Sunday, October 22, 2023

শাশুড়ি দিবস

0 comments

আমাদের জীবনে শাশুড়ি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তিনি অভিভাবক, মায়ের মতো। এমন একজন মানুষকে সম্মান জানাতে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের চতুর্থ রোববার 'শাশুড়ি দিবস' উদযাপন করা হয়। সেই হিসেবে আজ 'শাশুড়ি দিবস'।



বিয়ে মানে দুই পরিবারকে এক করা, যে কাজটি মোটেও সহজ নয়। অথচ এই কঠিন কাজটিই সহজে করেন শাশুড়িরা। আবার প্রেমের বিয়ের ক্ষেত্রে শ্বশুর বাধা হয়ে দাঁড়ালেও সাধারণত শাশুড়ি ঠিকই পাশে থাকেন। এমন একজন মানুষকে সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।


তাই আজ শাশুড়িকে সম্মান জানাতে পারেন। যাদের বিয়ের কথা চলছে তারাও হবু শাশুড়িকে শুভেচ্ছা জানাতে পারেন। তাতে বিয়ের কথাটা হয়তো আরও পাকা হবে।


এজন্য আপনার শাশুড়িকে ফোন দিতে পারেন। আন্তরিকভাবে জানতে পারেন, তিনি কেমন আছেন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি পছন্দের কোনো খাবার বা পছন্দের কিছু উপহার দিয়ে তাকে চমকে দিতে পারেন।


তিনি অসুস্থ থাকলে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারেন।


এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দিবস। শাশুড়ি দিবস কীভাবে চালু হয়েছিল বা কারা চালু করেছিলেন সেই ইতিহাস নিয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, নিশ্চয়ই শাশুড়িকে সম্মান জানাতেই দিবসটির প্রচলন হয়েছে।


Saturday, October 21, 2023

আপেল দিবস

0 comments

 প্রতি বছরের ২১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র আপেল দিবস পালন করে।

ন্যাশনাল টুডে বলছে, গবেষণায় দেখা গেছে—১০ থেতে ২০ বছর আগে প্রাচীন বন্য আপেল গাছের সন্ধান পাওয়া যায় মধ্য এশিয়াতে। তবে, শুরুর দিকে সেই আপেলগুলো স্বাদ কিছুটা টক ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৭তম শতাব্দীর প্রথম দিকে আপেল ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করেন, এই সময়েই রোমান জনগোষ্ঠী আপেলের আকার বড়, মিষ্টি ও বৃহৎ পরিসরে চাষাবাদ শুরু করে। আমরা এখন যে আপেল খাই, এই আপেলের বিকাশ তখনই হয়েছিল। তারপর আপেল যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে।

আপেল দিবস যুক্তরাষ্ট্রে পালন করা হলেও দিবসের শিকড় আসলে ইউরোপে। ১৯৯০ সালের ২১ অক্টোবর যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থা কমন গ্রাউন্ড আপেলের বিভিন্ন প্রজাতির গুরুত্ব বোঝাতে দিবসটির প্রচলন করেছিল। বর্তমানে আপেলপ্রেমীরা এখনো বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত সাড়ে সাত হাজারের বেশি জাতের আপেলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে আপেল দিবস পালন করে।



আপেল দিবস উদযাপনের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, একটি সুস্বাদু আপেলের স্বাদ নিন। হতে পারে হলুদ, সবুজ, গোলাপি বা লাল রঙের আপেল।

Tuesday, October 3, 2023

পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া মহাদেশ আবিষ্কারে

0 comments

 ১৬৪২ সনে অভিজ্ঞ ডাচ কাপ্তান -এবেল তাসম্যান এক সমুদ্রযাত্রায় বের হন। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ গোলার্ধে এক বিশাল মহাদেশ আবিষ্কার; যার অস্তিত্ব আছে বলেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন তিনি। বিবিসি ফিউচার অবলম্বনে।



সেসময় পৃথিবীর এই অংশ সম্পর্কে বেশিকিছু জানতো না ইউরোপীয়রা, যা তাদের কাছে ছিল রহস্যের চাদরে মোড়া। তবে তাদের ধারণা ছিল, নিশ্চয়ই এখানে বিশাল কোনো ভূখণ্ড আছে, আবিষ্কারের আগেই যার নাম তারা দিয়েছিল টেরা-অস্ট্রালিস। ইউরোপে নতুন এ মহাদেশের ধারণা অবশ্য অনেক প্রাচীন; বলতে গেলে সেই রোমান যুগ থেকেই এটি প্রচলিত ছিল।

কিন্তু, প্রথমবারের মতোন তা প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর হন এবেল তাসম্যান। ইন্দোনেশিয়ায় জাকার্তায় তখন ছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঘাঁটি। সেখান থেকেই ১৬৪২ সনের ১৪ সেপ্টেম্বর দুটি ছোট জাহাজ নিয়ে পশ্চিমদিকে যাত্রা শুরু করেন এবেল। পশ্চিমে যেতে যেতে জাহাজ দুটি প্রথমে দক্ষিণে মোড় নেয়, তারপর যেতে থাকে পুবদিকে। এভাবে একসময় বর্তমান নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণে এসে পৌঁছায়। এখানে আসার পর স্থানীয় অধিবাসী মাউরিদের সাক্ষাৎ পায় ডাচরা।

কিন্তু, সে অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। অচিরেই ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের এ সাক্ষাৎ রূপ নেয় সংঘাতে। ডাচরা তীরের জাহাজ ভেড়ায়, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে এসময় বার্তা আদান-প্রদানে ব্যবহার করতো ছোট নৌকা। দ্বিতীয় দিনেই এমন একটি নৌকায় সজোরে গুঁতো দেয় মাউরিদের ক্যানু (গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি এক ধরনের নাও)। এতে চার ইউরোপীয় মারা যায়।

পরে মাউরিদের ১১টি ক্যানু লক্ষ্য করে তোপ দাগা হয় জাহাজ থেকে, এতে কতজন মাউরি মারা যায়– ইতিহাসে তার কোনো উল্লেখ নেই।  

অভিযানের সমাপ্তি টানা হয় তখনই। রক্তপাতের ঘটনার স্মরণে এবেল তাসম্যান এই উপসাগরের নাম নাম দেন 'মুর্দানার্স বে' (ইংরেজিতে মার্ডারার্স বে), যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- খুনিদের উপসাগর। এরপর আর নতুন আবিষ্কৃত এ ভূখণ্ডে পদার্পণ করেননি তিনি, সপ্তাহখানেক পরেই ফিরে যান জাকার্তায়। এবেল বিশ্বাস করতেন, দক্ষিণের বিশাল সেই মহাদেশ তিনি আবিষ্কার করেছেন, কিন্তু আর কখনোই এমুখো হননি।  

প্রসঙ্গত; ততোদিনে অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে ইউরোপবাসী জানতো; কিন্তু, এটাই কিংবদন্তির সে মহাদেশ এমনটা বিশ্বাস করতো না। পরে অবশ্য তাই মনে করে তারা, এবং এরই নাম দেয় 'টেরা অস্ট্রালিস'।

