Thursday, June 3, 2010

মাউন্ট এভারেস্ট

0 comments
আরিফ হাসান
স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে না। আবার স্বপ্নবাজ মানুষের স্বপ্নের কোনো শেষ নেই। কারো স্বপ্ন সাঁতার কেটে সাগর পাড়ি দেয়া, কারো স্বপ্ন দু’পায়ে হেঁটে বিশ্ব দেখা। কারো কারো স্বপ্ন আরও বেশি। সেই স্বপ্ন পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে মেঘের জলকণা গায়ে মেখে আকাশ ছোঁয়ার!

পৃথিবী জুড়ে পাহাড়ের কোনো শেষ নেই। কিন্তু কোন পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আকাশ ছোঁয়া যাবে, সেটা জানা ছিল না কারোরই। তাতে কী, স্বপ্ন যখন আছে তখন সেই পাহাড় চূড়োর খবর একদিন ঠিকই জানা যাবে। হ্যাঁ, বহু বছর পরে হলেও একদিন সেই পাহাড় চূড়োর খবর ঠিকই জানা গেল। পৃথিবীর নানান দেশের পাহাড়-পর্বতের খোঁজ-খবর রাখতেন স্যার জর্জ এভারেস্ট নামের এক ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি ছিলেন ভারতের ব্রিটিশ সার্ভেয়ার জেনারেল। ১৮৫২ সালের কথা। জর্জ এভারেস্ট বললেন, নেপাল ও তিব্বতকে দুই পাশে রেখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়টিই পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পাহাড়! সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তার উচ্চতা ২৯ হাজার ফুটেরও বেশি (সাড়ে ৫ মাইলের মতো)! তিনি এর নাম দেন ‘চূড়ো ১৫’। পাহাড় নিয়ে যারা খোঁজ-খবর রাখেন তাদের কাছে বহুদিন এটা ‘চূড়ো ১৫’ নামেই পরিচিত ছিল। দশ বছর পরে অর্থাৎ ১৮৬২ সালে জর্জ এভারেস্টের সম্মানে ‘চূড়ো ১৫’র নাম রাখা হয় মাউন্ট এভারেস্ট। সবচেয়ে উঁচু পাহাড় হিসেবে ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ নাম পাওয়ার আগে নেপালিরা এই পাহাড়টির নাম দিয়েছিল ‘সাগরমাথা’ (আকাশের দেবী)। নেপালিদের কাছে এটা এখনো সাগরমাথা নামেই পরিচিত। আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাহাড়টিকে তিব্বতিরা ডাকত চোমোলুংমা নামে। তিব্বতি ভাষায় চোমোলুংমা মানে হলো মহাবিশ্বের দেবী মা। বিশ্ববাসী পাহাড়টিকে মাউন্ট এভারেস্ট হিসেবে ডাকলেও তিব্বতিরা ওকে এখনো চোমোলুংমা নামেই ডাকে।

পাহাড় থেকে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো যাদের নেশা তাদেরকে বলা হয় পর্বতারোহী। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো ওদের কাছে পাড়া বেড়ানোর মতো ব্যাপার! এক পাহাড় জয় করা হলেই ওরা তাই ছুটে যায় আরেক পাহাড়ে। সকল কষ্ট আর প্রতিকূলতাকে মনের জোরে দূরে ঠেলে জয় করে চলে পাহাড়ের পর পাহাড়। এ রকমই এক পর্বতারোহীর নাম এডমন্ড হিলারি। বাড়ি তার নিউজিল্যান্ড। এ-কান ও-কান হয়ে তার কাছে একদিন খবর যায়, এই পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের নাম এখন মাউন্ট এভারেস্ট। অমনি তার স্বপ্ন পেয়ে বসে, যে করে হোক আকাশসমান এই পাহাড়ের চূড়োয় তাকে একদিন উঠতেই হবে! ইচ্ছে পূরণের কথা জানাতেই সাথী হিসেবে পেয়ে যান আরেক পর্বতারোহী তেনজিং নরগেকে। বাড়ি তার এভারেস্টের দেশ নেপালেই। অদম্য সাহসী এই দুই পর্বতারোহী ১৯৫৩ সালের ২৯ মে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে পা রাখেন এভারেস্টের চূড়োয়। সেই শুরু। এরপর হিলারি এবং নরগের পথ অনুসরণ করে এভারেস্টের চূড়োয় পা রেখেছে ৪ শ’র বেশি পর্বতারোহী। এই তালিকায় নাম লেখাতে পেরেছে বাংলাদেশও। বাংলাদেশের সেই বীর পর্বতারোহীর নাম মুসা ইব্রাহীম। পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থানে ২৩ মে তিনি বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে এসেছেন।

এভারেস্টের পুরো তথ্য

০০ মাউন্ট এভারেস্ট কোনো আলাদা পাহাড় নয়। এটা বিশাল আকারের হিমালয় পর্বতমালার একটি উঁচু শিখর বা শৃঙ্গ।

০০ হিমালয় পর্বতমালার জন্ম প্রায় ৬ কোটি বছর আগে।

০০ ভূ-তাত্ত্বিক কারণে প্রতি বছর ২ ইঞ্চি করে বাড়ে এভারেস্টের উচ্চতা!

