Showing posts with label Culture. Show all posts
Showing posts with label Culture. Show all posts

Saturday, June 21, 2025

বাংলার ৫টি প্রাচীন বটগাছ, 🌳 যাদের ঘিরে আছে কাহিনি ও কালের সাক্ষ্য

0 comments

বাংলার মাটি, জল, বাতাসের মতোই বটগাছ আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গাছ শুধু ছায়া দেয় না, দেয় ইতিহাসের সাক্ষ্য, দেয় লোককথার আনন্দ, দেয় আত্মার আশ্রয়। আজ আমরা জানব বাংলার এমন ৫টি প্রাচীন বটগাছের গল্প — যাদের ঘিরে আছে অতীতের কাহিনি, মানুষের বিশ্বাস ও সময়ের ছাপ।

Banyan tree

🌿 ১. সুলতানি আমলের বটগাছ, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)

পানাম নগরের পাশে এক বিশাল বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর সাক্ষী হয়ে। সোনারগাঁ ছিল একসময় বাংলার রাজধানী, সুলতানদের বসতি। প্রচলিত আছে, এই বটগাছের নিচে বসত বিচারসভা। দণ্ডপ্রাপ্তদের নাম উচ্চারণ করলেই নাকি বাতাস থেমে যেত, শিকড় কাঁপত— যেন প্রকৃতি নিজেই রায় ঘোষণা করত।

পূর্বসূরিরা বলেন, পূর্ণিমা রাতে গাছের নিচে সাদা আলোর মতো কিছু দেখা যায়। কেউ বলেন, “পীর সাহেব আসেন রাতের ঘোড়ায় চড়ে”।

📍 অবস্থান: পানাম নগর, সোনারগাঁ

📜 কাহিনি: বলা হয়, এই বটগাছের নিচেই সুলতানি যুগে বিচারসভা বসত।

🧓 লোককথা: গ্রামের প্রবীণরা বলেন, পূর্ণিমার রাতে কেউ কেউ “আলো ঝলমলে পীর সাহেব” দেখতে পান।


🌿 ২. গোমতী বট, মহাস্থানগড় (বগুড়া)

মহাস্থানগড়ের প্রাচীন কেল্লার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই বটগাছকে স্থানীয়রা বলেন “গোমতী বট”। কথিত আছে, পাল রাজারা এই গাছের নিচে যুদ্ধের আগে বসতেন প্রার্থনায়। গাছটি নাকি যুদ্ধের সময় আশ্রয় দিত নারী ও শিশুদের।

আজও অনেক পর্যটক এই গাছের নিচে দাঁড়ালে শুনেন “মৃদু শঙ্খধ্বনি” — যাকে কেউ বলেন প্রাকৃতিক শব্দ, আবার কেউ বলেন অতীতের প্রতিধ্বনি।

📍 অবস্থান: মহাস্থানগড় কেল্লার পাশে

📜 কাহিনি: জনশ্রুতি মতে, প্রাচীন পাল রাজারা এই বটগাছের নিচে যুদ্ধের পূর্বে দোয়া করতেন।

🧓 লোকবিশ্বাস: এই গাছ নাকি কারো নাম শুনে পাতার নড়াচড়ায় “হ্যাঁ/না” বলে!


🌿 ৩. ভূতুড়ে বট, বড়জোড়া, পিরোজপুর

পিরোজপুরের বড়জোড়ার বাজারের পাশে এক প্রাচীন বটগাছ আছে, যার পরিচিতি— “ভূতুড়ে বট”। প্রায় একশ বছর আগে এক কৃষক এখানেই আত্মহত্যা করেছিলেন। এরপর থেকেই সন্ধ্যার পরে গাছের শিকড় থেকে যেন আসে কান্নার আওয়াজ।

স্থানীয়রা দিনভর গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নেয়, কিন্তু সূর্য অস্তালগামী হলেই কেউ আর কাছে ভিড়ে না। কিছু সাহসী তরুণ গেছেন, ভিডিও করেছেন — যদিও কিছুই ধরা পড়ে না, কেবল এক অদ্ভুত অনুভূতি।

📍 অবস্থান: বড়জোড়া বাজারের পাশে

📜 কাহিনি: শত বছর আগে এক চাষি এখানে আত্মহত্যা করেছিলেন, তারপর থেকেই গাছের পাতার মাঝে কেঁদে ওঠার শব্দ শোনা যায়।

🎭 ব্যবহার: স্থানীয়রা দিনে এখানে বিশ্রাম নেয়, কিন্তু সন্ধ্যার পর কেউ যায় না!


🌿 ৪. লালনের বটগাছ, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াতে লালন শাহের আখড়াবাড়ির পাশে যে বটগাছটি আছে, তা কেবল গাছ নয়— যেন আত্মার ঘর। লোকগীতি অনুসারে, লালন সাঁই এই গাছের নিচে বসেই আত্মজিজ্ঞাসা করতেন, গান লিখতেন।

আজও এখানে বসে বাউলরা গেয়ে ওঠেন —
“ধন ধারণা কিছু নয় লাগে,
যদি না জানিস আপন ভাগে…”

বটগাছটি যেন আধ্যাত্মিকতার প্রতীক, একান্ত সাধনার স্থান।

📍 অবস্থান: লালন শাহের আখড়াবাড়ি

📜 কাহিনি: লোকগীতি বলে, এই গাছের নিচেই লালন সাঁই ভাবনায় ডুবে যেতেন।

🎶 আজো এখানে বসে বাউলরা গান করে: “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”।


🌿 ৫. চন্দ্রনাথ বট, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে যে প্রাচীন বটগাছটি আছে, তা বহু পূণ্যার্থীর কাছে পবিত্র। হিন্দু ধর্মীয় কাহিনি বলে, সীতার বিশ্রামের স্থান ছিল এই বটগাছ। পূর্ণিমার রাতে এখানে হয় বিশেষ পূজা ও আরতি।

এই গাছের শিকড় যেন মাটির চেয়ে আকাশের দিকে বেশি টান, যেন সীতা ও রামের আলিঙ্গনের মতো এক নিরব অথচ শক্তিশালী স্পর্শ।

📍 অবস্থান: চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে

📜 কাহিনি: হিন্দু পূণ্যার্থীদের মতে, এটি ছিল সীতার বিশ্রামস্থল। পূর্ণিমায় এখানে আরতিও হয়।

🧘 আধ্যাত্মিক মহিমায় গাছটি আজও পূজিত হয়।


🧠 কেন বটগাছের সঙ্গে গল্প জড়িয়ে যায়?

বটগাছ গড়ে তোলে সমাজ, বসে “বটতলা সভা”, হয় বিচার, গড়ে ওঠে পীরের আসন। এর বিশালতা ও দীর্ঘায়ু মানুষকে দেয় এক প্রাকৃতিক শ্রদ্ধা — যেখান থেকে জন্ম নেয় কল্পনা, বিশ্বাস, ও গল্প।

Tuesday, May 6, 2025

সিয়াম আহমেদ বনাম শরিফুল রাজ: কে হচ্ছে ঢালিউডের পরবর্তী সুপারস্টার?

0 comments

 ঢাকাই সিনেমার গতি অনেকটাই বদলে গেছে। শাকিব খানের দীর্ঘ রাজত্বের পর এখন আলোচনায় উঠেছে দুই নতুন মুখ — সিয়াম আহমেদ এবং শরিফুল রাজ

তাদের অভিনয়, জনপ্রিয়তা, চরিত্র নির্বাচনের বৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন:

কে হচ্ছেন ঢালিউডের নতুন ‘রাজা’?

Siam_Ahmed-Shariful_Raj

🌟 সিয়াম আহমেদ: স্মার্ট হিরোর আধুনিক রূপ

✅ পরিচয় ও উত্থান

সিয়াম আহমেদ মূলত টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ ছিলেন।
২০১৮ সালে "পোড়ামন ২" সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক।
তৎকালীন তরুণদের মধ্যে সুদর্শন, স্মার্ট এবং মার্জিত লুকে বাজিমাত করেন।

🎥 উল্লেখযোগ্য সিনেমা

  • পোড়ামন ২

  • দহন

  • শান

  • মৃধা বনাম মৃধা

  • অপারেশন সুন্দরবন

⭐ পজিটিভ দিক

  • ক্লিন ইমেজ

  • পরিবার-ফ্রেন্ডলি চরিত্র

  • নায়কোচিত রোমান্টিক গ্ল্যামার

  • বিজ্ঞাপন ও মিডিয়ায় জনপ্রিয়

❌ সীমাবদ্ধতা

  • চরিত্রের বৈচিত্র্য কিছুটা কম

  • মূলত মেইনস্ট্রিম দর্শকের মধ্যে জনপ্রিয়


🔥 শরিফুল রাজ: বাস্তববাদী চরিত্রের বিদ্রোহী অভিনেতা

✅ পরিচয় ও উত্থান

মডেলিং থেকে আসা শরিফুল রাজ হঠাৎ করেই আলোচনায় আসেন ২০২১ সালের "নেটওয়ার্কের বাইরে" এবং "পরাণ" সিনেমায়।

🎥 উল্লেখযোগ্য সিনেমা

  • পরাণ

  • হাওয়া

  • গুণিন

  • ঢাকা ড্রিম

  • অজ্ঞাতনামা (সহ-ভূমিকা)

⭐ পজিটিভ দিক

  • শক্তিশালী অভিনয়

  • রাফ-অ্যান্ড-র’ লুক

  • বাস্তবভিত্তিক গল্পে পারদর্শিতা

  • তরুণ নির্মাতাদের পছন্দের পাত্র

❌ সীমাবদ্ধতা

  • ব্যক্তিগত বিতর্কে আলোচিত

  • সব বয়সী দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কম


🎯 কে এগিয়ে?



মাপকাঠি সিয়াম আহমেদ শরিফুল রাজ
লুক মার্জিত, হিরো টাইপ রাফ, বাস্তব
জনপ্রিয়তা মেইনস্ট্রিম তরুণ ও বুদ্ধিজীবী দর্শক
চরিত্র নির্বাচন নিরাপদ, রোমান্টিক চ্যালেঞ্জিং, বিতর্কিত
মিডিয়া প্রেজেন্স অধিক তুলনামূলক কম
আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা আছে বেশি

🧭 উপসংহার

ঢালিউড এখন রূপান্তরের পথে।

সিয়াম ঢালিউডের ‘সেফ হিরো’,
আর রাজ হলেন নতুন ঢংয়ের ‘রিয়েল হিরো’।

কেউ শাকিব খানের উত্তরসূরি হতে চান, কেউ বদলে দিতে চান পুরো হিরো ধারনাই।

Siam_Ahmed-Shariful_Raj

তবে সুপারস্টার হওয়ার জন্য শুধু জনপ্রিয়তা নয়, দরকার ধারাবাহিকতা, নতুনত্ব আর দর্শকের ভালোবাসা।
সময়ই বলে দেবে — কে হচ্ছেন ঢালিউডের আসল ‘নেক্সট সুপারস্টার’।

Friday, May 2, 2025

শাকিব খান: ঢালিউডের রাজা নাকি সময়ের স্রোতে হারানো নায়ক?

0 comments

বাংলা চলচ্চিত্র বলতেই একসময় মাথায় ভেসে উঠত একটি নাম — শাকিব খান। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢালিউডে রাজত্ব করা এই সুপারস্টার আজও আলোচনার কেন্দ্রে।

শাকিব_খান-Shakib_Khan
কিন্তু প্রশ্ন হলো — ২০২৫ সালে এসে তিনি কি এখনও আগের মতোই প্রাসঙ্গিক? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধূসর হয়ে যাচ্ছেন ‘সিনেমার রাজা’?


👑 সাফল্যের শুরুঃ ২০০০ থেকে ২০১৫

শাকিব খান ১৯৯৯ সালে ‘অনন্ত ভালোবাসা’ দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, ২০০৬ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সময় ছিল তার ক্যারিয়ারের ‘গোল্ডেন পিরিয়ড’।

  • হিট সিনেমা: কিং খান, আম্মাজান, প্রেমিক নাম্বার ওয়ান, ভাইজান এলো রে

  • অভিনয় দক্ষতা ও লুক তাকে আলাদা করে পরিচিতি দেয়

  • বাণিজ্যিক ছবির নতুন ভাষা তৈরি হয় তার মাধ্যমে


💔 সমালোচনার ঝড় ও পরিবর্তনের চাপ

তবে সময় বদলেছে। দর্শকের পছন্দ পাল্টেছে।

  • একই ধাঁচের গল্প

  • অতিরঞ্জিত অ্যাকশন

  • দুর্বল চিত্রনাট্য
    এসব কারণে অনেকেই বলতে শুরু করেন — “শাকিব খান এখন রিপিটেড, নতুন কিছু নেই”


🌍 টলিউড যাত্রা ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা

২০১৮ সালে শাকিব খান কলকাতায় কাজ শুরু করেন। ‘ভাইজান এলো রে’ ও ‘নাকাব’-এর মতো সিনেমা তাকে ভারতের দর্শকদের মাঝেও পরিচিত করে তোলে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সে সফলতা স্থায়ী হয়নি।


🎥 ২০২১-২০২4: নতুন প্রজন্ম বনাম কিং খান

এদিকে সিয়াম, শরিফুল রাজ, অনন্ত জলিলদের মতো নতুন মুখেরা ঢালিউডে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।

  • ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান

  • গল্পভিত্তিক সিনেমার চাহিদা

  • তরুণ নির্মাতাদের নতুন ধারা
    এসব কিছু শাকিবের স্টারডমে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।


🔄 ২০২৫: কামব্যাক নাকি কেবল উপস্থিতি?

