Thursday, November 5, 2026

সংবিধানের নতুন রূপরেখা: উচ্চকক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আমাদের রাজনৈতিক ভবিতব্য

0 comments

দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই, ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজপথের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, তার চূড়ান্ত ফসল মূলত নির্ভর করছে আমাদের সংবিধানের গুণগত সংস্কারের ওপর। জাতীয় সংসদ ভবনে ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো থেকে যেসব প্রস্তাবনা ও ‘আইডিয়া’ বেরিয়ে আসছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনা চলছে। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় আমি সংবিধানের বহু কাঁটাছেঁড়া দেখেছি, যা মূলত ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এবারের আলোচনাগুলোতে কাঠামোগত পরিবর্তনের যে রূপরেখা দেওয়া হচ্ছে, তা যদি রাজনৈতিক সততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।


**দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ**

আমাদের রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় ক্যানসার হলো নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা। পারস্পরিক আস্থার চরম সংকটের কারণে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন এ দেশে এক অলিক কল্পনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ কমিটির বৈঠকে এই সংকটের একটি অত্যন্ত সৃজনশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের প্রস্তাব উঠেছে—আর তা হলো সংসদের ‘উচ্চকক্ষ’ সৃষ্টি এবং তার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন।


আলোচনায় প্রস্তাব এসেছে যে, ১০৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা যেতে পারে, যার মধ্যে সংসদের নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে ৫০ জন এবং প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে (Proportional Representation) ৫০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। বাকি ৫ জন সদস্য রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেবেন, যারা শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান বা জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। এই উচ্চকক্ষের স্পিকারকে পদাধিকার বলে উপরাষ্ট্রপতি বা ভাইস প্রেসিডেন্ট করার একটি প্রস্তাব এসেছে, যিনি নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারপ্রধানের (তত্ত্বাবধায়ক প্রধান) দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া সরকারি ও বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ থেকে অন্যান্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।


আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে, এটি একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাব। উচ্চকক্ষের মেয়াদ যদি ৬ বছর হয় এবং নিম্নকক্ষের মেয়াদ ৪ বছর হয়, তবে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে সংসদ ভেঙে গেলেও রাষ্ট্রের একটি নির্বাচিত কক্ষ সবসময় বহাল থাকবে। এর ফলে রাষ্ট্র কখনোই সম্পূর্ণ জনপ্রতিনিধিত্বহীন হবে না। তবে এখানে আমার একটি পরামর্শ হলো, উচ্চকক্ষ যেন কেবল অবসরপ্রাপ্ত বা নির্বাচনে পরাজিত রাজনীতিকদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত না হয়। ৬৪ জেলা ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার যে প্রস্তাবটি এসেছে, তা অত্যন্ত সাধুবাদযোগ্য। উচ্চকক্ষকে হতে হবে সত্যিকার অর্থেই একটি 'হাউস অব এল্ডার্স' বা প্রজ্ঞাবানদের আড়ত, যা নিম্নকক্ষের যেকোনো হঠকারী বা জনস্বার্থবিরোধী আইন পাসের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।


**বিচার বিভাগকে রাজনীতির বাইরে রাখা**

অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল এর প্রধান হিসেবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে টেনে আনা। এতে করে সুপ্রিম কোর্ট চরমমাত্রায় রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়েছিল। বিশেষ কমিটির বৈঠকে অত্যন্ত প্রাজ্ঞতার সঙ্গে বিচার বিভাগকে এই নির্বাচনকালীন সরকারের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তিদায়ক দিক। বিচারালয় হলো সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান খোঁজার জন্য রাষ্ট্রপতির সর্বশেষ বিকল্পটিও বাদ দিয়ে পুরোপুরি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ থেকে বা স্পিকারকে প্রধান করার যে প্রস্তাবনা এসেছে, তা বাস্তবায়িত হলে বিচার বিভাগের হারানো পবিত্রতা ও নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।


তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাইরে রাখলেই নিশ্চিত হবে না। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের অধীনে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব নিয়ে কমিটিতে আলোচনা হয়েছে এবং সরকারের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা দ্রুত আইনে পরিণত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


**৭০ অনুচ্ছেদের শেকল ভাঙা**

বাংলাদেশের সংসদে জনপ্রতিনিধিরা মূলত দলীয় প্রধানের ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে কাজ করেন, যার মূল কারণ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদের কারণে কোনো সাংসদ নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারেন না। এই ধারাটি গণতান্ত্রিক চর্চাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। কমিটিতে প্রস্তাব এসেছে যে, ৭০ অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ণ বাতিল না করে একে চারটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা হোক: সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, সরকারের ওপর আস্থা/অনাস্থা ভোট এবং যুদ্ধ বা জাতীয় নিরাপত্তাজনিত বিষয়। এই চারটি বিষয় বাদে অন্য যেকোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে তাঁদের মতামত প্রকাশ ও ভোট দিতে পারবেন।


