Saturday, October 10, 2026

মাথা ব্যাথার কারণ জেন-জি

0 comments

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির দিকে তাকালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি সাধারণ চিত্র চোখে পড়ে—ক্ষমতার পালাবদল ঘটে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র বদলায় না। শাসকগোষ্ঠী বদলায়, কিন্তু শোষণের হাতিয়ারগুলো রয়ে যায় অবিকল। কিন্তু একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে এশিয়ার রাজনৈতিক ভূগোলে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বিশেষ প্রজন্ম, যাদের আমরা ডাকছি ‘জেনারেশন জি’ বা ‘জেন-জি’ (Gen-Z) নামে।


ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের কাছে এই জেন-জি এখন আক্ষরিক অর্থেই সবচেয়ে বড় ‘মাথা ব্যাথার কারণ’। কেন? কারণ তারা প্রচলিত ছকে বাঁধা রাজনীতি বোঝে না, তারা ভয় পেতে শেখেনি এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাদেরকে সস্তা প্রোপাগান্ডা দিয়ে বোকা বানানো যায় না। এশিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূলত দুই শ্রেণির মানুষের এক অলিখিত যুদ্ধ চলছে। একদল চায় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে বংশপরম্পরায় দেশটাকে লুটেপুটে খেতে আর নিজেদের ইচ্ছামতো শাসন চালাতে। আর অন্য দল—যার নেতৃত্বে রয়েছে এই তরুণ প্রজন্ম—তারা চায় শোষণমুক্ত এমন এক সমাজ, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভারতের সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলেই এই নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট রূপটি ধরা পড়ে।

বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান: ভয়ের দেয়াল ভাঙার গল্প

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান জেন-জিদের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি অহিংস ছাত্র আন্দোলন কীভাবে একটি প্রবল প্রতাপশালী স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটাতে পারে, তা বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো সাধারণ ছাত্ররাই হয়ে উঠেছিলেন জনতার কণ্ঠস্বর।

তারা শুধু রাজপথেই লড়াই করেননি, লড়াই করেছেন সাইবার জগতেও। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে, গুলি চালিয়ে, আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে আন্দোলন দমাতে চেয়েছে, তখন এই তরুণরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাজপথে দাঁড়িয়েছে। এই আন্দোলনে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেন সালমান মুক্তাদির এবং আয়মান সাদিকের মতো জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। সাধারণত যারা নিজেদের নিরাপদ বলয়ে থাকতে পছন্দ করেন, তারাও যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে লাখো তরুণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, তখন এই আন্দোলন আর শুধু ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রূপ নিয়েছিল এক সর্বাত্মক জনযুদ্ধে। তারা প্রমাণ করেছেন, ডিজিটাল দুনিয়ার তারকারাও যখন জনতার কাতারে নেমে আসেন, তখন শাসকের ভিত কেঁপে উঠতে বাধ্য।

হিমালয়ের দেশ নেপালে তারুণ্যের জয়ধ্বনি

বাংলাদেশের চেয়ে নেপালের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন হলেও, সেখানেও তারুণ্যের বিদ্রোহের সুর একই রকম। নেপালের রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে নেপালি কংগ্রেস, ইউএমএল এবং মাওবাদীদের মতো প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে জিম্মি ছিল। কিন্তু এই প্রথাগত দুর্নীতির চক্র ভেঙে সেখানেও জেন-জি এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছে।

নেপালের তরুণ সমাজের এই নীরব বিপ্লবের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছেন কাঠমান্ডুর বর্তমান মেয়র বলেন্দ্র শাহ (যিনি ‘বালেন’ নামেই বেশি পরিচিত)। একজন র‍্যাপার এবং স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার বালেন যখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র পদে দাঁড়ান, তখন অনেকেই তাকে উপহাস করেছিলেন। কিন্তু নেপালের তরুণ প্রজন্ম তাকে শুধু ভোট দিয়েই জয়যুক্ত করেনি, বরং প্রথাগত রাজনীতির গালে এক বিরাট চপেটাঘাত করেছে। বালেনের চোখে থাকা সেই সিগনেচার সানগ্লাস আর তারুণ্যের উদ্দীপ্ত চেতনা নেপালের জেন-জিদের কাছে এক নতুন আশার প্রতীক। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আর পুরোনো নেতাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নয়। তারা চায় কাজ, তারা চায় জবাবদিহিতা।

ভারতের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ‘সিজেপি’

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের চিত্রটাও এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। সেখানেও তারুণ্য একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করছে। সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) নামের একটি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা এই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।

অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা এবং নেহা বোরার মতো তরুণরা যখন এই আন্দোলনের ডাক দেন, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র প্রমাদ গোনে। এই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন জনপ্রিয় ইউটিউবার এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধ্রুব রাঠি। ধ্রুব রাঠি দীর্ঘদিন ধরেই তার তথ্যবহুল ভিডিওর মাধ্যমে ভারতের তরুণ সমাজকে সচেতন করে আসছেন। তিনি যখন সরাসরি এই আন্দোলনে সমর্থন জোগান, তখন সেটি আর একটি ছোট পরিসরের প্রতিবাদ থাকে না, বরং তা কোটি তরুণের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়।

রাষ্ট্র কতটা ভীত, তার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের চিত্রে। দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি-এর কর্মসূচি শুরুর আগেই ১৪৪ ধারা জারি, বিমানবন্দর থেকে অভিজিৎ দীপকে এবং সৌরভ দাসদের আটক করা, কিংবা গুরুগ্রামের ফ্ল্যাট থেকে ধ্রুব রাঠিকে আটক করে হেফাজতে নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই তরুণদের কণ্ঠস্বরকে এস্টাবলিশমেন্ট কতটা ভয় পায়। শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পেরেছে যে, এদেরকে প্রথাগত মিডিয়ার বয়ান দিয়ে বা ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি দিয়ে আর দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

সংঘাতের মূল কারণ: শোষক বনাম শোষিত

এশিয়ায় চলমান এই সংঘাতের গভীরে তাকালে আপনার উল্লেখিত সেই ধ্রুব সত্যটিই ফুটে ওঠে—এখানে মূলত দুটি শ্রেণির লড়াই চলছে।

প্রথম শ্রেণি (ক্ষমতালোভী শাসকগোষ্ঠী): এরা মনে করে রাষ্ট্র তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। এরা বংশপরম্পরায় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়। এরা দেশের অর্থনীতি, বিচারবিভাগ, প্রশাসন এবং গণমাধ্যমকে নিজেদের পকেটে পুরে রাখতে পছন্দ করে। এদের মূল লক্ষ্য হলো দেশের সাধারণ মানুষকে ‘নাগরিক’ হিসেবে নয়, বরং ‘প্রজা’ হিসেবে টিকিয়ে রাখা। এরা চায় মানুষ সবসময় মাথা নিচু করে থাকুক, যাতে তারা নির্বিঘ্নে দেশের সম্পদ লুটেপুটে খেতে পারে।

দ্বিতীয় শ্রেণি (তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি): এরা হলো সেই শ্রেণি যারা এই পচা-গলা সিস্টেমকে আর মেনে নিতে রাজি নয়। এরা গ্লোবালি কানেক্টেড, এরা জানে বিশ্বের অন্য প্রান্তে তাদের বয়সী ছেলেমেয়েরা কেমন জীবনযাপন করছে। এরা দেশের প্রতিটি মানুষের মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার চায়। কেউ শোষণের শিকার হবে না, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে—এটাই তাদের মূল দাবি।

কেন জেন-জি ‘মাথা ব্যাথার কারণ’?

প্রথাগত রাজনীতিকদের জন্য জেন-জি মাথা ব্যাথার কারণ হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লজিক রয়েছে:
১. তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার: জেন-জিকে সেন্সরশিপ দিয়ে আটকে রাখা যায় না। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া যখন বিক্রি হয়ে যায়, তখন এরা টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স (টুইটার) বা ফেসবুকের অল্টারনেটিভ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে।
২. প্রোপাগান্ডা বনাম ফ্যাক্ট-চেকিং: পুরোনো নেতারা মিথ্যা বলে পার পেয়ে যেতেন। কিন্তু জেন-জি যেকোনো তথ্যের সত্যতা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যাচাই (Fact-check) করে ফেলতে পারে। ফলে শাসকগোষ্ঠীর সাজানো বয়ান মুহূর্তেই ধসে পড়ে।
৩. ভয়হীনতা: এদের হারানোর কিছু নেই। এরা দেখেছে তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম কীভাবে আপস করে বেঁচেছে। এরা সেই আপসের পথে হাঁটতে নারাজ।
৪. হিউমার এবং স্যাটায়ার: এরা কাঠখোট্টা রাজনীতির বদলে মিম (Meme), স্যাটায়ার এবং শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদ করে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অনেক দ্রুত পৌঁছায়। ভারতের সিজেপি আন্দোলন বা নেপালের বালেনের র‍্যাপ সং এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