বর্তমানে শাকিব খান কিছু নতুন ছবিতে কাজ করছেন, যেমন:

  • “প্রিয়তমা” (২০২৩): দর্শকপ্রিয়তা পেলেও সমালোচকরা মিশ্র মত দেন

  • “রাজকুমার” ও “মাসুদ রানা” প্রজেক্ট: অপেক্ষায় দর্শক

প্রশ্ন হলো — এই প্রজেক্টগুলো কি আবারো তাকে রাজা বানাতে পারবে?


🧠 দর্শকের মতামত

পক্ষে:

  • “যতই সময় যাক, শাকিবের স্টারডম অমলিন”

  • “তিনি ইন্ডাস্ট্রির একটা ইতিহাস”

বিপক্ষে:

  • “উনি নিজেকে আপডেট করেননি”

  • “নতুনদের জায়গা ছেড়ে দেওয়া উচিত”


🧭 উপসংহার

শাকিব খান শুধু একজন নায়ক নন, ঢালিউডের একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। তিনি কি আবারো ফিরবেন তার রাজাসনে, নাকি নিজেই ইতিহাস হয়ে থাকবেন — তা নির্ভর করছে তার পরবর্তী পদক্ষেপে।


শাকিব খান এখন একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন — উত্তর দেবে সময়।

Monday, May 25, 2020

প্রথম বাংলা ইসলামি গান রেকর্ডিংয়ের কথা

0 comments
কাজী নজরুলের শতাধিক ইসলামি গানের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় হল ‘ও মোর রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’ গানটি। আব্বাসউদ্দীন আহমদের জীবনী থেকে জানা যায়, সঙ্গীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধেই কাজী নজরুল ইসলাম এ গান রচনা করেছিলেন। তবে আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধে রচনা করলেও এই গান নজরুলের জীবনব্যাপী সংগ্রামেরই অংশ যেখানে তিনি স্বজাতির বেদনা ও মুক্তির তাড়নায় প্রতিনিয়ত সৃষ্টির আনন্দে মেতে ছিলেন।

কবি তার কালজয়ী এ গানটি রচনা করেন ১৯৩১ সালে। লেখার মাত্র চারদিন পর শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের গলায় গানটি রেকর্ড করা হয়। রেকর্ড করার দুই মাস পর ঈদের ঠিক আগে আগে এই রেকর্ড প্রকাশ করা হয়। আব্বাসউদ্দীনের ‘দিনলিপি ও আমার শিল্পী জীবনের কথা’র এ গান সম্পর্কে আব্বাসউদ্দীন লিখেন,

‘কাজীদার লেখা গান ইতোমধ্যে অনেকগুলো রেকর্ড করে ফেললাম। তার লেখা ‘ বেণুকার বনে কাঁদে বাতাস বিধুর’, ‘অনেক কিছু বলার যদি দুদিন আগে আসতে’, ‘গাঙে জোয়ার এল ফিরে তুমি এলে কই’, ‘বন্ধু আজও মনে পড়ে আম কুড়ানো খেলা’ ইত্যাদি রেকর্ড করলাম। একদিন কাজীদাকে বললাম, ‘কাজীদা, একটা কথা মনে হয়। এই যে পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল- এরা উর্দু কাওয়ালি গায়, এদের গানও শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়। এ ধরনের বাংলায় ইসলামি গান দিলে হয় না?

কথাটা তার মনে লাগল। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, তুমি ভগবতীবাবুকে বলে তার মত নাও। আমি ঠিক বলতে পারব না’। আমি ভগবতী ভট্টাচার্য অর্থাৎ গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইনচার্জকে বললাম। তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, ‘না না না, ওসব গান চলবে না। ও হতে পারে না’। মনের দুঃখ মনেই চেপে গেলাম।

এর প্রায় ছয় মাস পর। একদিন দুপুরে বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি অফিস থেকে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল ঘরে গিয়েছি। দেখি, একটা ঘরে আশ্চর্যময়ী আর ভগবতীবাবু বেশ রসালো গল্প করছেন। আমি নমস্কার দিতেই বললেন, ‘বসুন, বসুন’। আমি তার রসাপ্লুত মুখের দিকে চেয়ে ভাবলাম, এ-ই উত্তম সুযোগ। বললাম, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে বলি। সেই যে বলেছিলাম ইসলামি গান দেওয়ার কথা। আচ্ছা; একটা এক্সপেরিমেন্টই করুন না, যদি বিক্রি না হয় আর নেবেন না, ক্ষতি কী’? তিনি হেসে বললেন, ‘নেহাতই নাছোড়বান্দা আপনি, আচ্ছা আচ্ছা, করা যাবে’।

শুনলাম, পাশের ঘরে কাজীদা আছেন। আমি কাজীদাকে বললাম, ভগবতীবাবু রাজি হয়েছেন। তখন সেখানে ইন্দুবালা কাজীদার কাছে গান শিখছিলেন। কাজীদা বলে উঠলেন, ‘ইন্দু, তুমি বাড়ি যাও, আব্বাসের সঙ্গে কাজ আছে’। ইন্দুবালা চলে গেলেন।

এক ঠোঙা পান আর চা আনতে বললাম দশরথ থেকে। তারপর দরজা বন্ধ করে আধঘণ্টার ভেতরই লিখে ফেললেন, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’।

তখনই সুর সংযোগ করে শিখিয়ে দিলেন। পরের দিন ঠিক এই সময় আসতে বললেন। পরের দিন লিখলেন, ‘ইসলামের ওই সওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর’। গান দু’খানা লেখার ঠিক চার দিন পরই রেকর্ড করা হল। কাজীদার আর ধৈর্য মানছিল না। তার চোখেমুখে কী আনন্দই যে খেলে যাচ্ছিল! তখনকার দিনে যন্ত্র ব্যবহার হতো শুধু হারমোনিয়াম আর তবলা। গান দু’খানা আমার তখন মুখস্থ হয়নি। তিনি নিজে যা লিখে দিয়েছিলেন, মাইকের পাশ দিয়ে হারমোনিয়ামের ওপর ঠিক আমার চোখ বরাবর হাত দিয়ে কাজীদা নিজেই সেই কাগজখানা ধরলেন, আমি গেয়ে চললাম। এই হল আমার প্রথম ইসলামি রেকর্ড। শুনলাম; দুই মাস পর ঈদুল ফিতররের সময় গান দু’খানা তখন বাজারে বের হবে। ঈদের বাজার করতে একদিন ধর্মতলার দিকে গিয়েছি। বিএন সেন অর্থাৎ সেনোলা রেকর্ড কোম্পানির বিভূতিদার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, আমার দোকানে এস’। তিনি এক ফটোগ্রাফার ডেকে নিয়ে এসে বসলেন, ‘এর ফটোটা নিন তো’। আমি তো অবাক! বললাম, ‘ব্যাপার কী’? তিনি বললেন, ‘তোমার একটা ফটো নিচ্ছি, ব্যস, আবার কী’?

ঈদের বন্ধে বাড়ি গেলাম।…কলকাতা ফিরে এসে ট্রামে চড়ে অফিসে যাচ্ছি। ট্রামে একটি যুবক আমার পাশে গুনগুন করে গাইছে, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’। আমি একটু অবাক হলাম। এ গান কী করে শুনল! অফিস ছুটির পর গড়ের মাঠে বেড়াতে গিয়েছি, মাঠে বসে একদল ছেলের মাঝে একটি ছেলে গেয়ে উঠল, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’। আনন্দে-খুশিতে মন ভরে উঠল।… ছুটলাম কাজীদার বাড়ি। শুনলাম, তিনি রিহার্সেল রুমে গেছেন। দেখি, দাবা খেলায় তিনি মত্ত। দাবা খেলতে বসলে দুনিয়া ভুলে যান তিনি। আমার গলার স্বর শুনে একদম লাফিয়ে উঠে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আব্বাস, তোমার গান কী যে-’ আর বলতে দিলাম না পা ছুঁয়ে তার কদমবুসি করলাম। ভগবতীবাবুকে বললাম, ‘তাহলে এক্সপেরিমেন্টের ধোপে টিকে গেছি, কেমন’? তিনি বললেন, ‘এবার তাহলে আরও ক’খানা এই ধরনের গান…’ (আব্বাসউদ্দীন, ১৯৬০)

Friday, April 22, 2016

মসলিন

0 comments
বাঙালীর উৎপাদিত সূক্ষ্ম কাপড়ের নামকরণ ‘মসলিন’ শব্দটি কোথায় কীভাবে জন্ম নিয়েছিল ইতিহাসে তার ধারণা খুঁজে পাওয়া কঠিন। ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম মনে করেন মসলিন ফার্সি। সংস্কৃত শব্দ নয়, বাংলা তো নয়ই। হেনরি-ইউল এবং এ.সি বার্নেল মনে করেন মসলিন শব্দ মসুল থেকে উদ্ভূত। মসুল ইরাকের অন্তর্গত একটি বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র। মসুল এলাকায় পুরাকালে উৎকৃষ্ট ধরনের বস্ত্র তৈরি হতো হয়ত ইউরোপীয়রা সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্রকে সাধারণভাবে মসুলি বা মসুলিন নামে অভিহিত করত। এর জের ধরে ইউরোপিয়ানরা যখন ঢাকার সূক্ষ্ম মসলিন কাপড়ের সন্ধান পায় সেই সুবাদে ঢাকার সূক্ষ্ম কাপড়কেও তারা মসলিন নামে আখ্যায়িত করতে পারে। এ ছাড়াও ঢাকার সূক্ষ্ম কাপড়কেই শুধু মসলিন বলা হতো না গুজরাট, গোলকুন্ডা ইত্যাদি স্থানে প্রস্তুত কাপড়কেও মসলিন নামে অভিহিত করা হতো। ঢাকার সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্রকে কোন নামে অভিহিত করা হতো তা জানা দুরূহ ব্যাপার। তবে বিত্তশালী, শ্রেষ্ঠী, রাজা, সম্রাট, সুবেদার, নায়েবে নাজিমদের, সম্রাজ্ঞী, শাহজাদা শাহজাদীদের জন্য ব্যবহৃত মূল্যবান মসলিন কাপড়ের নাম ছিল ‘ঝলমল খাস’ ঝলবুস গাস’। ‘আঁবে-ই-রওয়া, শবনাম, শরবতি, জামদানি, আলিবালি নামে মসলিনের চমৎকার নাম পাওয়া যায়। সূক্ষ্ম ও মিহি মসলিন কাপড় যোগাড় করা সে আমলেও কঠিন ব্যাপার ছিল। কারণ সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীদের ঝলমল খাস তৈরি করার জন্য বাদশাহী তাঁতখানা ছিল। এ তাঁতখানা শুধু রাজা-বাদশাদের ফরমায়েশকৃত মসলিন তৈরির কাজে ব্যবহৃত হতো।

যুগে যুগে মসলিন

ভারত বর্ষে মশলার আধিপত্য নিয়ে পর্তুগিজ এবং ডাচদের মধ্যে যে বাণিজ্যযুদ্ধ হয়েছিল পরবর্তীকালে পাশ্চাত্যে গ্রীক, রোমান সাম্রাজ্যে ধস নামার পর সামুদ্রিক বাণিজ্য আধিপত্য নিয়ে মসলিন যুদ্ধ না হলেও কালের বিবর্তনে রোমান ও গ্রীক সাম্রাজ্য ধ্বংসের পর পর সামুদ্রিক বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্যটুকু আরব বিশ্বের কাছে চলে যায়। নবম শতকে লিখিত আরব ভৌগোলিক সোলায়মানের সিলসিলাত-উত-তাওয়ারিখে রুমী নামক এক রাজ্যের বিবরণ পাওয়া যায় যেখানে যে ৪০ হাত দৈর্ঘ্য ও ২ হাত লম্বা এক টুকরা কাপড় একটি ছোট আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে নাড়াচাড়া করা যেত এমন সূক্ষ্ম বস্ত্রের বর্ণনা রয়েছে। ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা যখন সোনারগাঁও ভ্রমণ করেন তিনি সোনারগাঁওয়ে উৎপাদিত মসলিন কাপড়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন। চতুর্দশ শতকে সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের রাজত্বকালে চীনা দূত কংছুলোর নেতৃত্বে যে দলটি সোনারগাঁও এবং পাতুয়া ভ্রমণ করেন ইতিহাস মিংশরে লিখিত আছে সে সময়ের ঐশ্বর্যশালী বাংলায় সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্র তৈরি হতো। গিয়াসুদ্দীন আযম শাহ এবং সাইফুদ্দিন

হামজা শাহের দরবারে আগত চীনা প্রতিনিধিদের মহামূল্যবান মসলিন কাপড় ভেট হিসেবে প্রদান করা হয়েছিল। ষোড়শ শতকের প্রথমদিকে আগত পর্তুগিজ পর্যটক ডুয়ার্টে বারবাসাও বাংলাদেশের সুতি বস্ত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে ঈসা খাঁর রাজত্বকালে রানী এলিজাবেথের বিশেষ দূত রালফ ফিচ যখন সোনারগাঁও ভ্রমণ করেন তখন তিনি সোনারগাঁওয়ের মসলিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। ১৮৫১ সালে লন্ডনে সোনারগাঁওয়ের মসলিন কাপড় প্রদর্শিত হয়। ঐ প্রদর্শনীতে দর্শনীয় জিনিসসমূহের মধ্যে মসলিন এক বিশেষ স্থান অধিকার করে মসলিন সর্বোত্তম বস্ত্র বলে বিবেচিত হয়।

