বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা আজ এক গভীর ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াল। পরিসংখ্যানের জটিল সমীকরণ ছেড়ে যদি বাস্তবতার দিকে চোখ রাখা যায়, তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে—বিগত মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে নতুন করে ডিগ্রীধারী ও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখের বেশি। আর যদি বিগত আট বছরের চিত্র হিসাব করা হয়, তবে শিক্ষিত বেকারত্বের এই সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে প্রায় ৯ লাখের ঘরের কাছাকাছি। কোনো একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এত স্বল্প সময়ে শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মহীন হয়ে পড়া কেবল উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং এটি পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য এক বড় ধরনের লাল সতর্কবার্তা।
সম্প্রতি বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) উদ্যোগে রাজধানীর বিনিয়োগ ভবনের মাল্টিপারপাস অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় দেশের বেকারত্ব ও যুবশক্তির এই মর্মান্তিক চিত্রটি খোলামেলাভাবে তুলে ধরা হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অকাট্য সব তথ্য-উপাত্ত হাজির করেন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। জাতীয় পর্যায়ের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারক, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের উপস্থিতিতে দেওয়া তাঁর ওই বক্তব্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে চরম ঝাঁকুনি দিয়েছে।
সংকট কতটা ঘনীভূত: তথ্যের চোখে বাস্তব চিত্র
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার প্রদত্ত বক্তব্য ও সরকারি শ্রমশক্তি জরিপের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা যেকোনো নাগরিকের জন্য চরম দুশ্চিন্তার। ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, বর্তমানে দেশের মোট যুবশক্তির প্রতি চারজন যুবকের একজন সম্পূর্ণ বেকার। অর্থাৎ যে বয়সে একজন তরুণের কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখার কথা, সেই বয়সে প্রতি চারজনের একজন সমাজ ও পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
আরও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায় ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে। দেশের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক অংশের প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ-তরুণীই বর্তমানে 'নিট' (NEET—Not in Education, Employment, or Training) অর্থাৎ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা যেকোনো ধরনের পেশাগত প্রশিক্ষণের সম্পূর্ণ বাইরে অবস্থান করছেন। কর্মহীনতার এই বিশাল পরিসংখ্যানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য আরও বেশি প্রকট। যুবতী ও নারীদের ক্ষেত্রে শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের বাইরে থাকার এই হতাশাজনক হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশে, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা তুলনামূলক কম হলেও মোট জনসংখ্যার সার্বিক বিচারে তা আশঙ্কাজনক।
বাংলাদেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার নিরিখে যদি বেকারত্বের সাধারণ পরিসংখ্যান দেখা হয়, তবে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার সর্বনিম্ন—মাত্র সোয়া এক শতাংশের মতো। কিন্তু চরম বৈপরীত্য দেখা যায় উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে। স্নাতকোত্তর বা ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। সোজা কথায়, এ দেশের প্রতি তিনজন নিবন্ধিত বেকারের একজন সরাসরি গ্র্যাজুয়েট। ডিগ্রি যতো বাড়ছে, কাজের সুযোগ যেন ততোই সংকুচিত হয়ে আসছে।
বেকারত্বের পেছনে মূল কারণ ও ব্যর্থতার দায়
প্রশ্ন উঠেছে, একটি স্বাধীন ও উন্নয়নকামী রাষ্ট্রে স্বাধীনতার দীর্ঘ চার দশক পরও কেন যুব সমাজকে কাজের অভাবে বেকার থাকতে হচ্ছে? এই অভূতপূর্ব ব্যর্থতার পেছনে প্রধানত কাঠামোগত ত্রুটি ও নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত কাজ করেছে।
১. শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতা (Education-Employment Divorce): বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার সনদ নিয়ে বের হন। যার একটি বড় অংশ আসেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলো থেকে। কিন্তু এই শিক্ষাব্যবস্থা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাজারমুখী হতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দেশের চাকরির বাজার সর্বোচ্চ ৩ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে জায়গা দিতে পারলেও অবশিষ্ট ৪ লাখ তরুণ প্রতি বছর উদ্বৃত্ত বা বেকার হিসেবে যোগ হচ্ছেন।
২. নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ সংস্কৃতি: তরুণদের চাকরির অনুসন্ধানে প্রায় ৩৬ শতাংশই নির্ভরশীল হতে হয় স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়স্বজন বা অনানুষ্ঠানিক উপায়ের ওপর। প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার অভাব মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন বন্ধ করে দিয়েছে।
৩. সরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ: মানুষ মনে করে সরকারি চাকরিই সব। অথচ সরকারি খাত দেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৬ শতাংশ ধারণ করতে পারে। বাকি ৯৪ শতাংশ কর্মসংস্থান আসার কথা বেসরকারি খাত থেকে। কিন্তু বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়া এবং শিল্পকারখানার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
৪. দীর্ঘসূত্রিতা ও স্কারিং ইফেক্ট: বিসিএস বা অন্যান্য সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হতে দুই থেকে তিন বছর লেগে যাচ্ছে। বছরের পর বছর চাকরির বয়সের আশায় বসে থাকার কারণে যুবসমাজ তাঁদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ও উৎপাদনশীল সময়টুকু হারিয়ে ফেলছেন। একে অর্থনীতির ভাষায় ‘স্কারিং ইফেক্ট’ বলা হয়, যা একজন তরুণের জীবনভর ক্যারিয়ারকে পিছিয়ে দেয়।
বেকারত্বের মারাত্মক সামাজিক খেসারত: বাড়ছে অপরাধ ও অস্থিরতা
একটি রাষ্ট্রে যখন শিক্ষিত ও সামর্থ্যবান কোটি তরুণ কাজ পান না, তখন তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সুরক্ষার ওপর। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মহীনতা, হতাশা ও আর্থিক অনটন তরুণ সমাজকে খুব সহজেই অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং কালচার, মাদক ব্যবসা এবং অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের যে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে বিশাল বেকারের দল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
কাজের অভাব ও বেকারত্বের কারণে সৃষ্ট সামাজিক ক্ষোভ থেকেই পরবর্তীতে সৃষ্টি হয় বড় বড় গণআন্দোলন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কর্মসংস্থান, কোটা সংস্কার এবং সমতার সুযোগ তৈরি করা। রাজপথে তরুণেরা যখন অধিকার ও জীবিকার তাগিদে নেমে আসেন, তখন তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাসনব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও যখন বেকারত্বের মতো মৌলিক ও স্পর্শকাতর সংকট দূর হয় না, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দেয়।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়
আজকের তরুণ জনসংখ্যা যাকে 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' বা জনমিতিক লভ্যাংশ বলা হচ্ছে, তা চিরদিন থাকবে না। ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর যথার্থই সতর্ক করেছেন—যদি এই তরুণ শক্তিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর না করা যায়, তবে এই সম্ভাবনাময় লভ্যাংশ অচিরেই ‘ডেমোগ্রাফিক বোম’ বা মারাত্মক সামাজিক বিপর্যয়ে পরিণত হবে।
সংকট উত্তরণে কেবল পরিকল্পনা নয়, কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন:
শিক্ষাকে কর্মমুখী করা: সনাতন ডিগ্রী নির্ভর শিক্ষার প্রথা ভেঙে বাধ্যতামূলক কারিগরি, আধুনিক আইটি ও ভোকেশনাল শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে।
শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ: শিল্প খাতের কী ধরনের দক্ষ মানবসম্পদ দরকার, সেই অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস পুনর্গঠন করতে হবে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সুরক্ষা: ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে হবে।
স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা: দুর্নীতি, ঘুষ ও মামা-খালুর রেফারেন্স ছাড়া কেবল মেধার শক্তিতে যেন যুবসমাজ চাকরি পায়, সেই আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।
খাদ্য বা মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের গল্প শোনানো রাষ্ট্র যদি 'বেকার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ' হয়ে ওঠে, তবে তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না। তরুণদের হাতকে বেকার রেখে বা কেবল প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি ছড়িয়ে দেশ সামনে এগোতে পারে না। রাষ্ট্র, সরকার ও নীতি নির্ধারকদের মনে রাখা উচিত—তরুণদের কর্মসংস্থান কোনো অনুদান নয়, এটি তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে তার চড়া মাশুল পুরো জাতিকেই গুনতে হবে।
- ফজলে রেজওয়ান করিম
