর্ষণ করেছে। নির্মম, নৃশংস নির্যাতনের পর এক পর্যায়ে আমার বোধশক্তি লোপ পায়। ২৮ ঘন্টা সঙ্গাহীন ছিলাম”।

পাকিস্তানি সৈন্যদের ধর্ষণের বীভৎসতার ধরন সম্পর্কে পুনর্বাসন সংস্থায় ধর্ষিতাদের নিবন্ধীকরণ ও দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত সমাজকর্মী মালেকা খান জানান, সংস্থায় আসা ধর্ষিত নারীদের প্রায় সবারই ছিল ক্ষত-বিক্ষত যৌনাঙ্গ। বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ছিড়ে ফেলা রক্তাক্ত যোনিপথ, দাঁত দিয়ে ছিড়ে ফেলা স্তন, বেয়োনেট দিয়ে কেটে ফেলা স্তন-উরু এবং পশ্চাৎদেশে ছুরির আঘাত নিয়ে নারীরা পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসতো।

পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের নারীদের একাত্তরে কতো বীভৎসভাবে ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতন করেছে তার ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশী ধরা পড়ে ১৮ ফেব্র“য়ারীর ৭৪ সালে গৃহীত রাজারবাগ পুলিশ লাইনে একাত্তরে সুইপার হিসেবে কাজ করা রাবেয়া খাতুনের বর্ণনা থেকে। প্রামান্যকরন প্রকল্পের অষ্টম খন্ডে গ্রন্থিত ঐ বর্ণনায় কয়েকটি অংশ: রাবেয়া খাতুন জানান, ‘উন্মত্ত পান্জাবি সেনারা নিরীহ বাঙালী মেয়েদের শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয় নাই অনেক পশু ছোট ছোট বালিকাদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করে ওদের অসার রক্তাক্ত দেহ বাইরে এনে দুজনে দুপা দুদিকে টেনে ধরে চড়াচড়িয়ে ছিড়ে ফেলে ছিল। পদস্থ সামরিক অফিসাররা সেই সকল মেয়েদের ওপর সম্মিলিত ধর্ষণ করতে করতে হঠাৎ একদিন তাকে ধরে ছুরি দিয়ে তার স্তন কেটে, পাছার মাংস কেটে, যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে সম্পূর্ণ ছুরি চালিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ওরা আদন্দ উপভোগ করতো । ’ রাবেয়া খাতুনের আরেকটি বর্ণনায় জানা যায়, ‘ প্রতিদিন রাজারবাগ পুলিশলাইনের ব্যারাক থেকে এবং হেডকোয়ার্টার অফিসে ওপর তলা থেকে বহু ধর্ষিত মেয়ের ক্ষত-বিক্ষত বিকৃত লাশ ওরা পায়ে রশি বেধে নিয়ে যায় এবং সেই জায়গায় রাজধানী থেকে ধরে আনা নতুন মেয়েদের চুলের সঙ্গে বেধে ধর্ষণ আরম্ভ করে দেয়। ’

১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পরও পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙ্কারে আটকে রেখে নির্বিচারে ধর্ষণ করেছে বাঙালী নারীদের। বিচারপতি কে এম সোবহান প্রত্যক্ষ দর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘ ১৮ ডিসেম্বর মিরপুরে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া একজনকে খুঁজতে গিয়ে দেখি মাটির নিচে বাঙ্কার থেকে ২৩জুন সম্পূর্ণ উলঙ্গ, মাথা কামানো নারীকে ট্্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছে পাক আর্মিরা। ’

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, পুরোপুরি পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত পাক আর্মিদের ধর্ষণ-উত্তর অন্যান্য শারীরিক নির্যাতনের ফলে বেশ কিছু মেয়ে আত্মহত্যা করেছে, কাউকে কাউকে পাকসেনারা নিজেরাই হত্যা করেছে; আবার অনেকেই নিরুদ্দিষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক ড. রতন লাল চক্রবর্তী ৭২- এর প্রত্যক্ষদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, ‘ যুদ্ধের পর পর ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারী, ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন স্থানে উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে বেশ কিছু নারীকে। তাদের ড্রেসআপ এবং চলাফেরা থেকে আমরা অনেকেই নিশ্চিত জানতাম ওরা যুদ্ধের শিকার এবং ওদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। ’

তথ্যসূত্র: উক্ত লিখাটি ভোরের কাগজ, ১৮ মে ২০০২ ইং এ প্রকাশিত

শেষ কথা: এতো বিভৎস নির্যাতনের কোনো বিচার আজও হয়নি। বিশ্বের কাছে এসকল তথ্য অজানা। বিদেশ কেনো আমাদের নতুন প্রজন্ম যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে কতোটুকু জানে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এবং এই পাকিস্তানি সৈন্যদের সহায়তা দানকারী আলবদর আলশামস এখনও বীরের মত ঘুরে বেড়ায়। এই কি ছিল আমাদের নিয়তি?
উক্ত লিখাটি ভোরের কাগজ, ১৮ মে ২০০২ ইং এ প্রকাশিত। উল্লেখ করা উচিত ছিল লেখাটি সংগ্রহিত। আমি শুধু টাইপ করেছি মাত্র।

গিমে মিউজিয়াম, ফ্রান্স

0 comments
ল্যুভর মিউজিয়ামের মতোই আরেকটি সমৃদ্ধ জাদুঘর হলো গিমে জাদুঘর। এ জাদুঘরটি বিশেষভাবে পূর্ব ও দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর প্রত্নসামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়েছে। গিমে জাদুঘর তৈরির পেছনে ছিলেন ফ্রান্সের বিশিষ্ট শিল্পপতি এমিল গিমে। তারই নামানুসারে এ জাদুঘরের নাম করা হয়েছে। তিনি ১৮৭৬ সালে জাপান, চীন, ভারতবর্ষ, মিসর, গ্রিস ভ্রমণ করেছিলেন। এসব দেশ সফরকালে তিনি যে বিপুল পরিমাণ প্রত্নসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন, সেগুলো জনসমক্ষে প্রদর্শনের জন্য ১৮৭৯ সালে ফ্রান্সে নিজ শহরে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন। পরে প্যারিসে বর্তমান গিমে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে সব সংগ্রহই সেখানে স্থানান্তর করেন। প্রতিষ্ঠার এক দশক পর ১৮৮৯ সালে প্যারিসে শুরু হয় গিমে জাদুঘরের নতুন যাত্রা।
-আমিন রহমান নবাব

মোহাম্মদপুর শহীদ পার্ক মার্কেট

0 comments
মোহাম্মদপুর শহীদ পার্ক কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মার্কেটটি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত অবস্থায় ব্যবসায়ীরা দোকানদারি করে যাচ্ছে। জানা যায়, ১৯৯৮ সালে মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়। ঢাকা সিটি করপোরেশন মার্কেটটি পরিপূর্ণ না করে ২০০৫ সালে ব্যবসায়ীদের বুঝিয়ে দেয়। যখন ব্যবসায়ীরা মার্কেট বুঝে নেয় তখন প্রধান গেট দেয়া ছিল না, ছিল না কোনো বাথরুমের ব্যবস্থা, কোনো কলাপসিবল গেট ছিল না এমনকি দোকানের সার্টারগুলোও ঠিকমতো লাগানো ছিল না। অন্যদিকে, প্রথম ধাপে ৮০টি দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে দোকান ছোট করে ১১৪টি দোকান করা হয় এবং তৃতীয় ধাপে আরো ছোট করে ১৩৪টি দোকান করা হয় অর্থাৎ, বিভিন্ন সরকারের আমলে ধাপে ধাপে মোট ৮০টি দোকান ভেঙ্গে ১৩৪টি দোকান করা হয়। ব্যবসায়ীরা জানায়, মার্কেট সংলগ্ন শহীদ পার্ক কেন্দ্রীয় জামে মসজিদটি সম্পূর্ণভাবে ১৪৩জন দোকানমালিকের অর্থায়নে নির্মিত হয়। মোহাম্মদপুর শহীদ পার্ক কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির বর্তমান সভাপতি আক্তার হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক নূরনবী সবুজ বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্মিত অন্যান্য মার্কেটের তুলনায় এই মার্কেট পার স্কয়ারফিট ১০ টাকা ধার্য করে, যা অন্যান্য মার্কেটের তুলনায় বেশি। তারা অভিযোগ করেন ডিসিসি মার্কেট তৈরির পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো তদারকি কিংবা কোনো পাহারাদারের ব্যবস্থা রাখেনি। অথচ প্রতি মাসে সকল প্রকার রাজস্ব তারা কড়ায়গন্ডায় বুঝে নিচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ন্যূনতম কোনো সুযোগ-সুবিধা ডিসিসি থেকে এই মার্কেটের ব্যবসায়ীরা পাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা জানান, মার্কেটের দক্ষিণ পাশের গেটটি বন্ধ করে দেয়াল করে দেওয়ার কারণে মার্কেটটি অন্ধকার হয়ে পড়েছে। ক্রেতাগণ সহজে আসতে পারে না। তারা দক্ষিণ পাশের গেটটি অবমুক্ত করার দাবি জানান। অন্যদিকে বাথরুম ব্যবস্থাসহ কলাপসিবল গেট না থাকায় ঝুঁকির মধ্যে মার্কেট খোলা রাখতে হচ্ছে। রাতের বেলায় ব্যবসায়ীদের ভয় থাকে কখন কোন অঘটন ঘটে যায়। কাজেই ডিসিসির প্রতি তাদের প্রধান দাবি দক্ষিণপাশ অবমুক্ত ও কলাপসিবল গেটের ব্যবস্থাসহ বাথরুমের ব্যবস্থা করে দেওয়া। এই মার্কেটে রেডিমেড গার্মেন্টস-এর দোকানসহ, থান কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি, মোবাইলের যন্ত্রাংশ ও জুতার দোকান রয়েছে।
০০ হামিদুল করিম ০০

জাতীয় জাদুঘর

0 comments
ঢাকা নগরীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর অবস্থিত। সমকালিন বিশ্বের স্মৃতির মিনার এ মিউজিয়ামের যাত্রা শুরু ১৯১৩ সালের ৭ আগস্ট। শুরুতে এর নাম ছিল ঢাকা জাদুঘর। ১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা জাদুঘর থেকে তা জাতীয় জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়। এ দীর্ঘ পথ চলায় (১৯১৩-১৯৮৩) রয়েছে তার সুখ-দুঃখের অসংখ্য স্মৃতি। ১৯১৩ সালে ঢাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা পেলেও এই প্রচেষ্টা শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। ১৮৫৬ সালে ঢাকা নিউজ পত্রিকায় জাদুঘর স্থাপনের প্রস্তাব দিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল। অনারারি সেক্রেটারি হিসেবে এ আবেদন জানিয়েছিলেন এস. রবিনসন। এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সে সময় জাদুঘর প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কমিটি গঠন করাসহ বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এরপর মাঝে অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়। ১৯০৯ সালের দিকে শিলং থেকে কিছু মুদ্রা ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু এগুলো সংরক্ষণের জন্য তখন কোনো উপযুক্ত স্থান ছিল না। এ অবস্থায় ১৯১০ সালের ১ মার্চ তৎকালিন ব্রিটিশ সরকারের মুদ্রাতত্ত্ববিধ এইচ. ই স্ট্যাপলটন গভর্নর স্যার ল্যান্সলেট হেয়ারকে ঢাকায় একটি জাদুঘর স্থাপনের প্রস্তাব দেন। ১৯১২ সালের ২৫ জুলাই পুরান ঢাকার নর্থব্রুক হলে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুধীজনদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৩ সালের ২৫ মার্চ সরকার জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি অনুমোদন করে ৩০ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রভিশনাল জেলারেল কমিটি গঠন করেন। ঢাকার তৎকালিন কমিশনার নিকোলাস ডি বিটসন পদাধিকার বলে এ কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯১৩ সালের ৭ আগস্ট বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল প্রাথমিকভাবে পুরোনো সচিবালয়ের (বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) একটি কক্ষে ‘ঢাকা জাদুঘর’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। তবে দর্শকদের জন্য জাদুঘরটি খুলে দেয়া হয় ১৯১৪ সালের ২৫ আগস্ট। প্রথমে এর নিদর্শন সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭৯টি। বঙ্গভঙ্গরদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতেই যেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা জাদুঘর। ১৯১৪ সালে নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নলীনিকান্ত ভট্টাশালীকে জাদুঘরের কিউরেটর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নলীনী অক্লান্ত পরিশ্রম করে গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন জনপদ ঘুরে অসংখ্য প্রতœসম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন। তার একনিষ্ঠ প্রচেষ্ঠার ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই জাদুঘরটি একটি ঐতিহাসিক গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়। ঢাকা জাদুঘরকে পুরোনো সবিচালয় ভবন থেকে ১৯১৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকার নায়েব নাজিমের নিমতলীসহ প্রাসাদের বারদুয়ারীতে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৩৬ সালে পূর্বের কমিটি বিলুপ্ত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সভাপতি করে নয় সদস্যের একটা নতুন কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর জাদুঘর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পিত ছিল। ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল ঢাকা মিউজিয়াম অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠিত হয় এবং ঢাকা জাদুঘর একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। পরবর্তী সময়ে জনচাহিদাসহ নানাদিক বিবেচনায় এনে শাহবাগ এলাকায় জাদুঘরের জন্য আট একর জমির উপর একটি বৃহদাকার স্বয়ংসম্পূর্ণ ভবন নির্মাণ করা হয়। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর অধ্যাদেশ জারি করে ঢাকা জাদুঘরের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পদ, নিদর্শন, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শাহবাগসহ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সাথে আত্তীকৃত করা হয়। বর্তমানে জাদুঘরের চারতলা ভবনজুড়ে মোট ৪৪টি গ্যালারিতে উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের স্থায়ী প্রদর্শনী আছে। বর্তমান জাতীয় জাদুঘরের বিকাশের পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল অধ্যাপক আহমদ হাসান দানী’র। তার কল্যাণেই ঢাকার বনেদী পরিবারের সংগ্রহসমূহ যেমনÑ(তাইফুর আবুল হাসনাত) জাদুঘরের জন্য নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ১৯৯৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রায় ৮২ হাজার ৪৭৫টি নিদর্শন সংগৃহীত হয়েছে। নিদর্শনগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছেÑলালমাই ও ময়নামতি থেকে প্রাপ্ত প্রায় পঁচিশ লক্ষ বছরের পুরনো প্রস্তর খণ্ড। দিনাজপুরের বান গড়ের ১০ম-১১শ শতাব্দীর বৃষ্টি পাথরের নাগদরজা। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগসাকি শহরে নিক্ষিপ্ত আনবিক বোমার খণ্ডাংশ, অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলো হচ্ছেÑবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা নিদর্শন, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের ব্যবহƒত জিনিস, ঢাকাই মসলিন, সম্রাট শের শাহের আমলের মুদ্রা প্রভৃতি। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণাধীন মোট চারটি শাখা জাদুঘর রয়েছে। এগুলো হলো আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, ঢাকা; জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, চট্টগ্রাম; ওসমানী জাদুঘর, সিলেট এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা, ময়মনসিংহ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কথা ভেবে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ১৯৭৯ সালে ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এছাড়া ১৯৭৬ সালে জাতীয় জাদুঘরের অধীনে স্কুল কার্যক্রম কর্মসূচি চালু করা হয়। নিদর্শনের প্রকৃতি অনুসারে সমগ্র জাদুঘরকেÑইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা, জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা, সমকালিন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা এবং প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগ নামে মোট চারটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। এছাড়া সংরক্ষণ রসায়নাগার ও জনশিক্ষা নামে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের আরও দুটি বিভাগ রয়েছে। সংরক্ষণ রসায়নাগার বিভাগে জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন নিদর্শনসমূহকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করার কৌশল শিক্ষা দেয়। আর জনশিক্ষা বিভাগের অধীনে জাদুঘর সম্পর্কে বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

