বিশ্ব রাজনীতির ভরকেন্দ্র এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল। পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশ বাংলাদেশ, পরিণত হয়েছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত ক্রীড়নকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বাংলাদেশের সামনে যে আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়েছে, তা একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে আসছে বিনিয়োগের দারুণ সব প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া কিছু চুক্তির বেড়াজালে দেশের সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন এবং তার আগ্রাসী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্যনীতির ডামাডোলে বাংলাদেশ ঠিক কোন পথে হাঁটবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে যে বার্তা পাঠিয়েছেন, তা নিছকই কোনো আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছাবার্তা নয়। সেই বার্তার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে মার্কিন সামরিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের এক প্রচ্ছন্ন তাগিদ। বিশেষ করে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নেওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের দিকেই যে ওয়াশিংটনের নজর, তা ওই বার্তায় স্পষ্ট। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নেওয়ার মাত্র তিন দিন আগে এমন কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত ও চুক্তি চূড়ান্ত করে গেছে, যা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ করে তুলতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে উচ্চমূল্যে বোয়িং বিমান কেনা এবং সমরাস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ‘এল৩ হ্যারিস’ (L3 Harris) নামক একটি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। চমকপ্রদ বিষয় হলো, এসব চুক্তি জনগণের সামনে ‘প্রযুক্তি হস্তান্তর’ বা ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’-এর মোড়কে উপস্থাপন করা হলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামরিক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের কোনো প্রথম সারির সমরাস্ত্র কোম্পানি কখনোই কোনো উন্নয়নশীল দেশের কাছে তাদের মূল নকশা বা কোর টেকনোলজি হস্তান্তর করে না। এল৩ হ্যারিস-এর প্রস্তাবিত মডেলেও মূলত ‘অ্যাসেম্বলিং’ বা যন্ত্রাংশ সংযোজনের কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো, যন্ত্রাংশগুলো উচ্চমূল্যে আমেরিকা থেকেই আমদানি করা হবে এবং বাংলাদেশে শুধু সেগুলো জোড়া লাগানো হবে। এতে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে কোনো প্রকৃত জ্ঞান বা সক্ষমতা তৈরি হবে না। উল্টো আমদানির আড়ালে দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার এক বিশাল অংশ বিদেশে পাচার হওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বৈধ চ্যানেল তৈরি হবে।
এই ধরনের চুক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়'। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এ ধরনের একপেশে সামরিক নির্ভরতা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত মিত্রদের, বিশেষ করে চীনের সাথে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটাতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশের যোগানদাতা চীন। বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময় সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব খর্ব করার মার্কিন যে বৃহত্তর নীলনকশা, এই প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো তারই একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের কাঁধে এখন এক বিশাল দায়িত্ব—দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে এ ধরনের অসম চুক্তিগুলো কার্যকর হতে দেওয়া হবে, নাকি জাতীয় স্বার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এগুলো থেকে সসম্মানে বেরিয়ে আসার আইনি ও কূটনৈতিক পথ খোঁজা হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী ও আধিপত্যবাদী চরিত্র কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এমন নয়। বিশ্বজুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি বা ট্যারিফ ওয়ার তার এই চরিত্রের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খেয়ালখুশিমতো শুল্ক আরোপ করছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এবার শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তিনি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নৈতিক অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন—আর তা হলো ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বা ফোরসড লেবার। ট্রাম্পের দাবি, যেসব দেশ পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে, তাদের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কড়া শুল্ক বসাবে। আপাতদৃষ্টিতে এই কথাটি মানবাধিকারের পক্ষে মনে হলেও, এর পেছনের ভণ্ডামি বুঝতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।
বিশ্বের যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি জোরপূর্বক শ্রম বা কারাবন্দীদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানো হয়, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মধ্যে অন্যতম। আমেরিকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীতে একটি মারাত্মক ফাঁকফোকর রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হলেও দণ্ডিত অপরাধীদের ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে দাসত্ব বা বাধ্যতামূলক শ্রম প্রদান বৈধ। এই আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে আজও লাখ লাখ বন্দীকে কারখানার প্রোডাকশন লাইনে, কৃষিকাজে বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামমাত্র মূল্যে বা বিনা মূল্যে খাটানো হচ্ছে।
গবেষক মাইকেল পয়কারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে প্রায় ৬ লাখ কারাবন্দী সরাসরি যুক্ত ছিলেন, যা সে দেশের তৎকালীন মোট উৎপাদন শ্রমশক্তির ৪ শতাংশেরও বেশি। আভা ডুভার্নের বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র ‘থার্টিন্থ’ (13th) দেখলে মার্কিন এই আধুনিক দাসপ্রথার ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ আমেরিকায় বসবাস করলেও, পৃথিবীর মোট কারাবন্দীর ২৫ শতাংশই সে দেশের কারাগারে বন্দি। অর্থাৎ, যে দেশ নিজেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্দী শ্রমকে বৈধতা দিয়ে রেখেছে এবং বড় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলোর (যেমন কারগিল, ওয়ালমার্ট বা ফাস্ট ফুড চেইনগুলোর) সাপ্লাই চেইনে এই সস্তা শ্রম ব্যবহার করছে, তারাই আজ ইউরোপ বা কানাডার মতো দেশের ওপর ‘জোরপূর্বক শ্রম’-এর অজুহাতে শুল্ক বাড়াচ্ছে।
এই শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের নীতি অত্যন্ত সিলেক্টিভ বা বৈষম্যমূলক। চীনকে দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক শ্রমের (বিশেষ করে শিনজিয়াং প্রদেশে) জন্য দায়ী করা হলেও, ট্রাম্পের এই নতুন শুল্কের খাঁড়া চীনের ওপর সেভাবে পড়েনি। এর কারণ অত্যন্ত পরিষ্কার—বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ মিনারেলস-এর বাজারে চীনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। চীন পাল্টা আঘাত করলে যুক্তরাষ্ট্রের হাই-টেক শিল্প ধসে পড়তে পারে, এই ভয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বেইজিংয়ের সাথে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছে। অন্যদিকে, কানাডার ওপর ১৯৩০ সালের স্মুট-হাওলি (Smoot-Hawley) আইনের মাধ্যমে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে তিনি শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) বৈষম্যহীনতার নীতিকে তিনি বারবার পদদলিত করছেন।
