Showing posts with label Crime. Show all posts
Showing posts with label Crime. Show all posts

Sunday, July 19, 2026

অভিনেত্রী মীনাক্ষী থাপার নির্মম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনী

0 comments

মীনাক্ষী থাপার

রুপালি পর্দার গ্ল্যামার, খ্যাতি আর লাইমলাইটের হাতছানি প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে টেনে আনে মায়ানগরী মুম্বাইয়ে। এক বুক স্বপ্ন আর চোখে তারকা হওয়ার আকুলতা নিয়ে ভারতের উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি শহর দেরাদুন থেকে বাণিজ্য নগরীতে পাড়ি জমিয়েছিলেন তরুণ ও উদীয়মান মডেল-অভিনেত্রী মীনাক্ষী থাপা। কিন্তু বলিউডের সেই ঝলমলে আলোর নিচে যে কতটা অন্ধকার আর নির্মমতার ফাঁদ পাতা থাকে, তার সবচেয়ে করুণ ও বীভৎস উদাহরণ হয়ে রইলেন এই অভাগী তরুণী। ২০১২ সালের মার্চ মাসে ঘটে যাওয়া মীনাক্ষী থাপা হত্যাকাণ্ড কেবল বলিউডের ইতিহাসেই নয়, বরং বৈশ্বিক বিনোদন জগতের অন্যতম নৃশংস ও হাড়হিম করা অপরাধের একটি হিসেবে আজও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে আলোচিত হয়। সিনেমার ভুয়া শুটিংয়ের প্রলোভন দেখিয়ে যেভাবে এক সম্ভাবনাময় অভিনেত্রীর জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার তদন্তের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে লালসা, বিশ্বাসঘাতকতা আর চূড়ান্ত বর্বরতার এক নারকীয় উপাখ্যান।

মীনাক্ষী থাপা ছিলেন মূলত একজন ক্লাসিক্যাল নৃত্যশিল্পী। দেরাদুনে নিজের একটি ড্যান্স একাডেমি থাকার পরও রুপালি পর্দার মোহ তাকে তাড়া করে বেড়াত। অভিনয়ের সুনির্দিষ্ট সুযোগের অপেক্ষায় থাকা মীনাক্ষী মুম্বাইয়ের তীব্র প্রতিযোগিতার মাঠে নিজের অবস্থান তৈরি করতে ছোটখাটো চরিত্রে কাজ শুরু করেন। এর ধারাবাহিকতায় তিনি পরিচালক প্রবাল রাহার মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ছবি ‘৪০৪’ এ একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। পরবর্তীতে বিখ্যাত পরিচালক মধুর ভান্ডারকরের বিগ বাজেট সিনেমা ‘হিরোইন’ এর একটি দৃশ্যে জুনিয়র আর্টিস্ট বা সহ-শিল্পী হিসেবে কাজ করার সময় তার পরিচয় হয় অমিত জয়সওয়াল এবং প্রীতি সুরিন নামের এক যুগলের সঙ্গে। অমিত ও প্রীতিও মীনাক্ষীর মতোই বলিউডে ভাগ্য অন্বেষণ করতে এসেছিলেন এবং তারা নিজেদের অবিবাহিত দাবি করলেও বাস্তবে তারা ছিলেন বিবাহিত এবং তাদের দুটি সন্তানও ছিল, যা তারা মুম্বাইয়ের স্ট্রাগলিং লাইফে গোপন রেখেছিলেন।

পরিচয়ের পর খুব দ্রুতই মীনাক্ষীর সাথে তাদের গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। মীনাক্ষী খোশগল্পের ছলে নিজের পরিবার, দেরাদুনের ড্যান্স একাডেমি এবং পারিবারিক জীবন নিয়ে নানা কথা তাদের সাথে শেয়ার করতেন। মীনাক্ষীর মার্জিত পোশাক, রাজকীয় চালচলন এবং কথা বলার ধরন দেখে অমিত ও প্রীতির মনে এক চরম ভুল ধারণার জন্ম নেয়। তারা ধরে নেন যে মীনাক্ষী কোনো অতি সাধারণ পরিবারের মেয়ে নন, বরং তার পরিবার অত্যন্ত বিত্তশালী এবং তাদের অঢেল সম্পদ রয়েছে। আসলে অমিত ও প্রীতি মুম্বাইয়ে এসে প্রচুর ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং সেই ধারের টাকা দ্রুত শোধ করার জন্য তারা একটি শর্টকাট বা সহজ উপায়ের খোঁজ করছিলেন। মীনাক্ষীর তথাকথিত বিত্তশালী পারিবারিক অবস্থার কথা চিন্তা করে তাদের মাথায় এক নারকীয় পরিকল্পনা আসে। তারা সিদ্ধান্ত নেন যে মীনাক্ষীকে কোনো নির্জন স্থানে অপহরণ করে তার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করবেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, অমিত ও প্রীতি মীনাক্ষীকে একটি বড় বাজেটের ভোজপুরি সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের লোভনীয় প্রস্তাব দেন। তারা মীনাক্ষীকে বিশ্বাস করান যে উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজে (তৎকালীন এলাহাবাদ) ছবিটির শুটিং হবে এবং সেখানে বড় বড় প্রযোজক ও পরিচালকেরা উপস্থিত থাকবেন। ক্যারিয়ারের এই বিশাল ও সম্ভাব্য টার্নিং পয়েন্টের কথা ভেবে মীনাক্ষী বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে অত্যন্ত আনন্দের সাথে রাজি হয়ে যান। ২০১২ সালের ১৩ই মার্চ তিনি অভিযুক্ত অমিত ও প্রীতির সাথে প্রয়াগরাজের উদ্দেশ্যে মুম্বাই ত্যাগ করেন। ট্রেন যাত্রার সময়ও মীনাক্ষী জানতেন না যে তিনি আসলে নিজের অবধারিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রয়াগরাজে পৌঁছানোর পর প্রীতি সুরিনের আদি বাড়ি জৌনপুরের এক প্রত্যন্ত এলাকায় মীনাক্ষীকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরপরই তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাকে একটি ঘরের ভেতর সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়।

এর পর থেকেই দেরাদুনে থাকা মীনাক্ষীর পরিবারের সাথে তার সমস্ত যোগাযোগ হঠাৎ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর, ১৭ই মার্চ মীনাক্ষীর মায়ের মোবাইল ফোনে একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে একটি ভীতিপ্রদ টেক্সট মেসেজ আসে। সেখানে জানানো হয় যে মীনাক্ষী তাদের হেফাজতে আছেন এবং তাকে জীবিত ফেরত পেতে হলে অবিলম্বে ১৫ লাখ রুপি মুক্তিপণ দিতে হবে। একই সাথে মেসেজে চরম হুমকি দিয়ে বলা হয় যে যদি পুলিশকে এই বিষয়ে কিছু জানানো হয় অথবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দেওয়া হয়, তবে মীনাক্ষীকে জোরপূর্বক পর্নোগ্রাফিক চলচ্চিত্রে বা নীল ছবিতে কাজ করতে বাধ্য করা হবে এবং সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এই আকস্মিক ও ভয়ংকর বার্তায় মীনাক্ষীর মধ্যবিত্ত পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যায়। একজন সাধারণ সেনাকর্মীর পরিবারের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল। অসহায় মা ও ভাই কোনো উপায় না পেয়ে মীনাক্ষীর নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তাদের সাধ্যমতো প্রায় ৬০ হাজার রুপি জমা দেন এবং বাকি টাকা জোগাড় করার জন্য আরও কিছুটা সময় ভিক্ষা চান।