হাজার রেকর্ড বক্ষে যাহার/ বুক খুলে সে দেখায় তাকে কাছে পেলে মানুষ / নয়ন দুটি জুড়ায়। আমাদের জাতীয় জাদুঘর হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শন তুলে ধরার মধ্য দিয়ে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সেতুবন্ধন স্থাপন করেছে। তার মাঝে স্থান পেয়েছে কুরান-পুরাণ থেকে শুরু করে এশিয়া-আফ্রিকাসহ পুরো পৃথিবীর নানা দুর্লভ কীর্তি। জাদুঘরের মতো প্রসারিত হোক আমাদের হৃদয়। সব কিছুর মর্মমূলে জাগ্রত থাকুক মাতৃভূমির চেতনা।
০০ আল মেহেদী ০০

দাসত্ব প্রথা

20 comments
আদিম মানুষ নব্য প্রস্তরযুগে প্রবেশের সময় থেকেই অর্থাৎ কৃষিকাজ শুরুর সময় থেকেই দাসব্যবস্থার শুরু। ১৭৬০ সালে হাম্বুরাবি নামের ব্যাবিলনের এক শাসক আইন করে দাস প্রথা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই আইনে গৃহনির্মাণ, শস্য উত্পাদনসহ নানা কাজে জোর করে শ্রমিক নিয়োগের নিদর্শন পাওয়া যায়। এরপর বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সভ্যতাতেই দাসব্যবস্থার প্রচলন ছিল। বিশেষত গ্রিক সভ্যতায় এর ভয়াবহতা ছিল ব্যাপক। অ্যারিস্টটলসহ অনেক বোদ্ধাই তখন বলেছিলেন, দাসত্ব একটি প্রাকৃতিক বিষয়। প্রকৃতিগতভাবেই কেউ কেউ দাস হয়ে জন্মগ্রহণ করে। ১৪৭২ সালে পর্তুগিজ বণিকেরা প্রথম দাস চুক্তি করে। ১৬৬৩ সালে ভার্জিনিয়ার আদালত রায় ঘোষণা করেন, যে মা যদি দাস হয় তাঁর সন্তানও দাস বলে বিবেচিত হবে। বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য ও মুসলিম সভ্যতার সময়েও দাসব্যবসা ব্যাপকতা লাভ করেছিল। আফ্রিকায় দাস ব্যবসা ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। ঘানা, মালিসহ এমন কিছু দেশের প্রায় ৩ শতাংশ জনগণই ছিল দাস। এশিয়াতেও দাসব্যবস্থার প্রচলন ছিল, তবে তা অনেক পরে এই মহাদেশে প্রবেশ করে। এক তথ্যে উল্লেখ আছে, ১৮৪১ সালে ভারত উপমহাদেশে প্রায় নয় মিলিয়ন মানুষ দাস হিসেবে চিহ্নিত ছিল। সোনা, হীরা বা অন্য মূল্যবান বস্তু দাসদের মূল্য হিসেবে বিবেচিত হতো। শরীরে বেশি শক্তি রাখে এমন দাসদের বিক্রি করা হতো উচ্চ মূল্যে। বেশির ভাগ দাস বিক্রি হতো নিলামে। মূলত ইউরোপীয়রা ক্যারিবীয় অঞ্চলে কালোদের আখ চাষসহ নানা কাজে দাস হিসেবে ব্যবহার করত। তবে দাসব্যবস্থার বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে বিক্ষোভ-বিদ্রোহ দানা বাঁধতে থাকে পরবর্তীতে। অষ্টাদশ শতকেই সংগঠিতভাবে দাসেরা বিদ্রোহ শুরু করে আমেরিকা ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে। দাস কিংবদন্তি হিসেবে স্পার্টাকাস যেমন কিংবদন্তি হয়ে আছেন, তেমনি অনেক নাম না-জানা দাসও বিদ্রোহ করে প্রাণ দিয়েছে। ব্রিটেন ১৮০৭ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্র ১৮০৮ সালে তার আফ্রিকান দাসদের মুক্তি দেয়। ১৮৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এন্টিস্লেভারি সোসাইটি, ব্রিটেন ১৮৩৩ সালে আইন করে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাষ্ট্র ১৮৬৫ সালে, আর এর আগে ফ্রান্স ১৮৪৮ সালে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে দাস ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ঘটে ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।
সূত্রঃ প্রথম আলো

পিরামিড

0 comments
।রনক ইকরাম।
যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মিসরে গড়ে উঠেছিল এক অসাধারণ সভ্যতা। নীল নদের তীরে সভ্যতায় গড়ে উঠেছিল সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন রহস্যমণ্ডিত পিরামিড। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এত প্রাচীন হলেও সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র পিরামিডই এখনো পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রাজবংশের রাজাদের মমি সমাধিস্থ করা হতো পিরামিডের ভিতরের গোপন কক্ষে। আর রাজার সঙ্গে সঙ্গে সমাধিস্থ করা হতো প্রচুর ধনরত্ন, দাস-দাসী।

আজকের আধুনিক বিজ্ঞানীদের কাছেও পিরামিড এক অজানা রহস্য। যার কাঠামো আধুনিক বিজ্ঞানের সব শাখায়ই খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আর্কিটেকচারাল হিসেবে এ ধরনের কাঠামো সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প প্রতিরোধক এবং স্থায়ী হয়ে থাকে। সম্প্রতি দেখা গেছে যে, পিরাপিড আসলে একটা রেশনাল স্ট্রাকচার। বিশাল সব পাথর কেমন করে শত শত ফুট ওপরে তোলা হয়েছিল জানে না কেউ। জানে না কেমন করে কাঁটা হয়েছিল পাথরগুলো। কারণ পাথরগুলোর ধার এতই মসৃণ যে, অতি উন্নত যন্ত্র ছাড়া যেটা সম্ভব নয়। এখানেই শেষ নয়, মৃতদেহকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ায় মমি করে রাখত। এ কাজে তারা বিশেষ কিছু রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করত। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানীরা এখনো ধরতে পারেননি তাদের সেই পদ্ধতি।

পিরামিডের গঠনশৈলীর প্রভাব পৃথিবীব্যাপী। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগেকার মানুষের তুলনায় অস্বাভাবিক রকম বড় পাথরগুলো কিভাবে এত উপরে তোলা হয়েছিল, আধুনিক যুগের মানুষের কাছে এটা খুব বড় একটা রহস্য। সাধারণ রাস্তার উপর দিয়ে কোনো গাড়ি বা যন্ত্র ছাড়া এত বড় পাথর টেনে আনা কত অসাধ্য তা আমরা সবাই কল্পনা করতে পারি। কিন্তু মিসরের মরুভূমির বালুর উপর দিয়ে এত বড় পাথর টেনে আনা কত অসাধ্য তা আমাদের কল্পনার বাইরে। কেউ কখনো বালির উপর দিয়ে সাইকেল চালাতে গেলেই দেখা যায় বালি কিভাবে তার উপর দিয়ে চলমান বস্তুকে টেনে ধরে। তখনকার সময়ে মিসরে এমন কোনো প্রযুক্তি ছিল না যার দ্বার তারা এ বিশাল বিশাল স্থাপনাগুলো তৈরি করতে পারে। আর এ কারণেই এখনো অপার রহস্যের নাম পিরামিড।

মিসরের পিরামিডই হলো সবচেয়ে বিস্ময় জাগানিয়া স্থাপত্যগুলোর মধ্যে একটি, কিন্তু শুধু মিসর নয় বরং পৃথিবীর আরো নানা স্থানে রয়েছে আরো অনেক পিরামিড। ঠিক কি কারণে এবং কোনো যান্ত্রিক সুবিধা ছাড়াই কীভাবে নির্মিত হয়েছিল এই পিরামিডগুলো? জানি, এ রকম নানা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করেছে আপনার মনে কিন্তু হয়তো জানা হয়নি তেমন কিছুই।

মিসরে প্রচুর পিরামিড দেখতে পাওয়া যায়। তবে সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে প্রাচীন গির্জার খুফুর পিরামিড পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তমাশ্চর্যের একটি। খ্রিস্ট পু. ২৫৬০ সালে ফারাও রাজা খুফু নিজে এ পিরামিডটি তৈরি করেন। এই পিরামিড নিয়ে কয়েকটি মজার ব্যাপার রয়েছে। চার হাজার চারশত বছর ধরে এটিই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য কর্ম। ১৮৮৯ এ আইফেল টাওয়ার নির্মাণের পর এটি তার গৌরব হারায়। খুফুর পিরামিডের পাথরের গায়ে মূল্যবান লাইমস্টোন প্লাস্টার করা ছিল। পরে অন্য পিরামিডগুলো নির্মাণের সময়ে অন্য রাজারা এখান থেকে লাইমস্টোন নিয়ে নিজের সমাধিসৌধে লাগাতে শুরু করে। এই পিরামিডটিতে তিনটি কক্ষ রয়েছে। আর এই কক্ষগুলোতে ঢোকার জন্য পেরোতে হতো অনেকগুলো গোলক ধাঁধা। ইতিহাসের জনক হেরোডেটাসের মতে, এই পিরামিড তৈরিতে ১ লাখ লোকের ২০ বছর লেগেছিল।

একটা সময়ে খুফুর পিরামিডের শীর্ষে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও এখন আর দেওয়া হয় না। কেননা পর্যটকের এবং পিরামিড দুটোরই ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে এতে।

খুফুর পিরামিড সম্পর্কে বলে গেছেন দার্শনিক হেরোডেটাস। কিন্তু তিনি যে মতবাদ দিয়ে গেছেন তা পরবর্তীকালে ভুল প্রমাণিত হয়। কেননা আধুনিক প্রত্নতাত্তি্বকরা জানাচ্ছেন, খুফু এ পিরামিডটি তৈরিতে মূলত নীলনদের তীরবর্তী মানুষদের কাজে লাগিয়েছিলেন। সময় ২০ বছরের চেয়ে অনেক কম লেগেছিল।

তখনকার যুগে মিসরের লোকেরা ফারাও রাজাকে নিজেদের দেবতা মনে করত এবং মৃত্যুর পর তাদের পরবর্তী জীবনে চলার জন্য তার সমাধিতে তার মমিকৃত মৃতদেহের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে ধন সম্পদও দিয়ে দিত। পরে ফারাও রাজাদের এ সমাধিকে নিরাপদ করে দেয়ার জন্য এর উপর তৈরি করা হত পিরামিড আকৃতির কাঠামো। এখন পর্যন্ত গবেষণা অনুসারে ১৫৩৯ বিসি থেকে ১০৭৫ বিসি পর্যন্ত পিরামিডের মতো করে বা নির্ভেজাল লাইমস্টোন কেটে প্রায় ৬৩টি সমাধি তৈরি করা হয়েছিল। যার বেশির ভাগই অনেক দীর্ঘ এবং ক্রমে নিম্নগামী অসংখ্য ছোটবড় করিডরের জটিল বিন্যাসের মাধ্যমে অবশেষে গিয়ে ফারাওদের সমাধিতে গিয়ে শেষ হয়েছে। এ সমাধিগুলোতে নানা রকমের প্রতীক, দেয়ালে খোদাইকৃত ছবি, অন্যজগতে ভ্রমণের তথ্য এবং নতুন জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপাদান দেওয়া থাকত। ধন-সম্পত্তি তো থাকতই। এর রুমগুলোর একদম কেন্দ্রে থাকত স্বর্ণমণ্ডিত ফারাও রাজাদের শবাধার। এ রুমগুলো খুবই সতর্কতার সঙ্গে সিল করে দেওয়া হতো এবং এ সমাধির মূল্যবান দ্রব্য রক্ষা করার জন্য তখনকার মিসরের শ্রেষ্ঠ আর্কিটেকরা চোরদের ধোঁকা দেওয়ার উপযোগী ডিজাইন করার দায়িত্ব পেত। মাঝে মাঝে প্যাসেইজ রাস্তাগুলো বন্ধ করার জন্য বিশাল এবং মজবুত গ্রানাইটের প্লাগ ব্যবহার করা হতো। চোরদের দমন করার জন্য নকল দরজা, গোপন রুম ইত্যাদি অসংখ্য ব্যবস্থার পরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমাধির প্রবেশ প্রথে কোনো অভিশাপ দিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু এসব পূর্ব সাবধানগুলোর বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছিল। প্রাচীন যুগের চোর এবং ডাকাতরা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে ঠিকই সমাধির পথ খুঁজে বের করত এবং ধন-সম্পত্তি আত্মসাৎ করত।