একজন প্রবীণ সংবাদকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, এটি সংসদীয় গণতন্ত্রকে জীবন্ত করার মোক্ষম দাওয়াই। এর ফলে সরকারের স্থায়িত্ব যেমন হুমকির মুখে পড়বে না (কারণ অনাস্থা ও অর্থবিলে দলীয় বাধ্যবাধকতা থাকছে), তেমনি অন্যান্য সাধারণ আইন প্রণয়নে সাংসদরা নিজেদের বিবেক ও জনস্বার্থ অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন। তবে এখানে আমার পরামর্শ থাকবে, দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সদস্যপদ সরাসরি বাতিল না করে, দল থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতা দলের হাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত, সংসদ সদস্যপদ বাতিলের ক্ষমতা নয়।


**ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান**

আমাদের বর্তমান কাঠামোতে প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধানের হাতে প্রায় এককেন্দ্রিক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পুঞ্জীভূত। বিশেষ কমিটির বৈঠকে এক ব্যক্তির হাতে দল, সরকার ও সংসদের প্রধান—এই তিনটি পদ না রাখার বিষয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধের একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মানবাধিকার কমিশনকে নিছক সংবিধিবদ্ধ সংস্থা না রেখে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে। একটি ‘স্ট্যাটুটরি কনস্টিটিউশনাল বোর্ড’ গঠনের মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠনের যে রূপরেখা আলোচিত হয়েছে, তা যদি সত্যিকার অর্থে কার্যকর করা যায়, তবে নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে দুদক—সব প্রতিষ্ঠানই মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে।


পাশাপাশি, সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি ছাড়াও স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার যে প্রস্তাব এসেছে, তা সংসদীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক বিশাল মাইলফলক। জুলাই জাতীয় সনদেও এর উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।


**বিরোধী দলের অনুপস্থিতি ও ঐকমত্যের সংকট**

এত সব চমৎকার ও সময়োপযোগী আলোচনার মাঝেও একটি বিশাল শূন্যতা প্রকটভাবে চোখে পড়ছে—তা হলো কমিটিতে প্রধান বিরোধী দলের অনুপস্থিতি। জুলাই জাতীয় সনদের কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত থাকার কারণে বিরোধী দল এই বিশেষ কমিটিতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বারবার বিরোধী দলকে বৈঠকে এসে তাঁদের মতামত তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে আপত্তি শিথিল করার প্রস্তাব এলে কমিটি তা বিবেচনা করবে।


সাংবিধানিক সংস্কার কোনো একদলীয় ইশতেহার নয়। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চুক্তি। বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া যে সংবিধান প্রণীত হবে, তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে পড়তে বাধ্য। আমি মনে করি, সরকারের উচিত কেবল আনুষ্ঠানিক আহ্বানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, রাজনৈতিকভাবে উদ্যোগী হয়ে বিরোধী দলকে এই আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।


**২০১১ সালের ছায়া ও আমাদের প্রত্যাশা**

অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের আশাবাদী হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা ভুলিনি ২০১১ সালের কথা। তৎকালীন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন কমিটি সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটিমাত্র বৈঠকের পরই পুরো সিদ্ধান্ত উল্টে যায় এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেশে একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন দীর্ঘায়িত করার বীজ বপন করা হয়।


সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল ঠিক এই শঙ্কাটির কথাই বৈঠকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, অতীতে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েও মানুষ প্রতারিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, বর্তমান সরকারের কোনো একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা বা অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা নেই, তাই ২০১১ সালের পুনরাবৃত্তি হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।


তবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সব সময় বাস্তবতায় রূপ নেয় না। তাই নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং অংশীজনদের নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি থাকতে হবে। আমরা এমন একটি সংবিধান চাই, যা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট বা আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করবে। উচ্চকক্ষ সৃষ্টি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যেসব প্রস্তাব এই ৪৪ জন আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ দিয়েছেন, তা যদি কেবল রিপোর্টের কাগজে বন্দি না থেকে সংবিধানে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়, তবে বাংলাদেশ সত্যি একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আমরা আর কোনো প্রতারণার শিকার হতে চাই না, আমরা চাই একটি স্থায়ী, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের টেকসই সাংবিধানিক ভিত্তি।