কিন্তু নিষ্ঠুর লোন উলফ বা অপরাধী জুটি অমিত ও প্রীতির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। তারা বুঝতে পারেন যে মীনাক্ষীর পরিবার আসলে তাদের ধারণার মতো অঢেল সম্পদের মালিক নয় এবং ১৫ লাখ রুপি পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। একই সাথে তাদের মনে ভয় ঢুকে যায় যে মীনাক্ষীকে ছেড়ে দিলে সে মুম্বাইয়ে ফিরে পুলিশের কাছে তাদের আসল পরিচয় ফাঁস করে দেবে। এই চাক্ষুষ প্রমাণ ও নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে তারা মীনাক্ষীকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জৌনপুরের সেই নির্জন ঘরের ভেতরেই প্রথমে মীনাক্ষীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। তবে তাদের বর্বরতা এখানেই শেষ হয়নি। হত্যার পর মীনাক্ষীর মৃতদেহ যাতে কেউ সহজে শনাক্ত করতে না পারে, সেজন্য তারা একটি ধারালো ছুরি দিয়ে মীনাক্ষীর গলা কেটে তার মাথাটি শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর মাথাবিহীন ধড় বা শরীরের বাকি অংশটি প্রীতির জৌনপুরের বাড়ির একটি পুরনো ও পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে ইট-পাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। আর বিচ্ছিন্ন মাথাটি একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে তারা লখনৌগামী একটি চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে গভীর রাতে রাস্তার পাশের ঝোপে ফেলে দেয়, যা পুলিশ পরবর্তীতে শত চেষ্টা করেও আর কখনো উদ্ধার করতে পারেনি।

হত্যাকাণ্ডটি সম্পন্ন করার পরও সাইকোপ্যাথ বা বিকৃত মানসিকতার এই খুনি জুটি মীনাক্ষীর পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য ক্রমাগত মুক্তিপণের মেসেজ পাঠাতে থাকে। কিন্তু এই অতি চালাকির কারণেই তারা নিজেদের অজান্তে পুলিশের জালে ধরা পড়ার মোক্ষম সূত্রটি রেখে যায়। মীনাক্ষীর ভাই দেরাদুন ও মুম্বাই পুলিশের যৌথ সাইবার ক্রাইম সেলের শরণাপন্ন হন। পুলিশ তদন্তে নেমে দেখতে পায় যে মীনাক্ষীর মোবাইল ফোনের সিম কার্ড এবং তার ডেবিট কার্ডটি উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন এটিএম বুথ এবং লখনৌ ও কানপুর এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) এবং আইএমইআই নম্বর ট্র্যাক করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে নিখোঁজ মীনাক্ষীর ফোনের সিম কার্ডটি আসলে অন্য একটি হ্যান্ডসেটে ব্যবহার করে অমিত জয়সওয়াল অনবরত কল ও মেসেজ করছে।

দীর্ঘ এক মাস ধরে নিখুঁত ট্র্যাকিং ও ইলেকট্রনিক তথ্য বিশ্লেষণের পর, ২০১২ সালের ১৪ই এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকার একটি গোপন আস্তানা থেকে পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও, সিডিআর-এর অকাট্য প্রমাণের সামনে তারা ভেঙে পড়ে এবং নিজেদের হাড়হিম করা অপরাধের কথা স্বীকার করে। তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তি ও দেখানো পথ অনুযায়ী পুলিশ উত্তর প্রদেশের জৌনপুরের সেই বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে মীনাক্ষী থাপার পচনশীল ও মাথাবিহীন খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। এই ঘটনার নৃশংসতা সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেমন বিবিসি এবং এনডিটিভিতে প্রধান শিরোনাম হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল এবং রুপালি পর্দার ভেতরের এই ভয়ংকর অন্ধকার দিকটি দেখে গোটা বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

মুম্বাইয়ের সেশন কোর্টে এই মামলার দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ ছয় বছর ধরে চলে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এই হত্যাকাণ্ডকে সমাজের জন্য এক চরম হুমকি এবং ঠান্ডা মাথায় করা ‘বিরলতম অপরাধ’ বা রেয়ারেস্ট অফ রেয়ার কেস হিসেবে উল্লেখ করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের জোর আবেদন জানান। আদালতের বিচারক সায়না পাতিল মামলার সমস্ত নথিপত্র, বৈজ্ঞানিক ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে ২০১৮ সালের ৯ই মে এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। আদালত অমিত জয়সওয়াল এবং প্রীতি সুরিনকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা) এবং ৩৬৪-এ (মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে অপহরণ) ধারায় এককভাবে দোষী সাব্যস্ত করে আজীবন বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। মীনাক্ষী থাপার এই মর্মান্তিক ও অকাল পরিণতি আজীবন বিনোদন জগতে আসা নতুন ও অনভিজ্ঞ শিল্পীদের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং রুপালি জগতের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা প্রতারণার এক নির্মম ও জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে থেকে যাবে। যে সিনেমার প্রস্তাবটি এই তরুণীর কাছে ছিল এক নতুন জীবনের সোনালী সম্ভাবনা, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার জন্য হয়ে উঠেছিল এক অন্ধকার ও বীভৎস মৃত্যুর ফাঁদ।

Tuesday, July 8, 2025

হোয়াইট কলার ক্রাইম

0 comments

White collar crime (হোয়াইট কলার ক্রাইম) বলতে বোঝানো হয় সেইসব অপরাধ যা সাধারণত পেশাদার, সম্মানজনক, এবং উচ্চ সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা করে থাকেন, অর্থনৈতিক বা ব্যবসায়িক লাভের উদ্দেশ্যে। এই অপরাধগুলো শারীরিক সহিংসতাহীন হয় এবং সাধারণত প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, বা মিথ্যাচারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়।

White collar crime

🧠 মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1. অ-হিংস্র (Non-violent) — শারীরিক আক্রমণ থাকে না।

  2. আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে — সাধারণত টাকার প্রতারণা বা দুর্নীতির মাধ্যমে।

  3. বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে সংঘটিত — কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা বা সরকারিভাবে দায়িত্বে থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার।


🧾 সাধারণ White Collar Crime-এর উদাহরণ:

  1. জালিয়াতি (Fraud) — ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স, কর বা অন্য আর্থিক প্রতারণা।

  2. ঘুষ ও দুর্নীতি (Bribery and Corruption) — সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার।

  3. অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে শেয়ার কেনাবেচা (Insider Trading) — কোম্পানির গোপন তথ্য ব্যবহার করে শেয়ার বাজারে লাভবান হওয়া।

  4. মানি লন্ডারিং (Money Laundering) — অবৈধ অর্থকে বৈধ দেখানোর কৌশল।

  5. ট্যাক্স ফাঁকি (Tax Evasion) — ইচ্ছাকৃতভাবে কর না দেওয়া বা তথ্য গোপন করা।


⚖️ আইনি ব্যবস্থা:

প্রত্যেক দেশে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আলাদা আইন রয়েছে। যেমন, বাংলাদেশে দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) এ ধরনের অপরাধ তদন্ত ও দমন করে।


📌 উপসংহার:

White collar crime দেখতে তেমন ভয়াবহ না হলেও এর প্রভাব অনেক গভীর হতে পারে — যেমন: রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ক্ষতি, জনসাধারণের আস্থা নষ্ট হওয়া, বা সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি।

White collar crime


Friday, June 20, 2025

টিন্ডার প্রতারণা: প্রেমের নামে লুট

0 comments

একটি আন্তর্জাতিক সত্য প্রতারণা ঘটনা

টিন্ডার স্বাইন্ডলার: যার প্রেমের ফাঁদে লাখ ডলার খোয়াতেন তরুনীরা

ভূমিকা: ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত নেটফ্লিক্স ডকুমেন্টারি “The Tinder Swindler” বাস্তব জীবনের একটি ঐকান্তিক প্রতারণার কাহিনী তুলে ধরেছিল। এতে দেখানো হয়েছিল ইসরায়েলি প্রতারক শিমোন হায়ুত (নাম পরিবর্তন করে সাইমন লেভিয়েভ) কিভাবে টিন্ডার অ্যাপে দামী যৌথবেশে ভুয়া পরিচয় দিয়ে নারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিলেন। নেটফ্লিক্সের বিবরণ অনুযায়ী, মুক্তির মাত্র ২৮ দিনে বিশ্বজুড়ে দর্শকরা এই ডকুমেন্টারি ১৬৬ মিলিয়ন ঘণ্টা দেখেছেন, যা এটিকে প্ল্যাটফর্মের সর্বাধিক দেখা ডকুমেন্টারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০১৯ সালে নরওয়ের সশরীরে অনুসন্ধানকারী সাংবাদিকরা Verdens Gang পত্রিকায় “টিন্ডার স্বাইন্ডলার” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে ওঠে। এরপর জনমানসে কৌতূহল বেড়ে ওঠে এবং ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত নেটফ্লিক্স ডকুমেন্টারিতে ঘটনাটি আরও আলোচিত হয়।

The Tinder Swindler

প্রতারকের প্রেক্ষাপট

প্রতারক সাইমন লেভিয়েভের আসল নাম শিমোন হায়ুত। তিনি ১৯৯০ সালে ইসরায়েলের বেনী ব্রাক এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। কলেজ ছেড়ে দিয়ে তিনি ১৫ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান, কিন্তু কয়েক বছরে পরে বিভিন্ন ছোটখাটো প্রতারণার অভিযোগে ইসরায়েলে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০১১ সালে জাল চেকের মাধ্যমে অপরিচিতদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তাঁকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়। ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কারণে সে সময় কোনও শাস্তি পাননি। পরে তিনি নাম পরিবর্তন করে সাইমন লেভিয়েভ হয়ে ওঠেন, যা প্রখ্যাত হিরে ব্যবসায়ী Lev Avnerovich Leviev-এর সম্মানীয় বংশধরের পরিচয় বোঝাতে ব্যবহার করেন।

২০১৫ সালে ফিনল্যান্ডে তিনি তিনজন নারীর সাথে প্রতারণার অভিযোগে ধরা পড়েন এবং দুই বছর কারাদণ্ড পান। ২০১৭ সালে ইসরায়েলে ফেরার সময় নতুন পরিচয় দিয়ে এসে আবারও পালিয়ে যান। অবশেষে ২০১৯ সালের অক্টোবরে গ্রিসে ইন্টারপোল অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে ইসরায়েলে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি চারটি প্রতারণামূলক অভিযোগে ১৫ মাসের কারাদণ্ড লাভ করেন। তবে করোনার কারণে এই সাজা থেকে মাত্র পাঁচ মাস কারাদণ্ড জেলে কেটে তিনি মুক্তি পান, যা শিকার মহিলাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ইসরায়েলের পুলিশ ও অন্যান্য দেশের (নরওয়ে, সুইডেন, যুক্তরাজ্য) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনও তাকে বিভিন্ন অপরাধের জন্য অনুসন্ধান করে চলছে।

প্রতারণার পদ্ধতি

লেভিয়েভের প্রতারণা ছিল একধরনের পনজি-স্কিমের মত ব্যবস্থা। প্রথমে সে টিন্ডার অ্যাপে নিজেকে সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী হিসেবে উপস্থাপন করত। অনেক অর্থবহ ডেট ও ঘনিষ্ঠতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারীদের মন জয় করার পর তিনি তাদের ঘর-দরবারে যান এবং আকর্ষণীয় উপহার বণ্টন করেন। গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি শিকার মহিলাদের জন্য পাঁচতারা হোটেলে ডিনার করে, ব্যক্তিগত জেট ভাড়া করে ঘুরে বেড়াতেন। পরবর্তীতে নিজেকে ‘শত্রুদের’ আক্রমণে আহত দেখিয়ে একটি নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করতেন – যেমন ছবি এবং ভয়েস নোট পাঠিয়ে দেহরক্ষী কাতর হয়ে পড়েছে দেখানো। এরপর তিনি নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে অর্থ সাহায্য দাবি করতেন। ভুক্তভোগীরা প্রায়ই ঋণ নিয়ে বা নতুন ক্রেডিট কার্ড করে তার কাছে বিপুল পরিমাণ টাকা পাঠান। সমস্ত টাকা পুরোনো ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ধার করা ছিল; এতে এক ধরণের পনজি চক্র গড়ে উঠতো। শেষ পর্যায়ে তিনি জাল ফান্ড ট্রান্সফারের রশিদ পাঠিয়ে ভুক্তভোগীদের বোঝাতেন যেন টাকা ফেরত দিয়েছেন, তারপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এটিকে সহজবোধ্যভাবে বুঝতে কিছু ধাপ বলে ফেলা যেতে পারে:

  • প্রথমে টিন্ডার বা অনলাইনে পরিচয় গড়ে তোলা, ভুয়া পরিচয়বাক্য (সাইমন লেভিয়েভ) ব্যবহার করা।

  • উপহার ও অতিরিক্ত আদর প্রদর্শন করে দ্রুত আন্তরিকতা গড়ে তোলা।

  • পরবর্তী পর্যায়ে বিপদসঙ্কেত দেখানো – নিজেকে অথবা ফালতু দেহরক্ষীকে আক্রমণ করা হয়েছে বলে ছবি/কথা পাঠিয়ে ভয় দেখানো।

  • সাহায্যের দাবিতে অগ্রিম ঋণ বা টাকা নেওয়া, যেখানে ভুক্তভোগীরা প্রায়ই বিদেশ ভ্রমণ ও বিলাসিতা দেখিয়ে টাকা পাঠায়।

  • পুরোনো শিকারীদের টাকা দিয়ে নতুন শিকারীদের ঝলমলে জীবন যাপনের নালিশ সৃষ্টি করে প্রতারণা চালিয়ে যাওয়া।

