Wednesday, March 30, 2011

নাৎসি পার্টি

0 comments
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পরাজিত-বেদনাহত-ক্লান্ত জার্মানি মুখথুবড়ে পড়ে আছে। সম্মুখযুদ্ধে জার্মানরা পরাজিত হয়নি। জার্মানির পরাজয়ের কারণ ঘরের শত্রু বিভীষণ। আর সেই বিভীষণের দল হলো ইহুদি সম্প্রদায়। তার সঙ্গে আছে বুলিসর্বস্ব কিছু মার্কসবাদী। তারা পেছন থেকে দেশকে ছুরি মেরেছে। সুতরাং দেশকে দাঁড় করাতে হলে সবার আগে তাদের সমূলে উৎপাটন করা দরকার_ এমন ধারণা নিয়েই ১৯২০ সালে জার্মান ইতিহাসে আবির্ভূত হয় একটি দল, যার নাম 'ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি'। বাংলায় অর্থ দাঁড়ায় 'নাৎসি পার্টি'। এডলফ হিটলার ছিলেন দলটির প্রধান। নাৎসি পার্টির উত্থানে যেমন ছিল চমক এর পতনেও বিস্ময়ের কমতি ছিল না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের চরম লাঞ্ছনা মিলল ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে। রাজনৈতিক গুপ্তহত্যা, অর্থনৈতিক দুর্যোগ, সব মিলিয়ে জার্মানিতে তখন বিরাজ করছিল চরম অরাজক অবস্থা। ১৯১৯ সালে ন্যাশনাল জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি নামে একটি দলের উত্থান ঘটল গুপ্তভাবে। হিটলার তখন যুদ্ধফেরত সামান্য এক জার্মান সৈনিক। সদ্যগঠিত ওয়ার্কার্স পার্টির একটি টিমটিমে মোমবাতির মতো তার ক্ষীণ আলো বিকিরণ করছে। মাত্র সাড়ে সাত মার্ক দলের মূলধন। এই দলে ভিড়ে গেলেন হিটলার। দলীয় সম্পৃক্ততা তাকে এনে দিল কার্যকরী সভার সাত নম্বর সদস্যপদ। আস্তে আস্তে দলের সব কর্তাব্যক্তির ওপর হিটলারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করল। হিটলারের নিত্যনতুন উদ্ভাবনী শক্তিতে মরচে ধরা মানুষগুলো যেন গতিশক্তি ফিরে পান। ১৯২০ সালে হিটলারের উদ্যোগে দলের নাম সামান্য পরিবর্তন করে রাখা হলো, 'ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি' বা 'নাৎসি পার্টি'। ১৯২১ সালে দলের চেয়ারম্যান হলেন হিটলার। অগি্নময় ভাষায় বক্তৃতা আর মৌলিক পরিকল্পনার সাহায্যে জনসাধারণের এক বিরাট অংশের কাছে পেঁৗছে গেলেন হিটলার। এদিকে জেলখাটা খুনি, মদ্যপ, জুয়াড়ি আর লম্পটদের নিয়ে গঠিত হলো নাৎসি দলের ঝটিকা বাহিনী। অন্য রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ পণ্ড করা আর রাজনৈতিক গুপ্তহত্যাই ছিল এ বাহিনীর প্রধান কাজ। ১৯২৩ সালে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি বাহিনী 'বিয়ার হল ক্যু' পরিচালনা করে। কিন্তু ক্যু ব্যর্থ হলে হিটলারের ঠাঁই হলো জেলে। ৯ মাস জেল খেটে প্যারোলে ছাড়া পেলেন। জেলে বসে হিটলার লিখেন তার বিখ্যাত বই 'মাই ক্যাম্প'। এ সময় নাৎসি বাহিনীতে বিরাজ করছিল চূড়ান্ত সাংগঠনিক দুর্বলতা।

১৯২৮ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে নাৎসি দল ৪৯১টি আসনের মধ্যে মাত্র ১২টি আসন লাভ করে। ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর নির্বাচিত হলেও পার্লামেন্টে নাৎসি দলের আধিপত্য ছিল না। ১১টির মধ্যে মাত্র ৩টি মন্ত্রণালয় পেল নাৎসিরা, তাও আবার একটি দফতরবিহীন মন্ত্রী। একবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে নাৎসিরা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে থাকে। রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী গঠনের নামে প্রায় ২০ হাজার নাৎসি সদস্য ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনীতে। পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের জন্য আরেকটি চূড়ান্ত নির্বাচন দরকার। সব শক্তি নিয়ে নাৎসিরা নেমে পড়ল ভোটযুদ্ধে। তৃতীয় রাইখ সরকার গঠনের প্রাক্কালে 'ল অব ইনাবলিং' পাস করিয়ে হিটলার অর্জন করেন চরম ক্ষমতা। নাৎসি ব্যতীত জার্মানির অন্যসব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হলো। 'হেইল হিটলার! হেইল হিটলার!' রবে অভিনন্দিত করা হলো বর্বর রক্তপিপাসু হিটলারকে।

