Tuesday, August 4, 2026

মার্কিন বিনিয়োগ-আভাসের আড়ালে বাংলাদেশের কঠিন পরীক্ষা

0 comments
ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছক ও ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’

বিশ্ব রাজনীতির ভরকেন্দ্র এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল। পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশ বাংলাদেশ, পরিণত হয়েছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত ক্রীড়নকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বাংলাদেশের সামনে যে আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়েছে, তা একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে আসছে বিনিয়োগের দারুণ সব প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া কিছু চুক্তির বেড়াজালে দেশের সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন এবং তার আগ্রাসী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্যনীতির ডামাডোলে বাংলাদেশ ঠিক কোন পথে হাঁটবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে যে বার্তা পাঠিয়েছেন, তা নিছকই কোনো আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছাবার্তা নয়। সেই বার্তার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে মার্কিন সামরিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের এক প্রচ্ছন্ন তাগিদ। বিশেষ করে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নেওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের দিকেই যে ওয়াশিংটনের নজর, তা ওই বার্তায় স্পষ্ট। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নেওয়ার মাত্র তিন দিন আগে এমন কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত ও চুক্তি চূড়ান্ত করে গেছে, যা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ করে তুলতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে উচ্চমূল্যে বোয়িং বিমান কেনা এবং সমরাস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ‘এল৩ হ্যারিস’ (L3 Harris) নামক একটি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। চমকপ্রদ বিষয় হলো, এসব চুক্তি জনগণের সামনে ‘প্রযুক্তি হস্তান্তর’ বা ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’-এর মোড়কে উপস্থাপন করা হলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামরিক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের কোনো প্রথম সারির সমরাস্ত্র কোম্পানি কখনোই কোনো উন্নয়নশীল দেশের কাছে তাদের মূল নকশা বা কোর টেকনোলজি হস্তান্তর করে না। এল৩ হ্যারিস-এর প্রস্তাবিত মডেলেও মূলত ‘অ্যাসেম্বলিং’ বা যন্ত্রাংশ সংযোজনের কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো, যন্ত্রাংশগুলো উচ্চমূল্যে আমেরিকা থেকেই আমদানি করা হবে এবং বাংলাদেশে শুধু সেগুলো জোড়া লাগানো হবে। এতে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে কোনো প্রকৃত জ্ঞান বা সক্ষমতা তৈরি হবে না। উল্টো আমদানির আড়ালে দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার এক বিশাল অংশ বিদেশে পাচার হওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বৈধ চ্যানেল তৈরি হবে।

এই ধরনের চুক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়'। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এ ধরনের একপেশে সামরিক নির্ভরতা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত মিত্রদের, বিশেষ করে চীনের সাথে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটাতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশের যোগানদাতা চীন। বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময় সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব খর্ব করার মার্কিন যে বৃহত্তর নীলনকশা, এই প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো তারই একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের কাঁধে এখন এক বিশাল দায়িত্ব—দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে এ ধরনের অসম চুক্তিগুলো কার্যকর হতে দেওয়া হবে, নাকি জাতীয় স্বার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এগুলো থেকে সসম্মানে বেরিয়ে আসার আইনি ও কূটনৈতিক পথ খোঁজা হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী ও আধিপত্যবাদী চরিত্র কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এমন নয়। বিশ্বজুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি বা ট্যারিফ ওয়ার তার এই চরিত্রের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খেয়ালখুশিমতো শুল্ক আরোপ করছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এবার শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তিনি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নৈতিক অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন—আর তা হলো ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বা ফোরসড লেবার। ট্রাম্পের দাবি, যেসব দেশ পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে, তাদের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কড়া শুল্ক বসাবে। আপাতদৃষ্টিতে এই কথাটি মানবাধিকারের পক্ষে মনে হলেও, এর পেছনের ভণ্ডামি বুঝতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

বিশ্বের যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি জোরপূর্বক শ্রম বা কারাবন্দীদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানো হয়, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মধ্যে অন্যতম। আমেরিকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীতে একটি মারাত্মক ফাঁকফোকর রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হলেও দণ্ডিত অপরাধীদের ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে দাসত্ব বা বাধ্যতামূলক শ্রম প্রদান বৈধ। এই আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে আজও লাখ লাখ বন্দীকে কারখানার প্রোডাকশন লাইনে, কৃষিকাজে বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামমাত্র মূল্যে বা বিনা মূল্যে খাটানো হচ্ছে।

গবেষক মাইকেল পয়কারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে প্রায় ৬ লাখ কারাবন্দী সরাসরি যুক্ত ছিলেন, যা সে দেশের তৎকালীন মোট উৎপাদন শ্রমশক্তির ৪ শতাংশেরও বেশি। আভা ডুভার্নের বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র ‘থার্টিন্থ’ (13th) দেখলে মার্কিন এই আধুনিক দাসপ্রথার ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ আমেরিকায় বসবাস করলেও, পৃথিবীর মোট কারাবন্দীর ২৫ শতাংশই সে দেশের কারাগারে বন্দি। অর্থাৎ, যে দেশ নিজেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্দী শ্রমকে বৈধতা দিয়ে রেখেছে এবং বড় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলোর (যেমন কারগিল, ওয়ালমার্ট বা ফাস্ট ফুড চেইনগুলোর) সাপ্লাই চেইনে এই সস্তা শ্রম ব্যবহার করছে, তারাই আজ ইউরোপ বা কানাডার মতো দেশের ওপর ‘জোরপূর্বক শ্রম’-এর অজুহাতে শুল্ক বাড়াচ্ছে।