চোরেরা যেমন ধনসম্পদ চুরির আশায় মমি খুঁজে বেড়াত, তেমনি গুপ্তধনের আশায় গবেষকরা হন্যে হয়ে সমাধিগুলোতে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মিসরের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপত্য আবিষ্কারের অভিযানগুলো পূর্ণাঙ্গ আঙ্গিকে শুরু হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। ১৯ শতাব্দীতে এসে ইউরোপীয়রাও এ গুপ্তধনের সন্ধানে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের হতাশ হতে হয়েছিল, কারণ তারা অনেক গবেষণা করে কোনো সমাধি আবিষ্কার করে দেখত তাদের আগেই কেউ না কেউ গুপ্তধন সরিয়ে নিয়েছে। ১৮ শতাব্দীতেও সমাধিগুলোতে যেকোনো অভিশাপের অস্তিত্ব থাকতে পারে এটা সাধারণ মানুষ জানত না। কিন্তু ১৯ শতকের প্রথম দিকে ১৯২২ সালে হাওয়ার্ড কার্টার ও তার দল তুতেন খামেন নামক একজন ফারাও রাজার সমাধি এবং তাতে প্রচুর পরিমাণে ধন-সম্পত্তি খুঁজে পান। এরপর ঘটতে থাকে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা। তারপর থেকেই সমাধিগুলোতে যে অভিশাপও বিদ্যমান থাকতে পারে তা সবার নজরে আসে। কারণ এ সমাধিটির প্রবেশপথে খোদিত ছিল একটি অভিশাপ। যা এখন সারা বিশ্বেই তুতেন খামেনের অভিশাপ নামে পরিচিত। পিরামিডের মূল নির্মাতা মনে করা হয় মিসরের ফারাও রাজবংশকে। ধারণা করা হয়, জোসার শাসনামলে সর্বপ্রথম পিরামিডের নির্মাণকাজ শুরু হয়। পিরামিড নির্মাণে নিযুক্ত করা হয়েছিল বিপুল সংখ্যক দাস-দাসী। গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডেটাসের মতে, প্রায় এক লাখ লোকের দীর্ঘ বিশ বছরের পরিশ্রমে নির্মিত হয়েছিল পিরামিড। তবে পোলিশ স্থপতি ওয়েসলো কোজিনস্কির ধারণাটা একটু ভিন্ন। তার মতে, পিরামিডের মূল ক্ষেত্রেই লোক লেগেছিল প্রায় ৩ লাখ। আর অফসাইডে প্রয়োজন পড়েছিল আরো ৬০ হাজার মানুষের। অন্যদিকে বিশিষ্ট গণিতবিদ কুর্ট মেন্ডেলসনের ধারণা এই দুই জনের ধারণার চেয়ে আরো একটু ভিন্ন। তার ধারণা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ হাজার লোকের ১০ বছর সময় লেগেছিল পিরামিড নির্মাণের কাজে। বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ মার্ক লেহনারের মতে, পিরামিড নির্মাণের কাজে দাসদের নিয়োগ করা হয়নি বরং মিসরীয়রাই এটি নির্মাণের জন্য শ্রম দেয়। তিনি তার গবেষণায় পিরামিডের পাশে শ্রমিকদের থাকার একটা জায়গাও খুঁজে পেয়েছেন। পিরামিড নির্মাণের জন্য বিপুল সংখ্যক পাথরের প্রয়োজন পড়েছিল। সর্ববৃহৎ পিরামিড অর্থাৎ খুফুর পিরামিডটি নির্মাণের জন্য প্রয়োজন পড়েছিল প্রায় ২-২.৮ মিলিয়ন পাথরের ব্লক। এর মধ্যে কোনো কোনো পাথরের ওজন ছিল কয়েক টন। ধারণা করা হয়, মিসরীয়রা পিরামিড তৈরির আগে এর নকশা এবং ছোট একটি মডেল তৈরি করে নিয়েছিল এবং তারপর সেই নকশা বা মডেল অনুযায়ী নির্মাণ করা হয় পিরামিড।

এত ভারী পাথর উপরে টেনে তুলে কিভাবে পিরামিড নির্মাণ করা হয়, সেটি ভাবলে অবাক হতেই হয়। অধিকাংশের ধারণা, ব্লকগুলোকে ঢালু পথে উপরে টেনে তুলে নির্মাণ করা হয় পিরামিড। আবার হেরোডেটাস এ সম্পর্কে বলেছেন, পিরামিড নির্মাণ করা হয়েছিল সিঁড়ির মতো করে। অনেকটা স্টেডিয়ামের সিঁড়ির মতো ক্রমশ উঁচু এবং সমান্তরালভাবে। প্রথম ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরে পাথর এবং বিভিন্ন উপাদান টেনে তার উপরে ওঠানো হতো এবং তারপর দ্বিতীয় ধাপ নির্মাণের কাজে হাত দেওয়া হতো। আর এভাবেই ধাপে ধাপে নির্মাণ করা হয় পিরামিড। আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, পিরামিড হচ্ছে বহির্জাগতিক কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর তৈরি। তারাই এসে নির্মাণ করে গেছে এই পিরামিড। কিন্তু সে যুক্তি ধোপে টিকেনি। সত্য হলো_ পিরামিড আমাদের এই পৃথিবীর মানুষের হাতেই তৈরি, তারাই বছরের পর বছর পরিশ্রম করে নির্মাণ করেছে বিশালাকৃতির এসব পিরামিড।

এক সময় প্রায় ৪ হাজার ৪০০ বছর ধরে খুফুর পিরামিড পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্যকর্ম ছিল। ১৮৮৯ সালে আইফেল টাওয়ার নির্মিত হলে এটি তার গৌরব হারায়। খুফুর পিরামিডের পাথরের গায়ে মূল্যবান লাইমস্টোন প্লাস্টার করা ছিল। পরে অন্য পিরামিডগুলো নির্মাণের সময়ে রাজারা এখান থেকে লাইমস্টোন নিয়ে নিজের সমাধি সৌধে লাগাতে থাকে। বিশ্বখ্যাত এই পিরামিডটিতে তিনটি কক্ষ রয়েছে। আর এই কক্ষগুলোতে ঢোকার জন্য পেরোতে হতো অনেকগুলো গোলক ধাঁধা। এটি তৈরি করা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০০ বছর আগে। এর উচ্চতা প্রায় ৪৮১ ফুট। এটি ৭৫৫ বর্গফুট জমির উপর স্থাপিত। পিরামিডটি তৈরি করা হয় বিশাল বিশাল পাথর খণ্ড দিয়ে পাথর খণ্ডগুলোর একেকটির ওজন ছিল প্রায় ৬০ টন, আর দৈর্ঘ্য ছিল ৩০ থেকে ৪০ ফুটের মতো। এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল দূর-দূরান্তের পাহাড় থেকে। পাথরের সঙ্গে পাথর জোড়া দিয়ে এমনভাবে পিরামিড তৈরি করা হতো যে, একটি পাথর থেকে আরেকটি পাথরের মাঝের অংশে একচুলও ফাঁক থাকত না। পিরামিড তৈরিতে যত পাথর ব্যবহার হয়েছে, ৬ ফুট উঁচু ও ৩ ফুট চওড়া করে পাশাপাশি বসালে সে দেয়াল লম্বায় ৫০ মাইল ছাড়িয়ে যাবে! গড়ে ৯ টনেরও বেশি ওজনের পাথর একটার পর একটা সাজিয়ে বানানো পিরামিড তাই বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের বিস্ময় আর আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু। এক সময় খুফুর পিরামিডের শীর্ষে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও এখন আর দেওয়া হয় না। কারণ এতে পর্যটক এবং পিরামিড দুটোরই ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এখন পর্যন্ত সমগ্র মিসরে প্রায় ১৮০টি পিরামিডের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫টি এখনো টিকে আছে। কিন্তু কায়রো থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে গিজা এলাকায় অবস্থিত পিরামিডই ভুবনবিখ্যাত। উচ্চতা আর বিশালত্বের কারণে গিজা ও কায়রো ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেলেও চোখে পড়ে তিনটি পিরামিড। মজার ব্যাপার হলো চট করে এসব পিরামিডের উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা করা খুবই দূরূহ। এমনকি কাছাকাছি এসেও বোঝা যায় না_ এগুলো প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু!

পিরামিডকে অবস্থানগতভাবে বলা হয় ভূমির মাঝে এবং সীমান্তের উপাসনাবেদী। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে একই সঙ্গে মাঝে এবং সীমান্তে এর অবস্থান হয় কিভাবে। গ্রেট পিরামিডের অবস্থান মিসরের গিজায়। আরবি 'গিজা' শব্দের অর্থ 'সীমান্ত'। নীল নদের সৃষ্ট ব-দ্বীপে এটির অবস্থান। এটি উচ্চতম এবং নিম্নতম মিসরের সীমান্ত। এ কারণে মানুষের তৈরি অন্য যেকোনো স্থাপত্যের চেয়ে অবস্থানগতভাবে পিরামিড গুরুত্বপূর্ণ। পিরামিডের অবস্থান যে ব-দ্বীপে সেই ব-দ্বীপটির অবস্থান আবার গাণিতিকভাবে মিসরের মাঝখানে। তাই গ্রেট পিরামিড গিজাকে অবস্থানগতভাবে বলা হয় মাঝে এবং সীমান্তে।

মিসরের বিখ্যাত পিরামিডগুলোর একটি স্ফিংস। খুফু নির্মিত গিজার সর্বোচ্চ পিরামিডটির আয়ত্তের মাঝেই এটির অবস্থান। এর বিপরীতেই রয়েছে খাফরে পিরামিড। পূর্ব দিকে মুখ করা এ স্থাপনাটিকে দেখলে মনে হবে এক বিশাল সিংহ মানব সামনে পা ছড়িয়ে বসে রয়েছে। স্ফিংস এর নিচের অংশ দেখতে সিংহের মতো এবং উপরের অংশ বা মাথা তৈরি করা হয়েছে মানব নারীর চেহারা দিয়ে। এটি নির্মাণ করতে চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়েছে। স্ফিংস ৫৭ মিটার (১৮৫ ফুট) লম্বা এবং প্রশস্ত ৬ মিটার (২০ ফুট)। এর উচ্চতা ২০ মিটার (৬৫ ফুট)। দুই পা ছড়িয়ে নখর বিশিষ্ট থাবা মেলে রাখা এ সিংহ মানবীর মূর্তিটির গভীর অভ্যন্তরে রয়েছে মন্দির। প্রবেশ করতে হয় মেলে রাখা দুই পায়ের মাঝ দিয়ে। তবে স্ফিংসের নাক এখন আর অক্ষত অবস্থায় নেই। ধারণা করা হয় নেপোলিয়নের সৈন্য দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নাক হারা হয়েছে সিংহমানবী। মিসরের আরেকটি বিখ্যাত পিরামিড হচ্ছে 'স্টেপ পিরামিড অব ডিজুজার'। ডিজুজার ছিলেন ফারাও খুফুর দাদা। স্টেপ পিরামিডটি তৈরি করেন তিনি এবং তার মমি-ই উদ্ধার করা হয় এ পিরামিড থেকে। পিরামিড ডিজুজার মূলত ৬টি ধাপ বিশিষ্ট। একবারে খাড়া হয়ে এটি উঠে যায়নি। এ কারণেই একে স্টেপ পিরামিড বলা হয়। এর অবস্থান মিসরের সাক্কারাতে। ফারাও ডিজুজার এটি নির্মাণ করেন ২৬৩০ খ্রিস্টপূর্বে। এর উচ্চতা ২০৪ ফুট (৬২ মিটার)। তখনকার সময় এটিই ছিল পৃথিবীর বৃহৎ স্থাপনা। ডিজুজারের মমি চ্যাম্বারটি মাটির নিচে। সেখানে পেঁৗছতে হলে পাড়ি দিতে হয় একটি সুড়ঙ্গের জটিল পথ।

ফারাও নেফরুর তিনটি পিরামিডও দারুণ বিখ্যাত। নেফরু ছিলেন ফারাও ডিজুজারের ছেলে এবং ফারাও খুফুর বাবা। তিনি রেড পিরামিড, বেল্ট পিরামিড এবং মাইদুস পিরামিড নির্মাণ করেছিলেন। এ তিনটি পিরামিড থেকেই তিনটি মমি পাওয়া গেছে। এগুলোর মাঝে কোনোটি ফারাও নেফরুর, তা আলাদা করা যায়নি। কেউ মনে করেন রেড পিরামিড থেকে প্রাপ্ত মমিটিই নেফরুর, আবার কেউ বলেন বেল্ট পিরামিড থেকে প্রাপ্ত মমিটিই তার। রেড পিরামিড নির্মিত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০তে। মিসরের দুসুর-এ অবস্থিত এ স্থাপনাটির উচ্চতা ৩৪১ ফুট (১০৪ মিটার)। নেফরু জীবদ্দশায় এটি নির্মাণের কাজ শেষ করতে পারেননি। তার পুত্র খুফু অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন।

