Friday, April 16, 2010

পড়া মনে রাখার কৌশল

0 comments
০০ শারমিন জাহান ০০
আমাদের মস্তিষ্ক এক বিচিত্র তথা জটিল কারখানা এবং এর কাজ করার মতা অপরিসীম। এক কাজে লাগাতে হলে আপনাকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। খুব সহজ, তবে নিয়মিত চর্চার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা আমাদের মস্তিষ্কের অতি সামান্য অংশই মাত্র ব্যবহার করে থাকি। শতকরা হিসেবে মাত্র ৫% থেকে ৭%। বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানী, মেধাবী ব্যক্তিগণ সর্বোচ্চ ১৫% থেকে ১৮% মস্তিষ্ককে কাজে লাগাতে পেরেছেন। বাকি বিশাল অংশ অলস বসে থাকে। এই বিশাল অলস মস্তিষ্ককে কাজে লাগাতে পারলে মানুষ কি অসাধ্যই না সাধন করতে পারবে; একবার ভেবে দেখুন।
মনে রাখার টিপস্ ঃ
০০ নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন।
০০ এখনই কাজ শুরু করুন, এখনই।
০০ ঘুমের সময় নির্ধারণ করতে হবে এবং তা করতে হবে আপনার ‘বায়োলজিক্যাল ব্লক’ অনুযায়ী।
০০ সকাল হচ্ছে উত্তম সময় পড়ালেখা মনে রাখার। আরো অধিক উত্তম সময় হচ্ছে, সূর্যোদয়ের এক ঘণ্টা পূর্বে।
০০ প্রথমত শব্দ করে পড়তে হবে। এরপর ইচ্ছে হলে শব্দহীনভাবে পড়তে পারেন।
০০ প্রথমে সম্পূর্ণ বিষয়টি একবার বা দু’বার মনযোগ সহকারে পড়ে তারপর দু’তিন লাইন করে মুখস্ত করুন।
০০ একটানা অনেকক্ষণ পড়তে হলে মাঝখানে বিরতি দেয়া উত্তম। এক কিংবা দু’ঘণ্টা পর পর অন্ততঃ পাঁচ মিনিট বিরতি দিতে হবে। এ সময় একটা গান শুনতে পারেন কিংবা সটান শুয়ে পড়তে পারেন। আর যদি আপনি ধর্মে বিশ্বাসী হন তাহলে আপনার ধর্ম নিয়ে ভাবুন এবং মুসলমান হলে আল্লাহর ‘জিকির’ করুন।
০০ পছন্দের তালিকায় মিষ্টি জাতীয় খাবার রাখুন। চিনির শরবত, সাথে লেবু কিংবা শুধু লেবুর শরবত। গ্লুকোজ পানিও পান করতে পারেন। সাবধান! ডায়াবেটিক থাকলে অবশ্যই এসব পরিহার করুন। খাবার তালিকায় সবুজ শাকসবজি, ফলফলাদি রাখুন। স্বাভাবিক পুস্টিকর খাবার খেতে চেষ্টা করুন। ধূমপান পরিহার করুন।
০০ অল্প হলেও প্রতিদিন কিছু না কিছু পড়ুন।
০০ কম হলেও প্রতিদিন অন্ততঃ ৩০ মিনিট হালকা শরীরচর্চা করুন।
০০ প্রতিদিন অন্ততঃ ৫/৭ মিনিট মন খুলে হাসুন।
০০ অযথা কথা পরিহার করুন।
০০ অতিরিক্ত রাত করে ঘুমোতে যাবেন না।
০০ পড়াতে মন না বসলেও প্রথম প্রথম অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়তে বসুন।

Friday, April 9, 2010

ডিজিটাল

0 comments
ডিজিটাল বলতে কী বোঝায়
ডিজিটাল বলতে একটি ইলেকট্রনিক টেকনোলজি বা প্রযুক্তি যার মাধ্যমে তথ্য জেনারেট, তথ্য সংরক্ষণ এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করাকে বোঝায়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাঝে উপযুক্ত সমন্বয় সাধন এবং এর সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে প্রকৃত ডিজিটাল রূপ।

ডিজিটাল বাংলাদেশে যা থাকবে
সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। একটি ডিজিটাল বাংলাদেশে যা থাকবে বা যা থাকা বাঞ্ছনীয় তার একটি ধারণা দেয়া যেতে পারে, যা নিম্নরূপ :

ম্যানুয়াল ফাইল ব্যবস্থাপনার অপসারণ
যে কোনো অফিসে ফাইলের ওপর ফাইল স্তূপ হয়ে থাকবে এবং সেখান থেকে প্রয়োজনমাফিক যে কোনো তথ্য খুঁজে বের করা সত্যিই সময় সাপেক্ষ। অর্থাত্ এতে করে যথেষ্ট সময়ের অপচয় ঘটে। বরং এর চেয়ে প্রতিটি ডেস্কে একটি কম্পিউটার থেকে যে কোনো সময় তথ্য খুঁজে নেয়া এই ভোগান্তিকে অনেকাংশে কমিয়ে দিবে। তবে এ ব্যাপারে দেশীয় সফটওয়্যারের উপর গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক।

ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা
সার্বিকভাবে প্রতিটি সেক্টরে ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা দরকার। ম্যানুয়াল ফাইল ব্যবস্থাপনার চেয়ে কম্পিউটারাইজড সিস্টেমে সব ইনফরমেশন বা তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। আর এভাবে প্রতিটি সেক্টরে ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে ওঠবে। ইতিমধ্যে সরকার সাশ্রয়ী মূল্যে ল্যাপটপ ছাড়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। মালেয়শিয়ান প্রতিষ্ঠান টিএফটির প্রযুক্তিগত সহায়তায় বাংলাদেশ টেলিফোন শিল্প সংস্থা এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর বাস্তবায়ন কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা দেখার বিষয়।

কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়ানো
শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, আমরা চাই প্রতিশ্রুতির সঠিক বাস্তবায়ন। আমরা সামনের দিনে ডিজিটাল বাংলাদেশ, একটি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বাংলাদেশ পাবার অপেক্ষায় রয়েছি। আর এজন্য শহর এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কম্পিউটারের ব্যবহার অধিক হারে বাড়ানো প্রয়োজন।

ই-গভর্নমেন্ট
ই-গভর্নমেন্ট অর্থাত্ ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট। বাংলাদেশে ই-গভর্নেন্সের সূচনা হয় ১৯৯০ সালের দিকে। এর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সরকার কম্পিউটার সামগ্রীর উপর থেকে কর প্রত্যাহার করে নেয়। ২০০১ সালের শুরুতে ‘জাতীয় আইসিটি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়। তবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আইসিটির প্রয়োগ এখনও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। জরুরি হয়ে পড়েছে নির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে যাওয়া। কেবল কম্পিউটারায়নই যথেষ্ট নয়, চাই প্রতিটি সেক্টরে, প্রতিটি পর্যায়ে কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের সঠিক বাস্তবায়ন। ধরা যাক, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের একটি ওয়েবসাইট রয়েছে। এ ওয়েবসাইট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সাইটগুলো টেক্সট কিংবা গ্রাফিক্সগুলো তথ্য বিবরণ থাকলে হবে না, বিশাল তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ ডেটাবেজ থাকা বাঞ্ছনীয় এবং একেকটি মন্ত্রণালয়ের সাথে আরেকটি মন্ত্রণালয়ের তথ্যের সম্পর্ক স্থাপন থাকবে অবশ্যই। অর্থাত্ প্রয়োজনমাফিক প্রতিটি মন্ত্রণালয় তাদের মাঝে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে অনায়াসে। যে কোন সময় ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তথ্য হালনাগাদ করা যাবে খুব সহজে। দেশের জনসাধারণ যেন এ ওয়েবসাইটগুলো থেকে প্রয়োজনানুসারে তথ্য নিতে পারে এর নিশ্চয়তা থাকা অপরিহার্য। কিছু কিছু তথ্য হতে পারে ব্যবহারকারীর নিজস্ব তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ব্যবহারকারীর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা ভালো। সেক্ষেত্রে ব্যবহারকারী তার ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তা নিয়ন্ত্রণ করবেন। এতে করে ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।