০০ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় ২৯ হাজার ৩৫ ফুট বা সাড়ে পাঁচ মাইলের মতো।

০০ ভারতের ব্রিটিশ সার্ভেয়ার জেনারেল স্যার জর্জ এভারেস্টের নামে পর্বতটির নামকরণ করা হয়েছে। কারণ এভারেস্টের অবস্থান তিনিই প্রথম নির্ণয় করেন এবং উচ্চতা মাপেন।

০০ নেপালি ভাষায় মাউন্ট এভারেস্টের নাম সাগরমাথা বা আকাশের দেবী।

০০ তিব্বতি ভাষায় বলা হয় চোমোলুংমা বা মহাবিশ্বের দেবী মা।

০০ ২৭ ডিগ্রি ৫৯ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৬ ডিগ্রি ৫৬ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশে এর অবস্থান।

০০ ১৯৫৩ সালের ২৯ মে নিউজিল্যান্ডের স্যার এডমন্ড হিলারি এবং নেপালের তেনজিং নরগে সর্বপ্রথম এভারেস্ট চূড়োয় পা রাখেন।

০০ সর্বপ্রথম একা এভারেস্ট জয় করেন ইতালির পর্বতারোহী রেইনহোল্ড মেসনার, ২০ আগস্ট, ১৯৮০ সালে।

০০ শীতকালে সর্বপ্রথম এভারেস্টের চূড়োয় ওঠেন পোল্যান্ডের পর্বতারোহী লেসজেক চিচি ও ক্রিস্টোফ উইলিস্কি ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮০ সালে।

০০ এভারেস্ট চূড়োয় পা রাখা প্রথম আমেরিকানের নাম জেমস হোয়াইটেকার। তিনি ১৯৬৩ সালের ১ মে এভারেস্টচূড়োয় মার্কিন পতাকা ওড়ান।

০০ প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্ট-শৃঙ্গ জয় করেন জাপানের জুনকো তাবেই, ১৯৭৫ সালের ১৬ মে। তিনি চূড়োয় উঠেছিলেন সাউথকোল এলাকা দিয়ে।

০০ এভারেস্ট চূড়োয় পা রাখা প্রথম আমেরিকান নারীর নাম স্টেসি অ্যালিসন। তিনি ১৯৮৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা হয়ে চূড়োয় ওঠেন।

০০ উত্তর এবং দক্ষিণ উভয় পাশ দিয়ে এভারেস্টের চূড়োয় ওঠা প্রথম নারীর নাম ক্যাথি ওদোদ। তার বাড়ি দক্ষিণ আফ্রিকায়। দক্ষিণ পাশ দিয়ে চূড়োয় ওঠেন ১৯৯৬ সালের ২৫ মে এবং উত্তর পাশ দিয়ে চূড়োয় ওঠেন ১৯৯৯ সালের ২৫ মে।

০০ দক্ষিণ পাশ দিয়ে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে চূড়োয় ওঠা পর্বতারোহীর নাম বাবু চেরি শেরপা। ২০০০ সালের ২১ মে মাত্র ১৬ ঘন্টা ৫৬ মিনিটে চূড়োয় ওঠেন এই নেপালি।

০০ উত্তর পাশ দিয়ে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে চূড়োয় ওঠা পর্বতারোহীর নাম হ্যান্স কামারল্যান্ডার। ১৯৯৬ সালের ২৪ মে ১৬ ঘন্টা ৪৫ মিনিট সময় নিয়ে তিনি বেস ক্যাম্প থেকে চূড়োয় ওঠেন।

০০ সব পাশ দিয়েই চূড়োয় ওঠা পর্বতারোহীর নাম কুসাঙ শেরপা। বর্তমানে তিনি হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

০০ ৮ মে, ১৯৭৮ সালে পর্বতারোহী রেইনহোল্ড মেসনার ও পিটার হ্যাবেলার অক্সিজেন ছাড়াই এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন!