পিরামিড ও তার নির্মাণশৈলী নিয়ে যুগ যুগ ধরে অনেক জল্পনা-কল্পনা হয়েছে। পিরামিডের ভিতরের দেয়ালে আঁকা নানা রকমের ছবি, চিত্রলিপিতে লেখা ধর্মসংগীত আর দেয়ালে খোদাই করা প্রাচীন লিপি উদ্ধার করে এ সম্পর্কে সঠিক খবর জানার চেষ্টা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এরপরও নিশ্চিত হওয়া যায়নি- ঠিক কী কৌশলে তখনকার দিনে সুউচ্চ পিরামিডগুলো তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। এ নিয়ে অনেকগুলো ধারণার প্রচলন রয়েছে। কারো কারো মতে, নির্মাণাধীন পিরামিডের এক পাশ থেকে মাটি বা পাথরের ঢাল তৈরি করে তার ওপর দিয়ে ভারী পাথর টেনে টেনে তুলে পিরামিড বানানো হয়েছে। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞই এ মত প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মত-পিরামিড যত উঁচু হবে, ঢাল তত প্রশস্ত করতে হবে। এভাবে পিরামিডের চূড়া পর্যন্ত পৌঁছতে ১৩ মাইল লম্বা ঢাল বানাতে হবে, যা অসম্ভব। আবার আরেক মতানুসারে, পিরামিড বানানো হয়েছে ধাপে ধাপে চারপাশ দিয়ে ছোট ছোট ঢাল বানিয়ে। অপর একটি মতে, পিরামিডের চারপাশ মাটি দিয়ে ভরাট করে নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়েছে। পরে মাটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বলা বাহুল্য সবকিছুই ধারণা মাত্র। এর প্রকৃত রহস্য অজানা। জানা যায়নি মমি তৈরির রহস্যও। তবে এটা অনুমান করা যায় যে, পিরামিড তৈরির আগে থেকেই মমি তৈরি শিখেছিল মিসরীয়রা। ফারাও রাজবংশের রাজাদের মমি সমাধিস্থ করা হতো পিরামিডের ভিতর। মৃতদেহ দীর্ঘদিন সংরক্ষণে রাখার জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে মমি বানানো হতো। এ কাজে তারা বেশ কিছু রাসায়নিক পদার্থও ব্যবহার করত। আধুনিক বিজ্ঞানীরা এখনো এ রহস্যের কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। তবে কিছু বিষয় ঠিকই অনুমান করা গেছে। বিশ্বজুড়ে মিসরীয় মমি বিখ্যাত হলেও চীন, দক্ষিণ আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মমি খুঁজে পাওয়া গেছে। মমি হলো-কোনো ব্যক্তি বা পশু-পাখির মৃত্যুর পর তার সংরক্ষিত মরদেহ। মানুষ মারা যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে লাশ রাখলে তাতে ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণু আক্রমণ করে। নরম চামড়া নষ্ট করে দেয়। কোনো মরদেহকে মমি করার জন্য সবার আগে সেটিকে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত রাখা প্রয়োজন। সাধারণত পানির উপস্থিতিতেই ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়। সে কারণে মমি করার জন্য মরদেহকে দ্রুত পানিমুক্ত করা হতো যাতে সেখানে ব্যাকটেরিয়া ভিড়তে না পারে। সেটা শুকিয়ে নাকি কেমিক্যাল ব্যবহার করা হতো এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, প্রাচীন মিসরীয়রা মরদেহে এক ধরনের কেমিক্যাল দিয়ে সেটি রোদে শুকাত। এছাড়া ধোঁয়ার মাধ্যমেও পানি শুকিয়ে নিত। এ কাজে তারা বিশেষ ধরনের সুগন্ধিও ব্যবহার করত। মিসরীয়দের বিশ্বাস ছিল, তারা মারা যাওয়ার পর যদি তাদের লাশ মমিতে পরিণত করা হয়, তাহলে পরবর্তী জীবনে শান্তি হবে। আর সেজন্য নিজেকে মমিতে রূপান্তরের ব্যাপারে আগ্রহী হয়েই তারা ক্ষান্ত হতো না, বরং চাইত মৃত্যুর পরও ধন-সম্পদের মাঝে ডুবে থাকার মতো নিরাপদ আশ্রয়। এসব কারণেই মমি প্রক্রিয়াকরণ ছিল ব্যয়বহুল। এরকম সাধ্য-সামর্থ্যও সবার ছিল না। তাই ফারাও রাজা, রানী ও তাদের উচ্চপদস্থ দাপ্তরিক কর্মকর্তাদের মমি প্রক্রিয়া এবং সমাধিস্থ করা হতো জাঁকজমকভাবে।

মমি তৈরি করার পদ্ধতিকে মোটামুটি দীর্ঘমেয়াদি বলা চলে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুগন্ধি কেমিক্যাল দিয়ে একটি দেহ মমি করতে প্রায় ৭০-৮০ দিন লেগে যেত। প্রক্রিয়াটি বেশ কিছু ধাপে সম্পন্ন করা হতো। প্রথমে মরদেহকে ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা হতো। দ্বিতীয় ধাপে দেহের বাম দিকে লম্বালম্বিভাবে চেরা হতো। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নাড়ি-ভুঁড়িগুলো বের করে ফেলে দেওয়া হতো। থাকত শুধু চামড়া আর হাড়গোড়। নাকের ভিতর দিয়ে হুক ঢুকিয়ে মাথার মগজ বের করে ফেলা হতো। এরপর সেটি যত্নসহকারে ব্যাকটেরিয়ারোধক স্থানে শুকানো হতো। পরবর্তীতে দেহের প্রতিটি অঙ্গ আলাদাভাবে গুছিয়ে সরু ফালির মাধ্যমে সোজা করে রাখা হতো। সরু ফালিগুলো লাশের অবয়ব ঠিক রাখার কাজ করত। এরপর এগুলোকে একটি ধারক বা জারে রাখা হতো। মমি করার জন্য চার ধরনের কেনোপিক জার ছিল। এগুলো হলো-কেবিসেনুয়েফ, দুয়ামুটেফ, হেপি এবং ইমসেটি। কেবিসেনুয়েফের উপরে অর্থাৎ মাথার অংশ ছিল বাজপাখি আকৃতির, দুয়ামুটেফ ছিল শিয়ালের মতো, হেপি বেবুনাকৃতির এবং ইমসেটি মানবাকৃতির। মরদেহ কেনোপিক জারে কিছুদিন রাখার পর সুগন্ধি কেমিক্যাল লাগানোর জন্য নির্দিস্ট স্থানে নেওয়া হতো। সেখানে দেহটাকে কাপড় জাতীয় সরু ফালি দিয়ে ভালোভাবে ব্যান্ডেজ করার কাজ করা হতো। ব্যান্ডেজের অনেক ভাঁজ দেওয়া হতো। এসব ভাঁজের ফাঁকে ফাঁকে সুগন্ধি তো থাকতই, পাশাপাশি স্বর্ণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল দেহ অক্ষত রাখা। শরীরের প্রতিটি আঙ্গুলে লাগানো হতো স্বর্ণের ক্যাপ। স্বর্ণ, সুগন্ধি এবং ব্যান্ডেজ করার পর লাশ দিন কয়েক সুরক্ষিতভাবে রেখে দেওয়া হতো। অন্ত্যেস্টিক্রিয়ার সময় গড়িয়ে এলে কেনোপিক জারের ভিতর রাখা দেহকে স্নেডের ওপর রেখে তা টেনে নেওয়া হতো পিরামিড বা এর জন্য নির্বাচিত সৌধে। সেখানে লোকজন জড়ো হয়ে কান্নাকাটি করে ধর্মীয় যাগযজ্ঞের মাধ্যমে বিদায় জানাত মরদেহকে।

এ পদ্ধতিতে মমিকরণকে মিসরীয়রা মনে করত মুখ্য লাভের উপায়। তাই এর চাহিদা ছিল ব্যাপক এবং কিছু নির্দিষ্ট লোক এ প্রক্রিয়াকরণে সবসময় ব্যস্ত থাকত। মানুষ যেমন মারা যেত তেমনি মমিও করা হতো প্রচুর। তিন হাজার বছরে ৭০ মিলিয়নের মতো মমি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাহলে প্রশ্ন উঠে এতসব মমি গেল কোথায়? এর পিছনে দায়ী মানুষের সম্পদের লোভ। বিভিন্ন পিরামিড ও সমাধিসৌধে ঘুরঘুর করত রত্নলোভীরা। তারা সৌধগুলোতে সংরক্ষিত রত্ন লুট করার পাশাপাশি মমির দেহের ব্যান্ডেজ উল্টেপাল্টেও খোঁজ করত স্বর্ণ। হাতের আঙ্গুলে মোড়ানো স্বর্ণও লুট করে নিয়ে যেত। পরবর্তীতে লোপাট হয়ে যাওয়া মমি চ্যাম্বারগুলোর মমি পচে যেতে লাগল ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে। এভাবেই একসময় নিঃশেষ হয়ে যায় সবকিছু। তার চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় চোরেরা মমির গায়ের ব্যান্ডেজগুলো পর্যন্ত খুলে এনে কাগজ তৈরির কাজে ব্যবহার করত। অনেকে আবার মরদেহকে জ্বালানি হিসেবে। এভাবেই ধ্বংস হয়ে যায় মিলিয়ন মিলিয়ন মমি। কিন্তু ফারাও রাজা ও অভিজাতদের মমি সংরক্ষিত ছিল যেসব জায়গায়, সেগুলো ছিল খুব সুরক্ষিত। সেসব স্থানে পেঁৗছার পথ ছিল জটিল এবং ধাঁধায় ভরা। সে কারণেই হাতেগোনা কয়েকটি মমি অক্ষত রয়ে গেছে। মমি রহস্য আর পিরামিডের কারণে এটি মিসরীয় সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসাবে স্বীকৃত। সেই সঙ্গে পিরামিড পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও বিস্ময় জাগানিয়া স্থাপত্য হিসাবে আজ অবধি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

ল্যুভর মিউজিয়াম, ফ্রান্স

0 comments
পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত ইতিহাস জমা হচ্ছে তারই প্রতিচ্ছবি হলো জাদুঘর। পৃথিবীতে কিছু বিখ্যাত জাদুঘর আছে, এগুলোকে দেখার জন্য মানুষ সবসময় মুখিয়ে থাকে। সেগুলো যেমন বিভিন্ন দেশে, তেমনি সবাই এ জাদুঘর দেখার সুযোগটুকু পায় না।

প্যারিসকে বলা হয় অর্ধেক নগরী তুমি অর্ধেক কল্পনা। এ কল্পনা রাজ্যেই রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য জাদুঘর ল্যুভর। ল্যুভর ছাড়াও অবশ্য আরো কিছু বিখ্যাত জাদুঘর ফ্রান্সে রয়েছে। সে কথায় পরে আসছি। এখন শোনো ল্যুভরের কথা।

পৃথিবীর বিখ্যাত জাদুঘরগুলোর মধ্যে প্রথমে নাম বলতে গেলে বলতেই হয় ল্যুভরের কথা। এটি এক সময় দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হত। এক সময় ল্যুভর ফ্রান্সের রাজপ্রাসাদ হিসেবেও ব্যবহার করা হত। কিন্তু বর্তমানে এই জাদুঘরটির সামনে কাঁচের তৈরি পিরামিড বসিয়ে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। তবে এর ইতিহাস কিন্তু এতে একটুও বদলে যায়নি। এ জাদুঘরে প্রাচীন সভ্যতার শুরু থেকে আধুনিক সভ্যতার অনেক কিছুই রাখা আছে।

এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসটি কিন্তু বেশ দীর্ঘ। বিভিন্ন রাজা-রাজরার শাসনকাল পেরিয়ে ষোড়শ লুই একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুসারে ১৭৯৩ সালে তিনি এ জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন। এরপর থেকেই 'ল্যুভর' ধীরে ধীরে শিল্পের প্রাসাদ হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। এখানে সংগৃহীত আছে পৃথিবী খ্যাত বহু ছবি।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত পর্যটকদের কাছে ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ 'দ্য ল্যুভর' । বিখ্যাত চিত্রকর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নাম শুনেছ তো? ওই যে বিখ্যাত 'মোনালিসা' ছবিটি এঁকেছিলেন যিনি। এই শিল্পীর আঁকা মোনালিসাসহ বেশক'টি বিখ্যাত ছবি রাখা আছে ল্যুভরে। তাইতো প্যারিসকে বলা হয় 'মোনালিসার শহর'।

ল্যুভরের তিনটি উইং, ডেনন, সুলি ও রিচেলিউ। এর ফ্লোর রয়েছে চারটি। মোনালিসার অবস্থান ডেনন উইংয়ের দোতলায়। দর্শনীয় বস্তুর স্থাপনা অনুযায়ী নিচতলার ডেনন উইংয়ে রয়েছে ইউরোপীয়, ইতালীয় ও স্প্যানিশ ভাস্কর্য, মিসরীয় পুরাকীর্তি এবং গ্রিক ও রোমান পুরাকীর্তি। সুলি উইংয়ের কিছু অংশে রয়েছে প্রাচ্যের নিদর্শন এবং কিছু অংশে গ্রিক ও মিসরীয় নিদর্শন। রিচেলিউ উইংয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ফরাসি ভাস্কর্যের বিশাল সমাহার।
আমিন রহমান নবাব

হার্ডরক ব্যান্ড ডিপ পার্পল

0 comments
হার্ডরক মিউজিকের ধরনটাই যে ব্যান্ডের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হয়েছিল সে ব্যান্ডটি হচ্ছে ডিপ পার্পল। শুধু এটুকুই নয়, বিশ্বের রক মিউজিকের ইতিহাসে এ ব্যান্ডটির আরো বড় অবদান রয়েছে। ১৯৬৮ সালে বিখ্যাত ব্যান্ড ডিপ পার্পলের যাত্রা শুরু হয়। তখন ইংল্যান্ডের হাইফোর্ডে রাউন্ড এ ব্যাউট নামে একটি ব্যান্ড ছিল। যে ব্যান্ডে ছিলেন জন লর্ড যিনি অর্গান বাজাতেন এবং ছিলেন গিটারিস্ট রিচি ব্ল্যাকমোর। এরপর দি মেইজ নামক একটি ব্যান্ড থেকে ইয়ান পেইস নামের একজন ড্রামার রাউন্ড অ্যাবাউটে যোগ দিলেন ড্রামার হিসেবে। আর সে বছরই রিচির পরামর্শে ব্যান্ডের নাম বদলে নতুন নাম রাখা হলো ডিপ পার্পল। ১৯৬৮ সালে ডিপ পার্পলের প্রথম অ্যালবাম বের হয় যার টাইটেল ছিল 'শেডস অব ডিপ পার্পল'। এ বছরই তাদের ২য় অ্যালবাম 'দি বুক অব তালিয়েসিন'-এর কাজ শেষ হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ অ্যালবামটি ইংল্যান্ডে রিলিজই পায়নি। ১৯৬৯ সালে ডিপ পার্পলের ৩য় অ্যালবামটি বের হয়। আর ঠিক এর পরপরই ভোকালিস্ট হিসেবে ইয়ান গিলান এবং গিটারিস্ট হিসেবে রজার স্লোভোর এ ব্যান্ডে যোগ দেন। এরা দু'জনেই এপিসোড-৬ নামক একটি ব্যান্ড থেকে ডিপ পার্পলে যোগ দেন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় পার্পলের পরবর্তী অ্যালবাম 'ডিপ পার্পল ইন রক' বের হয় এবং এ অ্যালবামটি দারুণ সাফল্য পায়। এর মাঝেই ডিপ পার্পলের জনপ্রিয়তা গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭১-এ রিলিজ পায় ডিপ পার্পলের পরবর্তী অ্যালবাম 'ফায়ারবল'। লেড জেপলিনের পাশাপাশি ডিপ পার্পল ও সত্তরের দশকে হার্ডরক মিউজিককে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে।