টেলিসেন্টারের সংখ্যা বাড়ানো
বাংলাদেশ টেলিসেন্টার নেটওয়ার্কের এক হিসাবমতে, বাংলাদেশে দুই হাজারের অধিক টেলিসেন্টার বিদ্যমান রয়েছে। আর এ টেলিসেন্টারগুলো গড়ে ওঠছে প্রধানত বেসরকারি উদ্যোগেই। সরকারকে এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে, একটি নির্দিষ্ট কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিসেন্টারের সংখ্যা বাড়ানো উচিত।

নাগরিক সেবাগুলো ডিজিটালাইজেশন
ডিজিটাল বাংলাদেশে জনসাধারণ ঘরে বসেই অধিকাংশ নাগরিক সুবিধা পাবেন। যেমন মানুষ অনলাইনে কিংবা মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে সব বিল যেমন টেলিফোন, গ্যাস ইত্যাদি পরিশোধ করবেন। ইতিমধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবাও পাওয়া যাবে অনলাইনে। টেলিমেডিসিন সেবা এখন হাতের মুঠোয়। যানবাহনের সময়সূচি পাওয়া যাচ্ছে নির্দিষ্ট ওয়েব পোর্টাল থেকে। ডিজিটাল পাসপোর্ট প্রক্রিয়া অনেকটা স্তিমিত থাকলেও ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে মাত্র। ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে শুভ সূচনা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকে অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউস কার্যক্রম চালু হয়েছে ২০০৯ সালের নভেম্বর থেকে। তবে আর একটি আশার কথা, বাংলাদেশ ব্যাংক পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি ব্যাংককে পরীক্ষামূলকভাবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করার অনুমতি দিয়েছে।
নিজস্ব স্যাটেলাইট ব্যবস্থা গড়ে তোলা
কেবল নিজস্ব স্যাটেলাইট ব্যবস্থার মাধ্যমে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা গড়ে ওঠবে। ফলে বিকল্পভাবে ইন্টারনেট সার্ভিসসহ অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। চড়া দামের ভি-স্যাট অব্যাহত রাখার প্রয়োজন আসবে না।

অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা প্রসার রোধ করা উচিত
কিছুদিন হলো অবৈধভাবে ভিওআইপি ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। এটি ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য একটি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। সরকারের উচিত অবৈধভাবে ভিওআইপি ব্যবসার প্রসার ঘটতে না দেয়া। বরং বৈধভাবে ভিওআইপি প্রযুক্তির বিস্তারে সরকারকে যথার্থ উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স
সম্প্রতি সরকার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে একটি সার্কুলার জারি করে আইসিটি টাস্কফোর্সের নাম পরিবর্তন করে ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। বলা হচ্ছে, এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সরকার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা সম্ভব। এর আওতায় সংক্ষিপ্ত মেয়াদি, মধ্য মেয়াদি এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করা জরুরি। এ কমিটি জাতীয় কার্যক্রমের একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করবে। এক্ষেত্রে দেশের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল রূপ দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে দ্রুতগতিতে।

চাই সঠিক বাস্তবায়ন
সরকারের সব কার্যক্রম এবং তথ্যাবলী ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকবে। এতে বরং সুবিধা হবে সরকারের। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
মূলত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে আগে ডিজিটাইলেশন অর্থাত্ কম্পিউটারায়ন পদ্ধতির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এসব না করলে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যাবে।
ইমেইল : walisearch@yahoo.com /সাদ আবদুল ওয়ালী

লালনে দোল

0 comments
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রামে লালনের সমাধি প্রাঙ্গণে দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক সাধু-ফকিরের সমাবেশ ঘটে। আগে দোলপূর্ণিমার এই সাধু সমাবেশ সাধুসঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। এই সাধুসঙ্গে লালনপন্থী সাধু-ফকির একত্র হয়ে গুরুকার্য পালন করতেন। লালন দোলপূর্ণিমার এই সাধুসঙ্গ প্রবর্তন করেছিলেন সাধু-ফকিরদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের পথ রচনা করার জন্য। তখনকার সাধুসঙ্গে সাধুগুরুরা একত্র হয়ে ভোরে গুরুকার্য সেরে দৈন্য গান গেয়ে নিয়ে দুপুর অবধি গোষ্ঠ গান পরিবেশন করতেন। এই গোষ্ঠ গানের অনুষ্ঠানের ফাঁকে মাঝখানে বাল্যসেবা ও দুপুরের স্নান সেরে নিতেন। দুপুরে গুরুকার্য, পারশ ইত্যাদির পর পূর্ণসেবা, সন্ধ্যায় গুরুকার্য ও প্রার্থনাগীতির পর মধ্যরাত্রি অবধি গান, জ্ঞানকথার আলাপন এবং শেষে অধিবাস অনুষ্ঠিত হতো। বর্তমান লালন-প্রবর্তিত দোলপূর্ণিমার সাধুসঙ্গ সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়েছে। এখন দোলপূর্ণিমার আয়োজন পুরোপুরিভাবে ‘লালনমেলা’ বা ‘লালন স্মরণোৎসব’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এর চরিত্রগুণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বারোয়ারি মেলার সব লক্ষণ। যেমন এই মেলার একটি প্রান্তজুড়ে থাকে বাউলদের বাদ্যযন্ত্র বিক্রির দোকান। এসব দোকানে সাজানো বিচিত্র ধরনের একতারা, দোতরা, ডুগি, প্রেমজুড়ি বা কাঠজুড়ি, মন্দিরার ভেতর থেকে দেশ-বিদেশের সাধুরা তাদের প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্রটি কিনে থাকেন। অন্য প্রান্তে থাকে লালনপন্থী তাঁতি সাধুদের তাঁতে তৈরি গামছা-লুঙ্গি বিক্রির দোকান। এ ছাড়া থাকে প্লাস্টিকের সামগ্রী, কারুপণ্য থেকে শুরু করে আসবাবসামগ্রী, পাটি, মাটির পুতুল, মাটির হাঁড়ি, গয়না ইত্যাদির দোকান। পাশাপাশি সাঁইজির গানের ক্যাসেটসহ গানের বইও বিক্রি হয়। তবে ছেঁউড়িয়ার দোলপূর্ণিমার অনুষ্ঠান এমন মেলার চেহারা পেয়েছে খুব বেশি দিন আগে নয়। আসলে বিগত শতকের পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত উত্সবটি ছিল শুধু সাধু-ভক্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সে সময় এখানকার অনুষ্ঠানের একটি স্বতঃস্ফূর্ততাও বর্তমান ছিল। কিন্তু ষাটের দশকে লালন আখড়ার অনুষ্ঠান দুটি প্রশাসনিক সহায়তায় ক্রমশ আনুষ্ঠানিকতার ভেতরে আবদ্ধ হয়ে এর স্বতঃস্ফূর্ত রূপটি হারিয়ে ফেলে।
FileServe
তার পরও এ বছর দোলপূর্ণিমার অনুষ্ঠানের মধ্যে লালনের সমাধিকে ঘিরে একটি ভেক খিলাফত অনুষ্ঠান হয়েছে।

পুণ্যস্নান

0 comments
সাধারণত চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী বা অশোকাষ্টমী তিথিতে পুণ্যস্নান শাস্ত্রমতে নির্ধারিত। এ সময় নারায়ণগঞ্জ জেলার লাঙ্গলবন্দের আদি ব্রহ্মপুত্র নদে সনাতন ধর্মাবলম্বী কয়েক লাখ পুণ্যার্থী স্নান করেন। তাঁরা এই আদি ব্রহ্মপুত্র নদে নেমে ‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লোহিত্য, তুমি আমার পাপ হরণ করো’ এই মন্ত্র উচ্চারণ করেন। সঙ্গে ফুল, বেলপাতা, ধান, দূর্বা, হরীতকী, ডাব, আমের পল্লব প্রভৃতি সহযোগে পুণ্যস্নান করে থাকেন। এই স্নান উপলক্ষে লাঙ্গলবন্দের নদীতীরে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী বাসন্তী মেলা বসে। এই মেলায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মিয়ানমার থেকে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যে বর্ণিল মেলা জমে ওঠে, তার পাশেই বসে সারা দেশ থেকে আগত সাধু-সন্ন্যাসীদের আস্তানা। মেলার প্রকৃত অলংকার দেশি-বিদেশি বিচিত্র সব শখের সামগ্রীর পসরা, যেমন—কাঠের ঘর সাজানোর উপকরণ, মাটি-কাঠ-ঝিনুক দিয়ে তৈরি গয়না, শাখা, নকশি জুতা-স্যান্ডেল। এর বাইরে পুণ্যার্থীদের পূজার উপকরণ ও বাহারি খাবারের দোকান তো আছেই।
দেশ-বিদেশের পুণ্যার্থীরা পাপ মোচনের আশায় লাঙ্গলবন্দ ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে গান্ধীঘাট, রাজঘাট, ললিত সাধুর ঘাট, অন্নপূর্ণা মন্দির ঘাট, জয়কালী মন্দির ঘাট, দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ী ঘাট, আকরী সাধুর ঘাটসহ মোট ১৪টি ঘাটে স্নান সম্পন্ন করে ফিরে যাওয়ার পথে পুণ্যস্নান মেলা থেকে স্মৃতিস্বরূপ কিছু না কিছু কিনে নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহ জেলার শহরের গাঙ্গিনার পাড়সংলগ্ন শম্ভুপুরের ব্রহ্মপুত্র নদেও হয় পুণ্যস্নান। সেখানেও নদীর পাড়ে মেলা বসে। ময়মনসিংহ ছাড়াও সুনামগঞ্জ ও দিনাজপুরের পার্বতীপুরসহ আরও কয়েকটি জেলায়ও জাঁকজমকভাবে পুণ্যস্নান মেলা বসে।