শিকারদের অভিজ্ঞতা

এই প্রতারণায় বহু নারী আর্থিক ও মানসিক ভাবে চরম দূর্যোগের শিকার হন। এর মধ্যে বিশেষ করে সেসিলি ফ্রেলহয় এবং পার্নিলা শ্যোলমের কাহিনী আলোচিত।

সেসিলি ফ্রেলহয় (নরওয়ে): তিনি প্রথম দিকের প্রধান ভুক্তভোগী। নেটফ্লিক্স ডকুমেন্টারিতে দেখা যায় শিমন তাকে অত্যন্ত বিলাসবহুল ডেটে নিয়ে যান: পাঁচতারা হোটেলে মধ্যাহ্নভোজনের পর প্রাইভেট জেটে করে ভ্রমণ পর্যন্ত করেন। তারা সম্পর্কের ধারায় বাড়ি ভাড়া করেন একসাথে থাকার পরিকল্পনায়। পরবর্তীতে শিমন নাটক দেখান যে তাকে শত্রুরা আক্রমণ করেছে, তার দেহরক্ষী আহত হয়েছে। এরপর সুরক্ষার অজুহাত দেখিয়ে তিনি সেসিলিকে ২৫০,০০০ মার্কিন ডলার ঋণে সহায়তার দাবি করেন। সেসিলি পরবর্তীতে গিয়ার লিভিয়েভকে ট্র্যাক করতে অন্য ভুক্তভোগীদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ইন্টারপোলের সাহায্যে তাকে গ্রেপ্তার করাতে অবদান রাখেন। তিনি পরবর্তীতে LoveSaid নামের একটি সহায়তা গ্রুপ গঠন করে প্রতারণার শিকারদের সমর্থনে কাজ করে চলেছেন।

পার্নিলা শ্যোলম (সুইডেন): স্টকহোমের এক সাবেক বিক্রয়কর্মী পার্নিলা প্রথমদিকে ব্যক্তিগতভাবে প্রেমে পড়েননি; বরং শিমনের সঙ্গী হিসেবে ঘনিষ্ঠ হন। তারা একসাথে ইউরোপের বিলাসবহুল এলাকা ঘোরাফেরা করেন – পাঁচতারা হোটেল, রেস্তোরাঁ – তার সমস্ত বিল ভুক্তভোগীদের অর্থ থেকে জুড়ত। কয়েক মাস পর শিমন জানায় যে তার ‘শত্রুরা’ তার পিছু নিয়েছে এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে গিয়েছে, ফলে এখন তার মুক্তির জন্য অর্থ দরকার। ঝুঁকির কারণে ভীত পার্নিলা শেষ পর্যন্ত বহু হাজার ইউরো ঋণ নিয়ে শিমনকে দেয়, যা তাকে দেউলিয়া করে দেয়। বিষয়টি প্রকাশের পর পার্নিলা IDfier নামের একটি পরিচয় যাচাই প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ অনলাইনে ছদ্মবেশ ধরে প্রতারণা করতে না পারে। প্রতিবেদন অনুসারে, তাদের ঠকানোর ঘটনায় পার্নিলা শেষ পর্যন্ত ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লেও সমাজে ফ্রড সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছেন।

তদন্ত ও প্রকাশ

প্রথমদিকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে VG পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরই অনেক ভুক্তভোগী এগিয়ে আসতে শুরু করে। কিছুদিন পর গ্রিসে চলমান অনুসন্ধান অভিযান চলাকালীন ইন্টারপোল শিমনকে গ্রেফতার করে ইসরায়েলে ফেরত পাঠায়। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে তাকে ইসরায়েলের টেল অবিভ ম্যাজিক্রেট আদালতে ১৫ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। আদালতে শিমন ক্ষমা প্রার্থনা করলেও ভুক্তভোগীরা তার দ্রুত মুক্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ হন। আসলে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি প্রথায় (করোনা পরিস্থিতি) মাত্র ৫ মাস কারাদণ্ড হওয়ার পর মার্চ ২০২০-এ তিনি বেরিয়ে আসেন।

ডকুমেন্টারির মুক্তির পর ২০২২ সালের মাঝামাঝি এই কেস আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। প্রধান তিনজন নারী (সেসিলি, পার্নিলা ও আয়লিন) একসাথে গিফট-ফান্ডের মাধ্যমে তাদের দেনা মেটাতে প্রায় ৮০ লাখ মার্কিন ডলার সংগ্রহের জন্য একটি ফান্ডরাইজিং শুরু করেন। এদিকে শিমন লেভিয়েভ যে তার বিরুদ্ধে রাখা অভিযোগ মানতে অস্বীকার করেছেন, এবং সামাজিকমাধ্যমে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

আইনগত ফলাফল ও বর্তমান অবস্থা

শিমন হায়ুত ফিনল্যান্ডের কারাগার (২০১৫) এবং ইসরায়েলের আদালতে (২০১৯) সাজাপ্রাপ্ত হলেও এসব সাজা অনেকটাই পুরোনো কেসের জন্য ছিল; টিন্ডার কাণ্ডে তিনি কখনো আলাদা অপরাধে দণ্ডিত হননি। ২০১৯ সালের সিদ্ধান্তমতে তাকে ১৫ মাসের সাজা দেয়া হয়েছিল, তবে উপরে বর্ণিত কারণে মাত্র পাঁচ মাস জেলে ছিলেন। Business Insider অনুসারে ২০২০ সালের মে মাসে তিনি মুক্তি পান। এরপর থেকে লেভিয়েভের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট টিন্ডার প্রতারণা সংক্রান্ত কোন আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি। আইনি উদ্যোগ হিসেবে ইসরায়েলের একটি আদালত ২০২২ সালে লেভিয়েভ পরিবারের কাছ থেকে শিমনের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা গ্রহণে সহযোগিতা চেয়েছে, তবে এর ফলাফলের তথ্য এখনো অমীমাংসিত।

বর্তমানে সাইমন লেভিয়েভ টিন্ডার ও এর মাধ্যাকল অ্যাপগুলোতে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ। টিন্ডার কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে তার নামে কোন সক্রিয় প্রোফাইল নেই এবং তাকে প্ল্যাটফর্ম থেকে চিরতরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য ডেটিং অ্যাপেও (হিঞ্জ, ম্যাচ.কম ইত্যাদি) তাকে ব্লক করা হয়েছে। অপরদিকে স্ব স্ব দৃষ্টিকোণ থেকে শিমন দাবি করেছেন যে তিনি ‘অপরাধী’ নন; মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইনস্টাগ্রামে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে বলেছেন, “আমি তাদের কাছ থেকে এক পয়সাও নিইনি, নারীরা আমার সংস্পর্শে বিনোদিত হয়েছেন”।

বিস্তীর্ণ প্রভাব

টিন্ডার স্ইন্ডলারের কেস সারাবিশ্বে অনলাইন ডেটিং, প্রেম প্রতারণা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার দুর্বলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় উদাহরণ সরবরাহ করেছে। FBI ও অন্যান্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে শুধুমাত্র আমেরিকায় প্রেম প্রতারণায় $১ বিলিয়ন হারিয়েছে। FBI রিপোর্টে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রতারকরা কবিতা ও উপহার ছড়িয়ে শিকারীদের ভালবাসার আশ্বাস দিয়ে মনের ভরসা জাগিয়ে দেড়ান, পরে ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনা বা বিপদ দেখিয়ে আর্থিক চাহিদা করেন। আমাদের কাহিনীতে ব্যবহৃত কৌশলগুলো (প্রতি-ফিরে এলোমেলো টাকা ধার করা, বিপদের নাটক) আন্তর্জাতিক মানব নিরাপত্তার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়েছে।