সে যাই হোক, তাদের শেষোক্ত ধারণাটি ভুল ছিল। হারানো এক মহাদেশের ব্যাপারে এবেলই সঠিক ছিলেন। কিন্তু, দুর্ভাগ্য এই– সেটা তিনি নিজেও জানতেন না।

স্থানীয় মাউরি আধিবাসীদের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর নিউজিল্যান্ডের উপকূল থেকে চলে যায় এবেল তাসমানের জাহাজ দুটি। ছবি: অ্যালামি/ ভায়া বিবিসি ফিউচার

তারপর কেটে গেছে সুদীর্ঘ পৌনে চার শতক, পৃথিবী দেখেছে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর জয়জয়কার। আকাশ, পাতাল, সমুদ্রগর্ভে মানুষের নিরন্তর অভিযান। তবুও লুপ্ত সেই মহাদেশের কিংবদন্তির সমাধান হয়নি বহুকাল। ২০১৭ সালে সেই রহস্যের পর্দা তোলেন একদল ভূতাত্ত্বিক। তাদের 'জিল্যান্ডিয়া' (মাউরি ভাষায় রিউ- এ- মাউই) নামের নতুন মহাদেশ আবিষ্কারের ঘোষণা বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। প্রায় ৪৯ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিস্তৃত বিশাল এ ভূখণ্ড মাদাগাস্কারের চেয়েও প্রায় ছয়গুণ বড়।

এদিকে দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বকোষ, অভিধান, মানচিত্র থেকে শুরু করে হালআমলের সার্চ ইঞ্জিনগুলোও গোঁ ধরে ছিল, পৃথিবীতে মহাদেশ মাত্র সাতটি-ই আছে। কিন্তু, ভূতাত্ত্বিকদের দলটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে দেখান, এই পুরোটা সময়েই তারা মানুষকে ভুল তথ্য দিয়েছে। আসলে পৃথিবীতে আছে আটটি মহাদেশ– গবেষকদের আবিষ্কৃত ভূখণ্ডটি পৃথিবীর নবীনতম, ক্ষুদ্রতম এবং পরিধিতে সবচেয়ে সরু মহাদেশ হিসেবেও নতুন রেকর্ড গড়ে।

পার্থক্য শুধু এটাই যে, এই ভূভাগের ৯৪ শতাংশই জলের তলায় সমাহিত, শুধু নিউজিল্যান্ডের মতো গুটিকয় দ্বীপ সাগরের বুক ফুঁড়ে মাথা উঁচু করে আছে। একেই হয়তো বলে, স্পষ্ট চোখের সামনে থেকেও লুকিয়ে থাকা। অর্থাৎ কিনা দৃষ্টিসীমায় থেকেই নিজ রহস্য বুকে নিয়ে যুগ যুগ ধরে আড়ালে রেখেছিল।   

নিউজিল্যান্ডের ক্রাউন রিসার্চ ইনস্টিটিউট জিএনএস সায়েন্স এর ভূতাত্ত্বিক এন্ডি তুলখ বলেন, 'দৃশ্যমান কোনোকিছুর রহস্য আবিস্কারেও যে অনেক সময় লাগতে পারে, এটা তারই উদাহরণ।'

এন্ডি জিল্যান্ডিয়া আবিষ্কারক দলের একজন সদস্য ছিলেন।  

কিন্তু, অষ্টম মহাদেশের অস্তিত্ব প্রমাণ করেই এ কাহিনি শেষ হয়নি। হবার কথাও নয়, সাগরের ৬,৫৬০ ফুট নিচে থাকায় এ মহাদেশের অধিকাংশ রহস্যই আজো অজানা। সেই অজানাকে জানার চেষ্টাই শুরু হয় এরপর। যেমন কারা সেখানে বাস করতো? কত যুগ আগেই বা এটি জলের তলায় চলে যায়?

কষ্টসাধ্য এক আবিষ্কার

জিল্যান্ডিয়া নিয়ে গবেষণা করা সব সময়েই খুব জটিল ছিল।

এবেল তাসম্যান নিউজিল্যান্ড আবিষ্কারের এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে ১৬৪২ সনে ব্রিটিশ অভিযাত্রী ও মানচিত্র প্রস্তুতকারক জেমস কুক'কে দক্ষিণ গোলার্ধে এক বৈজ্ঞানিক অভিযানে পাঠানো হয়। তার ওপর নির্দেশ ছিল, সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে শুক্র গ্রহের অতিক্রম করাকে পর্যবেক্ষণ করার। সূর্য পৃথিবী থেকে কতটা দূরে, তা হিসাব করে বের করতে এর দরকার ছিল।

স্যাটেলাইট চিত্রে অস্ট্রেলিয়ার পাশে হালকা নীল রঙে সমুদ্র নিমজ্জিত জিল্যান্ডিয়ার আয়তনকে দেখানো হয়েছে। ছবি: জিএনএস সায়েন্স/ ভায়া বিবিসি

কিন্তু, তাকে মুখবন্ধ একটি খামও দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক দায়িত্বটি সম্পন্ন হলেই, কেবল সেটি খুলে দেখার নির্দেশ ছিল তার ওপর। এই নির্দেশনামায় কুককে দক্ষিণের এক বিশাল মহাদেশ আবিষ্কারের অতি-গোপনীয় মিশন দেওয়া হয়। কুক তাই-ই করেছিলেন, আর সোজা পৌঁছেছিলেন নিউজিল্যান্ডে। কিন্তু, তিনি জানতেন না, যে মহাদেশের সন্ধান করছেন, স্রেফ তার ওপর দিয়েই তার জাহাজ নিউজিল্যান্ডে পৌঁছেছিল।

জিল্যান্ডিয়ার অস্তিত্ব নির্দেশ করে প্রথম এমনকিছু প্রমাণ জড়ো করেছিলেন স্কটিশ প্রকৃতিবিদ স্যার জেমস হেক্টর। ১৮৯৫ সালে তিনি নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে থাকা বেশকিছু দ্বীপ জরিপের অভিযানে যোগ দেন । এসব দ্বীপের ভূতাত্ত্বিক গঠন অধ্যয়নের পর তিনি এ উপসংহারে পৌঁছান যে, 'বর্তমানে সাগরে ডুবে থাকা দক্ষিণ থেকে পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত এক মহাদেশীয় অঞ্চলের পাহাড়শ্রেণির চূড়া হলো নিউজিজিল্যান্ড ও আশেপাশের দ্বীপগুলো।'

অনেক আগেই এমন ধারণা পাওয়া সত্ত্বেও, জিল্যান্ডিয়ার অস্তিত্ব সম্পর্কে তথ্যউপাত্ত অপ্রতুল রয়ে যায় দীর্ঘকাল।  এমনকী ১৯৬০ এর দশকের আগপর্যন্ত গবেষণার চেষ্টা গুরুত্বও পায়নি।  

জিল্যান্ডিয়া আবিষ্কারক টিমের নেতৃত্ব দেওয়া ভূতাত্ত্বিক নিক মর্টিমার বলেন, 'এক্ষেত্রে গবেষণা হয়েছে খুবই ধীরে ধীরে।'