প্রেসিডেন্ট হিন্দেনবার্গের মৃত্যুর এক ঘণ্টার মধ্যে হিটলার প্রেসিডেন্টের সর্বময় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিলেন। হেইল হিটলার হলেন জার্মানির সর্বেসর্বা। 'এক দেশ, এক জাতি, এক নেতা!' নাৎসিদের এ স্লোগানকে ধারণ করে হিটলার হয়ে উঠলেন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন স্বৈরশাসক। ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরাজয়ের পর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বৈরশাসকও চিরবিদায় নিল। হিটলারকে ছাড়া অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলল নাৎসি পার্টি। পরবর্তীতে সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা হলেও ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট তাকে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯২০ সালে যে ধূমকেতুটি জার্মান আকাশে আবির্ভূত হয়েছিল, ১৯৪৫ সালে সেটি ঝরে পড়ল ধূমকেতুর গতিতেই। শুধু এই দুরন্ত কাহিনী বুকে ধরে রয়ে গেল মহাকাল, ইতিহাস।

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

Tuesday, March 29, 2011

মেরুদণ্ডে ব্যথা

0 comments
ব্যাক পেইন বা মেরুদণ্ডে ব্যথা কথাটি অনেকের মুখ থেকে প্রায়ই শোনা যায়। বলে, বেশিক্ষণ চেয়ারে বসে থাকার কারণে সোজা হয়ে দাঁড়ানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। সত্যি, মেরুদণ্ডে ব্যথা মানে পুরো শরীরই অকেজো। কারণ সোজা হয়ে বসতে বা দাঁড়াতে না পারলে কাজকর্ম করা মোটেও সম্ভব নয়। এক গবেষণা থেকে জানা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা আশি ভাগ মানুষই কোনো না কোনোভাবে মেরুদণ্ডের ব্যথায় আক্রান্ত। শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ দেশের মানুষই কমবেশি এ রোগে আক্রান্ত। হয়ত অনেকেই ধরে নিয়েছেন, এ রোগের বুঝি কোনো ওষুধ নেই। হ্যাঁ, আছে। তবে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি সেবনীয় ওষুধের চেয়ে খুব দ্রুত যে ওষুধে এ রোগ থেকে মুক্তি লাভ করা যায় তা হলো ব্যায়াম। কেউ যদি নিয়মিত সকাল-বিকাল নিয়ম মতো ওঠবস করে, হাঁটা-চলাফেরা করে কিংবা দৌড়ায়, তবে দ্রুতই রোগটি থেকে আরোগ্য লাভ করা যায়। ব্যায়াম করলে শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করে। এর ফলে বুক এবং উদরের মধ্যবর্তী মাংসপেশি স্বাভাবিক থাকে; মেরুদণ্ডের স্তম্ভগুলোও স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। চিকিৎসকদের মতে, মেরুদণ্ডের ব্যথা নিরাময়ে এটিই সবচেয়ে ভালো দাওয়াই। কাজও করে ভালো।

-আশরাফুল আলম মিলন

তামান সাফারি পার্ক, ইন্দোনেশিয়া

0 comments
সাফারি শব্দটি শুনলেই মনে হয় নিসর্গ আর প্রাণবৈচিত্র্যের সমাহার। যেখানে প্রাণীদের অবাধ বিচরণ। অন্যদিকে দর্শনার্থীরা বন্দি। ইন্দোনেশিয়ার তামান সাফারি পার্ক এর ব্যতিক্রম নয়। সেখান থেকে ঘুরে এসে লিখেছেন আবু তাহের