ইন্টারনেট ব্যবহার ও ডিজিটাল দক্ষতা কম থাকা মানুষজন এই ধরনের ফ্রডের সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে। ঘটনাক্রমে এই কেস প্রকাশের পর বিশ্বের অনেক ডেটিং অ্যাপ নিরাপত্তা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে – টিন্ডার অ্যাপে পরিপ্রেক্ষিত পরীক্ষার (photo verification) মতো ফিচার চালু হয়েছে এবং “সেফটি সেন্টার” চালু করার ঘোষণা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই কাহিনী ব্রেকিং নিউজে পরিণত হওয়ায় ভবিষ্যতে ভুক্তভোগী নারীদের কাহিনি সামনে আসার প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন।

প্রতারণা থেকে রক্ষা: করণীয় পরামর্শ

অনলাইন ডেটিংয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা প্রত্যেকের প্রয়োজন। বিশেষ করে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে:

  • পরিচয় যাচাই করুন: অচেনা কারো ছবি বা প্রোফাইল তথ্য গুগল-রিভার্স ইমেজ সার্চে যাচাই করুন। একই ছবি বা তথ্য অন্য কোথাও ব্যবহৃত হচ্ছে কি না দেখুন।

  • অর্থ বা ঋণ পাঠাবেন না: অপরিচিত কাউকে কোনওভাবে টাকা বা ঋণ দিতে যাবেন না। তাদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে বা ব্যাংক ট্রান্সফারে টাকা পাঠানোর আগে সতর্কতার সব সংকেত দেখুন। কখনও কারও জন্য ব্যাংক লোন বা কার্ড অফার করবেন না বা ভারসাম্য রক্ষার জন্য টাকা পাঠাবেন না।

  • ব্যক্তিগত তথ্য সীমিত করুন: আপনার ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য (ব্যাংক-কার্ড, পাসপোর্ট ইত্যাদি) শেয়ার করার আগে খুঁটিয়ে ভাবুন। একেবারেই অপরিচিতদের ব্যক্তিগত ডেটা (প্রয়োজন ছাড়া) দেবেন না।

  • সতর্ক থাকুন: অত্যধিক দ্রুত ভালোবাসা বা অতিরিক্ত বিলাসিতা প্রদর্শন করলে সাবধান হোন। উৎসব-উপহার, অত্যন্ত রোমান্টিক কথাবার্তা যদি খুব স্বাভাবিকের অতিরিক্ত মনে হয়, তবে সেটিও প্রতারণার অংশ হতে পারে।

  • আর্থিক লেনদেন এড়িয়ে চলুন: বিশেষ করে পারস্পরিক পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত, কাউকে নগদ বা ভার্চুয়াল কার্ডে টাকা দেবেন না। সন্দেহ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেনদেন বাতিল করে দিন। কখনও অপরিচিত কাউকে টাকা ট্রান্সফার করবেন না যাতে করে আপনি অনিচ্ছাকৃতভাবে অপরাধের অংশ হয়ে না পড়েন।

  • সহায়তা ও প্রতিবেদন: সন্দেহজনক কিছু দেখলে ডেটিং অ্যাপের নিরাপত্তা টিম অথবা স্থানীয় পুলিশকে অবহিত করুন। প্রয়োজনে পরিবার বা বন্ধুদের সাথে পরিচয় শেয়ার করে রাখুন এবং যেকোনো জরুরি বার্তার স্ক্রিনশট করে রাখুন।

অতএব, বিশ্বব্যাপী টিন্ডার স্ইন্ডলার কেসটি গমগমে করে দিয়েছে যে ডিজিটাল যুগেও প্রেম ও অর্থ লেনদেনে সতর্ক থাকা অপরিহার্য। আপনার পরিচয় যাচাই করে প্রতারণামূলক সংকেতগুলো চিনে ফেললে এবং উপযুক্ত সতর্কতা অবলম্বন করলে এই ধরনের অনলাইন প্রতারণা থেকে নিজেকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব।

উদ্ধৃতি: উপরোক্ত তথ্যের উৎস হিসেবে বিভিন্ন সংবাদপত্র, গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও আইনি নথি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত (gijn.org timesofisrael.com theguardian.com thenextweb.com theguardian.com) পরিসংখ্যান ও বিবরণগুলি উল্লিখিত উত্স থেকে সংগৃহীত।

Sunday, June 13, 2021

বাংলাদেশে আলোচিত ৫ পরকীয়া কাহিনী

0 comments

একটি সুখী পরিবারকে চোখের পলকে তছনছ করে দিতে পারে পরকীয়া সম্পর্ক। কেউ নিজের ইচ্ছায় এই নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়ান, আবার কেউ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েন। আবার জীবনসঙ্গী মনের মতো না হলে কেউ কেউ সচেতনভাবেই পরকীয়া প্রেম করেন। প্রতিনিয়ত পত্র পত্রিকায় পরকীয়ার সম্পর্ক নিয়ে নানা সংবাদ ছাপা হচ্ছে । বর্তমানে এর প্রবণতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে আলোচিত ৫ টি পরকিয়া সমাজকে নাড়া দেয়। আবেদন করে ব্যবস্থা নেয়ার।



১.  খুকু আর মনিরের পরকীয়ার কারণে যে মৃত্যু মানুষকে হতবিহ্বল করে তেমন মৃত্যু ঘটেছিল শারমীন রীমার। ১৯৮৯ সালে বিয়ের মাত্র তিন মাস পর খুন হন শারমীন রীমা। স্বামী মনিরের সাথে  চট্টগ্রাম বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। ফেরার পথে স্বামী মনির হোসেন রীমাকে হত্যা করে লাশ নারায়ণগঞ্জের মিজমিজি গ্রামের কাছে ফেলে রেখে আসে। বাড়ি থেকে এত দূরে কোনো মেয়ের লাশ পাওয়া গেলে যে কেউই সবার আগে ধরে নেয় হয় স্বামী নিজেও খুন হয়েছে বা নিজেই খুন করেছে। ঘটনার পরদিন ১০ মে গ্রেফতার হন মুনির। মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। ১৯৯০ সালের ২১ মে ঢাকার জেলা ও দায়রা আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর দীর্ঘদিন মামলা চলার পরে নিম্ন আদালতে অপরাধী মুনির হোসেন এবং হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনাদানকারী তার প্রেমিকা হোসনে আরা খুকু দুজনেরই ফাঁসির রায় হলেও উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের রায়ে খুকুকে খালাস দেওয়া হয়।



২. চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকর ডাক্তার ছেলে মোস্তফা মোরশেদ আকাশ এর বিয়ের কার্ড বিলি শেষ। এমন সময় জানতে পারেন তার হবুস্ত্রীর পুরাতন প্রেমিক রয়েছে। বিয়ের পর জানতে পারে অন্য আরেক একজনের সংগে  তানজিলা হক চৌধুরী মিতু’র চলছে পরকীয়া। বারংবার নিষেধ স্বস্ত্বেও সংশোধন হয়নি মিতু। অবশেষে ২০১৯ সালে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেই নিজেকে শেষ করে দেন আকাশ।