ট্রাম্পের এই আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা এবং ভীতির রাজত্ব কায়েম করার প্রবণতা গোটা বিশ্বের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্ক আরোপ করে জোর করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যায় না। বাণিজ্য ঘাটতি মূলত নির্ভর করে জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হিসাবের ওপর। ট্রাম্পের বিশাল বাজেট ঘাটতিই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে দুর্বল করছে। কিন্তু নিজের দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা ঢাকতে তিনি অন্য দেশের ওপর করের বোঝা চাপাচ্ছেন। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটটি বাংলাদেশের জন্য গভীরভাবে অনুধাবনের দাবি রাখে। যে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপ বা কানাডার মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সাথে এমন জবরদস্তিমূলক আচরণ করতে পারে, তারা বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের ঘাড় মটকে নিজেদের স্বার্থ আদায় করতে কুণ্ঠাবোধ করবে না, সেটাই স্বাভাবিক।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। কূটনীতিতে শুধু লাঠি দেখালে চলে না, গাজরও ঝোলাতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এই গাজর ঝোলানোর কাজটি সম্প্রতি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে করেছেন ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে এমন কিছু বার্তা দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের বিনিয়োগ খরায় ভোগা অর্থনীতির জন্য সুবাতাস বয়ে আনতে পারে। বিশেষ দূত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের দৃঢ় আস্থা রয়েছে। এই আস্থার প্রমাণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে তাদের নাগরিকদের জন্য জারি করা সতর্কতা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি ইতিবাচকভাবে শিথিল করেছে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি বড় স্বীকৃতি এবং পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সবুজ সংকেত।
বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিষয় উঠে আসে, যা প্রমাণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের সম্পৃক্ততা বহুমাত্রিক করতে চায়। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে অসীম মানবিকতার পরিচয় দিয়ে আসছে, সার্জিও গর তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। উল্লেখ্য, এই বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক ত্রাণের অর্ধেকের বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি সংকটের একটি স্থায়ী ও রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো ভূমিকা রাখা অপরিহার্য। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) সহায়তায় বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের জন্য একটি বিরাট সুখবর, যা ভবিষ্যতে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের প্রবেশাধিকার আরও সহজ করবে।
তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের আগ্রহ এবং 'প্যাক্স সিলিকা' (Pax Silica) ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশকে যুক্ত করার ইঙ্গিত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া এই প্যাক্স সিলিকা মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিরাপদ করার একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট। এটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বাজারে চীনের আধিপত্য রুখে দেওয়ার একটি কৌশল। সার্জিও গর জানিয়েছেন, আইটি খাতে বাংলাদেশের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে এবং বাংলাদেশ এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। একই সাথে, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার নির্মাণে এবং সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করতে মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সার্বিক এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি অত্যন্ত জটিল সমীকরণ আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের জবরদস্তিমূলক বৈশ্বিক অর্থনীতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া অসম সামরিক চুক্তি, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে রয়েছে সার্জিও গর-এর মতো কূটনীতিকদের নিয়ে আসা বিনিয়োগ, আইটি খাতে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখা। আবেগ বা তাৎক্ষণিক লাভের আশায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বোকামি হবে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর বা সমরাস্ত্র আমদানির চুক্তিগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। যদি দেখা যায় এসব চুক্তি আসলেই শুধু 'অ্যাসেম্বলিং'-এর নামে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের ফাঁদ এবং তা চীনের মতো বন্ধু রাষ্ট্রকে ক্ষেপিয়ে তুলছে, তবে চরম সাহসিকতার সাথে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এসব চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করার উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সাথে, ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশকে বিকল্প বাজারের সন্ধান করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেভাবে ট্রাম্পের ভণ্ডামিপূর্ণ নীতির কাছে নতি স্বীকার করে এক প্রকার নীরবতা পালন করছে, বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশের পক্ষে সরাসরি সংঘাত সম্ভব নয়। তবে অত্যন্ত সুকৌশলে মার্কিন বিনিয়োগ (যেমন কৃষি, আইটি ও ফার্মাসিউটিক্যালস) দেশের ভেতরে নিয়ে আসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। 'প্যাক্স সিলিকা'-এর মতো জোটে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে, যেন এটি প্রযুক্তি উন্নয়নের বদলে শুধুই অ্যান্টি-চীন ব্লকে পরিণত না হয়।
পরিশেষে, রাজনীতি ও কূটনীতিতে কেউ কারো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়, স্থায়ী কেবল জাতীয় স্বার্থ। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির সাথে দেনদরবার করার ক্ষেত্রে এই জনসমর্থনই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। বাণিজ্যের নামে কোনো পরাশক্তির কাছে বাংলাদেশ যেন বন্দি না হয় এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সম্ভাবনাগুলো যেন হাতছাড়া না হয়—সেই প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্বই আজ জাতির সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে একটি ভুল চুক্তি যেমন দেশকে দশকের পর দশক পিছিয়ে দিতে পারে, তেমনি একটি দূরদর্শী কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে পৌঁছে দিতে পারে আত্মমর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর অর্থনীতির অনন্য উচ্চতায়।
-ফজলে রেজওয়ান করিম



