Monday, January 31, 2011

দিঘিরপাড় মসজিদ, ওসমানী নগর; সিলেট

0 comments
সাইনবোর্ড না পড়লে যে কেউ মনে করবেন এটি একটি পার্ক। আসলে এটি কোনো পার্ক নয়, পার্কের আদলে তৈরি মসজিদ। যার অবস্থান পূণ্যভূমি সিলেটের ওসমানীনগর থানার তাজপুরের দিঘিরপাড়ে। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ নির্মাণ করেছেন এলাকার বিশিষ্ট ধনাঢ্য ব্যক্তি ধন মিয়া।
শৈল্পিক কারুকাজখচিত মসজিদের পাশেই রয়েছে সুবিন্যস্ত পাঠাগার। নামাজ আদায় ছাড়াও বিকালে লোকজন এখানে বই পড়তে আসেন। ভিড় করেন বিভিন্ন স্থান থেকে আগত সৌন্দর্যপিপাসুরাও। পাঠাগারের পেছনে রয়েছে সুবিশাল দিঘি। সুসজ্জিত ফুলের বাগান, নারিকেল গাছ, বসার ছাউনি, দোলনা, ছোট-বড় গেট। সব মিলিয়ে মনে হবে এটি কোনো পার্কের দৃশ্য। লোকমুখে শোনা যায়, ধন মিয়া স্বপ্নযোগে মসজিদ নির্মাণের আদেশ পেয়ে এটি নির্মাণ করেন। মসজিদের নির্মাণকাজ কয়েক বছর আগে শুরু হলেও শেষ হয়েছে দুই বছর আগে। পড়ন্ত বিকালে দিঘিরপাড়ের মনোরম দৃশ্য ঘুরতে আসা মানুষকে বিমোহিত করে। যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে অবসরে ঘুরে আসতে পারেন ওসমানীনগরের দিঘিরপাড় মসজিদ।

-রামিল মাসুদ

Saturday, January 29, 2011

খুশকি

0 comments
শীতে ত্বকের সঙ্গে সঙ্গে চুলেও দেখা দেয় নানারকম সমস্যা। এ সময় খুশকির উপদ্রব দেখা দেয়, চুলের ডগা ফাটে, চুল নিস্তেজ হয়ে পড়ে। বাতাসে আর্দ্রতার অভাবে চুলের চকচকে ভাব নষ্ট হয়ে যায়। আর চুল হয়ে ওঠে রুক্ষ, শুষ্ক, প্রাণহীন। শীতে চুলের এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন সঠিক পরিচর্যার। দরকার অয়েল ম্যাসাজ, হেয়ার স্পা বা প্রোটিন ট্রিটমেন্ট, যা আপনি পার্লার কিংবা সেলুনে গিয়ে করতে পারেন। এছাড়াও ঘরে বসে নিতে পারেন প্রতিদিনের চুলের যত্ন।

মধু ও অলিভ অয়েল সমপরিমাণ মিশিয়ে ১২ ঘণ্টা একটি পাত্রে রেখে দিন। পরে চুলের গোড়ায় ভালো করে ম্যাসাজ করুন, কিছু সময় পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

লেবু, জবাফুলের রস, নারিকেল তেল মিশিয়ে তুলা দিয়ে চুলের গোড়ায় ভালো করে লাগাতে পারেন। সপ্তাহে একবার এই প্যাকটি চুলে ব্যবহার করতে পারেন। এক ঘণ্টা রেখে চুল শ্যাম্পু করে কন্ডিশনার লাগাতে হবে।

হেনা, দুধ, ডিম, চায়ের লিকার মিশিয়ে চুলে লাগান। আধাঘণ্টা পর হার্বাল শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন।

তিলের তেল, মধু, পাকা পেঁপে মিশিয়ে চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লাগান। এক ঘণ্টা পর শ্যাম্পু করে কন্ডিশনার লাগান।

ওলমেক সভ্যতা

0 comments
পৃথিবীর রহস্যময় সভ্যতাগুলোর একটি হচ্ছে ওলমেক সভ্যতা। ওলমেকরা প্রাচীন মেক্সিকোর অধিবাসী ছিল। ওলমেক সভ্যতা মায়ান সভ্যতার পূর্বসূরি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার একটি। আজ থেকে প্রায় ৩ হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে বিকাশ ঘটেছিল এই সভ্যতার। ওলমেকরাই প্রথম প্রাচীন মেক্সিকোয় ধর্ম, লেখনী, পঞ্জিকা, গণিতশাস্ত্রে অসীম দক্ষতা_ এমন কি কম্পাসেরও সূত্রপাত করেছিল।

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ঘটনাটা ১৮৬২ সালের। মেক্সিকো তখনো জঙ্গল আর জলাভূমিতে ভরা এক নির্জন দেশ। এরকমই একটা অরণ্যঘেরা জলাভূমিতে চাষের জন্য মাটি খোঁড়াখুঁড়ি চলছিল। হঠাৎ করেই পাথরের বা ধাতুর একটি বিরাট বস্তু বেরিয়ে এলো। মাটির নিচে পুঁতে রাখা। জিনিসটা দেখে চাষিদের মনে হলো এটা একটি লোহার কেটলি। গুপ্তধনের লোভে ওদের চোখ চকচক করে উঠল। দ্বিগুণ উদ্যমে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করল তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জায়গাটা খুঁড়ে পাথরের একটি ভাস্কর্যের ভাঙা মাথার সন্ধান মিলল। গুপ্তধনের দেখা না পেয়ে চাষিরা ভীষণ হতাশ হলো। কিন্তু আগ্রহী হয়ে ওঠলেন প্রত্নতাত্তি্বকরা। কারণ এই ভাঙা মাথাটিই যে প্রাচীন ওলমেক সভ্যতার প্রথম নিদর্শন।

সেই শুরু। তবে ওমলেক সভ্যতা বলে আদৌ কিছু ছিল কি-না তা নিয়ে বিতর্কের কমতি ছিল না। ১৯৪২ সালে মেক্সিকোতে এক আন্তর্জাতিক প্রত্নতাত্তি্বক সম্মেলনে অজস্র নমুনা ও প্রমাণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ওলমেক সভ্যতার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সবাইকে নিশ্চিত করা হয়। নতুন সন্ধান পাওয়া এই সভ্যতার প্রাচুর্য দেখে হতবাক হয়ে গেলেন প্রত্নতাত্তি্বকরা।

'ওলমেক' শব্দটি এসেছে অ্যাজটেক সভ্যতার 'নাহুতল' ভাষা থেকে। শব্দটির অর্থ হচ্ছে 'রাবার পিপল'। পনেরো-ষোল শতকে উপসাগরীয় এলাকার নাব্যদেশে যারা বসবাস করত তাদের এই নামে ডাকা হতো। ওলমেকদের আদিনিবাস ধরা হয় আফ্রিকাকে। সেখান থেকে বহুদূরের পথ পেরিয়ে ওলমেকরা এসেছিল আমেরিকায়। ওলমেকদের অনেকে বলে থাকেন 'নওবান'। এটাই নাকি ওদের আসল নাম। আজ থেকে তিন হাজারেরও বেশি সময় আগে গড়ে উঠেছিল প্রাচুর্যে ভরা এই ওমলেক সভ্যতা। এটি ছিল প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মেসোআমেরিকার অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা। মেসো আমেরিকা অর্থ মধ্য আমেরিকা। আর ওলমেকরাই মেসো আমেরিকার প্রাচীন বাসিন্দা। ওলমেক সভ্যতার কেন্দ্র ছিল মেক্সিকোর ইউকান উপদ্বীপ। মেক্সিকো উপসাগরের উপকূলে টুক্সটিলা পাহাড়ের পাদদেশের জলাভূমিময় জঙ্গলে, সে জঙ্গলের পাশে গ্রামে এবং নগরে বাস করত ওলমেকরা। বর্তমান মেক্সিকোর ভেরাকুজ ও তাবাসকো প্রদেশই প্রথম নগর ও গ্রাম গড়ে তুলেছিল ওলমেকরা।

প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার কথা খুব শোনা গেলেও ওলমেক সভ্যতা এই দুই সভ্যতা থেকেও বুড়ো এবং সমৃদ্ধিশালী। ওলমেক সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন থেকে পণ্ডিতরা অনুমান করছেন, অ্যাজটেক ও মায়ার বিখ্যাত সভ্যতার অনেক কিছুই মায়ানদের দান করা। আর তাছাড়া ওমলেকদের সূক্ষ্ম খোদাইয়ের কাজ, বিরাট ভাস্কর্য, ভাষার ব্যবহার, গণিতশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য এবং বর্ষপঞ্জি প্রত্নতাত্তি্বকদের চমক লাগিয়ে দিয়েছে। পরবর্তী বিখ্যাত সভ্যতাগুলোর মতোই তারা পুরো ৩৬৫ দিনের এক দিনপঞ্জিকা মেনে চলত। তার চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ওলমেকরাও পিরামিড বানাতে জানত। আর পশ্চিমা দুনিয়ায় ওলমেকরাই সম্ভবত প্রথম জাতি, যারা নিজেদের একটি লিখন-পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল। আর মায়ান সভ্যতার বর্ণমালা ওলমেক সভ্যতার প্রভাবেই গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়। ওলমেকদের জীবনে ধর্ম ছিল কেন্দ্রজুড়ে, ছিল তাদের শাসকরা। আর সেই শাসকরা ছিলেন শামান। তাই যারা শাসক তারাই ছিলেন ওমলেকদের ধর্মীয় নেতা। সেই শামানরা নাকি রুপান্তরিত হতে পারত! ওলমেকদের মূল দেবতা ছিল জাগুয়ার দেবতা। ওলমেকরা মনে করত জাগুয়ার বা আমেরিকার এক ধরনের হিংস্র বাঘ সব শক্তির আধার। জাগুয়ারের মৃত্যু হলে সেই আত্মা বেরিয়ে আসে পৃথিবীতে। তবে এর বাইরেও এদের অন্য দেবতা ছিল। ওলমেক ধর্মে নরবলি ও রক্ত ঝরানোর রীতি ছিল। রক্ত ঝরানোর কৃত্য মানে দেবতাকে খুশি করতে নিজের শরীর থেকে (যেমন_ লিঙ্গ অথবা জিহবা) রক্ত ঝরানো।

ওলমেকরাই মেসো আমেরিকায় প্রথম স্থাপত্য নির্মাণে ও ভাস্কর্য গড়তে পাথর ব্যবহার করে । এ জন্য তারা দূরবর্তী পাহাড়ের কোয়ারি থেকে পাথর টেনে আনত। তৈরি করত পুরুষের মুখ। যা একেকটি প্রায় ৯ ফুট উঁচু। এগুলো আজো মেক্সিকোর ভিলাহেরমোসা নগরে দেখা যায়। বেশিরভাগ ওলমেকই গ্রামে বসবাস করত। আর এরা অরণ্য ও ঝোপঝাড় পুড়িয়ে ভুট্টা ও সূর্যমুখীর চাষ করত। বন্যার সময় ছাড়া তারা নদীর ধারেও করত। ভুট্টা ছাড়াও বুনত শিম, লাউ ও মিষ্টি আলু। সবজি ছাড়া মাংসের জন্য খেত মাছ, কাছিম, সাপ, ভোঁদড়, কাঁকড়া, হরিণ, খরগোশ ও পাখি। আর তারা খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে রাখার কৌশল জানত। পরবর্তী সময়ে যা খুঁজে পাওয়া গেছে অ্যাজটেকদের মধ্যে। ওলমেকদের চারটি শহরকে চিহ্নিত করা গেছে। লাগুনা দো লোজ সেরম, সান লোরেনজো, তে জাপাও আর লা তোনও। এগুলো প্রতিটিই উন্নত স্থাপনায় ও শৈলীতে সমৃদ্ধ। ওলমেক সভ্যতার প্রাচুর্য আর অগ্রগতি প্রত্নতাত্তি্বকদের অবাক করেছে। অনেক প্রশ্নের উত্তর আজো মেলেনি। ওলমেকরা কিভাবে আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় এলো? তারা কিভাবে এত তাড়াতাড়ি সব কিছু শিখে ফেলল? তাদের এই বিচিত্র ভাস্কর্যবিদ্যার উৎস কি? আবার রাতারাতি এ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেল কিভাবে! আর এ সভ্যতার প্রাণরস কিভাবে পেঁৗছে গেল মায় আর অ্যাজটেক সভ্যতার মধ্যে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজো মেলেনি।

-রণক ইকরাম

শীতকালে সকালে এবং সন্ধ্যায় আমাদেরও মুখ থেকে ধোঁয়া বের হয় কেন

0 comments
শীতকালে সকাল ও সন্ধ্যায় বাইরের পরিবেশে শীতল জলকণা ভেসে বেড়ায়। সেগুলো যখন আমাদের নিঃশ্বাসের সংস্পর্শে আসে তখন নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় সেগুলো হালকা হয়ে ধোঁয়ার মতো উপরে উঠে যায়। এজন্য মনে হয় নিঃশ্বাসের সঙ্গে মুখ ও নাক থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আসলে কিন্তু সেই ধোঁয়া আমাদের নাক ও মুখ থেকে বের হয় না।

ফারহানা মাহমুদ তন্বী

দ্য উইটেলসব্যাক গ্রাফ ডায়মন্ড

0 comments
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির স্মিথসোনিয়ান'স ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে এখন শোভা পাচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম সেই রহস্যময় সুন্দর হীরকখণ্ডটি; যার নাম 'দ্য উইটেলসব্যাক-গ্রাফ ডায়মন্ড'। জানা গেছে, মহামূল্যবান এই হীরকখণ্ডটি বিক্রির উদ্দেশ্যেই এখানে রাখা হয়েছে। এ হীরাটি শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল ১৯৫৮ সালে, ব্রাসেলসের ওয়ার্ল্ড এক্সিবিশনে। তারপরই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায় এ হীরকখণ্ডটি। এরপর ২০০৮ সালের এক নিলামে লরেন্স গ্রাফ এটিকে কিনে নেওয়ার পর আবারও আলোচনায় আসে হীরকখণ্ডটি।

রহস্যময় এই হীরকখণ্ডটি প্রথম পাওয়া গিয়েছিল ১৬৬৪ সালে ভারতে। স্পেনের রাজা চতুর্থ ফিলিপ তার মেয়ে ইনফানাটা মার্গারেটা টেরেসার সঙ্গে অস্ট্রিয়ার সম্রাট লিওপোল্ডের বাগদানের সময় এটি উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। ১৭৭২ সালে হাউস অব ব্রাভিয়া উইটেলবার্গ পরিবারের মধ্য দিয়েই এই হীরার নামকরণের ইতিহাস জন্ম নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই এই হীরকখণ্ডটি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। তারপর এ হীরকখণ্ডটি দীর্ঘকাল আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

হীরাটি সম্পর্কে বলা হয়, এটি যেমন সুন্দর তেমনি আকর্ষণীয়। অল্প আলোতে দেখলে ধূসর ও নীল রংয়ের দেখায়, আর অতি-বেগুনী রশ্মিতে দেখলে এটিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় গাঢ় কমলা রংয়ের দেখা যায়। উল্লেখ্য, নিলামে এর প্রাথমিক দাম ১৫ মিলিয়ন ধরা হলেও গ্রাফ কিনেছিলেন ২৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি দামে। প্রথমে ৩৫ দশমিক ৫ ক্যারেট থাকলেও পরে কাটার পরে এর নেট ওজন দাঁড়ায় ৩১ ক্যারেটে। জানা গেছে, ৪৫ দশমিক ৫২ ক্যারেটের পৃথিবীর সর্ববৃহৎ হীরা 'হোপ'-এর সঙ্গে তুলনা করেই এর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, এ হীরকখণ্ডটি এখন লন্ডনের ন্যাশনাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম বা অন্য কোথাও বিক্রি হয়ে যেতে পারে। আর এবার বিক্রি হলে পরে এ মূল্যবান রহস্যময় হীরকখণ্ডটি আবারও সেই একশ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে উধাও হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মেহেদী হাসান বাবু

মানুষখেকো গুহা

0 comments
গুহাও কি মানুষ খেতে পারে? ইতিহাস বলে পারে। গ্রিক ভূগোলবিদ স্ট্রাবো সর মতে, অ্যাপোলো দেবতার একটি মন্দির ছিল রহস্যময়। এই মন্দিরটি ছিল প্রাচীন গ্রিক শহর 'হিয়ারাপোলিস'-এ। সেই মন্দিরের কাছেই ছিল একটি গুহা। যার ভেতরে জন্তু-জানোয়ার ছুঁড়ে দিলে তারা আর বেরিয়ে আসত না। কোনো মানুষও যদি সেই গুহামুখ অতিক্রম করে সামান্য ভেতরে ঢুকত তারাও বেরিয়ে আসত না। পুরোহিতরা নিরাপদে ওই গুহায় ঢুকতে এবং বের হতে পারত। ওই গুহার ভেতর থাকার সময় তাদের মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়ে যেত। প্রাচীন গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল ওই গুহা হলো পরলোকে যাওয়ার পথ। সেখানে রাজত্ব করে অপদেবতারা। স্ট্রাবো এই পুঁথিটি লিখেছিলেন ২০০০ বছর আগে। এই প্রাচীন পুঁথির সূত্র ধরে নিউইয়র্ক কলেজের অধ্যাপক শেলডেন নতুন তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি মত প্রকাশ করেন, ওই গুহার নিচ থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস বেরিয়ে আসত। ফলে মানুষ বা প্রাণী গুহার ভেতর শ্বাসকষ্টে মারা যেত। এই প্রাচীন গ্রিক শহরটি বর্তমানে পশ্চিম তুর্কির পাযুক্কালে শহর। সেখানে আছে প্রচুর উষ্ণ প্রসরণ। তার মধ্যে আছে অধিক পরিমাণ ক্যালসিয়াম কার্বনেট। এসিডের সঙ্গে বিক্রিয়ার ফলে এ থেকে উৎপন্ন হয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড। বাষ্প এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড যে কোনো ফাটল দিয়ে ঢুকে যেত গুহার ভেতর। তাই কয়েক পা এগুলেই নিশ্চিত মৃত্যু। আরংসানের মতে, পুরোহিতরা দম বন্ধ করে থাকত বলে মারা যেত না। অ্যাপোলোর মন্দিরের সেই রহস্যময় গুহাটি এখনও আছে। কয়েক বছর আগে একদল অস্ট্রেলীয় ছাত্র ওই গুহার ভেতরে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এরপর থেকে তুর্কি সরকার গুহামুখে লোহার পাত বসিয়ে দিয়েছে । তানভীর উদ্দিন ড্যানি

