Friday, March 18, 2011

ধোলাই খাল, ঢাকা

0 comments
ধোলাই খাল পুরনো ঢাকার একটি এলাকা, অতীতে ঢাকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাল ছিল, বর্তমানে কারিগরী প্রতিষ্ঠানের জন্য বিখ্যাত। এখানে গাড়ির ইঞ্জিন, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম মেরামতের বহু লাভজনক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গত অর্থবছরে (২০১০) ধোলাই খাল এলাকায় উৎপাদিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে মোট ৩শ ১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের তার শাসনামলে ইসলাম খান চিশতীকে রাজমহলের সুবেদার নিযুক্ত করেন। তিনি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ভৌগোলিক অবস্থানের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক দিক বিবেচনা করে রাজধানী রাজমহল থেকে সরিয়ে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। তৎকালীন ঢাকার প্রধান জলপথ ও নগর রক্ষা পরিখা ছিল এই ধোলাই খাল। তার পাশে ছিল বেগ মুরাদের দুটি দুর্গ। নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে নগর রক্ষার পরিখা নির্মাণ ও জলপথ হিসেবে ব্যবহারের জন্য ঢাকার প্রথম সুবেদার ইসলাম খান ধোলাই খাল খনন করিয়েছিলেন।
১৮৭০ সালে লোহার পুলের উপর থেকে “দোলাই খাল”
এই শতকের ষাটের দশক পর্যন্তও ধোলাই খালের সঙ্গে ঢাকার নাম ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ধোলাইর যে শাখাটি ডেমরার দিকে গেছে, সেই শাখাটিই ধোলাই খাল নামে পরিচিত । উত্তর-পূর্বে দিকে বয়ে যেতে যেতে মিশেছে বালু নদীতে, যেটি আবার ডেমরায় মিশেছে লক্ষ্যা নদীর সঙ্গে। বালু নদী থেকে বহির্গত হয়ে ধোলাই খালটি ঢাকা শহরের পূর্বাঞ্চলে ধোলাই নদী হিসেবে প্রবাহিত, যা খাল নামে পরিচিত ছিল। নবাব ইসলাম খাঁ জনগণের স্বাস্থ্য, চলাচল সুবিদার্থে আরও কিছু এলাকায় খাল খনন করেন। পুরনো ধোলাই খালটির পুনর্খনন ও সংস্কার করে খালটিকে নৌযান চলাচল ও মালামাল আনা-নেওয়ার উপযোগী করেছিলেন। কোনো কোনো স্থানে পাকাপোক্ত এবং বাঁশ-কাঠের সেতু নির্মাণ করে শহরের পূর্ব ও পশ্চিমভাগের বিভিন্ন মহল্লার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা করে দিয়েছিলেন।
১৮৩০ সালে লোহার পুলের নীচে “দোলাই খাল”

খালের পূর্ব পাড়ে একটি এলাকায় পণ্যদ্রব্য বেচাকেনা হতো। ধোলাই খালের নামানুসারে তার নাম ধারন করে ধোলাইগঞ্জ। ১৮৩০ সালে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ালটার জনগণের চাঁদায় লোহার ঝুলন্ত পুল নির্মাণ করে ঢাকা শহরের সঙ্গে ধোলাইগঞ্জের সংযোগ সাধন করেন। ইংরেজ শাসনামলে ১৮৬৪ সালে গভর্নমেন্টের ব্যয়ে খালটি পুনরায় সংস্কার করা হয়। এতে তৎকালীন ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল বলে জানা যায়। ১৮৬৭ সালের এপ্রিল থেকে খালে চলাচলকারী জলযানের ওপর মাসুল ধার্য করা হয়। এ খাল দিয়ে শহরে মাল আনা-নেওয়ার ব্যাপারে ময়মনসিংহবাসীর বেশি সুবিধা হয়েছিল। ১৮৭২ সালে সরকার ধোলাই খালটি ঢাকা পৌরসভার হাতে ন্যস্ত করে। শুষ্ক মৌসুমে খালের পার থেকে মাটি কেটে শহরের অনেকেই ঘরবাড়ি তৈরির কাজে লাগাতেন। মুনতাসীর মামুন তাঁর 'স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী'তে লিখেছেন – '১৯০৯ সালে প্রকৌশলীরা ধোলাই খাল ও তার শাখা-প্রশাখাসহ ১২ মাইল জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করেন। এটি বাস্তবায়িত হয়নি'। মুনতাসীর মামুনের মতে, খালটির আসল নাম হলো দোলাই খাল। আমারও মনে হয় দোলাই খালই হবার সম্ভাবনা বেশি।
১৯০৪ সালে লোহার পুলের নীচে “দোলাই খাল”
ষাটের দশকের দিকে জমি দখলের প্রক্রিয়ায় ধোলাই খাল হারিয়ে যেতে থাকে। একসময় তা পুরো ভরাট করে ফেলা হয়। এর বিষফল ঢাকাবাসীকে বহন করতে হচ্ছে। পানি অপসারণের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় নগরে সৃষ্টি হচ্ছেই জলাবদ্ধতা। হারিয়ে গেছে সেই পুরনো চিত্র। ধোলাই খাল এখন আর খাল নেই। এর ওপর বর্তমানে জমজমাট মোটর পার্টস ও অন্যান্য শিল্পদ্রব্যের কারখানা এবং বাজার গড়ে উঠেছে।

গত ২৬ জানুয়ারি, ২০১১, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া ধোলাই খাল এলাকাকে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার ঘোসনা দিয়েছেন। খাল থেকে শিল্প প্রতিষ্টান, শিল্প প্রতিষ্টান থেকে শিল্প উদ্যান – খারাপ না। তবে খালটিকে পুনরায় উদ্ধার করতে পারলেই মনে হয় সবচাইতে ভাল হত।

দোলাইয়ের উপরে সেই বিখ্যাত লোহার পুল। একটা পুলের থেকে কি করে একটা এলাকার নাম লোহার পুল হয়ে যেতে পারে এটা একটা বিরাট বিষ্ময়। এই পুলটি নিশ্চয়ই কোন বিরাট অবদান এনেছিল তখনকার মানুষের জীবনে।
১৯০৪ সালে দোলাইয়ের পাড় থেকে Fritz Kapp নেয়া ছবি
বিখ্যাত সেই পুলের ছবি আজও এলাকার মানুষ তাদের ঘরে ঘরে, দোকানে দোকানে সাজিয়ে রাখে। অনেকেই ছবি দেখে আপ্লুত হয়। ফিরে যায় শৈশবে। গেন্ডারিয়ার ইতিহাসখ্যাত লোহার পুলটি তো বটেই, কোনো কংক্রিটের পুলও এখন আর নেই সেখানে। থাকবে কী করে? যার ওপর ছিল পুলটি, সেই ধোলাই খালই (অনেকে বলেন দোলাই খাল) তো নিশ্চিহ্ন!

ধোলাই খালের ওপর লোহারপুল ছিল উনিশ শতকে ঢাকার অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান। বিশ্বে তখন সবেমাত্র ‘সাসপেনশন ব্রিজ’ বা ঝুলন্ত সেতুর ব্যবহার শুরু হয়েছে। সেই ঝুলন্ত লোহার সেতু তৈরি হলো ঢাকায়। দেশের লোক তো যেতই, বিদেশিরাও ঢাকায় এলে আগ্রহ নিয়ে দেখতে যেত লোহারপুল। কর্নেল ডেভিডসন ১৮৪০ সালে ঢাকায় এসে লোহারপুল দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন পুল ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সৌন্দর্যে। লোহারপুল পেরিয়ে তিনি গিয়েছিলেন আরও সামনে পাগলাপুলের দিকে। ঘন জঙ্গল ছিল পূর্বদিকে। চমত্কার রাস্তা। পাশ দিয়ে ছবির মতো গ্রাম। একটি-দুটি নিঃসঙ্গ কুঠির খুবই ভালো লেগেছিল। সেসব কথা তিনি লিখে গেছেন ভ্রমণবৃত্তান্তে।

লোহারপুল তৈরি কাজ শুরু হয়েছিল ১৮২৮ সালে। দুই বছর লেগেছিল শেষ হতে। পুল তৈরির জন্য নির্মাণসামগ্রী ইংল্যান্ড থেকে এনে রাখা হয়েছিল ফরাশগঞ্জে। পুল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন উনিশ শতকে ঢাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় সরকারি কর্মচারী, ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ালটার্স। তিনি শুধু ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেটই ছিলেন না, শহর পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য যে ছোট একটি 'ইম্প্রুভমেন্ট কমিটি' গঠিত হয়েছিল, তারও ছিলেন সদস্য। ঢাকার সাধারণ মানুষ তাকে পছন্দ করত এ কারণে যে, শহর উন্নয়নের জন্য আন্তরিকভাবে তিনি বিভিন্ন কাজে হাত দিয়েছিলেন। ১৮২৫ থেকে ১৮৩০ সাল পর্যন্ত ঢাকায় ছিলেন তিনি।

লোহারপুল সম্পর্কে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, মুঘল আমলেও এখানে একটি ব্রিজ ছিল। তা নষ্ট হয়ে পড়ায় খালের দুই পাশের লোকজনের পারাপারের ক্ষেত্রে সমস্যা হতো। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ তখন বন্দর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা দরকার হয়ে পড়েছিল। এসব কারণেই ধোলাই খালের ওপর সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওয়াল্টার ছিলেন কর্মোদ্যোগী মানুষ। ঢাকার মিউনিসিপ্যাল (পৌরসভা) গঠনের ব্যাপারে এবং বিশেষ করে পয়োপ্রণালি, পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে তিনি নানা উদ্যোগ নিয়ে ঢাকাবাসীর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন। ওয়াল্টার লোহারপুল তৈরির জন্য ঢাকাবাসীকে অর্থ জোগান দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকাবাসী যে অর্থ দিয়েছিল, তা দিয়েই নির্মিত হয় ‘লোহারপুল’।

পুল তো তৈরি হলো, কিন্তু শক্তপোক্ত হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে। এক অভিনব ব্যবস্থা করা হলো সে জন্য। ঢাকায় তখন হাতির অভাব নেই। একটি পূর্ণ বয়স্ক হাতিকে তুলে দেওয়া হলো পুলের ওপর। দিব্যি হেলে-দুলে পার হয়ে গেল বিশাল দেহী ঐরাবত। সবার বিশ্বাস হলো, ঝুলন্ত সেতু সত্যি মজবুত হয়েছে। লোক উঠলে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা নেই মোটেও। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে নিউইর্কের বিখ্যাত ব্রুকলেন ব্রীজেও প্রথম মানুষ উঠতে চায়নি। মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য পাঁচটি হাতি এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করানো হয় ।

লোহারপুল হিসেবে পরিচিত পুলটি ছিল ধোলাই খালের ওপর তৈরি করা দ্বিতীয় সেতু। এই লোহারপুলটি টিকেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু পর্যন্ত। এরপর এটি নষ্ট হয়ে গেলে তৃতীয় পুলটি নির্মাণ করা হয়। তৃতীয় পুলটি টিকে ছিল স্বাধীনতার পরেও। ফওজুল করিম তাঁর পরিবিবি ও রক্তাক্ত লালবাগ দুর্গ গ্রন্থে লোহারপুল এবং ওয়াল্টার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ১৯৭৩-৭৪ সালে চতুর্থ পুলটি নির্মাণ করা হয়। এই লোহারপুলটি অনেকেই দেখেছেন। সূত্রাপুর থানার সামনে এক প্রান্তে কে বি (কেশব ব্যানার্জি) রোডের মোড়ে। রংধনুর মতো বাঁকা সেতু। রিকশাচালকেরা যাত্রী নিয়ে পুলে উঠতে পারতেন না। দুই প্রান্তে রিকশা ঠেলার জন্য মজুদ থাকত টোকাইয়ের দল। বলতে হতো না। রিকশা এলেই তারা ঠেলতে শুরু করত। পুল পার হলে এক টাকা। প্রথম দিকে চার আনা করে ছিল রেট। এখন পুলও নেই, ঠেলার লোকও নেই। শেষে লোহারপুলটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। থামগুলো জং ধরে নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সালের দিকে কাঠামো ভেঙে পড়ে। ১৯৯৭ সালে পুলের বদলে তৈরি হয় বক্স কালভার্ট। কোনো চিহ্নই নেই আর লোহারপুলের।

লোহারপুল তৈরির আগেই গেন্ডারিয়ায় যে কিছু কিছু ঘরবাড়ি ছিল, তার বিবরণ পাওয়া যায় কর্নেল ডেভিডসনের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে। তবে এলাকাটি জমজমাট হয়ে ওঠে ১৮৮০ সালের দিকে। এ সময় গেন্ডারিয়ায় রজনীকান্ত চৌধুরী ও দীননাথ সেন জমি কিনে বাগানবাড়ি বানান। মুনতাসীর মামুন ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এরপর ‘অনেকেই গেন্ডারিয়ায় জমি কিনে ঘরবাড়ি তৈরি করতে থাকেন। অচিরেই এলাকাটি ভদ্রলোকের কলোনিতে পরিণত হয়।’

আজ লোহারপুল তো নেই, ধোলাই খালও নেই। বৃষ্টি হলেই এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এখন লোহারপুল থেকে যাত্রাবাড়ী যাওয়ার একটি প্রশস্ত সড়ক হয়েছে। ফলে এলাকায় যোগাযোগের সুবিধা হয়েছে, যানজট কিছুটা কমেছে। কিন্তু লোহার পুল তো আর নেই। পুলটি নিছক পুলই ছিল না, ছিল এলাকার ঐতিহ্য। কে বি রোডে লোহারপুলের প্রান্তে সিটি করপোরেশন নির্মাণ করছে জহির রায়হান নাট্যকেন্দ্র। দুই দিকে উঠে গেছে দোকানপাট। ফলে লোহারপুল ঠিক কোথায় ছিল, অনেক দিন যাঁরা ওদিকে যাননি, তাঁদের পক্ষে জায়গাটি খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হবে। পুরোনো বাসিন্দাদের হয়তো মনে থাকবে, আরও কিছু দিন, তারপর হয়তো বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবে লোহারপুল!

লিখেছেন : পাভেল চৌধুরী

0 comments:

Post a Comment