Monday, November 22, 2010

হাজারদুয়ারী জমিদার বাড়ি

52 comments
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার যোগীপাড়া ইউনিয়নের বীরকুৎসা জমিদার বাড়িটি এলাকায় 'হাজারদুয়ারী জমিদার বাড়ি' নামে পরিচিত। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে আজ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে এ বাড়িটি। বেদখল হয়ে যাচ্ছে এখানকার মূল্যবান সম্পদ। এলাকাবাসী মনে করেন, দ্রুত জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণ করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে এর কোনো চিহ্নও হয়তো থাকবে না। তখন বাড়িটি মানুষের মনে স্মৃতি হয়েই থাকবে। গবেষক ও স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে জমিদারি প্রথা চালু থাকাকালে তৎকালীন বাগমারার বীরকুৎসা ছিল একটি পরগনা। এ পরগনার জমিদার ছিলেন ভারতের কাশী থেকে আসা বিরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে বীরু বাবু। পার্শ্ববর্তী নওগাঁর আত্রাই উপজেলার আমরুল ডিহি বিশাল রাজা ছিলেন গোপাল ধাম। প্রভাতী বালা নামে তার এক রূপবতী কন্যা ছিল। রাজা গোপাল ধাম জামাতা বিরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও কন্যা প্রভাতী বালার নামে বীরকুৎসা পরগনাটি লিখে দেন। প্রভাতী বালা ছিলেন রুচিশীল এবং খুবই শৌখিন মনের মানুষ। তার পছন্দ অনুযায়ী বীরু বাবু বীরকুৎসায় গড়ে তোলেন একটি নয়নাভিরাম অট্টালিকা। এর মেঝে শ্বেত পাথরে আবৃত করা হয়েছিল। এ অট্টালিকার জন্য হাজারটি দুয়ার তৈরি করা হয়। সব দুয়ারেই সেগুন কাঠের কারুকাজ করা হয়। দরজাগুলো তিনটি স্তরে সাজানো। প্রথমে কাঠ, তারপর লোহার গ্রিল এরপর তা দামি কাচে মোড়ানো হয়। রানী প্রভাতী বালা প্রাসাদের সব দরজা, মেঝে, আসবাবপত্র প্রতিদিন চাকর-চাকরানীদের দিয়ে ধুয়ে-মুছে ঝকঝকে-তকতকে করে রাখতেন। বীরু বাবুর আরও দুই ভাই দুর্গা বাবু ও রমা বাবু এই প্রাসাদেই থাকতেন। প্রাসাদের সামনে বাহারি ফুলের বাগান ছিল। জমিদার পরিবার সেখানে বিকালে সময় কাটাতেন। প্রাসাদের পশ্চিম দিকে খিড়কি দরজা পার হয়ে সান বাঁধানো একটি বিরাট পুকুর রয়েছে। এই পুকুরে শুধু জমিদার পরিবারের লোকজনই গোসল করত। প্রাসাদের ভেতরের এক পাশে ছিল জলসাঘর। সেখানে বসত গানের আসর। কলকাতা থেকে ভোলানাথ অপেরা এসে গান-বাজনা করত। পূর্ব দিকের দেউড়ির দুই পাশে ৬ জন করে ১২ জন বরকন্দাজ থাকত। দেউড়ির পাশে ছিল মালখানা। এর কিছু দূরে ছিল মহাফেজখানা। দেশ ভাগের পর ১৯৫০ সালে রেন্ট রোল অ্যাক্টের বলে জমিদারি প্রথা উঠে গেলে এই বিশাল অট্টালিকা, বিপুল সম্পদ ও জমিজমা ফেলে বিরু বাবু সপরিবারে ভারত চলে যান। বীরু বাবু চলে যাওয়ার পর স্থানীয় শীতল মিস্ত্রি, কাজী সাহেব ও অন্যরা মিলে জমিদার বাড়ির অনেক জিনিসপত্র বিক্রি করে দেন। বীরু বাবু তার ঘনিষ্ঠ সহচর কালিপদ সরকারের নামে বেশকিছু সম্পদ লিখে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রাণভয়ে তাতে রাজি হননি কালিপদ। এই কালিপদ এখন জমিদার বাড়ির পাশে মাত্র বিঘা দুই জমিসহ পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করছেন খেয়ে না খেয়ে। অন্যদিকে, রাজার রেখে যাওয়া সম্পদ ভোগদখল করে অনেক ফকিরও হয়েছে এখন বড় লোক। বীরকুৎসার জমিদার বাড়ি কেউ দেখতে গেলে তা ঘুরে দেখান বয়োবৃদ্ধ কালিপদ সরকার। ঘুরে দেখাতে দেখাতে বর্ণনা করেন সেই আমলের কথা। পুরনো সেই দিনগুলোর কথা ভেবে নীরবে চাপা কান্নায় ভেঙে পড়েন বার বার। দামি শ্বেত পাথর, উন্নত কাঠের দরজা, গ্রিল এবং কাচ প্রায় সবই চুরি হয়ে গেছে। এখনও চুরি হচ্ছে। প্রাসাদের পূর্বের দেউড়ি পার হয়ে সামনে আরেকটি বড় পুকুর আছে, সেখানে গোসল করত আমলা, পেয়াদা ও বরকন্দাজরা। এই পুকুরটিও আজ বেদখল হয়ে গেছে। বকুলতলার পাশে খাজনা আদায়ের ঘর ছিল। যা এখন বীরকুৎসা তহশিল অফিস নামে পরিচিত। এর পাশের পূজামণ্ডপটিতে বসানো হয়েছে পোস্ট অফিস। ভবনের ভেতরে অনেক কক্ষ এখনও ফাঁকা পড়ে আছে।

-শ.ম সাজু, রাজশাহী

52 comments:

Post a Comment