ইয়েলো রেইন

0 comments
ইয়েলো রেইন বা বাংলায় হলুদ বৃষ্টি। বায়ু দূষণের কথা উঠলেই বিজ্ঞানীরা সবার আগে ইয়েলো রেইনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে থাকেন। আবহাওয়া দূষিত হওয়ার ফলেই এরকম নামকরণ করা হয়। এটিকে কৃত্রিম বৃষ্টি বলা চলে। বায়ুমণ্ডলে তীব্র বিষাক্ত 'মাইকোটক্সিন' মিশিয়ে ইয়েলো রেইন ঘটানো সম্ভব। রাসায়নিক যুদ্ধে ইয়েলো রেইন একটি মারাত্মক অস্ত্র। দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক যুদ্ধে এর সর্বাধিক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এর ফলে খাদ্যশস্যই নয়, মানুষ এবং পশুপাখিও যথেষ্ট ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এ বায়ু শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে গেলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়! আর নানা রোগব্যাধি শুরু হয়। এতে তীব্র বিষাক্ত ফসজিন, সায়নাইড, নার্ভগ্যাস এবং মাস্টার্ড গ্যাস ব্যবহৃত হয়। এ বোমা বিস্ফোরণের ফলে তার ভেতরের বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে ভর দিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গ্যাস মাস্ক ব্যবহার না করলে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহের ভেতরে প্রবেশ করে প্রভূত ক্ষতিসাধন করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে গ্যাস মাস্ক সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। ফলে ইয়েলো রেইন দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তিরা ব্যাধিগ্রস্ত হতে বাধ্য করে।

ক্রপসার্কেল

0 comments
এক অপার বিস্ময়ের নাম 'ক্রপসার্কেল'। বিস্তীর্ণ শস্যভূমিতে সৃষ্ট এক ধরনের জটিল জ্যামিতিক চিত্রই হলো 'ক্রপসার্কেল' বা 'শস্যবৃত্ত'। এটা পৃথিবীর কোনো মানুষের তৈরি হতে পারে আবার সেটা বহির্জাগতিক কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর সৃষ্টিও হতে পারে। ক্রপসার্কেলের আকার-আকৃতি মোটেও সাধারন নয়। এটি কেবল জটিলই নয় রীতিমতো মহাজটিল। আর তার চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো বিজ্ঞানীদের মতে এ ধরনের ক্রপসার্কেল মানুষের পক্ষে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। যদিও কেউ কেউ এসব ক্রপসার্কেল দেখে মাথা খাটিয়ে কিছু ক্রপসার্কেল তৈরি করেছেন, কিন্তু সেসব ক্রপসার্কেল আগের সৃষ্ট ক্রপসার্কেলগুলোর ধারে-কাছেও যেতে পারেনি। আর এর মূল কারণ হলো_ এর জটিল জ্যামিতিক প্যাটার্ন এবং খুব ভালো গাণিতিক জ্ঞানের প্রয়োগ। এ ধরনের ক্রপসার্কেল তৈরি করতে হলে একজন মানুষকে গণিত এবং জ্যামিতি সম্পর্কে খুব ভালো জ্ঞান রাখতে হবে। সে ১৯৮০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে প্রায় ১০ হাজার শস্যবৃত্ত। যেগুলোর প্রতিটিতে ব্যবহার করা হয়েছে জটিল সব জ্যামিতিক হিসাব-নিকাশ। প্রায় প্রতিবছরই আবিস্কার হচ্ছে নিত্যনতুন সব ক্রপসার্কেল এবং এগুলো আগের তুলনায় আরও বেশি জটিল হচ্ছে। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের এক শস্যবৃত্তে এক এলিয়েনের (বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান প্রাণী) মুখচ্ছবি এবং তার হাতে ধরে রাখা একটি গোলক দেখা গিয়েছিল। পৃথিবীব্যাপী ক্রপসার্কেল আজও এক অনন্ত বিস্ময়ের নাম।

-মেহেদী হাসান বাবু

টেগর লজ, কুষ্টিয়া

0 comments
সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়ায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজ হাতে নির্মিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান 'টেগর লজ' তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। ১৮৯০ সালের শেষ ভাগে রবীন্দ্রনাথ ও কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কুষ্টিয়া রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশে বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। জায়গার পরিমাণ তখন আরও বেশি ছিল। ভুসিমাল ও পাটের কারবারের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 'টেগর অ্যান্ড কোম্পানি'। এর একাংশে কিছুকাল থাকার প্রয়োজনে তৈরি করেছিলেন টেগর লজ নামের দোতলা বাড়িটি।
পাঁচ লাখ টাকায় এক অমূল্য স্থাবর সম্পদ এখন কিনে নিয়েছে কুষ্টিয়া পৌরসভা। বাড়িটি শহরের মিলপাড়ায়। জায়গা খুব বেশি নয়, সাকুল্যে নয় কাঠা। তার উপরে ছোট্ট দোতলা বাড়ি। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা। উত্তর-দক্ষিণ দুই পাশেই বারান্দা। পশ্চিম পাশের কুঠুরির কোণে দোতলায় ওঠার পেঁচানো লোহার সিঁড়ি। বাড়িতে প্রবেশের পথ অবশ্য উত্তর দিকে। একেবারে মিলপাড়ার সড়কের সঙ্গে লাগোয়া। বাড়িটির নাম 'টেগর লজ'। ছোট্ট বাড়িটি মাপে ছোট হলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য হওয়ার কারণে মর্যাদা ও গৌরবে এক বিশালতা জুড়ে থাকলেও কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়ির যেমন বিপুল খ্যাতি ও পরিচিতি, সে তুলনায় শহরের ভেতরের এ বাড়িটি এখনও প্রায় অপরিচিতই বলা যায়।

ভুসিমালের কারবারের সঙ্গে এখানে কবি আখ মাড়াইকল ও পাটের গাঁট তৈরির কলও স্থাপন করেছিলেন। পরে স্বদেশি আন্দোলনের চেতনায় টেগর লজকে কেন্দ্র করে একটি বড় তাঁতশালাও গড়ে তোলেন। কবিকে ব্যবসার কাজে সাহায্য করতেন তার দুই ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথমদিকে ব্যবসা ভালো চললেও পরে টেগর অ্যান্ড কোম্পানি ক্রমাগত লোকসান দিতে থাকে। পাটের কারবার করতে এসে কবি লাখ টাকার ওপরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। উপায়ান্তর না দেখে তিনি শ্বশুরবাড়ি খুলনার দক্ষিণডিহির উদ্যমী যুবক যজ্ঞেশ্বরকে ব্যবসা দেখভালের দায়িত্ব দেন। যজ্ঞেশ্বর বহু খেটেখুটে ডুবতে বসা টেগর অ্যান্ড কোম্পানিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাতে থাকেন। একপর্যায়ে কবি তিন হাজার টাকায় যজ্ঞেশ্বরকে কোম্পানির সমুদয় যন্ত্রপাতি ও মালামাল দান করে দেন এবং 'টেগর লজ'সহ এখানকার দুই বিঘা জমি বছরে ৫০ টাকা খাজনার বিনিময়ে বন্দোবস্ত করে দেন। পরে যজ্ঞেশ্বর এখানে 'যজ্ঞেশ্বর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস' নামে একটি কারখানা গড়ে তোলেন (কারখানা ভবনটি এখনো আছে)। তারপর তো কেটে গেছে বহু দিন। একপর্যায়ে টেগর লজ বেদখল হয়ে যায়। বহু হাত বদল হয়ে অবশেষে এর মালিকানা এসে পেঁৗছায় স্থানীয় আবদুল গফুরের স্ত্রী ছালিমা খাতুনের নামে। আশপাশের জমিও চলে গেছে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে। তারা নিজেদের নামে কাগজপত্র করে নিয়েছেন। এর মধ্যে বাড়িটি আরও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ২০০৪ সালে পৌরসভার পক্ষে পাঁচ লাখ টাকায় বাড়িটি কিনে নেওয়া হয়। নিচের তলায় একটি বড় হলঘর ও একটি ছোট ঘর রয়েছে। ওপরে রয়েছে তিনটি ঘর। মাঝের ঘরটি একটু বড়। এখানে একটি আলমারিতে রাখা আছে কবির রচিত গ্রন্থমালা। দেয়ালে ঝুলানো কবির আঁকা ১২টি ছবির অনুকৃতি। দক্ষিণে সবুজ ঘাসে ঢাকা একচিলতে আঙিনা। সেখানে ছোট্ট একটি মঞ্চও আছে। উত্তরের প্রবেশপথের সামনেই কবির আবক্ষ মূর্তি। এ মূর্তি ও ছবির অনুকৃতিগুলো ভারতীয় দূতাবাস দান করেছে বলে জানিয়েছেন টেগর লজের তত্ত্বাবধায়ক এসএম নূরুদ্দিন। উপর তলায় আসবাবের মধ্যে রয়েছে কয়েকটি চেয়ার ও হেলান দিয়ে বসার একটি লম্বা বেঞ্চ। এগুলো শিলাইদহের আসবাবের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে। জরাজীর্ণ দেয়াল ছাড়া আর কিছুই ছিল না বাড়িটিতে। কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট লিয়াকত আলী বলেন, 'শিলাইদহের কুঠিবাড়ি সুপরিচিত হলেও টেগর লজকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া শহরের সঙ্গে কবির যে সম্পর্ক, তা অনেকেরই অজানা। ফলে টেগর লজ আজও উপেক্ষিত। টেগর লজকে অনতিবিলম্বে রবীন্দ্র জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় পরিণত করতে তিনি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী ভবনটিকে ঘিরে কুষ্টিয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার পাদপীঠ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

কবি যখন ট্রেনে কলকাতা থেকে আসতেন বা কলকাতা যেতেন, তখন শিলাইদহ যাতায়াতের সময় টেগর লজে বিশ্রাম নিতেন। অনেক সময় রাতযাপনও করেছেন। ব্যবসায়িক কাজের তদারক করেছেন এখানে থেকেই। তিনি কুষ্টিয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন বসন্তের ফুলে ভরা একটি কুরচি গাছ নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। '১০ বৈশাখ ১৩৩৪-এ লেখা 'কুরচি' নামে এ কবিতা পরে বনবাণী বইয়ে গ্রথিত হয়।' পদ্মা-গড়াই-হিশনার শীতল স্রোতে প্লাবিত এই অঞ্চল। এখানকার জনপদের ইতিহাস এক নদীর মতোই উদার, মহান ও বিশালতাই পূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ এখানে এসেছিলেন প্রথমে জমিদারি ও ব্যবসা দেখাশোনা করার কাজে। পরে মিশে গিয়েছিলেন এখানকার প্রতিটি মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে। তার প্রতিটি লেখায় মূর্ত হয়ে উঠেছে এখানকার মানুষের কথা। হয়ত কুষ্টিয়ার অকৃত্রিমতাই মুগ্ধ হয়ে কবি গেয়ে উঠেছিলেন 'আকাশ ভরা সূর্যতারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ/তাহারি মাঝখানে, আমি পেয়েছি মোর স্থান/ বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান'। শুধু জমিদারিত্বই নয়, এ স্থানটি ছিল রবি ঠাকুরের সাহিত্য সৃষ্টির এক অপূর্ব প্রেরণা। এখানে বসেই তিনি রচনা করেন মানসী, সোনারতরী, চিত্রা, বলাকা, ক্ষণিকা, নৈবদ্য প্রভৃতি কবিতা। তার অনবদ্য সৃষ্টি গল্পগুচ্ছের অধিকাংশ গল্প রচিত হয়েছিল এখানেই। এমনকি গীতাঞ্জলির অধিকাংশ গান সৃষ্টি হয় এ কুষ্টিয়ায়। ১৮৯০ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ বিচরণ করেছেন তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান টেগর লজে। জমিদারির কাজে কিংবা ব্যবসার কাজে কখনো স্বল্প-কখনো দীর্ঘ সময় থেকেছেন এখানেই। এসেছেন একাকী কিংবা সপরিবারে। ঘুরে বেড়িয়েছেন বোটে, পালকিতে। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়াকে কতখানি সমৃদ্ধ করেছিলেন তার লেখাতেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। শিল্প-সাহিত্য, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এখানে সে সময় আবির্ভাব ঘটেছিল বড় বড় প্রভাবশালী মহৎ সব ব্যক্তিত্বের। তাই তিনি আবেগভরা কণ্ঠে বলেছিলেন_ 'ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী আমারই সোনার ধানে গিয়াছে যে ভরি'। বাঙালি চিরকাল যাদের নিয়ে গর্ব করবে, তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যতম। তাই তার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

সিরাজ প্রামাণিক, খোকসা (কুষ্টিয়া)

ট্রি-হাউস

0 comments
বিশ্বজুড়েই অন্যরকম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার নাম ট্রি-হাউস বা গাছবাড়ি। গাছের ওপর বসবাস! ভাবতেই কেমন যেন একটা পুলক বোধ হয়! ভাবতেই অবাক লাগে, গাছের উপর ঘর। পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই রয়েছে গাছবাড়ি। এর মধ্যে কিছু রয়েছে প্রাচীন উপজাতিদের সত্যিকার বসবাসের জায়গা। আবার এর অনেকগুলো তৈরি করা হয়েছে নিতান্তই শখের বশে। সে রকমই একজন শখের মানুষ হরেস বারজেস। তিনি যে গাছবাড়ি বা ট্রি-হাউসটি তৈরি করেছেন সেটিই বিশ্বের সর্ববৃহৎ 'ট্রি-হাউস'। এ বাড়িটিকে তিনি ঈশ্বরের বাড়ি বলে অভিহিত করেন।


১৯৯৩ সাল থেকে এ গাছবাড়ির পরিকল্পনা ও কাজ শুরু করেন বারজেস। এটি কেবল একটি ট্রি হাউসই নয়, রীতিমতো একটা বিশাল বাড়ি! এতে রয়েছে ছোট একটি বাস্কেট বল কোচ, যার নিচে ২৫৮টি গজাল দেওয়া। বারজেস প্রচণ্ডরকম ঈশ্বর বিশ্বাসী মানুষ। আর এটিকে ঈশ্বরের বাড়ি বলার পেছনে একটা কারণ রয়েছে। বারজেস জানান, একদিন প্রার্থনায় ঈশ্বরের কাছ থেকে তিনি ট্রি-হাউস বানানোর আদেশ পান। ঈশ্বর তাকে সবরকম সহযোগিতারও আশ্বাস দেন। এ বাড়ি তৈরির কাজে তিনি ব্যবহার করেছেন গ্যারেজ, স্টোর রুম ও গোলাঘর থেকে পরিত্যক্ত জিনিসপত্র। বাড়িটি তৈরি করতে মোট ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ডলার।

ট্রি-হাউসটি তৈরি করা হয়েছে ৮০ ফুট উঁচু সাদা ওক গাছের ওপর। মাটি থেকে যা ৯৭ ফুট লম্বা। এর ব্যাসার্ধ প্রায় ১২ ফুট এবং পাশটি ৮ থেকে ১০ হাজার স্কয়ার ফুট। এর রয়েছে ১১টি মেঝে, ছয়টি অন্য ধরনের গাছ দিয়ে পাশে সুরক্ষিত দুর্গের মতো বেড় দেওয়া রয়েছে এটিতে। প্রায় স্বর্গের কাছাকাছি, ঈশ্বরের এ বাড়িটি তার একার নয়, বরং সবার জন্য। প্রচুর কাঠ লেগেছে এ বাড়িটি তৈরি করতে। তার হাতকে ঈশ্বর প্রতিটি স্থানে ব্যবহার করেছেন বলে জানান বারজেস। তিনি আগে গ্রামাঞ্চলে বাস করতেন কিন্তু বর্তমানে বাস করছেন শহরে। পেশায় বারজেস ল্যান্ডস্কেপ আর্কিট্যাক্ট। পৃথিবীতে তিনিই প্রথম এতবড় ট্রি-হাউস তৈরি করেছেন। বারজেসের বিশ্বাস-কেবল ঈশ্বরের কৃপার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।

আমিন রহমান নবাব

Friday, January 28, 2011

আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট

0 comments
একে বলা হয় ঈশ্বরের সিন্দুক। হাজার বছর ধরে মানুষের কাছে এক অপার রহস্যের বিষয় হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে এই আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট। হিব্রু, বাইবেল আর অন্যান্য প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ অনুসারে এই আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট হচ্ছে ঈশ্বরের নির্দেশে নির্মিত একটি সিন্দুক বা বাক্স। আর এই বাক্সের ভেতর সৃষ্টিকর্তার ১০টি অনুশাসনের বাণী সযত্নে রাখা আছে। পেন্টাটিউক অনুসারে সিনাই পর্বতে থাকা অবস্থায় সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে মুসা এই আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট নির্মাণের নির্দেশ পান। এটিকে ইসরায়েলের সৌন্দর্য নামে অভিহিত করা হয়। তবে অন্য একটি মতানুসারে মোট দুটি আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে একটি নির্মাণ করেন মুসা। অন্যটি বেজালিল। আবার একাধিক প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে খানিকটা ভিন্নমত প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সবকিছুর ঊধর্ে্ব মূল কথা একটাই, এটি একটি পবিত্র এবং সৌভাগ্যের প্রতীক। এতে রয়েছে স্রষ্টার অনুশাসনের বাণী। আর এই?আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট যার কাছে থাকবে, সেই হবে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী।