এই শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের নীতি অত্যন্ত সিলেক্টিভ বা বৈষম্যমূলক। চীনকে দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক শ্রমের (বিশেষ করে শিনজিয়াং প্রদেশে) জন্য দায়ী করা হলেও, ট্রাম্পের এই নতুন শুল্কের খাঁড়া চীনের ওপর সেভাবে পড়েনি। এর কারণ অত্যন্ত পরিষ্কার—বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ মিনারেলস-এর বাজারে চীনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। চীন পাল্টা আঘাত করলে যুক্তরাষ্ট্রের হাই-টেক শিল্প ধসে পড়তে পারে, এই ভয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বেইজিংয়ের সাথে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছে। অন্যদিকে, কানাডার ওপর ১৯৩০ সালের স্মুট-হাওলি (Smoot-Hawley) আইনের মাধ্যমে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে তিনি শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) বৈষম্যহীনতার নীতিকে তিনি বারবার পদদলিত করছেন।

ট্রাম্পের এই আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা এবং ভীতির রাজত্ব কায়েম করার প্রবণতা গোটা বিশ্বের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্ক আরোপ করে জোর করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যায় না। বাণিজ্য ঘাটতি মূলত নির্ভর করে জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হিসাবের ওপর। ট্রাম্পের বিশাল বাজেট ঘাটতিই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে দুর্বল করছে। কিন্তু নিজের দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা ঢাকতে তিনি অন্য দেশের ওপর করের বোঝা চাপাচ্ছেন। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটটি বাংলাদেশের জন্য গভীরভাবে অনুধাবনের দাবি রাখে। যে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপ বা কানাডার মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সাথে এমন জবরদস্তিমূলক আচরণ করতে পারে, তারা বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের ঘাড় মটকে নিজেদের স্বার্থ আদায় করতে কুণ্ঠাবোধ করবে না, সেটাই স্বাভাবিক।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। কূটনীতিতে শুধু লাঠি দেখালে চলে না, গাজরও ঝোলাতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এই গাজর ঝোলানোর কাজটি সম্প্রতি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে করেছেন ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে এমন কিছু বার্তা দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের বিনিয়োগ খরায় ভোগা অর্থনীতির জন্য সুবাতাস বয়ে আনতে পারে। বিশেষ দূত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের দৃঢ় আস্থা রয়েছে। এই আস্থার প্রমাণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে তাদের নাগরিকদের জন্য জারি করা সতর্কতা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি ইতিবাচকভাবে শিথিল করেছে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি বড় স্বীকৃতি এবং পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সবুজ সংকেত।

বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিষয় উঠে আসে, যা প্রমাণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের সম্পৃক্ততা বহুমাত্রিক করতে চায়। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে অসীম মানবিকতার পরিচয় দিয়ে আসছে, সার্জিও গর তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। উল্লেখ্য, এই বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক ত্রাণের অর্ধেকের বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি সংকটের একটি স্থায়ী ও রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো ভূমিকা রাখা অপরিহার্য। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) সহায়তায় বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের জন্য একটি বিরাট সুখবর, যা ভবিষ্যতে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের প্রবেশাধিকার আরও সহজ করবে।

তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের আগ্রহ এবং 'প্যাক্স সিলিকা' (Pax Silica) ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশকে যুক্ত করার ইঙ্গিত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া এই প্যাক্স সিলিকা মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিরাপদ করার একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট। এটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বাজারে চীনের আধিপত্য রুখে দেওয়ার একটি কৌশল। সার্জিও গর জানিয়েছেন, আইটি খাতে বাংলাদেশের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে এবং বাংলাদেশ এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। একই সাথে, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার নির্মাণে এবং সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করতে মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সার্বিক এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি অত্যন্ত জটিল সমীকরণ আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের জবরদস্তিমূলক বৈশ্বিক অর্থনীতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া অসম সামরিক চুক্তি, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে রয়েছে সার্জিও গর-এর মতো কূটনীতিকদের নিয়ে আসা বিনিয়োগ, আইটি খাতে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি।

বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখা। আবেগ বা তাৎক্ষণিক লাভের আশায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বোকামি হবে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর বা সমরাস্ত্র আমদানির চুক্তিগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। যদি দেখা যায় এসব চুক্তি আসলেই শুধু 'অ্যাসেম্বলিং'-এর নামে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের ফাঁদ এবং তা চীনের মতো বন্ধু রাষ্ট্রকে ক্ষেপিয়ে তুলছে, তবে চরম সাহসিকতার সাথে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এসব চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

