Showing posts with label History(ইতিহাস). Show all posts
Showing posts with label History(ইতিহাস). Show all posts

Friday, June 6, 2025

কুরবানী কার উপর ওয়াজিব: ইসলামিক বিধান ও হাদীসের আলোকে

0 comments

ইসলাম ধর্মে কুরবানীকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঈদুল আজহার বড় আকর্ষণ এই ইবাদতটি, যা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের প্রতীক। আল্লাহ তায়ালা কুরবানীর মাধ্যমে আমাদের আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ প্রতিজ্ঞা করেছেন, “আমি নিশ্চয় তোমাকে কাওসার দান করেছি; অতএব তোমার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়ো এবং কোরবানী দাও।”। আর কুরবানীকে ইসলামের অন্যতম শিয়া’র (লক্ষণ) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যেমন কথায় এসেছে, “জাকাত প্রদান, ঈদ এবং কুরবানী করা – এ জাতীয় মৌলিক নিদর্শনগুলোর মধ্য দিয়ে ইসলামের রূপ ও অবয়ব প্রকাশ পায়”। নবী করীম (সা.) মদীনায় হিজরতের পর থেকে ঈদুল আজহার প্রতিটি বছরে কুরবানী আদায় করে গেছেন এবং কখনও বাদ দেননি।

Qurbani

কুরআন ও হাদীসের আলোকে কুরবানীর বিধান

কুরআনে কুরবানীর হুকুম সরাসরি নির্দেশিত হয়েছে। সূরা কাওসারে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “অতএব তোমার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়ো এবং কোরবানি দাও”। এখান থেকে স্পষ্ট হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ ও কোরবানী করা সর্ম্পকে বলা হয়েছে। এছাড়া সূরা হজ্বের ৩৪ নম্বর আয়াতে আছে, “প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমরা নছিক (কুরবানির নিয়ম) নির্ধারণ করেছি; যেন তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে ওই পশুদের মাংস ভক্ষণ করে”।

হাদীস শরীফেও কুরবানীর গুরুত্ব ও বিধান বিস্তারিত এসেছে। ইবনে মাজাহ শরীফে আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, “যে যার কাছে সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানী দেয় না, সে যেন আমাদের নামাযের স্থানে আসেও না।” এই সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে সামর্থ্য থাকলে কুরবানী না করা কঠোরভাবে নিষেধ। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের উম্মাহর জন্য এবং নিজ ও পরিবার-উম্মাহর জন্য দুটি বড়, মোটা, সাদা-কালো প্রজাতির খাসি কুরবানী করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য, সাহিহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে নবী (সা.) আয়েশা (রা.)-এর কাছে জানান, “তোমরা অবশ্যই এক বছরের বয়সের ছাগল কুরবানী করবে; যদি তা তোমাদের জন্য কঠিন হয়, তাহলে ছয় মাসের (যৌবন ছাগল) কুরবানী করতে পার”। কুরবানীর জন্য অনুমোদিত পশুর মধ্যে শুধুমাত্র ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ ও উট – এই ছয় ধরণের পশু আছে। এগুলো ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীকে কুরবানী হিসেবে জবাই করা হারাম। যেমন হাদীসে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এসব ছয় ধরনের পশু ব্যতীত অন্য কোনো পশু কুরবানী হিসেবে জবাই করেননি।

Qurban

কুরবানী কার উপর ওয়াজিব – পাঁচটি শর্ত ব্যাখ্যা

হানাফী ফিকহ অনুযায়ী কুরবানী ওয়াজিব হলে পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হয়। এই শর্তগুলো হলো:

  • মুসলিম হতে হবে – কুরবানী শুধুমাত্র মুসলমানের ওপর ওয়াজিব, অমুসলিমের ওপর নয়।

  • বালিগ হতে হবে – অর্থাৎ পূর্ণবয়স্ক (জাঁককাঠামো ও যৌন চেতনাসম্পন্ন) হতে হবে। বাল্যকালে এই আমল ফরজ বা ওয়াজিব হিসেবে বিবেচিত নয়।

  • সুস্থ মস্তিষ্ক থাকতে হবে – পাগল বা মানসিকভাবে অস্থির ব্যক্তির ওপর কোনো শারীরিক ইবাদত ফরজ নয়।

  • নিযার (নিসাব) পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে – কুরবানীর দিন (১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ) নিজের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে নিসাব সমপরিমাণ (হানাফীদের মতে একই নিসাব, যা প্রায় ৫৯৫ গ্রাম রুপী বা প্রায় ১১ ভরি সোনা) সম্পদ থাকা উচিত। নিসাবের নিচে মালিকের ওপর কুরবানী ওযিব হয় না।

  • মুকীম বা নিজ এলাকায় অবস্থানকারী হতে হবে – পবিত্র ঈদের দিন নিজের নিবাসস্থলে অবস্থান করতে হবে। Musafir (ভ্রমণরত) অবস্থায় কুরবানী ওয়াজিব নয়। যদি কেউ পবিত্র স্থানে এলে তবেই সে ওয়াজিব হয়ে ওঠে।

এই শর্তগুলো পূরণ করলে যে মুসলমান তার অদক্ষিণ, স্বাস্থ্যবান ও শাস্ত্রানুযায়ী পুঁজি রয়েছে, তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। উদাহরণস্বরূপ, শপথবাদী হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কুরবানী না করে, সে অবশ্যই উম্মতের নামায থেকে নিজেকে দূরে রাখুক।

হাদীসের রেফারেন্সসহ দলিল

কুরবানীর বিধান ও ওয়াজিব হওয়ার বিভিন্ন শর্তের দালিল দিতে সহীহ হাদীস রয়েছেঃ

  • ইবনে মাজাহ (হাদিস নং ৩১২৩): আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, যে যার জন্য কুরবানী আদায় করতে সক্ষম সে যদি আদায় না করে, তবেই যেন আমাদের ঈদের নামাযের জায়গায় না আসে।

  • ইবনে মাজাহ (হাদিস নং ৩১২২): আয়েশা ও আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত, নবী (সা.) ইচ্ছা করলে দুইটি বড়, মোটা, দু’শিং বিশিষ্ট ভেড়া কুরবানী করতেন: একটি উম্মতের পক্ষ, আর একটি নিজ ও পরিবারের পক্ষ থেকে।

  • সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ১৯৬৩): বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, “তোমরা (বালিগ) ব্যক্তি লক্ষ্য করো, একবছরের পূর্ণবয়স্ক ছাগল বর্জন করিও না; যদি তোমাদের কঠিন হয়, তাহলে ছয় মাসের অর্ধবয়স্ক ছাগলও কুরবানী করতে পার”।

  • বুখারি-মুসলিম: হাদিস অনুযায়ী কুরবানী শুধুমাত্র পূর্বের বর্ণিত ছয় প্রকার পশু দিয়েই করা যায়।

  • সামুহিক খত্মুল হাদিস: (সম্ভাব্য) হাদিসে এসেছে, কুরবানীর মাস জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানির পশু জবেহ না হওয়া পর্যন্ত চুল-নখ কাটা নিষিদ্ধ।

এসব আদি-সূত্র দেখিয়ে মুসলিম উম্মাহ নিশ্চিত হয় যে কুরবানী আইন, সালাতের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল, এবং কুরবানীতে ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জিত হয়।

Eid-ul-Adha

শিশু, পাগল ও মুসাফিরদের বিধান

ইসলামী শরিয়তে বালক বা পাগল ব্যক্তির ওপর কোনো ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদত আরোপ করা হয় না। তাই শিশু বা মানসিক অক্ষম ব্যক্তির ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে কুরবানী নেই। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি পূর্ণবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের হলেও ঈদুল আজহার সময় ভ্রমণরত (মুসাফির) অবস্থায় থাকলে তার ওপরও কুরবানী ফরজ নয়। তবে যারা বাসিন্দা হয়ে ফিরে এলে তাৎক্ষণিক বা পরবর্তী সময়ে কুরবানী দিতে পারে।

অন্যদিকে, পূর্ণবয়স্ক বিশ্বাসী ব্যক্তি যদি পরিবারের একাধিক সদস্যের পক্ষ থেকে কুরবানী দিতে চান, তবে একটি পশু দিয়ে কয়েকজনের পক্ষ থেকেও আদায় করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, হাদিসে বর্ণিত হয়, হুদাইবিয়াতে জাবের (রা.) বলেন, “রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে আমরা ছিলাম; তখন উট ও গরু দুটি ক্রয় করে যেগুলো দিয়ে সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানী দিয়েছি।”। অর্থাৎ এক পশু দিয়ে ভাগাভাগি করে ৭ জন পর্যন্ত ব্যক্তির জন্য কুরবানী দেয়ার সুযোগ রয়েছে।

uḍḥiyah

নারীদের ক্ষেত্রে কুরবানীর হুকুম

ইসলামী ফিকহানুযায়ী, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যদি উপরোক্ত পাঁচটি শর্ত পূরণ করে থাকে, তার ওপরও কুরবানী ওয়াজিব। সাহাবিদের দাবি করা হত, যে ব্যক্তি তার পরিবারের সদস্যদের (স্ত্রীরা ও সন্তানেরা) সঙ্গে সম্পদবান হলে, প্রত্যেকের জন্য আলাদা পশু কুরবানী করতে হবে না; একটি পশু সাতজন পর্যন্ত হয়ে যায়। আবার অনেক মুতাহাদ্দিথ মনে করেন নারীরও স্বনিয়ন্ত্রিত সম্পদ থাকলে কুরবানী করা চাওয়া উচিত। তাই মাযহাব হানাফীর মতে, বিবাহিত স্ত্রী যখন তার ব্যক্তিগত সম্পদ (যেমন গহনা বা নিজস্ব আয়) থেকে নিসাব পরিমাণ বৈধ অর্থে সামর্থ্য সৃষ্টি করতে পারে, তখন তাঁর পক্ষেও কুরবানী দেওয়া ওয়াজিব। তিনি নিজে জবাই না করতে পারলেও, অন্যের মাধ্যমে বা দরিদ্রদের অংশ ভাগ করে দিয়েই আদায় সম্পন্ন করতে পারেন।

কুরবানী না দিলে পরিণতি

আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে তার ফল ভালো হয় না। কুরবানী দিতে সক্ষম থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ ত্যাগ করে, তাহলে গোনাহের আওতায় পড়বে। নবী (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই ব্যক্তিকে ঈদের নামাজের স্থানেও আসতে নিষেধ। এই উক্তি থেকে বোঝা যায় কুরবানী মুলক প্রযোজ্য আদর্শ মেনে না চলা মারাত্মক অপরাধ; তাই মুসলিম বুকে দায়বোধ থাকা উচিৎ।

সর্বোপরি, যদি কোনো বাসিন্দা অঞ্চলের মানুষ হঠাৎ সম্মিলিতভাবে কুরবানী পরিত্যাগ করে, তাহলে ইসলামের একতা ও সনাতনী দায়িত্ব বিকৃত হবে। শাস্ত্রীয় গ্রন্থে এমন পরিস্থিতিতে কঠোর ভাষায় সতর্ক করা হয়েছে – যদি সম্ভাব্য লোকেরা একযোগে কুরবানী না করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হস্তক্ষেপ হতে পারে। এটি প্রাচীন যুগের উদাহরণ, তবে আমাদের জন্য মর্মবাণী যে, কুরবানীকে অতিরিক্ত বা তুচ্ছ হিসেবে দেখা যায় না। বরং যা ওয়াজিব, তা ত্যাগ করলে ইসলামী সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়।

উপসংহার: আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার চর্চা

কুরবানী হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। পশু কোরবানী ঈমান আর তাকওয়া বৃদ্ধি করে, দাতব্য কাজ হিসেবে দরিদ্রদের জন্য খাদ্য ও সহায়তা জোগায়। এতে নবী ইব্রাহীম (আঃ)-এর আনুগত্যের আদর্শ অনুসরণ করি এবং নিজকে আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত রাখি। আল্লাহ তায়ালা সওয়াবের আশ্বাস দিয়েছেন – কুরবানী ছাড়াও কোনো গানাহ কটার নির্দেশনা নেই, বরং এটি মহান নেকি। তাই তরুণ-মুসলিম, সাধারণ ধর্মপ্রাণ বা শরীয়তজ্ঞ সবাই যেন কুরবানীকে ঈমানি অধিকার হিসেবেই গুরুত্ব দিয়ে পালন করে; তা কেবল একটি পশুর জবাই নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য, আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার সমাবেশ। আমাদের প্রত্যেকে আল্লাহর প্রাকৃষ্ট নির্দেশ মেনে কুরবানী দান করে নিজের হৃদয়ে তাকওয়া ও শোকরিয়া জন্ম দিই; কারণ কুরবানী আদায়ে না শুধু নিজের সুবৃত্তি, বরং সবার মাঝে ন্যায়-বিচার এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মাহ হিসেবে গৌরব প্রতিষ্ঠা পাই।

Islamic ritual sacrifice

সূত্র: সৌজন্যে ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও ইসলামিক গ্রন্থাবলী.

Title: Who Is Obligated to Offer Qurbani? Rules and Hadith-Based Guidelines in Islam
Tags: "Qurbani," "Obligated," "Rules," "Hadith"

কুরবানী কে কে দিতে পারবে? কার উপর ওয়াজিব

0 comments

ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী কুরবানী (উদ্বিয়াহ) একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে একজন মুসলমানের উপর ওয়াজিব হয়ে যায়। নিচে কুরবানী কারা দিতে পারবে এবং কার উপর এটি ওয়াজিব তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

Eid-ul-Adha

কুরবানী কে কে দিতে পারবে?

কুরবানী দিতে পারবে এমন ব্যক্তি হতে হবে:

  1. মুসলিম – কুরবানী শুধু মুসলমানদের জন্য।

  2. বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) – শিশুদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।

  3. আকিল (স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও জ্ঞানসম্পন্ন) – পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।

  4. মুকীম (অবস্থানকারী) – মুসাফির (অস্থায়ী ভ্রমণরত) ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়, তবে ইচ্ছা করলে করতে পারে।

  5. সামর্থ্যবান – যে ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তার উপর কুরবানী ওয়াজিব।


কুরবানী কার উপর ওয়াজিব?

নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হলে কুরবানী ওয়াজিব হয়:

  1. যার মালিকানায় ঈদুল আযহার দিন সুবহে সাদিক থেকে কুরবানীর শেষ সময় পর্যন্ত (৩ দিন), নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তার উপর কুরবানী ওয়াজিব।

  2. নিসাব পরিমাণ সম্পদ:

    • সোনা: ৭.৫ তোলা (৮৭.৪৮ গ্রাম)

    • রূপা: ৫২.৫ তোলা (৬১২.৩৬ গ্রাম)

    • অথবা এর সমমূল্যের টাকা বা সম্পদ (নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক মালামাল, জমি ইত্যাদি)

  3. এই সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে (যেমন বাসস্থান, পোশাক, খাদ্য, ব্যবহারের গাড়ি ইত্যাদি বাদ দিয়ে বাকি সম্পদ গণ্য হবে)।

  4. রোজা বা হজের মতো সময়সীমা নির্ধারিত – কুরবানীর সময় শুরু হয় ঈদের প্রথম দিন (১০ জিলহজ্ব) সুবহে সাদিক থেকে এবং শেষ হয় ১২ জিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত।


অতিরিক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

  • নারী ও পুরুষ উভয়ের উপরই কুরবানী ওয়াজিব, যদি তারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন।

  • প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিকে নিজ নিজ কুরবানী দিতে হবে, পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কুরবানী যথেষ্ট নয় যদি পরিবারের সকল সদস্যই নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন।

Tuesday, April 29, 2025

বাংলাদেশের ইতিহাসের ১০টি গৌরবময় ঘটনা — যা প্রতিটি নাগরিকের জানা উচিত

0 comments

বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে ঘটেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই পোস্টে আমরা জানবো এমন ১০টি ইতিহাস-গঠক ঘটনা যা আজকের বাংলাদেশকে রূপ দিয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

🔰 ভূমিকা:

বাংলাদেশের ইতিহাস শুধুই পৃষ্ঠায় লেখা নয়—এটি একটি জাতির আত্মত্যাগ, সাহস, সংস্কৃতি আর সংগ্রামের মহাকাব্য। এই জাতির পরিচয় গঠিত হয়েছে কয়েকটি মূল ঘটনায়, যা যুগে যুগে বাঙালির চেতনাকে শাণিত করেছে। চলুন জেনে নিই এমন ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা প্রতিটি বাংলাদেশির জানা উচিত।


১. 🏯 পাল রাজবংশের শাসন (৮ম–১২শ শতক)

প্রেক্ষাপট: পালরা বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং বাংলা অঞ্চলকে শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।
মুখ্য শাসক: ধর্মপাল, দেবপাল
গুরুত্ব:

  • নালন্দা ও বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসার ঘটে।

  • সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর) নির্মিত হয়, যা এখন ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ।

  • বাংলার প্রথম স্বাধীন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়।


২. ☪️ ইসলামের আগমন ও সুলতানি শাসন (১৩শ শতক)

প্রেক্ষাপট: বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।
সংস্কৃতিতে প্রভাব:

  • ফারসি ভাষার প্রসার

  • মসজিদ নির্মাণ (বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ প্রাচীন নিদর্শন)

  • ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।


৩. 🕌 মুঘল শাসন ও ঢাকার উত্থান (১৬শ–১৮শ শতক)

প্রেক্ষাপট: মুঘল সুবাহদাররা ঢাকাকে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক নগরীতে পরিণত করেন।
উল্লেখযোগ্য চরিত্র: শায়েস্তা খান
গুরুত্ব:

  • লালবাগ কেল্লা, হোসেনি দালান নির্মাণ

  • ঢাকার সুতি কাপড় (মসলিন) বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠে।


৪. ⚔️ পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭)

ঘটনা: নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যকার যুদ্ধ।
পরিণতি: বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়।
গুরুত্ব:

  • উপমহাদেশে দীর্ঘ ২০০ বছরের উপনিবেশিক শাসনের দরজা খুলে যায়।

  • বাংলা অর্থনীতিতে ধ্বংস নেমে আসে।


৫. 🇮🇳 ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন (১৯শ–২০শ শতক)

চরিত্র: সুভাষ বসু, খুদিরাম, বাঘা যতীন, মাস্টারদা সূর্যসেন
গুরুত্ব:

  • ভারত ছাড়ো আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন বাংলায় বিস্তার লাভ করে।

  • একে একে বহু বিপ্লবী শহীদ হন।

  • নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে (প্রিতিলতা ওয়াদ্দেদার অন্যতম উদাহরণ)।


৬. 📢 ভাষা আন্দোলন (১৯৫২)

ঘটনা: পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার চেষ্টা করলে বাঙালিরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।
শহীদ: সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত
গুরুত্ব:

  • একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত।

  • জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।


৭. 📃 ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬)

মূল দাবি: পূর্ব বাংলার জন্য স্বায়ত্তশাসন
গুরুত্ব:

  • পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ প্রথমবার সরাসরি রাজনৈতিক দাবি উপস্থাপন করে।

  • এটি ছিল ভবিষ্যতের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি।


৮. ✊ গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯)

ঘটনা: আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা আন্দোলন।
নেতৃত্ব: ছাত্র ইউনিয়ন, ডাকসু
গুরুত্ব:

  • আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার হয়।

  • সামরিক সরকার পতনের পথ সুগম হয়।


৯. 🗳️ নির্বাচন ও অসহযোগ আন্দোলন (১৯৭০–৭১)

ঘটনা: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় এবং কেন্দ্রের ক্ষমতা হস্তান্তরের অস্বীকৃতি।
প্রতিক্রিয়া: অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।
গুরুত্ব:

  • সারাদেশে প্রশাসন, আদালত, অফিস বর্জন শুরু হয়।

  • জাতীয় স্বাধীনতার ডাক।


১০. 🕊️ মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা (১৯৭১)

শুরু: ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটে গণহত্যা শুরু হয়।
সমাপ্তি: ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ।
গুরুত্ব:

  • প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন।

  • বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়।


📌 উপসংহার:

এই দশটি ঘটনা বাংলাদেশের জন্ম ও জাতীয় পরিচয়ের চূড়ান্ত রূপরেখা। প্রতিটি বাঙালির উচিত এই ইতিহাস জানা এবং তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ ইতিহাস জানলে আমরা ভুল শুধরে ভবিষ্যতের জন্য পথ তৈরি করতে পারি।

Sunday, February 7, 2021

মঠ

0 comments

মঠ এমন একটি অবকাঠামো, যেখানে কোন এক বিশেষ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা ধর্মীয় কারণে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকে ওই ধর্মের বিভিন্ন উপদেশ প্রদান ও শিক্ষাদান করা হয়।

খরোষ্ঠী-ব্রাহ্মী শিলালিপিতে বাংলায় সর্বপ্রথম মঠ উল্লেখ দেখা যায়। এটি মূলত খ্রিস্টীয় দুই শতক। খ্রিস্টীয় ছয় শতক থেকে এর সংখ্যা বাড়তে থাকে।



বেশীরভাগ মঠই পোড়া মাটির অলঙ্করণে আবৃত। দেয়ালে খোদাই করা লতা-পাতা, ফুল ইত্যাদি। এতে প্রবেশের জন্য থাকে দুইটি দরজা। এই পুরাকীর্তগুলো এখন অনেকটাই অবহেলিত। মঠের উপরিভাগে বেড়ে ওঠা পরগাছা নষ্ট করছে বাইরের দেয়াল। 


মধ্যযুগে মঠের সঙ্গে আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিষয়গুলিও জড়িত ছিলো। মঠগুলির ব্যয় নির্বাহ হতো প্রধানত কৃষি উৎপাদন থেকে। সাত শতকের সিলেটের বৈষ্ণব মঠগুলিকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য পেশাদার শেণীর লোকদের বসতি প্রতিষ্ঠা করে জনপূর্ণ করা হয় এবং অকর্ষিত ভূমি (অকর্ষ) চাষের অধীনে আনা হয়। পরবর্তীতে মঠ গুলি কৃষকদের সুদের বিনিময়ে ঋণ দিত । কৃষকরা এই ঋণ পরিশোধ না করতে পারলে মঠ গুলি তাদের জমি বাজেয়াপ্ত করতো । এজন্য মধ্যযুগের জনগণ একই দেব-দেবীর উপাসনা এবং একত্রে বসবাস করলেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে তারা দেশান্তরীয় মঠ এবং বঙ্গালদেশীয় মঠ এই উপ-দলীয় পার্থক্য বজায় রাখত। আবার, রাজ দরবারও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির পৃষ্ঠপোষকতার বিনিময়ে তাদের পার্থিব ক্ষমতা স্থিতিশীল করে তুলেছিল।


Friday, September 6, 2013

রহস্যময়ী ম্যাগনেটিক হিল ও স্পুক হিল

0 comments
কেমন হয় বলুন তো, যদি আপনার গাড়িটি এমনি রেখে দিলেন আর তা নিজে নিজে গড় গড় করে বিনা বাধায় ২০০ গজ মতো উপরে উঠে গেল! কী হতে পারে, যাদু না রহস্য? কি বিশ্বাস হচ্ছে না? পুরো ব্যাপারটা নিয়ে চ্যালেজ্ঞ ছুড়ে দেওয়া যেতে পারে আপনার কাছে। কারণ, ঘটনা কিন্তু পুরোপুরি সত্য। আমরা কথা বলছি মনকটন শহরের উত্তরে অবস্থিত চুম্বক পাহাড় বা ম্যাগনেটিক হিলকে নিয়ে। পাহাড়টি কানাডার নিউ বার্নসউইক প্রদেশে অবস্থিত। এই পাহাড়ের নিচে কোন গাড়ি রাখলে তা নিজে নিজে উপরে উঠে যায়।
রহস্যের শুরু ১৮৮০ সালে। যখন ছোটখাট ওয়াগনগুলো এমনি ওপরে উঠে যেত। ১৯৩৩ সালে খবরটি প্রথম ছাপা হলো স্থানীয় সিন্ট জন টেলিগ্রাফ জার্নালে। রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামলেন বিশেষজ্ঞরা। মনকটন শহরের প্রতিটি পাহাড়ে চললো অনুসন্ধান। পেরিয়ে গেল পাঁচ পাঁচটি ঘন্টা কিন্তু কোন ফলাফল নেই। শেষমেশ একেবারে বাড়ী যাওয়ার পথে দেখা গেল বিস্ময়কর কান্ড। নির্দিষ্ট একটি জায়গায় তাদের গাড়িটা বিনা বাধায় পাহাড়ের উচ্চভাগের দিকে উঠে গেল। চোখ পড়ল রাস্তার পাশের পানির উৎসটার দিকে। মাধ্যকার্ষণ নীতি অমান্য করে সেটাও বয়ে চলেছে ওপরের দিকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকার চুম্বক পাহাড়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে রুপান্তরিত করলেন। আজকাল অবশ্য এর আশপাশে গলফ কোর্স, চিড়িয়াখানা, রেলওয়েসহ অনেই কিছুই গড়ে উঠেছে। ২০০২ সালে ম্যাগনেটিক হিল পার্ক জিতে নেয় কানাডার সেরা আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানের পুরস্কার। এখন এই পাহাড়ের রহস্য উপভোগ করতে আপানাকে কিছু খরচ করতে হবে। তারপর আপনার গাড়িটাকে ওই স্থানটাতে রেখে দিন এবং দেখুন কি হয়! আপনার গাড়িটি পাহাড়ের নিচ থেকে নিজে নিজে উঠে যাবে পাহাড়ের উপরে। রাস্তার পাশের ড্রেনের পানির দিকে নজর দিতে ভুলবেন না কিন্তু। দেখবেন পানিও বয়ে চলেছে উপরের দিকে।

এই রকম আরেকটি পাহাড় হলো ফ্লোরিডার লেক ওয়ালসের স্পুক হিল। বিশ-ত্রিশ লাখ বছর আগে এটি ছিল একটি দ্বীপ। আর আজ স্পুক হিল দুনিয়ার অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র। প্রতি বছর প্রচুর পর্যটক এসে ভিড় করেন এখানে। এখানে এলে প্রথমেই আপনার চোখ পড়বে পথের ধারের সাইনবোর্ডটির দিকে। এতে লেখা আছে এক অদ্ভূত উপকথা। লেক ওয়ালস একটি ইন্ডিয়ান গ্রাম। বহু বছর আগে এই গ্রামে প্রচন্ড উপদ্রব ছিল গ্যাটার দস্যূদের। গ্রামের প্রধান ছিলেন একজন যোদ্ধা। যুদ্ধে দস্যুদের মেরে ফেললেন তিনি। যা থেকে জন্ম নিল একটি ছোট্ট লেক। লেকের উত্তর পাশে দাফন করা হয়েছিল সেই মহান যোদ্ধার মৃতদেহ। তখনকার দিনে চিঠি-পত্র আনা-নেওয়া করার পথে রানারদের নজরে পড়লো প্রথম এই ব্যাপারটি। তাদের ঘোড়াগুলোকে উপর থেকে নিচে নামার পথে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হচ্ছে। কী যেন ঘোড়াগুলোকে উপরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সেই থেকে জায়গাটির নাম হয়ে গেল স্পুক হিল। যার বাংলা অর্থ ভুতুড়ে পাহাড়। অনেকে বলে আজও সেই দস্যুরা প্রতিশোধ নেয়ার রাস্তা খুঁজছে এবং সেই যোদ্ধা এখনও লড়াই করে চলেছে।

Thursday, May 9, 2013

যেভাবে নির্বাচিত হন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট

0 comments
জাতি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব একটা পুরনো নয়। এর ইতিহাস মাত্র সোয়া পাঁচশ’ বছরের। পৃথিবীর মানচিত্রে এমন অনেক দেশ আছে যাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতা আমেরিকা থেকে অনেক বেশি প্রাচীন ও গৌরবোজ্জ্বল। উদাহরণস্বরূপ  মিসর, সিরিয়া, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, ইতালি, চীন, রাশিয়া, ইংল্যান্ড ও ভারতবর্ষসহ অনেক দেশের নাম করা যায়। আমেরিকায় সভ্যতার সূচনা ধরা হয় ১৪৯২ সাল  থেকে যখন কলাম্বাস এ দেশ আবিষ্কার করেন, যদিও তার আগেও এখানে ন্যাটিভ ইন্ডিয়ানদের বসবাসের অনেক আলামত পাওয়া যায়। স্কুলে যেভাবে আমেরিকার ইতিহাস পড়ানো হয় তাতে এই পুরো সময়টাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়।

প্রি-কলোনিয়াল পিরিয়ড (১৪৯২-১৬০৭); কলোনিয়াল পিরিয়ড (১৬০৭-১৭৭৬);  এবং পোস্ট-কলোনিয়াল বা স্বাধীন আমেরিকান পিরিয়ড (১৭৭৬ বর্তমান)।

সভ্যতার বিবেচনায় আমেরিকা অনেক জাতির তুলনায় নবীন হলেও তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ ও পাকাপোক্ত। তারা ২৩৬ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের চর্চা করে আসছে। আধুনিক বিশ্বে এমন দেশ খুব কমই আছে যাদের স্বাধীন গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এত লম্বা ও উজ্জ্বল। পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষ যখন ইংরেজদের কাছে তার স্বাধীনতা হারায় তার মাত্র ২০ বছরের মাথায় আমেরিকা একই ইংরেজদের কাছ থেকে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তাদের রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন করে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, স্বাধীনতার পর থেকেই তারা সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেরাই নিজেদের শাসন করছে। তবে তাদের গণতন্ত্র ইংল্যান্ড, ভারত কিংবা বাংলাদেশের মতো পার্লামেন্টারিয়ান পদ্ধতির নয়। আমেরিকার গণতন্ত্র প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির। এ পদ্ধতিতে সাধারণত জনগণের সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে থাকেন, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। নির্বাচন কিভাবে হয় তার বিস্তারিত আলোচনায় একটু পরে আসছি।

আমেরিকা স্বাধীন হয় ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই। এরপর তারা তড়িঘড়ি করে যেনতেন প্রকারের একটি সংবিধান রচনা করেন। আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যাদের সসম্মানে বলা হয় ‘ফাউন্ডিং ফাদারস’, তারা সময় নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা ও তর্ক-বিতর্ক করে দীর্ঘ ১১ বছরে জাতির জন্য তৈরি করেন একটি অমূল্য দলিল সংবিধান। এটা চূড়ান্ত রূপ নিয়ে গৃহীত হয় ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৭৮৭ সালে। এরপর দীর্ঘ ২২৫ বছরে মাত্র ২৭টি সংশোধনী নিয়ে সেই একই সংবিধান দেশে এখনো বলবৎ আছে। এ থেকে আমেরিকার ‘ফাউন্ডিং ফাদারদের’ দেশপ্রেম, গণতন্ত্রপ্রীতি, বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে পাঠকেরা আমাদের দেশের কথা একবার ভেবে দেখুন, আমরা মাত্র ৯ মাসের গৌরবোজ্জ্বল ও বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করে অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। আবার দুই বছরের মধ্যেই একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করে আরেকটি রেকর্ড করে ফেললাম, কিন্তু তারপর মাত্র দুই বছরের মাথায় চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে সংবিধানের আওতায় বাকশাল কায়েম করলাম। তারপর আজ অবধি আমাদের জাতীয় জীবনের ওই পবিত্র দলিল নিয়ে যে কাটাছেঁড়া, বালখিল্য ও খিস্তিখেউড় চলছে তার শেষ কোথায় আমরা কেউ জানি না। মাত্র ৪০ বছরে আমরা ১৫টি সংশোধনী এনেছি। আরেকটি অত্যাসন্ন।

এখানে একটি কথা আমি মোটা দাগে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ ও পাঠকদের বলে রাখতে চাই, একটি দেশের সংবিধান সব ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের সব নাগরিকের বিশ্বাস ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনসহ এক পবিত্র দলিল। এটা কস্মিনকালেও কোনো রাজনৈতিক দলের মেনিফেস্টো হতে পারে না। একটি দল কোনো বিশেষ সময়ে, বিশেষ কারণে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেলেই দলীয় বিবেচনায় সংবিধানে সংশোধনী আনতে পারে না।’

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী তাদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আর দশ-পাঁচটি দেশের মতো সাদাসিধে ধরনের নয়। যেহেতু প্রেসিডেন্টের হাতে যাবতীয় নির্বাহী ক্ষমতা, তাই তাদের ‘ফাউন্ডিং ফাদাররা’ নানা কিসিমের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একটি কঠিন ও জটিল পরোক্ষ পদ্ধতি আবিষ্কার করে গেছেন। বিভিন্ন সময়ে উদ্ভূত ছোটখাটো সমস্যা সামাল দিতে গিয়ে তারা ওই নিয়ম-কানুনে কিছু পরিবর্তন এনেছেন, কিন্তু সেই পুরনো মৌলিক পদ্ধতি এখনো বহাল আছে। আর মাত্র কিছু দিন পরই হতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তাই এ নির্বাচনের প্রাক্কালে আমার পাঠকদের সম্ভাব্য কৌতূহলী মনের খোরাক জোগাতে লিখছি আজকের এই কলামটি।

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী একজন প্রেসিডেন্টপ্রার্থী তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে কমসংখ্যক জনসমর্থন নিয়েও শুধু ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যাধিক্যে নির্বাচিত হয়ে হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে বসতে পারেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসে আমাদের চোখের সামনে এমন ঘটনা ঘটেছেও। ২০০০ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ জুনিয়র আল গোর থেকে অনেক কম জনভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে কারণে-অকারণে যুদ্ধ করে আমেরিকা ও পশ্চিমা অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে গেছেন।

এবার দেখা যাক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেক্টোরাল কলেজ কিভাবে কাজ করে। এ দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় চার বছর অন্তর অন্তর। পরপর দুই টার্মের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে পারেন না। যদিও বলা হয়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, কিন্তু আসলে এর সাথে সব কংগ্রেসম্যান অর্থাৎ ফেডারেল প্রতিনিধি পরিষদের (কেন্দ্রীয় নিম্নকক্ষ) সদস্য এবং কিছুসংখ্যক সিনেটরের (কেন্দ্রীয় উচ্চকক্ষ) নির্বাচন হয়। সিনেটররা রোটেশনের ভিত্তিতে ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন।

নির্বাচনের প্রায় এক বছর আগে থেকেই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা পার্টি নমিনেশনের জন্য লড়াইয়ের মাঠে নেমে পড়েন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট যেহেতু আপনাআপনি পার্টি নমিনেশন পেয়ে যান, তাই তিনি মাঠে নামেন আরেকটু পরে। প্রার্থীরা নিজের পকেট থেকে এবং ব্যক্তিগত ও পার্টি উদ্যোগে দেশের ভেতরে আইনানুযায়ী যে চাঁদা আদায় করেন, তা দিয়েই নির্বাচনী ব্যয় সঙ্কুলান করে থাকেন। এ দেশে প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্পেইন চলাকালীন সময়ে আমাদের দেশের মতো মাঠে-ময়দানে বড় বড় সভা সমাবেশ হয় না। মিটিং যা হয় তার সবই ঘরোয়া-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম মিটিং অথবা টাউন হলজাতীয় জমায়েত। বাকি সব প্রচার-প্রচারণা চলে মিডিয়ার মাধ্যমে। পত্রপত্রিকা, টিভি অ্যাড, টকশো, বিতর্ক, ইন্টারভিউ, এর সাথে আজকাল ই-মেইল, ফেসবুক, টুইটারও যোগ হয়েছে বটে। ক্যাম্পেইনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো নির্বাচনে তিন-চার সপ্তাহ আগে প্রার্থীদের মুখোমুখি জাতীয়ভাবে টিভি বিতর্ক।

প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে হয় পরপর তিনটি ডিবেট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের মাঝে হয় একটি। এসব ডিবেট ও তাদের ফলাফলকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে দেখা যায় দারুণ উত্তাপ ও উত্তেজনা। শেষ মুহূর্তে আনডিসাইডেড ভোটারদের সিদ্ধান্তে এসব ডিবেট বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

নির্বাচনটি যদিও ফেডারেল, তথাপি এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য নেই কোনো ফেডারেল নির্বাচন কমিশন। গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার দেখভাল ও পরিচালনার দায়িত্ব ৫০টি অঙ্গরাজ্য ও স্বতন্ত্র টেরিটোরি দেশের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে নিজ নিজ কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে ভোটার তালিকা করা থেকে শুরু করে ভোট গ্রহণ, ভোট গণনা, রেজাল্ট সার্টিফাই করা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ করে থাকে। এ ব্যাপারে তাদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব আইন, রাজ্যে রাজ্যে এ আইনের তফাৎও আছে বিস্তর।

কোন সরকারের অধীনে, কোন কমিশনের হেফাজতে, কোন তারিখে, কিভাবে নির্বাচন হবে এ নিয়ে এ দেশে কোনো বিতর্ক নেই। নির্বাচনের দিন-তারিখ সাংবিধানিকভাবে আগে থেকেই ঠিক করা। নির্বাচন হবে প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর (বছরটি কাকতালীয়ভাবে লিপইয়ার) নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মঙ্গলবারে। তবে নভেম্বরের প্রথম দিন যদি মঙ্গলবার হয় সে ক্ষেত্রে নির্বাচন হবে মাসের দ্বিতীয় মঙ্গলবারে। অর্থাৎ মাসের প্রথম দিন কোনো অবস্থাতেই নির্বাচন হতে পারবে না। নিশ্চয়ই এর কোনো মাজেজা আছে, কিন্তু বিষয়টি এখনো আমার মাথায় আসে না। ভোটের তারিখ নির্দিষ্ট থাকলেও ওই দিনের ভিড় এড়ানোর জন্য দুই-তিন সপ্তাহ আগ থেকেই স্বল্পপরিসরে অগ্রিম ভোটদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তার নিয়মও একেক রাজ্যে একেক রকম।

নির্বাচনের দিন ভোটাররা ভোট দেন, কিন্তু প্রার্থীরা সরাসরি সে ভোট পান না। ভোট পড়ে তাদেরই মনোনীত ইলেক্টোরাল কলেজের সপক্ষে। পরবর্তী পর্যায়ে এই ইলেক্টোরাল কলেজের দ্বারা আলাদাভাবে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে থাকে। সারা দেশে ইলেক্টোরাল কলেজের সদস্য সংখ্যা ৫৩৮ জন। আমেরিকার কেন্দ্রীয় আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। জনসংখ্যার অনুপাতে ৫০টি অঙ্গরাজ্য থেকে মোট ৪৩৫ জন সদস্য দুই বছর পরপর প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন এবং প্রতি ছয় বছর পরপর পর্যায়ক্রমে রোটেশনের মাধ্যমে ছোট-বড় প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে সমানসংখ্যক অর্থাৎ দুজন করে মোট ১০০ সদস্য সিনেটে নির্বাচিত হয়ে আসেন। এই দুইয়ের সমষ্টি ৫৩৫। তার সাথে যোগ হয় ওয়াশিংটন ডিসির জন্য আরো তিনজন। এ নিয়ে সর্বমোট ৫৩৮ জন। এই ৫৩৮ জনই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইলেক্টোরাল কলেজ।

রাজ্যওয়ারি ইলেক্টোরাল কলেজের বিন্যাস এ রকম। আলাবামা-৯, আলাস্কা-৩, অ্যারিজোনা-১১, আরকানসা-৬, ক্যালিফোর্নিয়া ৫৫, কলোরাডো-৯, কানেটিকাট-৭, ডেলাওয়ার-৩, ওয়াশিংটন ডিসি-৩, ফ্লোরিডা-২৯, জর্জিয়া-১৬, হাওয়াই-৪, আইডাহো-৪, ইলিনয়-২০, ইন্ডিয়ানা-১১, আইওয়া-৬, ক্যানসাস-৬, কেন্টাকি-৮, লুইজিয়ানা-৮, মেঈন-৪, ম্যারিল্যান্ড ১০, মন্টানা-৩, নেব্রাস্কা-৫, নেভাডা-৬, নিউ হ্যাম্পশায়ার-৪, নিউজার্সি-১৪, নিউ মেক্সিকো-৫, নিউ ইয়র্ক-২৯, নর্থ ক্যারোলাইনা-১৫, নর্থ ড্যাকোটা-৩, ওহাইও-১৮, ওকলাহোমা-৭, অরিগন-৭, প্যানসিলভানিয়া-২০, রোড আয়ল্যান্ড-৪, সাউথ ক্যারোলিনা-৯, সাউথ ড্যাকোটা-৩, টেনেসি-১১, টেক্সাস-৩৮, ইউটা-৬, ভারমন্ট-৩, ভার্জিনিয়া-১৩, ম্যাসাচুসেটস-১১, মিশিগান-১৬, মিনেসোটা-১০, মিসিসিপি-৬, মিসৌরি-১০, ওয়াশিংটন স্টেট-১২, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া-৫, উইসকনসিন-১০, ওয়ায়োমিং-৩। জনসংখ্যার ওঠানামার সাথে এই বিন্যাস অদলবদল হয়, কিন্তু মূল সংখ্যা ৫৩৮-এ স্থির থাকে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটা জাতীয় নির্বাচন হলেও কোনো একক জাতীয় নিয়মের ভিত্তিতে হয় না এ নির্বাচন। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে তার নিজস্ব নিয়ম ও আইনের ভিত্তিতে ভোট গ্রহণকার্যক্রম পরিচালিত হয়। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমনটি হয় বলে আমার জানা নেই। মেইন ও নেব্রাস্কা ছাড়া বাকি সব ক’টি অঙ্গরাজ্যে যে প্রার্থী বেশির ভাগ পপুলার ভোট পাবেন সে রাজ্যে তার মনোনীত ইলেক্টোরাল কলেজের সবাই জিতল বলে বিবেচিত হয়। পরবর্তীকালে আনুষ্ঠানিক এবং অফিসিয়াল নির্বাচনে তার ইলেক্টোরাল কলেজেই তার সপক্ষে ভোট দেয়ার সুযোগ পায়। পক্ষান্তরে প্রতিদ্বন্দ্বী পার্টির সব ইলেক্টোরাল কলেজই পরাজিত বলে গণ্য হয়।

মেইন ও নেব্রাস্কার বেলা এই সরল নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ওই দুই রাজ্যে যে প্রার্থী পপুলার ভোটে জয়লাভ করবেন তিনি পাবেন রাজ্যের দুই সিনেটারের বিপরীতে দুটো ইলেক্টোরাল কলেজ, বাকিগুলো নির্ভর করবে আনুপাতিক প্রাপ্ত ভোটের ওপর। অর্থাৎ যে প্রার্থী যে ক’টি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে জেতবে তিনি পাবেন আরো ততটি ইলেক্টোরাল কলেজ। এভাবে ৫৩৮টি ইলেক্টোরাল কলেজের মধ্যে যিনি ন্যূনতম ২৭০টি পাবেন, তিনিই বেসরকারিভাবে নির্বাচিত বলে ঘোষিত হবেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে তার রানিং মেট আপনা-আপনিই নির্বাচিত হয়েছেন বলে বিবেচিত হবেন।

এখানেই শেষ নয়। সরকারি ফল ঘোষণার আগে সারা দেশের সব ইলেক্টোরাল কলেজ এক জায়গায় জমায়েত হয়ে তাদের প্রার্থীদের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দেন। সেটা গণনা করা হয়, সার্টিফাই করা হয়, তারপর সরকারি ফল ঘোষিত হয়। এখন প্রশ্ন হলো, একজন প্রার্থীর মনোনীত ইলেক্টোরাল কলেজ কি আনুষ্ঠানিক সরকারি ভোটের সময় তার বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারে? বাস্তবে হয় না, তবে তাত্ত্বিকভাবে এটা সম্ভব।

ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই, তবে অতীতে কোনো সময় হলে হয়েও থাকতে পারে। ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে পাঠকদের জন্য এ জাতীয় কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য উদঘাটন করতে পারিনি। তবে দুইজন প্রার্থী যদি সমান সমান ইলেক্টোরাল কলেজ জেতেন তাহলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার মালিক কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ-প্রতিনিধি পরিষদ। এ রকম ঘটনা ইতিহাসে ঘটেছে বৈকি।

লেখক: আবু এন এম ওয়াহিদ; অধ্যাপক, টেনেসি স্টেইট ইউনিভার্সিটি

এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ

সূত্র: নয়াদিগন্ত, ৩০ অক্টোবর ২০১২

Monday, April 1, 2013

সভ্যতার বিবর্তন - রণক ইকরাম

0 comments
মার্কিন ইতিহাসবিদ উইল ডোরান্ট বলেছেন, 'সভ্যতা হলো সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতা, যা সামাজিক শৃঙ্খলা, আইনি শাসন ও তুলনামূলক জনকল্যাণের মধ্য দিয়ে অস্তিত্ব লাভ করে। সভ্যতা হচ্ছে জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ফসল। আর যে সমাজ, সামাজিক শৃঙ্খলা সাধন করে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন, অগ্রগতি ও মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধির কথা ভাবে, সেই সমাজই সভ্য সমাজ।' আর তাই মানব ইতিহাস বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মানা হয় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সভ্যতার উদ্ভব। সভ্যতার বিবর্তনে মানুষের জীবনধারা পাল্টেছে। হিংস্রতা থেকে মানুষের জীবন পেয়েছে সুসভ্য রূপ। বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মানুষ পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নানা পরিবর্তন নিয়ে আসে। এলাকাভেদে ও সংঘবদ্ধ দলভেদে এই পরিবর্তন একেক জায়গায় একক রকম। আর এই পরিবর্তনের শুরুর দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বহু সভ্যতা গড়ে ওঠে। এই সভ্যতাগুলোর ক্রমাগত বিবর্তনের ফলেই আমরা আজকের আধুনিক পৃথিবী পেয়েছি। চলুন জেনে নেওয়া যাক আলোচিত কিছু সভ্যতার গল্প।


সব মানুষের পূর্বপুরুষ আফ্রিকান


পৃথিবীতে প্রথম মানবসমাজের উদ্ভব হয়েছিল আফ্রিকা মহাদেশে, প্রায় ২ লাখ বছর আগে। আফ্রিকাকে বলা চলে আদি মানুষের নিবাস। এরও প্রায় ৭০ হাজার বছর পরে, তার মানে আজ থেকে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার বছর আগে তারা ছড়িয়ে পড়তে লাগল আফ্রিকার বাইরে, পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায়। প্রায় ৯০ হাজার বছর আগে তারা ইউরোপে আর মধ্যপ্রাচ্যে পেঁৗছায়। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আমেরিকা মহাদেশেই মানুষ পৌঁছায় সবার শেষে। সেখানে মানুষ পেঁৗছায় আজ থেকে মাত্র ১৫ হাজার বছর আগে!

আজকের সভ্য পৃথিবীর শুরুটা হয়েছিল ইউরোপ আর এশিয়া মহাদেশ থেকে। এশিয়ার আরব, পারস্য, ভারত, চীন ছিল সমৃদ্ধশালী এলাকা। আর ইউরোপে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি, গ্রিস ছিল উন্নত দেশ। আফ্রিকার মিসরও কিন্তু এক সময় অনেক উন্নত ছিল। জলপথ আবিষ্কারের মাধ্যমেই কিন্তু শুরু হয়েছিল ইউরোপ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য। এই জলপথ ব্যবহার করেই ইউরোপীয় বণিকরা আসা শুরু করে ভারতে। শুরু করে তাদের বসতি স্থাপন। একে একে আসে স্পেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের বণিকরা। এই জলপথ আবিষ্কারের সঙ্গে সূচনা হয় এই অঞ্চলের নতুন ইতিহাসের।

ইনকা সভ্যতা


যুগের পর যুগ ধরে প্রত্নতাত্তি্বকরা নানা প্রাচীন সভ্যতার খোঁজ করছেন। এর মধ্যে কোনোটি সমৃদ্ধ কোনোটিবা একেবারে অগোছাল। কোনোটির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আবার কোনোটি এখনো রয়ে গেছে অদ্ভুত রহস্যময়তার বেড়াজালে বন্দী। নেটিভ আমেরিকানদের ইনকা সভ্যতা এমনই এক রহস্যময় সাম্রাজ্য। তাদের সম্বন্ধে লিখিত কোনো তথ্য আজও আবিষ্কৃত হয়নি। তবে নানা প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন থেকে এ সভ্যতা সম্পর্কে অনুমান করা হয়। তাদের স্থাপত্যশৈলী ছিল অসাধারণ। মিসরের পিরামিডের নির্মাণশৈলী যেমন আধুনিক মানুষকে বিস্মিত করে, ঠিক তেমনি নান্দনিক ছিল ইনকাদের স্থাপত্যশৈলী। ইনকা সাম্রাজ্য 'কেচুয়া' নামক নেটিভ আমেরিকানদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বছর ধরে রাজত্ব করে গেছে। কেচুয়া জাতির শাসকদের মর্যাদা দেবতাতুল্য বলে তাদের ইনকা বলা হতো। সূর্যদেবকে তারা ইনতি বলে ডাকত এবং সেই নামের প্রতিনিধিত্ব করত ইনকা শাসকরা। একটি উপজাতি হিসেবে বর্তমান পেরুর কুস্কো এলাকায় সুপ্রাচীন ইনকা সভ্যতার সূচনা হয়েছিল। ইনকা সাম্রাজ্য একসময় বিস্তৃত ছিল বর্তমান পেরুর কুস্কো ভ্যালি থেকে উত্তরে ইকোয়েডর এবং সুদূর দক্ষিণে বলিভিয়া, চিলি এবং আর্জেন্টিনা পর্যন্ত। পেরুর কুস্কো ভ্যালিকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু মনে করা হচ্ছে বর্তমান প্রত্নতাত্তি্বক অনুসন্ধানকে ভিত্তি করে। ইনকাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টেট অব দ্য আর্ট নিদর্শন যা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত_ তা হলো মাচুপিচু। সমতল থেকে প্রায় এক হাজার ৮০০ ফুট উপরে এক দুর্গ শহর।

পেরুর কুস্কো অঞ্চলেই উপকথার প্রথম সাপা ইনকা মাংকো কাপাক ১২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কুস্কো রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে মাংকো কাপাকের উত্তরসূরিদের অধীনে আন্দিজ পর্বতমালার অন্যসব জাতিগোষ্ঠীকে নিজেদের মধ্যে নিয়ে এসে এ রাজ্যটি বিস্তার লাভ করে। ১৪৪২ সালের মধ্যেই রাজা পাচকুতিকের অধীনে ইনকারা তাদের সাম্রাজ্য দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত করে। পাচকুতিক নামের অর্থই হচ্ছে- পৃথিবী কাঁপানো মানুষ। তিনিই ইনকা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের আগে দুই আমেরিকা মহাদেশের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য ছিল।

ইনকাদের নির্মাণশৈলী খুবই নিখুঁত এবং সাদামাঠা। মিসরীয় ফারাওদের মতো তাদের সম্রাটরাও ডেমিগড মর্যাদার অধিকারী ছিল। স্পেনীয় দখলদারদের আক্রমণে ১৫৩২ সালে ক্ষমতাধর ইনকা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায় এবং অনেক পরে তাদের ধ্বংসস্তূপ থেকে ইতিহাসের পাতায় তুলে আনেন একজন উত্তর আমেরিকান এঙ্প্লোরার হায়ার্যাম বিংগাম। ১৯১১ সালে হায়ার্যাম বিংগাম তার ব্যক্তিগত ভ্রমণ অনুসন্ধিৎসা থেকে চলতে চলতে মাচুপিচু দুর্গনগরী, ইনকাদের শেষ আশ্চর্য নিদর্শন আবিষ্কার করেন। যখন তিনি প্রথম সে জায়গাটি খুঁজে পান তখন তিনি অনুমান করতে পারেননি, তিনি একটি মূল্যবান প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু তার সহজাত অনুসন্ধিৎসা তাকে আবার সেখানে ফিরে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীকালে পেশাদার প্রত্নতাত্তি্বকদের সহায়তায় তিনি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের এই সভ্যতাকে আবিষ্কার করেন।

বিধ্বংসী স্পেনিশ অভিযাত্রীরা বারবার আঘাত হেনেছিল ইনকাদের প্রাচুর্যে। তারা লুটপাট, হত্যাসহ আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে ইনকা সভ্যতার সমৃদ্ধ শহরগুলো। মূলত সেই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ইনকা সম্পর্কে খুব অল্পই তথ্য-প্রমাণ মিলেছে।

ইনকাদের স্মৃতি ও প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শনগুলো রহস্য হয়ে থাকার কারণ তাদের অধিক পরিমাণে স্বর্ণ ও রৌপ্যের ব্যবহার। স্পেনীয় দখলদাররা নেটিভ আমেরিকানদের আক্রমণ ও তাদের দেশ দখল করার কারণ ছিল, স্বর্ণ ও রৌপ্যের লোভ। সেজন্য মনে করা হয় ইনকাদের স্বর্ণ ও রৌপ্যের ঐতিহ্যই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়েছিল। একই কারণে তাদের বিভিন্ন নিদর্শন স্পেনীয়দের দ্বারা লুট হয়ে যাওয়া ও সেগুলোর স্বর্ণ ও রৌপ্য গলিয়ে ফেলার কারণে ইনকাদের সম্বন্ধে অনুমান করা আরও দূরূহ হয়ে পড়ে।

স্বর্ণের প্রতি ছিল ইনকাদের অন্যরকম আগ্রহ। এর পেছনে কারণ ছিল তারা স্বর্ণকে সূর্য দেবের প্রতীক ভাবত। তাদের মন্দিরগুলোতে তাই স্বর্ণের ব্যাপক ব্যবহার ছিল।


মুসলিম সভ্যতা


বিশ্বের সমৃদ্ধতম সভ্যতাগুলোর একটি হচ্ছে মুসলিম সভ্যতা। এই সভ্যতার উৎপত্তি মূলত ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের মাধ্যমে। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে এই সভ্যতার উৎপত্তি হয়েছে। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়_ এই সভ্যতা গড়ে উঠেছে যুক্তির উপর ভিত্তি করে। এই সভ্যতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো হল, কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বাইরে থাকা। আধুনিক জীবনধারার নতুন ধারণার বিবর্তনে এই সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। আরব বিশ্বে ইসলামের দাওয়াতি কাজ যখন শুরু হয় তখন সেখানকার মানুষ বর্বর ছিল। তাদের মধ্যে কোনো জ্ঞানের আলো ছিল না। ইসলাম তাদের জীবনে আলোকবার্তকা হয়ে ধরা দেয়। জ্ঞান ও প্রজ্ঞাভিত্তিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে ইসলাম বর্বর আরবদের জীবনের গতিধারাই পাল্টে দেয়। প্রাথমিক যুগেই সমুজ্জল হয়ে ওঠে মুসলিম সভ্যতা।

উইল ডোরান্ট তার সভ্যতার ইতিহাস শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, মুসলিম সভ্যতার মতো এত বিস্ময়কর সভ্যতা আর দ্বিতীয়টি নেই। ইসলাম যদি গতিময় না হতো এবং অন্যান্য সংস্কৃতিকে বিলীন করার চেষ্টা চালাত তাহলে মুসলিম সভ্যতা আরব ভূখণ্ডের গণ্ডি পেরোতে সক্ষম হতো না। এসব গুণাবলীর কারণেই ইসলাম এক শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে অন্যান্য সভ্যতাকে আকৃষ্ট করে বিশাল এক সভ্যতায় পরিণত হতে সক্ষম হয়েছিল ।

সিন্ধু সভ্যতা


উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত সভ্যাটির নাম হলো সিন্ধু সভ্যতা। এই সিন্ধু সভ্যতা ছিল মূলত ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা। ইতিহাসে ব্রোঞ্জ যুগ ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০- ১৩০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত সময়কালকে। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই সভ্যতার কেন্দ্র ছিল মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সিন্ধু নদের অববাহিকা। এই সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা নামেও পরিচিত। তবে আলোচিত এই সভ্যতার আবিষ্কার খুব বেশিদিন আগের নয়।

১৯২২-২৩ সালের কথা। ব্রিটিশ পুরাতত্ত্ববিদ স্যার জন মার্শালের ভারতীয় সহকারী রাখালদাস অধুনা পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের লারকানা জেলার মহেঞ্জোদাড়ো এলাকায় বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। তার ক'দিন আগেই মহেঞ্জোদাড়োর কয়েকশ' মাইল উত্তরে পাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলার হরপ্পায় একটি প্রাচীন শহরের চার-পাঁচটি স্তরবিশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছিল। আর এতেই নড়েচড়ে বসেন প্রত্নতাত্তি্বকরা। আশেপাশের এলাকাজুড়ে শুরু হয় ব্যাপকভিত্তিক অনুসন্ধান। ভারত ও পাকিস্তানের নানা জায়গায় এরকম আরো শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। এই আবিষ্কার সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্নতাত্তি্বক আবিষ্কারের সমস্ত অতীত রেকর্ড ভেঙে ফেলে। ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্তি্বকরা মনে করেন, এই সব শহর একটি স্বতন্ত্র সভ্যতার অন্তর্গত ছিল। এই সভ্যতাই সিন্ধু সভ্যতা, মেসোপটেমিয়ান সাহিত্যে সম্ভবত যার নাম মেলুহা। ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে বিচার করলে সিন্ধু সভ্যতা ছিল প্রাচীন পৃথিবীর বৃহত্তম সভ্যতা। এই সভ্যতার ব্যাপক বিস্তৃতি বিশ্বের অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতা থেকে এই সভ্যতাকে একদমই আলাদা করে তুলেছে।

এই সভ্যতা ছিল তাম্র-ব্রোঞ্জ [ক্যালকোলিথিক] যুগের সভ্যতা। কারণ, লোহার ব্যবহার এই অঞ্চলের অধিবাসীদের অজ্ঞাতই ছিল। এই সভ্যতার সামগ্রিক সময়কাল ধরা হয় ৫৫০০-১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। সিন্ধুবাসীদের প্রধান কৃষিজ ফসল ছিল গম, যব, মটর, খেজুর, তিল ও সরষে। সভ্যতার অনেক আগেই কৃষির উন্মেষ ও বিকাশ ঘটেছিল।

প্রস্তর যুগ


ভারতে প্রথম কবে মানুষ বসবাস শুরু করে, সঠিকভাবে তা বলা যায় না । মধ্যপ্রদেশের হোসংগাবাদ শহরের নিকটবর্তী হাথনোরা গ্রামের কাছে ভারতের প্রাচীনতম মানুষের নিদর্শনটি পাওয়া গেছে । এর সময় সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয় নি। অনুমান করা হয়েছে এর বয়স বড়োজোর ৫ লক্ষ বছর হবে । প্রাক্‌ঐতিহাসিক যুগের কোনো লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না । কারণ তখন মানুষ লিখতে পড়তে জানত না । একমাত্র তাদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও অস্ত্রশস্ত্র থেকে তাদের কথা জানতে পারা যায় । তখন মানুষ পাথরের সাহায্যে যন্ত্রপাতি তৈরি করত বলে প্রত্নতত্ত্ববিদরা এই যুগকে ‘প্রস্তর যুগ’ [Stone Age] বলে অভিহিত করেছেন । প্রস্তর যুগকে আবার তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে ,যথা- (১) পুরাপ্রস্তর যুগ [Palaeolithic Age বা Old Stone Age], (২) মধ্যপ্রস্তর যুগ [Mesolithic Age বা Middle Stone Age], ও (৩) নব্য প্রস্তর যুগ [Neolithic Age বা New Stone Age] ।

(১) পুরাপ্রস্তর যুগ [Palaeolithic Age বা Old Stone Age] : পুরাপ্রস্তর যুগের বিবর্তন দীর্ঘকাল জুড়ে চলেছিল । আনুমানিক ১০,০০০ বছর আগে, অর্থাৎ, ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পুরাপ্রস্তর যুগ শেষ হয় । এ সময় মানুষ চাষাবাদ করতে জানত না । তারা ছিল যাযাবর; ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াত । গাছের ফল ও পশুর মাংস ছিল তাদের প্রধান খাদ্য । এ সময় মানুষ ছিল খাদ্য সংগ্রহকারী । চাষবাস করে ফসল ফলাতে বা উৎপাদন করতে জানত না । পশু শিকারের জন্য তারা নানা ধরনের পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করত । গঙ্গা, যমুনা ও সিন্ধু উপত্যকার সমভূমি বাদ দিলে সারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে এগুলির নিদর্শন পাওয়া গেছে । এগুলির মধ্যে হাত কুঠার ছিল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ । পশ্চিম পাঞ্জাবের সোয়ান নদীর অববাহিকায় হাত কুঠারের নিদর্শন পাওয়া গেছে।

(২) মধ্যপ্রস্তর যুগ [Mesolithic Age বা Middle Stone Age]: ভারতে মধ্যপ্রস্তর যুগ আনুমানিক ৮০০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল । তবে ভারতের বাইরে অন্য অনেক জায়গায় এই যুগ অনুপস্থিত । সেইসব জায়গায় পুরাপ্রস্তরের পর সরাসরি নব্যপ্রস্তর যুগ শুরু হয় । এই সময়ও মানুষ ছিল খাদ্য সংগ্রহকারী, খাদ্য উৎপাদক নয় । কারণ তখনও পর্যন্ত মানুষ চাষ-আবাদ করতে শেখেনি । তবে পাথরের অস্ত্রগুলি এই সময় আয়তনে ছোটো হয়ে যায় । এই সময়ের অস্ত্রগুলিকে মাইক্রোলিথ (Microlith) বলা হয়; অর্থাৎ, ছোটো, শক্ত ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ত্রিকোণাকার । মৃৎশিল্পে ও চিত্রশিল্পেও মানুষ বেশ পটু হয়ে উঠে । মধ্যপ্রদেশের ভিমবেটকার গুহাচিত্র এ সময়ের উল্লেখ্য চিত্রশিল্পের নিদর্শন।

(৩) নব্যপ্রস্তর যুগ [Neolithic Age বা New Stone Age] :
আঞ্চলিক বৈষম্যগুলি ধরে মোটামুটিভাবে বলা যায়, খ্রি.পূ.৪০০০ অব্দ থেকে ভারতে নব্যপ্রস্তর যুগ শুরু হয় । মানুষ এ সময় কৃষিকাজ ও পশুপালন আয়ত্তে আনে এবং খাদ্য উৎপাদক হয়ে ওঠে । কাজেই মানুষ ক্রমশ: যাযাবরবৃত্তি ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে । মাটি ও বাঁশ দিয়ে ঘর তৈরি করা শিখে নেয় । বস্ত্রবয়ন শিল্প বিকশিত হয় । মৃতশিল্পের উন্নতি হয় । অস্ত্র ও যন্ত্রপাতিও আগের তুলনায় অনেক উন্নত, মসৃণ ও মজবুত হয় । আগুনের ব্যবহারেও মানুষ সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠে । মেহেরগড় এ যুগের সভ্যতা ।

মেহেরগড় সভ্যতা


মেহেরগড় সভ্যতা [Mehrgarh Civilisation]: হরপ্পা সভ্যতার আগে নব্যপ্রস্তর যুগের যে সব কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে মেহেরগড় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । হরপ্পা সভ্যতার কিছু কিছু লক্ষণ এই সভ্যতার মধ্যে পরিলক্ষিত হয় বলে অনেকে এই সভ্যতাকে আদি সিন্ধু সভ্যতা বলে অভিহিত করেছেন ।



(১) অবস্থান [Location of Mehrgarh Civilisation]: বালুচিস্তানের কাচ্চি সমতলভূমিতে বোলান নদীর পাড়ে কোয়েটা শহর থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে মেহেরগড়ের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে । জ্যাঁ ফ্রাসোয়া জারিজ -এর নেতৃত্বে ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদরা এই মেহেরগড় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছেন । এই সভ্যতার প্রধান কেন্দ্রগুলি হল কিলে গুল মহম্মদ, কোট ডিজি, গুমলা, মুন্ডিগাক, রানা ঘুনডাই, আনজিরা এবং মেহেরগড়।



(২) সময়কাল: প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে আনুমানিক ৭০০০ খ্রিস্টপূবাব্দে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল । এই সভ্যতা বহু বছর স্থায়ী হয়েছিল বলে মনে করা হয় ।



(৩) সভ্যতার বৈশিষ্ঠ:[Characteristics of Mehrgarh Civilisation] : মেহেরগড়ের খনন কার্যের ফলে যে সব তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে চাষবাসের কিছু প্রমাণ মিলেছে এবং বহু দূর দেশের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্যের সম্পর্কের প্রমাণও পাওয়া যায় । এখানকার মানুষ যে ঘরবাড়ি তৈরি করে গ্রাম স্থাপন করেছিল, প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যে তার প্রমাণ মেলে ।



(ক) প্রাচীনতর পর্যায়ে একাধিক ঘর নিয়ে বাড়ি তৈরি করা হত । এইসব বাড়ি তৈরি হত রোদে শুকানো ইটের সাহায্যে । এই সময় তারা চাষবাস, পশুপালন ও শিকার করত । মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হত এবং কোঁকড়ানো অবস্থায় সমাধিস্থ মৃতদেহ পাওয়া গেছে ।



(খ) পরের দিকে কৃষিকার্য ও পশুপালনের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায় । এই সময় তারা মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহার করতে শুরু করেছিল । বাড়িগুলিও আকারে বড়ো হয়েছিল । এইসব বাড়ি থেকে ছোটো শিলনোড়ার পাথর, উনুন, হাড় দিয়ে তৈরি হাতিয়ার ইত্যাদি জিনিস পাওয়া গেছে । সমাধির মধ্যে যে সব জিনিস পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ঝিনুকের তৈরি লকেট, পুঁতি ও ঝিনুক জাতীয় জিনিসের মালা, পাথরের লকেট, হাড়ের আংটি, পালিশ করা পাথরের কুডুল ইত্যাদি প্রধান । তখনকার মানুষ যব, গম, কুল, খেজুর ইত্যাদি চাষ করত । জন্তুজানোয়ারের মধ্যে হরিণ, হাতি, নীলগাই, বুনো ভেড়া ও ছাগল, শুয়োর, গোরু ইত্যাদির হাড় পাওয়া গেছে । গরু, ভেড়া, ছাগল এবং সম্ভবত কুকুরও পোষ মানানো হত । শুধু চাষবাস বা পশুপালন এখানকার মানুষের উপজীবিকা ছিল না । ব্যবসা বাণিজ্যও করত । এখানে পাওয়া সামুদ্রিক ঝিনুক থেকে মনে হয় সমুদ্র উপকূলবর্তী স্থানের সঙ্গে এদের ব্যাবসাবাণিজ্য চলত । মেহেরগড়ে যে সব পাথর পাওয়া গেছে তা থেকে মনে হয়, তাদের বাণিজ্য অন্তত তুর্কমেনিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । পাথর দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র বা জিনিসপত্র তৈরি হত । ধাতুর ব্যবহার অজ্ঞাত হলেও, সমাধি থেকে তামার তৈরি একটি পুঁতি পাওয়া গেছে । এখানে পাথরের তৈরি কুড়ুল পাওয়া গেছে ।


(৪) মেহেরগড় সভ্যতার গুরুত্ব [Importance of Mehrgarh Civilisation]: মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ । প্রথমত, এখানে গম ও যব চাষের যে প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা থেকে বোঝা যায় যে, এই দুটি শস্যের সূত্রপাত পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতে আমদানি করা হয়নি । দ্বিতীয়ত, এই সভ্যতা নব্যপ্রস্তর যুগের হলেও তামা, সিসা প্রভৃতি ধাতুও পুরোপুরি অজ্ঞাত ছিল না । তৃতীয়ত, এখানকার মানুষ দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য করত । চতুর্থত, এখানে কাঁচা মাটি দিয়ে পুরুষমূর্তি ও পোড়া মাটির নারীমূর্তি পাওয়া গেছে । তবে এই সব মূর্তির সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক কতটুকু ছিল, তা সঠিক ভাবে বলা যায় না । পরিশেষে, এই সভ্যতার আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, সিন্ধু সভ্যতার আগে নব্যপ্রস্তর যুগে বালুচিস্তান অঞ্চলে একটি মোটের উপর উন্নত গ্রামকেন্দ্রিক সভ্যতা ছিল। এই জন্য অনেকে এই সভ্যতাকে আদি সিন্ধু সভ্যতা বলে অভিহিত করেছেন ।

তাম্রযুগ


নব্য প্রস্তর যুগের অবসান হওয়ার পর ধাতুর ব্যবহার শুরু হয় । তবে কোথায় নব্যপ্রস্তর যুগের অবসান আর কোথায় ধাতব যুগের সূত্রপাত তা সঠিক ভাবে বলা যায় না । নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে ধাতব যুগের উত্তরণ হয়েছিল খুব ধীরে ধীরে । ধাতুর ব্যবহার ভারতের সর্বত্র একসঙ্গে হয়নি । উত্তর ভারতে প্রস্তর যুগের শেষ দিকে মানুষ তামার ব্যবহার শিখেছিল । তবে পাথরের ব্যবহার ও গুরুত্ব তখনও অব্যাহত ছিল । তাই এই যুগকে তাম্র-প্রস্তর যুগ বা (Chalcolithic Age) বলে । সিন্ধু সভ্যতা এই যুগের সভ্যতা । তামার পর ধীরে ধীরে লোহার প্রচলন শুরু হয় । অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতে প্রস্তর যুগের পরেই লৌহ যুগ শুরু হয় । ভারতে কোথাও ব্রোঞ্জযুগের কোনো উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় না ।

সান সিং তুন সভ্যতা


সান সিং তুন বিশ্বের আরেকটি প্রাচীন সভ্যতা যেটির উৎপত্তি ও বিকাশ এশিয়ায়। আর স্পষ্ট করে বললে চীনে। এই সভ্যতার আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত এখানকার সভ্যতা ও জীবন সম্পর্কে মানুষের ধারণাটা তেমন একটা স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু সান সিং তুন সভ্যতার আবিষ্কার সবকিছু আমূল বদলে দেয়। মজার ব্যাপার হলো এ সভ্যতার আবিষ্কারের গল্পটিও খুব অবাক করার মতো। এই সভ্যতার নামকরণ করা হয়েছে মূলত একটি গ্রামের নামে। সান সিং নামের একটি গ্রাম থেকে এই নামের উৎপত্তি। একজন সাধারণ কৃষকের কল্যাণে গোচা একটি সভ্যতা আবিষ্কৃত হবে, এমনটি কখনো কেউ ভাবেনি।

অথচ সান সিং তুন সভ্যতার আবিষ্কারের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন ইয়ে নামের একজন গরিব কৃষক। গরিব ইয়ে জমি চাষ করার সময় এমন বিস্ময়কর আবিষ্কার করবেন ভাবেননি তিনি নিজেও। জমি চাষ করতে গিয়ে আবিষ্কার হওয়া এখানকার প্রত্নতত্ত্ব ও আশপাশের এলাকা নিয়ে এরপর গবেষণা চলেছে একটানা কয়েক দশক। আর এ গবেষণা থেকেই উঠে এসেছে দারুণ এক ইতিহাস। পাঁচ থেকে তিন হাজার বছর আগে এখানে প্রাচীন শু রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল। সুউজ্জ্বল এই সভ্যতা এখানে ২০০০ বছর স্থায়ী ছিল। সান সিং তুন ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের ফলে শু রাষ্ট্রের ইতিহাস আর ২০০০ বছর এগিয়েছে। এ আবিষ্কার চীনের সভ্যতার ইতিহাসকে আর সুসম্পন্ন করেছে। সান সিং তুন সভ্যতা আর ছুয়াং চিয়াং নদীর সভ্যতা ও হোয়াংহো নদীর সভ্যতার মতো সবই চীনের সভ্যতার মূল ভিত্তি। সান সিং গ্রাম চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের সিচুয়ান প্রদেশে অবস্থিত। রাজধানী চেন তুং থেকে গাড়িতে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। আবিষ্কারের পর থেকেই আস্তে আস্তে পাল্টে যেতে থাকে এই গ্রামটি। বছর দশেক আগে এখানে সান সিং তুন নামে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রায় ৫০০০ বছর আগের পুরনো এই প্রাচীন নগরের অনেক ঐতিহ্য রয়েছে। ধারণা করা হয় ৩০০০ বছর আগে শহরটিকে আকস্মিকভাবে বাতিল করা হয়।

ফলে খুব উন্নত মানের সান সিং তুন সভ্যতা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। পাঁচ বছর আগে চেন তুং শহরের উপকণ্ঠে আবিষ্কৃত কিনশা ধ্বংসাবশেষ এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারও কারও মতে সান সিং তুন বর্তমান কিনশা ধ্বংসাবশেষের জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু ২০০০ বছর স্থায়ী এমন একটি প্রাচীন নগরকে বাতিল করার পেছনে নিশ্চয়ই কারণ ছিল? অবশ্যই ছিল। কারও মতে বন্যার জন্য আবার কারও মতে যুদ্ধের জন্য।

আবার একদল বলেন, মহামারী রোগের জন্য শহরটি বিলীন হয়েছে। কিন্তু এ সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক রেকর্ড নেই, সেই জন্য আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে এক গোলক ধাঁধা রয়েছে। 

ওলমেক সভ্যতা


খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ঘটনাটা ১৮৬২ সালের। মেক্সিকো তখনো জঙ্গল আর জলাভূমিতে ভরা এক নির্জন দেশ। এরকমই একটা অরণ্যঘেরা জলাভূমিতে চাষের জন্য মাটি খোঁড়াখুঁড়ি চলছিল। হঠাৎ করেই পাথর বা ধাতুর একটি বিরাট বস্তু বেরিয়ে এলো। মাটির নিচে পুঁতে রাখা জিনিসটা দেখে চাষিদের মনে হলো এটা একটি লোহার কেতলি। গুপ্তধনের লোভে ওদের চোখ চকচক করে উঠল। দ্বিগুণ উদ্যমে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করল তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জায়গাটা খুঁড়ে পাথরের একটি ভাস্কর্যের ভাঙা মাথার সন্ধান মিলল। গুপ্তধনের দেখা না পেয়ে চাষিরা ভীষণ হতাশ হলো। কিন্তু আগ্রহী হয়ে ওঠলেন প্রত্নতাত্তি্বকরা। কারণ এই ভাঙা মাথাটিই যে প্রাচীন ওলমেক সভ্যতার প্রথম নিদর্শন।

সেই শুরু। তবে ওমলেক সভ্যতা বলে আদৌ কিছু ছিল কি না তা নিয়ে বিতর্কের কমতি ছিল না। ১৯৪২ সালে মেক্সিকো তে এক আন্তর্জাতিক প্রত্নতাত্তি্বক সম্মেলনে অজস্র নমুনা ও প্রমাণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ওলমেক সভ্যতার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সবাইকে নিশ্চিত করা হয়। নতুন সন্ধান পাওয়া এই সভ্যতার প্রাচুর্য দেখে হতবাক হয়ে গেলেন প্রত্নতাত্তি্বকরা।

'ওলমেক' শব্দটি এসেছে অ্যাজটেক সভ্যতার 'নাহুতল' ভাষা থেকে। শব্দটির অর্থ হচ্ছে 'রাবার পিপল'। ১৫-১৬ শতকে উপসাগরীয় এলাকার নাব্যদেশে যারা বসবাস করত তাদের এই নামে ডাকা হতো। ওলমেকদের আদিনিবাস ধরা হয় আফ্রিকাকে। সেখান থেকে বহুদূরের পথ পেরিয়ে ওলমেকরা এসেছিল আমেরিকায়। ওলমেকদের অনেকে বলে থাকেন 'নওবান'। এটাই নাকি ওদের আসল নাম। আজ থেকে তিন হাজারেরও বেশি সময় আগে গড়ে উঠেছিল প্রাচুর্যে ভরা এই ওমলেক সভ্যতা। এটি ছিল প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মেসো আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা। মেসো আমেরিকা অর্থ মধ্য আমেরিকা। আর ওলমেকরাই মেসো আমেরিকার প্রাচীন বাসিন্দা। ওলমেক সভ্যতার কেন্দ্র ছিল মেঙ্েিকার ইউকান উপদ্বীপ। মেঙ্েিকা উপসাগরের উপকূলে টুঙ্টিলা পাহাড়ের পাদদেশের জলাভূমিময় জঙ্গলে, সে জঙ্গলের পাশে গ্রামে এবং নগরে বাস করত ওলমেকরা। বর্তমান মেঙ্েিকার ভেরাকুজ ও তাবাসকো প্রদেশই প্রথম নগর ও গ্রাম গড়ে তুলেছিল ওলমেকরা। প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে মায়ান ও অ্যাজটেক সভ্যতার কথা খুব শোনা গেলেও ওলমেক সভ্যতা এই দুই সভ্যতা থেকেও বুড়ো এবং সমৃদ্ধিশালী। ওলমেক সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন থেকে পণ্ডিতরা অনুমান করছেন, অ্যাজটেক ও মায়ান বিখ্যাত সভ্যতার অনেক কিছুই মায়ানদের দান করা। আর তাছাড়া ওমলেকদের সূক্ষ্ম খোদাইয়ের কাজ, বিরাট ভাস্কর্য, ভাষার ব্যবহার, গণিতশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য এবং বর্ষপঞ্জি প্রত্নতাত্তি্বকদের চমক লাগিয়ে দিয়েছে। পরবর্তী বিখ্যাত সভ্যতাগুলোর মতোই তারা পুরো ৩৬৫ দিনের এক দিনপঞ্জিকা মেনে চলত। তার চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ওলমেকরাও পিরামিড বানাতে জানত। আর পশ্চিমা দুনিয়ায় ওলমেকরাই সম্ভবত প্রথম জাতি, যারা নিজেদের একটি লিখন-পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল। আর মায়ান সভ্যতার বর্ণমালা ওলমেক সভ্যতার প্রভাবেই গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়। ওলমেকদের জীবনে ধর্ম ছিল কেন্দ্রজুড়ে, ছিল তাদের শাসকরা। আর সেই শাসকরা ছিলেন শামান। তাই যারা শাসক তারাই ছিলেন ওমলেকদের ধর্মীয় নেতা। সেই শামানরা নাকি রূপান্তরিত হতে পারত! বেশির ভাগ ওলমেকই গ্রামে বসবাস করত। আর এরা অরণ্য ও ঝোপঝাড় পুড়িয়ে ভুট্টা ও সূর্যমুখীর চাষ করত। বন্যার সময় ছাড়া তারা নদীর ধারেও চাষ করত। ভুট্টা ছাড়াও বুনত শিম, লাউ ও মিষ্টি আলু। সবজি ছাড়া তারা খেত মাছ, কাছিম, সাপ, ভোঁদড়, কাঁকড়া, হরিণ, খরগোশ ও পাখি। আর তারা খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে রাখার কৌশল জানত। পরবর্তী সময়ে যা খুঁজে পাওয়া গেছে অ্যাজটেকদের মধ্যে। ওলমেকদের চারটি শহরকে চিহ্নিত করা গেছে। লাগুনা দো লোজ সেরম, সান লোরেনজো, তে জাপাও আর লা তোনও।

এগুলো প্রতিটিই উন্নত স্থাপনায় ও শৈলীতে সমৃদ্ধ। ওলমেক সভ্যতার প্রাচুর্য আর অগ্রগতি প্রত্নতাত্তি্বকদের অবাক করেছে। অনেক প্রশ্নের উত্তর আজো মেলেনি। ওলমেকরা কিভাবে আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় এলো? তারা কিভাবে এত তাড়াতাড়ি সব কিছু শিখে ফেলল? তাদের এই বিচিত্র ভাস্কর্যবিদ্যার উৎস কি? আবার রাতারাতি এ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেল কিভাবে! আর এ সভ্যতার প্রাণরস কিভাবে পৌছে গেল মায়ান আর অ্যাজটেক সভ্যতার মধ্যে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজো মেলেনি।

বৈদিক সভ্যতা


উদ্ভব ও বিবর্তন: আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংস ও আর্য সভ্যতার বিকাশ হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কিন্তু উভয় সভ্যতার মধ্যে সম্পর্ক, কোনটি আগে, কোনটি পরে বা আর্যরাই সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কিনা, আর্যদের আদি বাসস্থান ভারতে, না তারা বহিরাগত— এইসব প্রশ্ন নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার অন্ত নেই। এসব প্রশ্নের সর্বজনগ্রাহ্য কোনো উত্তর হয় না । বেদ ছিল আর্য মনীষার প্রধান ফসল এবং বেদ থেকেই আমরা আর্যসভ্যতার পরিচয় পাই। তাই এই সভ্যতাকে বৈদিক সভ্যতা বলা হয় । ঋক্‌বেদের সময় থেকেই ভারতে ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয়। ঋক্‌বেদ কবে রচিত হয়েছিল, তা সঠিকভাবে জানা যায় না । ম্যাক্সমুলারের মতে, এর রচনা কাল খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের মধ্যে। বালগঙ্গাধর তিলকের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দ । দ্বিতীয় মতটি কেউই গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না। যাই হোক, সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের মধ্যে ঋক্‌বেদ রচিত হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। এই যুগকে তাই ঋক্‌বৈদিক যুগ বলা হয়। ঋক্‌বৈদিক যুগের পরবর্তী যুগকে পরবর্তী-বৈদিক যুগ বলা হয়।

বৈদিক সভ্যতার বৈশিষ্ট্য [Features of vedic civilisation]:


সাধারণভাবে খ্রীস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রীস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ পর্যন্ত প্রায় ১০০০ বছরকে আমরা বৈদিক যুগ বলে থাকি। এই যুগের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সহজেই চোখে পড়ে । প্রথমত,এই সময় থেকেই ভারতে ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয় । অর্থাৎ এই সময় থেকেই আমরা সাহিত্যিক উপাদানের উপর নির্ভর করতে পারি । বেদ থেকে আমরা সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের বহু মূল্যবান তথ্য জানতে পারি । দ্বিতীয়ত, এই সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের কাছে অস্পষ্ট ও অনেকাংশে অজ্ঞাত । তৃতীয়ত, বৈদিক সাহিত্যের উৎকর্ষতা ও উন্নত মান যেকোনো দেশের গর্বের বস্তু । এই সময়ে এত উন্নত মানের সাহিত্য পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায়নি। চতুর্থত, বৈদিক সভ্যতাই উত্তর ভারতের গঙ্গা-যমুনা বিধৌত বিস্তীর্ণ সমভুমির প্রথম সভ্যতা । সিন্ধু সভ্যতার পূর্বতম সীমানা ছিল মিরাট জেলার আলমগিরপুর । পঞ্চমত, বৈদিক সভ্যতা ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। প্রথমে তারা যাযাবর জীবন যাপন করত । পশুপালন ছিল তাদের প্রধান উপজীবিকা । পরে তারা কৃষিকাজ শুরু করে ও গ্রাম গড়ে তোলে। পরিশেষে, মনে রাখা দরকার যে,আর্যরা যে উন্নত মানের সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল,তা যুগে যুগে ভারতবাসীকে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং আজ আমরা সেই ঐতিহ্য ও পরম্পরার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি।

প্রকাশিত হয়েছে: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Wednesday, December 19, 2012

নেফারতিতি

0 comments
প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় বিখ্যাত রানীদের মধ্যে নেফারটিটি ছিলেন অন্যতম। তিনি ছিলেন ফারা আখেনাটেন-এর স্ত্রী। মিসরীয়দের ধর্মীয় আচরণে আখেনাটেন যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন, তাতে নেফারতিতিরও সহযোগিতা ছিল। মিসরীয় সভ্যতার প্রধান দেবতা হিসেবে আমরা সূর্যকে জানলেও আগে মিসরে বহু দেবতা পূজা করার প্রচলন ছিল। আখেনাটেনও নেফারতিতির উদ্যোগেই মিসরীয়রা সূর্যকে একমাত্র দেবতা হিসেবে পূজা করতে শুরু করে। অর্থাৎ মিসরে বহু দেবতার বদলে এক ঈশ্বরের পূজা প্রচলিত হয়। তবে নেফারটিটি অন্য দেবতাদেরও শ্রদ্ধা করতেন। প্রাচীন মিসরীয় পুঁতিপত্রে নেফারতিতিকে খুশি, আনন্দ বা ভালোবাসার প্রতীক হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

বার্লিনের নিউইস জাদুঘরে রাখা তার মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন ভাস্কর থুটমোস। এই মূর্তিটি থেকে সে যুগের মিসরের শিল্পকলা সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানা যায়।

Tuesday, November 13, 2012

তাজমহল

0 comments
পৃথিবীর সেরা আশ্চর্য্যগুলোর মধ্যে অন্যতম তাজমহল। ভারতের আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত তাজমহল একটি রাজকীয় সমাধি। মোঘল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগমের স্মৃতি রায় এই অপূর্ব সৌধটি নির্মাণ করেন।
তাজমহল বা শুধু তাজ হিসেবে পরিচিত এই মর্মর সৌধের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে। আর কাজ শেষ হয় ১৬৪৮ এ।

তাজমহলকে মোঘল স্থাপত্যশৈলীর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে মনে করা হয়। এর নির্মাণশৈলীতে অসাধারণ পারঙ্গমতায় পারস্য, তুরস্ক, ভারতীয় এবং ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর সম্মিলন ঘটানো হয়েছে।


যদিও তাজ কমপ্লেঙ্ এর কেন্দ্রে থাকা সাদা মার্বেলের গম্বুজাকৃতির রাজকীয় সমাধীটিই সাধারণ্যে অধিক সমাদৃত আর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু, তবে তাজমহল সামগ্রিকভাবে একটি জটিল অখণ্ড স্থাপত্যকীর্তি। এটি ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে সংরণের তালিকাভুক্ত করে। তখন একে বলা হয়েছিল, বিশ্ব ঐতিহ্যের চিরকাল সমাদৃত শ্রেষ্ঠ শিল্প নিদর্শন (universally admired masterpiece of the world`s heritage).


১৬৩১ খ্রিস্টাব্দে মোঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী মুমতাজ মহল তাদের চতুর্দশ সন্তান গৌহর বেগমের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এ মৃত্যুতে প্রচণ্ড শোকাহত হয়ে পড়েন শাহজাহান। তিনি প্রিয়তমা স্ত্রীর স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য তাজমহল গড়ার উদ্যোগ নেন।



তাজমহলের নির্মাণ কাজ শুরু হয় মমতাজের মৃত্যুর ঠিক পরপরই। মূল সমাধিটি সম্পূর্ণ হয় ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে এবং এর চারদিকের ইমারত এবং বাগান আরও পাঁচ বছর পরে তৈরি হয়।

স্বেত মর্মরে নির্মিত তাজমহল অন্যান্য মুঘল সমাধি সৌধের মতই মূলতঃ পারস্যদেশীয় বৈশিষ্টমণ্ডিত, যেমন আইওয়ানসহ প্রতিসম ইমারত, এ ধনুক আকৃতির দরজার ওপরে বড় গম্বুজ। বর্গাকার বেদির উপর স্থাপিত সমাধির ভিত্তি কাঠামোটি বিশাল এবং কয়েক কবিশিষ্ট। প্রধান কটিতে মুমতাজ মহল ও শাহজাহানের স্মৃতিফলক বসানো, তাদের কবর রয়েছে এক স্তর নিচে।

সমাধির উপরের মার্বেল পাথরের গম্বুজই এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। এর আকার প্রায় ইমারতের ভিত্তির সমান, প্রায় ৩৫ মিটার। এ ধরণের উচ্চতা হওয়ার কারণ, গম্বুজটি একটি ৭ মিটার উচ্চতার সিলিন্ডার আকৃতির ড্রাম এর উপরে বসানো।

তাজমহলের নির্মাণ কাজ শেষ হতে না হতেই শাহজাহান পুত্র আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দি ও মতাচ্যুত হন। তাকে আগ্রার কেল্লায় গৃহবন্দী করে রাখা হয়। কথিত আছে, জীবনের বাকি সময়টুকুর অধিকাংশ শাহজাহান আগ্রার কেল্লার জানালা দিয়ে তাজমহলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েই কাটিয়েছিলেন।

শাহজাহানের মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেব তাকে তাজমহলে স্ত্রী মমতাজের পাশে সমাহিত করেন। ১৯ শতকের শেষ ভাগে তাজমহলের একটি অংশ মেরামতের অভাবে তিগ্রস্থ হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের সময় ইংরেজ সৈন্যরা তাজমহলের বিকৃতি সাধন করে আর সরকারি কর্মচারীরা বাটালি দিয়ে তাজমহলের দেয়াল থেকে মূল্যবান ও দামী নীলকান্তমণি খুলে নিয়ে যায়।
১৯ শতকের শেষ দিকে লর্ড কার্জন তাজমহল পুণঃনির্মাণের একটি বড় প্রকল্প হাতে নেন। প্রকল্পের কাজ ১৯০৮ সালে শেষ হয়। তিনি তাজমহলের ভেতরের মঞ্চে একটি বড় বাতি (যা কায়রো মসজিদে ঝুলানো একটি বাতির অনুকরণে তৈরি করার কথা ছিল কিন্তু তৎকালীন কারিগরেরা ঠিক হুবুহু তৈরি করতে পারেনি) বসিয়েছিলেন। একইভাবে বাগানের নকশা পরিবর্তন করে ইংরেজ উদ্যানরীতিতে গড়া হয়। তাজের সামনের উদ্যানটি সেই নকশাতেই এখনও রয়েছে।

বিংশ শতাব্দীতে তাজমহলের রণাবেণে ব্যাপক মেনোযোগ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালে যখন জার্মান বিমান বাহিনী এবং পরে জাপানি বিমান বাহিনী আকাশপথে হামলা চালায়, তৎকালীন বৃটিশ সরকার তখন তাজমহল রার জন্য এর ওপর একটি ভারা তৈরি করেছিল। এরপর ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের সময়ও তাজমহলকে ভারা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল যাতে শত্রুপরে বৈমানিকের দৃষ্টিভ্রম হয় তাজকে খুঁজে নিতে।

তাজমহল সম্প্রতি যে হুমকির মুখে পরেছে তা হল যমুনা নদীর তীরের পরিবেশ দূষণ। এছাড়া মথুরাতে তেল পরিশোধনাগারের কারণে সৃষ্ট এসিড বৃষ্টি ( ওই শোধনাগারের বিষয়ে অবশ্য ভারতীয় উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে)।

১৯৮৩ সালে তাজমহলকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

Sunday, October 21, 2012

পাণ্ডু রাজার ঢিবি

0 comments
খুব কমসংখ্যক বাঙালি পাণ্ডু রাজার ঢিবি সম্পর্কে জানেন। তবে অনেক বাঙালিই জানেন সিন্ধু সভ্যতার কথা। প্রাচীন হরপ্পা, মহেঞ্জোদারোর পরিকল্পিত নগরী তাদের অবাক করে। নীলনদকেন্দ্রিক মিসরীয় সভ্যতাও অনেকের অজানা নয়। ব্যবিলনীয়, মেসোপটেমীয়, এসেরীয় সভ্যতা কিংবা প্রাচীন গ্রিক অথবা পারসিক সভ্যতা সম্পর্কেও তারা অনেকে খবর রাখেন। বিশেষ করে শিক্ষিত বাঙালি। সভ্যতা সম্পর্কে এ জ্ঞান তাদের পুলকিত করে। তারা বিস্মিত হন, মানব জাতির অংশ হিসেবে গৌরব বোধ করেন। এরূপ গৌরব করার মতো উপাদানই পাণ্ডু রাজার ঢিবি। যাকে বাংলা ও বাঙালি সভ্যতার স্মারক হিসেবে অভিহিত করা যায়।
নদীকেন্দ্রিক বাংলার বিস্তীর্ণ সমতল ভূ-ভাগ অপেক্ষাকৃত নবীন বলে এসব অঞ্চলে মানব বসতি গড়ে উঠেছে অনেক পরে। তাই সভ্যতার বয়সও এসব অঞ্চলে বেশি নয়। তবে বাংলার উত্তর, উত্তর-পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের পার্বত্যভূমি এবং নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহের ভূ-ভাগ অনেক প্রাচীন বলে এসব স্থানে মানব বসতি গড়ে ওঠে হাজার হাজার বছর আগে। অন্তত নব্য প্রস্তর যুগে স্থায়ী মানব বসতি গড়ে তুলে এসব অঞ্চলে আদি বাঙালিরা যে কৃষি সমাজের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। বিকাশের এ ধারা অব্যাহত ছিল এবং কালক্রমে উন্নতি ঘটেছিল। ক্রমোন্নতির ধারায় তাম্রপ্রস্তর যুগে বাংলার পুরনো ভূমি অঞ্চলের বিভিন্ন নদী উপত্যকায় গড়ে ওঠে সুসভ্য মানব বসতি। বিকাশ ঘটে উন্নত সংস্কৃতির। গড়ে ওঠে বাণিজ্যিক শহর। ধারণা করা হয় আলোচিত পাণ্ডুু রাজার ঢিবি এবং সংলগ্ন অঞ্চল ঘিরে এমনই এক বাণিজ্যিক শহরের পত্তন ঘটেছিল। বর্তমান পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলার অজয় নদীর দক্ষিণ তীর ঘেঁষে এ শহর গড়ে ওঠে।
প্রতœতত্ত্ববিদদের নিরলস খনন-প্রয়াসে ১৯৬২ সালে আবিষ্কৃত হয় পাণ্ডু রাজার ঢিবি। ঢিবি ও সংলগ্ন অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয় অসংখ্য তাম্রপ্রস্তর যুগের নিদর্শন। এসব নিদর্শন থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগেকার সুসভ্য বাঙালি সংস্কৃতি বা সভ্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময়কাল জগদ্বিখ্যাত সিন্ধু সভ্যতার প্রায় সমসাময়িক। তাই বলা যায়, যে সময়ে ভারতের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে উন্নত ধরনের সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল সে সময়ে বাংলাও পিছিয়ে ছিল না। পাণ্ডু রাজার ঢিবি ও সংলগ্ন অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রতœনিদর্শনসমূহ সাক্ষ্য দেয় চাষাবাদ, পশুপালন, ইট ও পাথরের ভিত্তির ওপর আরামদায়ক গৃহনির্মাণে বাঙালির পারঙ্গমতা ছিল ঈর্ষণীয়। তারা গোলাকার, বর্গাকার এবং আয়তাকার ঘর তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। পোড়া মাটির টুকরা এবং চুনের আস্তরণে ঘরগুলোর মেঝে পাকা করার কৌশল তারা আবিষ্কার করেছিলেন। নলখাগড়ার সঙ্গে মাটি মিশিয়ে তারা তৈরি করতেন ঘরের পোক্ত বেড়া বা দেয়াল। এরূপ দেয়াল আর খুঁটির ওপর নির্মিত হতো ঘরের ছাদ। শুধু গৃহনির্মাণ নয়, শিল্প ও শিল্পকলার নানা শাখায়ও তাদের উন্নতি ঘটেছিল ব্যাপক। ঢিবিতে প্রাপ্ত নিদর্শন এসব ক্ষেত্রে তাদের পারদর্শিতার প্রমাণ দেয়। একটি নিদর্শন ছিল মাটির পিণ্ডে রেশমি বস্ত্রের ছাপ। একে বস্ত্রশিল্প বিকাশের নিদর্শন হিসেবে পণ্ডিতরা উল্লেখ করেছেন। ঢিবিতে প্রাপ্ত পোড়া মাটির নিদর্শন বিশেষ করে চিত্রশোভিত মাটির পাত্র এবং মাতৃদেবীর প্রতিকৃতি সমসাময়িক বাংলার বিকশিত শিল্পকলার পরিচয়কেই তুলে ধরে।
পাণ্ডু রাজার ঢিবি এবং সংলগ্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক শহর থেকে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এমনকি দূর দেশেও বাণিজ্য পরিচালনা করা হতো বলে পণ্ডিতরা ধারণা করেন। এ ধারণার ভিত্তি তৈরি হয় ঢিবিতে প্রাপ্ত স্টিটাইট পাথরে নির্মিত এক গোলাকৃতি সিল থেকে। সিলটিতে কিছু খোদিত চিহ্ন আছে। যে চিহ্নগুলোকে চিত্রাক্ষর বলে শনাক্ত করা হয়। আর এ চিত্রাক্ষর থেকে বোঝা যায় সিলটি ভূমধ্যসাগরীয় ক্রিট দ্বীপের এবং আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে তা নির্মিত হয়েছিল। এ সিল এবং অনুরূপ আরও কিছু নিদর্শন থেকে অনুমিত হয় মানব সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন ইজিয়ান সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ শহর ক্রিটের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। পাণ্ডু রাজার ঢিবি এবং সংলগ্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক শহর থেকেই যে বাংলার প্রতিবেশী অঞ্চলে এবং দূর দেশে বাণিজ্য পরিচালনা করা হতো তা এক রকম নিশ্চিত করেই বলা যায়। আমরা জানি, বাণিজ্যে মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক, বিনিময়ের মাধ্যম। পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে একটি স্বর্ণমুদ্রার ভগ্নাবশেষ পাওয়া যায়। এর এক পীঠে মাছের প্রতীক আঁকা। মুদ্রার এ উপস্থিতি বাংলা অঞ্চলে সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক অর্থনীতির পরিচয় তুলে ধরে। আর এরূপ পরিচয় সূত্রে বলা যায়, আলোচ্য পাণ্ডু রাজার ঢিবি স্পষ্টতই বাংলা ও বাঙালি সভ্যতার স্মারক। জীবনযাপনের ক্রমোন্নতির প্রশ্নে আদি বাঙালিরা সমসাময়িক অপরাপর মানবগোষ্ঠী থেকে কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিলেন না পাণ্ডু রাজার ঢিবি তারই সাক্ষ্য বহন করে।
লেখক : প্রফেসর ড. এটিএম আতিকুর রহমান, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
এ সম্পর্কীয় আরেকটি রচনা_
পাণ্ডু রাজার ঢিবি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অজয় নদের তীরে বর্ধমান জেলার পাণ্ডুকে আবিষ্কৃত এ অঞ্চলের প্রথম তাম্র-প্রত্নযুগীয় প্রত্নস্থল। মধ্যপ্রস্তর যুগীয় প্রত্নস্থল বীরভনপুরের প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এর অবস্থান। ১৯৫৪-৫৭ সালের মধ্যে বিবি লাল কর্তৃক উৎখনন পরিচালিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রত্নতাত্তি্বক অধিদফতরের উদ্যোগে ১৯৬২-৬৫ এবং ১৯৮৫ সালে পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে কয়েক দফা প্রত্নতাত্তি্বক খনন চলে এবং বাংলার প্রাক-ইতিহাসের তাম্র-প্রত্ন যুগীয় সাংস্কৃতিক পর্যায়ে জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়। পর্যায়ক্রমে এখানে ৭৬টি তাম্র-প্রস্তর যুগীয় প্রত্নস্থল পাওয়া গেছে, যা বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলায় এবং ময়ুরাক্ষী (উত্তর), কোপাই, অজয়, কুনুর, ব্রাহ্মণী, দামোদর, দ্বারকেশ্বর, শীলাবতী এবং রূপনারায়ণ (দক্ষিণ) নদীর আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তাম্র-প্রত্ন যুগীয় প্রত্নস্থল পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করে মনে হয়, ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে এক বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নদীতীরে কৃষি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। যদিও তাম্র-প্রত্ন যুগীয় মানুষ ছিল প্রধানত কৃষিজীবী, তথাপি তারা শিকার অথবা মাছ ধরার কাজ বাদ দেয়নি। তারা কাদার আবরণকৃত দেয়ালবিশিষ্ট গোলাকার ও বর্গাকার সাদামাটা কুঁড়েঘরে বাস করত। ঘরের কোণে উনোন ও জ্বালানি রাখার স্থান নির্ধারিত ছিল। তারা ভাত খেত। সিদ্ধ মাংস, মাছ এবং ফলমূলও তাদের খাদ্য তালিকায় ছিল। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত তাম্র-প্রস্তর যুগীয় প্রত্নস্থলের মধ্যে সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হচ্ছে পাণ্ডু রাজার ঢিবি। ১৯৬২-৮৫ সালের মধ্যে ঢিবিটিতে (২০০ মি-১৭০ মি) পাঁচবার প্রত্নতাত্তি্বক খনন পরিচালিত হয়। ৪৪ মি থেকে ১০৫ মি পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের ৫৩টি ট্রেঞ্চে এ খনন কাজ চলে। ঢিবিটির প্রধান অংশ রাস্তা থেকে ৫ মিটার উঁচু। ১৯৮৫ সালের খননের মাধ্যমে প্রত্নস্থলে ৬টি স্তরের সন্ধান পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ট্রেঞ্চ স্বাভাবিক মাটির স্তর পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ তাম্র-প্রস্তর যুগীয় প্রত্নস্থলের মতো এখানেও দুটি প্রধান পর্ব বা স্তর রয়েছে : (ক) তাম্র-প্রস্তর যুগের পর্ব (খ) লৌগযুগের পর্ব। তাম্র-প্রস্তর যুগের পর্ব আবার মোটামুটিভাবে দু'ভাগে বিভক্ত। একটি ধাতুযুগের পূর্ববর্তী পর্ব এবং অপরটি লৌহযুগের পর্ব। পশ্চিমবঙ্গে তাম্র-প্রস্তর যুগ অব্যাহত ছিল সম্ভবত ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দপূর্ব পর্যন্ত। পাণ্ডুরাজার ঢিবি প্রত্নস্থলের গোচরে আসার ৬টি স্তরের প্রথম দুটি তাম্রপ্রস্তর যুগীয়। প্রথম পর্বের একেবারে নিচ থেকে অভ্যন্তরে তুষের দাগ বিশিষ্ট হাতে তৈরি ধূসর ও ফ্যাকাসে লাল রঙের মৃৎ শিল্পের টুকরো এবং মানুষের সমাধিস্থলের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ওপরের দিকে পাওয়া গেছে সাধারণ কালো, লাল ধূসর এবং অনুজ্জ্বল সিরামিক। এ স্তর থেকে মধ্যযুগীয় কিছু ছুরি ও ফলা পাওয়া গেছে। কিন্তু কোনো প্রকার তাম্র সামগ্রী পাওয়া যায়নি। তাই প্রথম পর্বের এ অংশটুকু ধাতু যুগের পূর্ববর্তী পর্যায়ের। দ্বিতীয় পর্বটি সম্পূর্ণভাবে তাম্র-প্রস্তর যুগীয় সংস্কৃতির নির্দেশক। এ স্তরে লাল, কালো ছোপাঙ্কিত লাল, সাদা ছোপাঙ্কিত লাল, কালো ও লাল মেশানো (ভেতর দিক সাদামাটা কিংবা ক্রিম অথবা সাদা রঙে রঞ্জিত) ক্রিম রঙের কাদামাটির প্রলেপযুক্ত এবং ধূসর মৃৎ পাত্রের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সিরামিক পাওয়া গেছে। 

Saturday, September 29, 2012

ফোর্ট উইলিয়াম

0 comments
ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের সর্বাধিক বিখ্যাত দুর্গ হলো ফোর্ট উইলিয়াম। ফোর্ট উইলিয়ামের মাধ্যমেই ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের ঘাঁটি নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিখ্যাত এই দুর্গটি কলকাতায় অবস্থিত। ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের একটি বড় নিদর্শন এই দুর্গ। বাস্তবে দুটি ফোর্ট উইলিয়াম ছিল: একটি পুরনো, অন্যটি নতুন। পুরনো দুর্গটি ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সূচনাকালের সৃষ্টি। স্যার চার্লস আইয়ার এই দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। তাঁর উত্তরসূরি জন বিয়ার্ড ১৭০১ সালে ফোর্ট উইলিয়ামের উত্তর-পূর্বাংশের দুর্গপ্রাচীর সংযোজন করেন। ১৭০২ সালে তিনি দুর্গের মধ্যভাগে বাণিজ্যকুঠি বা 'গভর্নমেন্ট হাউস' নির্মাণ শুরু করেন, যা ১৭০৬ সালে শেষ হয়। এরপর ইংল্যান্ডের রাজার সম্মানে দুর্গটির নামকরণ করা হয় ফোর্ট উইলিয়াম। ১৯৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করে ফোর্ট উইলিয়াম দখল করেন এবং ইংরেজদের তাড়িয়ে দেন। পরে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজরা জয়ী হলে উপমহাদেশে ইংরেজদের অবস্থান সংহত হতে থাকে। তারা ফোর্ট উইলিয়ামের স্থানে আরেকটি শক্তিশালী দুর্গ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৭৮০ সালের মধ্যে দুর্গটি নির্মাণের বেশির ভাগ কাজ শেষ হয়ে যায়। এর প্রায় একশ বছর পরে দুর্গটিকে আধুনিকায়ন করা হয়। দুর্গটিকে অষ্টভুজাকৃতির রূপ দেওয়া হয়। দুর্গে প্রবেশের জন্য সাতটি প্রবেশদ্বার ছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই দুর্গটি অদ্যাবধি পূর্ব ভারতে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

Fortwilliam1828
গ্রন্থনা : তৈমুর ফারুক তুষার