Wednesday, October 21, 2026

মানব কল্পনায় মৎস্যকন্যার চার সহস্রাব্দ: ভয়ংকর থেকে রূপসী নারী

0 comments

সমুদ্রের নীল ঢেউয়ের নিচে চিরকালই মানুষ খুঁজেছে রহস্য। কখনো তা আদিম ভীতি, কখনো অসীম অপার সৌন্দর্য, আবার কখনো ভালোবাসার আকুল আর্তি। আধুনিক পপ-কালচার কিংবা শিশুদের রঙিন রূপকথার বই খুললেই যে কমনীয় জলকন্যা আমাদের চোখে ভাসে—উন্মুক্ত মসৃণ বক্ষদেশ, একমাথা সোনালি চুল আর নাভির নিচ থেকে নেমে যাওয়া রুপালি আঁশে ঢাকা মাছের লেজ—এই রূপটি কিন্তু রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। আজকের এই মৎস্যকন্যা বা মারমেইড (Mermaid) কোনো একক কবির কল্পনাপ্রসূত সৃষ্টি নয়; বরং এটি প্রায় চার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক মিশ্রণ, পৌরাণিক রূপান্তর, ধর্মীয় রূপক এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের এক বিস্ময়কর ফসল।


যে চরিত্রটি আজ ডিজনির রূপালি পর্দায় গান গেয়ে যুবরাজকে মোহিত করে, মানব ইতিহাসের ঊষালগ্নে তার রূপ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি ছিলেন কখনো সভ্যতার জ্ঞান বিতরণকারী পুরুষ, কখনো উর্বরতার রুদ্রমূর্তি দেবী, কখনো ডানাঅলা রাক্ষুসী পাখি, আবার কখনো বিষাক্ত সাপের রূপধারী বা জলঘূর্ণির মতো প্রাণঘাতী সমুদ্রদানব। কীভাবে মানুষ, জন্তু, পাখি ও দেবী পরস্পর মিশে গিয়ে জন্ম নিল আধুনিক মৎস্যকন্যার? এই দীর্ঘ পৌরাণিক যাত্রার ইতিহাস কোনো রূপকথার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।

১. আদিম গুহাচিত্র থেকে সংকর অবয়বের শুরু: কেন মাছ অনুপস্থিত ছিল?

মানবজাতির গল্প বলার ইতিহাসের সূচনা যদি আমরা খুঁজতে যাই, তবে ফিরে তাকাতে হবে প্রাচীন প্রস্তর যুগে (প্যালিওলিথিক যুগ)—প্রায় ৩৩ থেকে ৩৮ হাজার বছর পূর্বে। জার্মানির স্টাডেল গুহা থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল হাতির দাঁতে খোদাই করা ‘সিংহ-মানব’ (Löwenmensch)। আবার দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের ত্রোয়া-ফ্রের গুহায় পাওয়া যায় প্রায় ১৩ হাজার বছর আগের ‘জাদুকর’ চিত্র, যেখানে মানুষের দেহের সাথে হরিণের শিং ও পশুর অঙ্গপ্রতঙ্গ মিশে আছে।

আদিম মানুষ প্রকৃতির রুদ্র রূপের সামনে ছিল অত্যন্ত অসহায়। শিকার ও জীবনসংগ্রামের সেই যুগে তারা পশুর শারীরিক শক্তি ও মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে একত্র করে এক অতিপ্রাকৃত সত্তার কল্পনা করেছিল। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২,২০০ সালের আগের কোনো টিকে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে মানবদেহের সাথে মাছের শরীরের কোনো সংকর দেখা যায় না।

তৎকালীন মানবচিন্তায় মাছ ছিল কেবল একটি শিকারযোগ্য জলজ খাদ্য, শক্তির কোনো প্রতীক নয়। পশুরাজ সিংহ, ক্ষিপ্র হরিণ বা আকাশের ডানাঅলা ঈগলের তেজ তাদের যতটা বিস্মিত ও ভীত করত, মাছ তা করত না। জলে মানুষ যেমন প্রবেশ করতে পারত না, তেমনি জলের ভেতরের গভীরতা ছিল কেবল এক দুর্ভেদ্য অন্ধকার। ফলে মাছের লেজ বা দেহ নিয়ে মানবাকৃতির কোনো রক্ষাকবচ বা দানবের কল্পনা মানুষের চিন্তায় আসতে বহু শতক সময় লেগেছিল।

২. মেসোপটেমিয়ার নদীউপত্যকা: সভ্যতার প্রথম ‘মৎস্যমানব’ ও ‘মৎস্যনারী’