একই সাথে, ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশকে বিকল্প বাজারের সন্ধান করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেভাবে ট্রাম্পের ভণ্ডামিপূর্ণ নীতির কাছে নতি স্বীকার করে এক প্রকার নীরবতা পালন করছে, বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশের পক্ষে সরাসরি সংঘাত সম্ভব নয়। তবে অত্যন্ত সুকৌশলে মার্কিন বিনিয়োগ (যেমন কৃষি, আইটি ও ফার্মাসিউটিক্যালস) দেশের ভেতরে নিয়ে আসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। 'প্যাক্স সিলিকা'-এর মতো জোটে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে, যেন এটি প্রযুক্তি উন্নয়নের বদলে শুধুই অ্যান্টি-চীন ব্লকে পরিণত না হয়।

পরিশেষে, রাজনীতি ও কূটনীতিতে কেউ কারো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়, স্থায়ী কেবল জাতীয় স্বার্থ। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির সাথে দেনদরবার করার ক্ষেত্রে এই জনসমর্থনই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। বাণিজ্যের নামে কোনো পরাশক্তির কাছে বাংলাদেশ যেন বন্দি না হয় এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সম্ভাবনাগুলো যেন হাতছাড়া না হয়—সেই প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্বই আজ জাতির সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে একটি ভুল চুক্তি যেমন দেশকে দশকের পর দশক পিছিয়ে দিতে পারে, তেমনি একটি দূরদর্শী কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে পৌঁছে দিতে পারে আত্মমর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর অর্থনীতির অনন্য উচ্চতায়।


-ফজলে রেজওয়ান করিম

Saturday, August 1, 2026

প্রতি চারজন যুবকের একজন কর্মহীন, দায় কার?

0 comments

 বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা আজ এক গভীর ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াল। পরিসংখ্যানের জটিল সমীকরণ ছেড়ে যদি বাস্তবতার দিকে চোখ রাখা যায়, তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে—বিগত মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে নতুন করে ডিগ্রীধারী ও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখের বেশি। আর যদি বিগত আট বছরের চিত্র হিসাব করা হয়, তবে শিক্ষিত বেকারত্বের এই সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে প্রায় ৯ লাখের ঘরের কাছাকাছি। কোনো একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এত স্বল্প সময়ে শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মহীন হয়ে পড়া কেবল উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং এটি পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য এক বড় ধরনের লাল সতর্কবার্তা।


সম্প্রতি বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) উদ্যোগে রাজধানীর বিনিয়োগ ভবনের মাল্টিপারপাস অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় দেশের বেকারত্ব ও যুবশক্তির এই মর্মান্তিক চিত্রটি খোলামেলাভাবে তুলে ধরা হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অকাট্য সব তথ্য-উপাত্ত হাজির করেন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। জাতীয় পর্যায়ের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারক, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের উপস্থিতিতে দেওয়া তাঁর ওই বক্তব্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে চরম ঝাঁকুনি দিয়েছে।

সংকট কতটা ঘনীভূত: তথ্যের চোখে বাস্তব চিত্র

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার প্রদত্ত বক্তব্য ও সরকারি শ্রমশক্তি জরিপের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা যেকোনো নাগরিকের জন্য চরম দুশ্চিন্তার। ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, বর্তমানে দেশের মোট যুবশক্তির প্রতি চারজন যুবকের একজন সম্পূর্ণ বেকার। অর্থাৎ যে বয়সে একজন তরুণের কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখার কথা, সেই বয়সে প্রতি চারজনের একজন সমাজ ও পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

আরও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায় ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে। দেশের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক অংশের প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ-তরুণীই বর্তমানে 'নিট' (NEET—Not in Education, Employment, or Training) অর্থাৎ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা যেকোনো ধরনের পেশাগত প্রশিক্ষণের সম্পূর্ণ বাইরে অবস্থান করছেন। কর্মহীনতার এই বিশাল পরিসংখ্যানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য আরও বেশি প্রকট। যুবতী ও নারীদের ক্ষেত্রে শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের বাইরে থাকার এই হতাশাজনক হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশে, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা তুলনামূলক কম হলেও মোট জনসংখ্যার সার্বিক বিচারে তা আশঙ্কাজনক।

বাংলাদেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার নিরিখে যদি বেকারত্বের সাধারণ পরিসংখ্যান দেখা হয়, তবে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার সর্বনিম্ন—মাত্র সোয়া এক শতাংশের মতো। কিন্তু চরম বৈপরীত্য দেখা যায় উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে। স্নাতকোত্তর বা ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। সোজা কথায়, এ দেশের প্রতি তিনজন নিবন্ধিত বেকারের একজন সরাসরি গ্র্যাজুয়েট। ডিগ্রি যতো বাড়ছে, কাজের সুযোগ যেন ততোই সংকুচিত হয়ে আসছে।

বেকারত্বের পেছনে মূল কারণ ও ব্যর্থতার দায়

প্রশ্ন উঠেছে, একটি স্বাধীন ও উন্নয়নকামী রাষ্ট্রে স্বাধীনতার দীর্ঘ চার দশক পরও কেন যুব সমাজকে কাজের অভাবে বেকার থাকতে হচ্ছে? এই অভূতপূর্ব ব্যর্থতার পেছনে প্রধানত কাঠামোগত ত্রুটি ও নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত কাজ করেছে।

১. শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতা (Education-Employment Divorce): বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার সনদ নিয়ে বের হন। যার একটি বড় অংশ আসেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলো থেকে। কিন্তু এই শিক্ষাব্যবস্থা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাজারমুখী হতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দেশের চাকরির বাজার সর্বোচ্চ ৩ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে জায়গা দিতে পারলেও অবশিষ্ট ৪ লাখ তরুণ প্রতি বছর উদ্বৃত্ত বা বেকার হিসেবে যোগ হচ্ছেন।

২. নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ সংস্কৃতি: তরুণদের চাকরির অনুসন্ধানে প্রায় ৩৬ শতাংশই নির্ভরশীল হতে হয় স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়স্বজন বা অনানুষ্ঠানিক উপায়ের ওপর। প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার অভাব মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন বন্ধ করে দিয়েছে।

৩. সরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ: মানুষ মনে করে সরকারি চাকরিই সব। অথচ সরকারি খাত দেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৬ শতাংশ ধারণ করতে পারে। বাকি ৯৪ শতাংশ কর্মসংস্থান আসার কথা বেসরকারি খাত থেকে। কিন্তু বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়া এবং শিল্পকারখানার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।

৪. দীর্ঘসূত্রিতা ও স্কারিং ইফেক্ট: বিসিএস বা অন্যান্য সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হতে দুই থেকে তিন বছর লেগে যাচ্ছে। বছরের পর বছর চাকরির বয়সের আশায় বসে থাকার কারণে যুবসমাজ তাঁদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ও উৎপাদনশীল সময়টুকু হারিয়ে ফেলছেন। একে অর্থনীতির ভাষায় ‘স্কারিং ইফেক্ট’ বলা হয়, যা একজন তরুণের জীবনভর ক্যারিয়ারকে পিছিয়ে দেয়।

বেকারত্বের মারাত্মক সামাজিক খেসারত: বাড়ছে অপরাধ ও অস্থিরতা

একটি রাষ্ট্রে যখন শিক্ষিত ও সামর্থ্যবান কোটি তরুণ কাজ পান না, তখন তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সুরক্ষার ওপর। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মহীনতা, হতাশা ও আর্থিক অনটন তরুণ সমাজকে খুব সহজেই অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং কালচার, মাদক ব্যবসা এবং অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের যে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে বিশাল বেকারের দল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

কাজের অভাব ও বেকারত্বের কারণে সৃষ্ট সামাজিক ক্ষোভ থেকেই পরবর্তীতে সৃষ্টি হয় বড় বড় গণআন্দোলন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কর্মসংস্থান, কোটা সংস্কার এবং সমতার সুযোগ তৈরি করা। রাজপথে তরুণেরা যখন অধিকার ও জীবিকার তাগিদে নেমে আসেন, তখন তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাসনব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও যখন বেকারত্বের মতো মৌলিক ও স্পর্শকাতর সংকট দূর হয় না, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দেয়।

উত্তরণের উপায় ও করণীয়

আজকের তরুণ জনসংখ্যা যাকে 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' বা জনমিতিক লভ্যাংশ বলা হচ্ছে, তা চিরদিন থাকবে না। ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর যথার্থই সতর্ক করেছেন—যদি এই তরুণ শক্তিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর না করা যায়, তবে এই সম্ভাবনাময় লভ্যাংশ অচিরেই ‘ডেমোগ্রাফিক বোম’ বা মারাত্মক সামাজিক বিপর্যয়ে পরিণত হবে।

সংকট উত্তরণে কেবল পরিকল্পনা নয়, কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন:

  • শিক্ষাকে কর্মমুখী করা: সনাতন ডিগ্রী নির্ভর শিক্ষার প্রথা ভেঙে বাধ্যতামূলক কারিগরি, আধুনিক আইটি ও ভোকেশনাল শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে।

  • শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ: শিল্প খাতের কী ধরনের দক্ষ মানবসম্পদ দরকার, সেই অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস পুনর্গঠন করতে হবে।

  • বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সুরক্ষা: ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে হবে।

  • স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা: দুর্নীতি, ঘুষ ও মামা-খালুর রেফারেন্স ছাড়া কেবল মেধার শক্তিতে যেন যুবসমাজ চাকরি পায়, সেই আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।

খাদ্য বা মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের গল্প শোনানো রাষ্ট্র যদি 'বেকার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ' হয়ে ওঠে, তবে তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না। তরুণদের হাতকে বেকার রেখে বা কেবল প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি ছড়িয়ে দেশ সামনে এগোতে পারে না। রাষ্ট্র, সরকার ও নীতি নির্ধারকদের মনে রাখা উচিত—তরুণদের কর্মসংস্থান কোনো অনুদান নয়, এটি তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে তার চড়া মাশুল পুরো জাতিকেই গুনতে হবে।

