Saturday, October 10, 2026

মাথা ব্যাথার কারণ জেন-জি

0 comments

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির দিকে তাকালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি সাধারণ চিত্র চোখে পড়ে—ক্ষমতার পালাবদল ঘটে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র বদলায় না। শাসকগোষ্ঠী বদলায়, কিন্তু শোষণের হাতিয়ারগুলো রয়ে যায় অবিকল। কিন্তু একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে এশিয়ার রাজনৈতিক ভূগোলে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বিশেষ প্রজন্ম, যাদের আমরা ডাকছি ‘জেনারেশন জি’ বা ‘জেন-জি’ (Gen-Z) নামে।


ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের কাছে এই জেন-জি এখন আক্ষরিক অর্থেই সবচেয়ে বড় ‘মাথা ব্যাথার কারণ’। কেন? কারণ তারা প্রচলিত ছকে বাঁধা রাজনীতি বোঝে না, তারা ভয় পেতে শেখেনি এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাদেরকে সস্তা প্রোপাগান্ডা দিয়ে বোকা বানানো যায় না। এশিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূলত দুই শ্রেণির মানুষের এক অলিখিত যুদ্ধ চলছে। একদল চায় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে বংশপরম্পরায় দেশটাকে লুটেপুটে খেতে আর নিজেদের ইচ্ছামতো শাসন চালাতে। আর অন্য দল—যার নেতৃত্বে রয়েছে এই তরুণ প্রজন্ম—তারা চায় শোষণমুক্ত এমন এক সমাজ, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভারতের সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলেই এই নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট রূপটি ধরা পড়ে।

বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান: ভয়ের দেয়াল ভাঙার গল্প

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান জেন-জিদের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি অহিংস ছাত্র আন্দোলন কীভাবে একটি প্রবল প্রতাপশালী স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটাতে পারে, তা বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো সাধারণ ছাত্ররাই হয়ে উঠেছিলেন জনতার কণ্ঠস্বর।

তারা শুধু রাজপথেই লড়াই করেননি, লড়াই করেছেন সাইবার জগতেও। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে, গুলি চালিয়ে, আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে আন্দোলন দমাতে চেয়েছে, তখন এই তরুণরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাজপথে দাঁড়িয়েছে। এই আন্দোলনে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেন সালমান মুক্তাদির এবং আয়মান সাদিকের মতো জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। সাধারণত যারা নিজেদের নিরাপদ বলয়ে থাকতে পছন্দ করেন, তারাও যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে লাখো তরুণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, তখন এই আন্দোলন আর শুধু ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রূপ নিয়েছিল এক সর্বাত্মক জনযুদ্ধে। তারা প্রমাণ করেছেন, ডিজিটাল দুনিয়ার তারকারাও যখন জনতার কাতারে নেমে আসেন, তখন শাসকের ভিত কেঁপে উঠতে বাধ্য।

হিমালয়ের দেশ নেপালে তারুণ্যের জয়ধ্বনি

বাংলাদেশের চেয়ে নেপালের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন হলেও, সেখানেও তারুণ্যের বিদ্রোহের সুর একই রকম। নেপালের রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে নেপালি কংগ্রেস, ইউএমএল এবং মাওবাদীদের মতো প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে জিম্মি ছিল। কিন্তু এই প্রথাগত দুর্নীতির চক্র ভেঙে সেখানেও জেন-জি এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছে।

নেপালের তরুণ সমাজের এই নীরব বিপ্লবের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছেন কাঠমান্ডুর বর্তমান মেয়র বলেন্দ্র শাহ (যিনি ‘বালেন’ নামেই বেশি পরিচিত)। একজন র‍্যাপার এবং স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার বালেন যখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র পদে দাঁড়ান, তখন অনেকেই তাকে উপহাস করেছিলেন। কিন্তু নেপালের তরুণ প্রজন্ম তাকে শুধু ভোট দিয়েই জয়যুক্ত করেনি, বরং প্রথাগত রাজনীতির গালে এক বিরাট চপেটাঘাত করেছে। বালেনের চোখে থাকা সেই সিগনেচার সানগ্লাস আর তারুণ্যের উদ্দীপ্ত চেতনা নেপালের জেন-জিদের কাছে এক নতুন আশার প্রতীক। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আর পুরোনো নেতাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নয়। তারা চায় কাজ, তারা চায় জবাবদিহিতা।

ভারতের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ‘সিজেপি’

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের চিত্রটাও এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। সেখানেও তারুণ্য একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করছে। সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) নামের একটি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা এই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।

অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা এবং নেহা বোরার মতো তরুণরা যখন এই আন্দোলনের ডাক দেন, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র প্রমাদ গোনে। এই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন জনপ্রিয় ইউটিউবার এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধ্রুব রাঠি। ধ্রুব রাঠি দীর্ঘদিন ধরেই তার তথ্যবহুল ভিডিওর মাধ্যমে ভারতের তরুণ সমাজকে সচেতন করে আসছেন। তিনি যখন সরাসরি এই আন্দোলনে সমর্থন জোগান, তখন সেটি আর একটি ছোট পরিসরের প্রতিবাদ থাকে না, বরং তা কোটি তরুণের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়।

রাষ্ট্র কতটা ভীত, তার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের চিত্রে। দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি-এর কর্মসূচি শুরুর আগেই ১৪৪ ধারা জারি, বিমানবন্দর থেকে অভিজিৎ দীপকে এবং সৌরভ দাসদের আটক করা, কিংবা গুরুগ্রামের ফ্ল্যাট থেকে ধ্রুব রাঠিকে আটক করে হেফাজতে নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই তরুণদের কণ্ঠস্বরকে এস্টাবলিশমেন্ট কতটা ভয় পায়। শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পেরেছে যে, এদেরকে প্রথাগত মিডিয়ার বয়ান দিয়ে বা ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি দিয়ে আর দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

সংঘাতের মূল কারণ: শোষক বনাম শোষিত

এশিয়ায় চলমান এই সংঘাতের গভীরে তাকালে আপনার উল্লেখিত সেই ধ্রুব সত্যটিই ফুটে ওঠে—এখানে মূলত দুটি শ্রেণির লড়াই চলছে।

প্রথম শ্রেণি (ক্ষমতালোভী শাসকগোষ্ঠী): এরা মনে করে রাষ্ট্র তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। এরা বংশপরম্পরায় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়। এরা দেশের অর্থনীতি, বিচারবিভাগ, প্রশাসন এবং গণমাধ্যমকে নিজেদের পকেটে পুরে রাখতে পছন্দ করে। এদের মূল লক্ষ্য হলো দেশের সাধারণ মানুষকে ‘নাগরিক’ হিসেবে নয়, বরং ‘প্রজা’ হিসেবে টিকিয়ে রাখা। এরা চায় মানুষ সবসময় মাথা নিচু করে থাকুক, যাতে তারা নির্বিঘ্নে দেশের সম্পদ লুটেপুটে খেতে পারে।

দ্বিতীয় শ্রেণি (তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি): এরা হলো সেই শ্রেণি যারা এই পচা-গলা সিস্টেমকে আর মেনে নিতে রাজি নয়। এরা গ্লোবালি কানেক্টেড, এরা জানে বিশ্বের অন্য প্রান্তে তাদের বয়সী ছেলেমেয়েরা কেমন জীবনযাপন করছে। এরা দেশের প্রতিটি মানুষের মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার চায়। কেউ শোষণের শিকার হবে না, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে—এটাই তাদের মূল দাবি।

কেন জেন-জি ‘মাথা ব্যাথার কারণ’?

প্রথাগত রাজনীতিকদের জন্য জেন-জি মাথা ব্যাথার কারণ হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লজিক রয়েছে:
১. তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার: জেন-জিকে সেন্সরশিপ দিয়ে আটকে রাখা যায় না। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া যখন বিক্রি হয়ে যায়, তখন এরা টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স (টুইটার) বা ফেসবুকের অল্টারনেটিভ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে।
২. প্রোপাগান্ডা বনাম ফ্যাক্ট-চেকিং: পুরোনো নেতারা মিথ্যা বলে পার পেয়ে যেতেন। কিন্তু জেন-জি যেকোনো তথ্যের সত্যতা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যাচাই (Fact-check) করে ফেলতে পারে। ফলে শাসকগোষ্ঠীর সাজানো বয়ান মুহূর্তেই ধসে পড়ে।
৩. ভয়হীনতা: এদের হারানোর কিছু নেই। এরা দেখেছে তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম কীভাবে আপস করে বেঁচেছে। এরা সেই আপসের পথে হাঁটতে নারাজ।
৪. হিউমার এবং স্যাটায়ার: এরা কাঠখোট্টা রাজনীতির বদলে মিম (Meme), স্যাটায়ার এবং শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদ করে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অনেক দ্রুত পৌঁছায়। ভারতের সিজেপি আন্দোলন বা নেপালের বালেনের র‍্যাপ সং এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

পরিশেষে বলা যায়, এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের দেখা মিলছে। বাংলাদেশ, নেপাল বা ভারত—যেদিকেই তাকাই না কেন, তরুণ প্রজন্ম পরিষ্কার একটি বার্তা দিচ্ছে: "আমাদের দেশ, আমাদের ভবিষ্যৎ, আর সিদ্ধান্তও হবে আমাদের।" যারা বন্দুকের নল বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে এই কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে চাইছে, তারা আসলে ইতিহাসের দেয়াল লিখন পড়তে ব্যর্থ হচ্ছে। জেন-জি শুধু শাসকগোষ্ঠীর মাথা ব্যাথার কারণই নয়, তারা এই ঘুণে ধরা সমাজকাঠামোর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার কারিগর। যতদিন না একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং আত্মমর্যাদাশীল সমাজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন তারুণ্যের এই জয়রথ থামানো কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

0 comments:

Post a Comment