৩. ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরের নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন মাহমুদা খানম (মিতু)। স্বামী পুলিশের এএসআই বাবুল আক্তার বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন। পাঁচ বছর পর পিবিআইর তদন্তে এ খুনের সঙ্গে বাবুল আক্তারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, আলোচিত মিতু হত্যা মামলার অন্যতম ইন্ধনদাতা মনে করা হচ্ছে ভারতীয় নাগরিক গায়ত্রী অমর সিংহকে। তিনি ২০১৩ সালে ইউএনএইচসিআরের ফিল্ড অফিসার (প্রটেকশন) হিসেবে কর্মরত ছিলেন কক্সবাজারে। একই সময় ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন সঙ্গে বাবুল আক্তার।

ওখানেই তাদের বন্ধুত্ব হয়। পরে তা রূপ নেয় পরকীয়ায়। গায়ত্রী বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম এবং ঢাকায় বিভিন্ন হোটেলে বাবুল আক্তারের সঙ্গে একান্তে দেখা করেছেন।

৪. ২০১৯ সালে বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যার পিছনেও রয়েছে পরকীয়ার মত বিষয়। বিয়ের পরও আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি তার আগের প্রেমিক নয়ন বন্ডের সাথে নিয়মিত সম্পর্ক রাখত। তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবনতির এক পর্যায়ে প্রকাশ্যে খুন করা হয় রিফাতকে। যদিও এর সাথে মাদক ও ছিনতাইয়ের একটি যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু সব ছাপিয়ে বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্কই বড় ঘটনার জন্ম দেয়।

৫.  ২০২১ সালের জুন মাসে কুষ্টিয়ায় পুলিশের এএসআই সৌমেন রায়ের ছোঁড়া গুলিতে স্ত্রী-সন্তানসহ পরকীয়া প্রেমিক নিহত হয়। পুলিশ জানায়,  দেড় বছর আগে সৌমেন কুষ্টিয়া থাকাকালীন সময়ে আসমার সাথে পরিচয় হয়।  আসমা তার আগের স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে সৌমেনের সাথে গোপনে বিয়ে করে। পরবর্তী পর্যায়ে সৌমেন বদলি হয়ে কুষ্টিয়া থেকে চলে গেলে আসমার সাথে বাড়ির পাশের সাকিলের পরকিয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে।



পশ্চিমা বিশ্বে পরকীয়া নিয়ে গবেষণা ও জরিপ হলেও বাংলাদেশে তা দৃশ্যমান নয়। ফলে জানা যায় না সঠিক তথ্য। তবে ২০১৯ এর একটি পরিসংখ্যানে জানা যায়, প্রতি ৫৫ মিনিটে ঢাকা সিটি করোর্পরেশনে একটি করে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। ইসলাম ধর্মে পরকীয়া কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে । ইসলামি আইন শাস্ত্রে পরকীয়ায় জড়িত নারী পুরুষের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যা হলো পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি।
বাংলাদেশে পরকীয়া সংক্রান্ত আইনের ৪৯৭ ধারায় বলা হয়েছে যে কোন বিবাহিত ব্যক্তি যদি অন্য কোন বিবাহিত নারীর সাথে জেনেশুনে যৌন সম্পর্ক করে তাহলে তা ব্যভিচার বলে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে সেই পুরুষটির পাঁচ বছরের কারাদন্ড, অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডের বিধান আছে। তবে যে নারীর সাথে ব্যভিচার করা হয়েছে - তার ক্ষেত্রে আইনে কোন শাস্তির বিধান নেই, ব্যভিচারকারী নারী ও পুরুষ উভয়ের শাস্তির কথাও বলা নেই।  


Wednesday, May 26, 2021

তাজমহল বিক্রি

0 comments

'তাজমহল বিক্রি’ এই ধরনের শিরোনামে যারা অবাক হয়ে বলছেন, এও কি সম্ভব? তাদের কাছে ‘নটবরলাল’ নামটি আশা করি অজানা। নটবরলাল এক কুখ্যাত নাম যা পুরো ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এক সময় নিজের বুদ্ধি, কুটিলতা, চুরি আর লোক ঠকানোর নজিরবিহীন ক্ষমতা দিয়ে। তিন তিনবার তাজমহলের মতো অপূর্ব ও নান্দনিক স্থাপত্য অবলীলায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন এই ব্যক্তি। কথা বলার ধরন এবং লোক ঠকানোর নতুন নতুন চক্রান্তে নিজেকে প্রায় অধরা করে তুলেছিলেন। অনেকবার ধরা পড়ার পরও বারবার জেল থেকে পালিয়েছেন সুচারু পরিকল্পনায়। জানার ইচ্ছে হচ্ছে নিশ্চয়ই, কে ছিলেন এই নটবর? কী করেই বা তাজমহল বিক্রির মতো অসাধ্য সাধন করেছিলেন তিনি?

তাজমহলের সৌন্দর্য দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন এক মার্কিন নবদম্পতি। এই অপার্থিব সৌন্দর্যের আটকাহন শুনছেন আর ভাবছেন এই তাজমহল যদি নিজেদের হতো। নিজেরাই যদি এই সৌন্দর্যের একমাত্র দাবিদার হতে পারতেন! ভালবাসার এই অমর চিহ্ন যদি নিজেদের নামে রাখা যেত। হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল, “চাইলেই আপনি হতে পারেন এই পুরো তাজমহলের ভাগিদার!” এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। সামান্য কৌতূহলে জিজ্ঞেস করা, “কি করে?” অমনি মখমলি পসরা সাজানো বিছানায় নটবরলালের বিচক্ষণ পদচারণ। উত্তরে, “আপনার স্বামী চাইলেই কিনে নিতে পারেন এই পুরো তাজমহল। আমি ভারত সরকারের সরকারি কর্মচারি। আমাদের মতো আরো কয়েকজনের হাতে এই তাজমহল বিক্রির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। আর সেই মোতাবেক আমরা কাজ করছি।” শুনতে সামান্য খটকা লাগছে ঠিকই, কিন্তু মনের মধ্যে তো পুরো তাজমহল নিজের করে পাওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু খটকা তো দূর করতে হয়। তাই জিজ্ঞেস করে নেওয়াই ভালো, “কেন আপনাদের সরকার এই তাজমহল বিক্রি করতে চাইছেন?” বাঘ যখন তার শিকারে নেমে পড়েছে আর শিকার যখন হাতের সীমানার মধ্যে তখন কি আর বাঘের উদরপূর্তি না ঘটে পারে? উত্তর এলো, “আমাদের সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা তো আর কারও অজানা নয়। আশেপাশে তাকিয়ে দেখুন কত না খেতে পাওয়া মানুষজন। এই অনাহারে থাকা লোকগুলোর খাবার যোগাতেই আমাদের সরকার হিমশিম খাচ্ছে। তার উপর হাজার হাজার টাকা খরচ করে এই তাজমহলের রক্ষণাবেক্ষণ করা কি আমাদের দ্বারা সম্ভব?”এই উত্তরেই গলে গেল নব দম্পতি। হাতে রয়েছে টাকা, আর দেরি কেন? হানিমুনে এসে এর চাইতে চমকপ্রদ উপহার আর কী-ই বা হতে পারে? তারা কিনে নিলেন তাজমহল, আর বাঘ তার শিকার ধরে পেট পূজো করে বেমালুম হাওয়া।