হোলি উত্সব

0 comments
প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা, তথা দোলপূর্ণিমায় বাংলাদেশের হিন্দু-বৈষ্ণব মানুষেরা হোলি উত্সব উদ্যাপন করেন। কথিত আছে, একদিন শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধা তাঁদের সখাসখি বা ভক্তদের সঙ্গে এক জায়গায় বসে আলাপ করছিলেন। একসময় আকস্মিকভাবে শ্রীরাধার ঋতুস্রাব ঘটে। সখাসখি বা ভক্তদের কাছে শ্রীরাধা যেন বিব্রত না হন, সে জন্য হোলির আয়োজন করেন শ্রীকৃষ্ণ। অন্যদিকে একথাও বলা হয়, বর্ষ শুরুর আগে দেহ অশুচি থাকলে যমদূত কাউকে স্পর্শ করতে পারে না। তাই হোলি উত্সব করে রং মেখে দেহকে রাঙিয়ে তোলা হয়। প্রকৃতির বিচিত্র-বর্ণিল রঙের প্রতি একাত্ম হতেই হোলির প্রচলন হয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। হোলি উত্সব বিভিন্ন বর্ণের তরল রং একে অপরকে কখনো দূর থেকে ছিটিয়ে দেয়। কখনো আবার কাছে গিয়ে গায়ে-মুখে হাত দিয়ে হাস্যোজ্জ্বল হয়ে তরল রং মাখিয়ে দেয়। হোলি উত্সব শুষ্ক রং মাখানো তেমন একটা চোখে পড়ে না।
শুধু রং ছিটানোই হোলি উত্সব প্রধান আনন্দ নয়, হোলি উত্সবে বিভিন্ন স্থানে আদি রসাত্মক গানও পরিবেশন করা হয়। বাংলাদেশে হোলি উৎসবে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক ও পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিরা, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। এসব অনুষ্ঠানে আজকাল হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমান-খ্রিষ্টানদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। এ দেশের সবচেয়ে জমজমাট হোলি উৎসব হয় পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার কালীমন্দির এলাকায়।

শাড়ি

0 comments
উড়ছে শাড়ি, উড়ছে আঁচল_পৃথিবীর যেখানেই হোক, এই ছবি আমাদের বাঙালি বা ভারতীয় নারীর চিরায়ত রূপ। তবে কালে কালে পাল্টেছে শাড়ির রকম, পরার ধরণধারন। ১ এপ্রিল এই শাড়ির বিবর্তন নিয়েই সিটি ব্যাংক ও আমেরিকান এক্সপ্রেসের সহযোগিতায় আহসান মঞ্জিলে '১০০ বছরে শাড়ীর বিবর্তন' শীর্ষক একটি শো করলেন ডিজাইনার তুতলী রহমান। সেই শো নিয়েই আজকের আয়োজন। লেখা : রিদওয়ান আক্রাম, ছবি : মোহাম্মদ আসাদশাটী থেকে শাড়ি

