দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই, ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজপথের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, তার চূড়ান্ত ফসল মূলত নির্ভর করছে আমাদের সংবিধানের গুণগত সংস্কারের ওপর। জাতীয় সংসদ ভবনে ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো থেকে যেসব প্রস্তাবনা ও ‘আইডিয়া’ বেরিয়ে আসছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনা চলছে। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় আমি সংবিধানের বহু কাঁটাছেঁড়া দেখেছি, যা মূলত ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এবারের আলোচনাগুলোতে কাঠামোগত পরিবর্তনের যে রূপরেখা দেওয়া হচ্ছে, তা যদি রাজনৈতিক সততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
**দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ**
আমাদের রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় ক্যানসার হলো নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা। পারস্পরিক আস্থার চরম সংকটের কারণে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন এ দেশে এক অলিক কল্পনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ কমিটির বৈঠকে এই সংকটের একটি অত্যন্ত সৃজনশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের প্রস্তাব উঠেছে—আর তা হলো সংসদের ‘উচ্চকক্ষ’ সৃষ্টি এবং তার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন।
আলোচনায় প্রস্তাব এসেছে যে, ১০৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা যেতে পারে, যার মধ্যে সংসদের নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে ৫০ জন এবং প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে (Proportional Representation) ৫০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। বাকি ৫ জন সদস্য রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেবেন, যারা শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান বা জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। এই উচ্চকক্ষের স্পিকারকে পদাধিকার বলে উপরাষ্ট্রপতি বা ভাইস প্রেসিডেন্ট করার একটি প্রস্তাব এসেছে, যিনি নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারপ্রধানের (তত্ত্বাবধায়ক প্রধান) দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া সরকারি ও বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ থেকে অন্যান্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে, এটি একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাব। উচ্চকক্ষের মেয়াদ যদি ৬ বছর হয় এবং নিম্নকক্ষের মেয়াদ ৪ বছর হয়, তবে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে সংসদ ভেঙে গেলেও রাষ্ট্রের একটি নির্বাচিত কক্ষ সবসময় বহাল থাকবে। এর ফলে রাষ্ট্র কখনোই সম্পূর্ণ জনপ্রতিনিধিত্বহীন হবে না। তবে এখানে আমার একটি পরামর্শ হলো, উচ্চকক্ষ যেন কেবল অবসরপ্রাপ্ত বা নির্বাচনে পরাজিত রাজনীতিকদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত না হয়। ৬৪ জেলা ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার যে প্রস্তাবটি এসেছে, তা অত্যন্ত সাধুবাদযোগ্য। উচ্চকক্ষকে হতে হবে সত্যিকার অর্থেই একটি 'হাউস অব এল্ডার্স' বা প্রজ্ঞাবানদের আড়ত, যা নিম্নকক্ষের যেকোনো হঠকারী বা জনস্বার্থবিরোধী আইন পাসের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
**বিচার বিভাগকে রাজনীতির বাইরে রাখা**
অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল এর প্রধান হিসেবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে টেনে আনা। এতে করে সুপ্রিম কোর্ট চরমমাত্রায় রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়েছিল। বিশেষ কমিটির বৈঠকে অত্যন্ত প্রাজ্ঞতার সঙ্গে বিচার বিভাগকে এই নির্বাচনকালীন সরকারের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তিদায়ক দিক। বিচারালয় হলো সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান খোঁজার জন্য রাষ্ট্রপতির সর্বশেষ বিকল্পটিও বাদ দিয়ে পুরোপুরি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ থেকে বা স্পিকারকে প্রধান করার যে প্রস্তাবনা এসেছে, তা বাস্তবায়িত হলে বিচার বিভাগের হারানো পবিত্রতা ও নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাইরে রাখলেই নিশ্চিত হবে না। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের অধীনে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব নিয়ে কমিটিতে আলোচনা হয়েছে এবং সরকারের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা দ্রুত আইনে পরিণত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
**৭০ অনুচ্ছেদের শেকল ভাঙা**
বাংলাদেশের সংসদে জনপ্রতিনিধিরা মূলত দলীয় প্রধানের ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে কাজ করেন, যার মূল কারণ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদের কারণে কোনো সাংসদ নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারেন না। এই ধারাটি গণতান্ত্রিক চর্চাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। কমিটিতে প্রস্তাব এসেছে যে, ৭০ অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ণ বাতিল না করে একে চারটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা হোক: সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, সরকারের ওপর আস্থা/অনাস্থা ভোট এবং যুদ্ধ বা জাতীয় নিরাপত্তাজনিত বিষয়। এই চারটি বিষয় বাদে অন্য যেকোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে তাঁদের মতামত প্রকাশ ও ভোট দিতে পারবেন।
একজন প্রবীণ সংবাদকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, এটি সংসদীয় গণতন্ত্রকে জীবন্ত করার মোক্ষম দাওয়াই। এর ফলে সরকারের স্থায়িত্ব যেমন হুমকির মুখে পড়বে না (কারণ অনাস্থা ও অর্থবিলে দলীয় বাধ্যবাধকতা থাকছে), তেমনি অন্যান্য সাধারণ আইন প্রণয়নে সাংসদরা নিজেদের বিবেক ও জনস্বার্থ অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন। তবে এখানে আমার পরামর্শ থাকবে, দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সদস্যপদ সরাসরি বাতিল না করে, দল থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতা দলের হাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত, সংসদ সদস্যপদ বাতিলের ক্ষমতা নয়।
**ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান**
আমাদের বর্তমান কাঠামোতে প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধানের হাতে প্রায় এককেন্দ্রিক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পুঞ্জীভূত। বিশেষ কমিটির বৈঠকে এক ব্যক্তির হাতে দল, সরকার ও সংসদের প্রধান—এই তিনটি পদ না রাখার বিষয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধের একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মানবাধিকার কমিশনকে নিছক সংবিধিবদ্ধ সংস্থা না রেখে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে। একটি ‘স্ট্যাটুটরি কনস্টিটিউশনাল বোর্ড’ গঠনের মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠনের যে রূপরেখা আলোচিত হয়েছে, তা যদি সত্যিকার অর্থে কার্যকর করা যায়, তবে নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে দুদক—সব প্রতিষ্ঠানই মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে।
পাশাপাশি, সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি ছাড়াও স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার যে প্রস্তাব এসেছে, তা সংসদীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক বিশাল মাইলফলক। জুলাই জাতীয় সনদেও এর উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
**বিরোধী দলের অনুপস্থিতি ও ঐকমত্যের সংকট**
এত সব চমৎকার ও সময়োপযোগী আলোচনার মাঝেও একটি বিশাল শূন্যতা প্রকটভাবে চোখে পড়ছে—তা হলো কমিটিতে প্রধান বিরোধী দলের অনুপস্থিতি। জুলাই জাতীয় সনদের কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত থাকার কারণে বিরোধী দল এই বিশেষ কমিটিতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বারবার বিরোধী দলকে বৈঠকে এসে তাঁদের মতামত তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে আপত্তি শিথিল করার প্রস্তাব এলে কমিটি তা বিবেচনা করবে।
সাংবিধানিক সংস্কার কোনো একদলীয় ইশতেহার নয়। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চুক্তি। বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া যে সংবিধান প্রণীত হবে, তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে পড়তে বাধ্য। আমি মনে করি, সরকারের উচিত কেবল আনুষ্ঠানিক আহ্বানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, রাজনৈতিকভাবে উদ্যোগী হয়ে বিরোধী দলকে এই আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
**২০১১ সালের ছায়া ও আমাদের প্রত্যাশা**
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের আশাবাদী হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা ভুলিনি ২০১১ সালের কথা। তৎকালীন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন কমিটি সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটিমাত্র বৈঠকের পরই পুরো সিদ্ধান্ত উল্টে যায় এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেশে একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন দীর্ঘায়িত করার বীজ বপন করা হয়।
সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল ঠিক এই শঙ্কাটির কথাই বৈঠকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, অতীতে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েও মানুষ প্রতারিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, বর্তমান সরকারের কোনো একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা বা অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা নেই, তাই ২০১১ সালের পুনরাবৃত্তি হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
তবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সব সময় বাস্তবতায় রূপ নেয় না। তাই নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং অংশীজনদের নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি থাকতে হবে। আমরা এমন একটি সংবিধান চাই, যা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট বা আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করবে। উচ্চকক্ষ সৃষ্টি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যেসব প্রস্তাব এই ৪৪ জন আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ দিয়েছেন, তা যদি কেবল রিপোর্টের কাগজে বন্দি না থেকে সংবিধানে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়, তবে বাংলাদেশ সত্যি একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আমরা আর কোনো প্রতারণার শিকার হতে চাই না, আমরা চাই একটি স্থায়ী, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের টেকসই সাংবিধানিক ভিত্তি।