জলের সাথে মানুষের আত্মিক ও দৈব সম্পর্ক প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে রূপ পায় সুমেরীয় ও মেসোপটেমীয় সভ্যতায়। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর উর্বর পলিকে কেন্দ্র করে যখন শহর গড়ে উঠল, তখন ভূগর্ভস্থ মিঠাপানি বা ‘অ্যাপসু’ হয়ে উঠল জীবন ও উর্বরতার পরম উৎস। সুমেরীয় জ্ঞান ও পানির দেবতা ‘এয়া’ (পরবর্তীতে ব্যাবিলনীয় এনকি) বাস করতেন এই পাতালজলে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩,৫০০ থেকে সপ্তম শতকের মধ্যকার বিভিন্ন নলাকার সিলমোহরে (Cylinder Seals) প্রথম মাছের লেজযুক্ত মানব অবয়বের সন্ধান মেলে। ব্যাবিলনীয় ও নব্য-অ্যাসিরীয় শিল্পে দেখা যায় ‘কুলুল্লু’—যার অর্থ মৎস্য-পুরুষ। কুলুল্লুর শরীরের উপরিভাগ ছিল বলিষ্ঠ ও দাড়িগোঁফযুক্ত পুরুষের মতো এবং নিম্নাংশ ছিল আঁশযুক্ত মাছের লেজ। মেসোপটেমীয় সৃষ্টিপুরাণ ‘এনুমা এলিশ’ মহাকাব্যে এই কুলুল্লুকে আদিম নোনা জলের দেবী ও বিশৃঙ্খলার প্রতীক তিয়ামাতের পক্ষে যুদ্ধরত এক পরাক্রমশালী দানব হিসেবে পাওয়া যায়।

একই সাথে দেখা মেলে ‘কুল্লিতু’ নামের এক সত্তার—যা মূলত সংরক্ষিত ইতিহাসের প্রাচীনতম ‘মৎস্যনারী’ রূপ। তবে ব্যাবিলনীয় শিল্পে পুরুষ কুলুল্লুর আধিক্য যতটা ছিল, কুল্লিতু ছিল অত্যন্ত বিরল। প্রাচীন এক সিলমোহরের ছাপে একটি জীবনবৃক্ষ বা খেজুরগাছের দুই পাশে কুলুল্লু ও কুল্লিতুর সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ‘অ্যাপক্যালু’ বা পুরোহিতকে।

অ্যাপক্যালুরা ছিলেন জলের গভীর থেকে উঠে আসা সাতজন মহাজ্ঞানী। এরিদু শহর থেকে উঠে আসা এই জ্ঞানীদের প্রধান ছিলেন ‘আদাপা’ (গ্রিক ঐতিহাসিক বেরোসাসের বর্ণনায় যাঁর নাম ‘ওআন্নেস’)। বেরোসাস লিখেছেন, ওআন্নেস সমুদ্র থেকে উঠে এসে বর্বর আদিম মানুষদের চাষাবাদ, বর্ণমালা, আইন, নগরনির্মাণ ও বিজ্ঞানের জ্ঞান শিক্ষা দিতেন। তিনি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না; তিনি পরতেন মাছের রূপের এক আবরণ বা পোশাক, যা দিনশেষে আবার সাগরের গভীরে মিলিয়ে যেত। অর্থাৎ মেসোপটেমিয়ায় মাছের রূপধারী চরিত্রগুলো কোনো মায়াবিনী বা বিপজ্জনক ছলনাময়ী নারী ছিল না; তারা ছিল সমাজ সংস্কারক, জ্ঞানদাতা ও অশুভ শক্তি তাড়ানোর রক্ষাকর্তা।

৩. দেবী আতরগাতিস: লজ্জা, রূপান্তর ও নারীর দেবত্ব

মৎস্যকন্যার রূপরেখায় প্রথম স্পষ্ট নারীদেবী হিসেবে যিনি ইতিহাসে আবির্ভূত হন, তিনি আরামীয়দের প্রধান দেবী—‘আতরগাতিস’ (গ্রিকদের কাছে ‘দেরকেতো’ এবং রোমানদের কাছে ‘দেয়া সিরিয়া’)। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে প্রাচীন সিরিয়ার হিয়েরাপোলিস বামবিস ছিল তাঁর আরাধনার কেন্দ্র।

ঐতিহাসিক ডিওডোরাস সিকুলাস এবং রোমান পণ্ডিত হাইজিনাসের বর্ণনায় আতরগাতিসের যে পৌরাণিক উপাখ্যান পাওয়া যায়, তা যেন আধুনিক ট্র্যাজিক রূপকথারই আদি রূপ। প্রেমদেবী আফ্রোদিতির ক্রোধে আতরগাতিস এক মরণশীল যুবকের প্রেমে পড়েন এবং এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু সামাজিক লজ্জা ও আত্মগ্লানিতে তিনি সেই শিশুকে পরিত্যাগ করে নিজেকে একটি হ্রদের জলে নিক্ষেপ করেন।

জলদেবতারা এই রূপসী দেবীর অলৌকিক সৌন্দর্য নষ্ট হতে দেননি। কিন্তু তিনি নিজেকে জলে ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বলে প্রকৃতির নিয়মে তাঁর নিম্নাংশ রূপান্তরিত হলো মাছের লেজে, আর নাভির ওপরের অংশটি রয়ে গেল এক অনিন্দ্যসুন্দরী মানবীরূপে। আতরগাতিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উপাখ্যানটিই মানব ইতিহাসে প্রথম কোনো নারীর অপরাধবোধ ও প্রেম থেকে মাছের শরীরে রূপান্তরিত হওয়ার স্পষ্ট দলিল। প্রাচীন হিয়েরাপোলিসে তাঁর মন্দিরে পবিত্র পুকুর থাকত, যেখানে তাঁর ভক্তরা পবিত্র মাছের পরিচর্যা করতেন এবং সাধারণ মানুষের জন্য মাছ স্পর্শ করা ছিল নিষিদ্ধ। আতরগাতিসের মধ্য দিয়ে জল, উর্বরতা, মাতৃত্ব এবং মাছের রূপ একসাথে গাঁথা হয়ে গেল।