শাড়ির চল হয়েছিল ঠিক কবে? নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। খানিকটা অনুমান করে নেওয়া যায়! সূত্র হিসেবে নেওয়া যাক 'শাড়ি' শব্দটির উৎস-সময়কালকে। সংস্কৃত 'শাটী' থেকে এসেছে 'শাড়ি'। তবে অনেকের ধারণা, সংস্কৃত হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও আদতে 'শাটী' ধার করা শব্দ। আর্যরা ভারতবর্ষে আসার আগেই নাকি 'শাটী' শব্দটির অস্তিত্ব ছিল। সেই হিসেবে বলা যেতেই পারে, শাড়ির ইতিহাস সাড়ে তিন হাজার বছর কিংবা তারও বেশি পুরনো। আর্য ভাষায় 'শাড়ি'কে আরো বিভিন্ন শব্দে আখ্যায়িত করা হয়েছে_'সাটক', 'সাটিকা'। আবার 'মহাভারত'-এ উলি্লখিত দ্রৌপদীর যে 'বস্ত্রহরণ' করা হয়েছিল, অনুমিত হয়, সেটাও শাড়িই ছিল। গুপ্ত যুগের (আনুমানিক ৩০০ থেকে ৫০০ সাল পর্যন্ত) বিখ্যাত কবি কালিদাসের 'কুমারসম্ভব'-এ শাড়ির কথা উল্লেখ আছে। গুপ্ত আমলের ইলোরা অজন্তা গুহার প্রাচীন চিত্রাবলি বলে দেয়, খ্রিস্টাব্দ শুরুর সময়ে শাড়ির অস্তিত্ব ছিল। পাহাড়পুর-ময়নামতির পোড়া ফলক থেকেও প্রমাণ যায়, হাজার বছর আগে এই পূর্ববঙ্গে শাড়ির চল ছিল। তবে এসব শাড়ির সঙ্গে আজকের শাড়ির তফাৎ রয়েছে। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, আদিমকালে পূর্ব-দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে সেলাই করা কাপড় পরার চল ছিল না। এই অখণ্ড বস্ত্রটি পুরুষ পরলে হতো ধুতি আর মেয়েরা পরলে শাড়ি। উভয়ের শরীরের ওপরের অংশই থাকত উন্মুক্ত। তবে পালা-পার্বণে উচ্চবংশীয় নারীরা ওড়না জাতীয় কাপড়ে নিজেকে ঢেকে নিত।
মধ্যযুগের কবিদের কাছ থেকে শুধু শাড়ির কথাই জানা যায় না, শাড়ির রঙের কথাও জানা যায়। চৌদ্দ শতকের কবি চণ্ডীদাস লিখেছেন, 'নীল শাড়ি মোহনকারী/উছলিতে দেখি পাশ'। প্রথম মা হওয়া নারীকে উপহার হিসেবে দেওয়া হতো লাল শাড়ি। শাড়ি পরার ক্ষেত্রে ধনী-গরিব বিভাজন ছিল। ধনীরা পরতেন মিহি মখমল কাপড়ের শাড়ি আর গরিবের শাড়ি ছিল সাধারণ সুতি।
মুসলমানরা আগমনের ফলে আরও অনেক কিছুর পাশাপাশি পোশাক-পরিচ্ছদেও লাগে পরিবর্তনের হাওয়া। তুর্কি-আফগান-মোগল সংস্কৃতির ধারা স্থানীয়রাও গ্রহণ করে। পাগড়ি, সালোয়ার-কামিজ ও পায়জামার মতো পোশাক জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও শাড়ির গুরুত্ব কিন্তু কমে যায়নি। দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের নারীরা শাড়িকেই নিজেদের পরিধানের প্রধান বস্ত্র হিসেবে আঁকড়ে ধরে থাকে। সম্ভবত মোগল আমলেই চালু হয় ব্লাউজ ও উর্ধ্বাঙ্গ ঢাকার রীতি। তবে তা উচ্চবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
মাদাম বেলনোসের চিত্রে উনিশ শতকের প্রথমদিকে গ্রামবাংলার অন্তঃপুরের যে ছবি পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়, এক প্যাঁচেই শাড়ি পরেছেন বাংলার নারী। অধিকাংশ শাড়ির রংই সাদা। তবে পাড় হতো চিকন এবং লাল। সায়া-ব্লাউজ কিংবা অন্তর্বাসের চল ছিল না।
১৮৮৯ সালে ঢাকা জেলার একটি হিন্দু পরিবারের ওপর করা জরিপে দেখা যায়, একজন মহিলা বছরে পাঁচ-ছয়টি শাড়ি ব্যবহার করে থাকেন। এগুলোর পেছনে খরচ হতো ৪ রুপি। ফ্যানি পার্কস ১৮৫১ সালে তাঁর বইয়ে লিখেছেন, 'ধনী মহিলারাও শাড়ি পরত। শীতের সময় ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য বাড়তি হিসেবে ব্যবহার করত চাদর।' তবে তখনো ব্লাউজ-সায়া-পেটিকোটের চল হয়নি, চালু করল কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল। ফুলহাতা ব্লাউজ এবং কুচিছাড়া শাড়িই ছিল সেই সময় উঁচু সমাজের নারীদের প্রধান ফ্যাশন। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাড়ি আর ব্লাউজ নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে; এবং ভবিষ্যতেও হতে থাকবে।
তবে শাড়ির কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, তা বলা যাবে না। ভারতবর্ষে শাসক গোষ্ঠী পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয়ভাবে বদলেছে পুরুষদের পোশাক কিন্তু শাড়িকে তার প্রধান পরিধেয় বস্ত্র হিসেবে আঁকড়ে রেখেছে নারী। তাই বলা যেতেই পারে, শাড়ি আর ভারতীয় নারী একে অপরের পরিপূরক।
মোগল যুগ
মোগলদের মধ্যে সম্রাট আকবরই প্রথম ভারতবর্ষের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা শুরু করেন। ভারতীয় নারীদের নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মোগল সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন। সেই ধারাবাহিকতায়ই মোগলাই আভিজাত্যে যোগ হল শাড়ি।
নানা রকম দামি পাথর ছাড়াও সোনা-রূপার সুতা দিয়ে শাড়িতে নকশার কাজ করা হতো। মোগলদের আগ্রহের জন্য মসলিনের শাড়ির উপস্থিতিও থাকত জেনানা মহলে। মোগলদের জন্য মসলিন কাপড় সংগ্রহের জন্য সরকারি লোক নিয়োগ দেওয়া হতো।
জমিদারি আমল
মোগলদের বাংলা জয়ের পর 'জমিদার' একটি বিশেষ পদবি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জমিদার মানেই বিশাল সম্পত্তির মালিক। স্বাভাবিকভাবেই সেই সময়ে ধনিক শ্রেণী হিসেবে 'জমিদার' গোষ্ঠীর আত্দপ্রকাশ ঘটে। তাদের সময়ে শাড়ি পরা হতো এক প্যাঁচে। ব্লাউজও এ সময়ে শাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে ঠাকুর পরিবারের মেয়েরা ব্লাউজকে সাধারণের কাছে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন।ষাটের দশক
ষাটের দশকের শেষ থেকে সত্তরে প্রথম দিকে হিপ্পীদর স্লোগান ছিল 'ফুলের শক্তি'। সমসাময়িক সময়ে চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে 'ফুল'। পোশাকের নকশাতেও থাকত ফুলের প্রাধান্য, এমনকি সাজসজ্জায়ও। পরে এ ফ্যাশনে নতুন মাত্রা আনে হিন্দি সিনেমার বহুল প্রচলিত 'মিনি শাড়ি'। বিশেষ করে বলা যেতে পারে 'সত্যম শিবম সুন্দরম' সিনেমাতে জিনাত আমানের পরা শাড়ির কথা। মিনি শাড়ির পাশাপাশি 'টেডি শাড়ি'র কথাও বলা যায়, যা অভিনেত্রী মমতাজ জনপ্রিয় করেছিলেন। শাড়ির সঙ্গে সঙ্গে ব্লাউজেও লাগে পরিবর্তনের হাওয়া। ব্লাউজের গলা করা হয় অনেকটা নৌকার আদলে এবং ব্লাউজের পেছনের দিকটা আটকানোর জন্য থাকত মেগি ক্যাপের বোতামভিক্টোরীয় যুগ
উনিশ শতকের চলি্লশ দশক থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কে বলা হয়ে থাকে 'ভিক্টোরিয়ান যুগ'। এ যুগে ফ্যাশনের মূল কথাই ছিল কাপড়ে সারা শরীর ঢাকা থাকতে হবে। এমনকি গোড়ালি দেখানোটাও অসম্মানকর হিসেবে বিবেচিত হতো। ভারতের সেই গরমেও ইংরেজরা ভিক্টোরিয়ান ফ্যাশনের পোশাক পরতে পিছপা হননি। ব্রিটিশদের সংস্পর্শে থাকা জমিদার ও স্থানীয় ধনীদের পোশাক-পরিচ্ছদেও যোগ হয় ভিক্টোরিয়ান ফ্যাশনের স্টাইল। এ সময়ে শাড়ির সঙ্গে ফুলহাতা ব্লাউজ এবং পেটিকোট পরার চল শুরু হয়। এই রীতিতে শাড়ি পরাটা বাঙালি নারীর চিরায়ত এক প্যাঁচে শাড়ি পরার ধারণাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়।১৯৪০-৫০ দশক
ব্রিটিশমুক্ত ভারতে ১৯৪০ দশকের শেষের দিক থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল হিন্দি চলচ্চিত্রের 'সোনালি সময়'। এসব চলচ্চিত্রের নায়িকারা ছিলেন তখনকার ফ্যাশন আইকন। নার্গিস, মধুবালা এবং বৈজয়ন্তীমালার মতো নায়িকাদের পোশাক ভাবনা ভারত উপমহাদেশের নারীদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করা শুরু করে। পাশাপাশি বাঙালি নারীদের সামনে ছিল সুচিত্রা সেন। তাঁর ছোট আস্তিন এবং লম্বা গলার ব্লাউজের স্টাইলগুলো ছিল দারুণ অনুকরণীয়। শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজও এ সময়ে হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সাধারণ ব্লাউজও সমানভাবে জনপ্রিয় হয়১৯৭০-৮০ দশক
দীর্ঘ সংগ্রামের পর বাংলাদেশ ১৯৭১-এ স্বাধীন এক দেশ হিসেবে আত্দপ্রকাশ করে। বাংলাদেশিরা নিজেদের সব কিছুর মধ্যে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করা শুরু করে। তাদের পছন্দের শাড়ির মধ্যে জায়গা করে নেয় দেশি খাদি এবং তাঁতের শাড়ি। আর এসব শাড়ির সঙ্গে চুলের সাজও ছিল আলাদা, করা হতো লম্বা বেণি কিংবা খোঁপা। ফুল দিয়েই সারা হতো খোঁপা অলঙ্কৃত করার কাজ। সে সময় আমরা পোশাকে অনুকরণীয় হিসেবে পেয়েছিলাম কবরী, শাবানা এবং ববিতার মতো অভিনেত্রী।
আন্তর্জাতিক সংগীতে একদিকে তখন ডায়ানা রসের ডিস্কো এবং অন্যদিকে বি জিসের জনপ্রিয় গান। এসবের সঙ্গে যোগ হওয়া ঝলমলে, জমকালো এবং চকচকে পোশাক পরার রীতি এ সময়ের শাড়ির ধরন ঠিক করে দেয়। ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসে হিন্দি চলচ্চিত্র 'সিলসিলা'য় অভিনেত্রী রেখার পরা 'সিলসিলা' শাড়ি। ঘন রঙের এই শাড়ির সঙ্গে পরা হতো হাতাবিহীন কিংবা হোল্টার গলার ব্লাউজ। আর সাজসজ্জার অনুষঙ্গ হিসেবে থাকত সুরমা, গাঢ় রঙের লিপস্টিক আর চিকন ভ্রূ। এ সময়ে শাড়ির সঙ্গে মিল করে কেশবিন্যাস নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। অনেকে পছন্দ করেছেন রেখার মতো চুলকে লম্বা করে ছেড়ে দিতে আবার কেউবা অভিনেত্রী ফারাহ ফসেটের মতো ঢেউ খেলানো চুলই পছন্দ করেছেন।
নব্বইয়ের দশক
এ দশকে এসে মনে হলো বাংলাদেশ ফ্যাশন ডিস্কোর অনেক গ্ল্যামার এবং চাকচিক্য দেখেছে। এবার নিজের স্বরূপ চেনার সময় এসেছে। ব্লক প্রিন্ট, নকশিকাঁথা, জামদানী, এবং টাঙ্গাইল সিল্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশী নারীদের কাছে। পাশাপাশি মিরপুর কাতান শাড়িও বিয়ের শাড়ি হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ যেন নিজের হারানো ঐতিহ্যকেই পুনঃআবিস্কার। বিখ্যাত মসলিনের সঙ্গে প্রাচীন বাংলার কাপড় বুননের রীতির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে এই জামদানি। জামদানির নকশা মূলত জ্যামিতিক। এতে লতাপাতা এবং ফুলের উপস্থিতি থাকে পূর্ণমাত্রায়। বলা হয়ে থাকে এই ধারা এসেছে ইরানী এবং মোগলদের কাছ থেকে। সাধারণত অভিজাতরাই এ শাড়ি পরে থাকতো।

২০০০ ও অতঃপর
বিশ্বায়ন আমাদেরকে একে অপরের কাছে নিয়ে এসেছে। কাছে নিয়েছে এসেছে সংস্কৃতি এবং মানুষদেরকে, আগে যা কল্পনাও করা যায়নি। উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে আজকের ফ্যাশন হচ্ছে বিভিন্ন উপাদানে প্রস্তুত এক নতুন ধারা। এমন কি হলিউড এবং বলিউড একে অপরের স্টাইল গ্রহণ করছে। সম্প্রতি বলিউডে শাড়ি থেকে ব্লাউজকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। আর বাংলাদেশ এই পূর্ব পশ্চিমের মিশ্রিত রূপই গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন এখন জামদানিতে এমব্রয়ডরি হাতে করা রং স্লিক ও
মসলিন Source: Kaler Kontho

লালনের দর্শন

3 comments
লিখেছেনঃ মোমেন
চৈতে-নিত্যে-অদ্বৈ এই তিন পাগলের ভাবশিস্য বাউল ধর্মের শিরোমনি সিদ্ধপুরুষ ফকির লালন শাহবাঙালির ধর্ম প্রচারক কলিকালের অবতার চৈতন্য।জাত-পাতের যাঁতাকলে পিষ্ট দরিদ্র মানুষের গৌরাঙ্গ-জাতহীন। নারী পুরুষ এক দেহে ধারণ করে আবির্ভূত।সিদ্ধপুরুষ লালন বাংলা ও এর বাইরে থেকে আসা সমস্ত মতবাদ আত্তীকরণের সর্বোচ্চ বঙ্গীয় প্রকাশ।'রবি ঠাকুরকে কিছুটা আধুনিককালের লালন বলা যেতে পারে'।

আমার লালনকে জানার ক্ষুদ্র চেষ্টার প্রথম কিস্তি।
FileServe
সমগ্র সিন্দ্ধু ও গাঙ্গেয় উপত্যকা তথা ভারতবর্ষ হাজার হাজার বছর ধরে ধারণ করছে অসংখ্য মানবের জীবন।নৃতাত্বিকভাবে জন্ম হয়েছে অনেক ভাষা, সংস্কৃতি বা এর বিশেষ রূপ ধর্ম।শত শত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের হাজারো রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-অর্চনার যে সনাতনী সংস্কৃতি তাই পরবর্তিতে হিন্দু ধর্ম নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।পারসিয়ান ও আরবীয়রা মশলার ব্যবসাসূত্রে ভারতের সাথে পরিচিত হয়। এবং সিন্দ্ধু অঞ্চলের মানুষদেরকে সিন্দ্ধ্ বা ইন্দু (Indus Valley) বা হিন্দু বলে তারা অভিহিত করে ফলশ্রুতিতে তাবত দুনিয়ার মানুষের কাছে ভারতীয়রা হিন্দু ও তাদের সংস্কৃতি বা ধর্ম হিন্দু ধর্ম নাম লাভ করে বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মত। বহুবিধ তণ্ত্র-মণ্ত্র- ডাক-যোগ দর্শনের প্রকাশ্য ও গোপন চর্চা অথবা কপিল, বৃহস্পতিদের বস্তুবাদী চার্বাক দর্শনের অভূতপূর্ব ভূমি ইন্ডিয়া। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় বা দার্শনিক সম্প্রদায়ের সহ অবস্থানের ফলে জীবনাচরনের মিলন (fusion), ভিন্নতা (fission), ধর্মের ক্রমবিকাশ, নতুন নতুন ধর্মের আবির্ভাবে ভারত যেন এক গরম তাওয়া (melting pot)।এখানে উদ্ভুত বৌদ্ধ ধর্ম পারস্য, মধ্যপ্রাচ্য আর মধ্য এশিয়া বাদ দিলে সমগ্র এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে।ভারতীয় ধর্ম বিস্তারিত (diffusion) হয়েছে অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা ছাড়া ধর্মের অনুপ্রবেশ আর সেমেটিক(Semitic) ধর্মসমূহ প্রবাহিত (current/tide) হয়েছে অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা ও ধর্ম অনুপ্রবেশ করেছে যুগপৎভাবে।দার্শনিক এই অবস্থানের কারণেই হয়তো ভারতীয়রা উপনিবেশ গড়ে তুলে নি কখনো কিন্তু উপনিবশিত হয়েছে বার বার।উপনিবেশকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মোগল আর ইংরেজরা।

সপ্তম শতকের তিরিশের দশকে মক্কা জয়ের পর আরবরা ইসলামের দর্শন হাতে নিয়ে দিগ্বিজয়ে বের হয় এবং ইসলাম ধর্ম প্রবাহিত হয়ে পশ্চিম দিকে মরোক্ক পর্যন্ত পুরানো সকল সংস্কৃতি খোলনলচে পালটে ফেলে এমন কী মুখের ভাষা পর্যন্ত প্রতিস্থাপিত করে কায়েম করে আরব বিশ্ব।এ প্রবাহের অতিরিক্ত সংযোজন স্পেন, এরপর ফ্রান্সের গলে গিয়ে ক্ষান্ত হয় আরবদের পশ্চিমমূখী যাত্রা। পূর্ব প্রবাহ ব্যাপকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয় পারস্যে।পারসিক সংস্কৃতির কাছে মুষড়ে পড়ে আরব সংস্কৃতি।ইরানে ইসলাম রূপান্তরিত হয়। ইরানের পার্শ্বে বাগদাদ দীর্ঘ দিন ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।আব্বাসীয়রা মুতাজিলাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ইসলামে যৌক্তিকভাবে আল্লার উপস্থিতি প্রমাণে প্রভাব বিস্তারকারী মুতাজিলারা ব্যর্থ হলে প্রভাব বিস্তার করে সূফীজম।যার উর্বর ভূমি হলো পারস্য বা ইরান।

সপ্তম শতক থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ শতকে এসে মুসলমানরা মোটামুটি পুরো ভারতবর্ষ দখল করে।কিন্তু ততোদিনে ইরানে দেয়ালে ধাক্কা খাওয়া ইসলাম অনেকটা ভিন্নরূপে যা কীনা প্রধানত ইরানের সূফীদের দ্বারা প্রচারিত হয় ভারতে।মোহাম্মদ ও খোলেফায়ে রাশেদীনের পরে যে নামগুলেো শুনা যায় তা হলো-বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী, খাজা বাবা মইনূদ্দীন চিশতী, বাবা ফরীদ, নিজাম উদ্দীন আউলিয়া, শাহ জালাল ইত্যাদি যারা সকলেই সূফী।পারস্য আর মধ্য এশিয়া থেকে ঝাকে ঝাকে পীর-আউলিয়ারা ভারতে ধর্ম প্রচার করে যাকে বলা যায় ইসলামের বিস্তার(diffusion)।
মরমি কবি ফকির লালনকে জানার চেষ্টার প্রারম্ভে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত ব-দ্বীপের অনিশ্চিত কৃষিভিত্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন এবং সনাতনী তথা হিন্দু , বৌদ্ধ এবং ইসলাম এই তিন ধর্মের মিথষ্ক্রিয়ার মানস জগৎ বিবেচনায় রাখা দরকার। হিন্দু ধর্মজাত বৈষ্ণব ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্মের সহজিয়া মতবাদ, ইসলামের সূফী মতবাদ বাংলায় যা মূলত মারেফত বা মাইজভাণ্ডারী নামে পরিচিত- এই তিন মূল ধারার মিলনের ফলে উদ্ভূত বাংলার ধর্ম হলো বাউল ধর্ম।
বাউল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়।বাউলদের ধর্মের তত্ত্ব ও দর্শন আছে, সাধন পদ্ধতি আছে, সাধক জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা আছে, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে তাদের একটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে, এ সমস্তই ব্যক্ত হয়েছে তাদের গানে।এই সম্প্রদা্য়ের সাধকগণের তত্ত্ব দর্শন ও সাধনা সংবলিত গানই বাউল গান।
রূপ থেকে স্বরূপে ওঠাই বাংলার বাউলদের সাধনা।

কীভাবে পুরূষ-প্রকৃতি ( জীবাত্মা-পরমাত্মা/ নারী-পুরুষ) বিভক্ত হ'ল এবং কীভাবে দুই দেশে না থেকে একত্রে রইল। পদ্ম কোথায় প্রস্ফুটিত হয়, পদ্ম পুস্পের রসে কীভাবে সাধন হয় এবং সহস্রদল হতে রজঃস্রোতের সঙ্গে রসরাজ লীলা করতে করতে অগ্রসর হয়ে তিন দিন তিন রূপ ধারণ করে শেষে সহজ মানুষ রূপে আত্মপ্রকাশ করেন।তারপর প্রকৃতি-পুরুষের শৃঙ্গার দ্বারা উর্ধ্বগত হয়ে স্বস্থানে যেয়ে যুগল হয়ে নিত্যরস লীলা আস্বাদন করেন- বাউল সাধনার মূলভাবটি মোটামুটি এর মধ্যে ব্যক্ত। এর থেকে বোঝা যায় বা্উল সাধনা নারী-পুরুষের যৌথ সাধন পদ্ধতি।
অদ্বৈতাচার্য ও নিত্যানন্দ প্রকৃতি- পুরুষ-মিলন-ঘটিত ধর্মসাধনার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্রের সময় হতে বাউলরা সম্প্রদায় হিসেবে প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গুরু পরম্পরায় ব্যাপ্ত হয় সারা বাংলায়।
বাউল সাধনার তিন স্তর
প্রবর্ত-- ভগবানের নিকট দৈন্য ও গুরুর করুণা প্রার্থনা।
সাধক-- দেহতত্ত্ব, মনের মানুষ, সাধনার স্বরূপের জ্ঞান লাভ।
সিদ্ধ--সাধনার পূর্ণতার স্বরূপ।
ফকির লালন ছিলেন সিদ্ধপুরুষ। বিশাখা লালনের সাধিকা।

লালন তথা বাউলদের যৌন সাধন।
বাঙালির কাছে যৌনতা বিষয়টি অনেক বড় ট্যাবু।নিয়মিত যৌন কাজে লিপ্ত হবে কিন্তু মুখে বলবেনা। চিন্তা করুন লালনের জীবন কাল আঠার শতকের শেষের দিক থেকে উনিশ শতক, সমগ্র ভারত বৃটিশদের দখলে। তথাকথিত মুসলমানদের (মোঘল) হাত থেকে নাছারারা ক্ষমতা দখল করেছে, মুসলমানরা জাত যাওয়ার ভয়ে শিক্ষা-দীক্ষা বাদ দিয়ে না বুঝে কোরান মুখস্ত করে জাত রক্ষায় ব্যস্ত।হিন্দুরা জাত-পাতের ঘেরাটোপ আর ইংরেজি শব্দ মুখস্ত করে অফিসের কেরানী বা বাবুগিরির মধ্যে ঘোড়পাক খাচ্ছে।

এমন সমাজে সম্পুর্ণ ভিন্ন স্কুল হল বাউলদের।

আধ্যাত্বিকতার চর্চায় মানবদেহকে ঈশ্বরের আবাস (বারামখানা) মনে করে বলে লালন/বাউলরা দেহ্তত্ত্বে (Physiology) ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করে। লালনের গানের বিশাল অংশ জুড়ে দেহতত্ত্বের গান।দেহ থেকে দেহে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঈশ্বরের ধারাবাহিকতায় সঙ্গম বা নারী-পুরুষের মিলন বাউলদের সাধনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।ডঃ উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতে-''কীভাবে পুরূষ-প্রকৃতি ( জীবাত্মা-পরমাত্মা/ নারী-পুরুষ) বিভক্ত হ'ল এবং কীভাবে দুই দেশে না থেকে একত্রে রইল। পদ্ম কোথায় প্রস্ফুটিত হয়, পদ্ম পুস্পের রসে কীভাবে সাধন হয় এবং সহস্রদল হতে রজঃস্রোতের সঙ্গে রসরাজ লীলা করতে করতে অগ্রসর হয়ে তিন দিন তিন রূপ ধারণ করে শেষে 'সহজ মানুষ' রূপে আত্মপ্রকাশ করেন।তারপর প্রকৃতি-পুরুষের শৃঙ্গার দ্বারা উর্ধ্বগত হয়ে স্বস্থানে যেয়ে যুগল হয়ে নিত্যরস লীলা আস্বাদন করেন- বাউল সাধনার মূলভাবটি মোটামুটি এর মধ্যে ব্যক্ত।" এর থেকে বোঝা যায় বাউল সাধনা নারী-পুরুষের যৌথ সাধন পদ্ধতি।

যে কথা বলছিলাম লালনের সময়কালে বা তার আগে পরে বাউলরা সবসময় নিজেদের সাধন পদ্ধতির ব্যাপারে গোপনীয়তা রক্ষা করতো।যেহেতু তাদের আখড়ায় অনেক সাধিকা থাকতো এবং বাইরের মানুষকে তারা নিজেদের জীবনাচরণ বলতোনা ফলে সহজেই নানারকম কুৎসা রটনা করেতে পেরেছে নিন্দুকেরা। আবদ্ধ সমাজে যৌনতা বিষয়ে গুজব ছড়ানো খুবই সহজ।আর বিশাল এই সম্প্রদায়ের কোথাও কোথাও নাকি বিপথগামী কিছু বাউল আখড়ার পাশে পতিতালয় গড়ে নিতো। এটি মূল ধারা নয়।
এবার আসা যাক সোজা কথায় তাদের সাধনা কী? লালনের গানে প্রায়ই শোনা যায় 'সহজ মানুষ' বা 'অটল রূপ' 'মনের মানুষ' 'অচিন পাখি' বা আলেকজনা এর দ্বারা কী বুঝায়? খুব সহজ ভাবে বললে এর দ্বারা গুরু, মুর্শিদ, রাসুল, আদম, ভগবান, আল্লা, ঈশ্বর ইত্যাদিকে বুঝায়। কিন্তু লালন ঈশ্বরের সর্বোচ্চ রূপ মানবদেহের প্রানের ধারার সাথে কীভাবে মিশে থাকে সে রহস্য উৎঘাটনে সচেষ্ট ছিলেন। লালন তথা বাউলদের এ লক্ষ্যে সাধন পদ্ধতির সম্পর্কে যৎসামান্য জানা যায় তা হলোঃ

পুরুষের বীজ আর নারীর রজঃ মিলিত হয়ে মানবের জন্ম।আর এই দু'য়ের উৎপত্তি সঙ্গমকালে।যৌন উত্তেজনার চুড়ান্ত পর্যায়ে (Orgasm) সহজ মানুষ বা ঈশ্বরের অটলরূপ উপস্থিত হয়। বাউলরা এই স্তরে পৌঁছে স্থির থেকে সাধন করতে চায়।কাম নদীর নিন্মমূখী ধারাকে ঊর্ধমূখী করে যারা দীর্ঘক্ষণ ধরে অরগাজমে থেকে সহজ মানুষ সাধন করতে পারে তারা হলো সিদ্ধ পুরুষ।ফকির লালন একজন সিদ্ধপুরুষ।এবার দেখি লালন তার গানে কী বলছে

আমি কী সন্ধানে যাই সেখানে
মনের মানুষ যেখানে।
আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি
দিবা রাতি নাই সেখানে।

যেতে পথে কাম নদীতে
পারি দিতে ত্রিবিণে (ত্রিবেণী)
কত ধনীর ধারা যাচ্ছে মারা
পইড়ে নদীর তোড় তুফানে।

রসিক যারা চতুর তারা
তারাই নদীর ধারা চিনে
উজান তরী যাচ্ছে বেয়ে
তারাই স্বরূপ সাধন জানে।

লালন বলে মইলাম জ্বলে
মইলাম আমি নিশি দিনে
আমি মনিহারা ফণির মতো
হারা হলাম পিতৃধনে।
এমন অসংখ্য গানে গানে লালন বা বাংলার অন্যান্য বাউলরা নিজেদের প্রেম,কাম, সাধনের কথা বলে গেছেন। রূপ (ঈশ্বর বা পরমাত্মা) থেকে স্বরূপে (মানব ও ঈশ্বর লীন) ওঠাই বাংলার বাউলদের সাধনা।
আমি আগের কিস্তিতে বলেছিলাম গুরু রবি ঠাকুর আধুনিক কালের বাউল। তার গানে গানে কবিতায় কবিতায় আধ্যাত্বিকতার সরব উপস্থিতি।সোনার তরীর হিং টিং ছট কবিতায় রাজা হবুচন্দ্র ভূপের স্বপ্নের খোয়াব নামায় দেখুন।গৌড়ের তথা বাংলার গুরুমারা চেলার উলট-পালট তাফসির-

‘ নিতান্ত সরল অর্থ , অতি পরিষ্কার ,
বহু পুরাতন ভাব , নব আবিষ্কার ।
ত্র্যম্বকের ত্রিনয়ন ত্রিকাল ত্রিগুণ
শক্তিভেদে ব্যক্তিভেদ দ্বিগুণ বিগুণ ।
বিবর্তন আবর্তন সম্বর্তন আদি
জীবশক্তি শিবশক্তি করে বিসম্বদী ।
আকর্ষণ বিকর্ষণ পুরুষ প্রকৃতি
আণব চৌম্বকবলে আকৃতি বিকৃতি ।
কুশাগ্রে প্রবহমান জীবাত্মবিদ্যুৎ
ধারণা পরমা শক্তি সেথায় উদ্ভূত ।
ত্রয়ী শক্তি ত্রিস্বরূপে প্রপজ্ঞে প্রকট —
সংক্ষেপে বলিতে গেলে , হিং টিং ছট্‌ । '
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
তাহে এক পাগলা ব্যটা বসে একা একেশ্বরে--লালন (৩য় পর্ব)
ছোটবেলা থেকে শুনতাম আল্লা থাকে সাত আসমানের উপরে।মনে করতাম আমরা তো এক আসমান দেখি তার উপরে বুঝি বাকীগুলো।বিজ্ঞানের হাতেখড়িতেই গ্রহ নক্ষত্র ইত্যাদি পড়ে সব কিছু কেমন যেন হয়ে গেলো।হিসেব মেলে না। ছোট বেলাতেই গ্রামের লোকজনের মুখে শুনেছি 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়... আট কুঠুরী নয় দরজা...।' কার গান কি বলছে কিছুই বুঝতাম না।কাউকে জিজ্ঞেস করলে আমাদের দেহে আত্মার যাওয়া আসা পর্যন্ত উত্তর মিলতো।কিন্তু কোথায় আট কুঠুরী নয় দরজা বা সাত আসমান?
বাউলদের সম্পর্কে জানা খুবই কঠিন কাজ। বলা হয়ে থাকে 'শম্ভুকের মতো আত্মসংকোচনশীল, আত্মগোপনশীল জীবন যাত্রার রীতি এই বাউলদের'। বাউলরা তাদের আধ্যাত্বিকতায় ব্যবহার করেছে ভারত পারস্য ও আরবের মিথ।ভারত হলো মিথের মক্কা।ফলে ধর্মের তত্ত্ব ও মিথের সহযোগিতায় তাদের সম্পর্কে কিছু ধারণা করা যেতে পারে।

লালনের খুবই পরিচিত একটি গানের কথায় আসা যাক--
ধন্য ধন্য বলি তারে
বেঁধেছে এমনও ঘর শুন্যের উপর
আ মরি শুন্যের উপর পোস্তা করে
ধন্য ধন্য বলি তারে।
খুব সুন্দর বুঝা যাচ্ছে ঈশ্বর তার বারামখানা এই মানব দেহ শক্ত করে তৈরী করেছে। কিন্তু কোথায়? শুন্যের উপর। শুন্য কী? বিজ্ঞানে এর কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। যে কোন কিছুকে আমরা আপেক্ষিকভাবে শুন্য ধরতে পারি। শুন্যের জন্মভূমি ভারত।বুদ্ধের মূল দর্শনই হলো শুন্যবাদ।নাগার্জুন শুন্য সম্পর্কে বলেছেন " অস্তি-নাস্তি-তদুভয়ানুভয়চতুষ্কোটি বিনির্মুক্তং শুন্যরূপম"। সহজ ভাবে বললে দাঁড়ায়-
আছে যে তা নয়
নাই যে তাও নয়
আছে নাই উভয়ই তাও নয়
আছে নাই উভয়ই যে নয় তাও নয়। এই চার মুক্ত কোন কিছু হলো শুন্য।এরই উপর ঈশ্বর পোস্তা করে ঘর বেঁধেছে। তাই ফকির লালন বলছে-ধন্য ধন্য বলি তারে।

ঘরে মাত্র একটি খুঁটি
খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি
কিসে ঘর রবে খাড়ি
ঝড়ি-তুফান এলে পড়ে।

ঘরের একটি খুটি বলতে কী বুঝায়? প্রাণিবিজ্ঞানে পড়েছি সমস্ত প্রানিজগতকে মোটা দাগে দুভাগে ভাগ করা যায় মেরুদণ্ডী অমেরুদণ্ডী।এই মেরুদণ্ড প্রাণির বিবর্তনের খুবই বড় একটি ধাপ।মেরুদণ্ডের কশেরুকার ভিতর দিয়ে তিনটি স্নায়ু পেচিয়ে পেচিয়ে (কুণ্ডলী স্ত্রীবাচক কুণ্ডলিনী) মাথায় গিয়ে মিলেছে।যা ভারতীয় তান্ত্রিকদের কাছে অনেক সময় ত্রিবেণী নামেও পরিচিত।সুষুন্মা, ইড়া,পিঙ্গলা।সুষুন্মা অক্ষের মতো যাকে পেচিয়ে বাকি দুটি। ইড়া বাম শুক্রাশয় থেকে ডান নাসারন্ধ্র পর্যন্ত। শ্বেত বর্ণের শান্ত সৌম্য ও চাঁদের সাথে তুলনীয়। পিঙ্গলা (লাল) ডান শুক্রাশয় থেকে বাম নাসারন্ধ্র পর্যন্ত বর্ধিত। ইহা ভয়াবহ শক্তিশালী ও সূর্যের সাথে তুলনীয়।

ত্রিবেণীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্তরে স্তরে বিভিন্ন কুঠুরী বা পদ্ম ফুলের বর্ণনা করা হয়েছে। পদ্ম গাঙ্গেয় অঞ্চলের খুব সাধারণ ফুল এবং প্রচুর মিথ। ব্রহ্মা স্বপ্ন দেখেন তার নাভিমূল থেকে পদ্ম ফুল ফুটে। স্বরস্বতী পদ্মফুলের উপর আবির্ভূত হন। প্রাণির দেহে ফুলের সনাক্তকরণ যাদের গ্রামদেশে বাড়ী তারা সহজেই করতে পারবেন। গরু ছাগলের বাছুর হওয়ার পর লোকজন পাহাড়া থাকে যেন ফুল না খেয়ে ফেলে। গরু তৃণভোজী কিন্তু এই আমিষ জাতীয় খাদ্য সরিয়ে না ফেললে সে অবশ্যই খায়। লালন তার গানে সরাসরি ফুল শব্দটিও ব্যবহার করেছেন।
কমল কোঠা কারে বলি
কোন মোকাম তার কোথা গলি
সেইখানে পড়ে ফুলি
মধু খায় সে অলি জনা।
একমাত্র খুঁটি সুষুন্মার শুরু থেকে শেষ অবধি কুণ্ডলিনীর (ত্রিবেণী) বিভিন্ন স্তরে সাধনার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন চৈতন্য জাগ্রত করে শেষে ঈশ্বরের সাথে লীন হওয়াই দুনিয়ার সমস্ত সাধকের উদ্দেশ্য। সাধকের রূপান্তরের এই স্তর বা চক্র বা ফুল বা কুঠুরী বা আসমান উপমায় কখনও সাত কখনও আট বা নয় ধরনের স্তরের কথা বলা হয়ে থাকে। লালন ৭, ৮, ৯, সবই ব্যবহার করেছে-
দেশ দেশান্তর দৌঁড়ে কেন মরছ রে হাপিয়ে
আদি মক্কা এই মানব দেহে
দেখনারে মন ধ্যেয়ে।
মানুষ মক্কা কুদরতি কাজ
উঠেছে আজগবি আওয়াজ সাত তলা ভেদিয়ে।
আছে সিং দরজায় তারি একজন নিদ্রা ত্যাগি হয়ে
দেখনারে মন ধ্যেয়ে।
অথবা যে গানটি ধরে আলোচনা করছি তার পরের অন্তরায়-
মূলাধার কুঠুরী নয়টা
তার উপরে চিলে কোঠা
তাহে এক পাগলা ব্যটা
বসে একা একেশ্বরে।
ভারতীয় মিথে সাধনার এই স্তরসমূহকে মুলতঃ সাত চক্রেই আলোচনা করা হয়েছে। কোথাও বা উপবিভাগ করেছে আট বা নয় চক্রে।
সুষুন্মার ভিত্তি বা মূলকে বলা হয় মূলাধার চক্র।
মূলাধারের অবস্থান যৌনাঙ্গ ও পায়ু পথের মাঝে। চিত্রে বৃত্তের ভিতর চতুর্ভূজের দ্বারা বুঝানো হয়েছে পার্থিব বিষয় আশয়। হাতির পিঠের উপর নিন্মগামী ত্রিভূজ দ্বারা যোনী তথা বিশ্বমাতা, এর মাঝখানে পুরুষ প্রতীক শিবলিঙ্গ যাকে সাড়ে তিন প্যাচে জড়িয়ে সর্প দেবী কুণ্ডলিনী। এবার আসা যাক হাতির কথায়। হাতি ভারতে একটি মিথিক চরিত্র। মিথ অনুসারে 'একদা হাতি মেঘের মতো রূপ পরিবর্তন করতে পারতো, উড়তে পারতো।একদিন সে উড়ে গিয়ে বসলো এক ডালে। ঐ গাছের নীচে এক সাধু তার শিস্যদের পড়াচ্ছিলেন।এমন সময় ডাল ভেঙ্গে কয়েকজন শিস্য মারা গেল আর হাতি সুন্দর উড়ে গিয়ে বসলো অন্য ডালে। সাধু সাথে সাথে রেগে গিয়ে সমস্ত হাতি জাতিকে অভিশাপ দিলেন। হাতি তার রূপ পরিবর্তন ও উড়ার ক্ষমতা হারালো। এর পর থেকে হাতি পৃথিবীতে হেঁটে চলা একখণ্ড অভিশপ্ত মেঘ।' হাতির এই সিম্বল থেকে বুঝা যায় শর্তমুক্ত হলে সহজেই পৌঁচা যায় পরবর্তি কুঠুরীতে। মূলাধার স্তর সাধকদের কাছে খুবই স্থুল পর্যায়। এর দ্বারা পরিচালিত মানুষজন সক্রিয় নয়।
পরের চক্র স্বধিস্থান(Svadisthana) ।
এটি কুণ্ডলিনীর বিশেষ আবাস।শরীরের যৌনাঙ্গ বরাবর এর অবস্থান। এই চক্রে কুণ্ডলিনী জাগ্রত হলে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয় সেক্স। চিত্রে পানির অসুর মকর এর প্রধান উপাদান। ফ্রয়েড জীবনের এই চক্রের আলোচনা করেছেন ভালোভাবে। ভারতীয় সাধকেরা এই কুঠুরী উত্তরণের ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত। একটি ধারা কামকে হ্যা বলেছে অন্যটি না। বাউলরা প্রথমটি।
৩য় তলা হলো মনিপুর-
নাভির লেভেলে এর অবস্থান। মানুষের ভোগবাদীতা,দখল মনোবৃত্তি ইত্যাদির প্রকাশ এখানে। বর্তমান পশ্চিমা জগতের জীবনে এই চক্রের প্রাধান্য।
উল্লেখিত চক্রসমূহ সাদামাঠা। যারা এর মধ্যে জীবন যাপন করে তাদের জাগতিক চাওয়া পাওয়াই নির্ধারণ করে জীবনের সুখ-দুঃখ।এরা নিষক্রিয় বা প্রতিক্রিয়াশীল। গুরু ঠাকুর বলেছেন 'পনের আনা মানুষ আসে খায় সন্তান উৎপাদন করে মারা যায়।'
পরবর্তি চক্র সমূহ উঁচু স্তরের।অনেকটা শরিয়ত-মারিফতের পার্থক্যের মতো। দান্তের মতে নতুন জীবনের শুরু।
চক্র চারঃ অনাহত(Anahata)
হৃদপিণ্ডের বরাবর এই পদ্ম। অনাহত মানেই আঘাত হীন।আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতা হলো আঘাত ছারা শব্দ অসম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানের Big Bang আল্লার কুন বা ভারতের ওঁম এই সব শব্দ আমাদের চেনা বস্তুর আগে। সাধকেরা চিরন্তন সেই আঘাতহীন শব্দ শোনার সাধনা করে। রাবেয়া বসরী বলেছেন নৈশব্দই সেরা ইবাদত। তিনি নদীর পারে বসে এই ইবাদতই করতেন।অনাহত শব্দ শুনার পরে পরবর্তি কুঠুরীতে গমন।
চক্র পাঁচ বিশুদ্ধ ( Vishuddha)
এর অবস্থান গলায়। কুণ্ডলিনী যখন এই তলে পৌঁছা্য় তখন সাধকের সাথে ঈশ্বরের কথাপকথোন হয়। চিত্রে নিন্মমূখী ত্রিভূজের ভিতর পূর্ণ বৃত্ত হলো পূর্ণ চন্দ্র। লালন তার বহু গানে বলেছে এই চাঁদের কথা। এখানকার দেবতা হলো অর্ধনরেশ্বর শিব। সাধকেরা দেখতে পান পারে যাওয়ার তরী।
লালন অসংখ্য গান লিখেছে পারাপার তত্ত্বের। চির মুক্তি লাভের এই যাত্রা খুবই বিপদ সংকুল। ঠিক সেই ফুলসেরাতের পুলের বর্ণনা।ওপারে আছে চির যৌবন অনন্ত ভূমি এক কথায় স্বর্গ।
সিদ্ধ পুরুষ হতে আর দু চক্র বাকী।
অহনা(Ajna) ষষ্ঠ চক্র
দুই ভ্রুর মাঝে উপরে মেয়েরা যেখানে টিপ পড়ে সেখানে এই চক্রের অবস্থান। সূফীদের ফানা ফিল্লা্হ বা ঈশ্বরের সাক্ষাৎ বা দিদার। রামকৃষ্ণের বর্ণনায় এ স্তরে কিছুটা আমি বা (Ego) থেকে যায়। তিনি বলেন এ যেন ঠিক কাঁচে ঘেরা বাতি। সবই দেখা যায় তবু থেকে যায় বাঁধা। মোহাম্মদের মিরাজে আল্লা ও তার মাঝে একটি পর্দা ছিল।
সহস্র( Sahasrara) ৭ম চক্র
এই স্তর হলো বাকা বিল্লাহ।ইউসুফ হাল্লাজের 'আয়নাল হক' বা আমিই সত্য। রামকৃষ্ণের বর্ণনায় কোন ধরণের বাঁধার অস্তিত্ত্ব নেই। শুধুই আলোর ঝলকানী। লালনের মতে দিবা রাতি নাই সেখানে। লালনের গানে দেখুন সহস্রের কথা
যে রূপে সাঁই বিরাজ করে দেহ ভূবনে
গুরুর দয়া যারে হয় সেই জানে।
শহরে সহস্র পারা তিনটি পদ্মার এক মহেরা
আলেক ছোঁয়ার পবন খোড়া ফিরছে সেখানে।
গুরুর দয়া যারে হয় সেই জানে।
সহস্রের উপরে চিলে কোঠায়ই পাগলা ব্যাটা থাকেন। এর পর লালন বলে-
উপর নীচে সারি সারি
সাড়ে নয় দরজা তারি
লালন কয় যতে পারি
কোন দরজা খুলে ঘরে।
সাড়ে নয় দরজা বলতে দুই চোখ, দুই কান, দুই নাক, মুখ, যৌনাঙ্গ, পায়ু। যৌনাঙ্গে নারীর দুই দরজা পুরুষের একটা গড়ে সাড়ে নয়।
ধন্য ধন্য বলি তারে
বেঁধেছে এমনও ঘর শুন্যের উপর
আ মরি শুন্যের উপর পোস্তা করে
ধন্য ধন্য বলি তারে।