বিশ্বজুড়েই আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট পরম আকাক্সিক্ষত এক বস্তুর নাম। ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সব মানুষ ঈশ্বরের সিন্দুকের সন্ধান করে গেছে বছরের পর বছর। এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ, ইতিহাসের বই-পুস্তক আর জনশ্রুতি_ সবকিছুতেই আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্টের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০০৮ সালে 'চ্যানেল ফোর' এ নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও প্রচার করে। ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ডেরও এ নিয়ে দাবি কম নয়। প্রত্নতাত্তি্বক ধর্মীয় যাজকরা এখনো আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট খুঁজে বেড়ান। চ্যানেলে চ্যানেলে এ নিয়ে প্রচার হয়েছে বহু তথ্যচিত্র, নির্মিত হয়েছে বহু চলচ্চিত্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে-'ডেভিড অ্যান্ড বাথশিবা' [১৯৫১], 'দ্য টেন কমান্ডমেন্টস' [১৯৫৬], 'সলোমন অ্যান্ড শিবা' [১৯৫৯], 'ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড দ্য লাস্ট ক্রুসেড' [১৯৮৯], 'ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড দ্য কিংডম অব দ্য ক্রিস্টাল স্কাল' [২০০৮], 'মেগামাইন্ড' [২০১০] প্রভৃতি। আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট নিয়ে নির্মিত হয়েছে ভিডিও গেমসও। বিশ্বজুড়েই তাই এটি এক বিশাল কৌতূহলের নাম।

আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট রহস্য নিয়ে নির্মিত ইন্ডিয়ানা জোনসের রেইডার অব দ্য লস্ট আর্ক ছবিটির গল্প অসাধারণভাবে এগিয়ে যায়। ছবির গল্পের শুরু ১৯৩৬ সালে। গুপ্তধন সন্ধানী ইন্ডিয়ানা জোনস একজন বিখ্যাত হান্টার। তিনি পেরুভিয়ান জঙ্গলে জটিল ধাঁধার এক মন্দির থেকে উদ্ধার করেন একটি স্বর্ণমূর্তি। আর সেটি দস্যুদের হাতে পড়ে ফিরে আসে আমেরিকায়। একসময় জোনস জানতে পারেন, হিটলারের নাৎসি বাহিনী খোঁজ করছে 'আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট'-এর। জিনিসটি হলো একটি সিন্দুক, যা ঈশ্বরের নির্দেশে ধর্মযাজক জ্যাকবের বারো বংশধর নির্মাণ করেছিল। আর সেই সিন্দুকে তারা সযত্নে রেখে দিয়েছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত ১০টি অনুশাসনের বাণী। কথিত আছে, যার কাছে এ মহামূল্যবান ও পরম পবিত্র সিন্দুকটি থাকবে, তিনি মালিক হবেন পৃথিবীর সব শক্তির। আর মূলত এ কারণেই নাৎসি বাহিনী হন্যে হয়ে সেই সিন্দুকের খোঁজ করতে শুরু করে। গল্পে সেই সিন্দুক নিয়েই জোনস আর নাৎসি বাহিনীর মধ্যে চলে নানা অভিযান, যুদ্ধ আর হানাহানি। কিন্তু আসলে কোথায় সেই আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট। ছবিতে এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

উত্তর নেই বাস্তবেও। প্রকৃত অর্থেই আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট রহস্যের কোনো শেষ নেই। বাইবেলে বলা হয়েছে, সিন্দুকটি ঈশ্বরের নির্দেশেই বানানো হয়েছিল। অ্যাকাসিয়া নামের মিসরের একটি পবিত্র গাছের কাঠ দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। আর সৌন্দর্যের জন্য পরে এটিকে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সিন্দুকটি লম্বায় ১.১৫ মিটার, প্রস্থে ০.৭ মিটার আর উচ্চতায় ০.৭ মিটার। এটি বহন করার জন্য রয়েছে দুটি হাতল। নির্মাণের পর থেকে বহু বছর ইহুদিরা এটি তাদের কাছে সযত্নে রেখেছিল। ইহুদিরা যখন 'ল্যান্ড অব ক্যাননে' এসে পেঁৗছায়, তখন তাদের পথ দেখিয়েছে এ সিন্দুক। এই সিন্দুকের জন্যই জর্ডান নদী দুই ভাগ হয়ে রাস্তা করে দিয়েছিল তাদের। রাজা ডেভিড ও তার ছেলে সলোমন জেরুজালেমে স্থানান্তর করে সিন্দুকটি একটি মন্দিরে রেখে দেন। বহু বছর পর ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুচাঁদনেজার ধ্বংস করে ফেলেন মন্দিরটি।

প্রায় সব জায়গায় বর্ণিত ঘটনাতেই এতটুকু মিলে গেছে। কিন্তু এর পরের ঘটনা নিয়েই বিশ্বজুড়ে যত বিতর্ক। কোথায় আছে পবিত্র সিন্দুকটি? অনেকে বলেন, ব্যাবিলন সভ্যতার কাছেই সিন্দুকটি রয়ে গেছে। আবার অনেকের মতে, রাজা সলোমন নিজেই সিন্দুকটির এমন ভবিষ্যৎ আন্দাজ করতে পেরে 'ডেড সি'র কাছে একটি গুহায় সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা আর জিম্বাবুয়ের লেম্বা সম্প্রদায়ের দাবি, তাদের পূর্ব-পুরুষরাই সিন্দুকটি বহন করে নিয়ে এসেছে। ইথিওপিয়ান খ্রিস্টানরা দাবি করে, সিন্দুকটি আসলে ইথিওপিয়ার অ্যাজিউমে সংরক্ষিত আছে। এরকম অনেকের অনেক রকম মত রয়েছে। কিন্তু মন্দিরটির প্রকৃত অস্তিত্ব আর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনোভাবেই নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্যদিকে প্রত্নতাত্তি্বক লিন রিটমেয়ার গবেষণা করে জানিয়েছেন, সিন্দুকটি টেম্পল মাউন্টে রক্ষিত আছে। নির্মাণের বহু বছর পর্যন্ত সিন্দুকটি জেরুজালেমে ছিল বটে; কিন্তু সেখান থেকে হঠাৎ করেই হারিয়ে যায় এটি। এ শতাব্দীতে এসে নাকি সিন্দুকটির খোঁজও মিলেছে। যদিও এ নিয়ে কেউই কোনো কথা বলতে চায় না। তাই রহস্যগুলো আরও যেন জটিল হতে থাকে। মানুষ যতই এগিয়ে যায়, ততই আরও জটিল হতে থাকে কোথায় আছে সেই ঈশ্বরের সিন্দুকটি। বলা হয়, প্রতি বছর শুধু একবার প্রধান ধর্মযাজক পবিত্র প্রাণীর রক্ত হাতে মেখে দেখতে পারবেন সিন্দুকটি। কোনো পাপী ব্যক্তি কোনোভাবেই সিন্দুকটি স্পর্শ করতে পারে না। পাপীদের জন্য সিন্দুকটি দেখারও অনুমতি নেই। ইতিহাসে আছে, যখনই কোনো পাপী মানুষ এটি দেখতে গিয়েছে কিংবা স্পর্শ করতে চেয়েছে, তখনই সে ঈশ্বরের কাছ থেকে কঠিন শাস্তি পেয়েছে। তবু বৈজ্ঞানিক মনের মানুষের গবেষণার শেষ নেই। ধর্মভীরু, প্রত্নতাত্তি্বক থেকে শুরু করে ইতিহাসবেত্তা এমনকি সাধারণ মানুষও মনে মনে খুঁজে বেড়ান সেই রহস্যময় পবিত্র সিন্দুক। কিন্তু সেই রহস্য আজো রহস্যই রয়ে গেছে।

-রণক ইকরাম

ডেলফি মন্দির

0 comments
গ্রিসে অবস্থিত ডেলফির মন্দির বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে স্থান দখল করে আছে। দেবতা অ্যাপোলোর মন্দির বলে খ্যাত এ স্থানটির সঙ্গে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটসহ বহু ইতিহাস খ্যাত মানুষের নাম জড়িয়ে আছে। ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতাসহ নানা কারণে এ মন্দিরটি আজো কোটি কোটি মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

গ্রিক মিথোলোজি অনুসারে ডেলফি ছিল একটি দৈববাণী প্রকাশের মাধ্যম বা জায়গা। ক্ল্যাসিক্যাল গ্রিক বিশ্বে এই স্থানটির রহস্যময়তা ও গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেবতা অ্যাপোলোর মন্দির হিসেবে তৎকালীন মানুষের কাছে এর গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। গ্রিসে এ মন্দিরটি স্থাপন করা হয় যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও বহুকাল আগে। ডেলফি নামে এই পাহাড়ি-পাথুরে এলাকায় আধ্যাত্মিক শক্তির বিশেষ প্রভাব আছে বলে ওই সময়কার লোকেদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। এ মন্দিরের দেবতা হলেন অ্যাপোলোর। মজার ব্যাপার হলো_ এ মন্দিরে কোনো যাজক ছিল না। কেবল বিশেষ মতাদর্শের নারীরাই মন্দিরটির যাজিকার পদ পেত। তাদের ডাকা হতো 'পিথিয়া' নামে। এ পিথিয়ারা মানুষের ভবিষ্যৎ বলতে পারতেন। নিখুঁতভাবে ভাগ্য গণনা করতেন। কেউ সমস্যায় পড়লে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন। পিথিয়াদের সাহায্য নিতে প্রতিদিন শত শত মানুষ ডেলফির মন্দিরে ভিড় জমাত। কিন্তু এ মন্দিরটির অস্তিত্ব ঠিক কোথায় ছিল তা বহুকাল অজ্ঞাত ছিল। মন্দিরটির পুনরাবিষ্কার সম্পর্কে দারুন একটি গল্পের প্রচলন রয়েছে।

বহুকাল আগে ডিমোসরাস নামে এক ব্যক্তির একপাল ছাগল ছিল। একপাল বললে ভুল হবে। বরং বলা চলে একপালের চেয়েও বেশিসংখ্যক ছাগল ছিল তার। তার একার পক্ষে এতগুলো ছাগল চরানো ছিল বেশ কঠিন। সেজন্য ডিমোসরাসকে প্রচুর কষ্ট করতে হতো। পাহাড়ের পাদদেশে তাজা ঘাস খাওয়াতে প্রতিদিনই ছাগলের পাল নিয়ে যেত সে। এভাবেই চলছিল সবকিছু। এরইমধ্যে একদিন দুপুরে ঘটল বিচিত্র এক ঘটনা। একটি বিশেষ জায়গার ঘাস খেয়ে আধা ডজন ছাগল অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করল। প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেননি ডিমোসরাস। এগিয়ে এসে জায়গাটি ভালো করে পরখ করতে পাহাড়ের গায়ে চওড়া এক ফাটল খুঁজে পেলেন ডিমোসরাস। এখন কী করণীয়? ভাবতে ভাবতেই বেশ চওড়া ফাটলটির ভেতরে ঢুকে পড়লেন তিনি। কিন্তু তার মধ্যেও দেখা দিল অস্বাভাবিকতা। একসময় তাকে খুঁজতে অন্য রাখালরা সেখানে এসে পেঁৗছল। সঙ্গীদের দেখে তাদের ভবিষ্যৎ বলতে শুরু করলেন ডিমোসরাস। ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। অনেকে জায়গাটি দেখতে চলে এলো। অবশেষে জানা গেল, এখানেই ছিল ভবিষ্যদ্বক্তা যাজিকা 'পিথিয়া'দের রহস্যময় ডেলফির মন্দির। একসময় অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির যাতায়াত ছিল ডেলফির মন্দিরে। পরবর্তী সময়ে ফাটলকে কেন্দ্র করে মাটি খুঁড়ে মন্দিরটির বর্তমান আকার খুঁজে পাওয়া যায়। পবিত্রতা এবং ভবিষ্যৎ জানার অন্য এক ভুবন ছাড়াও পাথুরে পিলার আর দেয়ালের সৌন্দর্যমণ্ডিত মন্দিরটির প্রত্নতাত্তি্বক গুরুত্বও কম নয়।

এক সময় পিথিয়াদের সাহায্য নেওয়ার জন্য ওই সময়ের বিখ্যাত ব্যক্তিরাও ডেলফির মন্দিরে এসে ভিড় জমাতেন। ডেলফির মন্দিরের সাহায্যপ্রত্যাশী বিখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকায় আছেন সম্রাট আলেকজান্ডার, সম্রাট নিরো ও মহাকবি হোমারের মতো ইতিহাসখ্যাত মানুষজন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ প্লুটার্ক ডেলফির মন্দির সম্পর্কে বলেন, প্রথমদিকে মন্দিরের পিথিয়া ছিল একজন। কিন্তু খুব অল্প দিনেই মন্দিরের প্রচার ও প্রসার বাড়তে থাকে। সাহায্যপ্রত্যাশী লোকজনের চাপ বাড়ার পর আরও দুইজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সম্রাট আলেকজান্ডার ডেলফির মন্দিরে এসে তার ভবিষ্যৎ জানতে চেয়েছিলেন। তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে বিরক্ত হয়ে তখনকার পিথিয়া বলেছিলেন, এখন ভবিষ্যৎ বলার উপযুক্ত সময় নয়, আপনি চলে যান। আলেকজান্ডার এ কথা শুনে রেগে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, সম্রাটের জন্য কোনো সময়-অসময় নেই। এখনই বল আমার ভাগ্যে কী আছে? অবশেষে বলপ্রয়োগ করলে পিথিয়া বলেন_ বেশ, শুনতে যখন চান তখন বলি। অনেক বড় বীর হিসেবে পৃথিবী আপনাকে মনে রাখবে, শত্রুরাও আপনার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। কিন্তু আপনার মৃত্যু হবে বিদেশের মাটিতে, শোচনীয় অবস্থায়। পিথিয়ার এ রকম ভবিষ্যদ্বাণী হুবহু ফলে গিয়েছিল। আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয় মাত্র ৩৩ বছর বয়সে, মারাত্মক জখম হয়ে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৮ অব্দে ডেলফির মন্দির একবার আগুনে পুড়ে যায়। সেটি পুনঃনির্মাণ কাজে মিসরীয় সম্রাট অ্যামেসিসের ব্যাপক অবদান ছিল। সময়ের আবর্তনে ডেলফির মন্দির একসময় পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। তবে এ মন্দিরের প্রত্নতাত্তি্বক গুরুত্ব অনুধাবন করে মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ এখন বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এখনো বছরের বিশেষ সময়ে আধুনিক পিথিয়ারা মানুষের ভবিষ্যৎ বলার কাজে এখানে ভিড় জমান। কিন্তু ডেলফির মন্দির আর একে ঘিরে সব গল্প এখনো রহস্যই রয়ে গেছে।

-রণক ইকরাম

ফিঙ্গারপ্রিন্ট

0 comments
ফিঙ্গারপ্রিন্ট তিন ধরনের হয়।
১।loop
২।whorl
৩।arch
বেশিরভাগ লোকের থাকে লুপ(৭০%), whorl থাকে প্রায় ২৫% লোকের আর arch থাকে ৫% লোকের।লুপকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়।সিংগেল লুপ এবং ডাবল লুপ।

ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাঝখানের অংশকে বলা হয় কোর।কোরটি ভাল করে দেখলে দেখা যায় এটি লুপ আকৃতি ধারণ করেছে। Figure 1 এ ডেল্টা এক টি দেখানো হয়েছে।ডেল্টা দুটিও হতে পারে দুপাশে।
Whorl এর কোর দেখুন গোলাকার।এক টা সারকেল এর উপরে আর এক টা সারকেল ।ডেল্টা এখানে দুটি।বৃত্তাকার pattern.

Arch টা ভালো করে খেয়াল করে দেখুন একদম সরল রেখার মত একটু বেকে গিয়ে পাহাড়ের মত আকার ধারণ করেছে।Delta নাই।
আপনি আপনার ফিংগার ইঙ্ক প্যাড এ ঠেসে একটি সাদা কাগজে ইমেজ তৈরি করুন আর দেখুন আপনার টা কোন টাইপের।তুলনা করার জন্য্ অন্য আরেকজনের টা নিয়ে তুলনা করুন।ম্যাগনিফাইং গ্লাস ইউজ করতে পারেন ভাল করে দেখার জন্য।
লিখেছেনঃ রুমেল

মসলিন

0 comments
মসলিন ইতিহাসখ্যাত অসাধারণ বস্ত্রশিল্পের নাম। এর কদর ছিল বিশ্বজুড়ে। কথিত আছে যে, এক টুকরো মসলিন ছিল ৪০ হাত দীর্ঘ আর প্রস্থে ছিল ২ হাত। এটি এতই সূক্ষ্ম ছিল যে, এক টুকরো মসলিনকে একটি আংটিতে সহজেই পোরা যেত। একটা সময় ছিল যখন এই বস্ত্রটি সোনারগাঁয়ে ব্যাপকভাবে তৈরি হতো। আর বিশ্ববাজারে এর ব্যাপক চাহিদা ছিল।

জেমস টেলর তার ‘ফটোগ্রাফি অব ঢাকা’য় ১৭৪৭ সালের ঢাকাই মসলিনের রফতানি সংক্রান্ত যে হিসাব দেখিয়েছেন তাতে উল্লেখ আছে, তখন সোনারগাঁও থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার মসলিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রফতানি হতো। অন্যদিকে খ্যাতিমান পর্যটক ইবনে বতুতা সোনারগাঁয়ের যে বর্ণনা করেছেন তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, ‘ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সোনারগাঁও একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ছিল এবং এই বন্দরনগরীর সাথে চীন, ইন্দোনেশিয়া (জাভা) ও মালয় দ্বীপপুঞ্জের সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল’।