সোনারগাঁও মোহনীয় মসলিনের পুণ্যভূমি

চতুর্দশ শতকের চারু কারুকলা খ্যাত বাংলার মধ্যযুগীয় রাজধানী সোনারগাঁও ছিল আদি মসলিনের পুণ্যভূমি। শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র বিধৌত দ্বীপসম এ স্থানটি এক সময় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় শুধু শীর্ষস্থান অধিকার করেনি। সোনারগাঁওয়ের বর্ণাঢ্য খ্যাতির গভীরে আছে মসলিন নিয়ে অনেক অজানা কাহিনী। আজ যেখানে লোনা ইটের প্রস্তর খসানো দালান মহাকালের করাল দৃষ্টি এড়িয়ে এখনও টিকে আছে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এক সময় এ স্থানই বণিক, সওদাগর, মসলিন কারিগর, দালাল, ফড়িয়াদের কলগুঞ্জনে মুখরিত থাকত। এ কথা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত সোনারগাঁওয়ের পানামনগরী যা এখনও মধ্যযুগীয় সমৃদ্ধ সংস্কৃতির স্বাক্ষর বহন করে আসছে সেই পানামনগরীই ছিল মসলিনের বিখ্যাত আড়ং। সোনারগাঁওয়ের খাসনগর দীঘি থেকে উত্থিত আদ্র বায়ু মসলিন সুতো কাটানোর জন্য উৎকৃষ্ট ছিল। মসলিন কারিগদের বসাবাস ছিল সম্ভবত খাস নগর দিঘির তীরেই। খুব ভোরে সোনারগাঁওয়ের মসলিন তাঁতিরা দীঘির চারদিক ঘিরে মসলিন সুতো টাঙিয়ে শুকাত। ভোরবেলার দীঘির আর্দ আবহাওয়া মসলিন সুতো শুকানোর জন্য অনুকূলে ছিল। খাসনগর দীঘির তীরের মসলিন কারিগররা শ্রেষ্ঠী, বিত্তশালীদের জন্য তৈরি করত ঝলমল খাস, মলবুস খাস আবে-ই-রওয়া, শাবনাম, আলিবালি নামক মহামূল্যবান মসলিন শুধু মসলিন তৈরিই নয় ধোপার কাজ থেকে শুরু করে, রঙ করা এবং মসলিনের মাঝে সোনা রূপার নান্দনিক ডিজাইনে মসলিনকে মোহনীয় করার জন্য সোনারগাঁওয়ের মসলিন কারিগরদের সুনাম ছিল। উৎকৃষ্ট ‘ফুটি’ কার্পাস উৎপাদিত হতো ব্রহ্মপুত্র তীর ঘেঁষেই। ঝলমল খাসের মতো উৎকৃষ্ট মসলিনের জন্য প্রয়োজন হতো ফুটি কার্পাসের। ফুটি কার্পাসের এই সহজলভ্যতার কারণেই আদি মধ্যযুগের রাজধানী সোনারগাঁওয়ের পৃথিবীখ্যাত মসলিন তৈরি সম্ভব হয়েছিল। খাসনগর দীঘিকে কেন্দ্র করে সোনারগাঁওয়ের সমাজব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন হয়েছিল। উৎকৃষ্ট চাল, বস্ত্র রফতানির ফলে সোনারগাঁওয়ের অর্থনীতি ফুলে ফেঁপে উঠলেও সাধারণ তাঁতিদের অর্থনৈতিক অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। বরং মলমল ঝলমল খাসের জন্য যে সমস্ত সুতো কাটুনি তরুণীরা নিয়োজিত ছিলেন তাদের কখনও ভাগ্য ফেরিনি। নিপুণ সুতা কাটুনি হওয়াতে অনেক সময় প্রশাসনিকভাবে নির্যাতনও নেমে আসত তাদের ওপর। ইতিহাসে উল্লেখ আছে সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞী সুবেদার, আমলা, শাহযাদা, শাহযাদি নায়েব নাজিযাদ জন্য যে বিশেষ মসলিন বস্ত্র তৈরি হতো মোগল রাজশক্তির বিশেষ কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে তাদের থাকতে হতো। মোগল রাজ কর্মচারীদের নির্দিষ্ট তাঁত খানায় যে রাজ কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন তাদের উপাধি ছিল ‘দারোগাই-মলবুস খাস’।

দারোগাই মলবুস খাসের শ্যেনদৃষ্টি ছিল মসলিন কারিগরদের ওপর। মাসের পর মাস মসলিনের মতো সুক্ষ্ম কাপড় বুননে কারিগরদের যে শ্রমটুকু ব্যয় হতো তার প্রকৃত মজুরি কখনো তাদের ভাগ্যে জুটতো না।

বরং নিজেরা নিপুণ সুতো কাটুনে হওয়াতে তারা নিজকে অভিশপ্তই মনে করত। সোনারগাঁও কারিগরদের নির্মিত মসলিন সুতো কোন কোন সময় ১৭৫ হাত লম্বা ছিল। জেমস টেলর সোনারগাঁওয়ে এক পাউন্ড ওজনের এক লাল সুতো দেখেছিলেন যার দৈর্ঘ্য ছিল ২৫০ মাইলের মতো। উল্লিখিত সুতো ১৮৫১ সালে বিলেতের প্রদর্শনীতে প্রদর্শন করা হয়েছিল। প্রদর্শিত সুতার সুক্ষ্মতা সম্পর্কে টেলর বলেছেন, ইহার ব্যাস ১/১০০০ থেকে ১/১৫০০ ইঞ্চি পরিমাণ! সুলতানি যুগে রাজধানী সোনারগাঁও থেকে মসলিন কাপড়ের ব্যবসায়ী হিসেবে আরব বণিকদের পাশাপাশি ইরানি ব্যবসায়ীদেরও পরিচয় পাওয়া যায়। সুলতানি আমলে ঠিক কতো টাকা মূল্যের মসলিন বিদেশে রফতানি হত তার সঠিক পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও জেমস টেলরের বর্ণনায় দেখা যায় ইংরেজ আমলে সোনারগাঁও আড়ং হতে ৩ লাখ ৫০ হাজার (তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার) টাকার মসলিন রফতানি হয়েছিল। স্বভাবতই রাজধানী সোনারগাঁও এবং তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোকে ঘিরে মসলিনবিষয়ক রমরমা বাণিজ্যের উত্থান হয়েছিল। এই সমৃদ্ধ বাণিজ্যের ধারা পলাশী যুদ্ধের আগ পর্যন্ত ক্ষীণ বহমান ছিল। মুসলিম রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সোনারগাঁওয়ের মসলিনের বর্ণাঢ্য ধারাটি বিলুপ্ত হতে হতে পলাশী যুদ্ধে বাংলার শোচনীয় পরাজয়ের পর তা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ সমস্ত কারণ ছাড়াও পাশ্চাত্যে আধুনিক বস্ত্র নির্মাণের ফল আবিষ্কৃত এবং সস্তা দামে কাপড়ের প্রচলন হওয়াতেও মসলিন শিল্পে একটি বড় রকমের ধাক্কা লাগে। ব্রিটিশ কলোনির বাজার হিসেবে ভারতবর্ষে তখন প্রচুর পরিমাণে মোটা সুতি কাপড় আমদানিতে বস্ত্রশিল্পের প্রতিযোগিতায় মসলিন শিল্প আর টিকে থাকতে পারেনি। এ ছাড়াও কোম্পানির তাঁতখানা কর্মকর্তা তাদের নিয়োগকৃত গোমস্তাদের মসলিন কারিগরদের ওপর অত্যাচার দালাল এবং ফড়িয়া দ্বারা মসলিনের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করাও ছিল সোনারগাঁওয়ের মসলিন শিল্প ধ্বংস হওয়ার একটি অন্যতম কারণ। ক্ষোভ এবং অসন্তোষের পুঞ্জিভূত নির্যাতনের শিকার সোনারগাঁওয়ের মসলিন কারিগররা একবার বিদ্রোহ করে। কোম্পানির কুঠিয়ালের লাঠিয়াল এবং ঢাকা থেকে আসা গোরা সৈনিকরা সোনারগাঁওয়ের মসলিন কারিগরদের এই বিদ্রোহকে কঠোর হস্তে দমন করে।

ঢাকার মসলিনের ইতিকথা

যেখানে রাজধানী সেখানে রাজসিক পরিবেশ। বিত্ত ও আভিজাত্যের স্থানান্তর রাজধানীকে কেন্দ্র করেই। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে রাজধানী সোনারগাঁও থেকে ঢাকা স্থানান্তরিত হওয়ার পর স্বভাবতই ঢাকা অভিজাত মহলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাসস্থানের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। মসলিনের ব্যাপারে এ কথাটি ষোলআনাই প্রযোজ্য। ১৬০৮ খ্রিস্টব্দের পর সোনারগাঁওয়ে মসলিন কাপড় যে তৈরি হতো না তা কিন্তু নয়। ঢাকা রাজধানী হওয়ার পরও সোনারগাঁওয়ে মসলিনের আয়ুষ্কাল টিকে ছিল আরও দেড়শত বছর। রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পর মসলিন কাপড় বিদেশে পরিচিত হতে থাকে ঢাকাই মসলিন হিসেবে। মোগলদের সময়ে এবং তৎপরবর্তী সময়ে ঢাকাই মসলিনের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়ায়ে পড়ে আরব বণিকদের মারফত উত্তর আফ্রিকা, জেদ্দা কায়রো, বশরা, নগরীতে ছড়ায়ে পড়ে। ইউরোপিয়ানদের সময়ে ঢাকায় দলে দলে ইউরোপীয় বণিকরা এদেশে আসতে শুরু করে এবং ঢাকাই মসলিন ইউরোপে এতো অধিক পরিমাণে রফতানি হতে থাকে যে ল-ন, প্যারি, আর্মস্টার্ডামের বাণিজ্য কেন্দ্রেও বিপুল প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। যেহেতু ঢাকার মসলিন নিয়ে একচেটিয়া বাণিজ্য ছিল ইউরোপিয়ানদের। তারা এ সম্পর্কে। বিভিন্ন অফিসিয়াল রিপোর্টে অল্প বিস্তর আলোচনাও করেছেন। ১৮৪৪ সালে ঢাকা বিভাগের তদানীন্তন অস্থায়ী কমিশনার ডানবারের লিখিত এক চিঠিতেও ঢাকাই মসলিন সম্পর্কে কিছু জানা যায়।