৪. গ্রিক পুরাণের প্রভাব: জলপরী থেকে ডানাঅলা ‘সাইরেন’

গ্রিকরা পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় সংস্কৃতি থেকে বহু বিশ্বাস নিজেদের পুরাণে একীভূত করেছিল (যাকে বলা হয় Interpretatio graeca)। গ্রিক পুরাণে জলের অসংখ্য চরিত্র ছিল:

  • ওশিয়ানিড ও নেরেইড: সমুদ্রদেবতা ওশিয়ানোস এবং নেরেউসের কন্যারা। নেরেইডরা ছিলেন এজিয়ান সাগরের বাসিন্দা, যাঁরা নাবিকদের ঝড়ে রক্ষা করতেন। তবে প্রাচীন গ্রিক মৃৎশিল্পে তাঁদের পুরোপুরি নিখুঁত নারীর শরীরেই আঁকা হতো।

  • ইউরিনোমে: ওশিয়ানিডদের একজন, যাঁর কাঠের একটি প্রাচীন মূর্তিতে (আর্কাদিয়ার ফিগালিয়ায়) তাঁকে সোনার শিকলে বাঁধা অবস্থায় কোমর থেকে নিচে মাছের রূপধারী হিসেবে দেখা গিয়েছিল।

  • নাইয়াড: নদী, ঝরনা ও প্রস্রবণের মিষ্টি জলের অপ্সরী।

কিন্তু গ্রিক পুরাণের যে চরিত্রটি মৎস্যকন্যার মনোস্তত্ত্বে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে, তারা কোনো মাছ ছিল না—তারা ছিল ‘সাইরেন’।

হোমারের সুবিখ্যাত মহাকাব্য ‘ওডিসি’র দ্বাদশ খণ্ডে সাইরেনদের উপস্থিতি রয়েছে। ট্রয় যুদ্ধ জয় করে ফেরার পথে ওডিসিউসকে সতর্ক করা হয়েছিল সাইরেনদের মায়াবী দ্বীপ নিয়ে। সাইরেনরা কোনো ডুবন্ত জলকন্যা ছিল না; প্রাচীন গ্রিক চিত্রে তারা ছিল পাখির দেহ ও নখযুক্ত, কিন্তু নারীর মুখ ও বক্ষবিশিষ্ট এক অদ্ভুত সৃষ্টি।

সাইরেনদের মূল অস্ত্র ছিল তাদের মোহিনী কণ্ঠস্বর। তাদের সেই স্বর্গীয় গান যে নাবিকের কানে যেত, সে জাহাজের হাল ছেড়ে আত্মবিস্মৃত হয়ে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং পাথরে আছড়ে পড়ে প্রাণ হারাত। ওডিসিউস তাদের গান শুনতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি নিজের সারা শরীরে শক্ত রশি দিয়ে জাহাজের মাস্তুলের সাথে বেঁধে রেখেছিলেন এবং তাঁর নাবিকদের কান বন্ধ করে দিয়েছিলেন গলানো মোম দিয়ে।

এই যে নারীর অমলিন সৌন্দর্য ও মায়াবী কণ্ঠের পেছনে লুকিয়ে থাকা চরম মৃত্যুফাঁদ—এই ধারণাটি প্রাচীন মানুষ সাইরেনদের থেকেই গ্রহণ করেছিল।

৫. ভয়াল দানবী স্কিলা ও মধ্যযুগের মোড়বদল

হোমারের ওডিসিতে সাইরেন ছাড়াও আরেকটি প্রাণঘাতী চরিত্র ছিল ‘স্কিলা’। এক সরু সামুদ্রিক প্রণালিতে একদিকে অবস্থান করত ভয়ংকর জলঘূর্ণি ক্যারিবডিস, আর অন্যদিকে শৈলচূড়ায় ওত পেতে থাকত স্কিলা। হোমার স্কিলাকে বারোটি পা ও ছয়টি দীর্ঘ গ্রীবাবিশিষ্ট ভয়ংকর দানবী হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন, যা এক নিমেষে জাহাজের ছয়জন নাবিককে ছোঁ মেরে তুলে নিত।