রালফফিচের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ‘সে সময়ে সোনারগাঁও থেকে প্রচুর তাঁতবস্ত্র অর্থাৎ পৃথিবীবিখ্যাত মসলিন ভারত, সিংহল, মালাক্কা, সুমাত্রাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। জেমস টেলরের মতে, তখন মসলিন ক্রয়-বিক্রয়ের প্রসিদ্ধ বাজার ছিল পানাম নামক স্থানটি। পানামনগরের কাছেই অবস্থিত বিশাল আকৃতির খাসনগন দিঘি, যা আজও বিদ্যমান, সে দিঘির স্বচ্ছ পানিতে মসলিনের সুতা ধুয়ে দিঘির চারপাশে মসলিন সুতা টানা দেওয়া হতো। জেমস অ্যাটকিনসন উনিশ শতকের প্রথমদিকে মসলিন সর্ম্পকে লিখেছিলেন, ‘এই প্রদেশে (বাংলার সর্বত্রই) ব্যাপকভাবে মসলিন তৈরি হয়ে থাকে’। তবে ভালো মানের মসলিন তৈরির জন্য যে ধরনের সহায়ক পরিবেশের প্রয়োজন ছিল তার জন্য সোনারগাঁ ছিল উল্লেখযোগ্য। কারণ যেসব অঞ্চল প্রতি বছর গঙ্গার জলে প্লাবিত হয় সেসব এলাকায়ই শ্রেষ্ঠ জাতের তুলা উৎপন্ন হতো। উন্নত মসলিন তৈরির জন্য উন্নত কার্পাস, স্বচ্ছ পানি, দ কারিগর এবং আর্দ্র জলবায়ুর প্রয়োজন ছিল। সোনারগাঁও অঞ্চল ছিল মসলিন তৈরির এক উপযোগী স্থান। তবে মজার বিষয় হলো, মসলিন মোগল রাজা-রানীদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই অনেক বেশি সমৃদ্ধি লাভ করে। শুধু তাই নয়, সে সময়ের উল্লেখযোগ্য বণিক-পর্যটকদের মন্তব্য থেকে ধারণা করা যায়, এ মসলিনের মতো বিশ্বের কোথাও এত উন্নত, নিখুঁত এবং নিপুণ কারুকাজের বস্ত্রশিল্প ছিল না। বাংলার সুবাদাররা মোগল বাদশাহদের দৃষ্টি কাড়তে তাদের কাছে উপঢৌকন হিসেবে মসলিন শিল্পকেই বেছে নিতেন। জানা যায়, এমনকি সম্রাজ্ঞী নুরজাহান এই মসলিন বস্ত্রের একজন অতি অনুরাগী ছিলেন।

জানা যায় যে উত্তর ভারতীয় বন্দর শহর মসলিপাটনাম থেকে প্রাচীন গ্রীসের বনিকরা কিনে নিয়ে যেত,ঐ শহরকে Maisolos নামেও ডাকা হত।অনেকে ধারন করেন Maisolos মসলিন শব্দটি এসেছে। আবার অনেকে ধারনা করেন মসলিন কাপড় বিক্রির জন্য প্রশিদ্ধ হওয়ায় ঐ স্থানের নাম মসলিনের নামে করা হয়েছে। বিখ্যাত পরিব্রাজক মার্কোপোলো এই অঞ্ছলে মসলিন কাপড়ের কথা বলেছেন

অন্যভাবে এস. সি. বার্নেল ও হেনরি ইউল নামের দুইজন ইংরেজের অভিধান "হবসন জবসন"-এ বলা হয়েছে মসলিন শব্দটি এসেছে ইরাকের এক বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র মসুল থেকে। মসুলও সূক্ষ্ম কাপড়ের জন্য বিখ্যাত। এই 'মসূল' এবং 'সূক্ষ্ম কাপড়' -এ দুয়ের যোগসূত্র মিলিয়ে ইংরেজরা অতিসূক্ষ্ম কাপড়ের নাম দেয় 'মসলিন'।

নবম শতাব্দীতে আরব বনিক রুমি নামে এক পাতলা কপড়ের কথা উল্লেখ করেছেন যা বাংলায় উৎপাদিত।
যেভাবে হোক মসলিন যে আমাদের দেশীয় উৎপাদন তাতে সন্দেহ নাই।

অভিজাত শ্রেনীর পরিধেয় কাপড়,ছাকুনী,ব্যান্ডেজ,কাপড় প্রভৃতিতে মসলিন ব্যাবহার হত।এমনকি মমির গায়ে যে কাপড় প্যাচানো হত তাও মসলিনের তৈরি।

বহু প্রাচীনকাল থেকে এই দেশের তাতীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উত্তম কার্পাস থেকে মিহি তন্তু উত্পাদন করে সুতিবস্ত্র বয়ন করে আসছেন। এর মধ্যে মসলিন বস্ত্র তার সূক্ষ্মতা ও নান্দনিকতায় বিশ্বের বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। অনেক বরেন্যরা লিখেছেন, ঈসা নবীর জন্মের প্রথম শতাব্দীকাল থেকেই বঙ্গদেশে বয়নশিল্প গড়ে উঠেছিল। বংশপরম্পরায় অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই শিল্প দ্রুত উত্কর্ষ লাভ করে। ঢাকা, সোনারগাঁও, ধামরাই, তিতাবাদি, জঙ্গলবাড়ি ও বাজিতপুরের তাতীরাই এই ব্যাপারে সিদ্ধ হস্ত ছিল।

প্রাচীন আমল থেকেই বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পের সুখ্যাতি থাকলেও মূলত মুঘল আমলে ঢাকা যখন রাজধানী হয় তখন থেকেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাপড়ের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে । সম্রাট, নবাবেরা মসলিন কাপড় কেনা আরম্ভ করেন চড়া দামে। সে যুগে মসলিন তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল ঢাকা, ধামরাই, সোনারগাঁ, টিটবাদি, জঙ্গলবাড়ি আর বাজিতপুর। জঙ্গলবাড়ি অধিকাংশের পেশা তখন মসলিন বোনা। উনিশ শতকের প্রথমভাগেও সেখানে একাজে নিয়োজিত ছিলেন প্রায় একশ তাঁতি পরিবার। জঙ্গলবাড়ি থেকে মাইল কুড়ি দূরে বাজিতপুর- ওখানে জন্মাতো উচুঁমানের কার্পাস, যা থেকে তৈরি হতো উঁচুমানের মসলিন। আজ থেকে দু'শ বছর আগেও বিদেশী বণিকেরা সোনারগাঁ থেকে মসলিন বিদেশে রপ্তানী করতো।

সাধারনত, মহিলারাই সুতা কাঁটা আর সূক্ষ্ম সুতো তোলার মত পরিশ্রম এবং ধৈর্যের কাজে নিয়োজিত ছিল। সুতো তোলার সময় কম তাপ এবং আর্দ্রতার দরকার হতো। তাই একেবারে ভোর বেলা আর বিকালের পরে এ কাজ করা হতো। মজার ব্যাপার হলো- আর্দ্রতার খোঁজে অনেক সময় এমনকি নদীতে নৌকার ওপর বসে সুতা কাটার কাজ চলত। একজন মহিলা এভাবে প্রতিদিন সুতো কেটেও মাসে মাত্র আধা তোলা সুতা তুলতে পারতেন। এই পরিশ্রমসাধ্য কাজের কারণে দক্ষ সুতা কাটুনির সংখ্যা অনেক কমে আসতে থাকে উনিশ শতকের শুরু থেকেই। জানা গিয়েছে- এই রকম সূক্ষ্ম সুতো কাটার কাজ অঞ্চল ছাড়া অন্য কোথাও এতোটা ভাল হতো না । এর কারণ ধরা হয় দু’টো- ঢাকার ফুটি কার্পাস আর শ্রমিকের দক্ষতা ও পরিশ্রম।

মসলিন তৈরির কাজটি ছিল ভীষন জটিল, কঠিন, সময়সাধ্য- তারচেয়েও বড় কথা হলো সেটা তৈরির জন্য দরকার হতো অসামান্য নৈপুণ্য আর আসুরিক ধৈর্য। মোটামুটি যে ক’ধাপ পেরিয়ে তৈরি হতো মসলিন সেগুলো হলো; সুতা নাটানো, টানা হোতান, সান বাঁধা, নারদ বাঁধা, বু-বাধাঁ, আর সবশেষে কাপড় বোনা । এসব শেষে একজন তাঁতি আর তার দু’জন সহকারীর লাগতো কমপক্ষে দু’তিন মাস।

মসলিন তৈরি শেষে ওগুলো ধোয়া হতো। সম্রাট আকবর এর আমালে সোনারগাঁ’র কাছে এগোরো সিন্ধুর জল কাপড় ধোয়ার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। আসলে এটা যে শুধু জলের গুনে হতো তা নয়, এর সাথে ছিল ভাল ক্ষার বা সাবান আর ধোপার দক্ষতা। মসলিন ধোবার জন্য রীতিমতো একটা শ্রেনীর মানুষই তৈরি হয়েছিল। আঠারো শতকের গোড়ায় একখন্ড মসলিন ধোয়ার খরচ পড়তো দশ টাকা। আবার ধোয়ার সময় কাপড়ে কোন দাগ লাগলে বিভিন্ন ফলের রস দিয়ে সেটা তুলে দেয়া হত। কাপড় ধোবার সময় কোনো সুতো সরে গেলে সেটা ঠিক করতো দক্ষ রিফুকাররা, তাদেরকে বলা হতো নারোদিয়া। এরপর শঙ্খ বা ছোট মুগুর দিয়ে পিটিয়ে মোলায়েম করা হতো। মোলায়েম করার সময় ছিটানো হতো চাল ধোয়া জল। একাজে নিয়োজিতরা কুন্ডুগার নামে পরিচিত। তারপর সাবধানে ইস্ত্রি করা হতো মসলিন। কোন কোন মসলিনে সুঁচের বা চিকনের কাজও করা হতো। কোন কোন সময় রঙও করা হতো। ঢাকার চিকনের কাজেও যথেষ্ট সুনাম ছিল, এখনও আছে । এরপর কাপড়গুলোকে ভালমতো ঠোঙাবন্দী করা হতো, একাজ যারা করতো তাদের বলা হতো বস্তাবন্দী।

সে সময়ে মসলিনের মানগত দিক বিবেচনা করে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত এতে করা হতো, এর মধ্যে শবনম, নয়নসুখ, জামদানি, সরবন্দ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সাধারণত মসলিনের দাম নির্ভর করত এর আয়তন, ওজন, সূক্ষ্মতা ও বুননের ওপর। যে কাপড় দীর্ঘ হতো বেশি, তাতে সুতার সংখ্যা হতো বেশি কিন্তু ওজন হতো কম সেটাই ছিল উৎকৃষ্ট। সবচেয়ে জনপ্রিয় মসলিনের নাম ছিল মলবুস খাস যার অর্থ খাসবস্ত্র। এটি মোগল সম্রাট ও তার পরিবারের জন্য নির্ধারিত ছিল। অন্যদিকে বাংলার সুবাদার বা নবাবের জন্য নির্ধারিত ছিল সরকার-ই-আলা।

মলবুস খাস
'মলবুস খাস' মানেই হলো খাস বস্ত্র বা আসল কাপড়। এজাতীয় মসলিন সবচেয়ে সেরা আর এগুলো তৈরি হতো সম্রাটদের জন্য। আঠারো শতকের শেষদিকে মলবুস খাসের মতো আরেক প্রকারের উঁচু মানের মসলিন তৈরি হতো, যার নাম 'মলমল খাস'। এগুলো লম্বায় ১০ গজ, প্রস্থে ১ গজ, আর ওজন হতো ৬-৭ তোলা। ছোট্ট একটা আংটির মধ্যে দিয়ে এ কাপড় নাড়াচাড়া করা যেতো। এগুলো সাধারণত রপ্তানি করা হতো।

সরকার-ই-আলা
এ মসলিনও মলবুস খাসের মতোই উঁচুমানের ছিলো। বাংলার নবাব বা সুবাদারদের জন্য তৈরি হতো এই মসলিন। সরকার-ই-আলা নামের জায়গা থেকে পাওয়া খাজনা দিয়ে এর দাম শোধ করা হতো বলে এর এরকম নামকরণ। লম্বায় হতো ১০ গজ, চওড়ায় ১ গজ আর ওজন হতো প্রায় ১০ তোলা।

ঝুনা
'ঝুনা' শব্দটি, জেমস টেইলরের মতে, এসেছে হিন্দী ঝিনা থেকে, যার অর্থ হলো সূক্ষ্ম। ঝুনা মসলিনও সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে তৈরি হতো, তবে সুতার পরিমাণ থাকতো কম। তাই এজাতীয় মসলিন হালকা জালের মতো হতো দেখতে। একেক টুকরা ঝুনা মসলিন লম্বায় ২০ গজ, প্রস্থে ১ গজ হতো। ওজন হতো মাত্র ২০ তোলা। এই মসলিন বিদেশে রপ্তানি করা হতো না, পাঠানো হতো মোঘল রাজ দরবারে। সেখানে দরবারের বা হারেমের মহিলারা গরমকালে এ মসলিনের তৈরি জামা গায়ে দিতেন।

আব-ই-রওয়ান
আব-ই-রওয়ান ফারসি শব্দ, অর্থ প্রবাহিত পানি। এই মসলিনের সূক্ষ্মতা বোঝাতে প্রবাহিত পানির মতো টলটলে উপমা থেকে এর নামই হয়ে যায়। লম্বায় হতো ২০ গজ, চওড়ায় ১ গজ, আর ওজন হতো ২০ তোলা। আব-ই-রওয়ান সম্পর্কে প্রচলিত গল্পগুলোর সত্যতা নিরূপন করা না গেলেও উদাহরণ হিসেবে বেশ চমৎকার।
যেমন: একবার সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে তাঁর মেয়ে উপস্থিত হলে তিনি মেয়ের প্রতি রাগান্বিত হয়ে বললেন তোমার কি কাপড়ের অভাব নাকি? তখন মেয়ে আশ্চর্য হয়ে জানায় সে আব-ই-রওয়ানের তৈরি সাতটি জামা গায়ে দিয়ে আছে। অন্য আরেকটি গল্পে জানা যায়, নবাব আলীবর্দী খান বাংলার সুবাদার থাকাকালীন তাঁর জন্য তৈরি এক টুকরো আব-ই-রওয়ান ঘাসের উপর শুকোতে দিলে একটি গরু এতোটা পাতলা কাপড় ভেদ করে ঘাস আর কাপড়ের পার্থক্য করতে না পেরে কাপড়টা খেয়ে ফেলে। এর খেসারৎস্বরূপ আলীবর্দী খান ঐ চাষীকে ঢাকা থেকে বের করে দেন।

খাসসা
ফারসি শব্দ খাসসা। এই মসলিন ছিলো মিহি আর সূক্ষ্ম, অবশ্য বুনন ছিলো ঘন। ১৭ শতকে সোনারগাঁ বিখ্যাত ছিলো খাসসার জন্য। ১৮-১৯ শতকে আবার জঙ্গলবাড়ি বিখ্যাত ছিলো এ মসলিনের জন্য। তখন একে 'জঙ্গল খাসসা' বলা হতো। অবশ্য ইংরেজরা একে ডাকতো 'কুষা' বলে।

শবনম
'শবনম' কথাটার অর্থ হলো ভোরের শিশির। ভোরে যদি শবনম মসলিন শিশির ভেজা ঘাসে শুকোতে দেয়া হলে শবনম দেখাই যেতোনা, এতোটাই মিহী আর সূক্ষ্ম ছিলো এই মসলিন। ২০ গজ লম্বা আর ১ গজ প্রস্থের শবনমের ওজন হতো ২০ থেকে ২২ তোলা।

তাছাড়া ডোরিয়া,নয়ন সুখ,বদন খাস,সর-বন্ধ,রঙ্,আলিবালি, তরাদ্দাম,তনজেব,সরবুটি,চারকোনার কথাও জানা যায়।

উপরোক্ত মসলিন ছাড়াও আরও একধরনের মসলিন পাওয়া যেত,যা এই দেশে তাতীরা এখনও সেই অনুরূপ কাপড় বোনার চেষ্টা করে যার নাম জামদানী। প্রকৃতপক্ষে আগেকার যুগে 'জামদানী' বলতে বোঝানো হতো নকশা করা মসলিনকে।বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার সাদিপুর, জামপুর ও কাচপুর ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার জামদানি শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। আর উল্লিখিত ইউনিয়নগুলোর কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয়েছে এক-একটি জামদানি পল্লী। এর মধ্যে আছে সাদিপুর ইউনিয়নের চেওড়াপাড়া, কাজিপাড়া, বারগাঁও, আন্দারমানিক, শিঙ্গলাব; জামপুর ইউনিয়নের হাতুরাপাড়া, তালতলা, মুছারচর, এবং কাচপুর ইউনিয়নের বেহাকৈর, কালিয়াবিটা, গাবতলা, সুকেরটেক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের কিছু অংশে ও রূপগঞ্জ উপজেলার বৃহৎ অংশজুড়ে উৎপাদিত জামদানি শিল্প ও অতীতের মসলিনের মতো ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করছে দেশে-বিদেশে। তাছাড়া সব বয়সের নারী-পুরুষদের নিখুঁতভাবে জামদানিতে কারুময় কাজ করতে দেখা যায়। জামদানি সুতা মার দেওয়া থেকে শুরু করে তাঁতে বুননের উপযোগী করে গড়ে তোলার কাজটি নারীরাই করে থাকে। এখানে উৎপাদিত এক একটি জামদানির খুচরা মূল্য ৮০০ টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত।

সেই মসলিন আজ নেই।ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীযভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ হতে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে প্রস্তুত করা আমদানীকৃত কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিলো। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতশিল্পে ধ্স নামে।

কথিত আছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা মসলিন উৎপাদন বন্ধ করার জন্য মসলিন তাঁতিদের হাতের বুড়ো আঙুল কেটে নেয়,অনেকে বলেন তাঁতীরা নিজেরাই নাকি নিজেদের আঙুল কেটে ফেলতো, যাতে কম পারিশ্রমিকের কাজে তাদের বাধ্য না করা হয়।

