Saturday, July 18, 2026

ঘামের বিনিময়ে ভাসমান অর্থনীতি: প্রবাসী আয়ের আলো-আঁধারি

0 comments

 

Foreign Remittance in Bangladesh

বাংলাদেশের অর্থনীতির খাতাপত্র খুললে একটা জিনিস চোখে পড়ে বারবার—যখনই দেশের ভেতরের অন্য সব সূচক দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনও একটা জায়গা থেকে টাকা আসতে থাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে। সেই উৎসটি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই সপ্তাহেই দেড়শ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসার খবর নিছক একটা পরিসংখ্যান নয়, বরং এটা বুঝিয়ে দেয় যে দেশের অর্থনীতির শ্বাস-প্রশ্বাস এখনও অনেকাংশে নির্ভর করছে বিদেশের মাটিতে থাকা লাখ লাখ মানুষের শ্রমের ওপর। প্রশ্ন হলো, এই নির্ভরতা কি আমাদের জন্য স্বস্তির, নাকি এটাই আসলে আমাদের অর্থনীতির একটা গভীর দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি?

রেমিট্যান্সের হিসাব-নিকাশ বোঝার আগে একটু পেছনে তাকানো দরকার। কয়েক বছর আগেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল, ডলারের আকাল ছিল প্রকট, আমদানিতে টান পড়েছিল, ব্যাংক খাতে অনাস্থার ছায়া ঘন হয়েছিল—সেই দুঃসময়ে একমাত্র যে জায়গাটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, তা হলো প্রবাসী আয়। রিজার্ভ কুড়ি বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার শঙ্কা যখন সবাইকে ভাবাচ্ছিল, তখন প্রবাসীদের পাঠানো ডলারই ধীরে ধীরে সেই ভাটার টান ঠেকিয়েছে। এখন রিজার্ভ আগের চেয়ে অনেকটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে বলে যে স্বস্তি অনুভূত হচ্ছে, তার পেছনের বড় কারণ এই একটিই।

কেন হঠাৎ এই উত্থান, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে বেশ কয়েকটা কারণ একসঙ্গে চোখে পড়ে। প্রথমত, বিনিময় হার দীর্ঘদিন একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্থিতিশীল রাখা গেছে, যার ফলে হুন্ডির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক দূরত্ব কিছুটা কমে এসেছে। দ্বিতীয়ত, অর্থপাচার ও অবৈধ মুদ্রা লেনদেনের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি বাড়ানোয় অনেকেই বৈধ পথে টাকা পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন বা উৎসাহিত হয়েছেন। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়ার মতো নতুন শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর পরিধি বেড়েছে, যা সামগ্রিক আয়ের অঙ্ককে বড় করেছে। আবার প্রবাসী হিসাবে লেনদেনের সুবিধা বাড়ানো এবং সঞ্চয় প্রকল্পের মতো উদ্যোগও মানুষকে ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রতি কিছুটা আস্থাশীল করে তুলেছে।

কিন্তু এই প্রাপ্তির পাশে একটা অস্বস্তিকর সত্যও থেকে যায়—হুন্ডি এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বরং প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই অবৈধ লেনদেনের পদ্ধতিও আরও সহজ ও ঝুঁকিহীন হয়ে উঠেছে। মোবাইল আর্থিক সেবার আড়ালে একটা বিশাল অঙ্কের টাকা এখনও ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে দিয়ে দেশে ঢোকে, যা রিজার্ভে যোগ হয় না, রাষ্ট্রের কোষাগারে রাজস্ব হিসেবে জমা পড়ে না। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো—ব্যাংকে টাকা পাঠাতে গেলে যে সময়ক্ষেপণ, কাগজপত্রের জটিলতা আর মাঝেমধ্যে অসদাচরণের শিকার হতে হয়, তার তুলনায় হুন্ডি এজেন্টের সেবা অনেক সহজ, দ্রুত আর অনেক সময় বিনিময় হারেও লাভজনক। যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে সহজ, দ্রুত ও প্রবাসীবান্ধব করা যাচ্ছে, ততক্ষণ শুধু আইন করে বা প্রণোদনা বাড়িয়ে হুন্ডি ঠেকানো কঠিন হবে।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—রেমিট্যান্স বাড়া মানেই কি অর্থনীতি সত্যিকারের অর্থে শক্তিশালী হচ্ছে? উত্তরটা এত সরল নয়। কোনো দেশের প্রবাসী আয় বাড়ার অর্থ এটাও হতে পারে যে, সে দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ যথেষ্ট নয়। মানুষ যখন নিজের দেশে পর্যাপ্ত রোজগারের পথ খুঁজে পায় না, তখনই সে বিদেশমুখী হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে দেশের ভেতরের উৎপাদনশীল খাত ও দক্ষ জনশক্তির সংকট তৈরি হতে পারে। তাই রেমিট্যান্সের এই উল্লম্ফনকে শুধু আনন্দের খবর হিসেবে না দেখে, এটাকে দেশের কাঠামোগত দুর্বলতার একটা সতর্কবার্তা হিসেবেও পড়া দরকার।

আবার ব্যাংক খাতের ভেতরের অবস্থা বিবেচনায় নিলে ছবিটা আরও জটিল হয়ে ওঠে। একদিকে রেমিট্যান্স রেকর্ড গড়ছে, অন্যদিকে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় চার ভাগের এক ভাগই ইতিমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে বলে সাম্প্রতিক তথ্য জানাচ্ছে। এই দ্বিমুখী চিত্র প্রমাণ করে, শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর ভর দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা যাবে না। ব্যাংক খাতের সুশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিচালনা এবং করব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে রেমিট্যান্সের এই স্রোত হয়তো সাময়িক স্বস্তি দেবে, কিন্তু স্থায়ী কাঠামোগত সমাধান দেবে না।

এই পুরো আলোচনায় যে বিষয়টা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়, তা হলো যাদের ঘামে এই অর্থ আসছে, সেই মানুষগুলোর বাস্তব জীবনযাত্রা। যাদের আমরা গর্ব করে ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলি, তাদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য দেশে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য পরিস্থিতিতে কাজ করেন। কম মজুরিতে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ, পাসপোর্ট আটকে রাখা, বিদেশে অমানবিক থাকার পরিবেশ—এসব অভিযোগ নতুন কিছু নয়। নারী কর্মীদের অবস্থা আরও উদ্বেগজনক; ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগের অভাব এবং নিয়োগকর্তার বাড়িকেই একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে নির্ভর করতে বাধ্য হওয়া তাদের অনেক বেশি অসহায় করে তোলে। দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে হয়রানির অভিজ্ঞতাও তাদের জন্য নতুন কোনো গল্প নয়। যে মানুষগুলো দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ যদি সম্মানজনক না হয়, তাহলে শুধু মুখে বীরত্বের তকমা দেওয়াটা এক ধরনের ভণ্ডামি হয়ে দাঁড়ায়।

দালালচক্রের দৌরাত্ম্যও এই খাতের অন্যতম বড় অভিশাপ। সরকার নির্ধারিত অভিবাসন খরচের বহুগুণ বেশি আদায় করে অনেক পরিবারকে ঋণের বোঝায় নুইয়ে দেওয়া হয়, ভিটেমাটি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। ফলে একজন শ্রমিক বিদেশের মাটিতে পা রাখার আগেই ঋণ আর দুশ্চিন্তার শিকলে বাঁধা পড়ে যান। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দক্ষতার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ক্রমশ কারিগরি জ্ঞান আর ভাষাদক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজছে, অথচ আমাদের অধিকাংশ কর্মী যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে পাড়ি জমান। এর ফলে তারা কম মজুরির কাজে আটকে থাকেন এবং দেশের সম্ভাব্য রেমিট্যান্সের পরিমাণও সীমিত হয়ে যায়।

তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, ব্যাংকিং প্রক্রিয়াকে প্রবাসীবান্ধব করে তুলতে হবে—দ্রুত সেবা, ডিজিটাল লেনদেনের সহজলভ্যতা এবং জটিল কাগজপত্রের বাধা কমানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, হুন্ডি বন্ধ করতে শুধু আইনি কঠোরতা নয়, বরং কেন মানুষ হুন্ডির দিকে ঝুঁকছেন তার মূল কারণ—বিনিময় হারের পার্থক্য ও ব্যাংকিং হয়রানি—দূর করাই বেশি কার্যকর হবে। তৃতীয়ত, দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে আমাদের কর্মীরা আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো মজুরির কাজ পেতে পারেন। চতুর্থত, বিদেশে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দূতাবাসগুলোকে সত্যিকারের সহায়ক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে হবে, যেখানে জরুরি সহায়তা, আইনি পরামর্শ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর থাকবে। আর সবশেষে, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করতে হবে, যাতে কেউ প্রতারণার শিকার না হন।

রেমিট্যান্সের এই রেকর্ড প্রবাহ নিঃসন্দেহে স্বস্তির একটা বার্তা বহন করে, কিন্তু এই স্বস্তিকে স্থায়ী সাফল্য মনে করার আগে কিছু কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া দরকার। শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লেই অর্থনীতি মজবুত হয় না; দরকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সুশাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, যাদের শ্রম আর ত্যাগের বিনিময়ে এই ডলার দেশে আসছে, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা শুধু প্রশংসাসূচক শব্দে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রকৃত সম্মান মানে আইনি সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা। রেমিট্যান্স যোদ্ধারা যদি সত্যিকার অর্থে সম্মানিত ও সুরক্ষিত বোধ করেন, তবেই এই প্রবাহ শুধু সাময়িক উত্থান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারবে।

- লেখা: ফজলে রেজওয়ান করিম