১৯৬০ এর দশকে মহাদেশের সংজ্ঞা নির্ধারণের বিষয়ে একমত হন ভূতাত্ত্বিকরা। সার্বিকভাবে এই সংজ্ঞায় বলা হয়, মহাদেশ হল পৃথিবীর একটি কাঠামো, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে আসে। মহাদেশীয় ভূত্বক (ক্রাস্ট) নানান ধরনের শিলা দ্বারা গঠিত, যা বেশ পুরু থাকে। মহাদেশ হতে হলে সেই ভূখণ্ডকে যথেষ্ট বড়ও হতে হবে।

মর্টিমার বলেন, 'ছোট এক টুকরো ভূখণ্ডকে মহাদেশ বলা যাবে না।' এই সংজ্ঞার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা কাজের একটি দিকনির্দেশনা পান। তারা বুঝতে পারলেন, এই সূত্র মেনে যথেষ্ট প্রমাণ জোগাড় করতে পারলেই অষ্টম মহাদেশ যে আসলেই আছে তা প্রমাণ করা যাবে।

অবশ্য তারপর ফের এই মিশন গতি হারায়, কারণ একটি মহাদেশ আবিষ্কার সত্যিই বেশ কঠিন, এবং ব্যয়বহুল। তাছাড়া, তেমন তাগিদও ছিল না বলে উল্লেখ করেন মর্টিমার। এরপর ১৯৯৫ সালে আমেরিকান ভূপদার্থবিদ ব্রুস লুয়েনডিক এই অঞ্চলকে আবারো একটি মহাদেশ হিসেবে বর্ণনা করেন, এবং এর নাম জিল্যান্ডিয়া দেওয়ার সুপারিশ করেন। সেদিন থেকে আবিষ্কারের চেষ্টা নবউদ্যম ফিরে পায় বলে জানান ভূতাত্ত্বিক এন্ডি তুলখ।

প্রায় একইসময়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সম্পর্কিত আইন, 'ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সী' কার্যকর হয়। এই আইনের ফলেই নিউজিল্যান্ড সরকার এবার নড়েচড়ে বসে। জিল্যান্ডিয়া আবিষ্কারের ব্যাপক তাগিদ অনুভব করেন ওয়েলিংটনের কর্তারা। গবেষণায় টাকা ঢালতে, দরকারি বৈজ্ঞানিক উপকরণ দিতেও এবার যেন তাদের উৎসাহ দেখা যায়।

কারণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সম্পর্কিত আইনে বলা হয়েছে, একটি দেশ তার মহাদেশীয় মহীসোপন পর্যন্ত সমুদ্রসীমা ও এরমধ্যে থাকা সব ধরনের সম্পদ নিজের বলে দাবি করতে – তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ছাড়িয়ে, উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০ কি.মি.) পর্যন্ত সমুদ্রসীমা বিস্তৃত করতে পারবে।

নিউজিল্যান্ড যদি প্রমাণ করতে পারে, দেশটির আরও বৃহৎ এক মহাদেশের অংশ– তাহলে সমুদ্রসীমা ছয়গুণ বাড়াতে পারবে। এতে বহুগুণে বাড়বে দেশটির রাজস্ব আয়ের উপায়। এই সম্ভাবনা উপলদ্ধি করে, সমুদ্রজরিপে হঠাৎ করেই হু হু করে আসতে থাকে তহবিল। সেই সুযোগ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে জিল্যান্ডিয়ার অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রমাণ জড়ো করতে থাকেন। সমুদ্রতল থেকে সংগ্রহ করা প্রতিটি পাথরের নমুনা জিল্যান্ডিয়ার স্বপক্ষেই সাক্ষ্য দিয়েছে।  

কিন্তু, আরও অকাট্য প্রমাণের দরকার ছিল। যা দিয়েছে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য। স্যাটেলাইটের দেওয়া তথ্যের সাহায্যে সমুদ্রতলের ভূত্বকের বিভিন্ন অংশের মধ্যাকর্ষণ শক্তির তারতম্য শনাক্ত করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রযুক্তির সাহায্যে সমুদ্রের ভূত্বক থেকে জিল্যান্ডিয়ার অপেক্ষাকৃত পুরু ভূত্বককে আলাদাভাবে চেনা  গেছে। এভাবে তৈরি সমুদ্রতলের মানচিত্রে উঁচুনিচু ভূপ্রকৃতির প্রায় অস্ট্রেলিয়ার সমান জিল্যান্ডিয়াকে স্পষ্টভাবেই দেখাতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা।     

মর্টিমার বলেন, 'আমরা যখন এই মহাদেশের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানাই, তখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলমগ্ন ভূখন্ড সম্পর্কেও মানুষ জানতে পারে। বিষয়টি দারুণ মজার। ভেবে দেখুন, দুনিয়ার সব মহাদেশেই অনেক অনেক দেশ আছে, কিন্তু জিল্যান্ডিয়ায় মাত্র তিনটি রাষ্ট্রের উপস্থিতি আছে।'  

এরমধ্যে নিউজিল্যান্ড স্বাধীন রাষ্ট্র। অন্যদিকে ফরাসী উপনিবেশ হিসেবে রয়েছে নিউ কালেদোনিয়া দ্বীপ এবং অস্ট্রেলিয়ার দুটি দ্বীপ– লর্ড হোয়ে আইল্যান্ড এবং বলস পিরামিড।

নিউজিল্যান্ডই হলো জিল্যান্ডিয়ার সর্বোচ্চ ভূখণ্ড। ছবি: অ্যালামি/ ভায়া বিবিসি


রহস্যময় বিস্তার

জিল্যান্ডিয়া ছিল প্রাচীন অতিকায় মহাদেশ গন্ডোয়ানার অংশ। আজ থেকে প্রায় ৫৫ কোটি বছর আগে দক্ষিণ গোলার্ধের সকল ভূমি একত্র হয়ে গড়ে ওঠে গন্ডোয়ানা। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা ও পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার মতো কিছু ভূখণ্ডের সাথে জিল্যান্ডিয়া ছিল গন্ডোয়ানার পুবদিকের অংশে।

তুলখ জানান, 'আজ থেকে প্রায় ১০ কোটি বছর আগে অজ্ঞাত জিল্যান্ডিয়া গন্ডোয়ানা থেকে পৃথক হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে আমরা আজো পুরোপুরি জানতে পারিনি।'   

মহাদেশীয় ভূত্বক সাধারণত ৪০ কিলোমিটার গভীর হয়– যা সামুদ্রিক ভূত্বকের চেয়ে অনেক পুরু। সামুদ্রিক ভূত্বক সাধারণত ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর হয়। কিন্তু, গন্ডোয়ানা থেকে পৃথক হওয়ার সময় জিল্যান্ডিয়া এতটাই দূরে সরে গিয়েছিল যে, এর ভূত্বকের পুরুত্ব ক্ষয় হতে হতে মাত্র ২০ কিলোমিটারে নেমে আসে। ফলে অতিসরু এই মহাদেশ পানির তলায় ডুবে যায়।   

সরু ভূত্বক নিয়ে জলমগ্ন থাকলেও– এই মহাদেশে পাওয়া নানান রকম শিলা পরীক্ষা করেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন এটি সমুদ্রের অংশ নয়, বরং মহাদেশ। কারণ গ্রানাইট, স্কিস্ট ও চুনাপাথর দিয়ে গঠিত হয় মহাদেশীর ভূত্বকের শিলাস্তর। অন্যদিকে, সামুদ্রিক ভূত্বকে ব্যাসল্ট শিলাই থাকে বেশি।

তারপরও এখনও অজানা রয়েছে অনেক কিছু। যেমন বিশ্বের অষ্টম এ মহাদেশের উৎপত্তি ভূতাত্ত্বিকদের যেমন বিস্মিত করে, তেমনি এর টিকে থাকাও কম অভিভূত করে না তাদের। এত সরু ভূত্বক থাকার পরেও কেন এটি খণ্ড খণ্ড হয়ে আরও ছোট ছোট মহাদেশ তৈরি করেনি– সেটা ভেবেও অবাক হন তারা।

আরেকটি বড় রহস্য ঠিক কখন জিল্যান্ডিয়া সমুদ্রে ডুবে গেল– সে সময় জানার ক্ষেত্রে। তাছাড়া, আদৌ এটি পুরোপুরি শুকনো ডাঙ্গার ভূখণ্ড ছিল কিনা তা নিয়েও আছে মতভেদ। বর্তমানে প্রশান্ত ও অস্ট্রেলীয় টেকটনিক প্লেটের সিমানায় গড়ে ওঠা পর্বতশ্রেণির খাঁজ বা চূড়া বিভিন্ন দ্বীপ হিসেবে গড়ে উঠেছে। তুলখ জানান, ভূতাত্ত্বিকদের একদল মনে করেন, জিল্যান্ডিয়ায় এমন কিছু দ্বীপ ছিল, আর বাকিটা ছিল নিচু, জলমগ্ন অংশ। আরেকদল মনে করেন, একসময় পুরোটাই ছিল শুকনো ডাঙ্গা।    

এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে কারা ছিল জিল্যান্ডিয়ার বাসিন্দা। এটি যার অংশ ছিল, সেই গন্ডোয়ানা ছিল প্রায় ১০ কোটি বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত, সেখানে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণির সমাগম। প্রথম স্থলচর চারপেয়ে প্রাণীর আবির্ভাব হয়েছিল গন্ডোয়ানায়। আরও পরবর্তীকালে টাইটানোসরসের মতো সর্ববৃহৎ স্থলচর জীবও বিচরণ করেছে। ভূতাত্ত্বিকরা আশাবাদী, হয়তো জিল্যান্ডিয়ার ডুবে থাকা শিলাস্তরে প্রাগৈতিহাসিক জীবাশ্ম পাওয়াও যেতে পারে।

সূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

Monday, October 2, 2023

স্বর্গ যখন কারাগার: প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে বাংলাদেশির দাসত্বের জীবন

0 comments

 বিদেশে ভালো চাকরির আশায় যখন দেশ ছাড়েন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মুস্তাফিজুর শাহীন, তখন কল্পনাও করেননি প্রশান্ত মহাসাগরীয় এক দ্বীপে তাকে এভাবে বন্দি থাকতে হবে, বেতন ছাড়াই কাজ করতে হবে, অভিযোগ করলে শিকার হতে হবে মারধরের এবং কেবল পালিয়ে যেতে পারলেই মিলবে নিস্তার।

প্রতিশ্রুতি ছিল জীবন বদলে দেওয়ার, মিলিয়নিয়র পোশাক ব্যবসায়ীর হয়ে কাজ করার। অথচ একসময় তা রূপ নেয় আধুনিক দাসত্বে, যেখানে প্রতিনিয়তই মারধর ও হত্যার হুমকি পেতেন শাহীন।

ভানুয়াতু দ্বীপের দিনগুলো স্মরণ করতে গিয়ে শাহীন মন্তব্য করেন, সেখানে নিজেকে তার 'জীবন্ত লাশ' বলে মনে হতো। তিনি বলেন, আমার সব স্বপ্ন, সব প্রত্যাশা ধুলোয় মিশে গেছে।

২০১৭ ও ২০১৮ সালের মধ্যে ভানুয়াতুতে আসা ১০৭ বাংলাদেশির মধ্যে শাহীন একজন। নিজেকে পোশাকের আন্তর্জাতিক একটি চেইনশপের মালিক পরিচয় দেওয়া মানব পাচারকারী শিকদার সুমন তাদের এখানে নিয়ে আসে।

এই ১০৭ বাংলাদেশির পরিণতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোতে আধুনিক দাসত্বের সবেচয়ে বড় ঘটনা। শাহীন এবং তার সহকর্মীদের প্রতারণা ও মারধরের শিকারের ঘটনা সামনে আসার পাঁচ বছর পার হলেও কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, উন্নত জীবনের আশায় এখনো অনেকের প্রত্যাশিত গন্তব্য ভানুয়াতুর মতো দ্বীপ।

শাহীনের জীবনে এই দুর্যোগের শুরু ২০১৮ সালের জুনে। ওই সময় টাঙ্গাইলের একটি বাস স্টেশনে শিকদার সুমনের এক সহযোগীর সঙ্গে তার দেখা হয়। শাহীনকে বলা হয়, সুমন 'মাল্টিমিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী', বিশ্বব্যাপী তার পোশাক ব্যবসা রয়েছে।

শাহীন খোঁজখবর নেন। সুমনের দাবি সে দক্ষিণ আফ্রিকার জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড মি. প্রাইসের হয়ে কাজ করে। শাহীন ভানুয়াতুর স্থানীয় একটি সংবাদপত্রে কিছুদিন আগেই প্রতিবেদন দেখতে পান, যার শিরোনাম 'ভানুয়াতুতে আসছে মি. প্রাইস'। সেখানে সুমন এবং ভানুয়াতুর একজন মন্ত্রীর উদ্ধুতি দেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো শাহীনের মনে ইতিবাচক ধারণা আনে।

দেশে শাহীনের ছোট তবে সফল পোশাক ব্যবসা ছিল। এই ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে সেগুলো সুমন এবং তার সহযোগীদের হাতে তুলে দেন শাহীন। স্ত্রী-সন্তানকে বিদায় জানিয়ে মি. প্রাইসের হয়ে কাজ করতে ভানুয়াতুর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাড়েন শাহীন।

সে ঘটনার পাঁচ বছর হতে চলেছে, শাহীন এখনো দেশে ফেরেননি।

ভানুয়াতুর পাংগো বিচ


ভানুয়াতুর রাজধানী পোর্ট ভিলায় আসার পর শাহীনের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। সমুদ্রতীরবর্তী একটি বাংলোতে তাকে আটকে রাখা হয়। ভাত আর বাঁধাকপি খেয়ে বেশিরভাগ দিন কাটিয়েছেন তিনি। সেখানে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদের দিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করানো হতো।