লিখেছেন : বেলের কাঁটা• • সুত্রগুলো- ,,,,,,

ধনুক

0 comments
ধনুবিদ্যা অর্থাৎ ধনুক দিয়ে তীর ছোড়া হলো মানুষের প্রাচীন কলাকৌশলের অন্যতম। প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই ধনুক ছিল যুদ্ধ ও শিকারের প্রধান অস্ত্র। যদিও ১৫ শতাব্দীতে যুদ্ধক্ষেত্রে ধনুকের ব্যবহার লুপ্ত হয়, তবুও শিকারের অস্ত্র হিসেবে এর ব্যবহার অক্ষুণ্ন থাকে। শুরুতে ধনুক তৈরি হতো সাধারণত কাঠ দিয়ে কিন্তু পরবর্তী সময়ে কাঠসহ অন্যান্য অনেক বস্তুর ব্যবহার শুরু হয়। এগুলোকে বলা হয় কম্পোজিট বা যৌগিক ধনুক। ১৯৫০-এর দশকের পর ক্রীড়াযন্ত্র হিসেবে ক্রসবো অর্থাৎ আড় ধনুকের ব্যবহার শুরু হয়। ঠিক তখন থেকেই ধনুকের ছিলারও (দড়ি) অনেক পরিবর্তন ঘটে। ধনুকের ছিলার উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে পশুর গায়ের লোম, শাকসবজির আঁশ, শন, রেশম, লিনেন পাক দেওয়া তন্ত্র এবং পশুর চামড়া, বাঁশ বা বেতের ফালি। তখন থেকেই ধীরে ধীরে বিকাশের মাধ্যমে তীরের উদ্ভব হয়। আগে যে তীর ব্যবহার করা হতো তা সম্ভবত কোনো ধরনের নলখাগড়া বা ক্রেন দিয়ে তৈরি হতো। তীর দিয়ে বিদ্ধ করার জন্যও তীরের অগ্রভাগে ধাতু বা পাথরের ফলার ব্যবহার করা হতো। লৌহ ও ইস্পাত আবির্ভাবের পর তীরের বিভিন্ন রকম ডিজাইন বিকাশ লাভ করে। দীর্ঘ ধনুকের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠিত আধুনিক ক্রীড়া হিসেবে ধনুবিদ্যা ক্রীড়ার সূত্রপাত ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে লাটুকেটে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা হয় তখন থেকেই আন্তর্জাতিক ধনুবিদ্যা প্রতিযোগিতার সূত্রপাত ঘটে। প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক আরচারি ফেডারেশন গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরুষদের জন্য দীর্ঘতম দূরত্ব হলো ৯০ মি. (৯৮.৪ গজ) এবং স্ত্রীলোকদের জন্য ৭০ মি. (৭৬.৫ গজ)। এ ক্রীড়ার প্রতি পৃথিবীব্যাপী আগ্রহ বেড়ে যাওয়ার ফলে ১৯৬৯ সালে ফিল্ম আরচারিকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং দীর্ঘতম তীর ছোড়ার দূরত্ব স্থির করা হয় ৬০ মি. (৬৫.৬ গজ) এবং চারটি লক্ষ্যস্থলের বৃহত্তমটির আকৃতি স্থির করা হয় ৬০ সে. মি.। বিংশ শতাব্দীর প্রথম-তৃতীয়াংশে ইউরোপে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে টার্গেট আরচারি একটি জনপ্রিয় ক্রীড়া হিসেবে প্রচলিত হয়। ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীরা আসত ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইডেন, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও চেকোস্লোভাকিয়া থেকে। ১৯০০, ১৯০৪, ১৯০৮, ১৯২০ সালে আরচারি অলিম্পিক প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারপর পুনরায় ১৯৭২ সালের অলিম্পিক ক্রীড়ায় আবার এটি প্রচলিত হয়।

-প্রীতম সাহা সুদীপ

ব্রহ্মপুত্র

0 comments
তিব্বতের কৈলাস পর্বতের হিমশীতল জলপ্রপাত, মানস সরোবরের নীলপদ্ম বিধৌত জলরাশি ও চেমাইয়াং ডং হিমবাহের স্রোতে সৃষ্ট ব্রহ্মপুত্র নদের বাংলাদেশ অংশের পুরনো ব্রহ্মপুত্র এখন মৃত প্রায়। এককালের উত্তাল খরস্রোতা পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ আজ যৌবনহারা, মরা খালে পরিণত হওয়ায় পুরনো ব্রহ্মপুত্রের ৫ হাজার ৪৩১ বর্গকিলোমিটার অববাহিকা এবং তার শাখা ও উপনদীগুলোর প্রায় ২ হাজার বর্গকিলোমিটার অববাহিকায় বসবাসরত বৃহত্তর ময়মনসিংহের ১ কোটি মানুষ আজ ভুক্তভোগী।

ব্রহ্মপুত্র আসামের ধুবড়ি থেকে নেমে দক্ষিণ-পূর্বমুখী কুড়িগ্রামের চিলমারী হয়ে ফুলছড়ি, হরিচণ্ডি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের খোলাবাড়ি এলাকার যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। সেখান থেকে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, জামালপুর সদর, ময়মনসিংহ জেলার ময়মনসিংহ সদর, ঈশ্বরগঞ্জ, ত্রিশাল, নান্দাইল, গফরগাঁও, কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর, কটিয়াদি, কুলিয়ারচর, ভৈরব উপজেলার ২৪০ কিলোমিটার প্রবাহিত হওয়ার পর পুরনো ব্রহ্মপুত্র ভৈরবে মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে। এই ২৪০ কিলোমিটার নদীকে ঘিরে দুই পাড়ের মানুষ হাজার বছর ধরে গড়ে তুলেছিল বসতি ও জীবিকা। প্রকৃতি এঁকেছিল জল আর সবুজে। এখন তা ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছে। বিপন্ন হয়ে পড়ছে পরিবেশ। হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানাচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহ এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ধরে রাখতে যেখানে প্রয়োজন ৩ হাজার কিউসেক পানি, সেখানে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত পুরনো ব্রহ্মপুত্র পানির প্রবাহ গড়ে মাত্র ৩০ কিউসেক। এ সময় নদের পানির গড় গভীরতা মাত্র ১.৫০ মিটার। বর্ষার সময় গড় গভীরতা ৬.৫০ মিটার। পানি প্রবাহের পাশাপাশি স্রোত না থাকায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ। যতদূর চোখ যায় শুধু ধু ধু বালুচর।

হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র হচ্ছে বিশ্বস্রষ্টা ব্রহ্মার পুত্র। হিমালয়ের কৈলাস পর্বতের (হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী ভগবান শিবের আবাসভূমি) পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত মানস সরোবরে ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০ ফুট উচ্চতায় এ নদের উৎস হওয়ায় উজানে ব্রহ্মপুত্রের গতি ছিল উচ্ছল ও দুর্বার। সপ্তদশ শতাব্দীতে এর প্রশস্ততা ছিল গঙ্গার তিনগুণ। গত শতাব্দীর প্রথমদিকে শেরপুর থেকে জামালপুর ১০ মাইল এবং ময়মনসিংহের কাওনা-মাওনার পাড়ি ছিল ১২ মাইল। ১৭৮৭ সালের বন্যা এবং ১৭৮৯ সালের ভূমিকম্পে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ঝিনাই খাল থেকে যমুনার উৎপত্তি হয়। ব্রহ্মপুত্র তার বিশালত্ব হারায়। তখন থেকে সে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নামে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

দেওয়ানগঞ্জের ফুলছড়ি, হরিচণ্ডি থেকে ভৈরবের পুরনো ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার সঙ্গমস্থল পর্যন্ত এই দীর্ঘ প্রায় ২৪০ কিলোমিটার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র তার গভীরতা হারিয়ে শীর্ণ, কঙ্কালসার। পুরনো ব্রহ্মপুত্রের পানিতে বুক ভিজাতে না পেরে তার শাখা নদী আয়মন, আখিলা, ক্ষীরু, শীলা, সুতিয়া, নরসুন্দাসহ কমপক্ষে ১০টি নদীর অস্তিত্ব মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। শুষ্ক মৌসুমে ক্ষীণ ধারায় সামান্য পানি নিয়ে পুরনো ব্রহ্মপুত্র গফরগাঁওয়ের টোক নগরের কাছে ও নরসিংদীর শিবপুরে শীতলক্ষ্যায় এবং নারায়ণগঞ্জ সদরে ধলেশ্বরীর সঙ্গে মিশেছে। পুরনো ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ কমে যাওয়ায় ক্ষীণ স্রোতধারা শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী এবং বুড়িগঙ্গাকে আর সজীব রাখতে পারছে না।

একদিন পুরনো ব্রহ্মপুত্র বৃহত্তর ময়মনসিংহকে সমৃদ্ধ করেছিল। পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল শত শত ঘাট ও বন্দর। পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য ব্রহ্মপুত্র-যমুনাই ছিল একমাত্র ভরসা। ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিল বাহাদুরাবাদ ও ফুলছড়ি, চিলমারী নৌ-বন্দর। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ে ফেরিঘাট বাহাদুরাবাদ-বালাশীতে যাত্রী ও ওয়াগন ফেরি চলাচল করত। পানি সংকটের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। কালের স্রোতে নতুন প্রজন্মের কাছে এসব গল্প বলে মনে হবে। নদী যখন উচ্ছল, স্রোতস্বিনী ছিল, দুই পাড়ের হাজার হাজার পরিবার যারা এই নদীকে ঘিরে গড়ে তুলেছিল বসতি ও জীবন, পুরনো ব্রহ্মপুত্রের এ করুণ পরিণতিতে তারা আজ পুরোপুরি বেকার। নদীপাড়ের স্থানীয়রা জানায়, নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় একটু বর্ষা হলেই দুই কূল ছাপিয়ে ফুঁসে উঠে পুরনো ব্রহ্মপুত্র। প্রতিশোধ নেয় সে মানুষের ওপর। ঘরবাড়ি, ফসল সবকিছু উজাড় করে ফেলে। এভাবে বারবার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়ে লাখো মানুষ। গফরগাঁও উপজেলার ব্রহ্মপুত্র পাড়ের চরআলগী মীরাপাড়া গ্রামের মজিবুর (৪০) জানান, গত বর্ষার আগেও তার দুই একর জমি ছিল। জমিতে ইরি-বোরো ও শাকসবজি চাষ করে ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখেই চলছিল তাদের সাজানো-গোছানো সংসার। কিন্তু গত বর্ষায় ১ মাসের ব্যবধানে সব ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় আজ সে ভূমিহীন। মজিবুরের স্ত্রী আমেনা খাতুন (৩৫) জানান, দিনমজুরি আর ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া আর তাদের কোনো উপায় নেই।

আজহারুল হক, গফরগাঁও

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ও স্থানের নামকরণের কারণ

0 comments
বাংলাদেশ

বাংশা বা বেঙ্গল শব্দটির সঠিক উৎপত্তি এখনো অজানা। যদিও বিশ্বাস করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে দ্রাবিড় উপজাতি সর্বপ্রথম এই শব্দের উৎপত্তি ঘটায়। আর ১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মওলানা ভাসানী তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানকে বাংলাদেশ বলে আখ্যায়িত করেন।

আবার কথিত আছে যে, বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ বলে এর নামকরণ করা হয়েছে বাংলাদেশ।

বাল্টিক সাগর

উত্তর ইউরোপের একটি সাগর বাল্টিক। বেল্ট থেকে এটি প্রবেশ করেছে বলে এর নাম করা হয়েছে বাল্টিক সাগর।

আমেরিকা

আমেরিগো ভেসপুটি নামে একজন পর্যটকের নাম থেকে আমেরিকা নামের উৎপত্তি হয়েছে। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার পর ১৪৯৭ সালে আমেরিগো সাহেব এই মহাদেশে আসেন এবং বহু অঞ্চল আবিষ্কার করেন।

কলম্বিয়া

আমেরিকা মহাদেশের আবিষ্কারক কলম্বাসের নাম অনুসারে এই দেশের নামকরণ করা হয়েছে কলম্বিয়া।

অস্ট্রেলিয়া : অস্ট্রেলিয়া শব্দের অর্থ হলো এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল। এই মহাদেশটি এশিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত বলে এর নামকরণ করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

গ্রিনল্যান্ড

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত গ্রীনল্যান্ড দ্বীপ। এই দ্বীপে এক ধরনের ছোট ছোট সবুজ গাছ জন্মায়। সেই থেকে এই দেশের নাম হয়েছে গ্রিনল্যান্ড অর্থাৎ সবুজ ভূমি।

কৃষ্ণ সাগর

শীতকালে ঘন কুয়াশা দ্বারা আচ্ছন্ন থাকে বলে চারপাশে কিছু দেখা যায় না। এ কারণে এই সাগরের নাম করা হয়েছে কৃষ্ণ সাগর।

ভূ-মধ্যসাগর

ভূ-মধ্য শব্দের অর্থ হলো পৃথিবীর মধ্যভাগ। প্রাচীনকালে মনে করা হতো এই সাগরটি পৃথিবীর মধ্যভাগে অবস্থিত। এ কারণে এর নামকরণ করা হয় ভূ-মধ্যসাগর।

এভারেস্ট শৃক্সখ

তৎকালীন বৃটিশ ভারতের সার্ভেয়ায় স্যাজর্জ এভারেস্টের নেতৃত্বে হিমালয় পর্বতের উচ্চতা নির্ণয় করা হয় বলে নাম করা হয় এভারেস্ট শৃঙ্গ।

মেসোপটিয়াম

বর্তমান ইরাকের প্রাচীন নাম মেসোপটিমিয়া। দুটি গ্রীক শব্দ মেসোআর পেটুনুস থেকে এর নামকরণ করা হয়। এই শব্দ দুটির অর্থ মধ্যস্থল ও নদী। সুতরাং মেসোপটিমিয়া অর্থ হলো নদীর মধ্যবর্তী স্থান।

ওয়াশিংটন

মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের নাম অনুসারে এর নাম করা হয়েছে।

ইকুয়েডর

ইকুয়েডর অর্থাৎ নিরক্ষীয় অঞ্চলে অসষ্রিে নাম ইকুয়েডর।

মো. আসাদুজ্জামান

ইংরেজি শব্দের উৎস সন্ধান

0 comments
সব ভাষার মিলনকেন্দ্র বলতে সাধারণত ইংরেজি ভাষাই বুঝি। কেননা ইংরেজি ভাষা নিজের প্রয়োজনে প্রায় সব ভাষা থেকে কিছু না কিছু শব্দ গ্রহণ করেছে। সাম্রাজ্যবাদী ভাষা হিসেবে ইংরেজির বদনাম থাকলেও ইংরেজি শব্দের প্রকাশ ক্ষমতা অন্য ভাষার চেয়ে অনেক বেশি। তাই আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবেও ইংরেজি ভাষার পরিচয় ব্যাপক।

ইংরেজি ভাষার সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। অনেক শব্দের অর্থ আমরা সহজেই বলতে পারি কিন্তু এসব শব্দের উৎসটা কোথায় এ প্রশ্ন করলে অনেকে যে চুপ করে থাকবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ এসব শব্দের মূলে গিয়ে দেখা যায় বিস্ময়কর সব কাহিনী। এ লেখাটির মাধ্যমে আমরা খুবই পরিচিত কিছু ইংরেজি শব্দের উৎস খুঁজব। ফলে শব্দগুলো আমাদের কাছে একেবারে আপনজনের মতো হয়ে উঠবে।

School : এই শব্দের মূল অর্থটা জানলে আজকের যুগের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনাই বন্ধ করে দিতে চাইবে।

School শব্দটা এসেছে গ্রিক থেকে। যার অর্থ ছিল 'অবসরযাপন'। তখন এই শব্দটা দিয়ে এমন এক সময়কে বুঝানো হতো, যখন সৈন্যদের আর যুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কৃষক মুক্তি পেত কৃষি কাজ থেকে। ব্যবসায়ীর ব্যবসা বন্ধ, অর্থাৎ পুরোপুরি অবসরযাপন। ওই সময় স্কুলে গেলেও পড়াশোনার কোনো ঝামেলা ছিল না। বই সঙ্গে নিলেও সেটা না খুললেও চলত। এসব স্কুলে যাওয়ার সুযোগ মিলত ধনীর ছেলে-মেয়েদের। তারা ওইসময় গল্প-গুজবের মধ্য দিয়ে অনেক কিছু শিখে ফেলত। পরবর্তী সময়ে তারা ভালো চাকরি পেত।

এটা দেখে অনেক মা-বাবাই চাইলেন তাদের ছেলেমেয়েরাও স্কুলে যাক। সময়ের পরিক্রমায় School হয়ে উঠল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু, যা এক সময় ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। তবে যতদূর জানা গেছে, তখনকার সময়ের স্কুলে অবসর পাওয়া যেত মাত্র এক ঘণ্টা!