০০ ২০০১ সালের ২৫ মে সবচেয়ে বেশি বয়সে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন নেপালের শেরম্যান বুল (৬৪)।

০০ সবচেয়ে কম বয়সে এভারেস্ট জয়ের রেকর্ড গড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্ডান রোমেরো (১৩) ২২ মে ২০১০।

০০ সবচেয়ে বেশিবার এভারেস্টের চূড়োয় আরোহণের রেকর্ড নেপালের আপা শেরপার। ২২ মে ২০১০ তিনি ২০ বারের মতো এভারেস্টের চূড়োয় পা রাখেন।

০০ প্রথম এভারেস্টের চূড়ায় দু’বার ওঠার কৃতিত্ব নেপালের নওয়াং গোম্বুর।

০০ প্রথম বাঙালি হিসেবে এভারেস্ট-শৃঙ্গ জয় করেন দেবাশীষ বিশ্বাস ও বসন্ত সিংহ রায়। দেবাশীষের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় আর বসন্ত সিংহের বাড়ি নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে।

০০ প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এভারেস্টের চূড়োয় লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়েছেন মুসা ইব্রাহীম। ২৩ মে ২০১০।

০০ সবচেয়ে দ্রুতগতিতে এভারেস্ট-শৃঙ্গে ওঠার রেকর্ড অস্ট্রিয়ার পর্বতারোহী ক্রিস্টিয়ান স্ট্যানগলের। তিনি ২০০৭ সালে বেস ক্যাম্প থেকে মাত্র ১৬ ঘন্টা ৪২ মিনিটে পর্বত চূড়োয় পৌঁছেন। অক্সিজেন ছাড়াই তিনি চূড়োয় পৌঁছেন।

০০ সবচেয়ে দ্রুতগতিতে চূড়ো থেকে নেমে আসার রেকর্ড ফ্রান্সের জ্য মার্ক বোয়াভিনের। তিনি প্যারাগ্লাইডিং করে মাত্র ১১ মিনিটে নেমে আসেন বেস ক্যাম্পে।

০০ সবচেয়ে বেশি সময় চূড়োয় অবস্থানের রেকর্ড নেপালের চিরি শেরপার। তিনি সাড়ে ২১ ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন।

০০ এভারেস্টের চূড়োয় পা রাখতে গিয়ে ২০০৯ সালের শেষ ভাগ পর্যন্ত ২১৬ জন অভিযাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন।

০০ এভারেস্ট চূড়োর সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকার নাম খুম্বু আইস ফল। এই এলাকায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন পর্বতারোহী প্রাণ হারিয়েছেন।

০০ এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অভিযাত্রীদল এভারেস্ট জয়ে গেছে চীন থেকে। ১৯৭৫ সালে ৪১০ জনের একটি অভিযাত্রীদল ওই অভিযানে অংশ নেন।

কিশোর পর্বতারোহী

শুধু বড়োরা কেন, স্বপ্ন এবং চেষ্টা থাকলে ছোটরাও অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারে। সবচেয়ে কম বয়সে এভারেস্টের চূড়োয় পা রেখে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে সেটাই প্রমাণ করেছিল নেপালের তেম্বা শেরি নামের এক কিশোর। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। এবার আরও তাক লাগার পালা। কারণ ২২ মে শনিবার তেম্বা শেরির রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়েছে এক মার্কিন কিশোর। নাম তার জর্ডান রোমেরো। বয়স তেম্বা শেরির চেয়ে আরও কম। মাত্র ১৩ বছর। একই দিনে এভারেস্ট জয়ী সবচেয়ে কম বয়সী ভারতীয় হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে আরেক কিশোর অর্জুন বাজপেয়ি। রোমেরোর কথায় ফিরে আসা যাক। পর্বতারোহী হিসেবে রোমেরোর বয়স খুব কম হলেও রেকর্ডের পাল্লা কিন্তু অনেক ভারী।

এশিয়া মহাদেশের এভারেস্ট জয়ের আগে পাঁচ পাঁচটি মহাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়োয় পা রাখা হয়ে গেছে তার! পর্বতারোহী হিসেবে পাহাড়চূড়ো জয়ের শুরু তার নয় বছর বয়স থেকে! ২০০৬ সালের ২২ জুলাই প্রথম জয় করেছে আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়ো মাউন্ট কিলিমানজারো। পরের বছরের এপ্রিলে জয় করেছে অস্ট্রেলিয়ার কোশিউসকো, ১১ জুলাই ইউরোপের এলব্রাস এবং ৩০ ডিসেম্বর দক্ষিণ আমেরিকার অ্যাকনকাগুয়া। ২০০৮ সালের ১৮ জুন উত্তর আমেরিকার ডিনালি এবং ২০০৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জয় করেছে ওশেনিয়ার কার্সটেনজ। এ বছরের ডিসেম্বরে নামবে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়ো ভিনসন ম্যাসিফ জয়ের মিশনে।

0 comments:

Post a Comment