- ফজলে রেজওয়ান করিম

Monday, July 27, 2026

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর: স্মৃতির রাজনীতি, শিল্পের স্বাধীনতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের খতিয়ান

0 comments

সময়ের আবর্তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত। চব্বিশের জুলাই কেবল একটি মাসের নাম নয়, এটি দেড় দশকের জমাটবদ্ধ ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং কর্তৃত্ববাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এক মহাকাব্যিক বিস্ফোরণের সমার্থক। শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন রচিত হয়েছিল, দুই বছর পর তার অর্জন, ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়াটা কেবল স্বাভাবিকই নয়, বরং একটি জীবন্ত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশের পূর্বশর্ত। এই দুই বছরে রাজপথের রক্ত ও বারুদ রূপান্তরিত হয়েছে সংসদীয় বিতর্কে, স্মৃতিরক্ষার লড়াইয়ে এবং শিল্পের স্বাধীনতায়। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—জুলাই কি সত্যিই তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছে, নাকি ক্ষমতার চিরায়ত গোলকধাঁধায় পথ হারিয়েছে?


যেকোনো সফল গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াইটি হয় স্মৃতির দখল নিয়ে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে গোষ্ঠী বিপ্লবের স্মৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র তাদের দিকেই হেলে পড়ে। জুলাইয়ের শহীদদের নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ বিশ্লেষণ করলে এই নির্মম সত্যটিই উন্মোচিত হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দাবি করছে, জুলাইয়ের আন্দোলনে তাদের চার শতাধিক নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। দলটির মহাসচিব থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতারা প্রতিনিয়ত এই আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, দলটির নিজস্ব কোনো ডিজিটাল বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভে এই শহীদদের পূর্ণাঙ্গ, সুবিন্যস্ত ও সম্মানজনক কোনো তালিকা বা পরিচিতি নেই। বিপরীতে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে জুলাইয়ের শহীদদের নিয়ে নিজস্ব বয়ান তৈরি করছে।


সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছেন, যেকোনো সংগঠন যখন তার আত্মত্যাগীদের জনসমক্ষে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করে, তখন তা দলীয় কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ‘পবিত্র সংহতি’ তৈরি করে। ফরাসি চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো এবং জাক দেরিদার ‘আর্কাইভ’ সংক্রান্ত দর্শন এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ফুকোর মতে, যার হাতে নথির নিয়ন্ত্রণ থাকে, সমাজের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণও দিনশেষে তার হাতেই বর্তায়। দেরিদা দেখিয়েছেন, আর্কাইভ কেবল অতীতকে জমিয়ে রাখার স্থান নয়, এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের কেন্দ্র। জামায়াত-শিবির এই দার্শনিক সত্যটি অত্যন্ত নিপুণভাবে অনুধাবন করেছে। তাদের ওয়েবসাইটে জুলাইয়ের শহীদদের নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ, গ্রাফিক্স এবং ‘প্রেরণার বাতিঘর’ নামক সেগমেন্ট তৈরি করা হয়েছে। এমনকি ছাত্রদলের কর্মী শহীদ ওয়াসিম আকরাম, যিনি চট্টগ্রামের মুরাদপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন, তাঁকেও শিবিরের ওয়েবসাইটে সসম্মানে জায়গা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপি নিজস্ব কর্মীর আত্মত্যাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। মৌখিক দাবির ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করার দিন যে ফুরিয়ে এসেছে, সেটি অনুধাবন করতে না পারার কারণে জুলাইয়ের সামগ্রিক আখ্যান ধীরে ধীরে একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কুক্ষিগত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মানুষের রক্ত আর আত্মত্যাগকে কেবল বক্তৃতার উপাদান না বানিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াটা যেকোনো রাজনৈতিক দলের নৈতিক দায়িত্ব।


স্মৃতির এই টানাপোড়েনের মধ্যেই রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক ও বিভ্রান্তি। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি যখন দাবি করেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে সুনির্দিষ্ট ‘ডিজাইন’ ছিল এবং স্নাইপারের গুলিতে মানুষ মারা গেছে, তখন তা গোটা আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাঁর এই মন্তব্য এমন একটি ইঙ্গিত দেয় যে, সাধারণ ছাত্র-জনতা কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে ব্যবহৃত হয়েছে, যার নেপথ্যে ছিল অন্য কোনো শক্তির ষড়যন্ত্র। এ ধরনের বক্তব্য কেবল শহীদদের আত্মত্যাগের অবমূল্যায়নই নয়, বরং ফ্যাসিবাদী শক্তির পতনকে একটি সাজানো নাটক হিসেবে প্রমাণের অপচেষ্টাকেও উসকে দেয়।


তবে দলের এই ধরনের বিভ্রান্তিকর অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি অত্যন্ত পরিপক্ব রাজনীতিকের মতো জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে চলা বিতর্কের অবসান চেয়েছেন। তাঁর মতে, জুলাই আন্দোলন নতুন রাষ্ট্র গঠনের যে সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তা পারস্পরিক আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই বাস্তবায়ন করতে হবে। দীর্ঘ ষোলো বছরের তোষামোদির সংস্কৃতি যে রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়, সে বিষয়েও তিনি সচেতন। তবে তিনি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা প্রমাণ করে যে রাজপথের আন্দোলন এখন কাঠামোগত সংস্কারের টেবিলে এসে পৌঁছেছে।


রাজনৈতিক এই পালাবদলের পাশাপাশি জুলাইয়ের চেতনাকে ঘিরে শিল্পের স্বাধীনতা, বিশেষ করে রাজনৈতিক কার্টুন নিয়ে সমাজে এক গভীর মেরুকরণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রথিতযশা কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের আঁকা কার্টুনগুলো এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একটি কার্টুনে মোটা পেটে ‘জুলাই’ লেখা অবয়বকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, এটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক দল এনসিপি এবং তার শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলামকে লক্ষ্য করে আঁকা। সমালোচকদের দাবি, জুলাইয়ের মতো পবিত্র ও সর্বজনীন একটি অভ্যুত্থানকে এভাবে ব্যঙ্গ করা শহীদদের প্রতি অবমাননার শামিল।


কিন্তু রাজনৈতিক কার্টুনের অন্তর্নিহিত ব্যাকরণ ও দর্শনের গভীরে প্রবেশ করলে ভিন্ন একটি সত্য উন্মোচিত হয়। সাধারণত কার্টুন আঁকা হয় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিবর্গ বা প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য, যাকে পরিভাষায় ‘পাঞ্চিং আপ’ বলা হয়। ২০২৬ সালের বাস্তবতায় এনসিপি বা এর নেতারা কোনো দুর্বল গোষ্ঠী বা ‘পাঞ্চিং ডাউন’-এর কাতারে পড়েন না। তাঁরা রাষ্ট্রের ক্ষমতার অন্যতম অংশীজন এবং জাতীয় সংসদের সদস্য। কার্টুনটিতে মূলত একটি গভীর রাজনৈতিক স্খলনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে যেমন দীর্ঘকাল ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নিজেদের দুর্নীতির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল, তেমনি চব্বিশের জুলাইকেও কি কেউ রাজনৈতিক অনৈতিকতার বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে? এনসিপি যখন ক্ষমতার সমীকরণে এমন কোনো দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়, যাদের বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তখন স্বভাবতই সেই রাজনৈতিক স্খলন সমালোচনার দাবি রাখে। শহীদদের আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয়, কিন্তু জীবিত অংশীজনরা যদি সেই আত্মত্যাগের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক আখের গোছাতে শুরু করেন, তবে কার্টুনিস্টের তুলি তা ক্ষমা করবে না—এটাই শিল্পের শাশ্বত ধর্ম।


অবশ্য শিল্পের এই ‘অনাক্রম্যতা’ বা ইনডেমনিটি নিয়েও দার্শনিক বিতর্ক রয়েছে। কান্টের নান্দনিক স্বায়ত্তশাসন বা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ মতবাদ দিয়ে রাজনৈতিক স্যাটায়ারকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। মেহেদী হকের আরেকটি কার্টুনে ২০২৪ এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ইরেজার দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠীকে মুছে ফেলার ইঙ্গিত রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, চব্বিশের জুলাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সব মত, পথ, শ্রেণি ও লিঙ্গের মানুষের এক অভূতপূর্ব বহুত্ববাদী আন্দোলন। এই আন্দোলনে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ তরুণরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল। কার্টুনটিতে যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্য বা অন্য গোষ্ঠীর মুছে যাওয়ার আখ্যান তৈরি হয়, সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে ‘প্রতীকী স্থানচ্যুতি’ বা বায়াস-কনফর্মিক ব্যঙ্গচিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ রয়েছে। বিপ্লব-পরবর্তী সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে চিরচেনা বিভ্রান্তি, দোলাচল এবং দ্রুত স্থিতিশীলতায় ফেরার আকুতি, এই বিতর্কিত কার্টুনগুলো তারই প্রতিচ্ছবি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে সুরক্ষার গ্যারান্টি দেয়, তেমনি তার একটি সামাজিক দায়বদ্ধতাও থাকে। তাই জুলাইয়ের কার্টুন নিয়ে চলমান এই বিতর্ক আমাদের সমাজে শিল্পের নীতিশাস্ত্র নিয়ে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের জন্ম দিয়েছে।


এতসব বিতর্ক, স্মৃতি চুরির রাজনীতি এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো: জুলাই কি সত্যিই ব্যর্থ হয়েছে? অধ্যাপক আসিফ নজরুলের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে হতাশাবাদীদের যুক্তির অসারতা প্রমাণিত হয়। যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে গেলে তার প্রারম্ভিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিতে হয়। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনকাল ছিল গুম, খুন, লুটপাট, ডিহিউম্যানাইজেশন এবং চরম ভয়ের রাজত্ব। ‘মায়ের ডাক’-এর অনুষ্ঠানে গুম হওয়া সন্তানের পিতাদের আহাজারি, ভোট নামক প্রহসনে জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং ব্যাংক লুটের মহোৎসব—এগুলো কোনো রূপকথা ছিল না, ছিল বাংলাদেশের প্রতিদিনকার রূঢ় বাস্তবতা।


জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় এবং অমোচনীয় সাফল্য হলো সেই দমবন্ধ করা ভয়ের সংস্কৃতির অবসান। আজ বাংলাদেশে আয়নাঘরের ত্রাস নেই, ভিন্নমতের কারণে রাষ্ট্রীয় গুমের শিকার হওয়ার ভয় নেই। ২০২৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষ দীর্ঘ সময় পর নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে। সংসদ এখন আর একদলীয় স্তাবকতার রঙ্গমঞ্চ নয়, বরং সরকারি ও বিরোধী দলের গঠনমূলক বিতর্কের একটি প্রাণবন্ত কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক পরিসরে গুমবিরোধী কনভেনশনে স্বাক্ষর এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার মিশনের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ মানবাধিকারের প্রশ্নে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল।


অবশ্যই জুলাইয়ের সব প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। পতিত স্বৈরাচার যে বিভাজন, ট্যাগিং এবং মালিকানার রাজনীতি শিখিয়ে গিয়েছিল, তা সমাজ থেকে রাতারাতি বিদায় নেয়নি। শাসনতান্ত্রিক সংস্কার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দমনের মতো বিষয়গুলোতে এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। জুলাই সনদের পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে নতুন করে হয়রানিমূলক মামলার উদয় হওয়া প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে এখনো অনেক পচন অবশিষ্ট রয়েছে। কিন্তু তাই বলে জুলাইয়ের অর্জনকে ব্যর্থ বলার কোনো সুযোগ নেই। ভাষা আন্দোলন বা মহান মুক্তিযুদ্ধও রাতারাতি তাদের সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু সেগুলো জাতির পথরেখা পালটে দিয়েছিল। ঠিক তেমনি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে এমন একটি মাইলফলক স্থাপন করেছে, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।


পরিশেষে বলা যায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আজ বাংলাদেশ এক জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্মৃতির রাজনীতি নিয়ে দলগুলোর প্রতিযোগিতা, শিল্পীর তুলিতে ফুটে ওঠা সমকালীন রাজনীতির ব্যঙ্গ এবং কাঠামোগত সংস্কারের শ্লথগতি—সবকিছু মিলিয়েই এই রূপান্তরের আখ্যান রচিত হচ্ছে। ভুল-ভ্রান্তি, আক্ষেপ এবং অসম্পূর্ণতার পরও জুলাই আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, কোনো স্বৈরাচারই অপরাজেয় নয় এবং জনগণের সম্মিলিত শক্তির কাছে যেকোনো অজেয় দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। এখন সময় এসেছে জুলাইয়ের বহুত্ববাদী চেতনাকে ধারণ করে বিভাজনের রাজনীতির অবসান ঘটানোর এবং একটি সত্যিকারের বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার। তবেই চব্বিশের জুলাই ইতিহাসে কেবল একটি স্ফুলিঙ্গ নয়, বরং একটি চিরস্থায়ী আলোকবর্তিকা হিসেবে বেঁচে থাকবে।

- ফজলে রেজওয়ান করিম

Wednesday, July 22, 2026

মালখানা কী?

0 comments

মালখানা হলো থানা, আদালত, শুল্ক কার্যালয় (কাস্টমস) বা যেকোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি নির্দিষ্ট, সুরক্ষিত কক্ষ বা গুদামঘর, যেখানে কোনো মামলার আইনি প্রক্রিয়া চলাকালে জব্দ করা আলামত, বেআইনি মালামাল, অবৈধ অস্ত্র, উদ্ধারকৃত যানবাহন কিংবা মূল্যবান নথিপত্র নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়।

সহজ কথায়, কোনো অপরাধের তদন্ত বা বিচারের স্বার্থে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেসব মালামাল বা সম্পদ জব্দ করে, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বা আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত সেসব জিনিস যেখানে জমা রাখা হয়, সেটাই হলো মালখানা


মালখানার তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা

আইনবিজ্ঞান এবং ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় (Criminal Justice System) মালখানা (Evidence Room / Property Room) কেবল একটি সাধারণ ভৌত গুদামঘর নয়; এটি মূলত বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রামাণিক শিকল বা ‘চেইন অব কাস্টডি’ (Chain of Custody) বজায় রাখার অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।

সহজ ভাষায়, কোনো অপরাধের তদন্ত থেকে শুরু করে আদালতে চূড়ান্ত বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত মামলাসংক্রান্ত আলামত, বেআইনি মালামাল, আলামত হিসেবে জব্দকৃত যানবাহন বা নথি নিরাপত্তা ও অবিকৃত অবস্থায় রাখার স্থানই হলো মালখানা।