জাকার্তা সফরের স্থানীয় গাইড বড় ভাই শামসুল আলম যখন ঘোষণা দিলেন, আজকে আমরা 'তামান সাফারি' দেখতে যাচ্ছি। আঁতকে উঠে তীব্র প্রতিবাদ জানালাম, সুদূর ইন্দোনেশিয়ায় এসেও হাতি, বাঘ, সিংহ দেখতে যাব? আমার কাছে সাফারি মানেই বন্যপ্রাণী দেখা। তাছাড়া দেশের একমাত্র সাফারি পার্ক দেখেছি। কক্সবাজারের ডুলাহাজারায় অবস্থিত এ সাফারি পার্কে খাঁচাবন্দি বেশকিছু বন্যপ্রাণী রয়েছে। তা বেশ কয়েকবারই দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। এরপরও জাকার্তা শহরে এসে ফের সাফারি দেখার কোনো মানে হয় না। আরও অনেক কিছু দেখার রয়েছে এ শহরে। তিনি জানালেন, তামান সাফারি না দেখলে ভ্রমণের স্বাদই অপূর্ণ থেকে যাবে। তার এ কথায় রাজি হতেই হলো।
সকালে যাত্রা শুরু করলাম 'তামান সাফারি'র উদ্দেশে। জাকার্তা শহর থেকে ৭৮ কিলোমিটার দূরে। বোগর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার। গাড়িতে মাত্র ২ ঘণ্টার পথ। বোগর শহর পার হওয়ার পর পাহাড়ি উঁচু ভূমি। হাইওয়ের দু'পাশে পর্যটকদের জন্য সারি সারি হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস। রয়েছে অসংখ্য রেস্তোরাঁ, কেনাকাটার জন্য বিভিন্ন পণ্যের সমাহার নিয়ে দোকান। রকমারি স্যুভেনির এবং হাতে তৈরি পণ্য নিয়ে সড়কের দু'পাশে পর্যটকদের জন্য পসরা সাজিয়ে বসেছে স্থানীয় আদিবাসী নারী-পুরুষ। রয়েছে কাঠ, বেত ও বাঁশের তৈরি হ্যান্ডিক্রাফট, পোশাক আরও কত কী। এখানে পর্যটকদের কেনাকাটার জন্য বিদেশি কোনো পণ্য নেই। স্থানীয় লোকজন তাদের তৈরি করা পণ্য নিয়ে পসরা বসিয়েছে দীর্ঘ সড়কের দু'পাশ ধরে। হতবাক হলাম ইন্দোনেশিয়ার এ পাহাড়ি এলাকায় হাজার হাজার পর্যটকের ভিড় দেখে।
সমতল থেকে ১২ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় একটি সাফারি কীভাবে পর্যটকদের স্বর্গভূমি হতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সাফারি পার্ককে কেন্দ্র করে পুরো এলাকাটি হয়ে উঠেছে পর্যটকদের তীর্থস্থান। খাড়া পাহাড় ধরে উপরে উঠে গেছে মসৃণ সড়ক। শত শত গাড়ি ছুটে যাচ্ছে আকর্ষণীয় এ পর্যটনকেন্দ্রের দিকে। সড়কের দু'পাশ ধরে অসংখ্য হোটেল, মোটেল, ভিলা, রেস্টুরেন্ট ও খাবারের দোকান কোনোটিই খালি পড়ে নেই।
ইন্দোনেশিয়ান ১ লাখ ২৫ হাজার রুপিয়া দিয়ে (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক হাজার) টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম সাফারি পার্কে। ভেতরে উন্মুক্ত বন্যপ্রাণী দর্শনের সুযোগ ছাড়াও পর্যটকদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নানা ব্যবস্থা। 'তামান সাফারি পার্ক'-এর পুরোটা ঘুরে সব ইভেন্ট উপভোগ করতে গেলে দু'তিনদিন সময় লেগে যেতে পারে। পর্যটকরা এখানে কেবল সাফারি বা বন্যপ্রাণী দেখার জন্য আসছে না, তারা আসছে পাহাড়ের নিসর্গকে আত্মস্থ করতে। প্রকৃতিকে হৃদয় দিয়ে উপভোগ করতে। এখানে বনের ভেতরে রাত কাটাতে রয়েছে আধুনিক সব ব্যবস্থা। সুদৃশ্য কটেজে মাত্র ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায় থাকার সুন্দর ব্যবস্থা পর্যটকদের প্রলুব্ধ করে। রয়েছে পাহাড়ের ট্রেইল ধরে হাঁটার দীর্ঘ রোমাঞ্চকর পথ। অবশ্য টিকিট কেটেই পাহাড়ি এ পথে হারিয়ে যেতে হবে। এখানে বিনোদনের জন্য রয়েছে অসংখ্য রাইড, বন্যপ্রাণীর খেলা, এডুকেশন শো, রেইন ফরেস্ট দেখার ব্যবস্থা।
উপন্যাসের বা সিনেমার 'কাউবয়' চরিত্রও এখানে বাস্তবে দেখতে পাবেন। কাউবয়দের এ উপস্থাপনা অবিশ্বাস্য ও শ্বাসরুদ্ধকর। তীর থেকে ধনুক ছুড়ে শত্রুকে বিদ্ধ করা কিংবা বোমা দিয়ে একটি ভবনকে চোখের সামনে আগুনের ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা বাস্তবেই ঘটে। এ ধরনের শো দেখে পর্যটকরা শিহরিত এবং আনন্দে উদ্বেলিত হয়। মোটরসাইকেল রেইস, কালচারাল শোর ব্যবস্থা, কেনাকাটার জন্য শপিংমলসহ কী নেই এখানে।
ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের প্রকৃতি এবং পরিবেশকে রক্ষা করে পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। পাশাপাশি আয় করছে কোটি কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা। সরকারপ্রধানও এ ব্যাপারে অতি সচেতন, বুঝতে কষ্ট হয় না। জাকার্তা শহরের কেন্দ্রস্থলে বিশাল এলাকাজুড়ে রাষ্ট্রপ্রধানের সরকারি দফতর ও আবাসস্থল। রাষ্ট্রপতি ভবনের এ বিশাল এলাকাজুড়ে অসংখ্য শতবর্ষী বৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার হরিণ। সবুজ মাঠে অসংখ্য হরিণের বিচরণ দেখার মতো দৃশ্য। এখানেই ঘটছে তাদের বংশবৃদ্ধি। যে দেশের সরকারপ্রধান এ ধরনের প্রকৃতিপ্রেমিক, সে দেশটির প্রকৃতি ও পরিবেশ হতে পারে সহজেই অনুমেয়।
ই-মেইল : taher_bd@hotmail.com

Sunday, March 27, 2011

কল্যাণপুর, মিরপুর; ঢাকা

0 comments
কল্যাণপুর মিরপুর সংলগ্ন একটি জনপদ। ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নাগরিকদের বড় একটি অংশ এ এলাকায় বাস করে। এক সময় এখানের জনজীবন খুবই সাধারণ ছিল। প্রচুর গাছপালাবেষ্টিত ছিল এ এলাকা। দিন দিন গাছপালা ধ্বংস করে গড়ে উঠছে আকাশ ছোঁয়া সব ভবন। ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। কল্যাণপুর মিরপুরের অন্যান্য এলাকার মধ্যে এখনও শান্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত। সাধারণ জনগণের অভিমত সন্ত্রাস কিংবা কারও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এখানে নেই। এখন কতদিন এমন থাকবে এটাও শঙ্কা এলাকাবাসীর। এ অঞ্চল ঘুরে এসে লিখেছেন জিসাদ ইকবাল