Salary : এক দৃশ্য কল্পনা করুন তো, মাসের প্রথম পাঁচ বা দশ তারিখে আপনার বস বেতন হিসেবে আপনাকে এক প্যাকেট লবণ দিলেন। কেমন লাগবে তখন আপনার? মাথা গরম হওয়ার মতো অবস্থা। শুধু আপনি নয়, সবারই এমনটা হওয়ার কথা। অথচ রোমান যুগে রোমান সৈন্যদের বেতন হিসেবে দেওয়া হতো লবণ। আর এই লবণ পেয়ে তাদের আনন্দ দেখে কে। লবণের ইংরেজি Salt থেকে পরবর্তী সময়ে Salary শব্দটি এসেছে। শুধু বেতন হিসেবে আমাদের আর লবণ দেওয়া হয় না, এই পার্থক্যটুকুই কেবল রয়ে গেছে।

Shampoo : এ শব্দটি এসেছে হিন্দি ভাষা থেকে। যার অর্থ হচ্ছে to press or massage। ইংরেজরা ভারতবর্ষে আসার পর এ শব্দটি তাদের খুব পছন্দ হয়। ফলে শব্দটি এখন ইংরেজি শব্দ ভাণ্ডারের অন্যতম।

Cosmetic : এ শব্দটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মেয়েদের রূপসজ্জার হরেকরকম সামগ্রীর কথা। Cosmetic শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ Cosmos থেকে। আর Cosmos-এর মানে যে কী, তা পরখ করার জন্য অভিধানটি একবার খুলেই দেখুন না, আপনার বিস্ময়ের সীমা থাকবে না।

Bank : এ শব্দটি এসেছে ইতালিয়ান ভাষা থেকে। তবে তখন শব্দটির মানে ছিল বর্তমানে প্রচলিত অর্থ থেকে ভিন্ন। তখন Bank মানে বুঝানো হতো 'moneychanger' এর টেবিলকে। মধ্যযুগীয় ইতালির প্রত্যেক শহরে প্রচলিত ছিল আলাদা আলাদা মুদ্রা। যেমন মিলান থেকে একজন মানুষ ফ্লোরেন্সে এলে তাকে প্রথমে ফ্লোরেন্সের মুদ্রা কিনতে হতো।

আর moneychanger-এর কাছে নানা শহরের মুদ্রা পাওয়া যেত। পৃথিবীর টাকা-কড়ির ইতিহাসে moneychanger এবং তার টেবিলটার গুরুত্ব ছিল অনেক। কারণ পরবর্তী সময়ে এরা সুদে টাকা ধার দিত। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের টাকা বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করত। আধুনিক যুগের Bank শব্দের পূর্ব নাম হলো moneychanger-এর টেবিল, কথাটি অবিশ্বাস্য হলেও একেবারেই সত্য।

আমিন রহমান নবাব

উপমহাদেশের প্রথম গৌরবময় বিদ্রোহ

0 comments
সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি ইংরেজ বেনিয়ারা ভারতে আসেন সামান্য ব্যবসার অজুহাত নিয়ে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে নানা চক্রান্ত ও কূটকৌশলের মাধ্যমে তারা ভারতের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে সক্ষম হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলাকে পরাজিত করার মাধ্যমে তারা এদেশে তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্যের জানান দিয়েছিল আর ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাসিমকে পরাজিত করে সমগ্র ভারত তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। পলাশী যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হাতে পায় তা কাজে লাগিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে শোষণ ও নির্যাতন চালাতে থাকে। বাংলার স্বাধীনচেতা জনগণ কখনও পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। তাই দীর্ঘ একশ বছরের অসন্তোষ অবসানের জন্য ১৮৫৭ সালে রাস্তায় নেমে আসে। ফলে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম কাহিনী মহাবিদ্রোহ, যাকে সিপাহি বিদ্রোহ বা ভারতীয় বিদ্রোহও বলা হয়ে থাকে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল ভারতীয় শাসকবর্গের তীব্র ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব। লর্ড ডালহৌসি তার স্বত্ব বিলোপ নীতি প্রয়োগ করে সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুর, সম্বলপুর প্রভৃতি রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। ডালহৌসি অযোধ্যা দখল করে নবাবকে কলকাতায় নির্বাসন দেন। ফলে নবাবের অধীনে অনেক পরিবার সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়ে। ব্রিটিশদের এসব কর্মকাণ্ড ভারতীয় নেতৃবৃন্দ ও জনগণকে চরমভাবে অসন্তুষ্ট করেছিল। ব্রিটিশ শাসনের আগে এদেশ ছিল কৃষি ও শিল্পসমৃদ্ধ। কিন্তু কোম্পানি শাসনে এদেশে শুরু হয় লাগামহীন শোষণের পালা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ভারতীয় দরিদ্র কৃষককুলের ওপর জমিদার ও রাজস্ব আদায়কারী শক্তির শোষণ বৃদ্ধি পায়। কৃষক ও জনসাধারণের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হয়। এসব কর্মকাণ্ড ভারতীয়দের বিদ্রোহে বাধ্য করেছিল। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের জন্য ধর্মীয় অসন্তোষ দায়ী ছিল। ভারতে খ্রিস্টান মিশনারিদের তৎপরতায় ভারতীয়দের মনে এ আশঙ্কা জন্মায় যে, ইংরেজ শাসনে তারা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হবে। খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রকাশ্য ধর্মপ্রচার, হিন্দু-মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা, মন্দির ও মসজিদের জমির ওপর করারোপ জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। ১৯৫৭ সালে জ.উ. গধহমধষবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক ভাষণে বলেন, 'খ্রিস্টধর্মের বিজয় পতাকা ভারতের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সগৌরবে উড্ডীন রাখার জন্য ভাগ্যবিধাতা হিন্দুস্থানের বিস্তৃত সাম্রাজ্য ইংল্যান্ডের হাতে তুলে দিয়েছে'। তার এ ধরনের বক্তব্য ভারতীয়দের বিদ্রোহে অনুপ্রাণিত করেছিল।

মহাবিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সামরিক বৈষম্য এবং এনফিল্ড রাইফেলের ব্যবহার। ব্রিটিশ সরকার ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ ভারতীয় সৈন্যের জন্য বার্ষিক ব্যয় করত ৯৮ লাখ পাউন্ড এবং ৫১ হাজার ৩১৬ জন ইউরোপীয় সৈনিকের জন্য ব্যয় করত ৫৬ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড। যা ছিল ভারতীয় সৈনিকদের জন্য চরম বৈষম্য। ব্রিটিশ সরকারের কয়েকটি সংস্কার যেমন তিলককাটা নিষিদ্ধ, দাড়ি কামানো এবং পুরনো পাগড়ি ব্যবহারে চাপ গ্রয়োগ ভারতীয় হিন্দু ও মুসলিম সৈনিকদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানে। মহাবিদ্রোহে সিপাহিদের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল এনফিল্ড রাইফেলের ব্যবহার। তখন ব্রিটিশ সরকার এনফিল্ড নামক এক ধরনের রাইফেলের ব্যবহার শুরু করে। এই রাইফেলের কার্তুজ পশুর চর্বি দ্বারা আবৃত থাকত। এতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, এনফিল্ড রাইফেলের গুলির কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি মাখানো আছে। এ চর্বি দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে ভরতে হতো। মুসলমান সৈনিকরা শূকরের চর্বি এবং হিন্দু সৈনিকরা গরুর চর্বি মুখে নেওয়ার গুজবে চরম বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এই সিপাহিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সংঘটিত হয় ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ বা সিপাহি বিদ্রোহ। সিপাহি বিদ্রোহের ফলাফল ছিল ভারতীয় ইতিহাসের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। এ বিদ্রোহের মাধ্যমে ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইন প্রণয়ন হয় এবং ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে। এ বিদ্রোহের ফলে ইংল্যান্ডের মহারানী এলিজাবেথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন, যার মাধ্যমে স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হয়, দেশীয় রাজন্যবর্গের দত্তকপুত্র গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়, ভারতীয়দের ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং যোগ্যতানুযায়ী ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। মূলত সিপাহি বিদ্রোহ ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। এই বিদ্রোহ ভারতীয় ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ এই বিদ্রোহ ছিল উপমহাদেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গৌরবময় প্রথম বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহের সাহসে বলীয়ান হয়ে পরবর্তী সময়ে?ভারতীয়রা অন্যান্য বিদ্রোহ ও সংগ্রাম করতে সক্ষম হয়েছিল এবং সর্বোপরি পেরেছিল ব্রিটিশদের ভারত থেকে পরিপূর্ণভাবে বিতাড়িত করতে।

-আল মুতাসিম বিল্লাহ

কালো জাদু

0 comments
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী ভূত হলো এমন এক জিনিস, যা মৃত ব্যক্তির আত্মা। আর তা জীবিত ব্যক্তির সামনে দৃশ্য আকার ধারণ বা অন্য কোনো উপায়ে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম। ভৌতিক অভিজ্ঞতার গল্প কম-বেশি সবারই জানা। এসব গল্পে ভূতকে নানাভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কখনো অদৃশ্য বা অস্বচ্ছ বায়বীয় আবার কখনোবা বাস্তবসম্মত সপ্রাণ মানুষ বা জীবের আকারে। আর এসব ভূত বা প্রেতাত্মার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে ভবিষ্যদ্বাণী বা কোনো কাজ করার বিদ্যাকে নেক্রোম্যান্সি বা কালো জাদু বলে। ভূডূ হচ্ছে এক ধরনের ব্ল্যাক ম্যাজিক বা ডাকিনীবিদ্যা। ভূডূবিদ্যার সাহায্যে নাকি কবরের লাশ জ্যান্ত করে তাকে গোলামের মতো খাটানো যায়। অন্যদিকে শামানের কাজও মৃত মানুষের আত্মা নিয়ে। তবে ভূডূর সঙ্গে শামানদের পার্থক্য_ এরা মন্দ আত্মার বিরুদ্ধে লড়াই করে। মন্দ আত্মাকে কাজে লাগায়।
বিদেশি সিনেমায় এমনকি ভারতীয় সিরিয়ালে প্রায়ই দেখা যায়, একজন দুষ্ট ব্যক্তি একটি পুতুলের গায়ে সুঁচ ফুটিয়ে আরেক জায়গায় এক ব্যক্তিকে হত্যা করছে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। বাংলায় একে ফুঁক দেওয়া, কবজ করা অথবা বাণ মারা বলে। এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটায় তাদের ওঝা বলে। আর এ প্রক্রিয়াটিই বিশ্বব্যাপী ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কালো জাদু নামে পরিচিত।

খ্রিস্টধর্ম প্রবর্তনেরও আগের কথা। বহুকাল আগে পাশ্চাত্যে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের প্রচলন ছিল না। তবে তাদের মধ্যে অদ্ভুত কিছু বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের চর্চা ছিল। এরা এক একটি গোত্র বিভিন্ন কাল্পনিক ভূত-প্রেত বা অশুভ আত্মার আরাধনা করত। যা অঋজওঈঅঘ ইখঅঈক গঅওেঈ বা কালো জাদু নামে পরিচিত। এমনকি এখনো এ বিদ্যার গোপন অনুসারীরা তাদের এ বিদ্যা দিয়ে মানুষের ক্ষতি করে আসছে। এ বিদ্যায় পারদর্শীদের ডাকি বা ওঝা বলে আর আফ্রিকান ভাষায় এদের বলে কিনডকি ।

মূলত প্রাক-শিক্ষিত সংস্কৃতির সর্বপ্রাণবাদ ও পূর্বপুরুষ পূজার মধ্যে ভূত বা আত্মাসংক্রান্ত ধ্যান-ধারণার প্রথম বিবরণ পাওয়া যায়। সে যুগে কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রথা, অন্ত্যেষ্টি সংস্কার, ভূত তাড়ানো অনুষ্ঠান ও জাদু অনুষ্ঠান আয়োজিত হতো। আর এসব আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মৃত আত্মার সন্তুষ্টি আনয়ন। মূলত আত্মাসংক্রান্ত সেই ধ্যান-ধারণা থেকেই ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কালো জাদুর বিবর্তন।

আদিম সমাজে উইচ-ডক্টর বা রোজারা এমন ব্যক্তি ছিলেন যারা ব্ল্যাক ম্যাজিক জানতেন। অতিন্দ্রীয় শক্তির বলে প্রেতাত্মাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। আর প্রেতাত্মাদের দিয়ে সম্ভব-অসম্ভব যে কোনো কাজ করে ফেলতে পারতেন খুব সহজেই। সে কারণে ওই সময় রোজারা একাধারে চিকিৎসক, জাদুকর এবং পুরোহিতের ভূমিকা পালন করতেন।

বর্তমানকালেও আদিম-সামাজিক ব্যবস্থায় বসবাসকারীদের মধ্যে উইচ-ডক্টর বা রোজাদের প্রভাব দেখা যায়। আদিম জাতিদের মধ্যে রোজাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হতো।

রোজারা তাদের ডাকিনী বিদ্যা খাটিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারত। চোর বা হত্যাকারী ধরা ও শাস্তি প্রদানে রোজাদের অপরিহার্য ভূমিকা ছিল। এছাড়াও তারা জাদুবিদ্যার সাহায্যে রোগ নির্ণয় এবং এর প্রতিকার করতেন। তারা তাদের শিশুদের রোগাক্রান্ত্ত করতে পারতেন এবং মানুষের মৃত্যুও ঘটাতে পারতেন। মানুষের মৃত্যু ঘটানোর জন্য তারা নানা ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। কখনো মানুষের একটি ছোট আকৃতির পুতুল তৈরি করে তাতে পিন বিদ্ধ করতেন। আবার কখনো কোনো লোকের চুল বা নখের টুকরো সংগ্রহ করে তা মাটিতে পুঁতে রাখতেন। এগুলো যখন আস্তে আস্তে শুকিয়ে যেত মানুষটিও ক্রমেই মৃত্যুমুখে পতিত হতো। রোজারা প্রায়ই রোগের চিকিৎসার জন্য গাছ-গাছড়া, লতাপাতা ব্যবহার এবং রোগের সংক্রমণ দূর করার জন্য জল ব্যবহার করত। কখনো তারা জাদুকরী পাথরসহ জল ছিটিয়ে দিতেন। তারা জাদুকরী গান, প্রার্থনা এবং আশ্চর্য ভঙ্গিমায় নৃত্য করত। এর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের মনকে প্রভাবিত করা। রোজারা সব সময় রঙিন পোশাক পরত, মুখোশ ধারণ এবং মুখমণ্ডল চিত্রিত করত। কেউ কেউ পশুর চামড়াও পরিধান করত। বস্তুত মানুষকে সম্মোহিত করত। আর লোকজন বিশ্বাস করতে বাধ্য হতো যে তাদের সৌভাগ্যের জন্য রোজারাই দায়ী।

ভূডূ (Voodoo) হচ্ছে এক ধরনের ব্ল্যাক ম্যাজিক বা ডাকিনীবিদ্যা। শোনা যায়, ভূডূবিদ্যার সাহায্যে নাকি কবরের লাশ জ্যান্ত করে তাকে গোলামের মতো খাটানো যায়। শামানের কাজও মৃত মানুষের আত্মা নিয়ে। তবে ভূডূর সঙ্গে শামানদের পার্থক্য হলো_ এরা মন্দ আত্মার বিরুদ্ধে লড়াই করে। মন্দ আত্মাকে কাজে লাগায়। ভূডূ এক ধরনের অপবিদ্যা। যারা ভূডূবিদ্যা জানে, তারা নাকি ইচ্ছা করলেই যাকে খুশি তার ক্ষতি করতে পারে। তাই এ বিদ্যায় পারদর্শীদের অনেকেই এড়িয়ে চলেন।

তবে শামান সব সময় ন্যায়ের পক্ষে কাজ করে। শামানকে কেউ বলে জাদুকর, কেউ কবিরাজ। শামান কথাটি এসেছে সাইবেরিয়ার তুঙ্গুস ভাষী মেষ পালকদের কাছ থেকে। অস্টাদশ শতাব্দীর ভ্রমণকারীরা প্রথম শামানদের ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে অবহিত করেন। জানা যায়, শামানরা এমন ধরনের মানুষ যাদের রয়েছে অবিশ্বাস্য শক্তি। মৃত ব্যক্তির আত্মার কাছ থেকে জ্ঞান সংগ্রহ করে তারা। ইচ্ছা করলেই নাকি নশ্বর দেহ ত্যাগ করে স্বর্গ বা নরকে স্বচ্ছন্দে প্রবেশ করতে পারে।

শামানদের প্রধান বাসস্থান এক সময় সাইবেরিয়া হলেও সোভিয়েতদের অত্যাচারে তারা দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়। তারা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের নানা জায়গায়। শামান বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে উত্তর আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপের শহরাঞ্চলেও। শামানরা তাদের নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রদর্শনের জন্য ভ্রমণ করছে চিলির সান্তিয়াগো থেকে শুরু করে কোরিয়ার সিউল পর্যন্ত। যদিও অনেক দেশের সরকার শামানিক চর্চাকে অবৈধ এবং বিপজ্জনক বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু রোমান্টিক মানুষের কাছে শামান হলো ধর্মীয় অভিজ্ঞতা লাভের গাইড। আর জাতীয়তাবাদীরা শামানকে মনে করে প্রাচীন সাংস্কৃতিক জ্ঞানের বাহক।

শামানদের মতে, আমাদের চারপাশে যত উপাদান রয়েছে সব কিছুর মাঝে আছে আত্মার অস্তিত্ব। 'ভূডূ' কথার অর্থও 'আত্মা'। এই শব্দটির উৎপত্তি ফন জাতির কাছ থেকে। এরা ইউয়ি সম্প্রদায়ের আত্মীয়। ভূডূ চর্চার উৎপত্তি হাইতিতে। তবে আফ্রিকায় এর চর্চা ব্যাপক। ব্রাজিল, জ্যামাইকাতেও কিন্তু কম ভূডূ চর্চা হয় না। তবে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নাম। যেমন, হাইতিতে বলা হয় ভূডূ, ব্রাজিলে ক্যানডোমবল, জ্যামাইকাতে ওবিয়াহ ইত্যাদি। পশ্চিম অফ্রিকার মানুষ সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে ভূডূতে সেখানকার কমপক্ষে পঁচিশ লাখ মানুষ এ বিদ্যার অনুরাগী। এ চর্চা সবচেয়ে বেশি হয় আফ্রিকার ঘানায়। ঘানার ককুজানের অধিবাসীরা এ বিদ্যাটির সাংঘাতিক অনুরাগী। এরা অসুখ-বিসুখে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের কাছে যাওয়ার চেয়ে ভূডূ চিকিৎসকদের ওপর অনেক বেশি ভরসা করে।

শামানরাও তাই। আত্মার ওপর এদের বিশ্বাস গভীর। এদের ধারণা, আত্মা তাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবে। বংশপরম্পরায় এ বিশ্বাস চলে আসছে তাদের মাঝে।
ভূডূ আর শামান দুই পদ্ধতিই ব্ল্যাক ম্যাজিকের অন্তর্ভুক্ত। তবে শামান সব সময় ন্যায়ের পক্ষে কাজ করে বলে অনেকেই একে ব্ল্যাক ম্যাজিকে অন্তর্ভুক্তের ব্যাপারে জোর আপত্তি জানান। ভূডূ এক ধরনের অপবিদ্যা। অন্যদিকে শামানকে কেউ বলে জাদুকর, কেউ বলে কবিরাজি। শামান কথাটি এসেছে সাইবেরিয়ার তুঙ্গুস ভাষী মেষ পালকদের কাছ থেকে। সর্বপ্রথম 'শামান' প্রসঙ্গ তুলে ধরেন অষ্টাদশ শতাব্দীর ভ্রমণকারীরা। জানা যায়, শামানরা এমন ধরনের মানুষ যাদের রয়েছে অবিশ্বাস্য শক্তি। মৃত ব্যক্তির আত্মার কাছ থেকে এরা জ্ঞান সংগ্রহ করতে পারে। আর শামানরা ইচ্ছা করলেই নাকি পৃথিবীর দেহ ত্যাগ করে স্বাচ্ছন্দ্যে স্বর্গ বা নরকে প্রবেশ করতে পারে। এক সময় শামানদের প্রধান বাসস্থান ছিল সাইবেরিয়া। এরপর সোভিয়েতদের অত্যাচারে তারা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আস্তে আস্তে শামানরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এরা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে উত্তর আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপের শহরাঞ্চলে। শামানরা তাদের নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রদর্শনের জন্য ভ্রমণ করছে চিলির সান্তিয়াগো থেকে শুরু করে কোরিয়ার সিউল পর্যন্ত। যদিও অনেক দেশের সরকার শামানিক চর্চাকে অবৈধ এবং বিপজ্জনক বলে মনে করে। কিন্তু রোমান্টিক মানুষের কাছে শামান হলো ধর্মীয় অভিজ্ঞতা লাভের বিশাল এক অবলম্বন।

শামানদের মতে, আমাদের চারপাশে যত উপাদান রয়েছে সব কিছুর মধ্যে আছে আত্মার অস্তিত্ব। অন্যদিকে 'ভূডূ' কথার অর্থও 'আত্মা'। এ শব্দটির উৎপত্তি ফন জাতির কাছ থেকে। এরা ইউয়ি সম্প্রদায়ভুক্ত। ভূডূ চর্চার উৎপত্তি মূলত হাইতিতে। তবে আফ্রিকায় এর চর্চা আরও বেশি। ব্রাজিল, জ্যামাইকায়ও ভূডূর প্রচলন রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো_ বিভিন্ন দেশে এর চর্চা হয় ভিন্ন ভিন্ন নামে। যেমন : হাইতিতে একে বলা হয় ভূডূ, ব্রাজিলে ক্যানডোমবল, জ্যামাইকায় ওবিয়াহ ইত্যাদি। পশ্চিম অফ্রিকার মানুষ সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে ভূডূতে সেখানকার কমপক্ষে পঁচিশ লাখ মানুষ এ বিদ্যার অনুরাগী। এ চর্চা সবচেয়ে বেশি হয় আফ্রিকার ঘানায়। ঘানার ককুজানের অধিবাসীরা এ বিদ্যাটির সাংঘাতিক অনুরাগী। এরা অসুখ-বিসুখে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার চেয়ে ভূডূ চিকিৎসকদের ওপর ভরসা করে বেশি।

শামানরাও তাই। আত্মার ওপর এদের অগাধ বিশ্বাস। এদের ধারণা, আত্মা তাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবে। বংশ পরম্পরায় এ বিশ্বাসটি অটুট রয়েছে তাদের মধ্যে। আফ্রিকায় যারা ভূডূ চর্চা করে তারাও কিন্তু বংশানুক্রমে এ কাজ করে আসছে। আফ্রিকান বাবা-মা তাদের সন্তানকে এ বিদ্যা চর্চায় উৎসাহ জোগায়। প্রতিদিনই সকালে পূজারিরা স্থানীয় দেবতাদের উদ্দেশে নৈবেদ্য অর্পণ করে তারপর নিজের কাজে বের হয়।

শামানরা শুধু বিশ্বাস করে আত্মায়। তাদের কোনো দেবতা নেই। তবে ভূডূ অনুসারীদের বিভিন্ন দেবতা আছে। যেমন ফ্লিমানি কোকু হলো রোগ মুক্তির দেবতা, হেভিও সো হলো বিদ্যুৎ এবং বজে র দেবতা, মেমী ওয়াটা ধনসম্পদের দেবী ইত্যাদি। দেবতার ওপর তাদের এত বিশ্বাস যে, তারা মনে করে, আগুন তাদের ক্ষতি করতে পারে না। ছুরি দিয়ে পেট কাটলেও তারা ব্যথা পায় না। তারা বলে, দেবতারা সহায় থাকলে সব বিপদ থেকেই রক্ষা পাওয়া যাবে।

শামানরাও বলে আত্মা তাদের সব রোগ মুক্তির পথ বাতলে দেয়। যারা এ সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী, তারা বলে শামানদের রয়েছে অলৌকিক ক্ষমতা। এরা আত্মার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে স্বাস্থ্য, খাদ্য, উর্বরতাবিষয়ক সব সমস্যারও সমাধান করে দিতে পারে।

শামানদের ব্যাপ্তি সাইবেরিয়া থেকে ল্যাপল্যান্ড, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা (বিশেষ করে আমাজন এলাকায়) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এমনকি ভারতেও বিস্তৃত। পূর্ব ভারতে সোরা নামে এক উপজাতি আছে, জঙ্গলে বাস করে। এরাও শামান সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। সোরা উপজাতির লোকেরা মৃতের সঙ্গে কথা বলে। এখানে শামানের ভূমিকা সাধারণত পালন করে মহিলারা। তারা দুই ভুবন অর্থাৎ পৃথিবী ও স্বর্গের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বলে শামান অনুসারীদের বিশ্বাস। মহিলা শামানকে কবর দেওয়া হয়। এরপর তার আত্মা চলে যায় অন্য ভুবনে। সেখানে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে সে। লোকেরা মহিলাকে কথা বলতে দেখে। শামান অনুসারীদের মতে আসলে মহিলা কথা বলছে না, বলছে মৃত ব্যক্তির আত্মা। মহিলা শুধুই মধ্যস্থতাকারী। সোরা উপজাতিদের মধ্যে শামান তৈরির জন্য ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা হয়। শামান মেয়ে বড় হয়ে শামান অনুসারী কাউকে বিয়ে করে। বলা হয় তার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান আসলে আত্মার সন্তান। সোরাদের মতে, মৃত্যু মানে মোটেই কারও অস্তিত্ব ধ্বংস নয়। মৃত্যু তাদের কাছে নতুন আরেকটি জীবন। তবে শামান হওয়া সহজ কাজ নয়। এ জন্য প্রচুর কষ্ট সহ্য করতে হয়। আমাজনের ইয়ানোমামি উপজাতিদের শামান তৈরির পদ্ধতি বিচিত্র এবং কষ্টকর। যে মানুষটি শামান হতে চায়, তাকে অন্তত সাতদিন ভীষণ নির্যাতন সহ্য করতে হয়। এর একটি হলো দুই নাকের ছিদ্রে তিন ফুট লম্বা বাঁশের নল ঢোকানো। সাত দিন শেষ হলে ভবিষ্যতের শামানকে রেখে আসা হয় জঙ্গলে। সেখানে গাছ কেটে সাত ফুট লম্বা যজ্ঞের পোল তৈরি করে ইয়ানোমামিরা। পোলটি ঢেকে দেওয়া হয় পাখির পালক দিয়ে। এটার নাম রক। রকটিকে ধরা হয় আত্মাদের বাসস্থান হিসেবে। আত্মারা নতুন শামানকে পাহারা দেয়। নতুন শামানকে গ্রামে নিয়ে যায় পুরনো দুই শামান কাঠের পোলসহ। এসময় গ্রামবাসী তাদের স্বাগত জানায়। কাঠের পোল নতুন শামানের দুই পায়ের মাঝে গেঁথে দেওয়ার পর প্রধান শামান নতুন শামানের মাথা টেনে ধরে ছুঁইয়ে দেয় পোলে। ব্যস, শামান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যায় নতুন শামান।
শামানদের ব্যাপ্তি সাইবেরিয়া থেকে ল্যাপল্যান্ড, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা (বিশেষ করে আমাজান এলাকায়) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এমনকি ভারতেও বিস্তৃত। পূর্ব ভারতে সোরা নামে এক উপজাতি আছে, জঙ্গলে বাস করে। এরাও শামান সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। সোরা উপজাতির লোকেরা মৃতের সঙ্গে কথা বলে। এখানে শামানের ভূমিকা সাধারণত পালন করে মহিলারা। তারা দুই ভুবন অর্থাৎ পৃথিবী ও স্বর্গের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বলে শামান অনুসারীদের বিশ্বাস। মহিলা শামানকে কবর দেওয়া হয়। এরপর তার আত্মা চলে যায় অন্য ভুবনে। সেখানে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে সে। লোকেরা মহিলাকে কথা বলতে দেখে। শামান অনুসারীদের মতে আসলে মহিলা কথা বলছে না, বলছে মৃত ব্যক্তির আত্মা। মহিলা শুধুই মধ্যস্থতাকারী। সোরা উপজাতিদের মধ্যে শামান তৈরির জন্য ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা হয়। শামান মেয়ে বড় হয়ে শামান অনুসারী কাউকে বিয়ে করে। বলা হয় তার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান আসলে আত্মার সন্তান। সোরাদের মতে, মৃত্যু মানে মোটেই কারও অস্তিত্ব ধ্বংস নয়। মৃত্যু তাদের কাছে নতুন আরেকটি জীবন।

তবে শামান হওয়া সহজ কাজ নয়। এ জন্য প্রচুর কষ্ট সহ্য করতে হয়। আমাজানের ইয়ানোমামি উপজাতিদের শামান তৈরির পদ্ধতি বিচিত্র এবং কষ্টকর। যে মানুষটি শামান হতে চায়, তাকে অন্তত সাতদিন ভীষণ নির্যাতন সহ্য করতে হয়। এর একটি হলো দুই নাকের ছিদ্রে তিন ফুট লম্বা বাঁশের নল ঢোকানো। সাত দিন শেষ হলে ভবিষ্যতের শামানকে রেখে আসা হয় জঙ্গলে। সেখানে গাছ কেটে সাত ফুট লম্বা যজ্ঞের পোল তৈরি করে ইয়ানোমামিরা। পোলটি ঢেকে দেওয়া হয় পাখির পালক দিয়ে। এটার নাম রক। রকটিকে ধরা হয় আত্মাদের বাসস্থান হিসেবে। আত্মারা নতুন শামানকে পাহারা দেয়। নতুন শামানকে গ্রামে নিয়ে যায় পুরনো দুই শামান কাঠের পোলসহ। এ সময় গ্রামবাসী তাদের স্বাগত জানায়। কাঠের পোল নতুন শামানের দুই পায়ের মাঝে গেঁথে দেওয়ার পর প্রধান শামান নতুন শামানের মাথা টেনে ধরে ছুঁইয়ে দেয় পোলে। ব্যস, শামান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যায় নতুন শামান।

-রণক ইকরাম

Thursday, January 27, 2011

মণিপুরী জাদুঘর

0 comments
২০০৬ সালের জানুয়ারি মাস। ঢাকায় বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের সেমিনার কক্ষে লোকবাংলা গবেষক দল 'বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি এবং শনাক্তকরণ, মূল্যমান নির্ধারণ ও মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ' শীর্ষক জাতীয় সেমিনারের আয়োজন করে। এতে মণিপুরীদের লোকসংস্কৃতি বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য মণিপুরী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হামোম তনু বাবুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি প্রবন্ধ তৈরির জন্য নানা তথ্য ও তত্ত্ব সংগ্রহ করার কাজ শুরু করেন নিজ এলাকায়। তিনি দেখলেন মণিপুরীদের লোকসংস্কৃতির অনেক ঐতিহ্য ও নিদর্শন হারিয়ে যাচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই এর অনেক ঐতিহ্য ও নিদর্শন বিলীন হয়ে যাবে। তাই তিনি এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেন এবং নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় গড়ে তুললেন একটি সংগ্রহশালা। নাম দিলেন 'চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরী ইন্টিলেকচ্যুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম' বা মণিপুরী জাদুঘর। হামোম তনু বাবু বলেন, প্রয়াত বাবার নামে দেওয়া এ জাদুঘর বাংলাদেশে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম একক জাদুঘর বা সংগ্রহশালা।

২০০৬ সালের ১ অক্টোবর এ জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন কবি দিলওয়ার। তখন থেকেই তনু বাবু জাদুঘরের জন্য বিভিন্ন এলাকায় মণিপুরীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করতে থাকেন তাদের ব্যবহৃত কৃষি, তাঁত, বিনোদন, খেলাধুলা, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি মাধ্যমের বিভিন্ন নিদর্শন।

২০০৭ সালের এপ্রিলে ঢাকায় লোকসংস্কৃতি বিষয়ে আরও একটি সেমিনারের আয়োজন করে যৌথভাবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ডবি্লউআইপিও। এখানেও হামোম তনু বাবু মণিপুরীদের লোকসংস্কৃতি বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ প্রবন্ধ উপস্থাপন করার জন্য আরও বেশি করে সংগ্রহের কাজ করতে লাগলেন। ২০০৭ সালের ১২ মে তার সংগ্রহ করা মণিপুরীদের বিভিন্ন ঐতিহ্য ও নিদর্শন দিয়ে সাজানো জাদুঘরের উদ্বোধন করেন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা। এ জাদুঘরে সংগ্রহ রাখা ঐতিহ্য ও নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে_ মণিপুরীদের নিত্যদিনের ব্যবহার্য কাঁসা-পিতলের কলস, জগ, গ্লাস, মগ, প্লেটসহ বিভিন্ন খাবার-দাবারের পাত্র, সোনা, রুপা ও বিভিন্ন ধাতবের তৈরি মেয়েদের বিভিন্ন ধরনের গহনা ও সাজসজ্জার উপকরণ, বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি, চালুন, ঠুঙ্গি, মাছ ধরার দুওড়, পোলো, ডালা, খালই, হাতপাখা, শুকনো খাবার রাখার পাত্র, কাঠের তৈরি চিরুনি, তাঁতের কাপড় বুননের সরঞ্জাম, বসার পাত্র, কৃষিকাজে ব্যবহৃত উপকরণ, ঢোল-তবলাসহ গান গাওয়ার বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, মণিপুরীদের তাঁতের বোনা বিভিন্ন রং ও নকশার শাড়ি, গামছা, শালসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড়, মণিপুরী ভাষার বর্ণমালা, ক্যালেন্ডার, বিভিন্ন প্রকাশনা, রাখাল-রাস নৃত্য, মণিপুরীদের বিভিন্ন উৎসবের পোশাকসহ এ সম্প্রদায়ের ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন নমুনা। এসব নমুনার অনেক কিছুই এখন প্রায় বিলুপ্ত। সবার জন্য উন্মুক্ত এ জাদুঘর। এখানে যেসব নমুনা আছে তা আরও ভালোভাবে সাজানোর জন্য প্রয়োজন উন্নত অবকাঠামো, যা তনুবাবুর পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য তিনি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে এ জাদুঘরটির আধুনিকায়নের জন্য সহযোগিতা চেয়েছেন।

ঠিকানা : তনু বাবু সড়ক, ছনগাঁও, আদমপুর বাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার।

গাজী মুনছুর আজিজ

গড়াই

0 comments
সীমার মাঝে অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর/ আমার মাঝে তোমার প্রকাশ তাই এত সুমধুর...।' কুষ্টিয়ার খোকসার জানিপুরে গড়াই নদী তীরে বসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতাটি রচনা করেছিলেন। গড়াইর রূপে বিমোহিত কবি শুধু গড়াইকেই বন্দনা করেননি, বন্দনা করেছিলেন গড়াইকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকাকে। কবিগুরুর সেই গড়াই আর আগের অবস্থায় নেই, শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে বিকিরিত করছে ধবল বালুর সোনালি কিরণ। এক সময় পদ্মার অন্যতম প্রধান শাখা নদী গড়াইয়ের পানি প্রবাহ আর তর্জন-গর্জন ছিল সবার চেনা। এখন অতি পরিচিত হিসেবে সবাইকে অবলোকন করতে হচ্ছে বালু মিশ্রিত মৃদু শব্দকে। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের নমুনা ও ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবের অশনি সংকেত হিসেবেও মানছেন কেউ কেউ। বিগত কয়েক বছর ধরে, বর্ষার পরপরই কমতে শুরু করে গড়াই নদীর পানি। পানি নিচে নেমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে নাব্য হারিয়ে ফেলা গড়াই পরিণত হয় ধু ধু বালুচরে। নদীটির উৎসমুখ তালবাড়িয়া থেকে ভাটির কামারখালী পর্যন্ত দুই তীরে জেগে ওঠা চর নদীর প্রবাহকে করছে বাধাগ্রস্ত। ফলে ক্ষীণ ধারায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদীটির পানি প্রবাহ। স্রোতধারার তীব্রতা কমে যাওয়ায় পলি জমতে শুরু করেছে যত্রতত্র। গড়াইকে পুনরুদ্ধার করতে সরকার কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করলেও তা নিতান্তই প্রশ্নবিদ্ধ। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বিগত ১৯৯৬-৯৭ সালে সাড়ে ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৩ বছর মেয়াদি একটি পুনরুদ্ধার খনন প্রকল্প প্রণয়ন করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, সেসময় ৫ লাখ ৮৭ হাজার ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হয়েছিল। ব্যয় বরাদ্দ হয়েছিল ৩ হাজার ৫৪২ টন চাল। একই সময়ে গড়াইয়ের বুকে পানি প্রবাহ সারা বছর সমুন্নত রাখতে বিভিন্ন মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে দাতা সংস্থাগুলোর সাহায্য নিশ্চিত হওয়ায় ২২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়সাপেক্ষে আরেকটি পুনরুদ্ধার প্রকল্প শুরু করা হয়। গড়াইয়ের উৎসমুখ তালবাড়িয়া থেকে ড্রেজিং করা হয় ৩০ কিলোমিটার ভাটি পর্যন্ত। ২৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটিতে ১ কোটি ১৫ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণের লক্ষমাত্রা ধার্য করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৯-২০০০ সালে পদ্মার মোট পানি প্রবাহের ৯-১০ ভাগ পানি গড়াই দিয়ে প্রবাহিত হয়।

ঘন ঘন ড্রেজিংয়ের ফলে কয়েক বছর নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী নাব্য ফিরে পায় এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিধারা সমুন্নত ছিল। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ ও তদারকির অভাবে আবার নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে, ধু ধু বালুচর মরূভৃমিএত পরিণত হয়েছে। হারিয়ে ফেলছে গড়াই তার অতীত ঐতিহ্য।

মনিরুল ইসলাম, খোকসা

কার্টুন

0 comments
কার্টুন ছবি আজ আমাদের সবার কাছেই পরিচিত। কিন্তু আমাদের অনেকের কাছেই এর আদি কথা অজানা। কিছু ইতস্তত কালির আঁচড় দিয়ে মনের ভাষাকে জীবন্ত করে তোলে এমন আঁকাআঁকিই কার্টুন হিসেবে পরিচিত। কার্টুনের কথা বললে আমাদের চোখের সামনে মোটামুটি এমন একটি ছবি ভেসে উঠে, যাতে রেখা বা রংয়ে একটু ভেঙেচুরে কিম্ভূত করা হয় আসল বস্তুর আলোকে। দেখে হাসি পায় যদিও, তবু কার্টুন ছবির মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৬৭১ সালে যখন কাঠের পিঠে কার্টুনের উৎপত্তি হলো তখন কিন্তু এর ব্যবহার ছিল অন্যরকম। শুধু কার্টুন নয়, তখন থেকে ক্যারিকেচার, কমিক স্ট্রিপ আর অ্যানিমেটেড কার্টুনের প্রচলন শুরু হয়।

ক্যারিকেচার হচ্ছে পুরো ছবিটিকে বা তার অংশবিশেষকে ইচ্ছা করে বিকৃতি করা। এতে চেহারাকে অনেক বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো হয় সবসময়। আবার এর পেছনে কোনো গূঢ় রহস্য নাও থাকতে পারে। আর কমিক স্ট্রিপ হলো পর পর ছবি সাজিয়ে কোনো ঘটনাকে মূর্ত করে তোলা, যাতে গল্পটা বা ঘটনাটা ফিল্মের মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অ্যানিমেটেড কার্টুনের কথা, এতে পর পর অনেক ছবি এমন আঁকা হয়, যাতে তার ছবি তুলে পর্দায় অভিক্ষেপণ করলে ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। এর নামই হচ্ছে কার্টুন ফিল্ম। যার আবিষ্কর্তা ছিলেন ওয়াল্ট ডিজনি। এবার আসা যাক কার্টুনের কথায়।

১৬৭১ সাল থেকেই মূলত কার্টুনের প্রচলন শুরু হয়। তখন অবশ্য এর উদ্দেশ্য ছিল খুব গুরুগম্ভীর। একটি শক্ত কাগজে ছবি এঁকে পরে তা থেকে ছবি তৈরি বা কাপড়ের উপর বন্ধনীর কাজ বা মোজাইক করার কাজে ব্যবহার হতো। অবশ্য ক্রমেই এর রূপ পাল্টে আধুনিককালের চিত্রশিল্পীদের কাছে এটি একটি শিল্প হয়ে ধরা দেয়।

সমৃদ্ধ হতে থাকে কার্টুন শিল্প। তারপর এলো নতুন যুগ। ১৮৬৩ সাল থেকে কার্টুন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হতে শুরু হলো। আর এর পথিকৃৎ ছিলেন ফরাসির 'শারিভাষী'। তার দেখাদেখি ইংল্যান্ডে আরম্ভ হলো পাঞ্চ (চঁহপব)। কার্টুন হাসায় ঠিকই, তবে হাসির খোরাক জোগাতেই শুধু কার্টুন ব্যবহার শুরু হয়নি। কার্টুন বিশুদ্ধ হাসির খোরাক যেমন জোগাতে পারে আবার প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক ভঙ্গিও ধারণ করতে পারে। আজকের জটিল দুনিয়ার কার্টুন শুধু হাসার জন্য নয়, ভাবার জন্য। উপলব্ধির জন্য বিশেষত আঁকা হয়।

-শামস সাইদ

গুহা

0 comments
গুহা প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়ের নাম। অনেকেরই ধারণা গুহা প্রাচীন মানুষের সৃষ্টি। বসবাস অথবা গোপন কোনো কাজে খুব কৌশলে নির্মাণ করা হয়েছে এসব। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভ্রান্ত। সত্যিকার অর্থে গুহা প্রকৃতিরই সৃষ্টি। বরফরাজ্য, মরুভূমি কিংবা সমুদ্রের মতোই পৃথিবীর এক বিচিত্র সৃষ্টির নাম গুহা। অন্ধকারে ঢাকা গভীরতার জন্য অনেকেই গুহাকে মৃত্যুফাঁদ বলে অভিহিত করেন। আবার কোনো কোনো গুহা প্রচণ্ড রকম শীতল হয়ে থাকে। তবে অন্ধকার এবং গভীর হলেও সর্বক্ষেত্রে গুহা মৃত্যুফাঁদ নয়।

গুহার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শিলা বিন্যাস চোখে পড়ে অহরহ। এক্ষেত্রে রুক্ষ ছিন্ন ভিন্ন শিলার পাশাপাশি অনেক সুন্দরতম শিলাও দেখা যায়। অনেক গুহাই পৃথিবীর অন্যতম সুন্দরতম স্থান বলে বিবেচিত হয়। কেননা অনেক গুহাকে কেন্দ্র করেই অনেক ক্ষেত্রে গড়ে উঠেছে নদী, ঝরনা, জলপ্রপাত, হ্রদ। কোনো কোনো গুহায় আবার রয়েছে উষ্ণ প্রস্রবন, বালি ও চোরাবালির মতো মরণফাঁদ।

কেন গড়ে ওঠে গুহা? এ বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে গুহা গড়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য কয়েকটি কারণের একটি হলো 'লাভা টিউব'। লাভা টিউব বা লাভা নির্গমণের ফলে সৃষ্ট নলাকার গুহা থেকেই গুহার উৎপত্তি। লাভা সাধারণত আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত হওয়ার সময় একটা ভূ-গর্ভস্থ পথ ধরে স্রোতের মতো এগোয়। সে কারণে লাভার চলার পথ ফাঁপা হয়ে যায়। আর এভাবেই গুহা তৈরি হয়। এছাড়া পানি চুঁইয়ে মাটির নিচে যায়। মাটির নিচে পাথরের ফাঁকে আগের জমাকৃত পানির সঙ্গে এই পানি জমা হয়। পানিতে বিদ্যমান ক্ষারে এসব পাথর হাজার হাজার বছর ধরে গলতে থাকে। আর এভাবে পাথরের জায়গায় তৈরি হয় বড় বড় ফাঁপা প্রকোষ্ঠ। এ প্রকোষ্ঠে পাথরের উপরের পানি নেমে যায়। ফলে উপরের ফাঁকা অংশ হয়ে পড়ে জলশূন্য। আর এভাবেই একসময় তা গুহায় রূপ নেয়। কোনো কোনো স্পেলিওলজিস্ট-এর মতে, ভূ-গর্ভস্থ পাথর অধঃক্ষেপণ, তাপ, চাপ ও রাসায়নিক ক্রিয়ার ফলে এর খনিজ উপাদান ও বুনট পরিবর্তিত হয়ে পলির রূপ ধারণ করে এবং ওই পাথরের স্থান ফাঁকা হয়ে তা গুহায় রূপ নেয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, যারা গুহা নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের স্পেলিওলজিস্ট আর যারা গুহা সন্ধান করেন তাদের স্পিলাংকার্স বলা হয়।

ভূ-বিজ্ঞানীরা গুহার ভেতরের তাপ, বাতাসের চাপ ও সূর্যালোকের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কখনো কখনো গুহাকে ভাগ করে থাকেন। শ্রেণী অনুসারে ভাগগুলো হলো_

টুইলাইট জোন: গুহার প্রবেশমুখে যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়, তাকে ঞরিষরমযঃ ুড়হব বা প্রদোষ অঞ্চল বলা হয়।

ভ্যারিয়েবল জোন : গুহার যে অংশে ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাপ উঠানামা করে তাকে ঠধৎরধনষব ুড়হব বা পরিবর্তনশীল তাপাঞ্চল বলে।

গুহার ভেতরে বিভিন্ন ধরনের বিন্যাস রয়েছে। হালকা ক্ষারীয় পানি গুহাতে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ে গঠিত হয় প্রাথমিক বিন্যাস 'স্পেলিওথেমস'। গুহার ছাদ থেকে পানি ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ার সময় কিছুটা ক্যালসিয়াম কার্বনেট গুহার ছাদে ও মেঝেতে থেকে যায়, এ জিনিস ক্রমাগত জমে গুহায় বিন্যস্ত হয়। গুহার ছাদে ঝুলন্ত এ ধরনের বিন্যাসকে বলে 'স্ট্যালাকটাইটস'। আর গুহার মেঝেতে গঠিত বিন্যাসকে 'স্ট্যালাগমাইটস' বলে, স্ট্যালাকটাইটস ও স্ট্যালাগমাইটস বিন্যাস পরস্পরের সঙ্গে মিশে নতুন এক ধরনের বিন্যাসের জন্ম দেয়। একে বলে গধরহংঃধু বা স্তম্ভ।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গুহা আবিষ্কৃত হচ্ছে। তবে এখনো এমন অনেক অনাবিষ্কৃত গুহা রয়েছে যা আগেরগুলো থেকে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতায় বেশি। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত গুহার মধ্যে মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের 'সারাওয়াক চেম্বার' সবচেয়ে বড় ভূ-গর্ভস্থ প্রকোষ্ঠ। এটি দৈর্ঘ্যে ২, হাজার ৩০০ ফুট ও প্রস্থে ১ হাজার ৪৭৬ ফুট। ফ্রান্সের রিজেয় জাঁ বার্নাদ বিশ্বের সবচেয়ে গভীর গুহা। এটি ৫ হাজার ২৫০ ফুট গভীর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির বিপুল গুহাশ্রেণীই পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা গুহা পথ। এ গুহার ভেতরদিকে রয়েছে ৫৫০ কিলোমিটার লম্বা গলিপথ ও খাদ। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সমুদ্রের তলদেশে এমন আরও শ'খানেক বিখ্যাত গিরিপথ ও গুহামালা রয়েছে। সুপ্রাচীনকাল থেকেই গুহা বিভিন্ন জীব-জন্তু ও মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পুরাবিদদের ধারণা, গুহাকে মানুষ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার শুরু করে ৫ লাখ বছর আগে থেকে। তাদের মতে, ইউরোপের প্রাগৈতিহাসিক মাথা লম্বা দীঘল মানুষ 'ক্রোম্যাগননরা' খ্রিস্টপূর্ব ৪০ হাজার বছর থেকে গুহাচিত্র আঁকা শুরু করে। গুহার নিশ্ছিদ্র আঁধারের সঙ্গে বহু প্রাণী বেশ মানিয়ে নিয়েছে। গুহাবাসী প্রাণীদের মধ্যে বাদুড়, সাপ, গিরগিটি, বিছাপোকা, ছারপোকা ছাড়াও আরও অনেক প্রজাতির পোকামাকড় বাস করে। মাটির ওপরের প্রাণীদের মতো এরা চোখনির্ভর নয়। এদের গন্ধ, স্পর্শ ও শ্রবণের অনুভূতি খুব তীক্ষ্ন। এরা এসব অনুভূতি দিয়েই গুহায় জীবনধারণ করে। গুহাতে এমন কিছু প্রাণী বাস করে যেসব প্রাণী গুহার অন্ধকার ছাড়া অন্য কোথাও বাস করে না। বা বলা উচিত বাস করতে পারে না। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এদের 'ট্রোগলোডাউট' বলা হয়। সপ্তদশ শতকে একদল বিজ্ঞানী এক গুহাবাসী গিরগিটির সন্ধান পায়। তারা সেটিকে ভুলে শিশু ড্রাগন বলে চিহ্নিত করে। এ নিয়ে ইউরোপজুড়ে তখন ভীষণ তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।

গুহা সন্ধান ও আবিষ্কার একটি অত্যন্ত কষ্টকর ও ব্যয়বহুল কাজ। এ কাজে প্রচুর সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। সবচেয়ে কষ্টসাধ্য হলো_ গুহার অস্তিত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা। তবে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্য ও উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কারের ফলে এখন গুহা সন্ধান অনেক সহজ হয়েছে। গুহা সন্ধানের ক্ষেত্রে ভূ-তাত্তি্বকরা মাটির নিচে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভূ-গর্ভে শব্দ প্রেরণ করেন। এ শব্দ মাটির নিচে বিভিন্ন শিলার স্তর থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। হাইড্রোফোন যন্ত্রের সাহায্যে প্রতিফলিত ধ্বনি ধারণ করে এবং কম্পিউটারের সাহায্যে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিধ্বনির লেখচিত্র অঙ্কন এবং পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন শিলার গঠন প্রকৃতি ও ফাঁপা কিনা তা বুঝা যায়। এভাবে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে গুহা সন্ধান করা হয়।

রণক ইকরাম

পূর্ণিমায় রাস নৃত্য

0 comments
মধ্যরাত। পূর্ণিমার পরিষ্কার আলো। হালকা শীতের আমেজ। বৃদ্ধ নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী এবং শিশু, সবাই বসে আছে মণ্ডপের চারপাশে। আর তাদের সবার দৃষ্টি মণ্ডপে নৃত্যরত শিল্পীদের প্রতি। নৃত্য চলছে। নৃত্য চলে এক জাতীয় বিশেষ গান ও বাজনার তালে। মণ্ডপের এক পাশে বসে গান-বাজনা বাজায় ৫/৬ জন বৃদ্ধ নারী-পুরুষ। আর যারা নৃত্য করছে, তারা বেশির ভাগ বয়সে শিশু ও কিশোরী। ১৫ থেকে ২০ জন দলবেঁধে এক ধরনের বিশেষ ঝলমলে পোশাক পরে এই নৃত্য করছে। যারা নৃত্য দেখছে তারা মাঝেমধ্যে নৃত্যশিল্পীদের টাকা পায়ের কাছে রেখে প্রণাম করে আসে।

প্রতি বছর কার্তিক মাসের পূর্ণিমা রাতে মাধবপুর জোড়া মণ্ডপে এবং আদমপুর বাজারে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। মণিপুরীদের হলেও এ উৎসবে যোগ দেয় এ অঞ্চলের মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই। উৎসবে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন স্থানসহ ভারত থেকে সংস্কৃতিপ্রেমীরাও ছুটে আসেন।

বেলা ১১টায় রাখাল নৃত্য দিয়ে রাস পূর্ণিমা উৎসব শুরু হয়। রাখাল নৃত্যের আগে যারা নৃত্য করে, তারা প্রথমে মণ্ডপে গোল হয়ে গোপী ভোজন করেন। গোপী ভোজন হলো বিভিন্ন সবজি দিয়ে রান্না করা তরকারি ও ভাত। এটা খেয়েই রাখাল নৃত্য শুরু করে শিল্পীরা। রাখাল নৃত্য চলে একটানা বিকেল পর্যন্ত। পাশাপাশি দিনভর চলতে থাকে মণিপুরীদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। রাখাল নৃত্য পরিবেশন করে মণিপুরী শিশু-কিশোর ও ছেলেমেয়েরা। এ নৃত্যের সময় ছেলেরা এক ধরনের এবং মেয়েরা বিশেষ পোশাক পরে। ঝলমলে এ বিশেষ পোশাকের নাম 'পলয়'। এ পোশাকের পরিকল্পনা করেছিলেন রাজা ভাগ্যচন্দ্র। রাখাল নৃত্যের মূল বিষয়বস্তু হলো কৃষ্ণ ও তার সখাদের নিয়ে। মণ্ডপে কখনো একক, কখনো দ্বৈত এবং কখনো দলবেঁেধ এ নৃত্য পরিবেশিত হয়।

অনুষ্ঠান শেষে এখানে রাসের বিশেষ খাবার খাওয়া হয়। রাস উৎসবে মণিপুরীরা বিভিন্ন সবজি, ডাল, গাছের লতা-পাতা দিয়ে উতি, পাকাউরা, সৈবুম, ইরোলবা নামের বিশেষ খাবার তৈরি করে। মণ্ডপে সবাই বসে কলা পাতায় এ খাবার খায়। রাত সাড়ে ১১টায় শুরু হয় রাস নৃত্য। চলে ভোর পর্যন্ত। রাস নৃত্য পরিবেশন করে মণিপুরী শিশু ও কিশোরী মেয়েরা। রাস নৃত্যের সময়ও পলয় পরা হয়। পলয় পোশাকের মাথার উপরি ভাগের নাম 'কোকুতম্বি'। এ পোশাকের মুখের উপর পাতলা স্বচ্ছ আবরণ থাকে। তার নাম 'মাইমুখ'। গায়ে থাকে সোনালি-রুপালি চুমকির কারুকাজের ঘন সবুজ ভেলভেটের ব্লাউজ। পরনে থাকে ঘন সবুজ রংয়ের পেটিকোট, যা শক্ত বক্রমের দ্বারা গোলাকৃতি ও ভাঁজমুক্ত করা হয় এবং অজস্র চুমকি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়নার দ্বারা কারুকাজ করা থাকে, যা সামান্য আলোতে ঝলমল করে ওঠে। পলয়ের এ অংশের নাম 'কুমিন'। এছাড়া জরির কারুকাজ করা পেশোয়ান খাওন, খবাংনপ পলয়ের অংশ। এছাড়া পলয়ের সঙ্গে কলথা, খবাংচিক, খুঁজিসহ স্বর্ণালঙ্কারও নৃত্য শিল্পীরা পরেন। রাস নৃত্যও গোলাকার মণ্ডপে কখনো একক, কখনো দ্বৈত এবং কখনো দল বেঁধে পরিবেশিত হয়। রাস নৃত্যের সঙ্গেও মণিপুরী সংস্কৃতির গান এবং বাজনা বাজে। রাস নৃত্যের মূল বিষয়বস্তু হলো রাধা ও তার সখাদের নিয়ে। এই নৃত্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের শুরু, মান-অভিমান এবং শেষে মিলন দেখানো হয়।

রাস পূর্ণিমা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক এইচ ফাল্গুনী বলেন, ১৭৮৯ সালে রাজর্ষি ভাগ্যচন্দ্র ভারতের মণিপুরে রাস পূর্ণিমা উৎসবের প্রবর্তন করেন। তার তিরোধানের পর মহারাজ চন্দ্রকীর্তি এ উৎসবকে আরও বেশি জনপ্রিয় করার জন্য কাজ করেন এবং উৎসবকে মণিপুরীদের কাছে ছড়িয়ে দেন।

১৯১৯ সালের নভেম্বরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট ভ্রমণে এলে তার সম্মানে মণিপুরী রাস নৃত্যের আয়োজন করা হয়। কবিগুরু এ নৃত্যের ভাবরস দেখে অভিভূত হন। পরে তিনি ত্রিপুরার রাজা বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুদ্ধিমন্ত্র সিংহকে মণিপুরী নৃত্যের শিক্ষক হিসাবে শান্তিনিকেতনে নিয়োগ করে মণিপুরী রাস নৃত্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তোলেন। বাংলাদেশে মণিপুরী সমপ্রদায়ের বসবাস প্রায় ২০০ বছর ধরে। এদেশে তাদের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। মণিপুরীদের তিনটি সমপ্রদায় রয়েছে। এগুলো হলো_ মৈতেই, বিষ্ণুপ্রিয়া এবং মৈতেই পাঙ্গাল। বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতেই সমপ্রদায় হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। এরা গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমপ্রদায়ভুক্ত। এছাড়া মৈতেই পাঙ্গালরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। তিন সমপ্রদায়ের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতিতে কিছু ভিন্নতা থাকলেও তাদের প্রধান বার্ষিক উৎসব 'রাস পূর্ণিমা'।

গাজী মুনছুর আজিজ