চারশত বছরের কৌলীন্য নিয়ে ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীর যে যাত্রা এবং যে ঢাকাকে বলা হয় মোগলদের শহর, সে ঢাকার মহামূল্যবান মসলিন সম্পর্কে মোগলরা তেমন কিছুই লিখে যায়নি। মোগলদের সময়ের লিখিত ঢাকার মসলিন সম্পর্কিত কোন ঐতিহাসিক গ্রন্থ থাকলে ব্রিটিশ প্রাক মসলিন সম্পর্কে আরও বেশি অবহিত হওয়া যেত। আইন-ই-আদববীর লেখক আবুল ফজল কিছুটা উল্লেখ করলেও। মসলিন সম্পর্কে লেখা যথার্থ নয়। মোগল সুবেদারদের আমলে ঢাকা, সোনারগাঁও থেকে মোগল রাজদরবারে রাজস্ব পাঠানোর সঙ্গে মূল্যবান মসলিন কাপড় পাঠানোরও একটি দাফতরিক নির্দেশনামা ছিল। ইতিহাস পাঠে লক্ষ্য করা যায় সুবেদার ইসলাম খান, দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান মোগল রাজদরবারে রাজস্ব পাঠানোর সঙ্গে, সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞীদের জন্য মলবুস খাস মসলিন পাঠিয়েছিলেন। তো এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না ঢাকার মোগল সুবেদার এবং নায়েবে নাজিসরা মসলিনের আদর্শ সমঝদার ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ঢাকাই-মসলিনের স্বর্ণযুগ শুরু হয় মোগলদের আমল থেকেই এবং ইউরোপিয়ানদের আমলে তা ফুলে ফেঁপে দাঁড়ায়। শুধু রাজধানীতেই নয়, ঢাকা জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে তাঁতশিল্প ছড়িয়ে পড়েছিল তা ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকে জেমস টেলর নিজ চোখেই দেখেছেন। বিশেষ করে অভিজাত রাজ-রাজরাদের মসলিন তৈরির জন্যে ঢাকা, সোনারগাঁও, ধামরাই, তিতাবাদি ও জঙ্গলবাড়ির কথা জেমস টেলর বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। ঢাকায় বসে ইউরোপিয়ানরা অনেক কাঁচা সোনা-রূপা লগ্নী করত। ইউরোপিয়ান এবং পাশ্চাত্যের টাকা বিনিময়কারী অনেক সংস্থাও ঢাকাতে গড়ে উঠেছিল। শুধু ঢাকাতেই নয়, রাজকীয় মসলিন তৈরি এবং জোগাড় করার জন্যে সরকারী প্রতিনিধিরা তিতাবদি, জঙ্গলবাড়ি, ধামরাই, সোনারগাঁওয়ে আসতেন। অনেক তাঁতিরা যাতে মসলিন বুননে ফাঁকি দিতে না পারে সে জন্যে সরকারী তাঁতখানায় পাহাড়ার বন্দোবস্ত ও থাকত। যে কাপড় যত বেশি দীর্ঘ এবং যত বেশিসংখ্যক সুতোবেষ্টিত ও ওজনে কম হতো সে মসলিনকেই উৎকৃষ্টতম মসলিন হিসেবে চিহ্নিত করা হেতা। এই শ্রেণীর মলবুস খাস এবং সরকার-ই-আলী মসলিনের ওজন ছিল ৬/৭ তোলা। এ কাপড় এতো সুক্ষ্ম ছিল যে একটি ছোট্ট আংটির ভেতরে তা অনায়াসে নাড়াচাড়া করা যেত। সম্রাট আওরঙ্গজেবকে ঢাকার যে মসলিন পাঠানো হয়েছিল তার ওজন ছিল ছয় তোলা। এ কাপড়ের দৈর্ঘ্য ছিল ১০ গজ এবং প্রস্থে ছিল ১ গজ। ঝুনা নামে এক প্রকার সূক্ষ্ম জালের মতো মসলিন তৈরি হতো যার ওজন ছিল ২০ তোলার মতো। পর্যটক ট্যাতাটিয়ার উল্লেখ করেছেন জুনা কাপ বিদেশে রফতানি করতে দেয়া হতো না কারণ এ সমস্ত সুক্ষ্ম কাপড় মোগল দরবারে প্রেরণ করা হতো। রঙ্গ নামে এক প্রকার মসলিনের কথা জেমস টেলর উল্লেখ করেছেন এর ওজনও ছিল ২০ তোলার মতো। মসলিনের এক কাব্যিক ও বর্ণাঢ্য নাম ছিল আব-ই-রওয়ান (স্বচ্ছ জলধারা)। ঢাকার মসলিন কারিগররা প্রবাহিত পানি নাম দিয়ে এর সূক্ষতা ও মসৃণতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। দেশে বিদেশেও ঢাকার আঁবে-ই-রওয়ার অনেক সুনাম ছিল। ইউরোপীয় বণিকরা কম মূল্যের আঁবে-ই-রওয়া কাপড় বিদেশে রফতানি করত। আঁবে-ই-রওয়ান মসলিন লম্বায় ২০ গজ এবং চওড়ায় ১ গজ ছিল এর ওজন ছিল ২০ তোলা। ঢাকাই মসলিনের আরেক বিস্ময়কর সৃষ্টি ছিল মুর্শিবাদের দেওয়ান ও ঢাকার নায়েবে নাজিমদের জন্যে তৈরি সরকার-ই আলী মসলিন। সরকার-ই-আলী নামধারী জায়গীরদারের প্রাপ্য খাজনা থেকে সরকার-ই-আলী মসলিনের মূল্য পরিশোধ করা হতো। সাদা জমিন বিশিষ্ট এই মূল্যবান মসলিনের ওজন ছিল ২০ তালা। সোনারগাঁও ও জঙ্গলবাড়ির তাঁতিরা জঙ্গল খাসসা নামে ২০ তোলা ওজনের মসলিন কাপড় তৈরি করত। শবনাম (ভোর বেলার শিশির) কাব্যিক নামে এক চমৎকার মসলিন উপহার দিয়েছিলেন ঢাকার তাঁতিরা। এ কাপড় এতো সূক্ষ্ম ও মিহি ছিল যে ভোরবেলায় এ কাপড় ঘাসে শুকাতে দিলে শিশির না কাপড় তা বোঝার কোন অবকাশ ছিল না। একখানি শবনামের ওজন ছিল ২০/২২ তোলা। এছাড়া আলিবালি, তন-তরান্দাম, নয়ন সুখ, বদন খাস, সর-বন্দ, সর-বুটি, কামিছ সারিয়া, চারকোনা ও জামদানি। এই সূক্ষ্ম মসলিন প্রতি গজের দাম ৪০০/২০০/২৫০ টাকায় উঠা-নামা করত। পূবেই উল্লেখ করেছি মূল্যবান মসলিন সংগ্রাহকরা সরকারী কর্মকর্তা নিয়োজিত ছিলেন। এ সমস্ত সরকারী কর্মকর্তাদের (১৭২৩-১৭৩৬ খ্রিঃ) কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন জেমস টেলর, শ্রীনাথ, সিরাজ-উদ-দীন মোহাম্মদ গনি, ছালেহ মোহাম্মদ নামে কয়েকজন রাজ কর্মকর্তা ও রাজকর্মচারীর নাম পাওয়া যায় জেমস টেলরের গ্রন্থে। সোনারগাঁওয়ে শেখ গরীবউল্লা নামে এক মসলিন ব্যবসায়ীর কথাও ইতিহাস পাঠে জানা যায়। ১৮ শতকের ইংরেজ কোম্পানির দলিলে এবং টেলরের ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকাই মসলিনের ব্যবসা সম্পর্কে একটি মোটামুটি হিসাব দিয়েছেন।

* দিল্লীর বাদশাহের জন্য সংগ্রহ করা হয় ১ লাখ টাকা মূল্যের মলবুস খাস, জামদানি, আঁবে-ই-রওয়া কাপড়।

* মুর্শিদাবাদের নবাবের জন্য সংগ্রহ করা হয় ৩ লাখ টাকার মসলিন।

* জগৎশেঠের জন্য সংগ্রহ করা হয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মসলিন।

* পাক ভারতের উত্তর পশ্চিাঞ্চলে বিক্রির জন্য ইরানী তুরানি ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করে ১ লাখ টাকার মসলিন।

* পাক ভারতের উত্তর-পশ্চিাঞ্চলে বিক্রির জন্য পাঠান ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মসলিন।

* বসরা, মত্তল, জেদ্দার বাজারে বিক্রির জন্য আর্মেনিয়াান ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করে ৫ লাখ টাকার মসলিন।

* বসরা, জেদ্দা, মত্তল বন্দরে বিক্রি করার জন্যে মোগল ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করে ৪ লাখ টাকার মসলিন।

* পাক ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য হিন্দু ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করে ২ লাখ টাকার মসলিন।

* ইউরোপে চালান দেয়ার জন্য ইংরেজ বণিক কোম্পানি সংগ্রহ করে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার মসলিন। পলাশী যুদ্ধের পর মসলিনের রফতানি অনেক বৃদ্ধি পায় এবং বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকার মসলিন ইংরেজ কোম্পানি ইউরোপে রফতানি করে।

* বিদেশের বাজারে চালান দেয়ার জন্য ইংরেজ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করে দুই লাখ টাকার মসলিন।

* ফরাসী বণিক কোম্পানি ইউরোপে চালান দেয়ার জন্য সংগ্রহ করে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার মসলিন।

* ফরাসী ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীরা বিদেশে চালান দেয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকার মসলিন সংগ্রহ করে।

* ওলন্দাজ বণিক কোম্পানি ইউরোপে চালান দেয়ার জন্য ১ লাখ টাকার মসলিন সংগ্রহ করেছে ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দের ঢাকাই মসলিন বাণিজ্যের যে হিসাব দেয়া হয় তাতে দেখা যায় দিল্লীর বাদশাহ, বাংলার নবাব ও জগৎশেঠের জন্য সাড়ে ৫ লাখ টাকার মসলিন সংগ্রহ করা হয়েছিল। মোগল ব্যবসায়ীরা মোট সাড়ে ৬ লাখ টাকার মসলিন আর্মেনিয়ান, হিন্দু ব্যবসায়ীরা সাত লাখ টাকার মসলিন এবং ইউরোপিয়ানরা মোট সাড়ে ৯ লাখ টাকার মসলিন বিদেশে রফতানি করেছিল। এফবি ব্রাডলি বাটের মতে, মসলিনের স্বর্ণ যুগে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা প্রায় ৫০-৬০ লাখ টাকার ঢাকাই মসলিন ইউরোপে রফতানি করেছিল।

Sunday, March 27, 2016

দানি সম্প্রদায়ের বর্বরতা

0 comments
কখনও শুনেছেন স্বামী মারা গেলেই স্ত্রীর আঙুল কেটে দেওয়া হয় শোক পালনের জন্য? শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এ রকমই এক প্রথা প্রচলিত আছে ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়ার দানি সম্প্রদায়ের মধ্যে। কলকাতার সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা এক প্রতিবেদনে এমন তথ্যই জানিয়েছে।
একজন দানি বিধবা
প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, যখনই পরিবারের কর্তা মারা যান, শোক পালনের জন্য স্ত্রীর দু’হাতের বেশ কয়েকটি আঙুল কেটে দেওয়া হয়। ধারণা, এতে নাকি মৃতের আত্মার শান্তি হয়! আঙুল কাটার আগে নারীর হাত কষে বেঁধে দেওয়া হয় যাতে হাতে রক্তের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। তার পর কুড়ুল দিয়ে আঙুল কেটে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে এই প্রথা সহ্য করতে হয় সেখানকার নারীদের।
দীর্ঘ দিন ধরে নিষ্ঠুর এই প্রথা চলে আসছে দানি সম্প্রদায়ের মধ্যে। ওই দ্বীপে গেলেই আঙুলহীন নারীদের দেখা মিলবে। তবে সম্প্রতি সে দেশের সরকার এই প্রথার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

Sunday, February 28, 2016

বাংলা ভাষার ইতিকথা

0 comments
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষায় আমরা কথা বলি, গান গাই, গল্প লিখি। যে ভাষাটায় আমরা নিত্যদিনের কথা, কাজ, সংস্কৃতিচর্চা করি, সেই ভাষার গল্পটা জানো কি? নিশ্চয়ই ভাবছ, বাংলা ভাষায় আমরা গল্প লিখি। কিন্তু বাংলার গল্প আবার কী? বাংলার গল্প মানে হচ্ছে বাংলা ভাষার উৎপত্তির গল্প, অর্থাৎ আমাদের প্রিয় ভাষাটার জন্মকাহিনী।

অনেক বছর ধরে অনেক পরিবর্তন, পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে আজকের বাংলা ভাষা। এটা সব ভাষার নিয়ম। ভাষাকে তাই তুলনা করা হয় নদীর স্রোতের সাথে, যা চলার পথে গতি পাল্টায়। ভাষাও এমন। মানুষের মুখে মুখে ব্যবহৃত হতে হতে উচ্চারণজনিত কারণে কিছু শব্দ, কিছু ধ্বনি পাল্টে যায়। এক সময় এই পরিবর্তনের কারণে ভাষাটাও পাল্টে যায় অনেকখানি। আর এভাবেই একটা ভাষা থেকে তৈরি হয় এক বা একাধিক নতুন ভাষা।
বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। প্রথমে ধারণা করা হতো, সংস্কৃত থেকে এসেছে বাংলা। কিন্তু সংস্কৃত ছিল লেখার ভাষা, সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা নয়। তাই পরে এই ধারণা পরিবর্তিত হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে নানারকম প্রাকৃত ভাষা প্রচলিত ছিল। এসব ভাষাই ছিল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। যেহেতু এই ভাষাগুলোতে মানুষ কথা বলতো, তাই ধারণা করা হয় প্রাকৃত থেকেই বাংলার জন্ম।
ভারতীয় আর্যভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর একটি শাখা। প্রাকৃত ভাষা এটির একটি স্তর। প্রাকৃত ভাষাও অবশ্য কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। প্রাকৃত অপভ্রংশ তার মধ্যে সবচেয়ে শেষ স্তর।
নানারকম প্রাকৃত অপভ্রংশের মধ্যে একটি হচ্ছে মাগধী প্রাকৃত। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন মনে করেন এই মাগধী ভাষার পূর্বাঞ্চলীয় রূপ থেকেই বাংলা ভাষা সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কাজী দীন মুহাম্মদসহ কয়েকজন ভাষাবিজ্ঞানীর মতে প্রাকৃত অপভ্রংশের পূর্বরূপ গৌড়ী অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার জন্ম।
বাংলা ভাষার তিনটি স্তর।

প্রথম স্তরটি প্রাচীন বাংলা। ৯০০/১০০০-১৪০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ছিল এর সময়কাল। এই স্তরেই লেখা হয়েছিল চর্যাপদ। আমি-তুমি জাতীয় সর্বনামের ব্যবহারও শুরু হয় এখান থেকেই।
বাংলার দ্বিতীয় স্তর মধ্য বাংলা। এর সময়কাল ১৪০০-১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ। চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন লেখা হয় এই স্তরে।
আমরা বর্তমানে যেই ভাষায় কথা বলি এটি বাংলার শেষ স্তর। একে বলা হয় আধুনিক বাংলা। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এখনও পর্যন্ত এই স্তরটি চলছে।
এভাবেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাংলা হয়ে উঠেছে আমাদের আজকের মুখের ভাষা।

লিখেছেন: মীম নোশিন নাওয়াল খান

Saturday, February 1, 2014

বই মেলা

0 comments
আজকের বৃহত্তর বই মেলার শুরুটা ছিল একেবারেই ভিন্ন রকম। ছোট যে বীজ বপন হয়েছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে তা এখন মহিরুহ হয়ে উঠেছে। ক্রমেই বেড়ে চলছে এই প্রাণের রাজত্ব। বইমেলা যা অমর একুশে গ্রন্থমেলা নামেও পরিচিত। বইমেলা'র জন্মদাতা হিসেবে উঠে আসে কয়েককটি নাম। যার মধ্যে রয়েছেন চিত্তরঞ্জন সাহা ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দীন।

যেভাবে শুরু :


বইমেলার কথা প্রথম ভাবতে শুরু করেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দীন। ১৯৬৫ সালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি (তৎকালীন পাবলিক লাইব্রেরি) প্রাঙ্গণে শিশু বইমেলার আয়োজন করেন। এ থেকেই শুরু হয় বইমেলার প্রথম যাত্রা।

তবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে বইমেলার বীজ বপনকারী হিসেবে শোনা যায় মুক্তধারা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জণ সাহাকে। একাই শুরু করেছিলেন। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে একটি চট বিছিয়ে কিছু বই নিয়ে বসেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা।

সময়টা ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র ৫৪ দিন আগে। ঢাকার রাস্তাঘাট, বাজার, হসপিটালে যুদ্ধের দগদগে স্মৃতি তখনও স্পষ্টভাবে লেগে আছে। সবার মনে বিধ্বস্ত সব স্মৃতি। সেই সময়টিতে চিত্তরঞ্জণ দেখেন অন্য রং। আঁকেন অন্য জীবনের ছবি। নতুন বাংলাদেশ গড়ার সময়টাতে চিত্তরঞ্জন এই উর্বর মাটিতে বুনে দিলেন বইমেলার বীজ।

তিনি ওই দিন বাংলা একাডেমি কর্মকর্তাদের কাছে অনুমতি নিয়ে বটতলায় বই নিয়ে বসেছিলেন। টেবিল চেয়ারের আয়োজন ছিল না বলে চট কিনে তাতে বই সাজিয়েছিলেন। ওই দিনই হলো আমাদের বই মেলার উদ্বোধন।

৭১ সালে যুদ্ধের সময় কলকাতায় তখন বাংলাদেশের বহু শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক আশ্রয় নিয়েছেন। কলকাতায় গিয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর সেই সব লেখকদের লেখা বই প্রকাশের উদ্যোগ নেন। মুক্তধারা প্রকাশনীর জন্ম হয়।

ওই ৩২টি বই ছিল বাংলাদেশের জন্মের সময়ে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অভিব্যক্তি। আর কলকাতায় প্রকাশিত ও সেখান থেকে বয়ে আনা ওই বইগুলো ছিল ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির বই মেলায় বিক্রির জন্য আনা প্রথম বই। কলকাতায় যে প্রকাশনা সংস্থা থেকে বইগুলো প্রকাশিত হয়েছিল তার নাম 'মুক্তধারা'। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকেই চিত্তরঞ্জন তার প্রকাশনা সংস্থার এমন নাম বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৭২ সালে শুরু করে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রায় একাই একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলা চালিয়ে যান চিত্তরঞ্জন। ১৯৭৬ সালে অনুপ্রাণিত হয়ে তার সাথে যোগ দেন আরো কয়েকজন। শুরু হয় মেলার বিস্তারের যাত্রা।

এর দু’বছর পর ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী মেলার সাথে বাংলা একাডেমিকে সরাসরি সংযুক্ত করেন। জাতীয় গ্রন্থ উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় এ মেলাটি আয়োজিত হয়। ১৯৭৯ সালে মেলার সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। এ সংস্থাটিও সংগঠিত করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা।

১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা সাহেব যখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, তখন তিনি বাংলা একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন সম্পন্ন করেন। কিন্তু স্বৈরাচারি এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাক তুলে দিলে দুজন ছাত্র নিহত হয়। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর সেই বছর আর বইমেলা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৪ সালে সাড়ম্বরে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়।

এরপর থেকে বিরতিহীন ভাবে চলতে থাকে বই মেলা। এ যাত্রা সময়ের সাথে সাথে আরো গতিময় হয়ে ওঠে। এখন মেলাকে ঘিরেই প্রকাশনা শিল্প শক্ত অবস্থানে দাড়াচ্ছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে এর সুনাম।

মেলা শুধু নিজের প্রসারই নয় পাঠক প্রসারও ঘটাচ্ছে। প্রতিবছরই যেসব অসংখ্য পাঠককে দোলা দিয়ে বইয়ের ভালোবাসায় আটকে রাখে। আরো বেশি বই বান্ধব পাঠক তৈরি হচ্ছে বইমেলায়। লেখকরাও নতুন করে স্বপ্ন বুনেন। পাঠক-লেখক- প্রকাশকদের বুকে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের বইমেলা।

Saturday, November 2, 2013

বস্ত্রহীন বিয়ে

1 comments
“শুভ বিবাহ” শব্দটা শুনলেই যেনো সবার মনটা আনচান করে উঠে। বর-কণে, উৎসব-আনন্দ সহ অনেক কিছুই মিশে রয়েছে বিবাহ শব্দটির মধ্যে। বিয়ে একটি মানবিক বিষয়। মানুষ যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে উঠে তখন সে তার জৈবিক চাহিদা মেটানো ও পারিবারিক কাঠামো তৈরি করার জন্য ধর্মীয় রীতি নীতি অনুযায়ী বিয়ে করে থাকে। মানুষের জন্ম লগ্ন থেকে শুরু করে আজ অবধি বিশ্বে বিয়ে প্রথা প্রচলিত আছে এবং থাকবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নিয়মে বিবাহ সম্পন্ন করা হয়। বিয়েকে ঘিরে উৎসব আমেজও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। বিয়েতে সাধারণত বিয়ের দিন বর ও কণে উভয়ই ঐতিহ্যগত ও ধর্মীয়ভাবে ঝলমলে পোশাক পরিধান করে থাকে।
বর্তমান আধুনিক সমাজে প্রত্যেকটা বিষয় পরিবর্তন হচ্ছে ঠিক তেমনি বিয়ের উৎসবেও এসেছে অনেক পরিবর্তন ও নতুনত্ব। আধুনিক এই বিশ্বে মানুষ সব কিছুতেই একটু ব্যতিক্রম খোজার চেষ্টা করে। ফলে পৃথিবী আধুনিক হচ্ছে নাকি অসভ্য হচ্ছে সেটাও একটি মূল্যবান প্রশ্ন।

আপনারা হয়তো ভাবছেন বিয়ের অনুষ্ঠানে আবার সভ্য-অসভ্যের কথা আসছে কেন? আসছে এই কারণে যে, বিয়েতে ব্যতিক্রম আনার জন্য মানুষ সভ্যতার চূড়ান্ত সীমা লংঘন করে ফেলছে।

আপনি কি কল্পনা করতে পারেন যে, একটি বিয়ে অনুষ্ঠান চলছে আর সেখানে বর কণে পুরো উলঙ্গ হয়ে বসে আছে। হয়তো এমন অবস্থা কল্পনাও করতে পারছেন না। কিন্তু এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে জ্যামাইকাতে। আর এই ঘটনাটি বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বিশ্ব ব্যাপী।

২০১২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী তারিখে জ্যামাইকার সমুদ্র সৈকতে আয়োজন করা হয়েএক নগ্ন বিয়ের উৎসব। যে বিয়ের অনুষ্ঠানে বিয়ে পড়ানো হয় ৯ জোড়া বর কনেকে। যে অনুষ্ঠানটি ছিল খুবই রুচিহীন ও সমালোচনা মুখর। এ দিন বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-কণের পায়ে দামি জুতা, হাতে রিস্টব্যান্ড এবং গলায় টাই আর নেকলেস থাকলেও তাদের শরীরে ছিল না কোনও পোশাক।

শরীরে কোনও পোশাক না থাকলেও যথারীতি কনেদের অনেকের মাথায়ই ছিল ঘোমটা বা অবগুণ্ঠন! আবার দু-একজন কণে মুকুট বা হ্যাটও পরেছিলেন। উলঙ্গ বর-কনেরা যাতে সহজেই সবার চোখে পড়ে সেজন্য তাদের দেহে বাড়তি সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতা বাড়াতে তাদের শরীরে ব্যবহার করা হয়েছিল উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করার পেইন্ট! আর কনেদের হাতে লাগানো হয়েছিল লাল, সাদা আর হলুদ রংয়ের বাহারি ফুল।

নয়টি নগ্ন জুটির আলোচিত-সমালোচিত এ গণবিয়ে অনুষ্ঠিত হয় জামাইকার নেগ্রিল সমুদ্র সৈকতে উন্মুক্ত আকাশের নিচে। এমন নির্লজ্জ ও উদ্ভট নগ্ন বিয়ের আয়োজন করেছিল ‘দ্য হেডোনিজম টু রিসোর্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করার পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে বহন করেছে এই নয় জুটির নগ্ন হয়ে বিয়ে করার যাবতীয় খরচও।

নগ্ন বিয়ের এই অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে অংশগ্রহণকারীদের বাছাই করার জন্য ‘কেন তোমরা নগ্নতার মধ্য দিয়ে দাম্পত্য জীবন শুরু করতে চাও?’ এ প্রশ্নটিসহ আরও কয়েকটি প্রশ্ন করা হয়। এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তরদাতার মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয় ১০০ জুটিকে।

পরে এদের মধ্য থেকে বাছাই করা হয় ভাগ্যবান সেরা ১০ জুটিকে। যাদের প্রদান করা হয় নগ্ন বিয়ের বিশেষ সুযোগ। আনন্দের বিষয় এই যে, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য মোট ১০টি জুটি নির্বাচন করা হলেও পরে একটি জুটির শুভবুদ্ধির উদয় হলে তারা এই অনুষ্ঠান থেকে তাদের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। ফলে অনুষ্ঠানটি নয়টি জুটিকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

নগ্ন বিয়েতে অংশ গ্রহণ করে এই নয় জুটি নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান ভেবেছে। অবশ্য বিশ্বের বিবেকবান মানুষরা ভেবেছে তারাই সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব। এই বিয়েকে ঘিরে জ্যামাইকা সহ সমগ্র বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিবেকবান মানুষেরা আশা করেন আধুনিকতা বা ব্যতিক্রমতার নামে ভবিষ্যতে কেউ যেনো আর কোনও দিন এই ধরনের নির্লজ্জ কাজে অংশ গ্রহণ বা আয়োজন না করে।

Dhaka Times 24

Sunday, November 4, 2012

হস্তশিল্প

0 comments
হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্প ছিল আদি ও মধ্যযুগীয় বাংলার গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। হস্তশিল্প হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল বয়ন, ধাতব পদার্থের কাজ, অলংকার, বিশেষ করে রুপার তৈরি অলংকার, কাঠের কাজ, বেত এবং বাঁশের কাজ, মাটি ও মৃৎপাত্র। পরবর্তী সময়ে হস্তশিল্প পণ্য তৈরিতে পাট এবং চামড়া প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। বাংলাদেশের হস্তশিল্প পণ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সৌন্দর্য এবং নৈপুণ্য বিদ্যমান। হস্তশিল্প হাতের তৈরি নানাবিধ পণ্য উৎপাদনের ক্ষুদ্রায়তন ইউনিট। গৃহের মালিক নিজে এবং পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় বা কয়েকজন বেতনভুক কর্মচারী নিয়ে যন্ত্র বা যন্ত্রপাতি ছাড়া এসব পণ্য প্রস্তুত করে থাকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, গাঙ্গেয় অববাহিকার মসলিন কাপড় রোমান এবং গ্রিক সাম্রাজ্য পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। চীনা এবং আরব পর্যটকরাও বঙ্গদেশে উৎপাদিত উচ্চমানের সুতি এবং রেশমি কাপড়ের কথা জানতেন। ষোড়শ শতাব্দী থেকে বঙ্গদেশের উচ্চমানের হাতেবোনা বস্ত্র, উন্নতমানের গজদন্ত, রুপা এবং অন্যান্য ধাতুর তৈরি কারুপণ্য মোগল দরবারেও সমাদৃত হয়েছিল। মোগল সম্রাটরা শিল্প-কারুপণ্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। হস্তশিল্প সৃষ্টি হয় চিত্রশিল্পী, ভাস্কর এবং কারুশিল্পীর কর্ম থেকে যাদের শিল্পী হিসেবে বস্তুত কোনো প্রশিক্ষণই থাকে না। তাদের সৃষ্ট হস্তশিল্প দেশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে জাদুঘরে মূল্যবান চিত্রকর্ম হিসেবে রক্ষিত না হয়ে বরং অন্য লোকদের জন্য ব্যবহারিক উপযোগ সৃষ্টি করে। শিল্পীরা সাধারণ লোকের প্রয়োজন মেটানোর পর ধনী ও অভিজাত লোকদের পৃষ্ঠপোষকতায় কারুশিল্পীর মর্যাদা অর্জন করে। হস্তশিল্পে উৎপাদিত পণ্যগুলো টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব হয়ে থাকে। বাংলাদেশে কয়েক লাখ মানুষের পেশা হস্তশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
গ্রন্থনা : ফারজানা শ্রাবন্ত

নকশি পিঠা

0 comments
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরাঞ্চলে নানা ধরনের পিঠা তৈরি হয়। নকশি পিঠা তার অন্যতম। পিঠার গায়ে যখন বিভিন্ন ধরনের নকশা আঁকা হয় অথবা ছাঁচে ফেলে পিঠাকে চিত্রিত করা হয়, তখন তাকে বলা হয় নকশি পিঠা। নকশি পিঠা বা নকশা করা পিঠা এক ধরনের লোকশিল্প। পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব-অনুষ্ঠান যেমন_অতিথি আপ্যায়ন, বর-কনের বাড়িতে লেনদেন, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে উপহার-উপঢৌকন পাঠানো, ঈদ, পূজা-পার্বণ, শবেবরাত, মহররম, খতনা, বিবাহ, নবান্ন, পৌষ-পার্বণ, প্রিয়জনের মনোরঞ্জন, অন্নপ্রাশন, আকিকা প্রভৃতি উপলক্ষে নানা স্বাদ, গন্ধ ও আকারের নকশি পিঠা তৈরি করা হয়। নকশি পিঠা তৈরির জন্য প্রথমে আতপ চালের গুঁড়া বা আটা সিদ্ধ করা হয়। পরে সিদ্ধ চালের গুঁড়া বা আটা থেকে রুটি করে তার ওপর গাছ, লতাপাতা ইত্যাদির নকশা তোলা হয়। খেজুর কাঁটা, খোঁপার কাঁটা, সূচ, পাটকাঠি, খড়কা ইত্যাদির সাহায্যে হাতে দাগ কেটে কেটে নকশাগুলো তোলা হয়। হাতের পরিবর্তে ছাঁচের সাহায্যেও পিঠাকে নকশাযুক্ত করা যায়। ছাঁচগুলো সাধারণত মাটি, পাথর, কাঠ বা ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি। এসব ছাঁচের ভেতরের দিকে গাছ, ফুল, লতাপাতা, মাছ, পাখি প্রভৃতির নকশা অঙ্কিত থাকে। সব ধরনের পিঠায় নকশা আঁকা হয় না। সাধারণত পুলিপিঠা ও পাকোয়ান বা তেলপিঠা, যাকে ফুলপিঠাও বলে, তাতে নকশা করা হয়। নারিকেলের সঙ্গে গুড় বা চিনি মিশিয়ে পুলিপিঠা তৈরি করা হয়। পুলিপিঠার এক পাশে হাতের আঙুল ও নখের সাহায্যে নকশা তোলা হয়, যা দেখতে ফুলের পাপড়ির মতো। পাকোয়ান পিঠায় বিচিত্র নকশা অঙ্কনে নৈপুণ্যের জন্য বৃহত্তর ময়মনসিংহের নারীদের খ্যাতি রয়েছে। নকশার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পিঠার বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়। যেমন_শঙ্খলতা, কাজললতা, চিরল বা চিরণপাতা, হিজলপাতা, সজনেপাতা, উড়িয়াফুল, বেঁট বা ভ্যাট ফুল, পদ্মদিঘি, সাগরদিঘি, সরপুস, চম্পাবরণ, কন্যামুখ, জামাইমুখ, জামাইমুচড়া, সতীনমুচড়া প্রভৃতি। পিঠার এই নামগুলো বিশেষ ভাবব্যঞ্জক।

Saturday, September 29, 2012

মহাবীর রুস্তম

0 comments
মহাকবি ফেরদৌসীর বিখ্যাত কাহিনীকাব্য 'শাহনামা'র সবচেয়ে আলোচিত কাহিনী 'সোহরাব-রুস্তম'। রুস্তম ইরানের লোককাহিনীর সবচেয়ে আলোচিত এক চরিত্র। জন্মগতভাবেই রুস্তম অনেক ব্যতিক্রমী গুণসম্পন্ন। লোককথায় তিনি চিরকালের কিংবদন্তির মহাবীররূপে উপস্থাপিত হয়েছেন। আর তাকে অমরত্ব দান করেছে দশম শতাব্দীর বিখ্যাত মহাকবি ফেরদৌসীর 'শাহনামা'। ইসলাম-পরবর্তী সময়ে লোককাহিনী ও ইতিহাসে পাওয়া যায় তার বর্ণনা।

মহাবীর রুস্তম ও আরেক বীর সোহরাব। কিন্তু জন্মের পর থেকে সোহরাব জানেন না তার পিতার পরিচয়। রুস্তম যে তারই জন্মদাতা এ কথা মা তাহমিনাও তাকে কখনো বলেননি। একদিন ঘটনাক্রমে সোহরাব যখন জানতে পারলেন তিনি মহাবীর রুস্তমের পুত্র, তখন পিতাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ইরানের বাদশাহ কায়কাউসের গভীর যড়যন্ত্রে পিতা-পুত্রের দেখা হয় না বরং প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য পিতা-পুত্রকে যুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়। দুজনে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। এক সময় স্তিমিত হয়ে এলো সোহরাবের ক্ষমতা। মহাবীর রুস্তম চড়ে বসলেন সোহরাবের বুকে। বুকের মাঝখানে চালিয়ে দিলেন ধারালো খঞ্জর। মৃত্যুর মুখোমুখি রক্তাক্ত সোহরাব। কিন্তু এমন সময় রুস্তম দেখলেন, সোহরাবের বাহুতে বাঁধা বাজুবন্দ তার খুব চেনা। সন্তান হওয়ার সংবাদে তিনি স্ত্রীর কাছে এ বাজুবন্দই পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু স্ত্রী তাকে কন্যা সন্তান হওয়ার সংবাদ দিয়েছিল। তাহলে এই বাজুবন্দ সোহরাবের হাতে কেন? দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন রুস্তম। এরপর উদ্ঘাটিত হয় আসল সত্য। মহাবীর রুস্তম যাকে খঞ্জরবিদ্ধ করেছেন, সেই সোহরাব আর কেউ নয়, তারই সন্তান। বিশ্বজুড়ে মানুষের মুখে মুখে বছরের পর বছর ধরে এ গল্পটির চর্চা হয়ে আসছে। এই কাহিনী এতই জনপ্রিয় যে, লোকজন একে সত্য হিসেবেই ধরে নিয়েছে। যেন ইতিহাসের কোনো অবিচ্ছেদ্য অংশ। সত্যিকার অর্থে এটি হচ্ছে দশম শতাব্দীতে রচিত মহাকবি ফেরদৌসীর বিখ্যাত কাহিনীকাব্য 'শাহনামা'র সবচেয়ে আলোচিত কাহিনী 'সোহরাব-রুস্তম'। রুস্তম ইরানের লোককাহিনীর সবচেয়ে আলোচিত এক চরিত্র। তার বাবার নাম জাল এবং মায়ের নাম রদুবা। জন্মগতভাবেই রুস্তম অনেক ব্যতিক্রমী গুণসম্পন্ন। তার সেই গুণগুলোই তাকে আলাদা ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্থান দিয়েছে লোককথায়। লোককথায় তিনি চিরকালের কিংবদন্তির মহাবীররূপে উপস্থাপিত হয়েছেন। ইসলাম-পরবর্তী সময়ে লোককাহিনী ও ইতিহাসেও পাওয়া যায় তার র্বণনা। ফেরদৌসীর শাহনামায় বিচিত্র সব ঘটনা ঘটিয়ে ব্যতিক্রমী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রুস্তম। কৈশরে সে তার রাজা মেনুচির সাদা হাতিকে হত্যা করেছিল শুধু গজা দিয়ে। নারিমানের ছেলে সাম তার দাদা। আর তার কাছ থেকেই রুস্তম উত্তরাধিকার সূত্রে বীরত্বের অধিকারী। পারস্যের লোককাহিনী মতে, মহাবীর রুস্তম বিয়ে করেন রাজকন্যা রদুবাকে। এক সময় রদুবার গর্ভে সন্তান আসে। খুশিতে আত্দহারা হয়ে যান রুস্তম। কিন্তু রদুবা যখন প্রসব বেদনায় কাতর, তখন যুদ্ধে যেতে হয় রুস্তমকে। রাজ তত্ত্বাবধানে থাকে রদুবা। রুস্তম যাওয়ার সময় বলে যায় সন্তান হওয়ার খবর যেন তাকে জানানো হয়। কিন্তু রদুবা কন্যা সন্তান হওয়ার মিথ্যা সংবাদ দেয়। কারণ পুত্র সন্তান হওয়ার সংবাদ দিলে রুস্তম তাকে নিয়ে যাবে, যুদ্ধবিদ্যা শেখাবে এবং হয়তো সে যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা যাবে। এমন আশঙ্কা করেই রদুবা লুকিয়েছিল পুত্র সন্তানের খবর। এমন ঘটনার কারণেই ঘটে গেছে সোহরাব-রুস্তমের সেই ট্র্যাজেডি। রুস্তম তার নায়কোচিত অভিযান চালিয়ে কোহেকাফের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিলেন। রুস্তমের আরও একটি বিখ্যাত কৃতিত্ব হচ্ছে পারস্যের অপদেবতা 'অকভান'-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। অকভান দেখতে কিছুটা বন্য গাধার মতো, যে দ্রুত ভোল পাল্টে মানুষের সর্বস্ব লুট করত। এ অপদেবতার অত্যাচারে রাজ্যের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। চিন্তিত হয়ে পড়েন রাজা। শেষে এর প্রতিকারের ভার মহাবীর রুস্তমকে দেওয়া হয়। রুস্তম তাকে হত্যা করে প্রজাদের বিপদমুক্ত করেন। এ ছাড়া রুস্তম ড্রাগনের সঙ্গেও যুদ্ধ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। এসব গল্প লোককাহিনী হলেও মানুষের কাছে এর আবেদন চিরন্তন।

উৎসঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

অদ্ভুত যত কুসংস্কার

0 comments
বিশ্বের আধুনিকতম দেশ থেকে শুরু করে দরিদ্রতম দেশ পর্যন্ত সর্বত্রই বিচিত্র সব কুসংস্কারের প্রচলন রয়েছে। আমাদের দেশেও বিভিন্ন অঞ্চলে বহু যুক্তিহীন ভ্রান্ত ধারণা বা বিশ্বাসের প্রচলন রয়েছে যেগুলোকে কুসংস্কার বলা যায়। চলুন এরকম আরও কিছু কুসংস্কার সম্পর্কে জেনে নিই।

*ছোট বাচ্চাদের হাতে লোহা পরালে ভূত-জিনে ধরবে না।

*রুমাল, ছাতা, হাতঘড়ি ইত্যাদি কাউকে ধারস্বরূপ দেওয়া যাবে না।

*হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে দুর্ভোগ আছে।

*হাত থেকে প্লেট পড়ে গেলে মেহমান আসবে।

*নতুন স্ত্রী কোনো ভালো কাজ করলে শুভ লক্ষণ।

*তিন রাস্তার মোড়ে বসতে নেই।

*স্বামীর নাম বলা যাবে না এতে অমঙ্গল হয়।

*বাছুরের গলায় জুতার টুকরা ঝুলালে কারও কুদৃষ্টি থেকে বাঁচা যায়।

*খাবার সময় যদি কারও ঢেঁকুর আসে বা মাথার তালুতে উঠে যায়, তখন একজন আরেকজনকে বলে তোকে যেন কেউ স্মরণ করছে বা বলা হয় তোকে গালি দিচ্ছে।

কাক ডাকলে বিপদ আসবে।

*শুকুন ডাকলে মানুষ মারা যাবে।

*পেঁচা ডাকলে বিপদ আসবে।

*দুজনে ঘরে বসে কোথাও কথা বলতে লাগলে হঠাৎ টিকটিকির আওয়াজ শোনা যায়, তখন একজন অন্যজনকে বলে উঠে 'তোর কথা সত্য, টিকটিকি ঠিক ঠিক বলেছে।'

*একজন অন্যজনের মাথায় টোকা খেলে দ্বিতীয় বার টোকা দিতে হবে, একবার টোকা খাওয়া যাবে না। নতুবা মাথায় ব্যথা হবে/শিং উঠবে।

*ভাত প্লেটে নেওয়ার সময় একবার নিতে নেই।

*নতুন স্ত্রীকে স্বামীর বাড়িতে প্রথম পর্যায়ে আড়াই দিন থাকতে হবে।

*পাতিলের মধ্যে খাবার খেলে মেয়ে সন্তান হবে।

*পোড়া খাবার খেলে সাঁতার শিখবে।


*বিড়াল মারলে আড়াই কেজি লবণ দিতে হবে।

*হঠাৎ বাম চোখ কাঁপলে দুঃখ আসে।

*খালি ঘরে সন্ধ্যার সময় বাতি দিতে হয়। না হলে ঘরে বিপদ আসে।

*রাতের বেলা কাউকে সুই-সুতা দিতে নেই।

*রাতে বাঁশ কাটা যাবে না।

*দোকানের প্রথম কাস্টমার ফেরত দিতে নেই।

ঘির থেকে বের হয়ে বিধবা নারী চোখে পড়লে যাত্রা অশুভ হবে।

* গেঞ্জি ও গামছা ছিঁড়ে গেলে সেলাই করতে নেই।

*গোসলের পর শরীরে তেল মাখার আগে কোনো কিছু খেতে নেই।

মিহিলার পেটে বাচ্চা থাকলে কিছু কাটাকাটি বা জবাই করা যাবে না।

*আশ্বিন মাসে নারী বিধবা হলে আর কোনোদিন বিবাহ হবে না।

*ডান হাতের তালু চুলকালে টাকা আসবে। আর বাম হাতের তালু চুলকালে বিপদ আসবে।

*বিধবা নারীকে সাদা কাপড় পরতে হবে।

*ভাঙা আয়না দিয়ে চেহারা দেখা যাবে না। তাতে চেহারা নষ্ট হয়ে যাবে।

*নতুন বউকে নরম জায়গায় বসতে দিলে মেজাজ নরম থাকবে।

* অনুপস্থিত কাউকে নিয়ে কথা বলার সময় হুট করে চলে আসলে, কেউ কেউ বলে উঠে 'তোর হায়াত আছে।' কারণ একটু আগেই তোর কথা বলছিলাম।

পিরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে ডিম খাওয়া যাবে না। তাহলে পরীক্ষায় ডিম (গোল্লা) পাবে।

*বাড়ি থেকে কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলে সে সময় বাড়ির কেউ পেছন থেকে ডাকলে অমঙ্গল হয়।

রাস নৃত্য

0 comments

মণিপুরীদের সবচেয়ে প্রধান উৎসব রাসমেলায় যে নৃত্য পরিবেশন করা হয় সেটাই রাসনৃত্য নামে পরিচিত। প্রতিবছর কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালন করা হয়। রাসনৃত্য মণিপুরী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধ্রুপদী ধারার এক অনন্য সৃষ্টি। মহারাস, বসন্ত রাস, কুঞ্জরাস, দিব্যরাস ও নিত্যরাস-রাসনৃত্য_এই পাঁচ ভাগে বিভক্ত। রাসনৃত্যে সাধারণত রাধা ও কৃষ্ণের ভূমিকা দেওয়া হয় শিশুদের, যাদের বয়স পাঁচের কম। মণিপুরীদের বিশ্বাস, এ বয়সের পর শিশুদের দৈবশক্তি লোপ পেয়ে যায়। তবে প্রকৃত নাটনৃত্য ও গীত পরিবেশন করে তরুণীরা, যারা রাধার সহচরী হিসেবে মঞ্চে আসে। রাসনৃত্যের মাধ্যমে ভক্ত-শিল্পীরা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আবেগসূত্রে মিলিত হয়। বাংলা, মৈথিলী, ব্রজবুলি ও মৈতৈ কবিদের পদাবলি থেকে রাসনৃত্যের গীত গাওয়া হয়। মণিপুরী নৃত্যকে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে বেড়াতে এসে এ নাচের কোমল আঙ্গিক দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। পরে তিনি তাঁর নৃত্যনাট্যে মণিপুরী নৃত্য ব্যবহার করেন। রাস মণিপুরী আদিবাসীরা প্রতিবছর যথানিয়মে উৎসব ভক্তিসহকারে উদ্যাপন করে। উৎসবের সময় দেশ-বিদেশ থেকে আগত দর্শনার্থীদের ভিড়ে মণিপুরীদের এলাকা সরগরম হয়ে ওঠে। রাধা-কৃষ্ণের প্রণয় উপজীব্য করে রাসনৃত্য শুধু মণিপুরী সমাজে নয়, পুরো সাংস্কৃতিকজগতেই এটি এখন পছন্দের একটি নৃত্য।

Tuesday, September 25, 2012

টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি

0 comments
সুপ্রাচীন কাল থেকে টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগররা তাদের বংশ পরম্পরায় তৈরি করছেন তাঁতের নানা জাতের কাপড়। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাং- এর ভ্রমণ কাহিনীতে টাঙ্গাইলের বস্ত্র শিল্প অর্থাৎ তাঁত শিল্পের উল্লেখ রয়েছে। সে দিক থেকে বলা যায় এটি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। বর্তমানে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির জন্যই টাঙ্গাইলের সুনাম বা পরিচিতি দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী।

তাঁত শিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে টাঙ্গাইলের সফট সিল্ক ও কটন শাড়ি। এই শাড়ির বুনন ও ডিজাইন দৃষ্টি কাড়ে। টাঙ্গাইলের শাড়ির বৈশিষ্ট্য হলো- পাড় বা কিনারের কারু কাজ। বিদেশী বণিক চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মসলিন কাপড় কালের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। কিন্তু তার সার্থক উত্তরাধিকারী হয়ে আজও টিকে রয়েছে টাঙ্গাইলের জামদানী, বেনারসী ও তাঁতের শাড়ি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরাই হচ্ছে টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি অর্থাৎ আদিকাল থেকেই এরা তন্তুবায়ী গোত্রের লোক। শুরুতে এরা সিন্ধু অববাহিকা থেকে পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ হয়ে চলে আসেন বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে। আবহাওয়া অনেকাংশে প্রতিকূল দেখে বসাকরা দু’দলে ভাগ হয়ে একদল চলে আসে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, অন্যদল ঢাকার ধামরাইয়ে। তবে এদের কিছু অংশ সিল্কের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজশাহীতেই থেকে যায়। তবে আরো ভালো জায়গায় খোঁজ করতে করতে অনেক বসাক টাঙ্গাইলে এসে বসতি স্থাপন করেন। এখানকার আবহাওয়া তাদের জন্য অনকূল হওয়াতে পুরোদমে তাঁত বোনার কাজে লেগে পড়েন। টাঙ্গাইলে বংশানুক্রমে যুগের পর যুগ তারা তাঁত বুনে আসছেন। এক কালে টাঙ্গাইলে বেশির ভাগ এলাকা জুড়ে বসাক শ্রেণীর বসবাস ছিলো, তারা বসাক সমিতির মাধ্যমে অনভিজ্ঞ তাঁতিদেরকে প্রশিক্ষণ দান ও কাপড়ের মান নিয়ন্ত্রন করতেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগ ও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর অনেক বসাক তাঁতি ভারত চলে যান। এ সময় বসাক ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও তাঁত শিল্পের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। তারা বসাক তাঁতিদের মতোই দক্ষ হয়ে উঠেন।

টাঙ্গাইল জেলার ১১টি উপজেলা আর ১টি থানার মধ্যে টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী, নাগরপুর, সখীপুর উপজেলা হচ্ছে তাঁতবহুল এলাকা। এছাড়া গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলার কিছু কিছু গ্রামে তাঁত শিল্প আছে। এ সকল গ্রামে দিন-রাত শোনা যায় মাকুর মনোমুদ্ধকর খটখট শব্দ। মাকুর খটখটির পাশাপাশি তাঁতিদের ব্যতিব্যস্ত নিরস্তর হাতে নিপুর শাড়ি বোনার দৃশ্য ও সত্যিই মনোমুগ্ধকর।


টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি তৈরি করতে হাতের কাজ করা হয় খুব দরদ দিয়ে, গভীর মনোসংযোগের সাথে অত্যন্ত সুক্ষ্ণ ও সুদৃশ্য ভাবে। পুরুষেরা তাঁত বোনে; আর চরকাকাটা, রঙকরা, জরির কাজে সহযোগিতা করে বাড়ির মহিলারা। তাঁতিরা মনের রঙ মিশিয়ে শাড়ির জমিনে শিল্প সম্মতভাবে নানা ডিজাইন করে বা নকশা আঁকে, ফুল তোলে।

টাঙ্গাইলে তৈরি করা হয় নানা রং ও ডিজাইনের নানা নামের শাড়ি। যেমন- জামদানী বা সফ্ট সিল্ক, হাফ সিল্ক, টাঙ্গাইল বি.টি, বালুচরি, জরিপাড়, হাজারবুটি, সূতিপাড়, কটকি, স্বর্ণচুড়, ইককাত, আনারকলি, দেবদাস, কুমকুম, সানন্দা, নীলাম্বরী, ময়ুরকন্ঠী এবং সাধারণ মানের শাড়ি।

শাড়ির বিভিন্ন নাম ও মান, হাতের কাজ, শাড়ির জমিনের রঙভেদে দাম ও ভিন্ন রকম-সর্বনিম্ন দু’শত টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়ে থাকে। এর মধ্যে জামদানি বা সফ্ট সিল্কের দাম সবচেয়ে বেশি। জামদানি শাড়ি তৈরি করা হয় আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন ভাবে।

টাঙ্গাইল তাঁতের প্রধান হাট হচ্ছে মূল শহর থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বাজিতপুর। বাজিতপুরে সপ্তাহের প্রতি সোম ও শুক্রবার হাট বসে। ভোর রাত হতে হাট শুরু হয়, সকাল ৯-১০টা পর্যন্ত চলে হাটের ব্যতিব্যস্ততা এবং বেচাকেনা। এ হাটের বেশির ভাগ ক্রেতারাই মহাজন শ্রেণীর। মহাজনরা এই হাট থেকে পাইকারি দরে কাপড় কিনে নিয়ে সারা দেশের বিভিন্ন বড় বড় মার্কেটে, শপিং মলে, ফ্যাশন হাউস গুলোতে সাপ্লাই দেন। মহাজনদের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও আমলাদের স্ত্রী-কন্যারাও এ হাট থেকে তাদের পছন্দের শাড়ী কিনে নিয়ে যান। তবে ঢাকা ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ভিত্তিক ফ্যাশন হাউস গুলোই টাঙ্গাইল শাড়ির বড় ক্রেতা ও সরবরাহকারী।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, যেমন- ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, জাপান, সৌদিআরব, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যসহ পশ্চিম বাংলায় টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির ব্যাপক কদর থাকলেও এ শাড়ি আন্তর্জাতিক বাজারে মার খাচ্ছে নানা কারণে-
(১) দামের জন্য (কাঁচামালের সরবরাহের সহজলভ্যতা না থাকা, কাঁচামালসহ তাঁত মেশিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে টাঙ্গাইল শাড়ি উৎপাদন খরচ বেশি পড়ে যায়)।
(২) ভারতীয় শাড়ির আগ্রাসন (সেখানে কাঁচামালের সহজলভ্যতা ও সূতার স্বল্প মূল্যের জন্য টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ির চেয়ে ভারতের শাড়ি দামে সস্তা হয়ে থাকে বিধায় অনেক ক্রেতাই সে দিকে ঝুকে পড়েছে)।
(৩) টাঙ্গাইল শাড়ি বিপণন ব্যবস্থাটি মহাজনি চক্রের হাতে বন্দি, ফলে বিপণন ব্যবস্থা সুষ্ঠু ভাবে পরিচালিত হচ্ছে না।
এ ছাড়া দেশ ভাগ, পাকিস্তান-ভারত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধের পর টাঙ্গাইল ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়া বসাক তাঁতিরা সেখানে টাঙ্গাইল শাড়ির কারিকুলামে যে শাড়ি তৈরি করছে তা টাঙ্গাইল শাড়ির নাম ভাঙিয়ে বিশ্ববাজার দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে এতো প্রতিকূলতার পরেও টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি তার হারানো বাজার পুনরুদ্ধারে সক্ষম হচ্ছে। কারণ টাঙ্গাইল শাড়ি মানেই ভিন্ন সূতায়, আলাদা তাঁতে তৈরি আলাদা বৈশিষ্ট্যের শাড়ি। এর নকশা, বুনন, ও রংয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্রতা। এ শাড়ি নরম, মোলায়েম, পরতে আরাম এবং টেকসই। এছাড়া সময় ও চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে টাঙ্গাইল শাড়ির আকর্ষণ ও নক্শার ব্যঞ্জনা।

জামদানি শাড়ি

0 comments

যুগ যুগ ধরে জামদানি শাড়ি বাঙালি নারীর কাছে অতি পরিচিত একটি পোশাক। প্রাচীনকালের মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী এই জামদানি শাড়ি মূলত কার্পাস তুলা দিয়ে তৈরি এক ধরনের সূক্ষ্ম বস্ত্র। মসলিনের ওপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয় আর নকশা বোনার পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে করোলা, ময়ূর প্যাচপাড়, চন্দ্রপাড়, দুবলা জাল, সাবু দানা ইত্যাদি নামকরণ করা হয়ে থাকে। জামদানির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় আনুমানিক ৩০০ খ্রিস্টাব্দে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে। ১৭০০ শতাব্দীতে জামদানি দিয়ে নকশাওয়ালা শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। এ ছাড়া নেপালের আঞ্চলিক পোশাক রাঙ্গার জন্যও জামদানি ব্যবহৃত হতো। বিগত সময়গুলো জামদানি শিল্প বেশ দুর্যোগপূর্ণ সময় পার করেছে। মোগল আমলে সম্রাট ও তাঁদের রাজ কর্মচারীদের এই শিল্পের প্রতি অমনোযোগিতা এবং ইংরেজ শাসনামলে শিল্প বিপ্লবের ফলে জামদানি শিল্প তার ঐতিহ্য হারাতে বসে। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে ঐতিহ্যের ধারক জামদানি শিল্প ও শিল্পীদের বাঁচাতে সরকার ঢাকার ডেমরায় জামদানি পল্লীর তাঁতিদের আর্থিক সহায়তা করে এবং ১৯৯২ সালে দক্ষিণ রূপসী গ্রামে জামদানি পল্লী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থাকে (বিসিক) দায়িত্ব দেয়। তবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বর্তমানে জামদানি শিল্প অনেকটাই তার পুরনো ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে। শাড়ি ছাড়াও সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, ব্যাগ ইত্যাদি হিসেবে বর্তমানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জামদানির ব্যাপক চাহিদা বাড়ায় এবং বাজারে এর উচ্চমূল্য নতুন করে বাংলাদেশে এই শিল্পের গতি সঞ্চার করেছে।

Friday, August 17, 2012

ঢাকার মসলিনের ইতিহাস

0 comments
চারশো বছরেরও বেশি বয়স শহরটির। কিন্তু এর ঐতিহ্যকে হাজার বছরের ঐতিহ্য বলা চলে নিঃসন্দেহে। স্থাপত্য-সংস্কৃতি- সংগীত-রীতি সবকিছুতেই সমৃদ্ধ এই নগর। প্রাচীন ঢাকার আরেক বিস্ময় ছিল এর বস্ত্রশিল্প। 'সিলসিলাতি তাওয়ারিখের' ইতিহাসবিদ সোলায়মান উল্লেখ করেছেন বাংলার একপ্রকার সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র সেখানকার মুসলিম তাঁতিরা বয়ন করেন যা একটি আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে বহন করা যায়।

