Showing posts with label Country. Show all posts
Showing posts with label Country. Show all posts

Friday, September 26, 2025

বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসা ও ইসরায়েলি দখলনীতি

0 comments

ইসরায়েলি দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণকে আন্তর্জাতিক আইন অবৈধ ঘোষণা করেছে। তবুও পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গোলান মালভূমিতে বসতি গড়ে তোলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকায় ১৫৮টি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় কোম্পানির নাম এসেছে, যারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এসব অবৈধ বসতি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত। এ তালিকায় রয়েছে বিশ্বের পরিচিত ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম, নির্মাণ কোম্পানি, ভোক্তা পণ্যের ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে বহুজাতিক খাদ্যচেইন পর্যন্ত।

ভ্রমণ ও পর্যটন প্ল্যাটফর্ম

Airbnb, Booking.com, Expedia ও TripAdvisor-এর মতো জনপ্রিয় অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের বসতিগুলিতে থাকা অ্যাপার্টমেন্ট, হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্রের বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যটকরা অবৈধ বসতিগুলোতে যাওয়া ও থাকা সহজ হয়েছে, ফলে বসতিগুলোর অর্থনীতি ও বৈধতার ভাবমূর্তি শক্তিশালী হয়েছে।

অবকাঠামো ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান

ইউরোপীয় ও ইসরায়েলি বেশ কয়েকটি কোম্পানি সরাসরি বসতি নির্মাণে যুক্ত থাকার অভিযোগে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে Heidelberg Materials AG (জার্মানি), Steconfer (পর্তুগাল), Ineco (স্পেন), Alstom (ফ্রান্স), Egis (ফ্রান্স) এবং Electra Group Ltd. (ইসরায়েল)। এরা সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করেছে, যা দখলকৃত ভূখণ্ডে বসতি টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য।

স্থানীয় বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক গ্রুপ

Export Investment Company Ltd., Hadar Group, Hamat Group Ltd., Kardan N.V., এবং Mayer’s Cars and Trucks Co. Ltd. সরাসরি বসতি অঞ্চলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ করেছে বলে জাতিসংঘের তালিকায় উল্লেখ আছে। তাদের কার্যক্রম বসতির অর্থনৈতিক টেকসই কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।

বহুজাতিক ভোক্তা পণ্যের ব্র্যান্ড

ইসরায়েলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালাচ্ছে কোকা-কোলা ও পেপসিকো। সমালোচকদের মতে, এসব কোম্পানির স্থানীয় উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসরায়েলি অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে, যা দখলনীতিকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। বিশেষত পেপসিকোর মালিকানাধীন সোডাস্ট্রিম আগে পশ্চিম তীরের একটি বসতিতে কারখানা পরিচালনা করত, যা আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পরে নেগেভে সরিয়ে নেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক খাদ্যচেইন

জাতিসংঘের তালিকায় উল্লেখিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্বখ্যাত ফাস্টফুড ব্র্যান্ড KFC। অভিযোগ উঠেছে, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বসতি অঞ্চলে ব্যবসা চালিয়েছে, যা অর্থনৈতিকভাবে বসতিগুলোকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তা সেবা

এছাড়াও পূর্ববর্তী সময়ে সমালোচিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যাটারপিলার (বুলডোজার দিয়ে বসতি নির্মাণ ও ঘরবাড়ি ভাঙচুরে ব্যবহারের অভিযোগ), হিউলেট-প্যাকার্ড (HP) (চেকপয়েন্ট ও নজরদারি সিস্টেমে প্রযুক্তি সরবরাহের অভিযোগ) এবং ব্রিটিশ নিরাপত্তা কোম্পানি জি৪এস (কারাগার ও নিরাপত্তা সেবা সরবরাহের অভিযোগ)।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রকাশিত এই তালিকা প্রকাশের পর মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, এই কোম্পানিগুলো বসতি কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতার ছাপ দিচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখছে। এ কারণে BDS (Boycott, Divestment and Sanctions) আন্দোলন এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে বৈশ্বিক বয়কটের ডাক দিয়েছে। ইতোমধ্যেই কিছু আন্তর্জাতিক তহবিল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।

কোম্পানিগুলোর অবস্থান

অভিযোগের মুখে অধিকাংশ কোম্পানি বলে আসছে, তারা কেবল ব্যবসায়িক ও স্থানীয় আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করছে। রাজনৈতিক ইস্যুতে কোনো অবস্থান নেয় না। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী কর্মকাণ্ডে অংশীদার হয়ে উঠছে।

   

বহুজাতিক কোম্পানি ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্ক: অভিযোগ, প্রমাণ ও কোম্পানির প্রতিক্রিয়া

এই প্রতিবেদনটি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করে কেন কিছু বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে অভিযোগ উঠেছে — বিশেষভাবে যে অভিযোগগুলো বাণিজ্যিক কার্যক্রম, সরবরাহ বা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বসতি-চলাচলে বা নির্ধারিত সামরিক/প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। আরেকটি লক্ষ্য হলো কোম্পানিগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া করেছে—সংক্ষিপ্ত উদাহরণ ও উৎসসহ।

সংক্ষিপ্ত সারমর্ম

জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা এবং সিভিল সোসাইটি অনেক বছর ধরে বিভিন্ন কোম্পানির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অভিযোগগুলোর ধরন মূলত তিনটি: (১) অর্থনৈতিকভাবে বসতি ও নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করা, (২) প্রযুক্তি/সেবার মাধ্যমে প্রশাসনিক বা নিরাপত্তা প্রক্রিয়ায় অবদান রাখা, এবং (৩) প্ল্যাটফর্ম বা পরিষেবা দিয়ে বসতিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বাভাবিক/বাণিজ্যিকভাবে উপস্থিত করা। নিচে প্রধান কোম্পানিগুলো নিয়ে টেবিল ও বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হলো।

কোম্পানি বনাম অভিযোগ — সংক্ষিপ্ত টেবিল

কোম্পানি প্রধান অভিযোগ / কীভাবে "সহায়তা" করছে বলে বলা হয় উদাহরণ / ঘটনার ইঙ্গিত কোম্পানির প্রতিক্রিয়া / পরিণতি
Coca-Cola (কোকা-কোলা) ইসরায়েলি অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও বটলিং/লোকাল অপারেশন দিয়ে পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক শক্তি প্রদান—যা বাল্কভাবে বসতি/একের পক্ষের নীতিকে সহায়তা করে বলে সমালোচনা। ইসরায়েলে স্থানীয় বটলার/পার্টনারের মাধ্যমে দীর্ঘকালীন উপস্থিতি; BDS আন্দোলন কোম্পানিটিকে বয়কট তালিকাভুক্ত করেছে। কোম্পানি সাধারণত বলে যে তারা মানবাধিকার নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; সার্বিকভাবে ব্যবসা বজায় রেখেছে, কিন্তু গ্রাহক-চাপে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
PepsiCo / SodaStream SodaStream-এর কারখানা পূর্বে পশ্চিম তীরে (অবৈধ বসতিসংলগ্ন এলাকা) অবস্থিত ছিল—সরাসরি বসতি-অর্থনীতিকে সাহায্য করতো। SodaStream-এর কারখানা বসতিতে থাকার কারণে আন্তর্জাতিক চাপ এবং বয়কট শুরু হয়; পরে কোম্পানি কারখানা স্থানান্তর করে। সোডাস্ট্রিম কারখানা সরিয়েছে; PepsiCo-র অধিগ্রহণের পরও রাজনৈতিক ও এথিক্যাল প্রশ্ন রয়ে গেছে।
Caterpillar সামরিক/নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত বড় বুলডোজার (D9 ইত্যাদি) বসতি সম্প্রসারণ ও বাড়ি ধ্বংসে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ—ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরাসরি অবদান। Human Rights Watch ও অন্যান্য রিপোর্টে এমন ব্যবহার উল্লেখ রয়েছে; কিছু বিনিয়োগকারী কেটারপিলার থেকে বেরিয়ে গেছে। Caterpillar সাধারণত বলে যে তারা সরকারি চাহিদা ও রপ্তানি নিয়ম মেনে চলে; কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি দিক থেকে চাপ গিয়েছে।
Hewlett-Packard (HP) আইটি/নজরদারি/ডেটা সিস্টেম সরবরাহ করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচয় যাচাই-প্রক্রিয়ায় অবদান রাখার অভিযোগ। কয়েকটি তদন্ত রিপোর্ট HP-এর সরবরাহ ও সিস্টেমের ব্যবহার আলোচ্য করেছে; কিছু শিক্ষা/ধর্মীয় বিনিয়োগকারী ডিভেস্টমেন্ট করেছে। HP বলেছে তারা আইনি ও কনট্রাকচুয়াল দায়িত্ব মেনে চলে; তবু কিছু প্রতিষ্ঠান নীতি-চাপে ডিভেস্টমেন্ট করেছে।
G4S (প্রাইভেট সিকিউরিটি) প্রাইভেট সিকিউরিটি সেবা দিয়ে সীমান্ত/নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশ—মানবাধিকার গ্রুপ গুলোর অভিযোগের সম্মুখীন হয়েছে। চাপের পর G4S কিছু ব্যবসায়িক অংশ বিক্রি/স্থগিত করেছে; এটি অনেকেই অ্যাকটিভিস্টদের সফলতা বলে দেখেন। কিছু অপারেশন বিক্রি বা বদল করেছে; পুরো প্রত্যাহার আংশিক ও বিতর্কিত।

নোট: উল্লিখিত টেবিলটি সারসংক্ষেপ—প্রতিটি লাইনের পেছনে সময়ভিত্তিক রিপোর্ট, তদন্ত ও সংবাদ কভারেজ রয়েছে। বিস্তারিত টাইমলাইন ও উৎস-ডকুমেন্ট যোগ করলে প্রতিটি কোম্পানির প্রতিক্রিয়া ও আইনি/কর্পোরেট কাগজপত্র আরও স্পষ্ট হবে।

১) অভিযোগের প্রকৃতি

বহুজাতিক কোম্পানিদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
  1. অর্থনৈতিক সহায়তা: সরাসরি বিনিয়োগ, স্থানীয় পার্টনারশিপ বা কারখানা–এবং সেই এলাকায় কর্মসংস্থান বসতির আর্থিক সংকট দূর করে।
  2. প্রযুক্তি ও সেবা সরবরাহ: নিরাপত্তা, পরিচয় যাচাই, নজরদারি বা प्रशासनিক সফটওয়্যার সরবরাহ করলে দখলকৃত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
  3. প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বাভাবিকীকরণ: বুকিং/ট্যুর/রিয়েল এস্টেট প্ল্যাটফর্ম বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটন-গন্তব্য হিসেবে দেখালে তা একটি দৃষ্টান্তিক বৈধতা দেয়।

২) কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়া ও করণীয়

বেশিরভাগ কোম্পানি দাবি করে যে তারা স্থানীয় আইন, আন্তর্জাতিক রপ্তানি/অপারেশন নিয়ম ও কর্পোরেট নীতিমালা মেনে কাজ করে। অনেক সময় তারা বলে থাকে যে মানবাধিকার রক্ষা তাদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার এবং তারা নিরপেক্ষ ব্যবসায়িক ভূমিকায় রয়েছে। আবার অনেকে নির্দিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ বা স্থানান্তর করে—যেমন SodaStream-এর কারখানা সরানো—তাতে BDS-ধর্মী আন্দোলনগুলোকে একধরনের বিজয় হিসেবে দেখা হয়েছে।

৩) প্রভাব এবং রাজনৈতিক/সামাজিক প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিকভাবে কিছু সরকার, পেনশন ফান্ড ও ইথিকাল বিনিয়োগকারী কোম্পানি বা সেক্টর থেকে ডিভেস্টমেন্ট করেছে। মানবাধিকার গ্রুপ ও রিসার্চ আইটেমগুলো (যেমন WhoProfits, Human Rights Watch) কোম্পানিগুলোকে নজরে রেখেছে এবং জাতিসংঘ নিজেও কিছু পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তালিকা বা ডাটাবেস আপডেট করেছে — যা কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে।

উপসংহার

কিসে ‘সহায়তা’ হয়ে থাকে—সে প্রশ্নে জবাব সরল নয়। সরাসরি অস্ত্র বা ট্যাকটিক্যাল সাপোর্ট না দিয়েও অর্থনীতি, সেবা ও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একধরনের সহায়তা এবং বৈধতা প্রদান করা যায়। এই কারণেই সিভিল সোসাইটি, জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো কর্পোরেট আচরণ, সরবরাহ শৃঙ্খল ও স্থানীয় কার্যক্রম বিশ্লেষণ করছে এবং কোম্পানিগুলোকে দায়বদ্ধ রাখার দাবি জানিয়েছে।
সূত্র (বাছাইকৃত অনলাইন রেফারেন্স — পড়ার সুবিধার্থে):
  • UN Human Rights — business & Israeli settlements database / related press releases (ohchr.org)
  • Reuters — সরাসরি সংবাদের কভারেজ ও UN ডাটাবেস রিপোর্ট (reuters.com)
  • Associated Press (AP) — Sodastream / corporate controversies (apnews.com)
  • Human Rights Watch — বিভিন্ন কোম্পানি ও কেস স্টাডি (hrw.org)
  • WhoProfits, BDS ও Ethical Consumer — কর্পোরেট সম্পর্কিত তদন্ত ও রিপোর্ট
  • গ্লোবাল সংবাদ মাধ্যম: The Guardian, Washington Post ইত্যাদি কভারেজ

ফিলিস্তিন প্রশ্নে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সম্পৃক্ততা এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। পর্যটন, অবকাঠামো, খাদ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা খাতে তাদের উপস্থিতি কেবল ব্যবসায়িক নয়, বরং রাজনৈতিক ও মানবাধিকার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কোম্পানিগুলোর ওপরও আন্তর্জাতিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।


Sunday, June 8, 2025

২০২৫ সালের বিশ্ব রাজনীতি: কোন দেশ এগিয়ে, কোন দেশ পিছিয়ে?

0 comments

বিশ্ব রাজনীতি ২০২৫ সালে এক নতুন মোড় নিয়েছে। কোভিড-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা, ইউক্রেন যুদ্ধ, চীনের উত্থান, পশ্চিমা জোটের কৌশল, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তন ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি—সব মিলিয়ে গ্লোবাল পাওয়ার ডাইনামিক্স এখন অনেক বেশি জটিল ও স্পর্শকাতর। চলুন দেখে নিই কোন দেশ এগিয়ে এবং কোন দেশ পিছিয়ে পড়ছে এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায়।

World-Map-of-Politics

🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র: নেতৃত্ব ধরে রাখার সংগ্রাম

  • অগ্রগতি: ইউক্রেন ও তাইওয়ান ইস্যুতে পশ্চিমা মিত্রদের সাথে কৌশলগত সংহতি বজায় রেখেছে।

  • চ্যালেঞ্জ: অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভক্তি, চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান।

  • বিশ্বে প্রভাব: এখনো বিশ্বব্যবস্থার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তবে একচেটিয়া ক্ষমতা নেই।


🇨🇳 চীন: প্রযুক্তি ও সামরিকতায় ক্রমবর্ধমান শক্তি

  • অগ্রগতি: BRI (Belt and Road Initiative) ও দক্ষিণ চীন সাগরে কর্তৃত্ব জোরালো হয়েছে।

  • চ্যালেঞ্জ: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক অবিশ্বাস।

  • বিশ্বে প্রভাব: উন্নয়নশীল দেশের জন্য চীনের বিকল্প নেতৃত্ব দৃশ্যমান।


🇷🇺 রাশিয়া: ইউক্রেন যুদ্ধের খেসারত

  • অগ্রগতি: কিছু আফ্রিকান ও এশিয়ান দেশের সাথে কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা।

  • চ্যালেঞ্জ: অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি।

  • বিশ্বে প্রভাব: পশ্চিমা জোটে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে।


🇮🇳 ভারত: বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যমপন্থী নেতৃত্ব

  • অগ্রগতি: প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে অভূতপূর্ব উত্থান।

  • চ্যালেঞ্জ: প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা।

  • বিশ্বে প্রভাব: G20 প্রেসিডেন্সি, ব্রিকস সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা।


🇧🇩 বাংলাদেশ: সম্ভাবনা ও চাপের দ্বন্দ্বে

  • অগ্রগতি: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগে অগ্রগতি।

  • চ্যালেঞ্জ: রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবাধিকার ইস্যু।

  • বিশ্বে প্রভাব: দক্ষিণ এশিয়ায় একটি কৌশলগত ও শ্রমনির্ভর শক্তি।


দেশ অগ্রগতি চ্যালেঞ্জ প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র মিত্রতা বজায়, প্রযুক্তি আধিপত্য অভ্যন্তরীণ বিভক্তি নেতৃত্ব রক্ষা
চীন BRI ও সামরিক উত্থান আন্তর্জাতিক অবিশ্বাস বিকল্প নেতৃত্ব
রাশিয়া আঞ্চলিক কূটনীতি নিষেধাজ্ঞা বিচ্ছিন্ন প্রভাব
ভারত প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সীমান্ত সমস্যা উদীয়মান শক্তি
বাংলাদেশ   অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রাজনৈতিক অস্থিরতা আঞ্চলিক গুরুত্ব

🔚 উপসংহার: 

২০২৫ সালে বিশ্ব রাজনীতি একটি দ্বিধান্বিত সময় পার করছে—পুরোনো শক্তি নিজেদের ধরে রাখার লড়াই করছে, আর নতুন শক্তিগুলো উত্থান ঘটাচ্ছে। এই দ্বৈতধারা বিশ্বের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

Tuesday, October 3, 2023

পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া মহাদেশ আবিষ্কারে

0 comments

 ১৬৪২ সনে অভিজ্ঞ ডাচ কাপ্তান -এবেল তাসম্যান এক সমুদ্রযাত্রায় বের হন। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ গোলার্ধে এক বিশাল মহাদেশ আবিষ্কার; যার অস্তিত্ব আছে বলেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন তিনি। বিবিসি ফিউচার অবলম্বনে।



সেসময় পৃথিবীর এই অংশ সম্পর্কে বেশিকিছু জানতো না ইউরোপীয়রা, যা তাদের কাছে ছিল রহস্যের চাদরে মোড়া। তবে তাদের ধারণা ছিল, নিশ্চয়ই এখানে বিশাল কোনো ভূখণ্ড আছে, আবিষ্কারের আগেই যার নাম তারা দিয়েছিল টেরা-অস্ট্রালিস। ইউরোপে নতুন এ মহাদেশের ধারণা অবশ্য অনেক প্রাচীন; বলতে গেলে সেই রোমান যুগ থেকেই এটি প্রচলিত ছিল।

কিন্তু, প্রথমবারের মতোন তা প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর হন এবেল তাসম্যান। ইন্দোনেশিয়ায় জাকার্তায় তখন ছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঘাঁটি। সেখান থেকেই ১৬৪২ সনের ১৪ সেপ্টেম্বর দুটি ছোট জাহাজ নিয়ে পশ্চিমদিকে যাত্রা শুরু করেন এবেল। পশ্চিমে যেতে যেতে জাহাজ দুটি প্রথমে দক্ষিণে মোড় নেয়, তারপর যেতে থাকে পুবদিকে। এভাবে একসময় বর্তমান নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণে এসে পৌঁছায়। এখানে আসার পর স্থানীয় অধিবাসী মাউরিদের সাক্ষাৎ পায় ডাচরা।

কিন্তু, সে অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। অচিরেই ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের এ সাক্ষাৎ রূপ নেয় সংঘাতে। ডাচরা তীরের জাহাজ ভেড়ায়, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে এসময় বার্তা আদান-প্রদানে ব্যবহার করতো ছোট নৌকা। দ্বিতীয় দিনেই এমন একটি নৌকায় সজোরে গুঁতো দেয় মাউরিদের ক্যানু (গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি এক ধরনের নাও)। এতে চার ইউরোপীয় মারা যায়।

পরে মাউরিদের ১১টি ক্যানু লক্ষ্য করে তোপ দাগা হয় জাহাজ থেকে, এতে কতজন মাউরি মারা যায়– ইতিহাসে তার কোনো উল্লেখ নেই।  

অভিযানের সমাপ্তি টানা হয় তখনই। রক্তপাতের ঘটনার স্মরণে এবেল তাসম্যান এই উপসাগরের নাম নাম দেন 'মুর্দানার্স বে' (ইংরেজিতে মার্ডারার্স বে), যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- খুনিদের উপসাগর। এরপর আর নতুন আবিষ্কৃত এ ভূখণ্ডে পদার্পণ করেননি তিনি, সপ্তাহখানেক পরেই ফিরে যান জাকার্তায়। এবেল বিশ্বাস করতেন, দক্ষিণের বিশাল সেই মহাদেশ তিনি আবিষ্কার করেছেন, কিন্তু আর কখনোই এমুখো হননি।  

প্রসঙ্গত; ততোদিনে অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে ইউরোপবাসী জানতো; কিন্তু, এটাই কিংবদন্তির সে মহাদেশ এমনটা বিশ্বাস করতো না। পরে অবশ্য তাই মনে করে তারা, এবং এরই নাম দেয় 'টেরা অস্ট্রালিস'।

সে যাই হোক, তাদের শেষোক্ত ধারণাটি ভুল ছিল। হারানো এক মহাদেশের ব্যাপারে এবেলই সঠিক ছিলেন। কিন্তু, দুর্ভাগ্য এই– সেটা তিনি নিজেও জানতেন না।

স্থানীয় মাউরি আধিবাসীদের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর নিউজিল্যান্ডের উপকূল থেকে চলে যায় এবেল তাসমানের জাহাজ দুটি। ছবি: অ্যালামি/ ভায়া বিবিসি ফিউচার

তারপর কেটে গেছে সুদীর্ঘ পৌনে চার শতক, পৃথিবী দেখেছে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর জয়জয়কার। আকাশ, পাতাল, সমুদ্রগর্ভে মানুষের নিরন্তর অভিযান। তবুও লুপ্ত সেই মহাদেশের কিংবদন্তির সমাধান হয়নি বহুকাল। ২০১৭ সালে সেই রহস্যের পর্দা তোলেন একদল ভূতাত্ত্বিক। তাদের 'জিল্যান্ডিয়া' (মাউরি ভাষায় রিউ- এ- মাউই) নামের নতুন মহাদেশ আবিষ্কারের ঘোষণা বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। প্রায় ৪৯ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিস্তৃত বিশাল এ ভূখণ্ড মাদাগাস্কারের চেয়েও প্রায় ছয়গুণ বড়।

এদিকে দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বকোষ, অভিধান, মানচিত্র থেকে শুরু করে হালআমলের সার্চ ইঞ্জিনগুলোও গোঁ ধরে ছিল, পৃথিবীতে মহাদেশ মাত্র সাতটি-ই আছে। কিন্তু, ভূতাত্ত্বিকদের দলটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে দেখান, এই পুরোটা সময়েই তারা মানুষকে ভুল তথ্য দিয়েছে। আসলে পৃথিবীতে আছে আটটি মহাদেশ– গবেষকদের আবিষ্কৃত ভূখণ্ডটি পৃথিবীর নবীনতম, ক্ষুদ্রতম এবং পরিধিতে সবচেয়ে সরু মহাদেশ হিসেবেও নতুন রেকর্ড গড়ে।

পার্থক্য শুধু এটাই যে, এই ভূভাগের ৯৪ শতাংশই জলের তলায় সমাহিত, শুধু নিউজিল্যান্ডের মতো গুটিকয় দ্বীপ সাগরের বুক ফুঁড়ে মাথা উঁচু করে আছে। একেই হয়তো বলে, স্পষ্ট চোখের সামনে থেকেও লুকিয়ে থাকা। অর্থাৎ কিনা দৃষ্টিসীমায় থেকেই নিজ রহস্য বুকে নিয়ে যুগ যুগ ধরে আড়ালে রেখেছিল।   

নিউজিল্যান্ডের ক্রাউন রিসার্চ ইনস্টিটিউট জিএনএস সায়েন্স এর ভূতাত্ত্বিক এন্ডি তুলখ বলেন, 'দৃশ্যমান কোনোকিছুর রহস্য আবিস্কারেও যে অনেক সময় লাগতে পারে, এটা তারই উদাহরণ।'

এন্ডি জিল্যান্ডিয়া আবিষ্কারক দলের একজন সদস্য ছিলেন।  

কিন্তু, অষ্টম মহাদেশের অস্তিত্ব প্রমাণ করেই এ কাহিনি শেষ হয়নি। হবার কথাও নয়, সাগরের ৬,৫৬০ ফুট নিচে থাকায় এ মহাদেশের অধিকাংশ রহস্যই আজো অজানা। সেই অজানাকে জানার চেষ্টাই শুরু হয় এরপর। যেমন কারা সেখানে বাস করতো? কত যুগ আগেই বা এটি জলের তলায় চলে যায়?

কষ্টসাধ্য এক আবিষ্কার

জিল্যান্ডিয়া নিয়ে গবেষণা করা সব সময়েই খুব জটিল ছিল।

এবেল তাসম্যান নিউজিল্যান্ড আবিষ্কারের এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে ১৬৪২ সনে ব্রিটিশ অভিযাত্রী ও মানচিত্র প্রস্তুতকারক জেমস কুক'কে দক্ষিণ গোলার্ধে এক বৈজ্ঞানিক অভিযানে পাঠানো হয়। তার ওপর নির্দেশ ছিল, সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে শুক্র গ্রহের অতিক্রম করাকে পর্যবেক্ষণ করার। সূর্য পৃথিবী থেকে কতটা দূরে, তা হিসাব করে বের করতে এর দরকার ছিল।

স্যাটেলাইট চিত্রে অস্ট্রেলিয়ার পাশে হালকা নীল রঙে সমুদ্র নিমজ্জিত জিল্যান্ডিয়ার আয়তনকে দেখানো হয়েছে। ছবি: জিএনএস সায়েন্স/ ভায়া বিবিসি

কিন্তু, তাকে মুখবন্ধ একটি খামও দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক দায়িত্বটি সম্পন্ন হলেই, কেবল সেটি খুলে দেখার নির্দেশ ছিল তার ওপর। এই নির্দেশনামায় কুককে দক্ষিণের এক বিশাল মহাদেশ আবিষ্কারের অতি-গোপনীয় মিশন দেওয়া হয়। কুক তাই-ই করেছিলেন, আর সোজা পৌঁছেছিলেন নিউজিল্যান্ডে। কিন্তু, তিনি জানতেন না, যে মহাদেশের সন্ধান করছেন, স্রেফ তার ওপর দিয়েই তার জাহাজ নিউজিল্যান্ডে পৌঁছেছিল।

জিল্যান্ডিয়ার অস্তিত্ব নির্দেশ করে প্রথম এমনকিছু প্রমাণ জড়ো করেছিলেন স্কটিশ প্রকৃতিবিদ স্যার জেমস হেক্টর। ১৮৯৫ সালে তিনি নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে থাকা বেশকিছু দ্বীপ জরিপের অভিযানে যোগ দেন । এসব দ্বীপের ভূতাত্ত্বিক গঠন অধ্যয়নের পর তিনি এ উপসংহারে পৌঁছান যে, 'বর্তমানে সাগরে ডুবে থাকা দক্ষিণ থেকে পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত এক মহাদেশীয় অঞ্চলের পাহাড়শ্রেণির চূড়া হলো নিউজিজিল্যান্ড ও আশেপাশের দ্বীপগুলো।'

অনেক আগেই এমন ধারণা পাওয়া সত্ত্বেও, জিল্যান্ডিয়ার অস্তিত্ব সম্পর্কে তথ্যউপাত্ত অপ্রতুল রয়ে যায় দীর্ঘকাল।  এমনকী ১৯৬০ এর দশকের আগপর্যন্ত গবেষণার চেষ্টা গুরুত্বও পায়নি।  

জিল্যান্ডিয়া আবিষ্কারক টিমের নেতৃত্ব দেওয়া ভূতাত্ত্বিক নিক মর্টিমার বলেন, 'এক্ষেত্রে গবেষণা হয়েছে খুবই ধীরে ধীরে।'

১৯৬০ এর দশকে মহাদেশের সংজ্ঞা নির্ধারণের বিষয়ে একমত হন ভূতাত্ত্বিকরা। সার্বিকভাবে এই সংজ্ঞায় বলা হয়, মহাদেশ হল পৃথিবীর একটি কাঠামো, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে আসে। মহাদেশীয় ভূত্বক (ক্রাস্ট) নানান ধরনের শিলা দ্বারা গঠিত, যা বেশ পুরু থাকে। মহাদেশ হতে হলে সেই ভূখণ্ডকে যথেষ্ট বড়ও হতে হবে।

মর্টিমার বলেন, 'ছোট এক টুকরো ভূখণ্ডকে মহাদেশ বলা যাবে না।' এই সংজ্ঞার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা কাজের একটি দিকনির্দেশনা পান। তারা বুঝতে পারলেন, এই সূত্র মেনে যথেষ্ট প্রমাণ জোগাড় করতে পারলেই অষ্টম মহাদেশ যে আসলেই আছে তা প্রমাণ করা যাবে।

অবশ্য তারপর ফের এই মিশন গতি হারায়, কারণ একটি মহাদেশ আবিষ্কার সত্যিই বেশ কঠিন, এবং ব্যয়বহুল। তাছাড়া, তেমন তাগিদও ছিল না বলে উল্লেখ করেন মর্টিমার। এরপর ১৯৯৫ সালে আমেরিকান ভূপদার্থবিদ ব্রুস লুয়েনডিক এই অঞ্চলকে আবারো একটি মহাদেশ হিসেবে বর্ণনা করেন, এবং এর নাম জিল্যান্ডিয়া দেওয়ার সুপারিশ করেন। সেদিন থেকে আবিষ্কারের চেষ্টা নবউদ্যম ফিরে পায় বলে জানান ভূতাত্ত্বিক এন্ডি তুলখ।

প্রায় একইসময়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সম্পর্কিত আইন, 'ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সী' কার্যকর হয়। এই আইনের ফলেই নিউজিল্যান্ড সরকার এবার নড়েচড়ে বসে। জিল্যান্ডিয়া আবিষ্কারের ব্যাপক তাগিদ অনুভব করেন ওয়েলিংটনের কর্তারা। গবেষণায় টাকা ঢালতে, দরকারি বৈজ্ঞানিক উপকরণ দিতেও এবার যেন তাদের উৎসাহ দেখা যায়।

কারণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সম্পর্কিত আইনে বলা হয়েছে, একটি দেশ তার মহাদেশীয় মহীসোপন পর্যন্ত সমুদ্রসীমা ও এরমধ্যে থাকা সব ধরনের সম্পদ নিজের বলে দাবি করতে – তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ছাড়িয়ে, উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০ কি.মি.) পর্যন্ত সমুদ্রসীমা বিস্তৃত করতে পারবে।

নিউজিল্যান্ড যদি প্রমাণ করতে পারে, দেশটির আরও বৃহৎ এক মহাদেশের অংশ– তাহলে সমুদ্রসীমা ছয়গুণ বাড়াতে পারবে। এতে বহুগুণে বাড়বে দেশটির রাজস্ব আয়ের উপায়। এই সম্ভাবনা উপলদ্ধি করে, সমুদ্রজরিপে হঠাৎ করেই হু হু করে আসতে থাকে তহবিল। সেই সুযোগ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে জিল্যান্ডিয়ার অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রমাণ জড়ো করতে থাকেন। সমুদ্রতল থেকে সংগ্রহ করা প্রতিটি পাথরের নমুনা জিল্যান্ডিয়ার স্বপক্ষেই সাক্ষ্য দিয়েছে।  

কিন্তু, আরও অকাট্য প্রমাণের দরকার ছিল। যা দিয়েছে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য। স্যাটেলাইটের দেওয়া তথ্যের সাহায্যে সমুদ্রতলের ভূত্বকের বিভিন্ন অংশের মধ্যাকর্ষণ শক্তির তারতম্য শনাক্ত করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রযুক্তির সাহায্যে সমুদ্রের ভূত্বক থেকে জিল্যান্ডিয়ার অপেক্ষাকৃত পুরু ভূত্বককে আলাদাভাবে চেনা  গেছে। এভাবে তৈরি সমুদ্রতলের মানচিত্রে উঁচুনিচু ভূপ্রকৃতির প্রায় অস্ট্রেলিয়ার সমান জিল্যান্ডিয়াকে স্পষ্টভাবেই দেখাতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা।     

মর্টিমার বলেন, 'আমরা যখন এই মহাদেশের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানাই, তখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলমগ্ন ভূখন্ড সম্পর্কেও মানুষ জানতে পারে। বিষয়টি দারুণ মজার। ভেবে দেখুন, দুনিয়ার সব মহাদেশেই অনেক অনেক দেশ আছে, কিন্তু জিল্যান্ডিয়ায় মাত্র তিনটি রাষ্ট্রের উপস্থিতি আছে।'  

এরমধ্যে নিউজিল্যান্ড স্বাধীন রাষ্ট্র। অন্যদিকে ফরাসী উপনিবেশ হিসেবে রয়েছে নিউ কালেদোনিয়া দ্বীপ এবং অস্ট্রেলিয়ার দুটি দ্বীপ– লর্ড হোয়ে আইল্যান্ড এবং বলস পিরামিড।

নিউজিল্যান্ডই হলো জিল্যান্ডিয়ার সর্বোচ্চ ভূখণ্ড। ছবি: অ্যালামি/ ভায়া বিবিসি


রহস্যময় বিস্তার

জিল্যান্ডিয়া ছিল প্রাচীন অতিকায় মহাদেশ গন্ডোয়ানার অংশ। আজ থেকে প্রায় ৫৫ কোটি বছর আগে দক্ষিণ গোলার্ধের সকল ভূমি একত্র হয়ে গড়ে ওঠে গন্ডোয়ানা। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা ও পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার মতো কিছু ভূখণ্ডের সাথে জিল্যান্ডিয়া ছিল গন্ডোয়ানার পুবদিকের অংশে।

তুলখ জানান, 'আজ থেকে প্রায় ১০ কোটি বছর আগে অজ্ঞাত জিল্যান্ডিয়া গন্ডোয়ানা থেকে পৃথক হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে আমরা আজো পুরোপুরি জানতে পারিনি।'   

মহাদেশীয় ভূত্বক সাধারণত ৪০ কিলোমিটার গভীর হয়– যা সামুদ্রিক ভূত্বকের চেয়ে অনেক পুরু। সামুদ্রিক ভূত্বক সাধারণত ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর হয়। কিন্তু, গন্ডোয়ানা থেকে পৃথক হওয়ার সময় জিল্যান্ডিয়া এতটাই দূরে সরে গিয়েছিল যে, এর ভূত্বকের পুরুত্ব ক্ষয় হতে হতে মাত্র ২০ কিলোমিটারে নেমে আসে। ফলে অতিসরু এই মহাদেশ পানির তলায় ডুবে যায়।   

সরু ভূত্বক নিয়ে জলমগ্ন থাকলেও– এই মহাদেশে পাওয়া নানান রকম শিলা পরীক্ষা করেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন এটি সমুদ্রের অংশ নয়, বরং মহাদেশ। কারণ গ্রানাইট, স্কিস্ট ও চুনাপাথর দিয়ে গঠিত হয় মহাদেশীর ভূত্বকের শিলাস্তর। অন্যদিকে, সামুদ্রিক ভূত্বকে ব্যাসল্ট শিলাই থাকে বেশি।

তারপরও এখনও অজানা রয়েছে অনেক কিছু। যেমন বিশ্বের অষ্টম এ মহাদেশের উৎপত্তি ভূতাত্ত্বিকদের যেমন বিস্মিত করে, তেমনি এর টিকে থাকাও কম অভিভূত করে না তাদের। এত সরু ভূত্বক থাকার পরেও কেন এটি খণ্ড খণ্ড হয়ে আরও ছোট ছোট মহাদেশ তৈরি করেনি– সেটা ভেবেও অবাক হন তারা।

আরেকটি বড় রহস্য ঠিক কখন জিল্যান্ডিয়া সমুদ্রে ডুবে গেল– সে সময় জানার ক্ষেত্রে। তাছাড়া, আদৌ এটি পুরোপুরি শুকনো ডাঙ্গার ভূখণ্ড ছিল কিনা তা নিয়েও আছে মতভেদ। বর্তমানে প্রশান্ত ও অস্ট্রেলীয় টেকটনিক প্লেটের সিমানায় গড়ে ওঠা পর্বতশ্রেণির খাঁজ বা চূড়া বিভিন্ন দ্বীপ হিসেবে গড়ে উঠেছে। তুলখ জানান, ভূতাত্ত্বিকদের একদল মনে করেন, জিল্যান্ডিয়ায় এমন কিছু দ্বীপ ছিল, আর বাকিটা ছিল নিচু, জলমগ্ন অংশ। আরেকদল মনে করেন, একসময় পুরোটাই ছিল শুকনো ডাঙ্গা।    

এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে কারা ছিল জিল্যান্ডিয়ার বাসিন্দা। এটি যার অংশ ছিল, সেই গন্ডোয়ানা ছিল প্রায় ১০ কোটি বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত, সেখানে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণির সমাগম। প্রথম স্থলচর চারপেয়ে প্রাণীর আবির্ভাব হয়েছিল গন্ডোয়ানায়। আরও পরবর্তীকালে টাইটানোসরসের মতো সর্ববৃহৎ স্থলচর জীবও বিচরণ করেছে। ভূতাত্ত্বিকরা আশাবাদী, হয়তো জিল্যান্ডিয়ার ডুবে থাকা শিলাস্তরে প্রাগৈতিহাসিক জীবাশ্ম পাওয়াও যেতে পারে।

সূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

Monday, October 2, 2023

স্বর্গ যখন কারাগার: প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে বাংলাদেশির দাসত্বের জীবন

0 comments

 বিদেশে ভালো চাকরির আশায় যখন দেশ ছাড়েন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মুস্তাফিজুর শাহীন, তখন কল্পনাও করেননি প্রশান্ত মহাসাগরীয় এক দ্বীপে তাকে এভাবে বন্দি থাকতে হবে, বেতন ছাড়াই কাজ করতে হবে, অভিযোগ করলে শিকার হতে হবে মারধরের এবং কেবল পালিয়ে যেতে পারলেই মিলবে নিস্তার।

প্রতিশ্রুতি ছিল জীবন বদলে দেওয়ার, মিলিয়নিয়র পোশাক ব্যবসায়ীর হয়ে কাজ করার। অথচ একসময় তা রূপ নেয় আধুনিক দাসত্বে, যেখানে প্রতিনিয়তই মারধর ও হত্যার হুমকি পেতেন শাহীন।

ভানুয়াতু দ্বীপের দিনগুলো স্মরণ করতে গিয়ে শাহীন মন্তব্য করেন, সেখানে নিজেকে তার 'জীবন্ত লাশ' বলে মনে হতো। তিনি বলেন, আমার সব স্বপ্ন, সব প্রত্যাশা ধুলোয় মিশে গেছে।

২০১৭ ও ২০১৮ সালের মধ্যে ভানুয়াতুতে আসা ১০৭ বাংলাদেশির মধ্যে শাহীন একজন। নিজেকে পোশাকের আন্তর্জাতিক একটি চেইনশপের মালিক পরিচয় দেওয়া মানব পাচারকারী শিকদার সুমন তাদের এখানে নিয়ে আসে।

এই ১০৭ বাংলাদেশির পরিণতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোতে আধুনিক দাসত্বের সবেচয়ে বড় ঘটনা। শাহীন এবং তার সহকর্মীদের প্রতারণা ও মারধরের শিকারের ঘটনা সামনে আসার পাঁচ বছর পার হলেও কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, উন্নত জীবনের আশায় এখনো অনেকের প্রত্যাশিত গন্তব্য ভানুয়াতুর মতো দ্বীপ।

শাহীনের জীবনে এই দুর্যোগের শুরু ২০১৮ সালের জুনে। ওই সময় টাঙ্গাইলের একটি বাস স্টেশনে শিকদার সুমনের এক সহযোগীর সঙ্গে তার দেখা হয়। শাহীনকে বলা হয়, সুমন 'মাল্টিমিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী', বিশ্বব্যাপী তার পোশাক ব্যবসা রয়েছে।

শাহীন খোঁজখবর নেন। সুমনের দাবি সে দক্ষিণ আফ্রিকার জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড মি. প্রাইসের হয়ে কাজ করে। শাহীন ভানুয়াতুর স্থানীয় একটি সংবাদপত্রে কিছুদিন আগেই প্রতিবেদন দেখতে পান, যার শিরোনাম 'ভানুয়াতুতে আসছে মি. প্রাইস'। সেখানে সুমন এবং ভানুয়াতুর একজন মন্ত্রীর উদ্ধুতি দেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো শাহীনের মনে ইতিবাচক ধারণা আনে।

দেশে শাহীনের ছোট তবে সফল পোশাক ব্যবসা ছিল। এই ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে সেগুলো সুমন এবং তার সহযোগীদের হাতে তুলে দেন শাহীন। স্ত্রী-সন্তানকে বিদায় জানিয়ে মি. প্রাইসের হয়ে কাজ করতে ভানুয়াতুর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাড়েন শাহীন।

সে ঘটনার পাঁচ বছর হতে চলেছে, শাহীন এখনো দেশে ফেরেননি।

ভানুয়াতুর পাংগো বিচ


ভানুয়াতুর রাজধানী পোর্ট ভিলায় আসার পর শাহীনের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। সমুদ্রতীরবর্তী একটি বাংলোতে তাকে আটকে রাখা হয়। ভাত আর বাঁধাকপি খেয়ে বেশিরভাগ দিন কাটিয়েছেন তিনি। সেখানে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদের দিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করানো হতো।

২০২২ সালে এসে ভানুয়াতুর পাবলিস প্রসিকিউটর সুমন, তার স্ত্রী এবং দুই সহযোগীকে মানবপাচার, দাসত্ব, অর্থ পাচার, হত্যার হুমকি ও দেশের শ্রম আইন লঙ্ঘনের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে।

ভানুয়াতুর প্রধান বিচারপতি ভিনসেন্ট লুনাবেক রায় ঘোষণার সময় বলেন, শিকদার সমুন সব সময় ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে কি কি করা হবে তা বলে হুমকি দিত। বলা হতো, তাদের গাড়ির নিচে চাপা দেওয়া হবে, তাদের কুপিয়ে মারা হবে বা গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে, জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে তাদের ফ্রিজারে ঢুকিয়ে রাখা হবে। তাদের লাশের ছবি তুলে সেগুলোরে পরিবারের কাছে পাঠানো হবে বলেও হুমকি দেওয়া হতো।

শাহীন আল জাজিরাকে জানান, এসব হুমকিকে তারা কখনো হালকাভাবে নেননি। তিনি জানান, ভানুয়াতুতে আসার পরপরই সুমনের হয়ে কাজ করা এক বাংলাদেশি তাকে ঘুষি মারে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বলপ্রয়োগ করে তার থেকে ১৪ হাজার ডলার নিয়ে যায়।

আর টাকা দিতে না পারায় বলা হয়, তার উল্টো ঝুলন্ত, রক্তাক্ত ছবি বাংলাদেশে থাকা পরিবারের কাছে পাঠানো হবে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, ভীত অবস্থায় একদিন দিনের কাজের বিরতির মধ্যে যখন সুমনের লোকজন ঘুমাচ্ছিল তখন সুযোগ পেয়ে শাহীন ও আরও দুইজন বাংলো থেকে পালিয়ে যান। তারা সৈকতের দিকে ছোটেন এবং উপকূল ধরে এগুতে থাকেন। পাশে রাস্তায় তারা একটি গাড়ি থামিয়ে উঠে পড়েন এবং তাদেরকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যেতে বলেন।

ব্র্যান্ডের নাম ভাঙিয়ে মানবপাচার, অতপর দাসত্ব

কর্তৃপক্ষের মনে সন্দেহ না জাগিয়ে কয়েক মাসের মধ্যে শাহীনসহ বাকি বাংলাদেশিদের ভানুয়াতুতে নিয়ে যায় সুমন। অনেককে বলা হয়, সুমনের মি. প্রাইসে কাজ করতে তারা বৈধ পথে অস্ট্রেলিয়া, কিউবা কিংবা নিউ ক্যালেডোনিয়াতে যাচ্ছেন।

জাল ব্যবসায়ী নথি, লাইসেন্স এবং পাশাপাশি ঘুষের মাধ্যমে পাচারকারীরা ভানুয়াতুর ইমিগ্রেশন পার হওয়ার ব্যবস্থা করে।

এরপর ভুক্তভোগীরা হয়ে যান সুমনের দাস। মারধরের হুমকির মুখে খুব সামান্য অর্থ অথবা বিনা পারিশ্রমিকে তাদেরকে দিয়ে কাজ করানো হতো। স্থানীয় সংবাদপত্রের মতে, ভানুয়াতুতে আসার পর তাদের দিয়ে জোর করে নির্মাণকাজ, কাঠের আসবাব তৈরি ও বিক্রি করানো হতো তাদের দিয়ে। কাজ করতে অস্বীকার করলেই তাদের মারধর করা হতো। তাদের প্রতিশ্রুত চাকরি কিংবা বেতন কখনোই দেওয়া হয়নি।

তদন্তে উঠে আসে, ভানুয়াতুতে প্রকৃত ব্যবসা পরিচালনার কোনো উদ্দেশ্যই ছিল না সুমনের। মূলত শাহীনের মতো লোকদের থেকে টাকা নিয়ে তাদেরকে সুবিধাবঞ্চিত অবস্থায় রেখে যাওয়াই ছিল সুমনের লক্ষ্য।

শহরের কেন্দ্রে মি. প্রাইস-এর একটি দায়সারা গোছের শোরুম তৈরি করেছিল সুমন। তদন্তকারীরা পরে জানতে পারেন, সুমন দক্ষিণ আফ্রিকার কোম্পানিটির ব্র্যান্ড আর লোগো বিনা অনুমতিতেই ব্যবহার করছিল।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর সুমন নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে দাবি করে, সে জিম্বাবুয়ের নাগরিক। যদিও তদন্তকারীরা পরে আবিষ্কার করেন, তার পাসপোর্ট আদতে জাল।

বিশ্বব্যাপী অভিবাসীদের ষষ্ঠ বৃহত্তম উৎস বাংলাদেশ। এসব অভিবাসীদের অনেকেই দালালদের ওপর নির্ভর করেন। এ দালালেরা বিদেশে সম্ভাব্য কর্মী এবং নিয়োগকারীদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।

প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশিকে বিদেশে ভালো চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করে এসব দালাল। এ দালালদের অনেকে অতীতে নিজেরাই পাচারের শিকার হয়েছিল।

বাংলাদেশের পাচার হওয়া ব্যক্তিদের ওপর ২০২২ সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়, 'বিশ্বব্যাপী পাচারের সবচেয়ে বেশি শিকার বাংলাদেশিরা।'

দালালদের ব্যবহার করা বিজ্ঞাপন। ছবি সৌজন্য: ভানুয়াতু পুলিশ

ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন বাংলাদেশ-এর মিশন প্রধান আবদুসাত্তার এসোয়েভ বলেন, পাচারের শিকার অনেককে বিদেশে পাড়ি দিয়ে তাদের এবং তাদের সন্তানদের জীবনকে নিরাপদ করার টোপ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, 'অনেকে তাদের সম্পদ এবং সারাজীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে।

'এদের অনেকেই পাচারের শিকার হন। তাদেরকে জোরপূর্বক শ্রম, যৌন নিগ্রহ বা ঋণের বোঝায় ঠেলে দেওয়া হয়।'

ভানুয়াতুর ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান চার্লি উইলি রেক্সোনা বলেন, ফিলিপাইন এবং অন্যান্য এশীয় দেশ থেকে আসা বিদেশি কর্মীরা প্রায়ই তাকে বলেন যে তাদের পাসপোর্ট তাদের বসেরা আটকে রেখেছে। এটি মানব পাচারের একটি স্পষ্ট লক্ষণ।

'পাচার হচ্ছে। এখানে এখনো চোরাচালান চলছে। কিন্তু তা প্রকাশ পাচ্ছে না,' বলেন তিনি।

উইলি রেক্সোনা বলেন, 'সুমন তার স্ক্যামটি আরও কয়েকটি দেশে চালু করার চেষ্টা করেছিল। কয়েকটি দেশে তারা এটি পরীক্ষা করেছিল। এরপর তারা ভানুয়াতুর আইনে 'ছিদ্র' খুঁজে পাওয়ার পর এখানে ব্যবসা ফাঁদার সিদ্ধান্ত নেয়।'

'আমাদের এখানকার লোকজন মানবপাচারের লক্ষণগুলো সম্পর্কে তেমন ধারণা রাখেন না, এমনকি অভিবাসন কর্মকর্তাদের মধ্যেও স্পষ্ট ধারণা নেই,' তিনি বলেন।

আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে অস্পষ্টতা

অপরাধের স্বতন্ত্র প্রকৃতি এবং সুমনের ভুক্তভোগীর সংখ্যা পোর্ট ভিলায় দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর বিচারপ্রক্রিয়ার সময় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল।

ওই ১০৭ ভুক্তভোগী মামলার মূল সাক্ষী। কিন্তু ভানুয়াতু সরকারের কাছে তাদেরকে খাওয়ানো এবং রাখার ব্যবস্থা ছিল না।

এছাড়া সুমন ও তার সহযোগীদের বিচার করতেও অসুবিধার মুখে পড়তে হয়।

ভানুয়াতুতে দাসপ্রথা এবং পাচারকে সংজ্ঞায়িত করে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। তাই ভানুয়াতুর পাবলিক প্রসিকিউটর জোসিয়া নাইগুলেভু চার আসামির বিরুদ্ধে তার অভিযোগ গঠনে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

২০২২ সালের জুন মাসে সুমন, তার স্ত্রী বুক্সো নাবিলা বিবি এবং অন্য দুই সহযোগীকে মানবপাচার, দাসত্ব, অর্থ পাচার, হামলা, হত্যার হুমকি এবং ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া বিদেশি ব্যক্তিদের কাজ দেওয়ার অভিযোগে সাজা দেন বিচারক।

সুমন এখন ভানুয়াতুর কারাগারে ১৪ বছরের সাজা ভোগ করছে। তার স্ত্রী এবং দুই সহযোগীকে এর অর্ধেক বছর সাজা দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বছরের শুরুতে তাদেরকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় এবং জরিমানা দেওয়ার পরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভানুয়াতুর ডিপার্টমেন্ট অভ কারেকশনস-এর পরিচালক জনি মারাঙ্গো সেই সময় স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন যে বিদেশি বন্দিদের স্বদেশে পাঠিয়ে দেওয়া 'স্বাভাবিক' ছিল।

১০৭ ক্ষতিগ্রস্থকে মোট এক মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে চার অপরাধীকে আদেশ দিয়েছিলেন আদালত, তবে ওই অর্থ এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

অন্যান্য দেশের তুলনায় এ সাজা লঘু হয়েছে বলে নাইগুলেভু মনে করেন।

নাইগুলেভু আল জাজিরাকে বলেন, 'সর্বোচ্চ সাজার ক্ষেত্রে আমাদেরকে এ দেশের আইন পর্যালোচনা করতে হবে।'

বিচারের পর থেকে শাহীন ছাড়া ভুক্তভোগীদের সবাই বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন।

শাহীন যেহেতু এ মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী হয়েছিলেন, তাই তার আশঙ্কা বাংলাদেশে ফিরে আসার সাহস করলে সুমন এবং তার সহযোগীরা তার ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে।

তাই ভানুয়াতুতে থাকা নিরাপদ মনে করে শাহীন তার স্ত্রী এবং সন্তানদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছেন।

শাহীন আল জাজিরাকে বলেন, 'আমি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করি কারণ আমি শুধু আমার বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তিত ছিলাম।'

শাহীনের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। ভানুয়াতুতে তার অভিবাসন মর্যাদা এখনো অচলাবস্থায় পড়ে রয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘের মাধ্যমে শরণার্থী মর্যাদা অর্জনের জন্য তার আবেদন গ্রহণ করা হয়নি।

তবে তিনি এখনো আশা করেন, একদিন তিনি পরিবারকে আরেকটু উন্নত জীবন দিতে পারবেন।

তবে আপাতত ভানুয়াতু তার কাছে বাংলাদেশের চেয়ে নিরাপদ বাড়ি, শাহীন বলেন।

ভবিষ্যতে কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো দেশে স্থায়ী হতে চান শাহীন।


প্রিয়াংকা শ্রীনিবাস | আল জাজিরা | দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড



Thursday, September 14, 2023

বিশ্বের নিষিদ্ধ ৬ স্থান

0 comments

 নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের কৌতূহল সবসময়ই বেশি। এই কৌতূহলই পৃথিবীর দুর্গম স্থানগুলোতে অভিযানে মানুষকে উৎসাহিত করেছে। তারপরও এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে জনসাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।



এরিয়া ৫১, নেভাডা, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডায় অবস্থিত 'এরিয়া ৫১' সামরিক ঘাঁটি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় জায়গা। সেখানে কী হয়, তা আজ পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত করে বলেনি। ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত মার্কিন সরকার এই জায়গাটির অস্তিত্ব স্বীকারই করেনি।

মার্কিন সেনাবাহিনীর ১৯৯২ সালের কিছু নথি ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং তখন এই সেনা ঘাঁটির কথা স্বীকার করা হয়। তারপরও এরিয়া ৫১ এ কী ধরণের কাজ বা গবেষণা হয়, তা মার্কিন সরকার নিশ্চিত করেনি। এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে চর্চিত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে গোপন ঘাঁটি।

বলা হয়, মার্কিন সেনাবাহিনী ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতারা যখন এই সেনাঘাঁটিতে যান, তখনও উড়োজাহাজ অবতরণের সময় জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে বাইরের কিছু দেখা না যায়।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের বক্তৃতায় এরিয়া ৫১ এর নাম উল্লেখ করেন বারাক ওবামা।

হিলারি ক্লিনটন ও বার্নি স্যান্ডার্সের মতো প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরাও তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় অঙ্গীকার করেছিলেন, নির্বাচিত হলে তারা এরিয়া ৫১ এর রহস্য উৎঘাটন করবেন।

স্নেক আইল্যান্ড, ব্রাজিল

ব্রাজিলের ইলহা ডি কুইমাডা গ্র্যান্ডে দ্বীপকে স্নেক আইল্যান্ড বা সর্পদ্বীপ বলা হয়। কারণ, এটি প্রাণঘাতী সাপের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা।

গোল্ডেন ল্যান্সহেড ভাইপার এতই বিষাক্ত যে এটি কামড়ালে আশেপাশের মাংস পর্যন্ত গলে যায়। বলা হয়, স্নেক আইল্যান্ডের কিছু জায়গায় প্রতি বর্গমিটারে একটি করে সাপ আছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ব্রাজিল সরকার দ্বীপটিতে যেতে কোনো পর্যটককে অনুমতি দেয় না।

এমনকি, গবেষণার কাজে কেউ সেখানে গেলেও সঙ্গে একজন চিকিৎসক রাখা বাধ্যতামূলক।

লেসকো গুহা, ফ্রান্স

১৯৪০ সালে ফ্রান্সের লেসকো গুহায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের চিত্রকর্মের সন্ধান পাওয়া যায় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটি একটি পর্যটন স্থানে পরিণত হয়।

দর্শনার্থীদের নিঃশ্বাস থেকে উৎপন্ন কার্বন মনোক্সাইডের কারণে গুহাচিত্রগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ফলে, গুহাটিতে ১৯৬৩ সালে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

এটি এখন ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। আসল গুহাটি বন্ধ হলেও দর্শনার্থীদের জন্য অনুরূপ কৃত্রিম গুহা চালু করা হয়েছে। তবে, গবেষক ও সংরক্ষণকারী কর্তৃপক্ষ এখনো আসল গুহাটিতে প্রবেশ করতে পারেন।

উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ, ভারত

বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ উত্তর সেন্টিনেল। এই দ্বীপ সম্পর্কে মানুষের কেবল ধারণাই রয়েছে, সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

ধারণা করা হয়, এই দ্বীপের বাসিন্দারা ৬০ হাজার বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে। তারা পুরো পৃথিবী থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

২০০৬ সালে ২ জেলে নৌকাডুবির কবলে পড়ে দ্বীপটিতে আশ্রয় নেয়। পরে দ্বীপের অধিবাসীরা তাদেরকে হত্যা করে। ওই দ্বীপের ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার যাওয়ার সময়ও দ্বীপের বাসিন্দারা তীর ছুঁড়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।

ভারত সরকার সেখানে বসবাসকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনোভাবেই সফল হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত এই দ্বীপটিতে যাওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত সরকার।

চেরনোবিল, ইউক্রেন

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ইউক্রেনের চেরনোবিলের কাছে (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত) একটি বিস্ফোরণ ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত পারমাণবিক দুর্ঘটনা।

বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, চেরনোবিল বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট বিকিরণের কারণে ক্যানসারে ৯ হাজার থেকে ১০ লাখ মানুষ মারা যাবে। এই ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে ৩০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও বিকিরণ বন্ধ করার প্রকল্পগুলো এখনো চলমান।

বিশেষজ্ঞদের অনুমান অনুসারে, অন্তত ২০ হাজার বছর এই অঞ্চলটি বসবাসের অযোগ্য থাকবে।

স্ভালবার্ড সীড ভল্ট

নরওয়ে এবং উত্তর মেরুর মাঝামাঝিতে অবস্থিত এই সীড ভল্টকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফ্রিজার বলা হয়। এই বিশাল শস্যাধারটিকে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এটি অক্ষত থাকে।

পৃথিবীতে যদি কোনো ভয়াবহ দুর্যোগের ঘটনাও ঘটে, তবুও এখানে রক্ষিত ৮ লাখ ৯০ হাজার বীজ সুরক্ষিত থাকবে এবং দুর্যোগ পরবর্তী খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

বিশ্বের প্রায় সব দেশের শস্যবীজ সংরক্ষিত আছে এই ভল্টে। প্রতি বছর মাত্র কয়েকবার এই ভল্টের দরজা খোলা হয়। ভল্টে সীমিতসংখ্যক মানুষের প্রবেশাধিকার আছে।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট/ Daily star Bangla

Wednesday, September 13, 2023

বিমানবন্দর তো নয় যেন বিলাসবহুল আধুনিক শহর

0 comments

 চাঙ্গি বিমানবন্দরকে শুধু সিঙ্গাপুরের বিস্ময় বললে কম বলা হবে। আধুনিকতা ও বিলাসিতার সমন্বয়ে তৈরি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এই বিমানবন্দরটি সারা বিশ্বেই পরিচিত এর অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য। মানুষ কোনো গন্তব্যে যেতে বিমানবন্দর ব্যবহার করে। কিন্তু চাঙ্গি বিমানবন্দর নিজেই যেন একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।



সুযোগ-সুবিধা, আরাম, যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন বিনোদনমূলক ব্যবস্থার সমন্বয়ে তৈরি বিশ্বের সেরা এই বিমানবন্দরটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে, এটি গতানুগতিক খোলসে আটকে না থেকে নিজেই একটি পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পার্ক, গার্ডেন, শপিং মল, বিয়ের আয়োজন থেকে শুরু করে কী নেই এতে! এ যেন বিমানবন্দর নয়, অত্যাধুনিক কোনো শহর।

যেন এক বিনোদনকেন্দ্র

অনেকেই ছুটির দিনে পরিবার পরিজন নিয়ে চাঙ্গির টার্মিনাল ১ এর সঙ্গে সংযুক্ত ১৫ লাখ বর্গফুট আয়তনের জুয়েল শপিং মলে ঘুরতে যান। দৃষ্টিনন্দন এই শপিং মলটির নকশা করেছেন বিখ্যাত কানাডীয় স্থপতি মোশে সাফদি ও তার দল। এখানেই গড়ে তোলা হয়েছে ৭ তলা বিশিষ্ট কৃত্রিম ঝরনা, যা বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ইনডোর ঝরনার খেতাব পেয়েছে। শপিং মলটিতে ডিজনির আদলে তৈরি লাইট ও মিউজিক শোর ব্যবস্থাও আছে।

চাঙ্গিতে হয় বিয়ের অনুষ্ঠানও। ছবি: চাঙ্গি বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া


অনেকেই সারাদিন কাটানোর জন্য চাঙ্গিতে যান। বিমানবন্দরটিতে পাতাল রেল ও বাসে করে খুব সহজেই যাওয়া যায়। সেখানে আপনি সিনেমা দেখতে পারেন, খাবার খেতে পারেন, মুদি কেনাকাটা করতে পারেন, এমনকি পড়াশোনার জন্য নিরিবিলি জায়গাও খুঁজে পেতে পারেন। বছরের পর বছর ধরে এটি বিয়ের শুটিং এবং পুনর্মিলনীর কাজেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।



মহামারির পর এখনো আগের মতো যাত্রী পরিবহন সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেনি বিমানবন্দরটি। তবে মানুষের কাছে এটি একটি নিছক ভ্রমণ কেন্দ্র না হয়ে আড্ডা ও বিনোদনের অন্যতম স্থান হয়ে উঠছে।

আধুনিকতা ও নান্দনিকতার মিশেল

আধুনিকতা ও নান্দনিকতার মিশেলে তৈরি চাঙ্গিকে বিশ্বের সেরা বিমানবন্দরের খেতাব দিয়েছে বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোর র‌্যাংকিং ও রিভিউ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্কাইট্র্যাক্স।

স্কাইট্র্যাক্স বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোর গ্রাহক সন্তুষ্টির ওপর বৃহত্তম বার্ষিক জরিপ পরিচালনা করে, যেখানে ভ্রমণকারীরা ৫৫০টিরও বেশি বিমানবন্দরের পরিষেবা এবং সুবিধা মূল্যায়ন করে থাকেন। চাঙ্গি স্কাইট্র্যাক্সের র‌্যাংঙ্কিংয়ে ১২ বার শীর্ষস্থান দখল করেছে, যার মধ্যে গত এক দশকেই ৮ বার বিমানবন্দরটি র‌্যাংকিংয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছে।



গত ২ বছর দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরের কাছে শীর্ষস্থান হারানোর পর গত মার্চে বিমানবন্দরটি আবারও তার মুকুট পুনরুদ্ধার করে। 'অতুলনীয় যাত্রী অভিজ্ঞতার' জন্য চাঙ্গির প্রশংসা করেছে স্কাইট্র্যাক্স।

২০১৯ সালে করোনা মহামারির আগে চাঙ্গি বিমানবন্দর উড্ডয়ন ও অবতরণ মিলিয়ে ৩ লাখ ৮২ হাজার ফ্লাইট পরিচালনা করেছে, যেগুলো ৬ কোটি ৮০ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে।

গার্ডেন, পার্ক ও অন্যান্য

চাঙ্গির অন্যান্য আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেইনফরেস্ট, হেজ মেজ (গোলকধাঁধা) এবং একটি ১২ মিটার উঁচু স্লাইড। আপনি যদি কোথাও যাওয়ার সময় বিমানবন্দরটিতে একটু আগে চলে আসেন, তাহলে সময় কাটানোর বহু অনুষঙ্গ পাবেন। ট্রানজিট লাউঞ্জে স্পা, বিনামূল্যে সিনেমা দেখা, সুইমিং পুল, ম্যাসাজ চেয়ার এবং প্রজাপতি বাগানে সময় কাটাতে পারেন।



বিমানবন্দরটিতে আরও আছে ক্যাকটাস গার্ডেন, বাউন্সিং নেট, ক্যানোপি পার্ক, ক্যানোপি ব্রিজ, ক্রিস্টাল গার্ডেন, ডিসমকভারি স্লাইড, ডিসকভারি গার্ডেন, এনচান্ডেট গার্ডেন, হেরিটেজ জোন, মিরর মেজ, পেটাল গার্ডেন, ইমারসিভ ওয়াল, কাইনেটিক রেইন, সিঙ্গাপুর রোজাক, স্টিল ইন ব্লুম, সূর্যমুখী বাগান, শাপলার বিলসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান।

২০১৯ সালে করোনা মহামারির আগে চাঙ্গি বিমানবন্দর উড্ডয়ন ও অবতরণ মিলিয়ে ৩ লাখ ৮২ হাজার ফ্লাইট পরিচালনা করেছে, যেগুলো ৬ কোটি ৮০ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে।

গার্ডেন, পার্ক ও অন্যান্য

চাঙ্গির অন্যান্য আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেইনফরেস্ট, হেজ মেজ (গোলকধাঁধা) এবং একটি ১২ মিটার উঁচু স্লাইড। আপনি যদি কোথাও যাওয়ার সময় বিমানবন্দরটিতে একটু আগে চলে আসেন, তাহলে সময় কাটানোর বহু অনুষঙ্গ পাবেন। ট্রানজিট লাউঞ্জে স্পা, বিনামূল্যে সিনেমা দেখা, সুইমিং পুল, ম্যাসাজ চেয়ার এবং প্রজাপতি বাগানে সময় কাটাতে পারেন।

বিমানবন্দরটিতে আরও আছে ক্যাকটাস গার্ডেন, বাউন্সিং নেট, ক্যানোপি পার্ক, ক্যানোপি ব্রিজ, ক্রিস্টাল গার্ডেন, ডিসমকভারি স্লাইড, ডিসকভারি গার্ডেন, এনচান্ডেট গার্ডেন, হেরিটেজ জোন, মিরর মেজ, পেটাল গার্ডেন, ইমারসিভ ওয়াল, কাইনেটিক রেইন, সিঙ্গাপুর রোজাক, স্টিল ইন ব্লুম, সূর্যমুখী বাগান, শাপলার বিলসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান।

যাত্রী অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিমানবন্দরটির নিরাপত্তাও বিশ্বসেরা। ব্যস্ততম বিমানবন্দর হওয়া সত্ত্বেও যাত্রীদের লাগেজ হারানোর ঘটনা এখানে ঘটে না বললেই চলে। অনেক সময় যাত্রীরা কানেক্টিং ফ্লাইট মিস করলেও চাঙ্গির দারুণ ব্যবস্থাপনার কারণে সেখানে এটিও সাধারণত ঘটে না।

চাঙ্গি বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া


বর্তমানে বিমানবন্দরের পঞ্চম টার্মিনালের নির্মাণ কাজ চলছে। আগামী দশকের মাঝামাঝিতে এটি চালু করার কথা রয়েছে।

দক্ষতা ও সৌজন্যতার দিক থেকে সিঙ্গাপুরের সুনাম আছে। চাঙ্গিতে তাদের সেই সুনামের প্রতিফলনই দেখা যায়।

তথ্যসূত্র: চাঙ্গিএয়ারপোর্ট.কম, বিবিসি/ ডেইলিস্টার বাংলা

Sunday, September 10, 2023

১১০ ট্রিলিয়ন মশকবাহিনীর আক্রমন ৮ বিলিয়ন মানুষের ওপর

0 comments

 মশার ইতিহাস ও মানবজাতির সংকট নিয়ে টিমথি ওয়াইনগার্ডের বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য মসকুইটো: আ হিউম্যান হিস্টরি অব আওয়ার ডেডলিয়েস্ট প্রিডেটর'-এর শুরুটাই যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আহ্বান—'উই আর অ্যাট ওয়ার উইথ মসকুইটো' (আমরা মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছি)। এ যুদ্ধে আমাদের জিততেই হবে। কিন্তু বিজয়ের লক্ষণ যে দেখা যাচ্ছে না। ২২ আগস্ট ২০২৩ বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী মশার ভয় তার বক্তব্যের একাংশ ভুলিয়ে দিয়েছে বলে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তার সঙ্গী একজন মশা মারার বৈদ্যুতিক ব্যাট নিয়ে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন, তবুও ভুলে যাওয়া কথা আর স্মৃতিতে জেগে ওঠেনি। মশা মারতে কামান দাগা—এ নিয়ে বিস্তর হাসিঠাট্টা হলে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মশার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কামানই যথেষ্ট নয়। ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালাস্টিক মিসাইলও মশার বিরুদ্ধে তুচ্ছ অস্ত্র।



অবিশ্বাস্য মনে হওয়ারই কথা, কিন্তু গবেষকেরা হিসাব করেই দেখিয়েছেন, গত ২ লক্ষ বছরে পৃথিবীতে যত মানুষ সৃষ্টি হয়েছে, তার অর্ধেকের মৃত্যু ঘটেছে মশার আক্রমণে, মশার কামড়জনিত ব্যাধিতে।

২.৫ মিলিগ্রাম ওজনের মশার কামড়ে পৃথিবীতে গড়পড়তা এক মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা অন্তত ৭ লক্ষ মৃত্যুর প্রত্যয়ন তো করছেনই। বাকি ৩ লক্ষ দরিদ্র দেশগুলোতে, যা সম্ভবত শনাক্তই হয়নি।

মশকসৃষ্ট যে রোগগুলো মানুষের পাইকারি হারে মৃত্যু ঘটাচ্ছে, সেগুলো হচ্ছে ম্যালেরিয়া, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস (আফ্রিকাতে নীলনদ অঞ্চলে এর প্রকোপ), ডেঙ্গু, জিকা ভাইরাস, ইয়েলো ফিভার এবং চিকুনগুনিয়া।

টিমথি ওয়াইনগার্ড বলছেন, অ্যান্টার্কটিকা, আইসল্যান্ড, সিসিলিজ ও ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ান কয়েকটি ক্ষুদ্র দ্বীপ বাদ দিয়ে গোটা পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছে ১১০ ট্রিলিয়ন মশকবাহিনীর অবিশ্বাস্য রকম বৃহৎ একটি দল, তাদের দৃষ্টি পৃথিবীর ৮ বিলিয়ন মানুষের ওপর।

গত ২ লক্ষ বছরে পৃথিবীতে বিরাজ করেছে ১০৮ বিলিয়ন মানুষ আর মশা হরণ করেছে তাদের মধ্যে ৫২ বিলিয়ন মানুষের জীবন। এর চেয়ে বড় ঘাতক দুর্বৃত্তের দেখা মেলেনি, দুই মহাযুদ্ধের মোট মৃত্যু মশকমৃত্যুর তুলনায় নস্যিমাত্র।

মশকমৃত্যু: সেলিব্রিটি

২০ মে ১৪৯৮ পর্তুগিজ অভিযাত্রী নির্মম নাবিক ভাস্কো দা গামা সদম্ভে ভারতবর্ষের কালিকটে পা রাখলেন। মরিচ আর দারুচিনির ঘ্রাণে উতলা এই অভিযাত্রী যদি কেবল লুণ্ঠনমূলক মসলা-বাণিজ্যে নিবেদিত না হয়ে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দিতেন, দক্ষিণ এশীয় এই পুরো অঞ্চলটিই হতো পর্তুগিজ উপনিবেশ। আমাদের পড়তে হতো ভিন্ন এক ঔপনিবেশিক ইতিহাস। ভাস্কো দা গামার হত্যাযজ্ঞ আর লুণ্ঠনের প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা ভারতবর্ষের ছিল না। ১৫২৪-এর ফেব্রুয়ারিতে পর্তুগিজ রাজকীয় নির্দেশে ভারতের ভাইসরয় হয়ে ১৪টি জাহাজের বহর নিয়ে হিজ এক্সিলেন্সি ভাস্কো দা গামা এপ্রিল মাসে তার তৃতীয় ভারতবর্ষ অভিযানে সমুদ্রযাত্রা করলেন। সেপ্টেম্বরে এসে পৌঁছলেন, নতজানু ভারতীয়দের তাকে স্বাগত জানানো ছাড়া ভিন্ন কোনো কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। ভাইসরয় পৌঁছেই টের পাইয়ে দিলেন তিনি কত প্রতাপশালী। কিন্তু তার প্রতাপকে মোটেও পাত্তা দেয়নি একটি ক্ষীণদেহী ভারতীয় এনোফিলিশ মশা। কখন যে হুল ফুটিয়ে ম্যালেরিয়ার জীবাণুু ঢুকিয়ে দিল পর্তুগিজ বীরপুরুষ, নবনিযুক্ত ভাইসরয় ভাস্কো দা গামা বুঝতেও পারেননি। বুঝলেন যখন প্রচণ্ড জ¦রে তাকে শয্যা নিতে হলো। ওদিকে বড়দিন উদ্যাপনের আয়োজনও চলছিল। ঠিক তার আগের দিন ২৪ ডিসেম্বর ১৫২৪ ক্রিসমাস ইভে ভারতবর্ষেই প্রাণ হারালেন ভাস্কো দা গামা। ফোর্ট কোচির সেইন্ট ফ্রান্সেস চার্চ প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করা হয়। ১৫ বছর পর ১৫৩৯ সালে জাতীয় বীর খেতাব দিয়ে ভাস্কো দা গামার দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে সোনার কাসকেটে ভরে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন শহরে এনে জেরিনোমোস চার্চে পুনরায় সমাহিত করা হলো।

মশাটা জানলও না ভারতীয়দের পক্ষে তার কাজ বড় প্রতিশোধ নিয়েছে। জানলেও এনোফিলিস ও তার স্বজাতির মশাদের বীরের মর্যাদা দেওয়া দূরে থাক, তাদের চিহ্নিত করা হলো ঘাতক হিসেবে দ্য ডেডলিয়েস্ট অ্যানিমেল ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। টিমথি ওয়াইনগার্ড এই মশাকে বলেছেন জেনারেল এনোফিলিস। এই জেনারেল মানে সাধারণ নয়, সামরিক পদবি জেনারেল।

বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর ৩২ বছর বয়সে রহস্যজনক মৃত্যুর কারণ এখনো সুনিশ্চিতভাবে অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে। তবে ম্যালেরিয়া কিংবা টাইফয়েড—এ দুটোকে সন্দেহ করা হচ্ছে, টাইফয়েডের পক্ষে সমর্থন বেশি।

২১ সেপ্টেম্বর ১৫৫৮ স্পেন ও হলি রোমান এম্পায়ারের রাজা পঞ্চম চার্লস যে ৫৮ বছর বয়সে ম্যালেরিয়ায় মারা গেছেন—এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। রাজপ্রাসাদের দেয়াল বাঘ আর সিংহের জন্য দুর্ভেদ্য হতে পারে, কিন্তু মশার জন্য নয়। মশাদের প্রবেশাধিকার সেকালেও ছিল, একালেও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্টের কন্যা এবং পরবর্তী একজন প্রেসিডেন্টের স্ত্রী সারাহ নক্স টেয়লর মাত্র ২১ বছর বয়সে ম্যালেরিয়ায় প্রাণ হারান ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৩৫। বিখ্যাত স্কটিশ অভিযাত্রী ডেভিড লিডিংস্টোন মশার কামড় খেয়েই ম্যালেরিয়ায় ভুগে মারা গেছেন। সেকালের ক্ষমতাবান চেঙ্গিস খান এবং একালের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হয়নি সত্য কিন্তু দুজনেই বেশ ভুগেছেন।

হলিউড স্বর্ণযুগের নায়ক এরোল ফ্লিন (১৯০৯-১৯৫৯) কুড়ি বছর বয়সে নিউ গিনিতে তামাক চাষের খামারে গিয়ে মশার দংশনে ম্যালেরিয়ায় শয্যা নিয়েছিলেন। উঠে দাঁড়িয়েছেন, হলিউডে রাজত্ব করেছেন, কিন্তু শরীরের ভাঙন ঠেকাতে পারেননি। পঞ্চাশ বছর বয়সেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।

১২২৭-এ রণাঙ্গনের ক্ষত সারাতে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন চেঙ্গিস খান, সে সময় দুর্বৃত্ত মশক তার মধ্যে ম্যালেরিয়া সংক্রমিত করে। বেশ কয়েক মাস তিনি শয্যাশায়ী থাকেন। শয্যা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেও এরপর আর বেশি দিন বাঁচেননি।

ট্রাফালগার যুদ্ধের বিজয়ী বীর হোরাশিও নেলসন (১৭৫৮-১৮৫৫) তার নৌসেনা জীবনের শুরুতে ম্যালেরিয়ায় খুব ভুগেছেন। একালের পরিবেশবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরা (জন্ম ১৯২৬) তার বিশ্ব-পর্যটনের কোনো একপর্যায়ে মশক দংশনে কাবু হয়ে শয্যা নেন এবং দীর্ঘদিন ভোগেন। মাইকেল কেইন (১৯৩৩) সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন।

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের (১৪৫১-১৫০৬) চতুর্থ সমুদ্রযাত্রায় ১৫০৩ সালে এশীয় সামুদ্রিক রুটে আসার কথা ছিল। কিন্তু ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছিল। 

মশার আক্রমণ ও ম্যালেরিয়ায় বিপুলসংখ্যক সৈন্যের মৃত্যু বহু যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করে দিয়েছে। 



মশক বিচিত্রা

আপনার আশপাশে কোথাও মিষ্টি চকোলেট, ক্যারামেল কিংবা অন্য চকোলেটজাতীয় কোনো খাবার রেখে দেখুন কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাকে টার্গেট করে এগিয়ে আসা মশাগুলোর মাথা গুলিয়ে গেছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। এই খাবারের ঘ্রাণ এবং মানুষের নিশ্বাস নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘ্রাণের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য করতে না পারাই মশার এই সিদ্ধান্তহীনতার কারণ। মশা তার টার্গেট ঠিক করে ঘ্রাণ দিয়ে। মশা কি জন্মান্ধ? মোটেও না; মশা দেখতে পায় এবং অত্যন্ত কম আলোতে মানুষ যেখানে দেখতে ব্যর্থ, মশা সাফল্যের সাথে তার কাছে যা দর্শনীয় তা দেখে থাকে। তবে মানুষের মতো করে বস্তুর স্পষ্ট ইমেজ দেখতে পায় না। মশার টার্গেট শনাক্তকরণ পদ্ধতিটি বেশ জটিল; এতে দৃষ্টির ভূমিকা সামান্যই। যদি মানুষকে টার্গেট করে থাকে, তাহলে প্রধান আকৃষ্টকারী উপাদান হচ্ছে মানুষের নিশ্বাস, আরও সুনির্দিষ্টভাবে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড। গুরুত্বপূর্ণ হলেও শনাক্তকরণের জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি মানুষের শরীরের উত্তাপ, ঘাম ও ত্বকের ঘ্রাণ উল্লেখযোগ্য আকর্ষক হিসেবে কাজ করে থাকে। ৫০ গজ দূর থেকে মশা কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘ্রাণ শনাক্ত করতে পারে। মশার কার্বন ডাই-অক্সাইড আসক্তির প্রমাণ মশা মানুষের মুখমণ্ডলের চারপাশে ঘুরঘুর করতে ভালোবাসে। কারণ, এই অঞ্চলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি ও ঘনীভবনের মাত্রা বেশি।

মানুষের অজ্ঞতার কারণে মশার চৌদ্দগুষ্টি আমাদের গালমন্দের শিকার। বাস্তবে ৩০০০ প্রজাতির মশা থাকলেও ১০০ প্রজাতি কামড়ে থাকে। আর মানুষের সামনে এসে কামড়ানো সাধারণ মশা ৮-১০ প্রজাতির বেশি নয়। আবার স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে সকল মশার মুণ্ডুপাত কতটা সমীচীন, ভেবে দেখা দরকার। পুরুষ মশা আপনার আমার ধারেকাছেও আসে না। তাদের আহার্য মানবরক্ত নয়, অন্য কোনো প্রাণীর রক্তও নয়। পুরুষ মশা ফুলের মধু আহরণ করে এবং তা খেয়ে একজীবন (প্রায় ছয় মাস) বেঁচে থাকে। মানবজাতির সাথে মশকজাতির পূর্বে শত্রুতার একটি মিথ আমাজন অঞ্চলে প্রচলিত থাকলেও বাস্তবে শত্রুতার যুক্তিসংগত কোনো কারণ নেই। স্ত্রী মশাকে ডিম পাড়তে হয়, শারীরিক চাহিদার কারণে তাকে প্রোটিন গ্রহণ করতে হয়। আর মশার জন্য তা সহজলভ্য মানুষের শরীরে। মানুষের নিশ্বাস ও শরীরের ঘ্রাণ সহজেই স্ত্রী মশাকে আকৃষ্ট করে, তার রক্ত সেবন করতে প্রলুব্ধ করে। স্ত্রী মশা সাধারণভাবে আগ্রাসী আচরণের হয়ে থাকে। স্ত্রী মশা মানুষের ঘামে আকৃষ্ট। ঘাম ও ব্যাকটেরিয়া মিলে শরীরে লেপ্টে থাকা শুকনো ঘাম মানুষের অজান্তে মশাকে আমন্ত্রণ জানায়।

মশা কামড়ায় বেশ তো; কিন্তু আপনি চুলকান কেন? 

মশা প্রাকৃতিকভাবে বুদ্ধিমান প্রাণী। মানুষের শরীর থেকে যে রক্ত টেনে নেয়, অল্পক্ষণের মধ্যেই তো সেই রক্ত জমাট বেঁধে মশার মরে যাবার কথা। কিন্তু তা তো ঘটছে না। মশার থুতু ও স্যালাইভায় রয়েছে অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট অর্থাৎ রক্ত জমাটবিরোধী উপাদান। প্রথমেই এই তরল ঢেলে দিয়ে রক্তের জমাট বাঁধা ঠেকাবার আয়োজন করে। সুতরাং রক্ত সেবনের পরপরই জমাট রক্তে তার পেট কঠিন পদার্থে পরিণত হয় না। স্যালাইভার আর একটি বিশেষ গুণ হচ্ছে অ্যানেসথেটিক শরীরের নির্দিষ্ট জায়গা কিছু সময়ের জন্য অসাড় করে রাখে, আপনি তাৎক্ষণিকভাবে টের পান না আপনার শরীর 'ব্লাড সাকার' আক্রান্ত হয়েছে। এটি লোকাল অ্যানেসথেশিয়া। ভরপেট লাঞ্চ কিংবা ডিনার করে মশা উড়ে গেল। অ্যানেসথেশিয়ার প্রভাবও কেটে গেল, অমনি আপনি চুলকাতে শুরু করলেন। অর্থাৎ মশা থুতু-স্যালাইভার সাথে কিছুটা চুলকানির উপাদানও ঢেলে দিয়ে যায়। যতক্ষণ না তা শেষ হচ্ছে, চুলকানোর তাড়না দূর হচ্ছে না। পাখাওয়ালা প্রাণীদের মধ্যে কম গতিশীল একটি হচ্ছে মশা। যেখানে একটি মৌমাছি ঘণ্টায় ১৫ মাইল পথ অতিক্রম করতে পারে, একই সময়ে মশা যেতে পারে সর্বোচ্চ ১.৫ মাইল। সে কারণেই মানুষের হাতে মশা সহজে মারা পড়ে।

গুনগুন গুন গান গাহিয়া কোন ভ্রমরা এল—ভ্রমরা ভাগ্যবান। রোমান্টিক একটি পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু একই কায়দায় ডানার সঞ্চরণে মশাও গান গেয়ে থাকে—সে গান শুনে মানুষের রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারের কথা মনে পড়ে। মানুষ আকৃষ্ট না হোক, যখন স্ত্রী মশার গান শুরু হয়, ফুলবনে ঘুরে বেড়ানো পুরুষ মশার আকাক্সক্ষা জাগ্রত হয়। রোমান্টিক আবহে মশক জোড়ের মিলন ঘটে।

মশা লাল ও কমলা রঙে আকৃষ্ট, কালোতেও। তবে মশার অপ্রিয় চারটি রং হচ্ছে—সাদা, বেগুনি, সবুজ আর নীল।

মানুষ তার নিজের ওজনের কত শতাংশের সমপরিমাণ খাবার খেতে পারে? স্ত্রী মশার সক্ষমতা স্মরণ রাখুন: নিজের ওজনের তিন গুণ রক্ত শুষে সঞ্চয় করে সানন্দে উড়ে যেতে পারে।

বোমারু বিমান মসকুইটো

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৩ নাৎসিদের ক্ষমতায় আরোহণ ও হিটলারের জার্মান চ্যান্সেলর হবার দশম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রপাগান্ডা মন্ত্রী হারমান গোয়েরিং বার্লিনে জার্মানির প্রধান বেতারকেন্দ্রে এসেছেন। তিনি এই দিনটিকে স্মরণ করে বেতার ভাষণ দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বেতারকেন্দ্র মসকুইটোর (মশা!) আক্রমণের শিকার হলো। গোয়েরিং প্রাণে বাঁচলেও অনেক কিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেল।

এই মসকুইটো আসলে দুই ইঞ্জিনের বোমারু বিমান। জাহাজের পুরো পরিচিতি ভি হ্যাভিল্যান্ড ডিএইচ ৯৮ মসকুইটো। জিওফ্রে ডি হ্যাভিল্যান্ডের বোমারু বিমান বানাবার প্রকল্পটি বাতিল হয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল স্যার উইলফ্রিড ফ্রিম্যান কড়াভাবে এই মশা প্রকল্প সমর্থন করেন। এ জন্য তখনকার বিমান উৎপাদন ও পরিবহনমন্ত্রী লর্ড বিভারব্রুক এই মশার ভিন্ন একটি নাম দিলেন 'ফ্রিম্যানস ফোলি'। এই বোমারু মশার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দিনের বেলায় নিচু ও মাঝারি উচ্চতায় উড্ডয়ন করে বোমা ফেলতে পারে, রাতে হাই অলটিচিউড বোম্বার: এটি পাথফাইন্ডার, ফাইটার বোম্বার, চোরাগোপ্তা আক্রমণে দক্ষ, গোয়েন্দাবৃত্তির উপযোগী এবং শত্রুপক্ষের আকাশসীমা দিয়ে দ্রুতগামী কার্গো পরিবহনের কাজ করতে পারে। একজন পাইলট ও একজন নেভিগেটর সামনে পাশাপাশি বসেন এবং পেছনে বোম্বার বেতে থাকেন একজন। ১৯৫০-এর দশকে রয়াল এয়ারফোর্স থেকে মসকুইটি অপসারণ করে জেট ইঞ্জিনের আধুনিক যুদ্ধবিমান বহরে সংযুক্ত করা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এই যান্ত্রিক মশা অক্ষশক্তির অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিল।

লেখক: এম এ মোমেন, দ্যা বিজনেস স্টান্ডার্ড