Sunday, July 19, 2026

স্বীকৃতিহীনতায় বড় সংকটে লাখো কওমি তরুণ

0 comments



উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষ করে ১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে যে ইসলামী শিক্ষাধারার সূচনা হয়েছিল, আজ দেড় শতাব্দী পর এসে সেই ধারার বৈশ্বিক মানচিত্রে সবচেয়ে বড় ও প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার বিচারে এ দেশ এখন দেওবন্দি শিক্ষার আদিভূমি ভারত এবং প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানকেও বহুদূরে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বে কওমি ধারার মাদরাসায় অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৬০ শতাংশই এখন এ দেশের, যা পাকিস্তানের মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। কিন্তু এই অভূতপূর্ব ও সুবিশাল সম্প্রসারণের গৌরবময় খতিয়ানের ঠিক উল্টো পিঠেই লুকিয়ে আছে এক চরম মানবিক ও সামাজিক বিপর্যয়। আর তা হলো—প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি স্বীকৃতিহীনতার জেরে দেশের লাখ লাখ কওমি তরুণের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার এখন এক গভীর অন্ধকারের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।

দেশের সামষ্টিক বা ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক সংকটের এই নড়বড়ে প্রেক্ষাপটে কওমি শিক্ষার এই দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকে দেশের গভীর আর্থসামাজিক বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিফলন বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদেরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার পর্যালোচনা অনুযায়ী, দেশের প্রান্তিক ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর চরম দারিদ্র্য এবং সাধারণ আধুনিক শিক্ষায় অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কওমি মাদরাসাগুলো এখন নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর জন্য একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প নিখরচায় আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠেছে। দেশের বৃহত্তম কওমি শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) সর্বশেষ দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে বর্তমানে নিবন্ধিত মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার ৭৩০টি এবং এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৭০ লাখ। এর বাইরেও দেশে অন্যান্য ছোট-বড় কওমি বোর্ডের অধীনে আরও ১০ হাজারেরও বেশি মাদরাসা পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে দেশে কওমি ধারার মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০ হাজার পার হয়ে গেছে। অথচ এই বিপুল পরিমাণ প্রায় সত্তর লাখ শিক্ষার্থীর ভাগ্য ও ক্যারিয়ার দেশের মূলধারার অর্থনৈতিক কাঠামো এবং কর্মসংস্থানের আনুষ্ঠানিক বাজারের সাথে বিন্দুমাত্র যুক্ত হতে পারছে না। এর একমাত্র কারণ হলো, কওমি শিক্ষার নিম্ন ও মধ্যম স্তরগুলো এখনো সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে রয়ে গেছে, যা এই বিপুলসংখ্যক তরুণকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে থেকেও আধুনিক যুগের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

যদি আমরা এই পুরো দৃশ্যপটটিকে বাংলাদেশের নিজস্ব ও স্বাধীন শ্রমবাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করি, তবে এর ভেতরের মূল ছবিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আরও বেশি মারাত্মক। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১৮ সালে কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’কে সাধারণ শিক্ষার মাস্টার্স সমমান হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং ছয়টি বড় বোর্ডকে নিয়ে ‘আল-হাইআতুল উলইয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ গঠন করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই স্বীকৃতি ছিল কেবলই একটি কাগজি ঘোষণা মাত্র। কারণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কোনো আইনি স্বীকৃতি না থাকায় এবং দেশের মূলধারার সাধারণ শিক্ষাক্রমের সাথে কোনো সমন্বয় না থাকায়, দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারা বা মাঝপথে পড়াশোনা বাদ দেওয়া লাখ লাখ সাধারণ শিক্ষার্থী আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য ও সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এমনকি যারা দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করছেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ দেশের প্রচলিত বিসিএস, ব্যাংকিং খাত, সরকারি অন্যান্য প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরি কিংবা কোনো বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে আবেদনের যোগ্য বলে গণ্য করা হচ্ছে না। এর সরাসরি ও নির্মম সামাজিক নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট ধরা পড়েছে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) পরিচালিত এক বিশেষ ক্রস-সেকশনাল গবেষণায়। ওই জরিপে দেখা গেছে, কওমি মাদরাসা থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ২ দশমিক ১৭ শতাংশ মূলধারার সরকারি বা বেসরকারি আনুষ্ঠানিক চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। তাদের প্রায় ৪৬ দশমিক ৫৫ শতাংশই জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মসজিদ ও মাদরাসায় ইমাম, মুয়াজ্জিন বা খতিব হিসেবে অত্যন্ত কম এবং যৎসামান্য বেতনে কর্মসংস্থান খুঁজে নেন, যা দিয়ে বর্তমানের চরম মূল্যস্ফীতির বাজারে চার-পাঁচজনের একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ভরণপোষণ করা প্রায় অসম্ভব। আর বাকি এক বিশাল অংশ জীবিকার তাগিদে অনন্যোপায় হয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা, দর্জির কাজ, প্রিন্টিং প্রেস কিংবা অনানুষ্ঠানিক চরম ঝুঁকিপূর্ণ দিনমজুরের পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হন।