ঢাকার ঐতিহ্য বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকাই বস্ত্রের জন্য। এই বস্ত্রশিল্প মূলত মোগলদের পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ণতা লাভ করেছিল। রকমারি বস্ত্রশিল্পের মাঝে এদেশের চারু ও কারুশিল্পীদের সৃষ্ট আপন মনের মাধুরী মেশানো মসলিন বস্ত্র ছিল প্রধান। মসলিন তার সূক্ষ্মতা ও রমণীমোহন পেলবতার জন্য জয় করে নিয়েছিল সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, নায়েবে নাজিম, শাহজাদা-শাহজাদীদের হৃদয়। সূক্ষ্ম বস্ত্রের জন্য প্রাচীন বাংলার গৌরব ছিল অবশ্য প্রাক-মুসলিম যুগেই। ওই সময়ের ঢাকাই বস্ত্রের ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন হলেও মধ্যযুগীয় বাংলার মুসলিম সুলতানদের আমলে মসলিন বিষয়ক কথকতা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। ত্রয়োদশ শতকে বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা যখন সোনারগাঁও আসেন তখন তিনি সোনারগাঁওয়ের মুসলিম তাঁতিদের বয়নকৃত সূক্ষ্ম বস্ত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। চতুর্দশ শতকে গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে চৈনিক পরিব্রাজকরা কংসুলোর নেতৃত্বে সোনারগাঁও, পাণ্ডুয়া ভ্রমণ করেছিলেন। চীনা দূতদের মালদহের আম খাওয়ানোর পাশাপাশি সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র উপহার দেওয়া হয়েছিল। চীনাদের ইতিহাস মিংশরে বাংলার মসলিনের কথা উল্লেখ আছে। চীনা দূতরা বাংলার মুসলিম কারিগরদের বয়নকৃত কয়েক পদের বস্ত্রের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এরও আগে আরবীয় বণিক, ঐতিহাসিক সোলায়মানের নবম শতাব্দীতে লেখা 'সিলসিলাতি-তাওয়ারিখের' ইতিহাসবিদ সোলায়মান উল্লেখ করেছেন বাংলার একপ্রকার সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র সেখানকার মুসলিম তাঁতিরা বয়ন করেন যা একটি আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে বহন করা যায়। এ সূত্র থেকেই প্রমাণ মেলে বাংলার মসলিনের নান্দনিক আকর্ষণ হাজার বছর আগেই আরব বিশ্বে পেঁৗছে যায়। সে সময় জেদ্দা, বসরা, মশুল বন্দরেও ব্যবসায়ীদের আরাধ্য বস্ত্র হিসেবে পরিচিতি পায় বাংলার মসলিন। তবে সে সময় বাংলার সূক্ষ্ম বস্ত্র কি নামে পরিচিত ছিল তা জানা যায়নি। সপ্তদশ শতকে ইংরেজদের কাছে ঢাকাই বস্ত্র পরিচিতি লাভ করে 'মসলিন' হিসেবে। ইংরেজরা কেনইবা ঢাকাই বস্ত্রের নাম 'মসলিন' দিয়েছিলেন তার কারণও জানা যায় না। মসলিন গবেষকরা ধারণা করেন ইরাকের 'মোসুল' বন্দরে বাংলার বস্ত্রের উপস্থিতির কারণে বাংলার বস্ত্র 'মসলিন' আখ্যায়িত হতে পারে। বাংলার বস্ত্রের 'মসলিন' নামকরণ যেভাবেই হোক না কেন মসলিনের আকর্ষণীয় ও রুচিস্নিগ্ধ নামের আড়ালে রাজসিক আভিজাত্যের বর্ণাঢ্য ছাপ পাওয়া যায়। মলমল খাস, মলবুস খাস নামক মসলিন ছিল শ্রেষ্ঠ। 'অাঁবে-ই-রওয়া' নামে এক ধরনের উৎকৃষ্ট মসলিন সোনারগাঁও, ঢাকা, জঙ্গলবাড়ি, বাজিতপুর, তিতাবাদির মুসলিম কারিগররা বয়ন করত। 'অাঁবে-ই-রওয়া' ফারসি শব্দ, অর্থ (প্রবাহিত স্বচ্ছ রজতধারা) 'শাবনাম' মসলিনের অর্থ ভোরের শিশির। মলমল খাস, মলবুস খাস, অাঁবে-ই-রওয়া, শাবনাম, ঝুনা, বদনখাস, আলিবালি, শরবন্দ, শরবেত হরেক পদের মসলিন তৈরিতে মুসলিম কারিগরদের সুনাম ছিল। উপরোক্ত বস্ত্রগুলোর বর্ণাঢ্য নামের কারিশমাই প্রমাণ করে এই বস্ত্রগুলো নির্মাণের পেছনে রাষ্ট্রের উঁচুস্তরের লোকজনের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা সর্বোপরি পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। এ নামগুলো ছিল মুসলিম রাজন্যদের দেওয়া, তাতে কি সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে। মধ্যযুগীয় ইতিহাসের পণ্ডিত ডঙ্ আবদুল করিম এবং তার পাশাপাশি ইংরেজ ঐতিহাসিকরাও দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করেছেন মসলিন বয়ন শিল্পে ঢাকা, সোনারগাঁও, তিতাবাদি, জঙ্গলবাড়ি, ধামরাই, বাজিতপুরের মুসলিম কারিগরদের বিশেষ অবদান ছিল। শুধু মসলিন বয়ন শিল্পই নয়, মসলিন কাপড়কে আকর্ষণীয় ও বর্ণাঢ্য করে তোলার জন্য সোনা-রূপার সূক্ষ্ম কারুকাজের শিল্পীরাও ছিল অধিকাংশ মুসলিম। সুতায় রং করা, রিফু করা, ইস্ত্রি করার কাজেও ঢাকা, সোনারগাঁওয়ের তাঁতিদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষত মলমল খাস, মলবুস খাস মসলিন ছিল দিলি্লর সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীদের জন্য। 'সরকার-ই-আলী' মসলিন ছিল মুর্শিদাবাদের নবাব ও নায়েবে নাজিমদের জন্য। মসলিনে যত বেশি সুতা থাকত এবং যে মসলিনটি ওজনে হালকা ছিল সে মসলিনই সর্বোৎকৃষ্ট মসলিন হিসেবে বিবেচিত হতো। সম্রাট আওরঙ্গজেবকে একখণ্ড মলমল খাস মসলিন পাঠানো হয়েছিল, যার ওজন ছিল ৭ তোলা এবং ওই সময়ই ওই মসলিনটির মূল্য ছিল ৪০০ টাকা। সুবাদার ইসলাম খান দিলি্লর সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং সম্রাজ্ঞী নূরজাহানকে সোগারগাঁওয়ের খাসনগরের তৈরি ২০ হাজার টাকার 'মলমল খাস' মসলিন পাঠিয়েছিলেন। এসব মসলিন এত সূক্ষ্ম এবং ওজনে এত পাতলা ছিল যে, অধিকাংশ মসলিনের ওজনই ৭ তোলা থেকে ২০ তোলার অধিক হতো না। একবার 'অাঁবে-ই-রওয়া' নামে মসলিনের এক খণ্ড কাপড় প্রাসাদের সম্মুখস্থ জমিনের ঘাসের ওপর শুকাতে দেওয়া হয়েছিল। কোনো এক কৃষকের গাভী মসলিনকে ঘাস মনে করে পুরো মসলিন খণ্ডটিই উদরস্থ করেছিল। নবাব আলিবর্দী খাঁ ওই গাভীর মালিকের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে শহর থেকেই বের করে দিয়েছিলেন। এমনি অনেক রসালো চকমপ্রদ উপাখ্যান মসলিন সম্পর্কে ছড়িয়ে আছে।

*মাহমুদুল হাসান

Tuesday, August 7, 2012

কড়ি

0 comments
বাংলা ভাষায় টাকা-কড়ি শব্দটি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি। এখনকার দিনে বিনিময় মুদ্রা হিসেবে যেমন টাকার ব্যবহার করা হয়, তেমনি প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিনিময় মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হতো কড়ি। সংস্কৃত ভাষায় কড়ির নাম কপর্দক। তাই বাংলায় এখনো অর্থাভাবকে কপর্দকশূন্য অবস্থা বলা হয়। বিনিময় মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত এই কড়ি মূলত মালদ্বীপের একটি সামুদ্রিক শামুকের খোল। দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকা অঞ্চলে এই কড়ি বিনিময় মুদ্রা হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলায় রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন থাকলেও এই মুদ্রার ব্যবহার ছিল মূলত শহর ও বড় বড় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোয়। গ্রামাঞ্চলে বিনিময় মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হতো কড়ি। মোগল আমলে রায়তরা শস্য অথবা কড়ি দিয়ে সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করতে পারত। উনিশ শতকের শেষ দিকেও বাংলাদেশের রংপুর ও সিলেট জেলায় কড়ি ব্যবহার করা হতো। ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার যোগাযোগ স্থাপনের পরবর্তী যুগে ইউরোপীয়রা প্রচুর কড়ি আমদানি করত। এই কড়িগুলো তারা ব্যবহার করত আফ্রিকা থেকে দাস কেনার কাজে। কারণ আফ্রিকার বাজারে বিনিময় মুদ্রা হিসেবে কড়ি ব্যবহার করা হতো।

জুম চাষ

0 comments
পাহাড়ি অঞ্চলে সমতল ভূমি খুবই কম। তাই সেখানে চাষাবাদ করা ভীষণ কঠিন। কিন্তু বেঁচে থাকার তাগিদে তবুও ফসল ফলাতে হয়। পাহড়ের ওপরে বিশেষ কায়দায় করা হয় চাষাবাদ। পাহাড়ে এই বিশেষ ধরনের চাষাবাদকেই জুম চাষ বলা হয়। জুম চাষের প্রকৃত অর্থ হলো স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে চাষাবাদ। এ ধরনের চাষাবাদে শুকনো মৌসুমে পাহাড়ের গাছপালা কেটে ও পুড়িয়ে দুই-তিন বছর চাষাবাদের পর আবার কমপক্ষে ১০ বছর পতিত রাখা হয়। এই পতিত রাখার সময়ে জমি আবার তার উর্বরতা ফিরে পায়; কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যার তুলনায় জমি কম হওয়ায় মাত্র তিন-চার বছর জমি পতিত রাখা হচ্ছে। জমি নির্বাচনের সময় বাঁশ, গাছ, আগাছাসহ ঢালু জমি নির্বাচন করা হয়। এরপর বাঁশ বা গাছ কেটে রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। পরে এগুলোতে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে পুরে গাছগুলো ছাই হয়ে যায় এবং আধা ইঞ্চি মাটিও পুড়ে যায়। এই পোড়ামাটি ও ছাই জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এরপর বৃষ্টি হয়ে মাটি একটু নরম হলে ফসল বোনা হয়। জুম চাষে একসঙ্গে অনেক ফসল বোনা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফসল ঘরে তোলা হয়। পাহাড়িদের জীবন যাপনের জন্য জুম চাষ অপরিহার্য একটি বিষয়। সাধারণত জুম চাষে আদা, হলুদ, ধান, কলা, ভুট্টা, তিল, তুলা প্রভৃতি ফসলের চাষ হয়ে থাকে।

গ্রন্থনা : তৈমুর ফারুক তুষার

চাকমাদের বিজু উৎসব

0 comments
ভোরের আলো ফোটার আগেই চাকমা নারী-পুরুষরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ফুল তোলার কাজে। নিজের বাগান, পাড়া-প্রতিবেশীর বাগান যেখান থেকেই হোক, তারা ফুল জোগাড় করবেই। এই দিন অন্যের বাগানের ফুল চুরিও অপরাধ নয়। এই ফুল দিয়ে তাদের দেবতাকে পূজা দেওয়া হয়। আর এসবই করা হয় চাকমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বিজুর দিনে। বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন এ উৎসব পালন করা হয়। বাংলা বছরের প্রথম দিনকে বলা হয় ফুল বিজু এবং শেষ দিনকে বলা হয় চৈত্রসংক্রান্তি বা মূল বিজু। ফুল বিজুর দিন সকালবেলা চাকমারা ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করে ফুল দিয়ে সাজায়, বুড়ো-বুড়িদের গোসল করায়, নতুন কাপড় দেয়। রাতে বসে পরের দিনের পাঁচন তরকারি রান্নার জন্য সবজি কাটতে বসে। এই হলো অনেক রকমের সবজি একসঙ্গে মিশেলে রান্নার পদ, যা কমপক্ষে পাঁচটি এবং বেশি হলে ৩২ রকম সবজির মিশেলে রান্না করা হয়। মূল বিজুর দিন চাকমা তরুণ-তরুণীরা খুব ভোরে উঠে কলাপাতায় করে কিছু ফুল পানিতে ভাসিয়ে দেয়। তারপর সবাই বিশেষ করে ছোটরা নতুন জামাকাপড় পরে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে থাকে। পরের দিন নতুন বছর বা 'গোর্য্যাপোর্য্যা' যার গড়িয়ে পড়ার দিন। নতুন বছরের এই দিনে সবাই মন্দিরে যায়, খাবার দান করে, ভালো কাজ করে, বৃদ্ধদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেয়।