পরিশেষে বলা যায়, এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের দেখা মিলছে। বাংলাদেশ, নেপাল বা ভারত—যেদিকেই তাকাই না কেন, তরুণ প্রজন্ম পরিষ্কার একটি বার্তা দিচ্ছে: "আমাদের দেশ, আমাদের ভবিষ্যৎ, আর সিদ্ধান্তও হবে আমাদের।" যারা বন্দুকের নল বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে এই কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে চাইছে, তারা আসলে ইতিহাসের দেয়াল লিখন পড়তে ব্যর্থ হচ্ছে। জেন-জি শুধু শাসকগোষ্ঠীর মাথা ব্যাথার কারণই নয়, তারা এই ঘুণে ধরা সমাজকাঠামোর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার কারিগর। যতদিন না একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং আত্মমর্যাদাশীল সমাজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন তারুণ্যের এই জয়রথ থামানো কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

Saturday, September 19, 2026

পাঞ্জেগানা মসজিদ মানে কি

0 comments


আমাদের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে বড় বড় নান্দনিক কেন্দ্রীয় মসজিদগুলো যেমন একদিকে ইসলামি স্থাপত্যের গৌরব বহন করে, তেমনি আমাদের ঠিক পাশের গলিতে থাকা শান্ত, নিভৃত 'পাঞ্জেগানা মসজিদ'গুলো বয়ে আনে অন্যরকম এক আত্মিক প্রশান্তি। অনেকেই হয়তো শব্দটির সাথে পরিচিত, আবার অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— পাঞ্জেগানা মসজিদ আসলে কী এবং এর গুরুত্ব কতটুকু?

ফার্সি 'পাঞ্জেগানা' শব্দের সহজ অর্থ হলো— যা পাঁচের সাথে সম্পর্কিত। পরিভাষায়, যে ছোট বা মহল্লার মসজিদগুলোতে শুধুমাত্র দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ (ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব ও এশা) নিয়মিত জামাতে আদায় করা হয়, সেগুলোকে পাঞ্জেগানা মসজিদ বলা হয়। সাধারণ বড় মসজিদের সাথে এর মূল তফাত হলো, এসব মসজিদে সাধারণত জুম্মার নামাজ কিংবা দুই ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয় না।

পাড়া-মহল্লার প্রাণকেন্দ্র
একটি পাঞ্জেগানা মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থানই নয়, এটি স্থানীয় সমাজের বন্ধন দৃঢ় করার এক অনন্য মাধ্যম। বড় বড় কেন্দ্রীয় মসজিদে দূর-দূরান্তের মানুষ আসেন, নামাজ শেষে আবার চলেও যান। কিন্তু পাঞ্জেগানা মসজিদের চিত্রটা ভিন্ন। এখানে প্রতিদিন একই চেনা মুখগুলো বারবার মিলিত হন। প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের খোঁজখবর নেওয়া, সুখ-দুঃখের গল্প ভাগ করে নেওয়ার চমৎকার এক সুযোগ তৈরি হয় এই আঙিনায়।

কেন এই মসজিদগুলোর প্রয়োজনীয়তা এত বেশি?
১. কাছাকাছি অবস্থান: বয়োবৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ মানুষ, যাদের পক্ষে দূরের কোনো বড় বা কেন্দ্রীয় মসজিদে হেঁটে যাওয়া কষ্টকর, তাদের জন্য বাড়ির ঠিক পাশেই পাঞ্জেগানা মসজিদ পরম স্বস্তির জায়গা।
২. কোলাহলমুক্ত পরিবেশ: এই মসজিদগুলো সাধারণত আকারে ছোট এবং ছিমছাম হয়। ফলে এখানে একাকী ইবাদত করা বা কোরআন তিলওয়াত করার জন্য এক অদ্ভুত নীরব ও শান্ত পরিবেশ পাওয়া যায়।
৩. ভ্রাতৃত্ববোধের চর্চা: মহল্লার ছোট বড় সবাই একসাথে এক কাতারে দাঁড়ানোর কারণে সামাজিক বৈষম্য দূর হয় এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়।
আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে যখন মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে, তখন এই ছোট ছোট পাঞ্জেগানা মসজিদগুলো আমাদের সমাজকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। এটি কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়, বরং প্রতিটি মহল্লার আত্মিক প্রশান্তির এক একটি অবারিত আশ্রয়স্থল।