কিন্তু প্রাচীন শিল্পকলা ও মুদ্রায়—বিশেষ করে হেলেনীয় ও এট্রুস্কান যুগে—স্কিলাকে আঁকা হতে থাকে এমন এক নারী হিসেবে, যাঁর শরীর থেকে সাপের মতো দুটি দীর্ঘ মাছের লেজ বের হয়ে গেছে এবং কোমরের চারপাশ থেকে হিংস্র কুকুরের মাথা বেরিয়ে আসছে। স্পারলঙ্গার গুহায় রোমান সম্রাট টাইবেরিয়াসের জন্য তৈরি বিশালাকার মার্বেল ভাস্কর্যেও স্কিলার এই মৎস্যরূপ স্পষ্ট। এই দ্বি-পুচ্ছধারী (Two-tailed) রূপটি পরবর্তীতে ইউরোপীয় মধ্যযুগীয় মৎস্যকন্যার শারীরিক কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

পাখির ডানা কীভাবে মাছের লেজ হয়ে উঠল?

মধ্যযুগের শুরুতেই ঘটে সবচেয়ে বড় বিস্ময়কর পরিবর্তনটি। ইউরোপে অষ্টম শতকের দিকে এসে পাখির রূপধারী সাইরেন ধীরে ধীরে মাছের লেজওয়ালা মৎস্যকন্যায় রূপান্তরিত হতে থাকে।

খ্রিষ্টীয় নৈতিক শিক্ষামূলক গ্রন্থ ‘ফিজিওলোগাস’ এবং অষ্টম শতকের অদ্ভুত প্রাণীদের বিশ্বকোষ ‘লিবার মনস্ট্রোরুম’ (Liber Monstrorum)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়: “সাইরেন হলো সমুদ্রের এমন এক জীব, যার ঊর্ধ্বাঙ্গ নারীর মতো হলেও নাভির নিচের অংশ মাছের আঁশ ও লেজে আবৃত।”

চার্চের পাদ্রিরা সাইরেনের এই রূপকে বাইবেলের নানা পাপের রূপক হিসেবে গ্রহণ করলেন। নারীর দীর্ঘ চুল ও হাতে থাকা আয়না হয়ে উঠল ‘অহংকার’ ও ‘কামাসক্তি’র প্রতীক; আর তাদের মায়াবী গান ও নোনা জল হয়ে উঠল জাগতিক পাপের ফাঁদ, যা সৎ মানুষকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করে নরকের অতল গহ্বরে ডুবিয়ে দেয়।

৬. রোমান ভেনাস ও ফরাসি মেলুসিন: প্রলোভন ও বিষাদ

রোমান পুরাণে প্রেমের দেবী ভেনাস (গ্রিক আফ্রোদিতি) সমুদ্রের ফেনা থেকে জাত। ভেনাসের সাথে সমুদ্রের মুক্তা, শাঁখ এবং আয়নার সংযোগ ছিল নিবিড়। মধ্যযুগের চিত্রকলায় মৎস্যকন্যাদের হাতে প্রায়শই একটি চিরুনি এবং একটি আয়না আঁকা থাকত। এটি কেবল রূপচর্চার দৃশ্য ছিল না; তৎকালীন ধর্মনীতি অনুযায়ী এটি ছিল আত্মপ্রেম ও মরণশীল দেহের মোহের এক কড়া সতর্কবার্তা।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ফোকলোরে জন্ম নেয় ‘মেলুসিন’-এর কাহিনি। ফ্রান্স ও জার্মানির জনপ্রিয় উপাখ্যানে মেলুসিন ছিল এমন এক নারী, যে কোনো মানুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এই শর্তে যে, সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে তার স্বামী কখনো তার স্নানকক্ষে উঁকি দিতে পারবে না। কৌতূহলী স্বামী যখন সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, তখন সে দেখে তাঁর সুন্দরী স্ত্রীর নিম্নাংশ এক দানবীয় ড্রাগন বা মাছের লেজে পরিণত হয়েছে। উন্মোচিত হয়ে যাওয়ার বেদনায় মেলুসিন প্রাসাদ ছেড়ে বাতাসে মিলিয়ে যায়। এই লোকগাথাগুলো প্রমাণ করে, রূপকথায় মৎস্যকন্যার উপস্থিতি কেবল নাবিকদের শিকার করার ভয়াল রূপেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মানুষের সংসারে এক চিরন্তন ভিনদেশি সত্তার নিঃসঙ্গতা ও ট্র্যাজেডিও সেখানে স্থান পেয়েছিল।

৭. চিকিৎসাবিজ্ঞানের যোগসূত্র: ‘সাইরেনোমেলিয়া’র বাস্তবতা

কল্পনা আর রূপকথার পাশাপাশি বিজ্ঞানের একটি চরম বাস্তব অধ্যায়ও মৎস্যকন্যার ধারণাকে লোকসমাজে স্থায়ী করতে সাহায্য করেছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি অত্যন্ত বিরল জন্মগত ত্রুটি রয়েছে, যার নাম সাইরেনোমেলিয়া (Sirenomelia), যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা লোকমুখে ‘মারমেইড সিনড্রোম’ বলে থাকেন।

এই রোগে আক্রান্ত হয়ে জন্ম নেওয়া মানবশিশুর দুটি পা আলাদা না হয়ে ভ্রূণাবস্থাতেই পরস্পরের সাথে সম্পূর্ণ জোড়া লেগে থাকে, যা অবিকল দেখতে মাছের পুচ্ছ বা লেজের মতো মনে হয়। প্রাচীন যুগে চিকিৎসা প্রযুক্তির অভাবে মানুষ বিজ্ঞানের এই জটিল ত্রুটিকে কোনো দৈব অভিশাপ কিংবা সাগরের জলপরীর বংশধর বলে বিশ্বাস করত। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন অ্যানাটমি গ্রন্থে এই শিশুদের সংরক্ষণ ও স্কেচ করা ছবি তৎকালীন সাধারণ মানুষের মৎস্যকন্যা বিশ্বাসের পক্ষে এক অলৌকিক ‘প্রমাণ’ হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

৮. অ্যান্ডারসন থেকে ডিজনি: এক ট্র্যাজিক সত্তার আত্মিক সংকট

উনিশ শতকে এসে মৎস্যকন্যার এই হাজার বছরের রক্তক্ষয়ী, ভয়াল ও নৈতিক পাপের রূপ এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় ড্যানিশ রূপকার হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের হাত ধরে। ১৮৩৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর মাস্টারপিস—‘দ্য লিটল মারমেইড’ (The Little Mermaid)।

অ্যান্ডারসনের গল্পে মৎস্যকন্যা কোনো নাবিকখেকো ডাইনি নয়, বরং সে এক পরম আত্মত্যাগী নিষ্পাপ আত্মা। সে এক রক্তমাংসের যুবরাজকে ভালোবেসে সমুদ্রের তলদেশের অমর জীবন ও নিজের কণ্ঠস্বর বিসর্জন দেয় কেবল একটি মরণশীল মানব আত্মা এবং মানুষের মতো হাঁটার দুটি পায়ের লোভে। ডাইনির বিষাক্ত ওষুধ খেয়ে সে যখন মাটিতে পা ফেলে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ধারালো ছুরির ওপর দিয়ে রক্ত ঝরিয়ে হাঁটার মতো যন্ত্রণাদায়ক।

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, যুবরাজ তাকে কখনোই ভালোবাসেনি; সে বিয়ে করে অন্য এক রাজকন্যাকে। শর্ত ছিল, যুবরাজ ভালো না বাসলে মৎস্যকন্যা সাগরের ফেনায় মিলিয়ে যাবে। রাজপুত্রকে হত্যা করে নিজের লেজ ও জীবন ফিরে পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে ভালোবেসে যুবরাজকে বাঁচিয়ে রেখে নিজে সাগরের ফেনায় বিলীন হয়ে যায়।

অ্যান্ডারসন মৎস্যকন্যাকে দানবের আসন থেকে নামিয়ে এনেছিলেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও এক অসমাপ্ত প্রেমের চিরন্তন ট্র্যাজেডিতে।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে (১৯৮৯ সালে) ডিজনি তাদের অ্যানিমেশনের মাধ্যমে অ্যান্ডারসনের এই করুণতম বিয়োগান্তক সমাপ্তিকে মুছে দিয়ে তৈরি করে এক রঙিন রোমান্টিক রূপকথা—যেখানে এরিয়েল নামের রাজকন্যা তার যুবরাজ এরিককে ফিরে পায় এবং মহাসমারোহে মানুষ হয়ে সুখে-শান্তিতে বাঁচতে শুরু করে। বিশ্বজুড়ে শিশুরা আজ যে হাসিখুশি, সুরেলা মৎস্যকন্যাকে চেনে, তা মূলত ডিজনির এই বাণিজ্যিক ও নরম রূপ।

৯. বাঙালি সংস্কৃতিতে আগমন: ‘জলপরী’ থেকে ‘মৎস্যকন্যা’

বাঙালি লোকগাথায় জলের অভাব ছিল না। আমাদের রয়েছে বারো মাসে তেরো নদী, পদ্মাবতীর রূপকথা, বেহুলা-লখিন্দরের ভেলা কিংবা সাগরের জলপরী ও জলকন্যাদের কাহিনি। কিন্তু আমাদের দেশি রূপকথার জলপরীরা ছিল রক্তমাংসের সাধারণ নারীর রূপধারী, যারা জলে ডুব দিয়ে বাস করতে পারত এবং জল থেকে ডাঙায় উঠে আসতে পারত মানুষের মতো পায়ে হেঁটেই।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার এবং পরবর্তীতে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর হাত ধরে ইউরোপীয় শিশুসাহিত্য বাংলায় অনূদিত হতে শুরু করে, তখন লেখকেরা এক অদ্ভুত সংকটে পড়লেন। পশ্চিমা এই অর্ধেক নারী আর অর্ধেক মাছের অবয়বকে বাংলায় কী বলা হবে? কেবল ‘জলপরী’ বললে তো তাদের নিচের সেই মাছের আঁশযুক্ত লেজের অনন্য পরিচয় হারিয়ে যায়।

সেই ভাষাগত ও ধারণাগত শূন্যস্থান থেকেই বাংলা সাহিত্যে তৈরি হলো এক অপূর্ব নতুন শব্দ—‘মৎস্যকন্যা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় ও সমকালীন অনুবাদে এই শব্দটি এমনভাবে জড়িয়ে গেল যে, আজ বাঙালি পাঠকের মনে মৎস্যকন্যা বললে আর বিজাতীয় কোনো সত্তা মনে হয় না; মনে হয় সে যেন আমাদের বঙ্গোপসাগরেরই কোনো অতল রহস্য।

রূপান্তরের হাজার বছর: আদি রূপ বনাম আধুনিক রূপের তুলনা

বৈশিষ্ট্যআদি পৌরাণিক রূপ (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ – ৮ম শতক)মধ্যযুগীয় রূপ (৮ম – ১৮শ শতক)আধুনিক রূপ (১৯শ শতক – বর্তমান)
শারীরিক অবয়বমৎস্যপোশাকধারী পুরুষ (ওআন্নেস), মাছের লেজযুক্ত পুরুষ (কুলুল্লু), কিংবা ডানাঅলা পাখি (সাইরেন)।কোমরের ওপর নারী, নিচে একটি বা দুটি মাছের লেজ (স্কিলা/মেলুসিন)।অত্যন্ত সুন্দরী তরুণী, কোমর থেকে নিচে চকচকে রুপালি আঁশের একটি একক মাছের লেজ।
প্রতীকী অর্থজ্ঞান, কৃষি, উর্বরতা ও অশুভ তাড়ানোর রক্ষাকবচ।প্রলোভন, পাপ, অহংকার, কামাসক্তি ও নিশ্চিত ধ্বংসের রূপক।প্রেম, কৌতূহল, আত্মত্যাগ, স্বাধীনতা ও অবুঝ রোমান্টিকতা।
কণ্ঠস্বরের ভূমিকাজ্ঞানগর্ভ উপদেশ ও মন্ত্রোচ্চারণ।নাবিকদের বিভ্রান্ত করে জাহাজের ধ্বংস ডেকে আনা প্রাণঘাতী মায়াজাল।রাজপুত্রকে মোহিত করার সুরেলা গান ও আত্মপ্রকাশের ভাষা।

সমাপ্তি: আমাদের মনের অতল সমুদ্র

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যদি আমরা মৎস্যকন্যার দিকে তাকাই, তবে দেখব এই চরিত্রটি আসলে মানুষের চিরন্তন দ্বিধাদ্বন্দ্বেরই এক প্রতিচ্ছবি। মানুষ যেমন পুরোপুরি বন্য পশু নয়, আবার পুরোপুরি ঈশ্বরও নয়—সে ঠিক মাঝখানের এক সত্তা; মৎস্যকন্যাও ঠিক তেমনই ডাঙা আর জলের মধ্যবর্তী এক অদ্ভুত মিলনবিন্দু। সে ডাঙার মানুষকে ভালোবাসে, অথচ ডাঙায় তার আশ্রয় নেই; সে সাগরের গভীর থেকে উঠে আসে, অথচ সাগরের অন্ধকারের চেয়ে ডাঙার আলো তাকে বেশি টানে।

মেসোপটেমিয়ার মাটির সিলমোহর থেকে শুরু করে হোমারের গ্রিস, রোমের মন্দির, মধ্যযুগের চার্চের পাণ্ডুলিপি, অ্যান্ডারসনের বিষাদমাখা ডেনমার্ক হয়ে আজকের ডিজিটাল স্ক্রিন—মৎস্যকন্যা বারবার নিজের খোলস বদলেছে। সভ্যতা যত এগিয়েছে, মানুষ তার নিজের অবচেতন ভয়, কামনা ও ভালোবাসাকে জলের এই কাল্পনিক রূপটির ওপর নতুন রঙে এঁকেছে।

বিজ্ঞানের স্যাটেলাইট ও সাবমেরিন হয়তো আজ সাগরের প্রতিটি ইঞ্চি মেপে ফেলেছে, রূপকথার সেই মাছের লেজওয়ালা জলকন্যাকে হয়তো বাস্তবের কোনো প্রবালপ্রাচীরে খুঁজে পাওয়া যাবে না; কিন্তু মানব মনের গভীর সমুদ্রের তলদেশে মৎস্যকন্যা চিরকালই বেঁচে থাকবে—এক অতৃপ্ত ভালোবাসা, মায়াবী গান আর অসীম কৌতূহলের অমর রূপ হয়ে।