২০২২ সালে এসে ভানুয়াতুর পাবলিস প্রসিকিউটর সুমন, তার স্ত্রী এবং দুই সহযোগীকে মানবপাচার, দাসত্ব, অর্থ পাচার, হত্যার হুমকি ও দেশের শ্রম আইন লঙ্ঘনের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে।

ভানুয়াতুর প্রধান বিচারপতি ভিনসেন্ট লুনাবেক রায় ঘোষণার সময় বলেন, শিকদার সমুন সব সময় ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে কি কি করা হবে তা বলে হুমকি দিত। বলা হতো, তাদের গাড়ির নিচে চাপা দেওয়া হবে, তাদের কুপিয়ে মারা হবে বা গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে, জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে তাদের ফ্রিজারে ঢুকিয়ে রাখা হবে। তাদের লাশের ছবি তুলে সেগুলোরে পরিবারের কাছে পাঠানো হবে বলেও হুমকি দেওয়া হতো।

শাহীন আল জাজিরাকে জানান, এসব হুমকিকে তারা কখনো হালকাভাবে নেননি। তিনি জানান, ভানুয়াতুতে আসার পরপরই সুমনের হয়ে কাজ করা এক বাংলাদেশি তাকে ঘুষি মারে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বলপ্রয়োগ করে তার থেকে ১৪ হাজার ডলার নিয়ে যায়।

আর টাকা দিতে না পারায় বলা হয়, তার উল্টো ঝুলন্ত, রক্তাক্ত ছবি বাংলাদেশে থাকা পরিবারের কাছে পাঠানো হবে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, ভীত অবস্থায় একদিন দিনের কাজের বিরতির মধ্যে যখন সুমনের লোকজন ঘুমাচ্ছিল তখন সুযোগ পেয়ে শাহীন ও আরও দুইজন বাংলো থেকে পালিয়ে যান। তারা সৈকতের দিকে ছোটেন এবং উপকূল ধরে এগুতে থাকেন। পাশে রাস্তায় তারা একটি গাড়ি থামিয়ে উঠে পড়েন এবং তাদেরকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যেতে বলেন।

ব্র্যান্ডের নাম ভাঙিয়ে মানবপাচার, অতপর দাসত্ব

কর্তৃপক্ষের মনে সন্দেহ না জাগিয়ে কয়েক মাসের মধ্যে শাহীনসহ বাকি বাংলাদেশিদের ভানুয়াতুতে নিয়ে যায় সুমন। অনেককে বলা হয়, সুমনের মি. প্রাইসে কাজ করতে তারা বৈধ পথে অস্ট্রেলিয়া, কিউবা কিংবা নিউ ক্যালেডোনিয়াতে যাচ্ছেন।

জাল ব্যবসায়ী নথি, লাইসেন্স এবং পাশাপাশি ঘুষের মাধ্যমে পাচারকারীরা ভানুয়াতুর ইমিগ্রেশন পার হওয়ার ব্যবস্থা করে।

এরপর ভুক্তভোগীরা হয়ে যান সুমনের দাস। মারধরের হুমকির মুখে খুব সামান্য অর্থ অথবা বিনা পারিশ্রমিকে তাদেরকে দিয়ে কাজ করানো হতো। স্থানীয় সংবাদপত্রের মতে, ভানুয়াতুতে আসার পর তাদের দিয়ে জোর করে নির্মাণকাজ, কাঠের আসবাব তৈরি ও বিক্রি করানো হতো তাদের দিয়ে। কাজ করতে অস্বীকার করলেই তাদের মারধর করা হতো। তাদের প্রতিশ্রুত চাকরি কিংবা বেতন কখনোই দেওয়া হয়নি।

তদন্তে উঠে আসে, ভানুয়াতুতে প্রকৃত ব্যবসা পরিচালনার কোনো উদ্দেশ্যই ছিল না সুমনের। মূলত শাহীনের মতো লোকদের থেকে টাকা নিয়ে তাদেরকে সুবিধাবঞ্চিত অবস্থায় রেখে যাওয়াই ছিল সুমনের লক্ষ্য।

শহরের কেন্দ্রে মি. প্রাইস-এর একটি দায়সারা গোছের শোরুম তৈরি করেছিল সুমন। তদন্তকারীরা পরে জানতে পারেন, সুমন দক্ষিণ আফ্রিকার কোম্পানিটির ব্র্যান্ড আর লোগো বিনা অনুমতিতেই ব্যবহার করছিল।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর সুমন নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে দাবি করে, সে জিম্বাবুয়ের নাগরিক। যদিও তদন্তকারীরা পরে আবিষ্কার করেন, তার পাসপোর্ট আদতে জাল।

বিশ্বব্যাপী অভিবাসীদের ষষ্ঠ বৃহত্তম উৎস বাংলাদেশ। এসব অভিবাসীদের অনেকেই দালালদের ওপর নির্ভর করেন। এ দালালেরা বিদেশে সম্ভাব্য কর্মী এবং নিয়োগকারীদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।

প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশিকে বিদেশে ভালো চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করে এসব দালাল। এ দালালদের অনেকে অতীতে নিজেরাই পাচারের শিকার হয়েছিল।

বাংলাদেশের পাচার হওয়া ব্যক্তিদের ওপর ২০২২ সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়, 'বিশ্বব্যাপী পাচারের সবচেয়ে বেশি শিকার বাংলাদেশিরা।'

দালালদের ব্যবহার করা বিজ্ঞাপন। ছবি সৌজন্য: ভানুয়াতু পুলিশ

ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন বাংলাদেশ-এর মিশন প্রধান আবদুসাত্তার এসোয়েভ বলেন, পাচারের শিকার অনেককে বিদেশে পাড়ি দিয়ে তাদের এবং তাদের সন্তানদের জীবনকে নিরাপদ করার টোপ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, 'অনেকে তাদের সম্পদ এবং সারাজীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে।

'এদের অনেকেই পাচারের শিকার হন। তাদেরকে জোরপূর্বক শ্রম, যৌন নিগ্রহ বা ঋণের বোঝায় ঠেলে দেওয়া হয়।'

ভানুয়াতুর ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান চার্লি উইলি রেক্সোনা বলেন, ফিলিপাইন এবং অন্যান্য এশীয় দেশ থেকে আসা বিদেশি কর্মীরা প্রায়ই তাকে বলেন যে তাদের পাসপোর্ট তাদের বসেরা আটকে রেখেছে। এটি মানব পাচারের একটি স্পষ্ট লক্ষণ।

'পাচার হচ্ছে। এখানে এখনো চোরাচালান চলছে। কিন্তু তা প্রকাশ পাচ্ছে না,' বলেন তিনি।

উইলি রেক্সোনা বলেন, 'সুমন তার স্ক্যামটি আরও কয়েকটি দেশে চালু করার চেষ্টা করেছিল। কয়েকটি দেশে তারা এটি পরীক্ষা করেছিল। এরপর তারা ভানুয়াতুর আইনে 'ছিদ্র' খুঁজে পাওয়ার পর এখানে ব্যবসা ফাঁদার সিদ্ধান্ত নেয়।'

'আমাদের এখানকার লোকজন মানবপাচারের লক্ষণগুলো সম্পর্কে তেমন ধারণা রাখেন না, এমনকি অভিবাসন কর্মকর্তাদের মধ্যেও স্পষ্ট ধারণা নেই,' তিনি বলেন।

আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে অস্পষ্টতা

অপরাধের স্বতন্ত্র প্রকৃতি এবং সুমনের ভুক্তভোগীর সংখ্যা পোর্ট ভিলায় দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর বিচারপ্রক্রিয়ার সময় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল।

ওই ১০৭ ভুক্তভোগী মামলার মূল সাক্ষী। কিন্তু ভানুয়াতু সরকারের কাছে তাদেরকে খাওয়ানো এবং রাখার ব্যবস্থা ছিল না।

এছাড়া সুমন ও তার সহযোগীদের বিচার করতেও অসুবিধার মুখে পড়তে হয়।

ভানুয়াতুতে দাসপ্রথা এবং পাচারকে সংজ্ঞায়িত করে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। তাই ভানুয়াতুর পাবলিক প্রসিকিউটর জোসিয়া নাইগুলেভু চার আসামির বিরুদ্ধে তার অভিযোগ গঠনে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

২০২২ সালের জুন মাসে সুমন, তার স্ত্রী বুক্সো নাবিলা বিবি এবং অন্য দুই সহযোগীকে মানবপাচার, দাসত্ব, অর্থ পাচার, হামলা, হত্যার হুমকি এবং ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া বিদেশি ব্যক্তিদের কাজ দেওয়ার অভিযোগে সাজা দেন বিচারক।

সুমন এখন ভানুয়াতুর কারাগারে ১৪ বছরের সাজা ভোগ করছে। তার স্ত্রী এবং দুই সহযোগীকে এর অর্ধেক বছর সাজা দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বছরের শুরুতে তাদেরকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় এবং জরিমানা দেওয়ার পরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভানুয়াতুর ডিপার্টমেন্ট অভ কারেকশনস-এর পরিচালক জনি মারাঙ্গো সেই সময় স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন যে বিদেশি বন্দিদের স্বদেশে পাঠিয়ে দেওয়া 'স্বাভাবিক' ছিল।

১০৭ ক্ষতিগ্রস্থকে মোট এক মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে চার অপরাধীকে আদেশ দিয়েছিলেন আদালত, তবে ওই অর্থ এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

অন্যান্য দেশের তুলনায় এ সাজা লঘু হয়েছে বলে নাইগুলেভু মনে করেন।

নাইগুলেভু আল জাজিরাকে বলেন, 'সর্বোচ্চ সাজার ক্ষেত্রে আমাদেরকে এ দেশের আইন পর্যালোচনা করতে হবে।'

বিচারের পর থেকে শাহীন ছাড়া ভুক্তভোগীদের সবাই বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন।

শাহীন যেহেতু এ মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী হয়েছিলেন, তাই তার আশঙ্কা বাংলাদেশে ফিরে আসার সাহস করলে সুমন এবং তার সহযোগীরা তার ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে।

তাই ভানুয়াতুতে থাকা নিরাপদ মনে করে শাহীন তার স্ত্রী এবং সন্তানদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছেন।

শাহীন আল জাজিরাকে বলেন, 'আমি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করি কারণ আমি শুধু আমার বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তিত ছিলাম।'

শাহীনের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। ভানুয়াতুতে তার অভিবাসন মর্যাদা এখনো অচলাবস্থায় পড়ে রয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘের মাধ্যমে শরণার্থী মর্যাদা অর্জনের জন্য তার আবেদন গ্রহণ করা হয়নি।

তবে তিনি এখনো আশা করেন, একদিন তিনি পরিবারকে আরেকটু উন্নত জীবন দিতে পারবেন।

তবে আপাতত ভানুয়াতু তার কাছে বাংলাদেশের চেয়ে নিরাপদ বাড়ি, শাহীন বলেন।

ভবিষ্যতে কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো দেশে স্থায়ী হতে চান শাহীন।


প্রিয়াংকা শ্রীনিবাস | আল জাজিরা | দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড



Sunday, October 1, 2023

ইয়াকোব থমাস: বাংলা ফন্ট তৈরি করার এক ভিনদেশী কারিগর

0 comments


১৯৭৭ সালের কথা। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজের সূত্রে বাংলাদেশে আসে এক আমেরিকান-সুইডিশ দম্পতি। চাকরির সুবাদে বাংলাদেশই হয় তাদের বসবাসের নতুন ঠিকানা। ধীরে ধীরে পরিবারও বড় হতে থাকে। ১৯৮১ সালে সেই পরিবারেই জন্ম ইয়াকোব থমাসের; বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে ভিন্নধারার ফন্ট তৈরি করে বাংলা টাইপোগ্রাফির জগতে যিনি দখল করে আছেন তাৎপর্যপূর্ণ স্থান।

ইয়াকোব থমাসের জন্ম আমেরিকাতে হলেও বেড়ে ওঠা পুরোটাই বাংলাদেশে। তাই বাংলার সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি তার ভালোবাসা জন্মে ছোটবেলাতেই। তবে নিজের নাম উচ্চারণের ক্ষেত্রে নিজ মাতৃভাষা সুইডিশকেই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। ইয়াকোব থমাসের নাম ইংরেজিতে রূপান্তর করলে লেখ্যরূপ দাঁড়ায় জেকব থমাস। সাধারণত সুইডিশ ভাষায় ইংরেজি অক্ষর 'জে' (J) এর উচ্চারণ 'ইয়' হয়। তাই মায়ের ভাষা অনুসারে 'ইয়াকোব থমাস' হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বেশি।



কিন্তু বাংলায় যার বড় হওয়া, নামের ক্ষেত্রে তো তার ছায়া অবশ্যই থাকবে। ইয়াকোবের ভাষ্যে, সুইডিশ ভাষায় নাম 'ইয়াকোব' হলেও ছোটবেলা থেকে বাংলাদেশে থাকায় বাংলায় নাম দাঁড়িয়েছে 'ইয়াকুব'। নামের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সাহচর্যে শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলার চর্চাও শুরু হয়েছিলো শৈশবে। ভালোবাসতেন ছবি আঁকতে। আর এই আঁকাআঁকির ঝোঁক তাকে টেনে নিয়ে যায় ফন্ট তৈরির জগতে।   

১৫ বছর বয়স পর্যন্ত ইয়াকোব থমাস বাংলাদেশে ছিলেন। মাঝে অবশ্য দক্ষিণ ভারতে পড়াশোনার জন্য গিয়েছিলেন। সেখানকার বোর্ডিং স্কুলে পড়তেন তিনি। ছুটিতে ফিরতেন বাংলাদেশে। মা-বাবার চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় থাকা এবং ঘোরার সৌভাগ্য তার হয়েছিলো। ইয়াকোব বলেন, 'ছোটবেলায় প্রথমে ঈশ্বরদীতে ৫ বছর ছিলাম। তারপর কুষ্টিয়াতে ৫ বছর এবং সবশেষে ঢাকাতে ২/৩ বছর ছিলাম। ঢাকাতে আমরা ফার্মগেটে থাকতাম।'

দীর্ঘ ১৫ বছর বাংলাদেশে কাটানোর পর এদেশীয় পাট গুটিয়ে পাড়ি জমান আমেরিকাতে। সেখানে গিয়ে ধীরে ধীরে শেখা শুরু করেন বাংলা হরফ। ইয়াকোব বলেন, 'ছোটবেলায় আমি বাংলা বর্ণমালা শিখিনি। আমেরিকাতে চলে যাওয়ার পরপরই শিখতে শুরু করেছি। ফন্ট, ক্যালিগ্রাফি, লেটারিং এর প্রতি আমার বিশেষ ঝোঁক ছিল। ফাইন আর্টসের পাশাপাশি কমার্শিয়াল আর্ট নিয়ে তাই পড়াশোনা করি। তখন দেখি, গ্রাফিক ডিজাইনের মূল উপাদান হলো ছবি এবং ফন্ট। এগুলো আসলে কারা ডিজাইন করে সেটা জানার আগ্রহ তখন জন্মালো। এটি আসলে সৃজনশীলতার অংশ।'

আমেরিকায় গিয়ে গ্রাফিক ডিজাইনের উপর নিতে শুরু করেন প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ। পরবর্তী সময়ে জর্জিয়ার সাভানাহ কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন থেকে গ্রাফিক ডিজাইন বিষয়ে সম্পন্ন করেন স্নাতকোত্তর। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ২০০৪ সালে পুনরায় ফিরে আসেন বাংলাদেশে। এখানে এসে যুক্ত হন বিভিন্ন এনজিও'র সাথে।

বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে সর্বপ্রথম ফন্টের বিষয়টি নজরে পড়ে ইয়াকোব থমাসের। সুতন্বী ফন্ট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হতো তখন। তিনি বলেন, 'কাজ করতে গিয়ে আমি দেখলাম বাংলায় অল্প কয়েকটা ফন্ট ছিল। মূলত একটি ফন্টই সবাই বেশি ব্যবহার করতো। ডিসপ্লে ফন্ট কয়েকটা ছিল, যেগুলো আবার ভালো মানের না। ল্যাটিন স্ক্রিপ্টের ক্ষেত্রে দেখতাম ৬০ হাজারের বেশি ফন্ট আছে। সেখানে নতুন কিছু করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য অনেককিছু করা যেতে পারে।'

মানের ঘাটতি এবং অনুকরণপ্রিয়তার বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর ইয়াকোবের কাজের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তিনি বলেন, 'বাংলায় সুতন্বী ফন্ট কে ডিজাইন করেছে তা আমার জানার খুব কৌতূহল ছিল। সব জায়গায় বিভিন্ন নামে একই রকম ফন্ট দেখতে পাওয়া যেত। তবে লেটারপ্রেস ফাউন্ড্রিতে যেসব পুরোনো বই আছে, সেগুলোর ফন্ট অনেকটা ভিন্ন।'

গ্রাফিক ডিজাইন ও ফন্টের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভাষার প্রতি আকর্ষণও গড়ে উঠে ইয়াকোবের। বর্তমানে বলতে না পারলেও অনায়াসেই পড়তে পারেন ৭ থেকে ৮টি ভাষা। ভাষার প্রতি ভালোবাসাই ফন্টের দিকে ঝুঁকতে সাহায্য করেছে বলে মনে করেন তিনি। আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রতি ভালো লাগা থেকে ইয়াকোব আরবি ভাষাও শিখেছেন।

অনুপ্রেরণার উৎস যখন হাতের লেখা-ব্যানার-দেয়াল লিখন!

ইয়াকোবের হাতের লেখা দেখে ফন্ট তৈরির নেশা ছিল। তাই পথেঘাটে ছড়িয়ে থাকা সাইনবোর্ড কিংবা ব্যানার কোনোকিছুই নজর এড়াতো না। নিয়মিত সেগুলো পড়তেন এবং চিন্তা করতেন কীভাবে এগুলোকে ফন্টে রূপান্তর করা যায়।

প্রতিটি ফন্ট কীভাবে একে অপরের থেকে ভিন্ন হয় এবং নতুনত্ব কীভাবে আসে তা জানতে চাইলাম ইয়াকোব থমাসের কাছে। উত্তরে তিনি হাতের লেখা নিয়মিত চর্চা এবং কলমের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। টাইপোগ্রাফি বা ক্যালিগ্রাফি চর্চার কিছু কলম রয়েছে। পাইলট প্যারালাল কলম এর মধ্যে অন্যতম। কলমের 'নিব'-এর মধ্যেই দেখা যায় মূল ভিন্নতা। কিছু কলমের মোটা নিব থাকে, আবার কিছু কলমের থাকে চিকন। কলম অনুসারে লেখাও ভিন্নরকম হয়।

ইয়াকোব বলেন, 'কলমের কারণে আসলে ফলাফল ভিন্ন হয়। নতুন ফন্ট তৈরির অনুপ্রেরণা হাতের লেখা, দেয়াল লিখন, সিএনজির পেছনের লেখা থেকে পাই। আবার ল্যাটিন স্ক্রিপ্টের বিভিন্ন ফন্ট থেকেও অনুপ্রেরণা পাই।'

বাম হাতে কলম ধরে কাগজে-কলমে প্রাথমিকভাবে ফন্ট তৈরির কাজ করেন ইয়াকোব। প্রথমে কাগজে প্রতিটি অক্ষর অসংখ্যবার লিখে ফন্টের ধরন কেমন হবে যাচাই করে নেন। এরপর গাণিতিক পরিভাষায় লেখার জ্যামিতিক মাত্রা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করেন। ফন্টের কোন অংশ কতটুকু বাঁকা থাকবে, ধারের অংশ কতটুকু সুক্ষ্ম থাকবে কিংবা কতটুকু সোজা থাকবে তা গাণিতিকভাবেই ঠিক করা হয়। আর সবটুকুই নির্ভর করে কলম এবং হাতের ক্যালিগ্রাফির উপর। কলমের ভিন্নতা ফন্টেও ভিন্নতা এনে দেয়।

টাইপোগ্রাফি বা ক্যালিগ্রাফির জন্য প্রয়োজনীয় কলম কোন জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছে জানতে চাইলে ইয়াকোব বলেন, 'পাইলট প্যারালাল কলম আমি আমেরিকা থেকে নিয়ে এসেছি। আরবি ক্যালিগ্রাফির জন্য একটু চ্যাপ্টা আকৃতির কাঠের কলম ব্যবহার করি। এগুলো সংগ্রহের জন্য আমাকে ইস্তাম্বুল বাজারে যেতে হয়েছে।'

২০১৫ সালে চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর হাতের লেখার উপর ভিত্তি করে ফন্ট তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি। কাইয়ুম চৌধুরীর হাতের লেখার সংকলন অনেকবছর ধরেই পর্যবেক্ষণ করেছেন ইয়াকোব থমাস। পরবর্তী সময়ে হাতের লেখা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তৈরি করেন কাইয়ুম ফন্ট।

কাইয়ুম ফন্ট ছাড়াও সূর্য, প্রসারণ, বরেন্দ্র, প্রকৃতি, সূর্যোদয়, সফর, বিপি ভূত, কমিক বেঙ্গলি, ফিগিন্স পিকাসহ বিভিন্ন ফন্ট তৈরি করেছেন। এই ফন্টগুলোর নামের পেছনেও ভিন্ন ভিন্ন গল্প রয়েছে। ধরা যাক, বরেন্দ্র ফন্টের কথা। আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ফেরার পর ইয়াকোব প্রায় ১২ বছর রাজশাহীতে ছিলেন। তাই এই অঞ্চলের প্রতি ভালোবাসা থেকে ফন্টের নাম রাখেন বরেন্দ্র ফন্ট। আবার বিপি ভূত ফন্টটি অনেকটা ভূতুড়ে আদলে তৈরি। ইংরেজিতে যদিও 'স্পুকি' ফন্ট ঘরানার অনেকরকমের ফন্ট রয়েছে। তবে বাংলায় এমন ফন্টের সংখ্যা তুলনামূলক কম।

বিভিন্ন আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় দৈনিক পত্রিকার জন্য ইয়াকোব ফন্ট প্রস্তুত করেছেন। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বিলুপ্ত একটি সেমিটিক ভাষা ইউগারেটিকের উপরও ফন্ট তৈরি করেছেন। ফন্টের জগতে প্রবেশের পরেও অধ্যয়ন থেকে নিজেকে দূরে রাখেননি। আধুনিক টাইপের ধরন নিয়ে জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে লন্ডনে টাইপ ডিজাইনের উপর একটি কোর্স করেন।  

পাইরেসি এখন মূল সমস্যা

ইয়াকোব থমাসের মতে, বাংলাদেশে ফন্ট নিয়ে কাজ করার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন কিছু তৈরির পর তা হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়া। এর অবশ্য ভালো খারাপ দুটি দিকই উল্লেখ করেন পশ্চিমের এই নকশাকার। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে ফন্ট নিয়ে কাজ করা একটি কঠিন বিষয়। হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ার ভালো দিক হচ্ছে, নানান জায়গায় ফন্ট ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। অপরদিকে যারা টাইপ ডিজাইনকে জীবিকা হিসেবে নিতে চায় তাদের কাজের সুযোগ হারিয়ে যায়।'

আমি বাংলাদেশে সাক্ষাৎ করেছি কয়েকজনের সাথে যারা টাইপ ডিজাইনকে পেশা হিসেবে নিতে পারছে না। 'রবি' ফন্টের উদ্ভাবক নাজিমউদদৌলা মিলন, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন থেকে স্নাতক হয়েছেন। এই ফন্টটি তৈরি করার পর তিনি টাইপ ডিজাইনিং বাদ দিয়েছেন। কারণ একটি কাজ পাওয়ার পর আর কোনো কাজ আসেনি; কেউ ফন্ট কিনতে চায় না। বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইরেসি হয়।'

টাইপ ডিজাইন থেকে আয় কম হওয়ার কারণে অনেকে এই জায়গা থেকে সরে যাচ্ছে বলেও মনে করেন ইয়াকোব। তার মতে, টাইপ ডিজাইনের পরিবর্তে ইউআই/ইউএক্স ডিজাইনের ক্ষেত্রে ডিজাইনাররা বেশি ঝুঁকছে। 

সপরিবারে থাকেন বারিধারায়

২০১৭ সাল থেকে বেঙ্গল ক্রিয়েটিভ মিডিয়াতে কর্মরত আছেন ইয়াকোব থমাস। তার তৈরিকৃত ফন্টের সংরক্ষাণাগার হিসেবে 'বাংলা টাইপ ফাউন্ড্রি' নামক একটি ওয়েবসাইটও তৈরি করেছেন। ২০১৮ সালে 'বাংলা টাইপ ফাউন্ড্রি' ব্র্যান্ড হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে বারিধারা ডিওএইচএসে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি।

পারিবারিক জীবনে স্ত্রী ও তিন সন্তান রয়েছে ইয়াকোব থমাসের। বড় সন্তান বর্তমানে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ভারতে থাকলেও ইয়াকোব ঢাকায় বাকি দুই সন্তান এবং স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন। তার স্ত্রী আমেরিকান বংশোদ্ভুত হলেও বেড়ে উঠেছেন থাইল্যান্ডে। স্ত্রীর প্রসঙ্গে ইয়াকোব বলেন, 'আমরা ইন্ডিয়াতে একই স্কুলে পড়াশোনা করতাম। আমাদের সম্পর্কের শুরু সেখানেই। সে খুব ভালো বাংলা বলতে পারে।'



টাইপ ডিজাইনের বিষয়টি ছেলেমেয়েদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছেন পশ্চিমের এই নকশাকার। তিনি বলেন, 'মাঝেমধ্যে আমার কাজের অংশ তাদেরকে শিখিয়েছি। আমার বড় ছেলে আর্ট ভালোই পারে। তবে সে এখন আর্ট বাদ দিয়ে কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়ছে।'

স্বপ্ন দেখেন বাংলায় বই লেখার!

অনলাইনে ফন্ট বিক্রির প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার স্বপ্ন দেখেন ইয়াকোব। যেখানে পাইরেসির সুযোগ ছাড়া বিভিন্ন ফন্টের নকশাকাররা তাদের ফন্ট বিক্রি করতে পারবে। তাতে নতুন নতুন ফন্টও আসবে এবং অল্প দামে হলেও মানুষের ফন্ট কেনার অভ্যাস হবে বলে মনে করেন তিনি।

এছাড়াও ইয়াকোবের ইচ্ছা ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে টাইপ ডিজাইনকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার। তিনি বলেন, '৫ বছর আমি অনেকটা একাই কাজ করেছি। এখন আমি অন্যদের প্রশিক্ষণ দিতে চাচ্ছি। আমার কাজ শেখাতে খুব ভালো লাগে।'

বাংলা ভাষায় টাইপ ডিজাইন নিয়ে তেমন কোনো বই না থাকায় আক্ষেপ রয়েছে ইয়াকোব থমাসের। তাই বাংলায় বই লেখার স্বপ্নের কথাও উল্লেখ করেন এক ফাঁকে। 

তিনি বলেন, 'আমার কাছে ল্যাটিন স্ক্রিপ্টের ৪ থেকে ৫টি বই আছে। কিন্তু বাংলায় কোনো বই খুঁজে পাইনি। বাংলার ফন্টের ব্যাপারগুলো ল্যাটিন স্ক্রিপ্টে উল্লেখ নেই। তাই এটা নিয়ে আমি একটা পাঠ্যবই লিখতে চাই।'

সুস্মিতা চক্রবর্তী মিশু | দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড