বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং জনজীবন বর্তমানে এক নজিরবিহীন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। গত ছয় মাস ধরে চলা এই তীব্র সংকট কেবল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, বরং তা দেশের সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন, রফতানি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও হতাশাজনক। অর্থনৈতিক সূচকগুলোর লাগাতার নিম্নমুখী প্রবণতা, বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয়ের দৃশ্যমান অভাব দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। আমাদের এই লেখার মূল উদ্দেশ্য কোনো চূড়ান্ত রায় বা সিদ্ধান্ত প্রদান করা নয়; বরং বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরে এর সমাধানে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, তা বিশ্লেষণ করা।
- ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ছয় মাসে কেবল সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে অন্তত ৯৫টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
- এই কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে অন্তত ৬২ হাজার শ্রমিক তাদের কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন।
- সংকট সমাধানে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও সক্ষমতা এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করে সিপিডি।
- দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই (৬২ শতাংশ) নিম্নমুখী বা সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।
- চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ ভাগ বা অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে বলে গভীর শঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
- সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানিয়েছেন যে, মূল্যস্ফীতির সরকারি তথ্যের সাথে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতার কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না এবং পে-স্কেল ব্যবস্থাপনায় সরকার দক্ষতা দেখাতে পারেনি।
- সামনের দিনগুলোতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ অর্থনীতিকে আরও বেশি দুশ্চিন্তায় ফেলবে।
- শিল্পে যে ব্যাপক স্থবিরতা চলছে, তাতে অনানুষ্ঠানিক খাত বা অন্যান্য খাতে এক কোটি শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
- তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাংলাদেশের শিল্প খাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২,৩৮৭ কোটি টাকা পর্যন্ত বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।
- দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২,৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট।
- অর্থাৎ, প্রতিদিন গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১,৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট চাহিদার প্রায় ৩৬ শতাংশ।
- গ্যাসের অপর্যাপ্ত চাপের কারণে দেশের পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল, কাঁচ ও সার কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
- শুধু বর্তমান কারখানাই নয়, নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় প্রায় ১,৮৫৭টি বিনিয়োগ আবেদন আটকে আছে, যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল।
- বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কারখানাগুলোতে ব্যয়বহুল ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
- দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ পেট্রোলিয়াম জ্বালানির চাহিদা মেটানো হয় বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে।
- মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি পরিবহন ও বিমা ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- বিগত এক দশকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট থেকে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে ১৬৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।
- নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে চরম ধীরগতি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা ও আমদানি করা জ্বালানি তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাজুক করে তুলেছে।
- সাম্প্রতিক সময়ে মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং এলএনজি সরবরাহের ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র ও দৃশ্যমান করেছে।
- সরকার তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) বকেয়া পাওনা বাবদ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
- বিদ্যমান লোডশেডিং পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পিডিবিকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে এই কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে।
- বিদ্যুৎ খাতে দেশীয় গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সেই সাশ্রয়কৃত গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহের একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শিল্পের বর্তমান উৎপাদন সংকট অনেকাংশে লাঘব করবে।
- বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানিয়েছেন যে, বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বসে থাকা ৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা কাজে লাগানো হলে তা একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস) সমান সুবিধা দিতে সক্ষম।
- বিশ্ববাজারে এলএনজির অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমানে এলএনজির তুলনায় ফার্নেস তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সরকারের জন্য অধিকতর সাশ্রয়ী বলে বিবেচিত হচ্ছে।
- দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারকরণ: আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দেশের স্থলভাগ এবং সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম অত্যন্ত দ্রুত ও জোরালো করতে হবে। বাপেক্সকে শক্তিশালী করে পরিকল্পিত ১৫০টি গ্যাস কূপ খননের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে, যেখানে এ পর্যন্ত মাত্র ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে।
- বহুমাত্রিক আমদানি উৎস ও অবকাঠামো উন্নয়ন: এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে একক কোনো চুক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক উৎস নিশ্চিত করতে হবে এবং মজুত ও টার্মিনাল অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে।
- শিল্প খাতে অগ্রাধিকার: দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে রফতানিমুখী উৎপাদন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় থাকে।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসার: সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে কেবল নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহৎ পরিসরে বাস্তব প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনবে।
- সিস্টেম লস হ্রাস ও সঠিক ব্যবস্থাপনা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সিস্টেম লস কমিয়ে আনা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে উৎপাদন ও সরবরাহের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বা লোডশেডিং শিডিউল নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিল্প খাত পূর্বপ্রস্তুতি নিতে পারে।
- কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা: বৈশ্বিক অস্থিরতা বা ভূরাজনৈতিক প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ সংকট দেখা দিলে দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে বিপর্যস্ত না হয়, সেজন্য অন্তত কয়েক দিনের চাহিদা মেটানোর মতো কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তুলতে হবে।
- দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা: সর্বোপরি, সাময়িক সংকটের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনার বদলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্বল্পমেয়াদি ভাড়াইভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অযৌক্তিক ব্যয় হ্রাস করে সাশ্রয়ী ও দেশীয় সম্পদের ওপর ভিত্তি করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।