১৯৭৩ সালে ডিপ পার্পলের আরেকটি অ্যালবাম বাজারে আসে। সে বছরই হঠাৎ ব্যান্ড ছেড়ে চলে যান স্লোডার ও গিলান। তাদের জায়গায় যোগ দেয় অখ্যাত ভোকালিস্ট ডেভিড কভারডেল ও বেইজিস্ট গ্লেন হিউগস। নতুন নাইন আপে ১৯৭৪ সালে ডিপ পার্পলের নতুন অ্যালবাম 'বার্ন' বের হয়। লাইন আপ চেঞ্জ হবার কোনো প্রভাব অ্যালবামটিতে পড়ে না; বরং অ্যালবামটি বিপুল সাফল্য অর্জন করে। এ বছরই ডিপ পার্পলের 'স্টর্ম ব্রিংগার' নামক অ্যালবাম বাজারে আসে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে রিচি ব্ল্যাকমোর 'ডিপ পার্পল' ছেড়ে 'রেইনবো' নামে নতুন ব্যান্ড গঠন করলেন। ব্ল্যাকমোরের মতো গিটারিস্টকে হারিয়ে ভয়াবহ সমস্যায় পড়ে গেল ডিপ পার্পল। কিন্তু টমি বেলিন ব্ল্যাক মোরের জায়গা দখল করলেন এবং ডিপ পার্পলের পরবর্তী অ্যালবাম 'কাম টেস্ট দি ব্যান্ড'ও ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। ১৯৭৬ সালে হঠাৎ করেই ব্যান্ডটি ভেঙে দেওয়া হলো। এ বছরের ডিসেম্বরেই অতিরিক্ত মাদকাসক্তের কারণে মারা গেলেন বেলিন। এর ঠিক ৮ বছর পর ১৯৮৪ সালে পুনর্জন্ম হলে ডিপ পার্পলের মেম্বার সেই পুরনো লাইন আপের ৫ জনই। ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে রিলিজ পেলো ডিপ পার্পলের নতুন অ্যালবাম 'পারফেক্ট স্ট্রেজারস'। ১৯৯০ সালে বের হলো নতুন অ্যালবাম 'স্লেভস অ্যান্ড মাস্টারস'। অ্যালবামটির মিউজিক ছিল নেইনবো স্টাইলের। যা ভক্তরা একদমই পছন্দ করল না। তারা গিলানকে ব্যান্ডে ফিরিয়ে আনার দাবি করল। একই দাবি তুললেন লর্ড, পেইস এবং স্লোভারও। তাই ব্ল্যাকমোর বাধ্য হলেন টার্নারকে বাদ দিয়ে গিলানকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু তারপরও তাদের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকত। যার ফলে ১৯৯৩ সালে চিরতরে ব্ল্যাকমোরের ব্যান্ড থেকে চলে যাওয়া। তার জায়গায় নেওয়া হলো গিটারের মাস্টার জো স্যাট্রিয়ানিকে। এরপর একেবারে পাকাপাকিভাবে নেওয়া হলো 'স্ট্রিভ মোর্সকে'। মোর্সের কল্যাণেও ডিপ পার্পলের পরবর্তী অ্যালবাম 'পারপেন্ডিকুলারে' বিভিন্ন ধারার মিউজিকের সমাবেশ ঘটল। ২০০২ সালে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের কারণে ব্যান্ড ছেড়ে দিলেন লর্ড। ব্যান্ডে এলেন আরেক কিবোর্ডিস্ট রেইনবো। পাঁচ বছর পর ২০০২ সালে ব্যানানাম নামক নতুন অ্যালবাম বের হয় ডিপ পার্পলের। এ অ্যালবামটি দারুণ প্রশংসিত হয়। এরপর ২০০৫ সালের অক্টোবরে তাদের নতুন অ্যালবাম র‌্যাপচার বের হলো। র‌্যাপচারকেই ডিপ পার্পলের সবচেয়ে প্রগ্রেসিভ অ্যালবাম হিসেবে ধরা হয়। এখনো এ ব্যান্ডটি দাপটের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।

প্রীতম সাহা সুদীপ

পরমাণু ঘড়ি

32 comments
মানুষ সময় মাপার জন্য নানা ধরনের ঘড়ি ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু প্রাচীন যুগের ঘড়িগুলো সঠিক সময় নির্দেশ করতে পারত না। বিজ্ঞানীরা অনেক উন্নত ধরনের ঘড়ি আবিষ্কার করেছেন। এগুলো শুধু সঠিক সময় নির্দেশই করে না, এক সেকেন্ডের শতাংশ মাপতেও সক্ষম। ক'বছর আগে বিজ্ঞানীরা পরমাণু ঘড়ি নামে একটি অতি আধুনিক ঘড়ির উদ্ভাবন করেছেন। এটির আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সময় নির্দেশক ঘড়ির জগতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। এই পরমাণু ঘড়িগুলো এতই সঠিক সময় নির্দেশ করে যে, ৩০ হাজার বছরের মধ্যে মাত্র এক সেকেন্ড সময়ের হেরফের হয়। বর্তমানে তিন প্রকার ঘড়ির প্রচলন আছে। যান্ত্রক, বৈদ্যুতিক এবং ইলেকট্রনিক। যান্ত্রিক ঘড়ি সাধারণ স্পিংয়ের এর সাহায্যে চলে। বৈদ্যুতিক ঘড়ি চলে ক্যাটারির শক্তিতে। ইলেকট্রনিক ঘড়ির শক্তি হলো কোয়ার্টস। এসব ঘড়ি সঠিক সময় নির্দেশ করে বটে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে, বন্ধ হয়ে যায়, নয়তো মন্দগতি অথবা দ্রুতগতি প্রাপ্ত হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গৃহীত সবচেয়ে ক্ষুদ্র সময়ের একক হলো পরমাণু সেকেন্ড। এই মান অনুসারে সেকেন্ডের সময় ১৩৩ সিজিয়ামের পরমাণু কম্পন হয় ৯১৯২৬৩১৭৭০। পরমাণু দ্বারা সৃষ্ট কম্পাঙ্ক পরিমাপক পরমাণু ঘড়িতে ব্যবহার করা হয়। কম্পনের সংখ্যা গণনা করে সময় মাপা হয়। অধিকাংশ পরমাণু ঘড়িতে ১৪০০ থেকে ৪০ হাজার MHZ মাইক্রোওয়েব কম্পাঙ্ক ব্যবহার করা হয়। ১৯৪৭ সালে সর্বপ্রথম অ্যামুনিয়া পরমাণু দ্বারা সৃষ্ট কম্পাঙ্ক ব্যবহার করে পরমাণু ঘড়ি নির্মিত হয়। ১৯৪৭-এ ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যান্ডার্ডে এই ঘড়ি প্রস্তুত করা হয়। ১৯৫৫ সালে সিজিয়াম ধাতু থেকে উৎক্ষিপ্ত পরমাণু কিরণের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁত একটি ঘড়ি টেডিংটনে প্রস্তুত করা হয়। এরপর বিভিন্ন প্রয়োগ শালায় ও রসায়নাগারে সিজিয়াম কিরণ চালিত পরমাণু ঘড়ি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হতে থাকে। সিজিয়াম ঘড়ির সিজিয়াম ধাতুটিকে আগুনে গরম করা হয়। এর ফলে সিজিয়াম কিরণ সৃষ্টি হয়ে একটি এক কোয়ার্টার্স ঘড়িতে ৫ মেগাহার্টস কম্পাঙ্ক বৃদ্ধি করে সিজিয়াম কম্পাঙ্কের সমান মান এনে বিদ্যুৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত করা হয়। ৫ মেগাওয়াট কম্পাঙ্কের কিছু অংশ অন্য একটি ঘড়িকে নিয়ন্ত্রিত করে এবং ঘড়িটি সঠিক সময় নির্দেশ করে।
শামীম রহমান রিজভী

নওশেরার উদ্বাস্তু শিবির

0 comments
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় পাকিস্তানে ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় ১৭ লাখ মানুষ। এর মধ্যে আট লাখ মানুষ সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। ন্যূনতম মাথা গোঁজার ঠাইও হারিয়ে ফেলেছে অনেকে। এ অবস্থায়ও থেমে নেই প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা। দৈনন্দিন কাজের ভিড়ে নওশেরার উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এক তরুণী বন্যার পানিতে গতকাল গোসল সাড়েন

মৌলভীবাজার

0 comments
ঢাকা থেকে ২১০ কিলোমিটার দূরে সিলেট বিভাগের জেলা মৌলভীবাজার। এ জেলার বড়লেখা উপজেলায় রয়েছে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় দুটি জলপ্রপাত। এছাড়াও বেশ কিছু বেড়ানোর জায়গা আছে জেলা শহরের আশপাশে।

মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় রয়েছে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। প্রায় ২৭০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া এ জলপ্রপাত সারা বছরই বহমান থাকে। তবে বর্ষা পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। মাধবকুণ্ড ইকো পার্কের প্রধান ফটক ফেলে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ হাঁটার পরে জলপ্রপাতে এসেই সড়কটি শেষ হয়েছে। জলপ্রপাতের কাছেই একটি খাসিয়া পুঞ্জি। খাসিয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছোট্ট এ গ্রামটি ছবির মতো সুন্দর।

পরীকুণ্ড জলপ্রপাত

মাধবকুণ্ড ঝরণার কিছুটা আগে শিব মন্দিরের বিপরীত দিক থেকে পাথুরে ঝিরি পথটি শেষ হয়েছে পরীকুণ্ড জলপ্রপাতে। এ ঝরণাটির সৌন্দর্য মাধবকুণ্ডের চেয়েও অনেক বেশি। তবে এটি কেবল বর্ষাকালেই প্রাণ ফিরে পায়।

হাকালুকি হাওর

দেশের অন্যতম হাওর হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে অবস্থিত। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পশ্চিম প্রান্তে পড়েছে হাকালুকির একটি অংশ। হাকালুকি হাওরের নামকরণ নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। জানা যায়, বহু বছর আগে ত্রিপুরার মহারাজ ওমর মানিক্যের সৈন্যদের ভয়ে বড়লেখার কুকি দলপতি হাঙ্গর সিং জলমগ্ন এ জায়গায় লুকিয়ে ছিল। এ কারণে এ এলাকার নাম হয় হাঙ্গর লুকি বা হাকালুকি। এরকম আরো একটি কাহিনী হলো- এক সময় বড়লেখার পশ্চিমাংশে হেংকেল নামে এক আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস ছিল। তাদের সে এলাকার নাম ছিল হেংকেলুকি। পরবর্তীতে হেংকেলুকি থেকেই হাকালুকির উদ্ভব হয়।

প্রায় ১৮১ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে অবস্থিত এ হাওরের প্রায় ৭০ ভাগই মৌলভীবাজার জেলাতে। বর্ষায় এ হাওর প্লাবিত হয়ে বিশাল রূপ ধারণ করে। তখন এর গভীরতা থাকে ৬-২০ ফুট। শুষ্ক মৌসুমে হাওরের বেশিরভাগই শুকিয়ে যায়। শুধু হাওরের প্রায় ২৩৮টি বিলে সারা বছরই কমবেশি পানি থাকে।

বর্ষিজোড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল

মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বর্ষিজোড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এর আরেক নাম লাউডগা রিজার্ভ ফরেস্ট। প্রায় আটশো একরেরও বেশি জায়গা জুড়ে বর্ষিজোড়া পাহাড়ের উপর এ বন। এ বনের প্রধান বৃক্ষ শাল।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে রেল ও সড়কপথে মৌলভীবাজার যাওয়া যায়। ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়দাবাদ থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ (০১৭১১৯২২৪১৭), শ্যামলী পরিবহন (০১৭১১৯৯৬৯৬৫), সিলেট এক্সপ্রেস (০১৭১৩৮০৭০৬৯), টি আর ট্রাভেলস (০১৭১২৫১৬৩৭৮) ইত্যাদি বাসে যাওয়া যায় মৌলভীবাজার। ভাড়া নেন এসি বাসে ২৫০ টাকা, টি আর ট্রাভেলসের এসি বাসে ৩৫০ টাকা। ট্রেনে মৌলভীবাজার যেতে হলে নামতে হবে কুলাউড়া স্টেশনে। ঢাকার কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬.৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, দুপুর ২.০০ মিনিটে প্রতিদিন ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ১০.০০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ভাড়া- এসি বার্থ ৫৮১ টাকা, এসি সিট ৩৯৭ টাকা, প্রথম শ্রেণী বার্থ ৩৪৫ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ২৩৫ টাকা, স্নিগ্ধা শ্রেণী ৩৮০ টাকা, শোভন চেয়ার ১৫০ টাকা, শোভন ১৩০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮.১৫ মিনিটে যায় পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এবং শনিবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯.০০ মিনিটে উদয়ন এক্সপ্রেস। ভাড়া প্রথম শ্রেণী বার্থ ৪১৫ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ২৮৫ টাকা, স্নিগ্ধা শ্রেণী ৪৭২ টাকা, শোভন চেয়ার ১৮৫ টাকা, শোভন ১৭০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

মৌলভীবাজারে থাকার জন্য কয়েকটি সাধারণ মানের হোটেল আছে। শ্রীমঙ্গল রোডে হোটেল সোনাগাঁও (০৮৬১-৬৪৬০৭), শহরের কুসুমবাগে হোটেল শেরাটন প্লাজা (০৮৬১-৫২০২০), সাইফুর রহমান রোডে হোটেল হেলাল (০৮৬১-৫২৫৩৫)। এসব হোটেলে প্রতিদিনের রুম ভাড়া ১৫০-৫০০ টাকায় থাকার ব্যবস্থা আছে।

জরুরি প্রয়োজনে

সদর হাসপাতাল: ০৮৬১-৫৩০৩৮, ০৮৬১-৫৩০৮২, ফায়ার সার্ভিস ০৮৬১-৫২১১১, কুলাউড়া থানা: ০৮৬২৪-৫৬০০৩, বড়লেখা থানা: ০৮৬২২-৫৬০১৩।
০০ আলোকচিত্র ও লেখা মুস্তাফিজ মামুন ০০

Saturday, August 28, 2010

বাদামি প্রেতাত্মা রহস্য

0 comments
ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা স্যার রজার টাউনসেন্ট প্রায় ৩০০ বছর আগে জেলা শহর নরফকে থাকতেন। তিনি যখন টাউন সেন্ট প্রাসাদ তৈরি করেন তখন পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে দামিদামি পাথর সংগ্রহ করে এনেছিলেন। পুরো ভবনটিই তৈরি করা হয়েছিল চমৎকার মার্বেল পাথরে। ১৭১৩ সালের ঘটনা। লর্ড টাউনসেন্ট বিয়ে করেন ডরেথি নামের এক অপরূপা সুন্দরীকে। ডরেথি অবশ্য তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন না। তার প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল ডলি। তিনি খুব সুন্দরী ছিলেন কিন্তু টাউনসেন্ট তার প্রথম স্ত্রীকে ভালোবাসতেন না। টাউনসেন্ট তাকে গৃহবন্দী করে রাখেন। ডলি রাজাকে প্রচুর ভালোবাসতেন, স্বামীর জন্য তিনি সব কিছু করতে প্রস্তুত থাকতেন। আর তাই তিনি কখনো স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে আপত্তি করেননি। এদিকে ডরেথি অপরূপা সুন্দরী হওয়ায় তাকে নিয়েও সে সময় প্রচলিত ছিল নানা ধরনের কথা। কথিত আছে লর্ড ওয়ার্টসনও নাকি তার স্বামী ছিলেন। আসলে ডরেথি ছিলেন দুশ্চরিত্রা? আর তাই রাজা তাকেও দেখা শোনার জন্য পাহারার ব্যবস্থা করেন। এভাবেই চলছিল রাজা টাউনসেন্টের সংসার। কিন্তু বড় ঝড় নামে ১৭২৬ সালে, যখন তার প্রথম স্ত্রী মারা যান। বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছা ছিল ডলির, তিনি মৃত্যুকে খুব ভয় পেতেন। তবুও তাকে অকালে মরতে হলো। এ মৃত্যু রাজাও মেনে নিতে পারেননি। তিনি মাঝে মাঝেই আনমনা হয়ে বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে থাকতেন। একদিন রাজা তেমনি করে বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসেছিলেন। হঠাৎ পাশের ঘরে, যেখানে ডলি থাকতেন সেখানে বিকট শব্দ হলে রাজা চমকে গেলেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে পাশের ঘরে উঁকি দিলেন। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলেন না। সব কক্ষ তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলেন তিনি। হঠাৎ দেখলেন কে যেন সিঁড়ি ভেঙে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। হালকা আলো অন্ধকারে মনে হলো তিনি আর কউ নন, নিশ্চয়ই তার প্রথমা স্ত্রীর প্রেতাত্মা। কিন্তু তাকে বাদামি লাগছে কেন? সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতেই রাজা আর কিছু দেখতে পেলেন না। এরপর দীর্ঘদিন ওই কক্ষের দিকে পা বাড়াননি তিনি। ক্রমেই এ খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে কৌতূহলী মানুষ বাসাটি দেখতে আসতে শুরু করে। আর এভাবেই প্রাসাদসহ পুরো এলাকাটি 'রায়হাম হল' নামে পরিচিতি পায়। প্রেতাত্মার এ সত্যকাহিনী বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ক্যাপ্টেন ফ্লেদিক ম্যারিয়টের মনে ব্যাপক দাগ কাটে। কৌতূহল বশত তিনি এক রাত সে প্রাসাদে গিয়ে কাটান। সে রাতে হঠাৎ কার যেন কান্না শুনতে পান তিনি। সব কক্ষ তন্নতন্ন করে খুঁজেও কারো দেখা না পেয়ে তিনি সেদিন বাসায় চলে যান।

পরে আরেকদিন তিনি তার দু বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। গভীর রাতে তারাও কান্নার শব্দ শুনতে পেলে তারা পুরো প্রাসাদ খুঁজতে থাকেন। হঠাৎ দেখেন বাদামি রংয়ের এক নারী একটি কক্ষে বসে কাঁদছেন। আক্রমণের ভয়ে তারা সঙ্গে নিয়েছিলেন গুলিভর্তি পিস্তল। তারা নারীটির কাছে যেতেই তিনি যে কোথায় হারিয়ে গেলেন তা তারা বুঝতেও পারলেন না। এরপর প্রায় শতাব্দীকাল ধরে এ রহস্যটি লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। তারপর ১৯৩৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এটি নিয়ে আবার বিশ্বব্যাপী হইচই পড়ে যায়। ওই নারীকে নাকি আবারো দেখা গেছে। এমনকি তার ছবিও নাকি তোলা সম্ভব হয়েছে। এমনই দাবি করলেন ক্যাপ্টেন প্রোভান্ড ও ইন্দোসিরা নামের দুই ফটো সাংবাদিক। তারা রায়হাম হলে রাতে ছিলেন এই আশায়_ যদি বাদামি রংয়ের ওই নারীর কোনো ছবি তোলা যায়। আর তারা নাকি তা তুলেছিলেনও। সে ছবি নাকি তাদের কাগজে ছাপাও হয়েছিল।
এরপর থেকেই ইংল্যান্ডের রায়হাম হল মানেই বাদামি প্রেতাত্মার পিশাচ বলে মনে করেন অনেকেই।

প্রীতম সাহা সুদীপ

ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম

22 comments
উপমহাদেশের প্রাচীনতম জাদুঘর হিসেবে ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম ইতিহসে অমর হয়ে আছে। ১৮১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এশিয়াটিক সোসাইটি অঙ্গনে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম জাদুঘরটি কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। যার নাম ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম। প্রথমদিকে এশিয়াটিক মিউজিয়াম হিসেবে পরিচিত এ জাদুঘরটি পরবর্তীকালে ইমপেরিয়াল মিউজিয়াম নামে পরিচিতি লাভ করে এবং উপমহাদেশের মধ্যে এ শ্রেণীর সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আর যাত্রা শুরুর সময় থেকেই সংগ্রহ, বিন্যাস, প্রসার-বহুমাত্রিক পর্যায়সমূহ ফলপ্রসূভাবে অতিক্রম করেছে। প্রায় আট হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ জাদুঘরটিতে শিল্পকলা, প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্য_ এ ছয়টি ভাগে মোট ষাটটি গ্যালারিতে সুসজ্জিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। বহুমুখী এ প্রতিষ্ঠানের রয়েছে নানাবিধ সুশৃক্সখল কার্যক্রম। এর ফলে ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে একে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৮৬৬ সালে ভারতীয় জাদুঘর অধ্যাদেশ-১৭, ১৮৬৬-এর অধীনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্ব ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম নামে একটি কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। যা পরবর্তীকালে ইন্ডিয়ান ভারতীয় জাদুঘর অধ্যাদেশ-১০, ১৯২০ দ্বারা সংশোধন করা হয়। বর্তমানের ভিক্টোরিয়ান সৌধটির ভিত্তি স্থাপন করা হয় ১৮৫৭ সালে এবং ১৮৭৫ সালে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এর স্থপতি ছিলেন ডবি্লউ এল গ্র্যানভিল। জাদুঘরটি ১৮৭৮ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে প্রাক ও আদি ঐতিহাসিক, মৌর্য, সাতকাহন, গান্ধার, কুষান, গুপ্ত, পাল, সেন, চন্ডেল, হোয়সলা ও ঢোল যুগীয় শিল্পের গ্যালারিগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য বহুযুগের প্রাচীন নিদর্শনের সংগ্রহও রয়েছে। একটি বিশেষ গ্যালারিতে রয়েছে মিসরীয় প্রাচীন নিদর্শনের একটি সংগ্রহ, যার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে একটি মমি। এছাড়াও রয়েছে সংস্কৃত, প্রাকৃত, আরবি, ফারসি, উর্দু ও বাংলা ভাষার শিলালিপি, পাণ্ডুলিপি ও সিলমোহর। ভারতীয় প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও আধুনিককালের মুদ্রাসমূহ কয়েকটি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে। শিল্পকলা শাখায় ভারতীয় চিত্রকলা, বস্ত্রশিল্প ও অলঙ্কার সামগ্রীর পাশাপাশি নেপাল, তিব্বত, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা এবং ইরানের শিল্পসামগ্রীও প্রদর্শিত হয়। নৃতত্ত্ব শাখায় প্রত্ন-নৃতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের বিভাগ এবং সঙ্গেই রয়েছে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সজ্জিত গ্যালারি। জুওলোজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া, জিওলোজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া ও বোটানিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া কর্তৃক পরিচালিত বিজ্ঞান শাখার অনেক গ্যালারি রয়েছে। প্রাণিবিদ্যার গ্যালারিগুলোতে কীটপতঙ্গ, মাছ, উভচর প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রদর্শিত হয়। অর্থকরী উদ্ভিদ শাখায় ভেষজ গাছ-গাছড়া, উদ্ভিজ্জ তন্তু, রঞ্জক উদ্ভিদ, আঠা ও রেসিন, দারু, তেল ও তৈল বীজের সংগ্রহ রয়েছে। ভূতত্ত্ব বিভাগের সংগ্রহ পাঁচ ভাগে বিভক্ত_ সিওয়ালিক জীবাশ্ম, ভূপৃষ্ঠ ও উল্কাপিণ্ড, প্রস্তর ও খনিজ, অমেরুদণ্ডী ও মেরুদণ্ডী প্রাণীর জীবাশ্ম। জাদুঘরের পরিচালনায় আটটি সমন্বয়কারী কার্যকরী কমিটি রয়েছে। যথা শিক্ষা, উপস্থাপন, প্রকাশনা, সংরক্ষণ, ফটোগ্রাফি, মেডিকেল, মডেলিং ও গ্রন্থাগার। এসব কমিটি জাদুঘর ও পরিদর্শকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ভিত্তিতে ভিডিও ও মুদ্রিত তথ্য প্রকাশ, প্রতিমূর্তি তৈরি, জাদুঘরের জিনিসপত্রের পরিচর্যা, গণসংযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা কার্যক্রমের দিকে সামগ্রিকভাবে লক্ষ্য রাখে। এছাড়াও জাদুঘরের অভ্যন্তরীণ বক্তৃতা, সেমিনার, প্রদর্শনী এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জাদুঘর কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক আন্তঃদেশীয় ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর মতো বহির্মুখী কার্যক্রম বৃদ্ধি করছে।।
শামীম রহমান রিজভী 

মুখোশচিত্র

0 comments
বাংলার লোক কারুশিল্পের ইতিহাসের এক অনন্য শৈল্পিক অংশ মুখোশচিত্র। সামাজিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান সম্পদও বটে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, 'দেশের লোকসংস্কৃতির মধ্যে অতীত যুগের সংস্কৃতির বহু নিদর্শন আজ সংযুক্ত আছে, সেগুলোর অন্যতম মুখোশচিত্র। এটি আমাদের জাতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার মূল্যবান উপকরণ'। মানবসমাজের মুখোশচিত্র-সম্পর্কিত শিক্ষার তথ্য ও তত্ত্বসংবলিত বিষয়কে সাধারণ অর্থে মুখোশচিত্রের ইতিহাস বলা হয়। মুখোশচিত্র গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সৃষ্টি। চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত মুখোশ মুখে লাগিয়ে মঞ্চে অভিনয় ও পূজা-পার্বণে নৃত্য পরিবেশিত হয়। যেকোনো অনুষ্ঠানে নৃত্য-অভিনয়ের সঙ্গে মুখোশের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নানাভাবে মুখোশের আবির্ভাব ঘটে। বাংলাদেশের গ্রামের বিভিন্ন মেলায় বা যাত্রানুষ্ঠানে, চৈত্র-সংক্রান্তিতে নৃত্যের আয়োজন হতো, সেই মেলায় বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পসরা সাজানো হতো নানা ধরনের মুখোশ দিয়ে। ধরনের মুখোশ আছে যেগুলোকে খেলনাজাতীয় মুখোশ বলা যেতে পারে। আবার অনেক মুখোশ আছে যা নৃত্য, অভিনয় এবং পূজা-পার্বণে ব্যবহার করা হয়। মুখোশচিত্রের প্রতিটি শিল্পীই তাদের তৈরি মুখোশকে সামান্য রদবদল করে বিভিন্ন চরিত্র সৃষ্টি করে। যেমন_ বাঘ, ভালুক, বানর, দেবদেবী ইত্যাদি। আর এসবই শিল্পীর হাতের সৃষ্ট কলাকৌশল।

অদৃশ্য ও কল্পিত বিষয়কে মুখোশে প্রকাশ করা হয় যা মঙ্গল বা অমঙ্গল বাচক ঐন্দ্রিজালিকতা সৃষ্টির জন্য মুখোশচিত্রকে ৭টি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। পৌরাণিক মুখোশ, লোকায়ত মুখোশ, গ্রামীণ মুখোশ, প্রাণী মুখোশ, সামাজিক মুখোশ, মিশ্র মুখোশ এবং অন্যান্য মুখোশ। লোকজ আচার-অনুষ্ঠানে লোকনৃত মুখোশের ব্যবহারের মূলে রয়েছে আবহমান গ্রাম-বাংলার নর-নারীর নানা অভিব্যক্তি যেমন_ বীরত্বব্যঞ্জক, কামভাব বা সম্মোহন ভাবের প্রকাশ। এছাড়া নানা কুপ্রভাব দূরীকরণে লোকসমাজের যুগ-যুগান্তরের সংস্কার ও বিশ্বাস অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠানে বিভিন্ন লোকনৃত্য প্রভৃতি ছাড়াও বিভিন্ন কাজে মুখোশচিত্র তৈরি হয়েছে।

মুখোশ সামাজিক বা ধর্মীয় ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও শক্তি সাধনার স্বরূপের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাছাড়া লৌকিক ও পৌরাণিক গল্পসমূহ হাসি-তামাশা, বিদ্রুপ ভয়ভীতির জন্যও মুখোশ মুখে লাগিয়ে নৃত্য এবং অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান। সভ্যতার আদি স্তরে শক্তিকে বশ করার প্রয়োজনে ও পরে সামাজিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শিশুদের খেলনা হিসেবেও মুখোশচিত্র ব্যবহার হয়। এখন প্রশ্ন আসে মুখোশচিত্রের উৎপত্তি হলো কিভাবে। মানুষের আদিযুগের বর্বর দশা থেকেই তার লোক কারুশিল্পে মুখোশ তৈরির কৌশল শিক্ষার সূত্রপাত। নৃতত্ত্ববিদ, পুরাতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের প্রচেষ্টায় আদিযুগের মানুষেরা প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করার অদম্য ইচ্ছায় বুদ্ধির সাহায্যে নানা উপায় ও কৌশল আবিষ্কার করেছিল এবং এই কৌশলগুলো তারা তাদের পূর্ব পুরুষদের শিখিয়ে দিত। সম্ভবত লোক কারুশিল্পে এভাবেই বংশানুক্রমে মুখোশচিত্রের উৎপত্তি হয়েছিল।

বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই লোক কারুশিল্পের মুখোশের প্রচলন ছিল। ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, বগুড়া, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলে আজো কিছু কিছু মুখোশের প্রচলন কোনোরকম টিকে আছে। এসব অঞ্চলের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবসহ অন্যান্য মেলা পার্বণে মুখোশ পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীরা বৈশাখের উৎসবে বিভিন্ন মুখোশচিত্র তৈরি করে শোভাযাত্রা সহকারে বাংলা বর্ষবরণ উদযাপন করে।

মুখোশ কাঠ, কাগজ, মাটি, বেত, শোলা ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে। মুখোশ তৈরিতে লাল, নীল, হলুদ, এবং কালো রং প্রধান। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মালাকার, পাল, কুমার, আচার্য এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্পী মুখোশ তৈরি করে থাকেন। মুখোশ তৈরি করতে গ্রাম-বাংলার দেবদেবীর মুখাকৃতি এবং বিভিন্ন ধরনের পশুপ্রাণীর মুখের মতো তৈরি করে যা ডাইস বা ছাপ হিসেবে পরিচিত, তার ওপর মুখোশের কাঠ ও বেত তৈরি করে নিতে হয়। পরে এগুলো শিল্পীরা হাতে টিপে টিপে দেবদেবীর কিংবা পশু আকৃতির মুখোশ তৈরি করেন। যেমন_ মুণ্ডু মূর্তির মুখোশ, বড়াম চণ্ডীর মুখোশ, বড়খা গাজীর মুখোশ, ধর্ম ঠাকুরের মুখোশ, সত্য নারায়ণ ও সত্য পীরের মুখোশ, পীর গোড়া চাঁদের মুখোশ, ওলা বিবির মুখোশ, ভৈরবের মুখোশ, ঘাটু দেবতার মুখোশ, মানিক পীরের মুখোশ ইত্যাদি।

রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার সুশান্ত পাল। নওগাঁ আত্রাইয়ের নয়ন মালাকার, বিশ্বনাথ মালাকার, মাগুরার শালিখা উপজেলার শংকর মালাকারসহ কয়েকজন মুখোশচিত্র শিল্পীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তারা মুখোশচিত্র ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের প্রয়োজনে তৈরি করেন। তারা এই মুখোশচিত্র তৈরি করতে মাটি, কাগজ ও শোলার দ্বারা বংশানুক্রমে মুখোশচিত্র তৈরি করার কৌশল শিখেছেন। তারা বলেন, 'আজ কোনোরকমে আমরা টিকে আছি। এই শিল্পটি হারিয়ে যেতে বসেছে'।

আসলেই মুখোশচিত্র এখন লুপ্তপ্রায়। মুখোশচিত্রের শিল্পীরা এখন কালের বিবর্তনের সঙ্গে মুখোশচিত্রের পাশাপাশি তৈরি করেছেন শোলার আধুনিক কাজ এবং শখের হাঁড়িসহ অন্যান্য কাজ। তার কারণ মুখোশচিত্রের আর আগের ঐতিহ্য নেই। কিছু একটা করে তো তাদের চলতে হবে। তবুও তারা অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে এ মুখোশচিত্রটিকে ধরে রেখেছে। আমাদের লোক কারুশিল্পে মুখোশচিত্রের সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রদর্শন শুধু জাদুঘরে কিংবা বিভিন্ন মেলা উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে এ কাজে জড়িত শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এ শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব।
হাসান মাহমুদ রিপন

Friday, August 27, 2010

ঢাকার রেকর্ড সংখ্যক শিলালিপি প্রকাশ, বঙ্গ নিয়ে গবেষণায় ট্রাস্ট ফান্ড হচ্ছে

0 comments
ঢাকা: রাজধানী ঢাকার অলি-গলি ঘুরে খুঁজে পাওয়া নতুন ৫৪টি প্রাচীন শিলালিপি প্রকাশ করেছে ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি।

শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকার শিলালিপি’ শীর্ষক প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। একই অনুষ্ঠানে ‘প্রাচীন বঙ্গ নিয়ে গবেষণায় যৌথ উদ্যোগে ট্রাস্ট ফান্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন অর্ধশতাধিক চিত্রশিল্পী, ভাষাবিদ, শিক্ষক, আলোকচিত্রী, স্থপতি ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী পণ্ডিতরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮৭২ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ঢাকার মোট ২১টি শিলালিপি বিভিন্ন সাময়িকী ও বইতে প্রকাশিত হয়। কিন্তু স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত গত দু’ছরের জরিপে ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি আরবি ও ফারসি ভাষার আরও ৫৪টি নতুন শিলালিপির সন্ধান পায়। এছাড়া পর্তুগিজ, ল্যাটিন, আর্মেনীয় ও ইংরেজী ভাষার ১২ এপিটাফও খুঁজে পায় তারা।

আলোকচিত্রী পাভেল রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে ’ঢাকার শিলালিপি’ প্রতিবেদনটির মোড়ক উন্মোচন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক। প্রতিবেদন পাঠ করেন জাকারিয়া মন্ডল।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির আহবায়ক জয়ীতা রায়। অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে প্রাচীন বঙ্গ বিষয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে ’ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন শিল্পী সাহাবুদ্দিন আহমেদ। ঘোষণা পত্র পাঠের পরপরই আদি কাঠামো ভেঙ্গে ফেলা ইসলাম খাঁ মসজিদের চিত্রকর্ম ঢাবি উপাচার্যের হাতে তুলে দেন ভাস্কর রাশা।

আগেই জমা পড়ে চন্দ্রশেখর দে, আবদুস সাত্তার, ফরিদা জামান, সাঈদা কামাল, রণজিৎ দাশ, রোকেয়া সুলতানা, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, নাইমা হক, বীরেন সোম, আইভি জামান, কেজি মুস্তাফা, আনিসুর রহমান, হামিদুজ্জামান খান ও মামুন কায়সারের চিত্রকর্ম।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, প্রতœত্ত্ববিদ আকম যাকারিয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রফেসর এমিরিতাস’ এবিএম হোসেন, স্থপতি মীর মোবাশ্বের আলী, স্থপতি শামসুল ওয়ারেস, ফারসি ভাষাবিদ অধ্যাপক কুলসুম আবুল বাশার, চিত্রশিল্পী সমর জিৎ রায় চৌধুরী ও সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু।

এ সময় এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান আবু সাঈদ এম আহমেদ, টাকার নকশাকারক কেজি মুস্তাফা, চিত্রশিল্পী নাইমা হক, চিত্রশিল্পী লালারুখ সেলিম, ইংরেজী অনুবাদক অধ্যাপক ফখরুল আজম, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের পরিচালক সুবীর চৌধুরী, স্থপতি রফিক আযম, ফরিদ উদ্দিন খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদনে ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির জরিপে খুঁজে পাওয়া ৮টি শিলালিপির ফটোকপি ছাপানোর দায়ে অভিযুক্ত করা হয় পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ইউসুফ সিদ্দিক ও জাতীয় জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক ড. এম এনামুল হককে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনুবাদের জন্য অনুবাদকদের কাছে সরবরাহ করা কিছু শিলালিপির ফটোকপি ছাপা হয়ে যাওয়ায় ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটিকে তড়িঘড়ি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়েছে। ঢাবি’র পৃষ্ঠপোষকতায় কমিটি শিগগিরই ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক ছয়টি গ্রন্থ প্রণয়ন করবে। যার কপিরাইট দেওয়া হবে ঢাবিকে।

উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক তার বক্তব্যে ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক তথ্য উপাত্ত নথিবদ্ধকরণের সঙ্গে জড়িত সকলকে ধন্যবাদ জানান। তরুণ প্রজন্ম নির্দেশনা পেলে অসাধারণ কিছু করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

উপাচার্য আরও বলেন, ‘৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এখন আমরা আবার ইতিহাসের দিকে যাচ্ছি।’

অধ্যাপক এবিএম হোসেন বলেন, ‘ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি শিলালিপি খোঁজার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। কিন্তু তাদের পরিশ্রমে সংগৃহীত শিলালিপির চুরি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’
রাজিব ত্রিপুরা, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম.বিডি

Thursday, August 26, 2010

বার্ড ফ্লু

0 comments
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের তিনটি ধরন আছে। এগুলো হচ্ছে ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’। ‘এ’ টাইপের ভাইরাস প্রকৃতিতে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে আছে। উড়ন্ত পাখি, হাঁস-মুরগি, ঘোড়া, বিড়াল ও মানুষে ভাইরাস ‘এ’ বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত করা হয়েছে। অপর দু’টি টাইপ ‘বি’ ও ‘সি’ কেবল মানুষে পাওয়া যায়। আমাদের দেশে পোল্ট্রিতে যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে আছে সেটি ‘এ’ শ্রেণীভুক্ত। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয়। এটি মানুষকেও সংক্রমিত করতে পারে। ১৮৭৮ সালে ইতালিতে সর্বপ্রথম উচ্চ রোগ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়।

আচেহ দ্বীপ

0 comments

আচেহ হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার একটি প্রদেশ। এটি উত্তর সুমাত্রার একটি দ্বীপ। এর রাজধানী বান্দা আচেহ। তেল, গ্যাস, তামা, রাবারসহ প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিপূর্ণ এ প্রদেশ হতে ইন্দোনেশিয়ার মোট জাতীয় উৎপাদনের ৩০ ভাগ আসে এ প্রদেশটির তরল গ্যাস হতে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ প্রদেশটির জনগণ দরিদ্র। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সুকর্নার শাসনামল থেকে এ প্রদেশটি স্পেশাল জোনের মর্যাদা ভোগ করে আসছে। কিন্তু এখানকার জনগণ পূর্ণ স্বায়তশাসনের জন্য সংগ্রাম করে আসছে দীর্ঘদিন হতে। ‘ফ্রি আচে আচেহ মুভমেন্ট’ নামক একটি সংগঠন এ সংগ্রাম পরিচালনা করে আসছে। সুহার্তোর পদত্যাগের পর আচেহ প্রদেশের জনগণ আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের জন্য বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং এ বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য ১৯৯৯ সালের ৪ ডিসেম্বর স্বাধীনতার ঘোষণার হুমকি দেয়। ইন্দোনেশিয়ার সরকার স্বাধীনতার দাবি প্রত্যাখ্যান করে। তবে সেখানে স্বায়ত্তশাসন প্রদানের বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নমনীয় মনোভাব পোষণ করে।

পৃথিবীর প্রথম সংবাদপত্র

0 comments
পৃথিবীর প্রথম নিয়মিত সংবাদপত্র আমাদের আজকের সংবাদপত্রের মতো ছিল না। প্যাপিরাসের পাতায় হাতে লেখা সংবাদ তখন পৌঁছত গ্রাহকদের হাতে হাতে, যাদের মধ্যে গ্রামে বসবাসকারী লোক যেমন ছিল তেমনি ছিল পর্যটকরা, যারা নিজ দেশের খবরাখবর জানতে চাইত। এ ধরনের নিয়মিত পত্রিকা সম্ভবত গ্রিক ভাষাতে সর্বপ্রথম হেলেনিস্টিক সময়ে (৩২৩ খ্রি.পূ.) নগরকেন্দ গুলোতে যেমন- আলেকজান্দি য়ায় প্রকাশিত হতে শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে ল্যাটিন ভাষায় লিখিত এ জাতীয় সংবাদপত্র রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশিত হতে থাকে। এটি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে শুরু হয়ে খ্রিস্টীয় প্রথম শতক পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিদিনের খবর (Diunna) নামে দৈনন্দিন খবর পরিবেশনার পাশাপাশি সিনেটের কার্যবিবরণী কোর্টের মামলা, অফিসিয়াল ঘোষণাসমূহ জন্ম-মৃত্যুর খবর, আর্থিক রিপোর্ট, খেলাধুলার খবর এমনকি সাহিত্যকর্মও প্রকাশ করা হতো। এটিই প্রথম পত্রিকা যেখানে সাংবাদিক ও সম্পাদসহ একদল স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করত।

আলজেরিয়া

47 comments
উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় ভূমধ্যসাগরের ওপর অবস্থিত। আফ্রিকা মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র হলো আলজেরিয়া। দেশটি নয়-দশমাংশ জুড়ে সাহারা মরুভূমি অবস্থিত। দেশটির দক্ষিণে সাহারা মরুভূমির অবস্থানের জন্য এখানকার জলবায়ুতে মরুভূমির প্রভাব লক্ষ করা যায় অন্যদিকে উত্তরে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর পরিলক্ষিত হয়।

নামকরণের ইতিহাস

আলজেরিয়া নামটি এসেছে ‘আলজিয়ার্স’ থেকে। আলজেরিয়ার আরবি নাম আলজাজাইর অর্থাৎ দ্বীপসমূহ, নামটি রাজধানী সংলগ্ন দ্বীপগুলোকে নির্দেশ করছে। বনিয়াদি যুগে আলজেরিয়ার উত্তরাংশ নুমিডা নামে পরিচিত ছিল।

ঐতিহাসিক পটভূমি

এক হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই অঞ্চলে ফিনিশীয় বণিকরা বসতি স্থাপন করেছিল। পরবর্তী অঞ্চলটি রোমের অধিকারে চলে যায়। ৫ শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ভ্যান্ডাল ও বাইজেন্টাইন সাম্র্যাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসে এ অঞ্চলটি। ৭ শতকে এখানে মুসলিম অভিযান পরিচালিত হয়। ৭১১ সালে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা উমাইয়া খিলাফতের অধিকারে চলে আসে। পরবর্তী সময়ে নানা উপজাতি গোষ্ঠীর আক্রমণ হয়েছে আলজেরিয়াতে। ১৮৩০ সালে দেশটি ফ্রান্সের অধিকারে চলে আসে। প্রায় এক শতাব্দীর অধিককাল দেশটি ফ্রান্সের শাসনাধীন থাকার পর ১৯৬২ সালে আলজেরিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর নির্বাচনে প্রাথমিক ইসলামিক মুক্তি ফ্রন্টের বিপুল সাফল্য অর্জিত হয়। এমতাবস্থায় দেশটিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ঘটে এবং পরবর্তীতে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায় এবং ইসলামিক মুক্তিফ্রন্টে ফাটল দেখা যায়। ইসলামি মুক্তিফ্রন্টের বিভিন্ন সশস্ত্র শাখা ২০০০ সালের জানুয়ারি মাসে ইসলামি মুক্তিফ্রন্ট থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং অনেক সশস্ত্র সেনা জাতীয় সংহতির প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আওতায় আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু এরপরও দেশটিতে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, বাসস্থান জনিত সমস্যা, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ইত্যাদি বিষয়গুলো দেশটিতে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