প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ও লেখকদের সংজ্ঞা

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এবং অপরাধবিজ্ঞানীরা (Criminologists) মালখানার গুরুত্ব ও এর প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আলামতের পবিত্রতা রক্ষার বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন:

১. পল এল. কার্ক (Paul L. Kirk - বিশিষ্ট ফোরেনসিক বিজ্ঞানী ও লেখক):

"ফোরেনসিক বিজ্ঞানে আলামতের বস্তুগত মান অপেক্ষা এর হেফাজতের নিরাপত্তা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মালখানা হলো সেই আইনি পরিমণ্ডল যা কোনো আলামতকে জব্দ করার মুহূর্ত থেকে আদালতে উপস্থাপনের দিন পর্যন্ত তার প্রাথমিক অবস্থা ও গুণগত মানকে অপরিবর্তিত রাখার নিশ্চয়তা দেয়।"

২. হেনরি সি. লি (Henry C. Lee - অপরাধবিজ্ঞানী ও 'Physical Evidence in Forensic Science' গ্রন্থের লেখক):

"আলামতের নিরাপদ সংরক্ষণাগার বা মালখানা না থাকলে সেরা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও আদালতে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। কাস্টডি প্রক্রিয়ায় সামান্য ফাঁক বা মালখানার অব্যবস্থাপনা আলামতের আইনি গ্রহণযোগ্যতা (Admissibility) নষ্ট করে দেয়।"

৩. ব্ল্যাকস ল ডিকশনারি (Black's Law Dictionary):

"মালখানা বা প্রপার্টি রুম হলো কোনো বিচারিক এখতিয়ারের অধীনে থাকা এমন এক সুরক্ষিত স্থান, যেখানে আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন বা বাজেয়াপ্তিকরণের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত জব্দকৃত সম্পত্তি সাময়িকভাবে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে রাখা হয়।"

তাত্ত্বিক কাঠামোর মূল স্তম্ভসমূহ

আইনগত ও ফোরেনসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি আদর্শ মালখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান তত্ত্ব কাজ করে:

  • চেইন অব কাস্টডি তত্ত্ব (Chain of Custody Principle):

    আলামতটি কার হাত থেকে উদ্ধার হলো, কে মালখানায় জমা দিল, কতোদিন কার কাছে সংরক্ষিত ছিল এবং আদালতে কখন প্রদর্শিত হলো—তার একটি ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্ন লিখিত বা ডিজিটাল প্রমাণ থাকা বাধ্যতামূলক।

  • দূষণ প্রতিরোধ তত্ত্ব (Contamination Prevention):

    একটি আলামতের জৈব বা রাসায়নিক উপাদান যেন অন্য আলামতের সংমিশ্রণে এসে নষ্ট বা পরিবর্তিত না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করা মালখানার প্রাথমিক দায়িত্ব।

  • রাষ্ট্রীয় জিম্মাদারি তত্ত্ব (Doctrine of Public Custodianship):

    মালখানায় থাকা প্রতিটি বস্তু নাগরিকের বা রাষ্ট্রের সম্পত্তি। আদালত রায় না দেওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র এর সাময়িক ট্রাস্টি বা অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

বাস্তব উদাহরণ ও আলামতের ধরন

মালখানায় মূলত তিন ধরণের আলামত বা সম্পত্তি সংরক্ষণ করা হয়:

১. জৈব ও পচনশীল আলামত (Biological Evidence)

  • উদাহরণ: রক্তমাখা পোশাক, ডিএনএ নমুনা, ভিসেরা বা মাদকদ্রব্য।

  • সংরক্ষণ পদ্ধতি: এসব আলামত সাধারণ মালখানায় রাখলে পচে নষ্ট হয়ে যায়, তাই এর জন্য বিশেষ কোল্ড স্টোরেজ বা কেমিক্যাল ল্যাবভিত্তিক মালখানার প্রয়োজন হয়।

২. সাধারণ ও বস্তুগত আলামত (Physical Evidence)

  • উদাহরণ: হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র (ছুরি, পিস্তল), উদ্ধারকৃত টাকা, জাল নথিপত্র, সোনার গয়না বা মোবাইল ফোন।

  • সংরক্ষণ পদ্ধতি: এগুলো বিশেষ নম্বরযুক্ত ট্যাগ ও সিলগালাযুক্ত প্যাকেটে প্রধান মালখানা কর্মকর্তা (Malkhana Officer)-এর অধীনে রেজিস্টারে ভুক্তি দিয়ে রাখা হয়।

৩. ভারী ও দৃশ্যমান আলামত (Bulk/Vehicle Evidence)

  • উদাহরণ: দুর্ঘটনায় পতিত বা চোরাচালানে ব্যবহৃত ট্রাক, প্রাইভেটকার, মোটরবাইক কিংবা সিএনজি।

  • সংরক্ষণ পদ্ধতি: এগুলো আয়তনে বড় হওয়ায় সাধারণ কক্ষের বদলে মালখানার অধীনস্থ খোলা বা ছাদযুক্ত এলাকা, যাকে ‘ডাম্পিং ইয়ার্ড’ বলা হয়, সেখানে রাখা হয়।