শুধু তাজমহল নয়, লালকেল্লা, সংসদভবন সব বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এই গল্প শুনলে অনেকেই শোরগোল তুলবেন, “আরে, এটা কখনো হয় নাকি? মানুষ এতো বোকা কিভাবে হতে পারে?” কিন্তু বাস্তবিকই এই ধরনের কারসাজি শুধু একবার নয়, তিন তিনবার করেছেন তাজমহল বিক্রেতা ঠগ শিরোমণি নটবরলাল। শুধু ক্রেতাদের বোকামি বললে নটবরলালকে ছোট করে দেখানো হবে। তার কথার কারসাজি, বিভিন্ন কৌতূহল দমনে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরের সম্মোহন যে কারও উপর খুব সহজেই প্রভাব বিস্তার করতো। আর সেই কারণে শুধু কি তাজমহল? ৫৪৫ জন সাংসদসহ পুরো সংসদভবন, লালকেল্লা, রাষ্ট্রপতি ভবন- এই সবকিছুই বিক্রি করেছিলেন তিনি চড়া দামে বিভিন্ন খদ্দেরের কাছে। শুধু সাধারণ মানুষই নন, টাটা, বিড়লা, আম্বানি, মিত্তলও এই ঠগবাজের শিকার হয়েছিলেন নানাভাবে। এভাবেই দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ এই নটবরলালের দুষ্কর্মের শিকার।

এবার জানাই, কে এই নটবরলাল?

বিহারের সিওয়ান জেলার বানগ্রা গ্রামে ১৯১২ সালে নটবরলালের জন্ম। তার আসল নাম কিন্তু নটবরলাল নয়। মিথিলেশ কুমার শ্রীবাস্তব হলো তার প্রকৃত নাম। ছেলেবেলা থেকেই নটবরলালের একটি বিশেষ গুণ ছিল। আর সেটি হলো অন্যের সই নিখুঁত জাল করা। তার প্রথম চুরির ঘটনাটাও বেশ মজার। গ্রামের এক বৃদ্ধ তাকে শহরের ব্যাংক থেকে চেকে সই দিয়ে টাকা ওঠানোর জন্য পাঠাতেন। একদিন মিথিলেশ এর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চেপে গেল। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত মিথিলেশ চেক বইয়ের কয়েকটা পাতা চুরি করে নিল। ব্যাংকে সই নকল করে ১,০০০ টাকার চেক লিখলো এবং একটু ভয়ে ভয়ে ব্যাংকে জমা দিল। আশাতীত ভাবে সেই চেক ব্যাংকে গ্রহণ করলো এবং তাকে এক হাজার টাকা দিল। এই তার অপরাধ জীবনের শুরু। নটবরলাল কে দেখতে খুব একটা আলাদা করে বলার মতো কিছু নয়। সাদামাটা আর পাঁচটা লোকের মতোই তিনি। তা হলেও বুদ্ধি আর চাতুরিতে তার জুড়ি মেলা ভার।


তার নটবরলাল হয়ে ওঠার গল্পটাও বিচিত্র। মিথিলেশ যখন ঠগবাজি শুরু করে তখন তার এক শাগরেদ ছিল, তার নাম নটবরলাল। একদিন কিছু সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা পুলিশের কাছে ধরা পড়ে যায় মিথিলেশ, কিন্তু তার শাগরেদ পালিয়ে যায়। তখন মিথিলেশ নিজেকে নটবরলাল নামে পরিচয় দেয় আর তার পালিয়ে যাওয়া বন্ধুর পরামর্শেই ঠগবাজি করতো বলে জানায়। সেই থেকে মিথিলেশ হয়ে যায় ‘নটবরলাল’। কয়েদি নটবরলাল ঠগবাজি করে প্রচুর অর্থ সম্পত্তির মালিক হয় এই নটবরলাল। তাবড় তাবড় গোয়েন্দা, অপরাধ বিশেষজ্ঞদের ঘোল খাওয়ানো এই নটবরলাল শুধু টাকার জন্যই ঠগবাজি করতো না। এটা যেন তার নেশা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুলিশের তাবড় তাবড় অফিসারদের পর্যন্ত তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হতে হয়েছিল। আর এই নেশাই তাকে তার ওকালতি পেশা থেকে স্থায়ীভাবে এই ঠগবাজি পেশায় আনতে বাধ্য করে। তবে তার এই ঠগবাজি জীবন যে একেবারে সরলভাবে মসৃণতায় চলেছিল তা কিন্তু নয়। অনেক ঘাত প্রতিঘাতও পোহাতে হয়েছিল তাকে। অন্তত ১০০টি প্রতারণার কেস ও জোচ্চুরির মামলায় নটবরলালের পিছনে আঠার মতো লেগেছিল ৮টি রাজ্যের বিশাল পুলিশ বাহিনী। বিভিন্ন মামলায় তার সাজা'র সম্মিলিত মেয়াদ হয় প্রায় ১১৩ বছর। কিন্তু নটবরলালের বয়েই গেছে আদালতের রায় মেনে নিয়ে জেলের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকতে। পুলিশ আর জেলারদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ৯ বার ধরা পড়েও জেল ভেঙে পালিয়েছে এই নটবর, চলে গিয়েছে পুলিশের নাগালের বাইরে। ফের ধরা পড়েছে, ফের পালিয়েছে। জেল ভাঙা যেন তার কাছে কোনও ব্যাপারই না। সর্বসাকুল্যে ১১৩ বছরের জেলের পরিবর্তে শুধুমাত্র ২০ বছরের মতো জেল জীবন কাটাতে হয়েছিল তাকে। বয়স বাড়ার ফলে অনেকে ভেবেছিল বুড়িয়ে গেছে নটবর। তার বুদ্ধিতে বুঝি জং ধরে গিয়েছে। কিন্তু না, সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১৯৯৬ সালে ৮৪ বছর বয়সে সর্বশেষ নটবরলাল ধরা পড়েছিল। অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে থাকার অনুমতি জোগাড় করে নটবরলাল। কানপুর জেল থেকে হুইল চেয়ারে পুলিশ পাহারায় ‘অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স’ (AIMS)-এ যাওয়ার মাঝেই ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গিয়েছিল ঠগ শিরোমনি। সেই শেষবার তাকে দেখা গিয়েছিল। আর দেখা যায়নি নটবরলালকে! পরিবারের দাবি তার মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বাস করতে পারেনি পুলিশ। তবে আর কোনোদিন কোথাও দেখাও যায়নি নটবরলালকে। ২০০৯ সালে তার উকিল আদালতে আবেদন দাখিল করেন যেন নটবরলালের নামে সকল মামলা তুলে নেওয়া হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন ওই বছরের জুলাইয়ের ২৫ তারিখ নটবরের মৃত্যু হয়। যদিও তার ভাই গঙ্গা প্রসাদ শ্রীবাস্তব দাবি করেন ১৯৯৬ সালেই নটবরের মৃত্যু হয়। তাই তার মৃত্যু নিয়ে এখনও রয়ে গেছে বিশাল রহস্য। তার ভাই বর্তমানে বিহারের গোপালগঞ্জে বাস করেন। নটবরের এক মেয়ে আছে যিনি একজন সিপাহীকে বিয়ে করেন।

তবে আজও অপরাধ জগত নিয়ে গবেষকদের কাছে নটবরলাল চূড়ান্ত কৌতূহলের কেন্দ্র। কোন জাদুতে সে লোক ঠকিয়ে তাজমহল, লালকেল্লা, রাষ্ট্রপতি ভবন ও সংসদ ভবন বিক্রি করে মোটা টাকা রোজগার করেছিল তা-ও এক অবাক বিস্ময়। নটবরলালের নাম নিয়ে হিন্দিতে দুটো সিনেমাও হয়েছে। একটিতে অমিতাভ বচ্চন এবং অন্যটিতে ইমরান হাশমি অভিনয় করেন। নটবরলালের চুরিগুলোর ধারণা বিভিন্ন সিনেমায় বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার এতো বড় নাটের গুরু, যার চালাকি ও বুদ্ধিতে বাঘা বাঘা লোকজন থেকে অনেকেই তটস্থ থাকতো, এই ধরনের একজনকে তার গ্রামের লোকজন কিন্তু পর করে দেয়নি। গ্রামের লোকজন সকলেই নটবরের স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলার ব্যাপারে খুব সচেষ্ট। তারা নটবরকে নিয়ে রীতিমত গর্ব করে। প্রতারণার ধরনের কারণে তাকে অনেক সময় ‘ফ্র্যাঙ্ক অ্যাবাগনেল’ এবং ‘ভিক্টর লুস্টিগ’-এর সাথে তুলনা করা হয়। প্রকৃত অর্থেই নটবর ছিল তার সময়ের চোরদের মধ্যে সেরাদের সেরা।

লেখা: বিশ্বজিৎ দেবনাথ (মলাট)

Wednesday, April 7, 2021

আইফেল টাওয়ার বিক্রি

0 comments

 জালিয়াতি করে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার বিক্রি করে দিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। তা–ও আবার দুই–দুইবার! অসম্ভব কাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন ইউরোপ–আমেরিকায় জালিয়াতি করে ‘নাম কুড়ানো’ ভিক্টর লাস্টিগ। ‘কাউন্ট’ ভিক্টর লাস্টিগ নামেও কুখ্যাত ছিলেন তিনি। লাস্টিগের জন্ম ১৮৮০ সালে, অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরিতে (এখনকার চেক রিপাবলিক)। অপরাধ জগতে পা রাখেন তরুণ বয়সেই। জীবনের একটা লম্বা সময় কাটান প্যারিসে। সেখানে পড়াশোনার সময় জুয়া তাঁকে পেয়ে বসে। তাঁর নাম ওঠে তখনকার বিভিন্ন অপরাধ ম্যাগাজিনে।



১৯২৫ সালে পত্রিকায় একটি লেখা পড়েন ভিক্টর লাস্টিগ। সেখানে জানতে পারেন, আইফেল টাওয়ার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, তার জোগান দিতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ব্যয়ভার বহন করার চেয়ে টাওয়ারটি রদ্দি হিসেবে বেচে দেওয়াই ভালো কি না, এমন প্রশ্ন তোলা হয় লেখাটির শেষ দিকে। আর এই শেষ লাইন থেকেই লাস্টিগের মাথায় আইফেল টাওয়ার বেচে দেওয়ার বুদ্ধিটি আসে। আর শুরু করে দেন জাল দলিল-দস্তাবেজ তৈরির অপকর্ম।

এরপর গোপনে একদল ভাঙারি ব্যবসায়ীকে একটি বিলাসবহুল হোটেলে দাওয়াত করেন লাস্টিগ। ব্যবসায়ীদের কাছে নিজেকে ফ্রান্সের ডাক ও টেলিগ্রাফমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। বোঝাতে সক্ষম হন যে এই টাওয়ার এখন দেশের জন্য একটা বোঝা এবং এ জন্যই সরকার এটিকে ফেলনা হিসেবে বেচে দিতে চাইছে। লাস্টিগ ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেন, পুরো বিষয়টি গোপন রাখা জরুরি, কেননা এ বিষয়ে জানাজানি হলে বিতর্ক দেখা দেবে। লাস্টিগ আরও বলেন, তিনি নিজে টাওয়ারের ক্রেতা নির্বাচনের দায়িত্বে আছেন।

অবশেষে আন্দ্রে পয়সন নামের এক ফরাসি ব্যবসায়ীকে ফাঁদে ফেলেন লাস্টিগ। তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। পয়সনকে জানান, মন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবস্থান নাজুক এবং তিনি সুযোগ–সুবিধাবঞ্চিত। এসব বলে তিনি আদতে পরোক্ষভাবে ঘুষ দাবি করেন। অন্যদিকে পয়সন চাইছিলেন ব্যবসায়ীমহলে নিজের একটা উঁচু অবস্থান তৈরি করতে। তাই তিনি যেভাবেই হোক আইফেল টাওয়ারটি কিনতে চাইছিলেন। কাজেই লাস্টিগকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতেও তাঁর দ্বিধা ছিল না। লাস্টিগ পুরো টাকা পাওয়ার পর পগারপার। প্রায় ৭০ হাজার ফ্র্যাঙ্ক হাতিয়ে নিয়ে স্বদেশে পাড়ি জমান তিনি।

লাস্টিগ ধরে নিয়েছিলেন, পয়সন লজ্জায় এবং পুলিশের কাছে ধরা পড়ার ভয়ে কাউকে বিষয়টি জানাবেন না। কেননা ঘুষ দেওয়াও তো অপরাধ। এদিকে খবরের কাগজেও চোখ রাখছিলেন এ বিষয়ে কোনো খবর ছাপা হয় কি না, তা দেখার জন্য। একসময় নিশ্চিত হন, জালিয়াতির বিষয়টি জানাজানি হয়নি। লাস্টিগ আবার প্যারিসে ফিরে আসেন এবং আরও একবার আইফেল টাওয়ার বিক্রির নাটক সাজান। আগের মতোই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করেন। তবে এবার তাঁর জালিয়াতি ধরা পড়ে যায়। কিন্তু চতুর লাস্টিগ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগেই পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।

লাস্টিগের ৪৭টি ছদ্মনাম এবং অসংখ্য পাসপোর্ট ছিল। পাঁচটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। ব্যক্তিত্ব ছিল দারুণ আকর্ষণীয়। তাই একটি গোয়েন্দা সংস্থা লাস্টিগকে ‘তরুণীদের স্বপ্নের পুরুষ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। আর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাঁকে চিহ্নিত করেছিল ‘সম্মানিত অভিজাত ব্যক্তি’ হিসেবে! লাস্টিগের আরেকটি বিশ্বখ্যাত জালিয়াতির ঘটনা ‘রোমানিয়ান বক্স’ নামে পরিচিত। এই রোমানিয়ান বক্স দিয়ে নাকি দুনিয়ার যেকোনো টাকার নোট নকল করা যেত!

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, ফ্রান্স টুডে ও মেন্টালফ্লস ডটকম