অবস্থান ও আয়তন

৩৬০৪র্২ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৩০১র্৩ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। দেশটির উত্তরে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণে সাহারা মরুভূমি, দক্ষিণ-পূর্বে নাইজার, পূর্বে লিবিয়া, উত্তর-পূর্বে তিউনেশিয়া, পশ্চিমে মরক্কো, আর দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে মরক্কো, পশ্চিমে দক্ষিণ মরক্কো। আলজেরিয়ার দক্ষিণে সাহারা মরুভূমি রয়েছে। দেশটির আয়তন প্রায় ২৩,৮১,৭৫১ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম দেশ।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা

দেশটিতে ৪৮টি প্রদেশ আছে।

উচ্চতম ও নিশুতম স্থান

দেশটির উচ্চতম স্থান হচ্ছে মাউন্ট তাহাত, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯,৫৭৩ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এবং নি¤œতম স্থান হচ্ছে ছট মেলরহির, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০৭ ফুট উঁচু।

জলবায়ু

আফ্রিকায় অবস্থিত এই দেশটির জলবায়ু শুষ্ক থেকে আংশিক শুষ্ক। শীতকাল আর্দ্র ও আরামদায়ক। তবে কিছুটা গরম থাকে। গ্রীষ্মকাল শুষ্ক। উচ্চ মালভূমি অঞ্চলে শীতকাল শুষ্ক ও ঠাণ্ডা এবং গ্রীষ্মকাল উত্তপ্ত। গ্রীষ্মকালে উত্তর-আফ্রিকার মরুভূমিতে উত্তপ্ত ধূলিঝড় প্রবাহিত হয়।

প্রধান নদী

ছেলিফ।

প্রাকৃতিক সম্পদ

পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস, লৌহ, ফসফেট, ইউরেনিয়াম, সীসা, দস্তা।

এক নজরে

রাষ্ট্রীয় নাম: পিপলস ডেমোক্রাটিক রিপাবলিক অব আলজেরিয়া। রাজধানী: আলজিয়ার্স। জাতীয়তা: আলজেরিয়ান। আয়তন: ২৩,৮১,৭৫১ বর্গ কিমি। আন্তর্জাতিক সীমান্ত: স্থলসীমান্ত ৬৩৪৩ কিমি এবং সমুদ্র উপকূলীয় ভূমি ৯৯৮ কিমি। জনসংখ্যা: ৩ কোটি ৪৯ লাখ। ধর্ম: মুসলমান ৯৯ ভাগ, ও ইহুদি ১ ভাগ। মুদ্রা: দিনার, স্বাধীনতা লাভ: ৫ জুলাই ১৯৬২ (ফ্রান্সের নিকট থেকে), জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ: ৮ অক্টোবর ১৯৬২, জাতীয় দিবস: ১ নভেম্বর, ভাষা: আরবি, সরকার পদ্ধতি: রাষ্ট্রপতি শাসিত, সরকার প্রধান: রাষ্ট্রপতি।

প্রাচ্যের ভেনিস বরিশাল

0 comments
দক্ষিণাঞ্চলে অসংখ্য পুরাকীর্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই ছিল দেব-দেবীর মূর্তি, দীঘি, দুর্গ, তাম্রলিপি ও মুদ্রা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাকলা-চন্দ দ্বীপের অনেক পুরনো কীর্তিই ধবংস হয়ে গেছে ঘূর্ণিঝড় ও নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, চতুর্থ শতকে রাজা চন্দ বরমা চন্দ দ্বীপ জয় করে একটি বিরাট দুর্গ নির্মাণ করেন। এই দুর্গটির অবস্থান ছিল কোটালীপাড়ায়। মাটির দুর্গটি ১৫ থেকে ৩০ ফুট উঁচু এবং দুই মাইল লম্বা। ৩১৫ খ্রীষ্টাব্দে এটি নির্মাণ করা হয়। ১৫০৮ খ্রীষ্টাব্দে ভূমি জরিপের সময় কোটালীপাড়ায় ঐ দুর্গের কাছাকাছি বেশকিছু স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যায়। এছাড়া বেশকিছু তাম্রলিপি উদ্ধার হয়। তাম্রলিপিগুলোর মধ্যে ঘুঘ্রাহাটি বা ঘাগরকাঠি তাম্রশাসন তাৎপর্যপূর্ণ। ষষ্ঠ শতকে চন্দ দ্বীপ-বাকলার দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ ছিল সমৃদ্ধশালী জনপদ। দশম শতকের রাজা শ্রী চন্দে র ৫ খানা তাম্রশাসনের মধ্যে তিনখানা প্রাচীন চন্দ দ্বীপে পাওয়া যায়। এগুলো হলো ধুলিয়া, কেদারপুর ও ইদিলপুর তাম্রশাসন। ধুলিয়া ও কেদারপুর বর্তমানে ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত। আর কোটালীপাড়া গোপালগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। এছাড়া উজিরপুর থানার শিকারপুরে ১০১৫ খ্রীষ্টাব্দে রচিত একটি তালপাতার পুঁথি পাওয়া যায়। তাম্রশাসনে গৌরনদী থানার রামসিদ্দি, বাঙ্গালা ও ঝালকাঠী থানার নৈকাঠী ও চন্দ দ্বীপের নাম উল্লেখ ছিল। রামসিদ্দি ও বাঙ্গালা গ্রাম দুইটি ছিল পাশাপাশি। ১৩ শতকের এ তাম্রশাসনে ব্রাহ্মণকে ভূমিদানের ও চন্দ ভণ্ড জাতি শাসন ও মন্দির নির্মাণের কথা উল্লেখ আছে।
চতুর্থ থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত বাকলা-চন্দ দ্বীপে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে। তখন সংঘারাম বৌদ্ধ মন্দির ও বেশ কিছু বৌদ্ধ মন্দির স্থাপিত হয়। মূলত পাল ও সেন আমলে চন্দ দ্বীপ (বরিশালের আদি নাম) উন্নত জনপদ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। তখন বাঙ্গালা, রামসিদ্দি, মাহিলারা, ফুলশ্রী, গোবরধন, বাটাজোর, চন্দ হার, শিকারপুর, বাগদা, নলচিড়া, বাকাল, বাকাই, লক্ষণকাঠী, আগৈলঝাড়া, নৈকাঠী, রুনশি, বাইশারী, নথুল্লাবাদ, রাজাপুর, ইদিলপুর, গোবিন্দপুর ও লতা প্রসিদ্ধ স্থান হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। এই স্থানগুলোতেই ছিল নানা প্রাচীন কীর্তি। কালের বিবর্তনে পুরনো কীর্তি তো দূরের কথা, অনেক এলাকার অস্তিত্বই নেই। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ছাড়াও নদী ভাঙ্গনে হারিয়ে গেছে এসব পুরাকীর্তি। এক সময়ে যেখানে ছিল রাজাদের দালানকোঠা, সেখান দিয়ে এখন চলছে বড় বড় জাহাজ।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ফুলশ্রী গ্রামে রাজবংশের ৭ জন রাজকুমারের নামে ৭টি দীঘি ছিল। সুপরিকল্পিতভাবে সুপেয় পানির জন্য খনন করা হয়েছিল এ দীঘিগুলো। এখন তার অস্তিত্ব নেই। অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। নরসিংহের দীঘিতে ঘাটলা পাওয়া গিয়েছিল স্বাধীনতার আগে। এখন সেখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। মাহিলাড়ার রুদ্র সেনের বাড়ি ও দীঘি এখন শুধুই ইতিহাস। রাজাপুর থানার নিকট স্বাধীনতার পূর্বে পুকুর খনন করতে গিয়ে মাটির নীচে টালী ইটের নির্মিত প্রশস্ত দেয়াল পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদগণের মতে এসব স্থাপনা সেন আমলের তৈরি। পাল ও সেন আমলের মূর্তিগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ধবংস হয়ে গেছে। চুরি হয়ে গেছে অনেক পুরাকীর্তি। মাধবপাশার দলুজমর্দন সুগন্ধা নদীতে কাইত্তাইনি মূর্তি পেয়েছিল। দুইটি মূর্তি মাধবপাশার রাজবাড়িতে রাখা হয়েছিল। রাজপরিবার ৫শ’ বছর ধরে ঐ মূর্তি পূজা করত বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। এখন মূর্তিও নেই রাজা কিংবা রাজ্যও নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঐ মূর্তি দুইটি উধাও হয়ে যায়। পরবর্তীতে পুলিশ একটি মূর্তি উদ্ধার করে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে পাঠায়। শিকারপুর থেকে উদ্ধার করা তারা মূর্তিটি ছিল ভারতবিখ্যাত। তখন ঐ মূর্তিকে কেন্দ করে শিকারপুর তীর্থ স্থানে পরিণত হয়েছিল। দেবীর সেবায়েতের নিজ হাতে লেখা প্রাচীন পুঁথি থেকে জানা যায়, শ্রী গঙ্গাবতী চক্রবর্তী সুগন্ধা নদীতটে পাষাণময়ী তারামূর্তি ও শিবলিঙ্গ প্রাপ্ত হন। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে আটিপাড়া গ্রামের একদল মুসলমান ঐ মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলে। পরে সেখানে একটি কালি মূর্তি স্থাপন করা হয়। সেই মূর্তিটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ভেঙ্গে ফেলে। মূর্তির সাথে প্রাপ্ত শিবলিঙ্গ তারা মন্দিরে এখনো সংরক্ষিত আছে। শিকারপুরে ধবংসপ্রাপ্ত তারা মূর্তিটি সপ্তম শতকে স্থাপন করা হয়েছিল বলে সেবায়েতরা দাবি করেন। দক্ষিণাঞ্চলের বহু পুরনো মূর্তি, মন্দির ও পুরনো মুদ্রা এভাবেই বিলীন হয়েছে। প্রাচীন বাড়িগুলো বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে। এখন প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর যেসব পুরাকীর্তি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছে তা ততটা পুরনো আমলের নয়।
০০ লিটন বাশার

বাংলাদেশের নৌকা

20 comments
নদীমাতৃক এ বাংলাদেশের বুক চিরে বয়ে গেছে ছোট-বড় অসংখ্য নদী। বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। আধুনিক যানবাহনের বহুল প্রচলনের আগে আমাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল। নৌকা, যা আজকের দিনে আমরা হারাতে বসেছি। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মালামাল ও যাত্রী পরিবহনের সহজ মাধ্যম ছিল বিভিন্ন রকমের নৌকা। উত্তাল নদীবক্ষে গান গেয়ে পালতোলা নৌকা বেয়ে যেত মাঝিরা। আজও এই বাংলার এমনও অনেক এলাকা আছে যেখানে নৌকায় যাতায়াত করতে হয়। যুগ যুগ ধরে বাংলার মানুষ ও অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বিভিন্ন রকমের নানা নামের নৌকা। এসব নৌকার অধিকাংশই এখন আর টিকে নেই। এসব নৌকা এখন প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে প্রায় ৮০ রকম নৌকার মডেল স্থান পেয়েছে। নতুনের আগমনে পুরনোকে হারাতে হয় এরই ধারাবাহিকতায় আমরা হারিয়ে ফেলেছি নৌকা শিল্প। জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে যাত্রীবাহী কেরাই নৌকা, সাপুড়িয়া, মালবাহী কবিতী ও উবরী নৌকার মডেল। এছাড়া বৌচোরা, গয়না, বাছারি, কোষা, গন্ডি, লক্ষ্মী বিলাস, টালাই, বজরা, সিলেটি নৌকা, পানসী, ঘাসী, বালামী, জৈয়ন্তাপুরী, ইটা নৌকার মডেল। এগুলো এক সময় ছিল আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলো ছিল পরিবেশবান্ধব। বর্তমানে এসবের জায়গা দখল করে নিচ্ছে যান্ত্রিক নৌকা (ট্রলার) ও ওয়াটার বাস। যার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অতীত ঐতিহ্য। ভরা নদীতে পালতোলা নৌকা ভেসে চলার মতো মনোরম দৃশ্য আজকাল দেখা যায় না। এখন নদীর বুক চিরে নির্মিত হচ্ছে নতুন নতুন ব্রিজ। বাংলার প্রধান প্রধান নদীগুলোতে যান্ত্রিক নৌকার দাপটে বিলীনপ্রায় আমাদের ঐতিহ্যবাহী জলযান। নৌকা শিল্পের সঙ্গে যেসব কর্মী-শিল্পীরা জড়িত ছিলেন তারাও আজ হুমকির মুখে। এছাড়া নদীমাতৃক এ বাংলাদেশের নদীগুলো এখন আর আগের মতো উচ্ছল নেই। নদীর নাব্যতা কমছে, দখল হচ্ছে নদীর পাড়। প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। এসব বিভিন্ন কারণে নদীমাতৃক এ বাংলাদেশের বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নৌকা সংস্কৃতি। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের ভরা নদী বা বিলে চলত নৌকাবাইচ। আজকাল এটিও দেখা যায় না। বাংলাদেশের কাঠের তৈরি এসব নৌকা ছিল ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম শিল্প, যা আমাদের সবার সুদৃষ্টির ফলে আবারো ফিরে আসতে পারে। হয়তো আমরা আবারো দেখতে পাব ভরা নদীতে পালতোলা নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে। এর জন্য প্রথমেই নদীগুলোর জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে আর যান্ত্রিক নৌকার পাশাপাশি স্থান দিতে হবে ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকাকে। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এসেও আমরা দেখতে চাই আমাদের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ধরলার বুক চিরে ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলছে হারিয়ে যাওয়া লৌকিক জলযান।
উত্সঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন