Thursday, September 2, 2010

অবরুদ্ধ পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস

0 comments
বায়তুল মোকাদ্দসের সত্তাগত পবিত্রতা, আল্লাহর পক্ষ থেকে তা চিহ্নিতকরণ, কোরআনে এ পবিত্রতার উল্লেখ, মি'রাজ-এর স্মৃতি; প্রথম কিবলা এবং এর পবিত্রতা সম্পর্কে রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামগণের সুস্পষ্ট ধারণার ভিত্তিতে ইসলামের পবিত্র মর্যাদার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। বায়তুল মোকাদ্দসের পবিত্রতা সম্পর্কে প্রথম যে সুস্পষ্ট অভিমত পাওয়া যায় তা হচ্ছে হজরত মূসা (আ.) এর জবানিতে তিনি বনী ইসরাইলকে বলেন : 'হে আমার জাতি, আল্লাহতা'য়ালা তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তোমরা সেখানে প্রবেশ কর' সূরা মায়েদা : ২১
কিন্তু এখানে 'পবিত্র ভূমি' মানে পুরো ফিলিস্তিন, শুধু বায়তুল মোকাদ্দস, নাকি বায়তুল মোকাদ্দসের একটি নির্দিষ্ট অংশ তা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়নি। তবে পরবর্তী আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, উদ্ধৃত আয়াতের লক্ষ্য তৎকালীন "বায়তুল মোকাদ্দস হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা মূসা (আ.)-এর বক্তব্যের জবাবে বনি ইসরাইল বলেছিল : হে মূসা নিঃসন্দেহে সেখানে এক জবরদস্ত জালেম গোষ্ঠী রয়েছে (অতএব) তারা সেখান থেকে বেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত কিছুতেই আমরা সেখানে প্রবেশ করব না" সূরা মায়েদা-২২। এ থেকে মনে হয়, একটি নির্দিষ্ট জনপদই (বা শহর) এখানে লক্ষ্য আর তাহলে নিঃসন্দেহে তা হবে বায়তুল মোকাদ্দস। কেননা ফিলিস্তিনের অন্য কোনো এলাকা বা শহরই হজরত মূসা (আঃ)-কে নবীরূপে স্বীকারকারী ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানগণের কাছে সমানভাবে পবিত্রস্থান রূপে পরিগণিত হয়নি। বিশেষ করে কোরআন মজিদের যে আয়াতে বিষয়টি প্রমাণ করেছে তার অনুসারী মুসলমানদের কাছে ফিলিস্তিনের অন্য কোনো জায়গাই বায়তুল মোকাদ্দসের ন্যায় পবিত্র বলে পরিগণিত নয়। সূরা মায়েদার ২১ নং আয়াতে বায়তুল মোকাদ্দসকে পবিত্র ভূমি বলে উল্লেখ করা হয়েছে এর নাম উল্লেখ না করেই' কিন্তু সূরা বনী ইসরাইলে অধিকতর সুস্পষ্টভাবে এ ভূখণ্ডকে নির্দেশ করা হয়েছে এবং এর পবিত্রতা বা বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতা'য়ালা তার খোদায়ী নিদর্শনাদির ব্যাপকতর প্রদর্শনীর লক্ষ্যে হজরত রাসূল আকরাম (সা.)-কে মি'রাজ বা ঊর্ধ্বলোকে পরিভ্রমণ করিয়েছিলেন। এ ভ্রমণ প্রথমে ছিল মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় পর্যায় ছিল মসজিদুল আকসা থেকে ঊর্ধ্বলোকে। নিঃসন্দেহে মানবজাতির পূর্ণতা ও মর্যাদার চরমতম নিদর্শন এ ভ্রমণে বায়তুল মোকাদ্দসকে 'মধ্যবর্তী স্টেশন' রূপে মর্যাদা প্রদানের পেছনে এর পবিত্রার মর্যাদাই বহন করে। এ প্রসঙ্গে সূরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে যে আল্লাহতা'য়ালা মসজিদুল আকসার পার্শ্ববর্তী এলাকাকে বরকতময় করেছেন।

হজরত দাউদ (আ.) বায়তুল মোকাদ্দসে তার রাজত্বের রাজধানী স্থান করেন এবং একটি বিশাল ইবাদতখানা নির্মাণে হাত দেন যা হজরত সোলায়মান (আ.) কর্তৃক সমাপ্ত হয়। এভাবে বায়তুল মোকাদ্দসের পবিত্রতার মর্যাদা বাস্তবরূপ লাভ করে_ এরপর হজরত ঈসা (আ.) এর সময় থেকে তার অনুসারীদের সাক্ষর এবং রাসূলে আকরাম (সা.) এর নবুয়ত প্রাপ্তির পর থেকে মুসলমানদের দ্বারা বায়তুল মোকাদ্দস পবিত্রস্থান রূপে গণ্য হতে থাকে। বায়তুল মোকাদ্দস মুসলমানদের প্রথম কেবলা। পরবর্তীতে কেবলা হিসেবে কা'বা গৃহে নির্ধারিত হলেও মুসলমানদের দৃষ্টিতে বায়তুল মোকাদ্দসের পবিত্রতার মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে। কেননা পবিত্র ভূমির পবিত্রতা একটি চিরন্তন ব্যাপার। মক্কা মুয়াজজামাহ ও মদিনা মুনাওয়ারহ পরে বায়তুল মোকাদ্দস হচ্ছে ইসলামের ১ম কিবলা ও তৃতীয় পবিত্র স্থান। হজরত রাসূল আকরাম (সা.) মক্কার মজিদুল হারাম; মদিনার মসজিদুন্নবী (স.) ও বায়তুল মোকাদ্দস মসজিদের উদ্দেশ্য সফরকে বিশেষভাবে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা অন্য কোনো মসজিদ সম্পর্কে করেননি। বায়তুল মোকাদ্দস মসজিদ এবং তার আশপাশের এলাকা বহু নবীগণের স্মৃতিবিজড়িত। এ পবিত্র নাম শুধু একটি স্থানের সঙ্গে জড়িত নয় বরং এই নাম সকল মুসলমানের ইমান ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এখানে রয়েছে অসংখ্য নবী রাসূলের মাজার। ওহী ও ইসলামের অবতরণ স্থল এ নগরী-নবীগণের দ্বীন প্রচারের কেন্দ ভূমি্ তাই এই পবিত্র নগরীর প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। কিন্তু দুভার্গ্য হলেও সত্য আজ প্রায় অর্ধশত বছরের বেশি হলো মুসলমানদের এই পবিত্র মসজিদ যায়নবাদী ইহুদিরা দখল করে আছে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেভিড বেন গুরিয়ন ব্রিটিশের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় তেলআবিবকে রাজধানী করে ইসরাইল রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় মাত্র দশ মিনিটের ব্যবধানে আমেরিকা ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদান করার ঘোষণা দেয়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়ার স্বীকৃতি এসে যায়। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইহুদি রাষ্ট্র গঠন সংক্রান্ত নীলনকশার পেছনে ব্রিটেন ও আমেরিকাসহ ইউরোপীয় শক্তির মদদ কতটা সক্রিয় ছিল। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন আরব রাষ্ট্রগুলো এই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করলেও তারা সেদিন সঙ্গে সঙ্গে পৃথক 'প্যালেস্টাইন' রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দিতে পারেনি।

১৯৬৭ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধের ফলে ইসরাইল বায়তুল মোকাদ্দস দখল করে নেয়। ১৯৭৩ সালে সংঘটিত আরব-ইসরাইল দ্বিতীয় যুদ্ধের মাধ্যমেও তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বায়তুল মোকাদ্দসের সার্বভৌমত্ব মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনা। মুসলমানদের প্রকাশ্য দুশমন ইহুদিরা প্রতি মুহূর্তে আল-কুদসের পবিত্রতা বিনষ্ট করে চলেছে। গত প্রায় ২৫ বছরে কোনো বিদেশি মুসলমানের পক্ষে তাদের প্রাণপ্রিয় আল-কুদস গমন ও বায়তুল মোকাদ্দসে নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। অধিকন্তু ফিলিস্তিনের মুসলমানরাও স্বাধীনভাবে মসজিদুল আকসায় নামাজ আদায় করতে পারছে না। ইসরাইলি রক্তপিপাসু নরপশুরা মসজিদুল আকসায় ঢুকে অহরহ মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। ১৯৬৯ সালে মানবতার দুশমন ইসরাইল পবিত্র আকসায় আগুন ধরিয়ে দেয় ফলে। এই পবিত্র ঘর মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর বিরুদ্ধে সমগ্র মুসলিম দুনিয়া মারমুখো হয়ে ওঠে। মুসলিম নেতারা ওই বছর রাবাতে এক শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হন এবং আল-আকসা মসজিদে অগি্ন সংযোগের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ওই শীর্ষ সম্মেলনে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সংগঠন 'ইসলামী সম্মেলন সংস্থা'র জন্ম হয়। অগি্নসংযোগ করেই ইসরাইলি দস্যুরা ক্ষান্ত হয়নি। তারা আল-কুদ্সের তলদেশ খনন শুরু করে। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ইসরাইল আল-কুদ্সের পশ্চিম দেওয়াল ঘেঁষে খনন কার্য চালায়। ফলে আল-কুদস-এর দেয়াল অতিক্রম করে বিশ মিটার এলাকাজুড়ে এক বিরাট গর্তের সৃষ্টি হয়।

১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মে গঠিত হয় পিএলও (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন)। এই সংগঠনটি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সাফল্যের সঙ্গে তুলে ধরতে সক্ষম হয়। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা, আরব লীগ প্রভৃতি সংস্থায় স্বীকৃতি পায় পিএলও। কিন্তু এই সাফল্য সত্ত্বেও পিএলও সম্পর্কে এ কথা বলা প্রয়োজন যে, ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী চেতনা নিয়ে লড়তে গিয়ে নিজেদের ভূখণ্ডে কার্যকর প্রতিরোধের দেয়াল তুলতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ওদিকে আন্তর্জাতিক ইহুদি স্বার্থের প্রতিভূরা জাতিসংঘের কাছ থকে ইসরাইলের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়।

ফিলিস্তিনি গেরিলাদের হঠিয়ে তিউনিসিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালে 'শাতিলা' এবং 'শাবলা' শরণার্থী শিবির দু'টোয় যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হয় সেই দুঃসহ বেদনার কথা মুসলিম বিশ্ব কখনো ভুলবে না। আন্তর্জাতিক চক্রের মদদে লেবাননে গৃহযুদ্ধের সৃষ্টি হয়। এ গৃহযুদ্ধে ফিলিস্তিনিরা জড়িয়ে পড়লে এই সুযোগে ইসরাইল লেবাননে আগ্রাসন চালিয়ে ফিলিস্তিনি আস্তানা ধ্বংস করার সুযোগ পায়। এরপর থেকে পিএলও হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে আপসের পথ বেছে নেয়। ইয়াসির আরাফাতের পিএলও বিধ্বস্ত হলেও মূল ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনি জনতার স্বাধীনতার চেতনা কিন্তু হারিয়ে যায়নি। তারা ইসরাইলের ট্যাঙ্ক, কামান, গুলি, অগি্নসংযোগ প্রভৃতির বিরুদ্ধে খালি হাতে রাস্তার পাথর কুড়িয়ে আর রান্নাঘরের বটি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই নতুন আন্দোলনের নাম ইনতিফাদা। ইনতিফাদার মানে হলো গণজাগরণ বা গণআন্দোলন। যারা পশ্চাতে রয়েছে ইসলামের সত্যিকার প্রেরণা। এই আন্দোলন শুরু হয় ১৯৮৭ সালের ৯ ডিসেম্বর। কিশোর, তরুণ আর মহিলারা এই আন্দোলনের আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল এবং অতীতের যে কোনো সময়ে চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ব্যাপক এবং ধারাল। নারী-পুরুষ, যুবক, বৃদ্ধ, কিশোর নির্বিশেষে আজ জেগে উঠেছে ফিলিস্তিনের সাধারণ জনগণ। ইমানদীপ্ত বক্ষ ও অন্তরভরা সাহস হচ্ছে এ মুক্তি সংগ্রামে তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তাদের ভরসা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য নয় বরং সর্বশক্তিমান আল্লাহ। বিশ্ববরেণ্য ওলামায়ে কেরামগণ রমজানের শেষ শুক্রবারকে কুদ্স দিবস ঘোষণা করে। এ বছর ২৩ রমজানকে আন্তর্জাতিকভাবে কুদ্স দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। বায়তুল মোকাদ্দস পুনরুদ্ধারে জনমত সৃষ্টি করা এবং এর গুরুত্ব ও মর্যাদা জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর অবশ্য কর্তব্য। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তার হুকুম পালনের তৌফিক দিন, আমীন।

লেখক : অধ্যাপক মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন খান
অধ্যাপক, দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

0 comments:

Post a Comment