কওমি মাদরাসার এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এবং সরকারি নিবন্ধনের প্রশ্নে খোদ দেশের আলেম সমাজের মধ্যেই তীব্র মতভেদ ও দৃষ্টিভঙ্গির চরম পার্থক্য রয়েছে, যা এই সংকটকে আরও বেশি ঘনীভূত করে তুলছে। কওমি বোর্ডগুলোর নেতাদের একটি বড় অংশ মনে করেন যে, নিবন্ধন বলতে যদি সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা তথাকথিত এমপিওভুক্তিকে বোঝানো হয়, তবে তারা এর সম্পূর্ণ বিপক্ষে। তাদের মূল আশঙ্কা হলো, যদি এই বিশাল প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো সরকারি বা আমলাতান্ত্রিক নিবন্ধনের আওতায় আসে, তবে দীর্ঘ চার দশক ধরে ধরে রাখা কওমি শিক্ষার আদি স্বকীয়তা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও স্বাধীনতা সম্পূর্ণ ক্ষুণ্ন হতে পারে। তারা ভয় পাচ্ছেন যে, সরকার ভবিষ্যতে তাদের ওপর নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ সিলেবাস বা আধুনিক পাঠ্যবই জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে পারে, যা মৌলিক ইসলামী শিক্ষার মূল আদর্শ ও আকিদার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই আশঙ্কার কারণেই কওমি মাদরাসার নীতিনির্ধারকেরা যুগের পর যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় তদারকি বা মূল্যায়নের আওতার বাইরে থেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অন্যদিকে, আধুনিক শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একটি স্বাধীন ও একক রাষ্ট্রে একই ধরনের ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন দুটি সম্পূর্ণ পৃথক ও বিপরীতমুখী সমান্তরাল ধারায় (আলিয়া ও কওমি) পরিচালিত হওয়া একটি দেশের সমন্বিত জাতীয় শিক্ষানীতির জন্য চরম ক্ষতিকর। তাদের মতে, কওমি মাদরাসাগুলোতে কার্যকর সরকারি মনিটরিং ও আধুনিক অডিট না থাকায় সেখানে শিক্ষার গুণগত মান, জবাবদিহিতা এবং অনেক ক্ষেত্রে শিশু অধিকারের সুরক্ষাও বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

এই ভয়ংকর ও অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাগত বাস্তবতার সবচেয়ে কালো ও আশঙ্কাজনক দিকটি হলো এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। প্রতি বছর হাজার হাজার কওমি তরুণ যখন দাওরায়ে হাদিস পাস করে বের হচ্ছেন, তখন তাদের সামনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সীমিত গণ্ডি ছাড়া মূলধারার অর্থনীতির কোনো দরজা খোলা থাকছে না। কাঙ্ক্ষিত রেট বা ভালো বেতনের কোনো চাকরি না পেয়ে এবং দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিগুলোতে প্রবেশাধিকার না থাকায়, এই বিশাল বেকার, হতাশ ও বঞ্চিত তরুণ জনগোষ্ঠী জীবনধারণের জন্য চরম মানসিক অবসাদ ও হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। একটি দেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ (Demographic Dividend) বা তারুণ্যের লভ্যাংশ কীভাবে সঠিক কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও দূরদর্শী সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে এক মারাত্মক ‘ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার’ বা জনমিতির বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে, বাংলাদেশ আজ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এই কওমি তরুণদের ঘাম, শ্রম ও মেধাকে যদি দেশের উৎপাদনশীল খাতে বা মূলধারার জাতীয় অর্থনীতিতে পুরোপুরি কাজে লাগানো না যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশে এক মারাত্মক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো শর্টকাট জাদুর কাঠি সরকারের হাতে নেই। এ জন্য প্রয়োজন একটি সুচিন্তিত, টেকসই ও বাস্তবসম্মত জাতীয় অর্থনৈতিক ও শিক্ষানীতি।

প্রথমত, সরকারকে কওমি মাদরাসার শীর্ষ নেতৃত্ব ও আলেম সমাজের মতামত এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। কওমি শিক্ষার মৌলিক স্বকীয়তা ও ধর্মীয় অনুভূতি অক্ষুণ্ন রেখে এমন একটি গ্রহণযোগ্য সমন্বিত নিবন্ধন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা তাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করবে। দ্বিতীয়ত, কওমি মাদরাসার নিম্ন ও মধ্যম স্তরগুলোর জন্য একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের সংস্কার জরুরি, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি (IT) এবং বিভিন্ন কারিগরি ও কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকবে। এর ফলে একজন শিক্ষার্থী যদি মাঝপথেও পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, তবে সে যেন আইটি বা অন্যান্য কারিগরি সেক্টরে নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। তৃতীয়ত, দাওরায়ে হাদিসের যে মাস্টার্স স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সেটিকে শুধু কাগজের আইনি ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির বাজারে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোটা বা আবেদনের বিশেষ সুযোগ তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আসরে প্রিয় দলের বিদায় বা হারে কষ্ট পাওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি দেশের এই লাখ লাখ কওমি তরুণের হঠাৎ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি হারিয়ে মূলধারার সমাজ থেকে ছিটকে পড়ার নির্মম বাস্তবতার বিষয়েও দেশের নীতিনির্ধারক, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ নাগরিকদের গভীরভাবে ভাবা অত্যন্ত জরুরি। সময় থাকতে এই লাল বাতির সংকেতকে গুরুত্ব না দিলে, খাদের কিনারা থেকে এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর পতন ও সামাজিক বিপর্যয় ঠেকানো আর কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।


- ফজলে রেজওয়ান করিম

0 comments:

Post a Comment