Thursday, September 3, 2026

বিদ্যুৎ বিলের ডিজিটাল মারপ্যাঁচ: আপনার প্রিপেইড মিটার কি সত্যিই বেশি টাকা কাটছে? জানুন পেছনের হিসাব

0 comments

পকেটের টাকা চোখের নিমিষে উধাও হয়ে যাওয়ার অদ্ভুত এক জাদু দেখতে চান? তাহলে ডেস্কো বা ডিপিডিসির প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ করার অভিজ্ঞতাটাই যথেষ্ট! স্মার্ট প্রিপেইড মিটার আমাদের জীবনকে অনেকটাই ঝামেলামুক্ত করেছে ঠিকই, কিন্তু এর ভেতরের হিসাবের মারপ্যাঁচগুলো অনেকের কাছেই এক বিরাট রহস্য। টাকা রিচার্জ করার পর হঠাৎ মনে হয়, অ্যাকাউন্টে যেন জাদুর বলে কিছুটা টাকা কম জমা হলো! এই নিখোঁজ টাকাগুলো আসলে কোথায় যায়? কেনই বা রিচার্জ করার সাথে সাথেই ব্যালেন্স কমে যায়? উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রবেশ করতে হবে বিদ্যুৎ বিলের এই গোলকধাঁধায়।



বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বার্ক (BERC) নির্ধারিত সরকারি ট্যারিফ রেট অনুযায়ী পোস্টপেইড এবং প্রিপেইড—উভয় ধরনের গ্রাহককেই কিন্তু একই হারে বিদ্যুতের দাম পরিশোধ করতে হয়। তাহলে পার্থক্য কোথায়? মূল পার্থক্যটা হলো টাকা কেটে নেওয়ার নিয়ম এবং সময়ের মধ্যে। পোস্টপেইড মিটারের ক্ষেত্রে গ্রাহক আগে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন এবং মাস শেষে বিল পরিশোধ করেন। অন্যদিকে, প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র—ব্যবহারের আগেই সিস্টেম থেকে বাধ্যতামূলক ফিক্সড চার্জ বা নির্ধারিত ফি কেটে রেখে বাকি অংশ ব্যবহারের জন্য এনার্জি ব্যালেন্সে পাঠানো হয়। একটি মাসিক বিদ্যুতের বিল মূলত তিনটি প্রধান উপাদানের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়: মোট বিদ্যুৎ খরচ বা এনার্জি কনজাম্পশন, নির্দিষ্ট ডিমান্ড চার্জ এবং ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স বা ভ্যাট। ইউনিট মূল্য বা স্লাব এবং প্রিপেইড মিটারের মৌলিক নিয়মগুলো পোস্টপেইডের মতোই, তবে কর্তনের সময়টাই হলো আসল খেলা।

আপনি যখনই নতুন ক্যালেন্ডার মাসের প্রথম রিচার্জটি করতে যাবেন, তখনই সিস্টেম অতন্দ্র প্রহরীর মতো আপনার টোকেন থেকে বেশ কিছু বাধ্যতামূলক ফি টেনে নেবে। এই প্রথম রিচার্জের সময় ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া এবং মোট রিচার্জ পরিমাণের ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট তাৎক্ষণিকভাবে কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু এই ডিমান্ড চার্জ আসলে কী? এটি হলো আপনার অনুমোদিত লোড বা স্যাংশনড লোডের বিপরীতে মাসে একবার কাটা হওয়া একটি নির্ধারিত ফি। একটি আদর্শ আবাসিক সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট (kW) লোডের জন্য এই ডিমান্ড চার্জ হলো ৪২ টাকা। ডিপিডিসির हालের একটি নোটিশ অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক যদি কোনো কারণে এক বা একাধিক মাস রিচার্জ করা থেকে বিরত থাকেন, তবে পরবর্তী যখনই তিনি রিচার্জ করবেন, তখন জমে থাকা সমস্ত ডিমান্ড চার্জ একসাথে কাটা হবে।