ওয়ার্ডভুক্ত(১১)এলাকা : কল্যাণপুর, দক্ষিণ পাইকপাড়া, মধ্য পাইকপাড়া, সায়েন্স ল্যাবরেটরি স্টাফ কোয়ার্টার, ডি-টাইপ সরকারি কলোনি, কল্যাণপুর হাউজিং স্টেট
জনসংখ্যা : ২ লাখ প্রায়
ভোটার সংখ্যা : ৬০ হাজার
ভোটকেন্দ্র : ৮টি
থানা : মিরপুর
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : হাইস্কুল চারটি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দুটি, কিন্ডারগার্টেন ২০টি
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান : মসজিদ ২০টি, মাদ্রাসা ৬টি, গির্জা ১টি
অন্যান্য : পানির পাম্প চারটি, ক্লাব দুটি :অনুশীলন সংসদ ও অগ্রদূত সংসদ, বিআরটিসি বাস ডিপো, সড়ক গবেষণাগার, র‌্যাব-৪ এর কার্যালয়, ইবনে সিনা হাতপাতাল ও কলেজ, গ্গ্নুকোমা রিসার্চ ইনস্টিটিউট

বিহারিদের গণহত্যা
১৯৭১ সালে কল্যাণপুর একটি জনবিরল এলাকা ছিল। চারদিকে ধানক্ষেত আর কৃষিজমির মধ্যে দু-একটি ঘরবাড়ি ছিল। তখনকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুর বিহারি অধ্যুষিত এলাকা ছাড়াও কল্যাণপুরের মধ্য পাইকপাড়াতেও বিহারিদের বসবাস ছিল। এলাকাবাসী জানায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারিরা কল্যাণপুরের বিভিন্ন বাড়িতে নিরীহ বাঙালিদের ওপর হামলা চালায়। অনেক বাড়িতে লুটতরাজ ও গণহত্যা চালায়। তখন অনেক বাঙালি পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও সমর্থক সন্দেহ করে অনেককে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে নির্জনে ছুরি, তলোয়ার দিয়ে গণহত্যা করত বিহারিরা। এখনও বিহারিদের গণহত্যার নিদর্শন রয়েছে অনেক স্থানে, বাড়িতে। বর্তমান কল্যাণপুরের ১২ নম্বর রোডের রিতা ভিলায় একই পরিবারের ১৩ জনকে হত্যা করার কথা জানায় এলাকাবাসী। ২ নম্বর রোডের মেলোডি হাউস, ১৩ নম্বর রোডের কলেল্গাল হাউসে লুকানো অবস্থায় একজনকে হত্যা করে বিহারিরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারিদের হাতে নিহতদের স্মরণে শহীদ মিনার রোড এবং অনুশীলন সংসদ মাঠে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।


কল্যাণপুর পোড়া বস্তি
গৃহায়ন ও গণপূর্তের হাউজিং বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জায়গায় কল্যাণপুর পোড়া বস্তি। ১৯৮৯ সালের দিকে বস্তিটি আগুনে পুড়ে যায়। এরপর থেকে পোড়া বস্তি নামে পরিচিতি লাভ করে। এখানে বরিশাল, ভোলা অঞ্চলের লোকজনের বসবাস বেশি। ২০০৩ সালে বস্তি উচ্ছেদ করা হলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার পুনর্বাসন হয় এখানেই। বস্তিবাসীর নাগরিক সংকট লেগেই আছে। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও গ্যাস, পানির রয়েছে তীব্র সংকট। তেমনি রাস্তা, স্যুয়ারেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই বস্তির ভেতরে। অন্যদিকে পোড়া বস্তি নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা, চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা রয়েছে পোড়া বস্তিকে ঘিরে। দক্ষিণ কল্যাণপুরের বাসিন্দা আকতারুজ্জামান বলেন, পোড়া বস্তিতে নীরবে জমজমাট মাদক ব্যবসা চলছে। আপনি একবার শুধু তাদের সঙ্গে পরিচিত হবেন তারপর থেকে আর এখানে আসতে হবে না, মোবাইল ফোনে কল দিলেই ঠিকানামতো মাদক পেঁৗছে যাবে। কী চাই গাঁজা, ফেনসিডিল না ইয়াবা। আর মাদকসেবীরা নেশার টাকা জোগাড় করতে এলাকায় ছিঁচকে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বস্তির প্রবেশপথে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ভাঙাড়ি দোকান। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বাসাবাড়ি থেকে চুরি হওয়া বিভিন্ন জিনিসপত্র এসব ভাঙাড়ি দোকানে কেনাবেচা চলে।

অনুশীলন সংসদ
১৯৭২ সালে এলাকার কিছু যুবক খেলাধুলা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উদ্ভাসিত হয়ে গড়ে তোলেন অনুশীলন সংসদ নামে একটি ক্লাব। যে ক্লাবটি আজ ওয়ার্ডবাসীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনে কাজ করে যাচ্ছে। ভিক্টোরিয়া ক্লাবের ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক রেজাউল করিম বাবুল প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি থেকে ১৯৭৬ সালে ক্লাবের রেজিস্ট্রেশন করা হয়। সামাজিক বন্ধনের টানে প্রতিদিন নবীন-প্রবীণ বাসিন্দাদের পদচারণায় মিলনমেলায় পরিণত হয়। খেলাধুলার পাশাপাশি শহীদ মিনারে ফুল প্রদান, শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিত, দুস্থ অসহায়দের চিকিৎসাসেবা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশবাসীকে সহায়তা করা হয়। এ ছাড়াও ক্লাবের উদ্যোগে মাঠে প্রবীণ ব্যক্তিদের সকালবেলা হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের ব্যবস্থা, ফলদ ও ঔষধি গাছ রোপণ এবং শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। ওয়ার্ডবাসীর নাগরিক সংকট দূর করতে এবং রাস্তা প্রশস্ত করতে ক্লাবের সদস্যরা কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন সবসময়।

বিনোদন কেন্দ্র হতে পারে কল্যাণপুর খাল
ওয়ার্ডের সীমানা রয়েছে কল্যাণপুর খাল। কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর নজরদারির অভাবে খালের দু'পাশ অবৈধ দখলে চলে যাচ্ছে। তেমনি তরল ও কঠিন বর্জ্য পরিষ্কার না করায় দূষিত হচ্ছে খালের পাশপাশের পরিবেশ। এলাকাবাসী জানায়, কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে খালের জায়গা একটু একটু করে দখল নিচ্ছেন বাড়ির মালিকেরা। এসব দখল এখনই ঠেকানো না গেলে ভবিষ্যতে উদ্ধার করা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। কল্যাণপুর প্রধান সড়কের ব্রিজ থেকে খালের দু'পাশে হাঁটাচলার জন্য ফুটপাত নির্মাণ ও খালের সীমানায় বৃক্ষরোপণ করা হলে খালটি বিনোদন কেন্দ্র পরিণত হবে।

ঢাকায় একাত্তরের বধ্যভূমি

1 comments
দেশের স্বাধীনতার জন্য বলি হওয়া অসংখ্য শহীদের স্মৃতি ধারণ করে আছে বধ্যভূমিগুলো। সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়ায় অনেক বধ্যভূমি নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল পরিণত হয়েছিল একটি বধ্যভূমি ও গণকবরে। আরও যেসব বধ্যভূমি ও গণকবরের সন্ধান মিলেছে ঢাকায়_ সেগুলো হলো তেজগাঁও এতিমখানা, সাভারের ভায়াডুবি ব্রিজ, কালীবাবুর গ্যারেজ সংলগ্ন খাল, কামালপুর বাজার কালভার্ট, নবাবগঞ্জের বর্ধনপাড়া গ্রাম, কলাকোপা গ্রাম, আমিরবাগ, বারানিবাগ, সাতগাঁও, চরাইল, পোস্তগোলা, কেরানীগঞ্জের মধ্য কেরানীগঞ্জ, মান্দাইল খালের পাশে, কালীগঞ্জ, শুভাঢ্যা, নগরগঞ্জ, কালিন্দী, জিঞ্জিরা, আদাবর, মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল কলেজ, মহাখালী যক্ষ্মা হাসপাতাল, এমএনএ হোস্টেল, তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরের পাশে, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কুর্মিটোলা বিমানবন্দর, আদমজীনগরের শিমুলপাড়া, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, নারিন্দা খেলার মাঠ, সূত্রাপুর লোহার পুল ও সায়েদাবাদ আউটফল বধ্যভূমি
ছবি: রেজওয়ান
'মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হল বলিদান'_ গানটি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য বলি হওয়া অসংখ্য শহীদের স্মৃতি ধারণ করে আছে বধ্যভূমিগুলো। সারাদেশে রয়েছে চিহ্নিত বা অচিহ্নিত অসংখ্য বধ্যভূমি। তবে ঢাকায় বধ্যভূমির সংখ্যা বেশি। সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়ায় অনেক বধ্যভূমি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যেগুলো এখনও আছে, সেগুলোর চিহ্নও মুছে যেতে বসেছে। ঢাকায় এ পর্যন্ত ৭০টি বধ্যভূমি ও গণকবরের সন্ধান পেয়েছে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি। এর মধ্যে রাজধানীর মিরপুরেই রয়েছে ২৩টি। ৭০টির মধ্যে কেবল ১০টি বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এর সবই প্রায় মিরপুরে। মিরপুরের এ ১০টির মধ্যে মাত্র একটি বধ্যভূমি সংরক্ষণ করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। অবশিষ্টগুলো এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন। রায়েরবাজার বধ্যভূমি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম থেকেই অসংখ্য মানুষের লাশ এনে স্থানটিকে রীতিমতো গণকবরে পরিণত করা হয়েছিল। শহর থেকে দূরে নিরিবিলি এ বধ্যভূমিটি আবিষ্কৃত হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর মানুষ সেখানে লাশ দেখে ভিড় করে। সেদিন রায়েরবাজারের বিভিন্ন গর্ত থেকে প্রচুরসংখ্যক লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকেরই লাশ ছিল বেশি। কিছু মানুষের লাশ এতই বিকৃত ছিল যে, শনাক্ত করার উপায় ছিল না। যাদের শনাক্ত করা গিয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, সেলিনা পারভীন, ডা. ফজলে রাব্বী প্রমুখ। ২৫ মার্চ থেকে মূলত গণহত্যার কালরাত শুরু হয়। হানাদাররা এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের, অধ্যাপকদের বাসভবন ঘেরাও করে। তারা জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. মুনিরুজ্জামান, তার দুই আত্মীয় ও এক প্রতিবেশী যুবককে গুলি করে। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা বেঁচে থাকলেও বিনা চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়। হানাদাররা কামান, রকেট লঞ্চার, মর্টার নিয়ে ঢাবির ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল) আক্রমণ করে। সকালে গোলাগুলি থামে। ইকবাল হলে পড়তে থাকে এক স্তূপ লাশ। জগন্নাথ হলেও চলে গণহত্যা। মূলত তৎকালীন সব আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর হানাদারদের ছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ। তাই তারা সব আধুনিক অস্ত্র নিয়ে হলে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারাদেশেই অসংখ্য বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়। ঢাকায় সেসব গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও বধ্যভূমির বর্তমান অবস্থা যেমন_
রায়েরবাজার বধ্যভূমি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেণ্য শিক্ষক ড. মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, শিল্পী আলতাফ মাহমুদসহ বহু শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা করে আলবদর ও রাজাকাররা স্বাধীনতার মাত্র একদিন আগে। তাদের সবাইকে হত্যার পর রায়েরবাজারের নিচু ডোবায় লাশ ফেলে দেয় ঘাতকরা। ১৬ ডিসেম্বর প্রথম আবিষ্কৃত বধ্যভূমির নাম রায়েরবাজার বধ্যভূমি। এখানে ঢাকার অন্যান্য এলাকা থেকে হত্যা করা মৃতদেহ এনে ফেলত হানাদার বাহিনী। রায়েরবাজারের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে স্মৃতিফলক স্থাপন ও এ স্থানটি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
মুসলিম বাজার বধ্যভূমি : ১৯৯৯ সালের ২৭ জুলাই মিরপুর মুসলিম বাজারের পাশে নূরী মসজিদের বর্ধিতাংশ নির্মাণের জন্য মাটি খননের সময় বধ্যভূমিটির সন্ধান পাওয়া যায়। এ বধ্যভূমি থেকে অসংখ্য হাড়গোড়, মাথার খুলি ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়। জানা যায়, এখানে একাত্তরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছিল।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন : রাজারবাগ পুলিশ লাইন ছিল পাকবাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র। এখানে বধ্যভূমিও আছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এখানকার পুলিশ ব্যারাক আক্রমণ করে প্রায় ২ হাজার বাঙালি পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এরপর নয় মাসব্যাপী হত্যাযজ্ঞে স্থানটি পরিণত হয় গণকবর আর বধ্যভূমিতে।
জগন্নাথ হল : হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অবস্থানরত নিরপরাধ ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে জগন্নাথ হলের ৩ শিক্ষক, ৩৪ ছাত্র ও ৪ কর্মচারীকে মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় হানাদার বাহিনী। এছাড়া পাশের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলেও (তৎকালীন ইকবাল হল) বহু ঘুমন্ত ছাত্রকে হত্যা করা হয়।
রমনা কালীবাড়ি : ২৯ মার্চ বাঙালি ইপিআর অফিসার ক্যাপ্টেন আজাদসহ ২০ ইপিআর সদস্যকে এখানে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৭ মার্চ কালীমন্দিরের সিংহ দরজার কাছে ৫০-৬০ জনকে হত্যা করা হয়। এখানে মধুদার লাশও পাওয়া যায় ।
সূত্রাপুর লোহার পুল : পাকসেনা ও তাদের দোসররা বহু মানুষকে সূত্রাপুর লোহার পুলের ওপর এনে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ পুলের ওপরই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. হরিনাথ দেকে গুলি করে হত্যা করে হানাদাররা।
জগন্নাথ কলেজ : পাকসেনা ও তাদের দোসররা পুরো ৯ মাস এ কলেজে থেকে পুরনো ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে অগণিত মানুষ হত্যা করে। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি শনিবার কোতোয়ালি থানা পুলিশ স্থানটি খুঁড়ে ৭টি কঙ্কাল উদ্ধার করে।
ছবি: প্রথম আলো
সেনানিবাস ও বিমানবন্দর এলাকা : ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী ট্রাকে করে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিদিন শত শত লাশ নিয়ে আসত। তারপর গর্ত করে বুলডোজার চালিয়ে সেসব লাশ মাটিচাপা দিত।
ইস্কাটন গার্ডেন : এখানে বিভিন্ন গর্ত থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। ঢাকা পতনের কিছু দিন আগে সান্ধ্য আইন জারি করে বিভিন্ন স্থান থেকে মহিলাদের ধরে এনে এখানে অত্যাচারের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
রাইনখোলা : স্বাধীনতার পরপরই এ বধ্যভূমিটি চিহ্নিত করা হয়। একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে রাইনখোলা এলাকায় বধ্যভূমিটির সন্ধান পাওয়া যায়।
মিরপুর বাঙলা কলেজ : একাত্তরে মিরপুরের বাঙলা কলেজের পুরোটাই হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। শিক্ষক কমনরুমের দক্ষিণে একটি, অধ্যাপকদের বাসভবনের গেটের সামনে একটি এবং ছাত্রাবাসের পশ্চিমে দুটি কুয়া ছিল। এ কুয়াগুলোয় ফেলা হতো শহীদদের লাশ। অনার্স ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর সংলগ্ন এলাকা ও কলেজের পেছনে রয়েছে গণকবর।
কালাপানি : মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের শহীদবাগে অবস্থিত কালাপানি বধ্যভূমি। এখানে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিহারি এবং পাকবাহিনীর দোসররা হত্যা করে বহু মুক্তিকামী মানুষকে। এখান থেকে ১৯৭২ সালে উদ্ধার করা হয়েছিল ৮১ বস্তা দেহাবশেষ ও অসংখ্য লাশ।
শিরনিরটেক ও কাউয়িন্দা : মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের উত্তরদিকে বেড়িবাঁধ সংলগ্ন স্থানটিই শিরনিরটেক। তার পাশে কাউয়িন্দা গ্রামেও ৫০০ থেকে ৫৫০টি লাশ দেখেছেন স্থানীয়রা।
গোলারটেক : মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের পেছনের এলাকাটির নাম গোলারটেক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এটি ছিল মূলত হিন্দুপাড়া। একাত্তরে গোলারটেক গ্রামটিই হয়ে ওঠে বাঙালি নিধনযজ্ঞের চারণভূমি। সৌধের ঠিক উত্তরে অবস্থিত গণকবরে রয়েছে ১৮ শহীদের লাশ। এখন যেখানে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ।
আলোকদি : মিরপুরের প্রায় শেষ প্রান্তের গ্রাম আলোকদি। একাত্তরের ২৪ এপ্রিল মধ্যরাতে এ গ্রামের নিরীহ জনসাধারণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের এ দেশীয় দালাল, রাজাকার ও বিহারিরা। তারা এ গ্রামের ২-৩ হাজার মানুষকে হত্যা করে।
শিয়ালবাড়ি : মিরপুরের সনি সিনেমা হলের মোড় থেকে উত্তরে হাজি রোডের শিয়ালবাড়ি গ্রাম। তখন প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বাস ছিল এ গ্রামে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর সেই গ্রামটি হয়ে পড়েছিল বিরানভূমি। এখানে একটি গণকবর রয়েছে।
সারেংবাড়ি : মিরপুর শাহ্আলী মাজারের উত্তরে রয়েছে সারেং মনির উদ্দিন শাহের একটি মাজার। সারেংবাড়ি গ্রাম নামে পরিচিত এ এলাকায় ১৯৯১ সালে সিটি করপোরেশন স্যুয়ারেজ ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গেলে বেরিয়ে আসে মানুষের হাড়, মাথার খুলি, চশমা, জুতা, গুলির খোসা, বন্দুকের অংশ, হাতের চুড়ি ইত্যাদি।
জল্লাদখানা : মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে পাওয়ার হাউসসংলগ্ন জল্লাদখানা বধ্যভূমি। ১৯৯৯ সালে কূপটি খননের পর উদ্ধার করা হয় ৭০টি মাথার খুলি, ৫ হাজার ৩৯২টি হাড় ও ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রী। পরে সেসব তিনটি ট্রাকবোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধে।
তেজগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ ইনস্টিটিউট : এখানকার ২৮, ৩৩ ও ৩৭ নম্বর স্টাফ কোয়ার্টার প্রাঙ্গণে মাটি খুঁড়ে বেশ ক'জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ডিসেম্বরের ১০ থেকে ১৬ তারিখের মধ্যে এসব হতভাগ্য বাঙালিকে হত্যা করা হয়।
ধানমণ্ডি বালিকা বিদ্যালয় : মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ধানমণ্ডি বালিকা বিদ্যালয়কে বাঙালি নির্যাতন ও হত্যাকেন্দ্রে পরিণত করা হয়।
ধলপুর ডিপো : ধলপুর ময়লা ডিপো নামে পরিচিত স্থানটির বড় বড় গর্তে হাজার হাজার মানুষকে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

দেশব্যাপী ১৭৬টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ১৭৬টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ এবং সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার স্থান তথা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত দেশের ৩৫টি স্থানে বধ্যভূমি চিহ্নিত করে তা সংরক্ষণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে পাওয়া তালিকা এবং অন্যান্য সুপারিশের মাধ্যমে এ ১৭৬টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টির জন্য সরকারি জমি পাওয়া গেছে। বাকি ১৪৭টির জন্য জমি কিনতে হবে, যার অর্থায়ন হবে প্রকল্প ব্যয় থেকে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭১ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিটি বধ্যভূমির জন্য ১০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে ২০১৩ সালের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) তাজুল ইসলাম এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই আমরা বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি। পরিকল্পনা কমিশন থেকে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে, একসঙ্গে এত বধ্যভূমির কাজ হাতে না নিয়ে দুই-তিন ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে।

- রিবেল মনোয়ার

শাঁখারীবাজারের মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধ

0 comments
২৬ মার্চ থেকে পুরো এপ্রিল পর্যন্ত পাকসেনারা নির্মমভাবে হত্যা করে শত শত অসহায় সাধারণ শাঁখারীকে। বাড়িঘর সবকিছুই পুড়ে ছাই। শাঁখারীবাজারের বাতাসে শুধু মৃত মানুষের গন্ধ আর ধ্বংসাবশেষ। ২৬ মার্চ বিকেল ৪টা ৪৯ মিনিটে পাকবাহিনী ৪০, শাঁখারীবাজারে গুলি করে হত্যা করে। ২৬ মার্চ বিকেলে পাকসেনারা ৪৭, শাঁখারীবাজারে সর্বপ্রথম তাদের বাড়িতে হামলা চালায়।

২৮ মার্চ দুপুর ১২টা থেকে ১টার সময় ৩৬, শাঁখারীবাজারের ডা. নিশিহরি নাথকে যখন পাকসেনারা হত্যা করে তখন শাঁখারীবাজারের বাসিন্দারা চলে যান বুড়িগঙ্গার ওপারে জিনজিরায়।


মহান মুক্তিযুদ্ধে শাঁখারীবাজারের আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য শহীদ স্মৃতিসৌধ সমিতি ১৯৭১ সালে শাঁখারীবাজারে নির্মাণ করে 'শহীদ মিনার'।

Saturday, March 26, 2011

মৃত্যু কী

58 comments
মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। জীবনের সঙ্গে মৃত্যু ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে মৃত্যু যেন শুধু বড়দের জন্য। ছোটদের এ বিষয়ে তেমন কিছু জানানো হয় না বা বলা হয় না। অবশ্য হালে এ ব্যাপারটা কিন্তু একদম বদলে গেছে।
ছোট ছোট বাচ্চারা যখন প্রশ্ন করে বাবা-মায়েদের, 'দাদু বা নানু কীভাবে মারা গেছে?' তখন বাবা-মায়েদের বিপদে পড়তে হয়। কারণ মৃত্যু কী, কেনই বা মৃত্যু আসে, বা মৃত্যু কেন স্বাভাবিক তা বোঝাতে হিমশিম খান তারা। সম্প্রতি এক জার্মান মনোবিজ্ঞানী বাচ্চাদের জন্য বিশেষ একটি প্রোগ্রামের আয়োজন করেছেন। এ প্রোগ্রামে বাচ্চাদের মৃত্যু সম্পর্কে নানা বিষয় জানানো হয়, দেওয়া হয় নানা তথ্য। কোলোন শহরের অদূরেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৫ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য আয়োজন করা হয়েছিল বিশেষ এ কোর্সের। এ কোর্সের মেয়াদ পাঁচদিন। কোর্সের নাম 'হসপিস মাখ্ট শুলে' অর্থাৎ যে মানুষটি মৃত্যুর খুব কাছাকাছি তার সঙ্গে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাটানো। সেই কোর্সে প্রতিদিনই বাচ্চাদের একবার করে জানানো হয় মৃত্যু হচ্ছে খুবই স্বাভাবিক এক প্রক্রিয়া। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকে এর মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। কেউ মারা যেতে পারে রোগে ভুগে, কেউ দুর্ঘটনায়, কেউ আবার নিজের মৃত্যু নিজেই ডেকে আনতে পারে। যেভাবেই হোক না কেন মৃত্যু অবধারিত। বিভিন্ন ধরনের মেঘের রঙের মধ্য দিয়ে বাচ্চাদের বোঝানো হয়েছে।
বেঁচে থাকার অর্থ হলো সাদা মেঘ। অসুস্থ মানে অন্ধকার এবং মৃত্যু মানে কালো মেঘ। এই হচ্ছে প্রধান তিনটি রঙ। এসব বাচ্চাকে বলা হয়েছিল পাঁচদিনে তারা কী দেখেছে, জেনেছে তা নিয়ে একটি লেখা জমা দিতে। কী লিখেছে তারা? একটি ছেলে জানাল, 'আমার দাদা এখন বসবাস করছে কালো মেঘের মধ্যে। কারণ তিনি মারা গেছেন। আমি সাদা মেঘের মধ্যে কারণ এখানে আমার সব বন্ধু-বান্ধব আর খেলার সাথী রয়েছে।'
একটি মেয়ে জানাল, 'সাদা মেঘে আমি লিখেছি আমাদের স্কুলে একটি নতুন টয়লেট বসানো হয়েছে। স্কুলের বাগানে ফুল ফুটছে। আর অন্ধকার মেঘে আম্মুর কথা লিখেছি। কারণ আম্মু অসুস্থ।' মনোবিজ্ঞানী বেটিনা হাগেডর্ন ডুরেন শহরে ১৩ বছর ধরে এ বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। হসপিস মাখ্ট শুলের কোর্সটি তিনিই চালু করেছেন ২০০৫ সালে। তিনি বলেন, এর মূল কারণ হলো হঠাৎ পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যুর খবর অথবা তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই ও এ ধরনের খবর মানুষ মেনে নিতে পারে না। অনেকে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েন। অনেকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেটিনার কথায়, 'মৃত্যু প্রসঙ্গে বাচ্চারা প্রশ্ন করলে বেশিরভাগ বাবা-মা-ই জানেন না, কী উত্তর দিতে হবে। তারা মনে করেন, এ বিষয়ে বাচ্চাদের কিছু বলা ঠিক নয়। আমরা কিন্তু বাচ্চাদের সঙ্গে ভয়ভীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি। এমনকি জন্ম-মৃত্যুর নানা দিক নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করি, অনেক কিছু বুঝিয়ে দিই। মৃত্যু অবধারিত। প্রতিটি মানুষের জীবনে মৃত্যু একবার আসবেই। তাই খুবই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুকে গ্রহণ করতে হবে।
এ ব্যাপারে ছায়ানটের স্কুল কার্যক্রম নালন্দার নবম শ্রেণীর ৪ শিক্ষার্থীকে (অরভি, সৌরভ, অনিন্দ্য নাহার, দীপ্ত) এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানিয়েছে, এটা আমরা এক ধরনের ভীতিকর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে জানি। যা সমাজ বা ব্যক্তির জন্য স্বস্তিকর নয়। তাই এটা পদ্ধতিগত শিক্ষার মধ্যে থাকলে ভালো হয়। জন্মটা যেমন একটা জৈব প্রক্রিয়া মৃত্যুটা তার স্বাভাবিক পরিসমাপ্তি। মানবজাতি তার জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে সুদীর্ঘ সময় ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে আছে। জ্ঞানবিজ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার জন্য আমরা এগিয়ে চলেছি।
এটা অনুধাবন করলে সমাজের মঙ্গলকামনা আমাদের মধ্যে দৃঢ় হবে। জীবনকে পরিমিতিবোধ ও লোভ থেকে দূরে রাখতে সমর্থ হব।

-এনামুল হক মনি