ডিমান্ড চার্জের পাশাপাশি আরেকটি নিয়মিত ফি হলো মিটার ভাড়া। ডেস্কো বা ডিপিডিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত সিঙ্গেল-ফেজ মিটারের জন্য প্রিপেইড সিস্টেমে প্রতি মাসে ৪০ টাকা করে মিটার ভাড়া কাটা হয়। তবে আপনার মিটারটি যদি খোলা বাজার বা ওপেন মার্কেট থেকে নিজস্ব টাকায় কেনা হয়ে থাকে, তবে এই মিটার ভাড়া সম্পূর্ণ শূন্য বা মওকুফ থাকে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, মাসের দ্বিতীয় বা তার পরবর্তী রিচার্জগুলোর ক্ষেত্রে কী ঘটে? স্বস্তির বিষয় হলো, একই ক্যালেন্ডার মাসের মধ্যে পরবর্তীতে যতবারই রিচার্জ করুন না কেন, আর কোনো অতিরিক্ত বা ফিক্সড চার্জ কাটা হয় না। কেবল ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কাটা হয়, কারণ মাসিক ফিক্সড চার্জগুলো প্রথম রিচার্জের সময়ই পরিশোধ হয়ে গেছে। গ্রাহকরা খুব সহজেই ডেস্কো প্রিপেইড কাস্টমার পোর্টালের মাধ্যমে তাদের অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স এবং এই সমস্ত কাটার হিস্ট্রি সরাসরি যাচাই করতে পারেন।

প্রাথমিক সমস্ত কর্তন সম্পন্ন হওয়ার পর যে অবশিষ্ট টাকা থাকে, তা সরাসরি মিটারে এনার্জি ব্যালেন্স হিসেবে জমা হয়। এরপর যখন আপনি বাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে শুরু করেন, তখন ডিজিটাল মিটারটি খুব নিভৃতে পোস্টপেইড বিলের মতো ঠিক একই প্রোগ্রেসিভ বা ক্রমবর্ধিমান হারে সেই ব্যালেন্স কাটতে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, প্রতি নতুন মাসের প্রথম দিনের ঠিক মধ্যরাতে মিটারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সবচেয়ে সস্তা বা প্রাথমিক রেটে রিসেট হয়ে যায়। গ্রাহকরা প্রথমে সবচেয়ে সাশ্রয়ী স্লাবগুলো পূরণ করেন এবং অতিরিক্ত ইউনিটগুলো পরবর্তী তুলনামূলক ব্যয়বহুল স্লাবে গড়ায়।

এই ট্যারিফ স্লাবগুলোর হিসাব অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। যদি কোনো গ্রাহক পুরো মাসে সর্বমোট ৫০ ইউনিট বা তার কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তবে তিনি পাবেন লাইফলাইন সুবিধার সবচেয়ে কম রেট, যেখানে প্রতি ইউনিটের দাম পড়ে মাত্র ৪.৬৩ টাকা। তবে শর্ত হলো, এই লাইফলাইন রেটটি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন পুরো মাসের ব্যবহার ঠিক ৫০ ইউনিট বা তার নিচে সীমাবদ্ধ থাকবে। এর বাইরে সাধারণ ক্রমবর্ধিমান স্লাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ৫.২৬ টাকা, ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ৮.৫০ টাকা, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ৯.১০ টাকা, এবং ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ৯.৬২ টাকা। ব্যবহার আরও বাড়লে স্লাবের হারও বাড়তে থাকে; যেমন ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের দাম পড়ে ১৫.০১ টাকা এবং ৬০১ ইউনিট বা তার বেশি ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিটের জন্য গুণতে হয় ১৭.৩৫ টাকা করে। এই নিয়মের বাইরেও ছোটখাটো শর্ত রয়েছে, যেমন লাইফলাইন রেটটি কেবল তখনই প্রযোজ্য হয় যখন পুরো মাসের ব্যবহার ৫০ ইউনিট বা তার কম হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা যাক। ধরুন, ১ কিলোওয়াট (kW) লোড এবং একটি ইনস্টলমেন্ট মিটার রয়েছে এমন একজন গ্রাহক মাসের প্রথম দিনে ১,০০০ টাকা রিচার্জ করলেন। সেক্ষেত্রে এনার্জি ক্রেডিট জমা হওয়ার আগেই সিস্টেম স্টেপ-বাই-স্টেপ ডিডাকশন বা কর্তন সম্পন্ন করবে। মোট ১,০০০ টাকা থেকে প্রথমে ৪৭.৬২ টাকা কেটে নেওয়া হবে ভ্যাট বাবদ। এই ভ্যাট গণনার নিয়ম হলো মোট টাকাকে ১.০৫ দিয়ে ভাগ করে ৫ শতাংশ গুণ করা। এর সাথে ১ কিলোওয়াট লোডের জন্য ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৪০ টাকা মিটার ভাড়া তাৎক্ষণিকভাবে কাটা হবে। সব মিলিয়ে এই প্রাথমিক কর্তনগুলোর পর অবশিষ্ট ৮৭০.৩৮ টাকা নিট ব্যালেন্স হিসেবে মিটারে পাঠানো হয়। এখানেই শেষ নয়, প্রিপেইড গ্রাহকদের জন্য একটি দারুণ সরকারি উৎসাহ বা প্রণোদনা রয়েছে—রিচার্জের পর সাধারণত ০.৫ শতাংশ সরকারি rebate বা ছাড় সরাসরি তাদের চূড়ান্ত ব্যালেন্সে যোগ করে দেওয়া হয়।

ব্যালেন্স কীভাবে খরচ হয় তারও একটি চমৎকার হিসাব রয়েছে। ধরা যাক, একজন গ্রাহক পুরো মাসে ঠিক ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করলেন। এই শক্তির ব্যবহারটি প্রথম দুটি নিয়মিত স্লাবের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য খরচ পড়বে ৩৯৪.৫০ টাকা (প্রতি ইউনিট ৫.২৬ টাকা হিসেবে) এবং বাকি ১২৫ ইউনিটের জন্য খরচ পড়বে ১,০৬২.৫০ টাকা (প্রতি ইউনিট ৮.৫০ টাকা হিসেবে)। এই দুইয়ে মিলে মোট এনার্জি চার্জ দাঁড়াবে ১,৪৫৭ টাকা। এর সাথে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ যুক্ত করলে সাবটোটাল হবে ১,৪৯৯ টাকা। পরিশেষে, এর ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট যোগ হবে ৭৪.৯৫ টাকা, যার ফলে ওই ২০০ ইউনিটের জন্য মোট প্রদেয় বিল দাঁড়াবে ১,৫৭৩.৯৫ টাকা। তুলনামূলকভাবে, পোস্টপেইড মিটারের ক্ষেত্রে এই হিসাবগুলোর পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত ছোটখাটো মিটার ভাড়া যোগ হতে দেখা যায়।
Unit Range Rate per Unit
0-50 units (lifeline) Tk 4.63
0-75 units Tk 5.26
76-200 units Tk 8.50
201-300 units Tk 9.10
301-400 units Tk 9.62
401-600 units Tk 15.01
601+ units Tk 17.35

Note: The lifeline rate applies only if the entire month's use is 50 units or less.


বিদ্যুৎ বিলের এই চুলচেরা হিসাব নিয়ে যদি কোনো গ্রাহকের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ, বিভ্রান্তি বা জটিলতা তৈরি হয়, তবে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যেকোনো সময় ডেস্কোর অফিসিয়াল হটলাইন ১৬১২০ অথবা ডিপিডিসির হটলাইন ১৬১১৬ নম্বরে যোগাযোগ করে প্রিপেইড বিল, কর্তন বা মিটার ব্যালেন্স সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের পরিষ্কার ব্যাখ্যা জেনে নেওয়া সম্ভব। প্রিপেইড মিটারের এই আধুনিক ব্যবস্থার খুঁটিনাটি জানা থাকলে পকেট ফাঁকা হওয়ার ভয় কেটে যায় নিমিষেই, আর বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপরও রাখা যায় নিখুঁত ও স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ।

-ফজলে রেজওয়ান করিম

Wednesday, August 26, 2026

জ্বালানি সংকটে টালমাটাল দেশের অর্থনীতি

0 comments

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং জনজীবন বর্তমানে এক নজিরবিহীন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। গত ছয় মাস ধরে চলা এই তীব্র সংকট কেবল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, বরং তা দেশের সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন, রফতানি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও হতাশাজনক। অর্থনৈতিক সূচকগুলোর লাগাতার নিম্নমুখী প্রবণতা, বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয়ের দৃশ্যমান অভাব দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। আমাদের এই লেখার মূল উদ্দেশ্য কোনো চূড়ান্ত রায় বা সিদ্ধান্ত প্রদান করা নয়; বরং বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরে এর সমাধানে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, তা বিশ্লেষণ করা।


শিল্প খাতে স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সংকট ও সামষ্টিক অর্থনীতির দুরবস্থা
বর্তমান জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ও সরাসরি ধাক্কাটি এসে লেগেছে দেশের উৎপাদনশীল ও শিল্প খাতে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সাম্প্রতিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে অর্থনীতির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে:

  • ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ছয় মাসে কেবল সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে অন্তত ৯৫টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

  • এই কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে অন্তত ৬২ হাজার শ্রমিক তাদের কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন।

  • সংকট সমাধানে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও সক্ষমতা এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করে সিপিডি।

  • দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই (৬২ শতাংশ) নিম্নমুখী বা সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।

  • চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ ভাগ বা অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে বলে গভীর শঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।

  • সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানিয়েছেন যে, মূল্যস্ফীতির সরকারি তথ্যের সাথে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতার কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না এবং পে-স্কেল ব্যবস্থাপনায় সরকার দক্ষতা দেখাতে পারেনি।

  • সামনের দিনগুলোতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ অর্থনীতিকে আরও বেশি দুশ্চিন্তায় ফেলবে।

  • শিল্পে যে ব্যাপক স্থবিরতা চলছে, তাতে অনানুষ্ঠানিক খাত বা অন্যান্য খাতে এক কোটি শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর পরিসংখ্যান জ্বালানি সংকটের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে:

  • তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাংলাদেশের শিল্প খাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২,৩৮৭ কোটি টাকা পর্যন্ত বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।

  • দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২,৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট।

  • অর্থাৎ, প্রতিদিন গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১,৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট চাহিদার প্রায় ৩৬ শতাংশ।

  • গ্যাসের অপর্যাপ্ত চাপের কারণে দেশের পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল, কাঁচ ও সার কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

  • শুধু বর্তমান কারখানাই নয়, নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় প্রায় ১,৮৫৭টি বিনিয়োগ আবেদন আটকে আছে, যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল।

  • বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কারখানাগুলোতে ব্যয়বহুল ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

সংকটের অন্তর্নিহিত কারণ, আমদানিনির্ভরতা ও অতীত সরকারের রেখে যাওয়া দায়
বর্তমান এই বহুমুখী সংকটের পেছনে যেমন আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দায়ী, তেমনি দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল, কৌশলগত ব্যর্থতা এবং অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরতাও সমানভাবে কাজ করছে।

  • দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ পেট্রোলিয়াম জ্বালানির চাহিদা মেটানো হয় বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে।

  • মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি পরিবহন ও বিমা ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

  • বিগত এক দশকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট থেকে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে ১৬৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।

  • নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে চরম ধীরগতি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা ও আমদানি করা জ্বালানি তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাজুক করে তুলেছে।

  • সাম্প্রতিক সময়ে মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং এলএনজি সরবরাহের ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র ও দৃশ্যমান করেছে।

অতীতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি নিরাপত্তার নামে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করলেও এর সঙ্গে সিস্টেম লস ও আর্থিক ভর্তুকির এক বিশাল বোঝা তৈরি করে রেখে গেছে। বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক সিস্টেম লসের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল। বিগত সরকারগুলো বিশেষ দায়মুক্তি আইনের (যা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন হিসেবে পরিচিত) মাধ্যমে দরপত্র ছাড়াই একের পর এক ব্যয়বহুল ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি করে দেশের জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর ও ভঙ্গুর করে তুলেছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৪৫ শতাংশ সক্ষমতা দিনের পর দিন অলস বসিয়ে রেখে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরিশোধ করতে হচ্ছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি এলএনজি এবং এলপিজি ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। দেশে এলএনজি সরবরাহের জন্য মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এবং সামিট গ্রুপকে টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ জমানায় ব্যাংকগুলোর এলসি খোলার অক্ষমতা এবং ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি খাতে স্থবিরতা দেখা দিলেও তারা বিভিন্ন উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এর পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করলেও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের কোনো নতুন সক্ষমতা বৃদ্ধি করেনি; তবে তারা বিদ্যমান অবকাঠামো এবং সীমিত সম্পদের মাধ্যমেই কোনোরকমে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল এবং লোডশেডিং বা জ্বালানি সংকট সেভাবে অনুভূত হয়নি। কিন্তু বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দৃশ্যত ব্যর্থ হয়েছে। দেশজুড়ে লোডশেডিং ও গ্যাসের অভাব চরম আকার ধারণ করায় জনমনে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষুব্ধ জনতা বিদ্যুৎ অফিসে ঘেরাও ও কর্মকর্তাদের হেনস্তা পর্যন্ত করছে। সরকারের পক্ষ থেকে আগের সরকারগুলোকে দায়ী করে আগামী দুই বছর সময় চাওয়া হলেও তা সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারছে না।

সরকারের চলমান ব্যবস্থাপনা ও সাম্প্রতিক পদক্ষেপসমূহ
সংকট সমাধানে বর্তমান সরকার কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সিপিডির মতে তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট ধীরগতি এবং এলএনজি ব্যবস্থাপনায় কারিগরি দক্ষতার অভাব রয়েছে। এমনকি নতুন সরকারের আমলেও দরপত্র ছাড়া সরাসরি কেনাকাটার দিকে ঝোঁক দেখা গেছে এবং বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়ার একটি নীতিমালার কাজ চলছে, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পের স্থবিরতা কাটাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশে লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট নিরসনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:

  • সরকার তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) বকেয়া পাওনা বাবদ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

  • বিদ্যমান লোডশেডিং পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পিডিবিকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে এই কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে।

  • বিদ্যুৎ খাতে দেশীয় গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সেই সাশ্রয়কৃত গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহের একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শিল্পের বর্তমান উৎপাদন সংকট অনেকাংশে লাঘব করবে।

  • বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানিয়েছেন যে, বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বসে থাকা ৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা কাজে লাগানো হলে তা একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস) সমান সুবিধা দিতে সক্ষম।

  • বিশ্ববাজারে এলএনজির অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমানে এলএনজির তুলনায় ফার্নেস তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সরকারের জন্য অধিকতর সাশ্রয়ী বলে বিবেচিত হচ্ছে।

এছাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে সরকার কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন যে, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ সক্ষমতার নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণ ও ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিগত সরকারগুলোর রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ খাতের বিপুল বকেয়া বিল পরিশোধের বিশাল চাপও বর্তমান সরকারকে সামলাতে হচ্ছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছাড়ার সময় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ছিল এবং বর্তমানে তা ৪৩ হাজার কোটি টাকায় অবস্থান করছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে চলতি বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ উপকরণের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর প্রত্যাহার করেছে এবং আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপকে দেওয়া ৩০ লাখ টন সক্ষমতার জ্বালানি তেল শোধনাগার নির্মাণের কাজ বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার সেটি সরকারি খরচে বাস্তবায়নের প্রকল্প নিলেও বর্তমান সরকার এখনো সেখানে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে পারেনি।

সংকট সমাধানে অবশ্য করণীয় পদক্ষেপসমূহ
বিদ্যমান এই বহুমাত্রিক জ্বালানি সংকট কোনোভাবেই কেবল স্বল্পমেয়াদি জ্বালানি আমদানি, ভারত থেকে সাময়িক ডিজেল সংগ্রহ বা কেবল দেনা পরিশোধের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে এবং বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রাখতে জ্বালানি নীতিতে কৌশলগত পরিবর্তন আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ওপর জরুরি ভিত্তিতে জোর দেওয়া প্রয়োজন:

  • দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারকরণ: আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দেশের স্থলভাগ এবং সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম অত্যন্ত দ্রুত ও জোরালো করতে হবে। বাপেক্সকে শক্তিশালী করে পরিকল্পিত ১৫০টি গ্যাস কূপ খননের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে, যেখানে এ পর্যন্ত মাত্র ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে।

  • বহুমাত্রিক আমদানি উৎস ও অবকাঠামো উন্নয়ন: এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে একক কোনো চুক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক উৎস নিশ্চিত করতে হবে এবং মজুত ও টার্মিনাল অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে।

  • শিল্প খাতে অগ্রাধিকার: দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে রফতানিমুখী উৎপাদন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় থাকে।

  • নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসার: সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে কেবল নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহৎ পরিসরে বাস্তব প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনবে।

  • সিস্টেম লস হ্রাস ও সঠিক ব্যবস্থাপনা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সিস্টেম লস কমিয়ে আনা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে উৎপাদন ও সরবরাহের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বা লোডশেডিং শিডিউল নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিল্প খাত পূর্বপ্রস্তুতি নিতে পারে।

  • কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা: বৈশ্বিক অস্থিরতা বা ভূরাজনৈতিক প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ সংকট দেখা দিলে দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে বিপর্যস্ত না হয়, সেজন্য অন্তত কয়েক দিনের চাহিদা মেটানোর মতো কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তুলতে হবে।

  • দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা: সর্বোপরি, সাময়িক সংকটের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনার বদলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্বল্পমেয়াদি ভাড়াইভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অযৌক্তিক ব্যয় হ্রাস করে সাশ্রয়ী ও দেশীয় সম্পদের ওপর ভিত্তি করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট কেবল একটি সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি নয়, এটি দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি গভীর পরীক্ষাস্বরূপ। বিগত দেড় দশকের জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই সংকট রাতারাতি দূর হওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সঠিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন, দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ও দক্ষ ব্যবহার এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ভবিষ্যতে একটি টেকসই, নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

-ফজলে রেজওয়ান করিম